অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৪
নুসাইবা ইভানা
হসপিটালের করিডোরে পিনড্রপ নীরবতা।
জিয়ান চেয়ারে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু তার দৃষ্টি আটকে আছে ইমার্জেন্সি কেবিনের দরজার দিকে। ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে দরজা খুলে সুনয়নাকে একপলক দেখে আসতে। সুনয়নার মুখটা একবার দেখলে হয়তো তার হৃদয় কিছুটা শান্ত হতো। আবার মনে হচ্ছে, একটু পরেই দরজাটা খুলে সুনয়না হাসিমুখে বের হয়ে বলবে, “এই যে মিস্টার পাইলট, এত ভয় পেয়েছ কেন? পুরুষ মানুষ এত ভয় পেলে চলে?”
কিন্তু সময় যেন কাটতেই চাইছে না। কল্পনা জুড়ে নানারকম চিন্তার বিচরণ—সেখানে খানিক সুখের হাতছানি, তো খানিকটা দুঃখের ঘনঘটা। নাহিদ কয়েকবার পানি এগিয়ে দিলেও জিয়ান ছুঁয়েও দেখছে না। দুই হাতের আঙুল শক্ত করে জড়িয়ে শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁট কাঁপছে বারবার।
নাহিদ আলতো করে জিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা করিস না।”
মিতা বেগম দূর থেকে ছেলের অবস্থা দেখে চোখ মুছলেন। ছেলেটা গতকাল রাত থেকে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে, মুখে কিছু তুলছে না। নাজিম চৌধুরী মিতা বেগমের দিকে এগিয়ে এসে ধীরকণ্ঠে বললেন, “জিয়ান ছোটবেলা থেকেই তো এমন। যাকে ভালোবাসে, তাকে নিয়ে পৃথিবী বানিয়ে ফেলে। ছোটবেলা থেকে জাহিনকে কতটা আগলে রাখত! নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসত জাহিনকে।”
মিতা বেগমের মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। জাহিনের স্মৃতিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই বুকটা ভারী হয়ে আসলো।
সায়না একটা বেবিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। নীলাঞ্জনা আরেকটা বেবিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। ছোট্ট দুটো মুখ একদম শান্ত। একজন ঘুমাচ্ছে, আরেকজন চোখ মিটমিট করছে। জাহানারা বেগম মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তার সেই আদুরে মেয়েটাও আজ মা হয়েছে! এখনও যাকে তার বাচ্চা মনে হয়। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “মাশাআল্লাহ, দুটোই একদম জিয়ানের মতো দেখতে হয়েছে।”
নীলাঞ্জনা বলল, “নাহহহ, মেয়ে বাবুটা দেখতে জিয়ানের মতো। আর দেখো, খেয়াল করে ছেলে বাবুটার চোখ, নাক, ঠোঁট সবটা কেমন নয়নার মতো।”
সায়না বলল, “হুম, কিন্তু কপাল আর থুতনিটা রেজা ভাইয়ের মতো।”
জিয়ান শুনেও কোনো প্রতিক্রিয়া দিল না। বরং এই কথাগুলোও তার বিরক্ত লাগছে শুনতে। তার একটাই কথা—আমার সুনয়নাকে একবার সুস্থ দেখতে চাই, তারপর বাকি সব।
আরও প্রায় চল্লিশ মিনিট এভাবে কেটে গেল। তারপর কেবিনের দরজা খুলে অনিকেত বের হয়ে আসল। মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও ঠোঁটের কোণে লেপ্টে আছে মৃদু হাসি। তার ঠোঁটের কোণের হাসি যেন প্রমাণ করে সুনয়না ঠিক আছে।
জিয়ান একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে অনিকেতের সামনে দাঁড়াল, “অনি? কেমন আছে ও?”
