Home অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৭

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৭

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৭
নুসাইবা ইভানা

সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। নয়না ভার্সিটির গেটে দাঁড়িয়ে আছে। হৃদয় এসে বলল, “কিরে, এখনো দাঁড়িয়ে আছিস? দ্রুত চল, আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঝড় হবে। দেখিস না, রৌদ্রোজ্জ্বল শহরটা কেমন কালো মেঘে ঢেকে গেছে!”
“তুই যা, একজন আসবে, তার সাথে যাব।”
হৃদয় ভ্রু কুঁচকে নয়নার দিকে তাকিয়ে বলল, “সুনয়না, তুই রিলেশন করিস? তোর বয়ফ্রেন্ডও আছে! আমিও দাঁড়িয়ে থাকব। তোর বয়ফ্রেন্ড দেখতে কেমন রে?”

“বাজে বকিস না, আমার ছোট বোন আসবে গাড়ি নিয়ে। এসব প্রেম-ভালোবাসায় আমি নেই।”
“আই লাভ ইউ।”
“স্যরি ব্রো, আপনি ভুল স্টেশনে চলে এসেছেন।”
“সেম ইয়ার রিলেশনে কী প্রবলেম?”
“আমার পছন্দ না। প্রেম হবে সিনিয়রদের সাথে—বেবির মতো ট্রিট করবে, আবার সেই বেবির হাতের ইশারায় সিনিয়র নাচবে। এমন না হলে প্রেম করে মজা আছে নাকি?”
“শোন, ক্লাসফ্রেন্ডকে ডেট করা আরও জোস! সারাক্ষণ মাখোমাখো প্রেম ভালো লাগে নাকি! সেম এজ রিলেশনে চব্বিশ ঘণ্টার একুশ ঘণ্টাই মার-কাটারি সম্পর্ক থাকে। তোর কখনো ভাবতে হবে না কোন কথা বলবে, কোন কথা বলব না।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“তুই চুপ করবি। তোর বকবক একদম অসহ্য লাগছে। সর, চোখের সামনে থেকে।”
হৃদয় ছাতা মেলে মাথার ওপর ধরে বলল, “নিষ্ঠুর রমণী, প্রেম দিলি না। বাসায় গিয়ে অন্তত একটা কল দিস।”
নয়না সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। মেঘে ঢাকা শহর জুড়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, মৃদু বাতাস। কিন্তু এসব কিছুই যেন নয়নাকে আর টানে না। বিরক্ত লাগে।
নয়না ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়াল। ততক্ষণে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। নয়না তাকিয়ে দেখছে ঝড়ের মতো পড়া বৃষ্টি। তাদের যেন ঝরে পড়ার কত তাড়া। কাঁধের ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি স্পর্শ করল। চোখ বন্ধ করতেই ভেসে এল চেনা সেই কণ্ঠস্বর: “এসো, হাত ধরো, চলো ভিজি আজ বৃষ্টিতে।”
নয়না দ্রুত চোখ মেলে তাকাল। জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে বলল, “ঘৃণা করি আপনাকে। আপনার স্মৃতিকেও আমি ঘৃণা করি।”

এর মধ্যে গাড়ি এসে থামল নয়নার সামনে।
নয়না চোখ তুলে তাকাল।
গাড়ির দরজা খুলে অনিকেত নয়নাকে ইশারায় গাড়িতে এসে বসার জন্য বলল। নয়না ব্যাগটা নিয়ে গাড়িতে এসে বসল।
“মন খারাপ?”
“নাহ।”
“চল, আমরা আজ বৃষ্টিবিলাস করি ভাইবোন মিলে।”
“নাহ, বাসায় ফিরতে দেরি হলে আম্মু টেনশন করবে।”
“আরেহ, কিছু হবে না। আম্মুকে বোঝানোর দায়িত্ব আমার।”
“একটা রেস্টুরেন্টে চলো তো ভাইয়া। খিচুড়ি খাব ঝাল ঝাল ভর্তা দিয়ে।”
“তুই আর ঝাল?”
“ইচ্ছে করছে।”
“আচ্ছা, চল।”

