অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭২
সুমি চৌধুরী
সন্ধ্যা নামতেই চৌধুরী বাড়িতে ধুমধাম করে শুরু হয়ে গেল গায়ে হলুদের মূল অনুষ্ঠান। চারিদিকের চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা, সানাইয়ের সুর আর অতিথিদের কোলাহলে পুরো বাড়ি উৎসবের রঙে রঙিন। শুভ্রাকে হলুদ রঙের একটা সুন্দর শাড়ি আর ফুলের গহনায় অপরূপা সাজে সাজিয়ে এনে স্টেজে বসানো হলো। একে একে সব আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধুরা এসে হাসিমুখে তার গালে, কপালে হলুদের ছোঁয়া দিতে লাগল, সেলফি তুলতে লাগল। কিন্তু এত মানুষের ভিড়েও শুভ্রার মনটা যেন অন্য কোথাও হারিয়ে গেছে। তার ব্যাকুল চোখ জোড়া বারে বারে চারপাশের শত শত মানুষের মুখের ভিড়ে শুধু একজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু না, পুরো প্যান্ডেলের কোথাও ঈশানের বিন্দুমাত্র দেখা নেই। বুকটা এক অজানা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে শুভ্রার, প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে পাহাড়ের মতো ভারী মনে হচ্ছে। অন্য দিকে, বাড়ির এক কোণে পাখির অবস্থা বড্ড খারাপ। মেয়েটা যেন কান্নার সাগরে ভেসে যাচ্ছে, কেঁদে কেঁদে তার চোখ জোড়া ফুলিয়ে লাল করে ফেলেছে। সে কেন এভাবে কাঁদছে, কার জন্য তার এই বুকফাটা আর্তনাদ তা এই মুহূর্তে এক চরম রহস্য। তবে এই কান্নার পেছনের অজানা গল্পটা যদি কখনো সুযোগ আসে, তবে নিশ্চয়ই খুঁজে বের করা যাবে।
রাত ঠিক বারোটার দিকে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হলো। মেহমানরা বিদায় নিলে শুভ্রা অত্যন্ত ক্লান্ত আর ভাঙা শরীর নিয়ে নিজের রুমে ফিরে এলো। কিন্তু রুমে পা রাখতেই হুট করে তার মনের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো, তার সিক্সথ সেন্স যেন জানান দিল ছাদে কেউ একজন আছে। কেন জানি তার মন বলছে, এই মুহূর্তে ঈশান ঠিক ছাদের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে। যেই ভাবা সেই কাজ, শুভ্রা আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে দ্রুত পায়ে হেঁটে একছুটে ছাদে চলে এলো। ছাদের দরজা ঠেলে বাইরে আসতেই শুভ্রার সারা শরীর থমকে গেল। ঠিক যা ভেবেছিল তাই। রাতের মৃদু বাতাসে চাঁদের আলোয় ছাদে ঈশান রেলিংয়ের সামনে একদম সোজা হয়ে নিচের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রা নিজের চঞ্চল নিঃশ্বাসটুকু চেপে ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল, তারপর ঈশানের ঠিক পেছনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। বুক ঢিপঢিপ করছে তার, কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো কোনো রকমে আলতো করে ফাঁক করে ডেকে উঠল,
—- “ঈশান ভাইয়া।”
শুভ্রার কণ্ঠস্বর শুনে ঈশান কিন্তু বিন্দুমাত্র চমকে উঠল না। তার শরীরী ভাষা দেখে মনে হলো, সে আগে থেকেই জানত যে শুভ্রা এই মাঝরাতে তার খোঁজে ঠিক ছাদে ছুটে আসবে। সে উল্টো দিকে মুখ করেই, শুভ্রার দিকে না তাকিয়ে একদম শান্ত অথচ ভারী গলায় বলল,
—- “কিছু বলবে?”
শুভ্রা এক পা এগিয়ে এসে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল,
—- “আমার বিয়ে হয়ে গেলে আপনি খুশি হবেন, ঈশান ভাইয়া?”