অনিকেত কোনো কথার উত্তর না দিয়ে জিয়ানকে জড়িয়ে ধরল। তারপর হেসে বলল, “কংগ্রাচুলেশন দুলাভাই, বিপদ কেটে গেছে। সুনয়নার জ্ঞান ফিরেছে। তোর বউ একদম ঠিক আছে, আর কোনো বিপদ নেই।”
জিয়ানের বুক থেকে যেন বিশাল পাথর নেমে গেল। সে দুহাতে মুখ ঢেকে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই মুহূর্তের অনুভূতি জিয়ান ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না। আনন্দে জিয়ানের চোখের কোণ ভিজে উঠল। মুখ থেকে হাত সরিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে বলল, “আমি কি নয়নার সাথে এখন দেখা করতে পারব? জাস্ট একবার, একনজর দেখেই চলে আসব।”
“এক মিনিট,” অনিকেত হেসে বলল, “ভেতরে যাওয়ার আগে কান্নাকাটি বন্ধ করুন দুলাভাই, আমার বোন ভয় পেয়ে যাবে।”
জিয়ান কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত কেবিনের দিকে চলে গেল।
সুনয়না দুর্বল চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। স্যালাইনের সুই লাগানো হাতটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। দরজা খোলার শব্দে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল জিয়ানকে। নয়নার ঠোঁটের কোণে হাসি চলে আসল প্রিয় মুখটা দেখতেই। লোকটার চোখ লাল হয়ে আছে, চুল এলোমেলো। শার্টে রক্তের দাগ শুকিয়ে গাঢ় হয়ে গেছে। এত বিধ্বস্ত লাগছে কেন তার নিজের মানুষটাকে! জিয়ান অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুনয়নার দিকে, তার চোখে তখন পানি টলমল করছে।
সুনয়না ঠোঁট নেড়ে ফিসফিস করে বলল, “এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? কী হয়েছে তোমার?”
জিয়ান কোনো কথা বলল না। দ্রুত এসে সুনয়নার হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে কপালে ঠেকাল। তারপর ভাঙা গলায় বলল, “আর কখনো আমাকে এত ভয় পাইয়ো না, সুনয়না। আমি… আমি শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি।”
সুনয়না দুর্বল হেসে বলল, “আমি কোথায় যাব তোমাকে ছেড়ে? এত সহজে তোমার পিছু ছাড়ছি না।”
জিয়ান নয়নার ওপর ঝুঁকে পড়ে কপালে চুমু দিল। চোখ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল নয়নার হাতের ওপর। শেষ মুহূর্তে কান্না আটকে রাখতে ব্যর্থ হলো জিয়ান।
নয়না অবাক হয়ে বলল, “তুমি কাঁদছ?”
জিয়ান খানিকক্ষণ চুপ হয়ে রইল। এরপর মৃদু কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ কাঁদছি। তোমার কিছু হলে আমিও বাঁচতাম না। আমি বুঝে গেছি তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব না।”
নয়না মৃদু হেসে বলল, “আমাদের বেবি কেমন আছে?”
জিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “জানি না।”
“মানে?”
“আমি দেখিনি।”
নয়না বিস্মিত চোখে তাকাল, “একবারও দেখোনি!”
জিয়ান মাথা নাড়িয়ে না-সূচক সম্মতি দিল। এরপর ধীরকণ্ঠে বলল, “তুমি ছাড়া তখন কিছু দেখার অবস্থায় ছিলাম না। আমি শুধু তোমাকে এভাবে দেখতে চেয়েছিলাম। আমার কাছে তুমি আগে, তারপর বাকি সব।”
নয়নার বুকটা হঠাৎ অদ্ভুত ভালো লাগায় ছেয়ে গেল। এই মানুষটা তাকে কতটা ভালোবাসে, সেটা নতুন করে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবুও প্রতিবারই জিয়ান নতুনভাবে প্রমাণ করে দেয়। নয়নার চোখ দুটো ছলছল করছে। কিছু বলবে, কিন্তু ঠোঁট কাঁপছে।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে নাহিদের গলা ভেসে এলো, “দুলাভাই! এবার কি ভেতরে ঢুকতে পারি? নাকি এখনও রোমান্টিক সিন চলছে? তা বলি কী, বাসায় গিয়ে রোমান্টিক সিন করা যেত না? না মানে, হসপিটালে আমরা সবাই আছি, সবাই তো টেনশনে! একবার কি আপনার বউকে দেখার সুযোগ দেবেন?”
