Home কিস অফ বিট্রেয়াল কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪১

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪১

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪১
লামিয়া রহমান মেঘলা

ভোরের আলো দিগন্তের রেখা ধরে ধরণীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
সকাল সকাল হিমেলের ফোনে বেশ কয়েকটি কল আসায় সে বিরক্ত বোধ করে। এমনিতেই গত রাতে দেরি করে ঘুমিয়েছে। তার ওপর এত সকালে কারও ফোন আসবে, এমনটা সে আশা করেনি।
একরাশ বিরক্তি নিয়ে হিমেল ফোনটা হাতে নেয়। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নম্বরটি দেখে সে বিছানায় উঠে বসে। মুহূর্তেই তার চোখের সমস্ত ঘুম উড়ে যায়।
ফোন কানে তুলতেই ওপাশ থেকে হন্তদন্ত হয়ে কারও বিচলিত কণ্ঠ ভেসে আসে,

“স্যার শুনছেন? দুঃখিত আপনাকে এত সকালে বিরক্ত করলাম। এদিকে ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গিয়েছে। কক্সবাজার থেকে আসা শিপমেন্টগুলো যে এএসপি ধরতে চেয়েছিল, সেই লোকটাকেই এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
হিমেল কথাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে। তবে এই এএসপির উধাও হয়ে যাওয়ার পেছনে সে যার কথা ভাবছে, তার হাত নেই বলেই মনে হচ্ছে।
ভেতরে ভেতরে বিচলিত হলেও হিমেল নিজের কণ্ঠকে যথাসম্ভব শীতল রেখে বলে,
“রাদ, রিল্যাক্স। এসব বিষয় খুবই স্বাভাবিক। এভাবে বিচলিত হলে সমস্যার সমাধান হবে না। নিজেকে শান্ত করো।”
“কিন্তু স্যার, লোকটা একজন এএসপি।”
“তুমি চিন্তা করো না। আমি দেখছি।”
“জি স্যার।”
ফোন কেটে যেতেই হিমেল পাশে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত স্ত্রীর দিকে একবার তাকায়। তারপর ধীরে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে।
দ্রুত পায়ে ফ্রেশ হয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে সে। এরপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

পুরোটা রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে কায়ান। ঘুমন্ত সেরিনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেই রাত পার করেছে সে। শুনতে পাগলামি মনে হলেও সত্যিটা ঠিক এমনই। ফলশ্রুতিতে তার দু’চোখ রক্তিম আভা ধারণ করেছে।
ভোরের আলো যখন ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ছে, তখনই ফজরের আজান শেষ হয়েছে। মসজিদ থেকে দলে দলে মানুষ ফিরছে আপন গৃহের পথে। চারপাশে এক ধরনের নির্মল প্রশান্তি বিরাজ করলেও সেই প্রশান্তির আড়ালে যেন অদৃশ্য কোনো অশুভ স্রোত নিঃশব্দে বয়ে চলেছে।
ঠিক এমন সময় হিমেলের ফোন আসে।
সেরিনকে বিরক্ত না করে কায়ান নিঃশব্দে তার পাশ থেকে উঠে আসে। ফোনটি কানে তুলতেই সংক্ষিপ্ত স্বরে বলে,
“হ্যাঁ বল।”
ওপাশ থেকে ভেসে আসে হিমেলের কণ্ঠ,
“নিচে নাম। আমি তোদের বাগানে।”
“কেন? ভেতরে আয়।”
“না, ভেতরে যাব না। তুই বাইরে আয়।”
“ওকে।”

কল কেটে দিয়ে কায়ান একবার সেরিনের দিকে তাকায়। ঘুমন্ত মেয়েটির বুক পর্যন্ত চাদর টেনে দিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে।
সিকদার নিবাসের বিশাল বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হিমেল। সকালের নরম আলোয় তার মুখে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য খেলা করছে।
কায়ান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে সেখানে এসে দাঁড়ায়।
কায়ানকে সামনে পেতেই হিমেল তাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে। যেন চোখের দৃষ্টিতেই মানুষের ভেতরের সমস্ত গোপন সত্য খুঁজে বের করতে চাইছে। তবে তাতে কায়ানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বুকের কাছে দুই হাত গুঁজে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে সে।
হিমেল ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,