এই একটা প্রশ্নে হুট করে ভেতরের কোন এক গহীন কোণে প্রচণ্ড চমকে উঠল ঈশান। কিন্তু সে নিজের ভেতরের উথাল-পাথাল ঝড়, নিজের সবকিছু বুকের গভীরতম প্রকোষ্ঠে শক্ত করে চাপা দিল। তারপর ধীরপায়ে শুভ্রার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। পেছনের রেলিংয়ে হালকা হেলান দিয়ে, দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে সে শুভ্রার হলদে রাঙা মুখের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে কৃত্রিম, হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
—- “বসের পর এই পৃথিবীতে যদি কাউকে সব থেকে বেশি আপন চোখে দেখে থাকি তো সেটা তুমি, শুভ্রা। আর আমি কিনা তোমার বিয়েতে খুশি হব না? আমি অনেক খুশি হয়েছি।”
শুভ্রা এক চুলও নড়ল না। সে ঈশানের সেই গভীর, রহস্যময় চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে থেকে দৃঢ় গলায় বলল,
—- “কিন্তু আমি তো আপনার মুখে এই মিথ্যা হাসির আড়ালে, আপনার চোখে অন্য কিছু দেখছি।”
ঈশান এক পলক চোখ সরিয়ে নিয়ে আবার তাকাল, তারপর অবহেলা করার ভান করে বলল,
—- “তাই? কী দেখছ শুনি?”
—- “ভালোবাসা।”
—- “আর?”
—- “বিশ্বাস ।”
—- “আর?”
—- “ভরসা।”
—- “আর?”
—- “সম্মান।”
—- “আর?”
ঈশান প্রতিটা শব্দের পর শুধু ‘আর’ বলে তার ভেতরের কথা জানতে চাইছিল। শুভ্রা এবার নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে এক নিঃশ্বাসে গড়গড় করে সব বলে দিল,
—- “আর যত্ন, মায়া, ব্যাকুলতা, আন্তরিকতা, ত্যাগ, ধৈর্য, ক্ষমা, এক অদ্ভুত নিরাপত্তাবোধ আর নিজের সব অনুভূতি ভাগাভাগি করে নেওয়ার তীব্র আকুতি।”
ঈশান সব কটি কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনল। তার পাথরের মতো শক্ত মনে যেন প্রতিটা শব্দ গিয়ে তীরের মতো বিঁধল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
—- “বাহ। এত কিছু দেখো আমার চোখে? তোমার ভেতরে অনুভূতি আছে বলতে হবে। তবে একটা জিনিস ভুল শুভ্রা, তা হলো তোমার এই চোখ দুটো। কারণ আমার মধ্যে তোমার জন্য এসবের কিচ্ছু নেই।”
শুভ্রা এবার আরও এক পা এগিয়ে এলো। ঈশানের চোখের মণি বরাবর নিজের ভেজা চোখ দুটো রেখে একদম চ্যালেঞ্জ করার সুরে বলল,
—- “সত্যি কি আমি ভুল দেখেছি? আপনি কি এখন আমার এই চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, বুক ফুলিয়ে বলতে পারবেন যে আপনার মাঝে আমার জন্য এসবের কিচ্ছু নেই?”
কথাটা শোনা মাত্রই ঈশানের ভেতরের সমস্ত শক্ত বাঁধ যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শুভ্রার ওই নিষ্পাপ, আকুল চোখের দিকে তাকিয়ে সে নিজের মুখের মিথ্যাটা ধরে রাখতে পারল না। সে চট করে চোখ নামিয়ে নিল। এক ঝটকায় উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে দুহাতে শক্ত করে ছাদের লোহার রেলিংটা চেপে ধরল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, গলার রগগুলো ফুলে উঠল। সে চরম এক যন্ত্রণাদায়ক, রূঢ় গলায় বলল,
—- “চলে যাও এখান থেকে শুভ্রা। আমার আর কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। প্লিজ, চলে যাও।”
শুভ্রার মনে হলো ঈশান যেন নিজের ভেতরের সব তীব্র অনুভূতিগুলো ইচ্ছে করেই আড়াল করছে। কোনো এক অদৃশ্য দেয়ালে মাথা কুটে নিজেকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে। শুভ্রা আর নিজের আবেগকে কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারল না। সব ভয়, সব সামাজিক বাধা এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে সে দৌড়ে গিয়ে ঈশানকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঈশানের চওড়া পিঠে মুখ গুঁজে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার সারা শরীর তখন কান্নায় কাঁপছে। সে কাঁদতে কাঁদতে নিজের মনের সব জমানো আকুলতা ঢেলে দিয়ে বলল,