সুনয়না লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।
জিয়ান বিরক্ত মুখে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, “শালা, তোরে আমি হসপিটাল থেকেই বের করে দেব! একটু সহ্য হলো না? চলে এসেছিস ডিস্টার্ব করতে?”
নাহিদ হেসে ভেতরে ঢুকল। তার পেছনে সায়না, নীলাঞ্জনা। দুজনের কোলে দুটো বেবি। একে একে মিতা বেগম, জাহানারা বেগম, নাজিম চৌধুরী, মাহবুব তালুকদারসহ বাকিরাও ঢুকলেন।
সায়না মুচকি হেসে বলল, “এই নাও, এবার তোমাদের রাজপুত্র আর রাজকন্যাকে দেখো। আমার ভাই তো বউয়ের শোকে সন্তানের মুখও দর্শন করেনি!”
জিয়ান ধীরে ধীরে প্রথম বেবিটাকে কোলে নিল। ছোট্ট মুখটা দেখে তার বুকের ভেতর কেমন কেঁপে উঠল। বেবিটা চোখ বন্ধ করেই ছোট্ট হাতে মুঠো করে ধরল জিয়ানের আঙুল।
জিয়ান নিঃশ্বাস আটকে ফিসফিস করে বলল, “আমাদের মেয়ে।”
তারপর দ্বিতীয় বেবিটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল, “এটাও আমাদের বেবি?”
নাহিদ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “না, এটা হসপিটাল ফ্রি দিয়েছে!”
কেবিনজুড়ে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
সুনয়না শান্ত চোখে নিজের ছোট্ট পরিবারটার দিকে তাকিয়ে রইল। এত পূর্ণতা তার কপালে ছিল! সুনয়নার নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে। তার পৃথিবীটা যেন আজ পূর্ণ হয়ে গেছে। এরপর জীবনে আর কোনো কিছু পাওয়ার নেই।
দূরে কোথাও, হাজার মাইল দূরত্বে লন্ডনের ব্যস্ত শহরে, মেহনুর হয়তো তখনও জানে না—এই মুহূর্তে চৌধুরী বাড়িতে নতুন দুটি প্রাণ এসেছে। সে নিজের কাজে এতটাই মগ্ন ছিল যে আজ সারাদিনে একবারও এই বাড়ির কারও ফোন ধরতে পারেনি। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় এসে সোফায় নিজের শরীরটা এলিয়ে দিতেই জারিফ দৌড়ে এসে হেসে বলল, “জানো মাম্মা, আমার একটা বোন হয়েছে! ও হ্যাঁ, একটা ভাইও হয়েছে। কী মজা, কী মজা!”
অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৩
মেহনুর কেন যেন ‘ছেলে হয়েছে’ কথাটা সহ্য করতে পারল না। ধমক দিয়ে বলল, “এখান থেকে যাও, আমাকে রেস্ট করতে দাও। কতবার বলেছি বাইরে থেকে আসলে সাথে সাথে বিরক্ত করতে চলে আসবে না!”
জারিফ মন খারাপ করে চলে গেল নিজের রুমে। এই যে জারিফের বলতে ইচ্ছে করছে—’মাম্মা, আমরা দাদু বাড়িতে যাব, ভাই-বোনকে দেখতে’—কিন্তু বলা হলো না। উল্টো বিষণ্ণ মন নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল জানালার বাইরে আকাশের দিকে।

Nxt