জিয়ানের আজ আরব আমিরাত থেকে কানাডা আসার ফ্লাইট। রেডি হয়ে সব চেক করে নিজের সিটে এসে বসল।
সেকেন্ড অফিসার বলল, “স্যার, আজকে কত তারিখ? আমার মোবাইলটা ড্রায়ারে রেখে এসেছি। আবার ঘড়িটাও সাথে নেই।”
জিয়ান ভুলে যেতে চাইছিল আজকের তারিখ। জুলাই মাসের এগারো তারিখ—আজ জিয়ান আর নয়নার চতুর্থ বিবাহবার্ষিকী। জিয়ান চোখ বন্ধ করে বলল, “এগারো তারিখ।”
“ধন্যবাদ স্যার।”
জিয়ান চোখ বন্ধ করল। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বলল, “Cleared for takeoff.”
জিয়ান চোখ খুলে বলল, “Ladies and gentlemen, this is your captain speaking. We are ready for takeoff…”

জিয়ান থ্রটল সামনে ঠেলে ইঞ্জিনে বেশি শক্তি দিল। বিমান গতি নিতে শুরু করল। ধীরে ধীরে প্লেন উপরের দিকে উঠতে থাকল। মনের ভেতর—তুমি, তুমি মানেই দহন। দগ্ধ হৃদয়ে বেঁচে আছি, তবুও বলি আমি ভালো আছি। বছর শেষে ক্যালেন্ডারের মতোই তোমাকে আমার জীবন থেকে বাদ দিয়ে দিলাম। ভালো থেকো প্রিয়তমা অর্ধাঙ্গিনী। মনের বেদনা কেবল নিজস্ব দায়িত্ব হলে সর্বস্ব।

বিমান মেঘের স্তর ভেদ করে ওপরে উঠতেই শহরটা ক্রমশ ছোট হতে থাকল। একসময় আর দেখা গেল না শহর। জানালার বাইরে কেবল সাদা মেঘ, অথচ জিয়ানের ভেতরে জমে আছে ঘন কালো স্মৃতি। অটোপাইলট অন করে সে একটু পেছনে হেলান দিল। ককপিটের আলো নিভুনিভু, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। আজ কেবল মনটা ছন্নছাড়া।
একসাথে কাটানো দুটো বছর তো আর কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে না। কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলো তারিখ মানে না—হঠাৎ এসে বুকের ভেতর ধুম করে বসে পড়ে বজ্রপাতের মতো।
মিতা বেগমের সামনে কথা হয়েছিল, তখন সে বলেছিল বৃষ্টির কথা। আনমনে জিয়ান ভাবতে লাগল—নয়না কি এখনো বৃষ্টি ভালোবাসে? আমার মতো এখন কি বৃষ্টিকেও ঘৃণা করে? কত কথা, যার কোনো উত্তর নেই। শুধু মনে পীড়া বাড়ে সেসব কথায়।

জিয়ান চোখ বন্ধ করল। মনে পড়ে গেল সেই শেষ দিনটার কথা। কী থেকে কী হয়ে গেল! মুহূর্তেই যেন সাজানো স্বপ্নগুলো ভেঙে গেল। কে জানত, সেটাই হবে শেষ দেখা? কিছু কথা আর বলা হল না, কিছু ক্ষমা আর চাওয়া হল না। জিয়ান ভেবেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সময়ই যে সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বসে। সে কেবল চলে ফুরিয়ে যেতে জানে, ফিরিয়ে দিতে জানে না।
ককপিটে ফার্স্ট অফিসারের কণ্ঠ ভেসে এল, “Captain, cruising altitude reached.”
“Roger,” জিয়ান শান্ত স্বরে বলল।
শান্ত কণ্ঠ, অশান্ত মন।

রেস্টুরেন্টে বসে নয়না চুপচাপ খিচুড়ি খাচ্ছে। বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে, জানালার কাঁচের গায়ে বৃষ্টি পড়ে টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। অনিকেত নয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজ এত চুপচাপ কেন? কিছু তো একটা হয়েছে তোর।”
“এমনি।”
“কী হয়েছে, বল আমাকে।”
নয়না চুপ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মুচকি হেসে বলল, “তোমার বিয়েতে আমাকে দাওয়াত দাওনি কেন!”
অনিকেত নয়নার দিকে তাকিয়ে বলল, “রেজার কথা মনে পড়ছে?”
“না ভাইয়া, নতুন করে আর কী মনে পড়বে! কিছু মানুষ থাকে, যাদের মনে পড়াও একটা অভ্যাস। অভ্যাসের জন্য কারণ লাগে না। তাই ঘটা করে তাদের আর মনে পড়ার কিছু নেই।”
অনিকেত আর কিছু বলল না। ভাই হিসেবে সে জানে, কিছু কষ্টের ভাগ নেওয়া যায় না। কিছু দুঃখ কেবল একান্ত ব্যক্তিগত।