“এএসপি সিকেন্দারের কী হয়েছে?”
কায়ানের মুখভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয় না।
“আপাতত কী হয়েছে জানি না। কাল রাতেই উপরে চলে গেছে। চিরকালের ঘুম ঘুমিয়েছে।”
এমন নির্লিপ্ত উত্তর শুনে হিমেলের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়।
“আর ইউ ম্যাড, কায়ান? সালা, ওটা একজন এএসপি। তুই কী করেছিস এটা? ওর বডি কোথায়?”
কায়ান একটুও ইতস্তত না করে উত্তর দেয়,
“তোর পায়ের নিচে পুঁতে রেখেছি।”
কথাটা শুনে হিমেল তৎক্ষণাৎ নিচের দিকে তাকায়।
এটা সেই পুরোনো আমবাগানের অংশ। গভীর দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে সে খেয়াল করে, মাটির ওপর নতুন ঘাস বসানো হয়েছে। কাজটা এত নিখুঁতভাবে করা যে বিশেষভাবে লক্ষ্য না করলে কিছুই বোঝার উপায় নেই।
হিমেল দুহাতে মাথা চেপে মাটিতে বসে পড়ে।
“এর উত্তর কিভাবে দিবি এবার?”
কায়ানও ধীরে ধীরে তার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।
“দোস্ত, ভয় পাচ্ছিস? ধরা পড়লে চাকরি থাকবে না, তাই?”
হিমেল মাথা নাড়ে।

“না রে, আমার এসব নিয়ে ভয় হচ্ছে না। ভয় হচ্ছে তোকে নিয়ে। তুই যে দিনের পর দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিস, এটা কি বুঝতে পারছিস, কায়ান?”
কথাটা শুনে কায়ানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।
“কিছুটা।”
সেই হাসিতে অনুশোচনা ছিল না, ছিল না দ্বিধা কিংবা অস্বস্তি। বরং ছিল এমন এক শীতল স্বীকারোক্তি, যা অকারণেই মানুষের মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিতে পারে।
হিমেল বুঝতে পারে না, কায়ানকে ঠিক কীভাবে বোঝাবে। বহুদিন ধরেই সে চেষ্টা করে যাচ্ছে বন্ধুটিকে থামানোর। কিন্তু আজ তার মনে হচ্ছে, সবকিছু হাতের বাইরে চলে গেছে।
পানি অনেক আগেই মাথার ওপর উঠে গেছে। এখন সেই উত্তাল স্রোতকে আটকে রাখার ক্ষমতা তার নেই।
আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্য হলো, কায়ান নিজেও তা খুব ভালো করেই জানে।
ঘুমন্ত মানুষকে জাগানো সম্ভব কিন্তু যে ঘুমায়নি কখনো তাকে কিভাবে জাগায়।

সেরিন হঠাৎ করেই নিজের পাশটা খালি অনুভব করে ঘুম থেকে জেগে ওঠে।
চোখ মেলে কায়ানকে না দেখে প্রথমেই দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। কেবল সকাল ছয়টা বাজে। এত সকালে কায়ান কোথায় গেল?
প্রশ্নটা মনে নিয়েই সে বিছানা ছেড়ে নিচে নামে। ওয়াশরুমে উঁকি দিয়েও কাউকে দেখতে পায় না।
রুমের বাইরে না গিয়ে সে কায়ানের ঘরের বিশাল বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। ছাদের মতো প্রশস্ত সেই জায়গা থেকে পুরো বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়।
বারান্দার কিনারায় এসে দাঁড়াতেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে পুরোনো আমগাছটার নিচে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে কায়ান এবং হিমেল।
দুজনের মধ্যে গভীর কোনো কথোপকথন চলছে। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে বিষয়টা সাধারণ কিছু নয়। তবু এত দূর থেকে শব্দ ভেসে আসে না।
সেরিন ভ্রু কুঁচকে ওদের পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। কিন্তু কোনোভাবেই কিছু বুঝে উঠতে পারে না।
ওদিকে হিমেল হঠাৎই চোখ তুলে তাকিয়ে সেরিনকে দেখতে পায়।
এক মুহূর্তেই সে বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ায়।