কানাডার আকাশে ঢুকতে ঢুকতে সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। অস্তমিত সূর্যটার কমলা আলোয় মেঘগুলো পোড়া কাগজের মতো দেখা যাচ্ছে। জিয়ান জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার প্রিয় গোধূলিবেলা। তুমি একদিন অস্ত যাওয়া সূর্য দেখিয়ে বলেছিলে, ‘দেখো, সূর্যও ক্লান্ত হয়ে ডুবে যায়। তুমি কখনো আমাকে ভালোবেসে ক্লান্ত হবে না তো?’”
হঠাৎ ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে ইন্টারকমে ঘোষণা দিল, “We will be landing shortly. Please fasten your seat belts.”
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠ একদম পেশাদার। কেউ বুঝতে পারবে না, এই কণ্ঠের আড়ালে কতটা কষ্ট লুকিয়ে আছে।

সারাটা দিন নয়নার মন খারাপ ছিল। এখন রাত নয়টা বাজে। নয়না বারান্দায় দাঁড়াল। আকাশে বিন্দু পরিমাণ মেঘের আনাগোনা নেই। ঝলমলে চাঁদ, তারা। দেখে বলার উপায় নেই যে সারাটা দিন ঝুম বৃষ্টি ছিল। নয়না নিজের ফোনটা হাতে নিল, ডাটা অন করল। স্ক্রিনে অনেক নোটিফিকেশন আসতে লাগল। কিন্তু যার মেসেজের জন্য বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে, সে আর টেক্সট করে না।
নয়না মৃদু স্বরে বলল,
“সব শেষ হয়ে গেছে, নয়না। এখন অপেক্ষা করা মানে বোকামি। মানুষ খুব সহজেই ভুলে যায়। আমি কেন ভুলতে পারি না!”
কিছু শেষ হলেও, কিছু থেকে যায়।
কিছু নাম না নেওয়া অনুভূতি,
কিছু না পাঠানো বার্তা, কিছু অলিখিত ভালোবাসা।
আর থেকে যায় কিছু মানুষ, যারা দূরে থেকেও অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে থাকে হৃদয় জুড়ে।

কানাডার মাটিতে চাকা ছুঁতেই প্লেনটা হালকা ঝাঁকুনি খেল। জিয়ান গভীর শ্বাস নিল। আরেকটা ফ্লাইট শেষ। আরেকটা দিন শেষ। একেকটা দিন যেন জিয়ানের কাছে দীর্ঘ একটা বছরের মতো।
হয়তো কোনো একদিন, কোনো এক আকাশের নিচে দুজনেই বুঝবে, সব বিচ্ছেদ মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়। কিছু গল্প কেবল পাশাপাশি চলতে থাকে, একই সময়ে, ভিন্ন জীবনে।
কানাডার ঠান্ডা বাতাস জিয়ানের মুখে এসে লাগল। এয়ারপোর্টের স্বয়ংক্রিয় দরজাগুলো খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জিয়ানের মনে হল, এই শহরে কেউ তার অপেক্ষায় নেই। লাগেজ হাতে নিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে এল। চারপাশে অচেনা মুখ, অচেনা ভাষা, অথচ এই অচেনাতেই তার অভ্যস্ততা।

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৬

হোটেলে পৌঁছে স্যুটকেসটা খুলল না সে। জানে, ভেতরে সব ঠিকঠাক সাজানো—ঠিক যেমন তার জীবনটা বাইরে থেকে গোছানো মনে হয়। বিছানার পাশে বসে ফোনটা হাতে নিল। আজ একবারও নয়নার নামটা সার্চ করেনি সে। প্রতিদিন ‘সুনয়না’ নামটা সার্চ করে ঘেঁটে দেখে নয়নার আইডি। সেখানে এখন আর কিছু করে না।
জানালার বাইরে তুষার পড়ছে।
রাতের নীরবতা, হলদে লাইটিং আর সাদা তুষারপাত। সব মিলিয়ে অসাধারণ এক দৃশ্য। তবে এই দৃশ্যে আর মন টানে না জিয়ানের। দ্রুত হাতে পর্দা টেনে সোজা শুয়ে পড়ল বেডে।

অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ২৮