“সেরিন তাকিয়ে আছে। স্বাভাবিক আচরণ কর।”
সেরিনের নাম শুনে কায়ানও মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়।
তারপর দুজন এমন ভাবেই হাঁটতে হাঁটতে সিকদার নিবাসের ভেতরে প্রবেশ করে, যেন একটু আগেও কোনো গুরুতর আলোচনা হচ্ছিল না।
ওদের চলে যেতে দেখে সেরিনও রুমে ফিরে আসে।
ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই দেখে কায়ান রুমে দাঁড়িয়ে আছে।
সেরিন ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে যায়।
“আপনি রাতে ঘুমাননি?”
“না।”
“কেন?”
“তোমাকে দেখেছি।”
কথাটা শুনে বিস্ময়ে সেরিনের চোখ বড় হয়ে যায়।
লোকটা কী বলছে? পাগল হয়ে গেল নাকি?
তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে কায়ান মৃদু হেসে ফেলে। তারপর কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়।

সেরিন পুরো ব্যাপারটাকে মজা ভেবেই উড়িয়ে দেয়।
নিচে নেমে আসতেই দেখে হিমেল সোফায় বসে আছে।
মুহূর্তেই তার মুখজুড়ে হাসি ফুটে ওঠে।
“ভাইয়া, আপনি বসুন। আমি চা নিয়ে আসছি।”
হিমেল মাথা নাড়ে।
কিছুক্ষণ পর সেরিন চা আর নাস্তা এনে তার সামনে রাখে।
হিমেল চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ বড় করে বলে,
“বাহ, চা তো দারুণ হয়েছে।”
সেরিন মৃদু হেসে ফেলে।
এরপর কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ভাইয়া, এত সকাল সকাল আপনারা বাগানে কী করছিলেন?”
হিমেল এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়।
“কিছু না। আমবাগানের আমগুলো বিক্রি করতে বলেছিল কায়ান, তাই এসেছিলাম।”
সেরিন বিস্মিত হয়ে বলে,

“কেন? আম তো আম্মা বেগম আগেই পাড়িয়ে ফেলেছে।”
কথাটা শুনে হিমেলের যেন বিষম উঠে যায়।
সে প্রবল কাশিতে ভেঙে পড়ে।
সেরিন তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তার পিঠে আলতো চাপড় দিতে থাকে।
“ভাইয়া, পানি খান।”
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে কথাটা বলেই সে গ্লাস এগিয়ে দেয়।
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ির ওপর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখে ফেলে কায়ান।
দৃশ্যটা যতটা সাধারণ, তার ভেতরের প্রতিক্রিয়াটা ততটাই অস্বাভাবিক।
অকারণেই ভেতরটা জ্বলে ওঠে তার।
তবে সেই অনুভূতির কোনো ছাপ মুখে ফুটতে দেয় না।
দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এসে সে সেরিনকে হিমেলের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনায় সেরিন চমকে ওঠে।

“কী হয়েছে?”
কায়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
“জান, আমাকেও চা এনে দাও।”
সেরিন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়।
কিন্তু কিছু না বলেই রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
সেরিন চোখের আড়াল হতেই কায়ান গিয়ে হিমেলের সামনে বসে।
তার কণ্ঠ নিচু, তবে বিরক্তি স্পষ্ট।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪০

“বাল, আমার বউ তোর এত কাছে যায় কেন?”
হিমেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“রিল্যাক্স, কায়ান। এত পজেসিভনেস ভালো নয়।”
কায়ান বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দেয়,
“আমি এমনই।”

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here