—- “ঈশান ভাইয়া, আমি আপনাকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। যতটা ভালোবাসা একজন মানুষ তার পুরো হৃদয় উজার করে কাউকে বাসতে পারে, ঠিক ততটাই ভালোবাসি আপনাকে। আমি কোনোভাবেই এই বিয়েটা করতে পারব না। আমার মন, আমার স্বপ্ন, আমার জীবনের সব অনুভূতি যে অনেক আগেই আপনার কাছে বন্দি হয়ে গেছে। অন্য কারও হাত ধরে একটা নতুন জীবনে পা রাখার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি আমার এই শরীরে নেই। আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন ঈশান ভাইয়া। অনেক দূরে, এমন কোনো অজানা জায়গায় নিয়ে চলুন যেখানে এই বিয়ের কোলাহল, এই লোকদেখানো আনন্দ, এই চাপা কান্না আর এই অসহ্য দমবন্ধ করা অনুভূতিগুলো আমাকে আর ছুঁতে পারবে না। আমি শুধু আপনার পাশে থাকতে চাই। আপনার বুকের ওপর মাথা রেখে নিশ্চিন্তে একটা দীর্ঘশ্বাস নিতে চাই। আমি এমন একটা আশ্রয় চাই, যেখানে কোনো ভয় থাকবে না, কোনো সামাজিক জাত-ধর্মের কষ্ট থাকবে না থাকবে শুধু আপনি আর একটুখানি শান্তি। প্লিজ, আমাকে আপনার সাথে নিয়ে চলুন ঈশান ভাইয়া, আমি আর পারছি না জ্যান্ত মরে যাচ্ছি আমি।”
শুভ্রার এই বুকফাটা আর্তনাদ আর আকুলতা শুনে ঈশানের পাথরের মতো মুখটা আরও শক্ত হয়ে উঠল। শুভ্রার চোখের নোনা জল আর তপ্ত নিশ্বাস তখন ঈশানের পিঠের শার্ট ভিজিয়ে একাকার করে দিচ্ছে। ঈশান আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা শূন্য দৃষ্টি মেলে ধরল, তারপর চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে কয়েকটা বড় বড় তপ্ত নিশ্বাস নিল। যেন সে নিজের ভেতরের এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিকে জোর করে চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। পরক্ষণেই ঈশান চরম এক উন্মাদনায় চোখ খুলল। সে এক ঝটকায় পেছনে ঘুরে শুভ্রার হাত দুটো নিজের শরীর থেকে আলতো করে নয়, বরং সজোরে ছাড়িয়ে নিল। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই, নিজের সমস্ত রাগ আর ভেতরের যন্ত্রণাকে এক করে ঠাসিয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল শুভ্রার নরম গালে। থাপ্পড়টা এতটাই জোরে আর আকস্মিক ছিল যে শুভ্রা নিজের শরীরের টাল সামলাতে পারল না। সে ছিটকে গিয়ে ছাদের শক্ত, খসখসে ফ্লোরের ওপর পড়ে গেল। পড়ে যাওয়ার সময় তার কনুইটা ফ্লোরের সাথে ঘষা খেল আর সে ব্যথায় তীব্র চিৎকার করে উঠল,
—- “আহহ্।”
শুভ্রা এক হাত দিয়ে নিজের কনুই আর অন্য হাত দিয়ে গালে চেপে ধরে অবিশ্বাস্য চোখে ঈশানের দিকে তাকাল। কিন্তু ঈশান তখন যেন এক অন্য মানুষ, শোকে আর যন্ত্রণায় পাগলের মতো হয়ে সে শুভ্রার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
—- “এখন মুখে যেই কথাটা বললে, এই নোংরা কথাটা যদি নেক্সট টাইম আর কোনোদিন তোমার মুখে শুনি তবে তুমি আর কোনোদিন এই দুনিয়ায় ঈশানের মুখ দেখতে পাবে না। মনে রেখো এটা। আমি এতদিন তোমার সাথে হেসে, ভালোবেসে কথা বলেছি বলে তুমি আমার মাথায় চড়ে বসতে চাইছ? কী পেয়েছটা কী আমাকে? আমি কি মানুষ নই? আমার কি নিজের কোনো জীবন নেই? যখন ইচ্ছা হয় একবার এসে আমার সাথে দুষ্টুমি করো, আর এখন এসে এসব ফালতু, আবোলতাবোল কথা বলছ। আমার জাস্ট এই মুহূর্তে তোমাকে একদমই সহ্য হচ্ছে না শুভ্রা। আমার চোখের সামনে থেকে এখনই দূর হও তুমি। গেট আউট ফ্রম হেয়ার।”
শুভ্রা কিছুক্ষণ অশ্রুভেজা চোখে ঈশানের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ঈশান তাকে এত জোরে থাপ্পড় মেরেছে, এতে তার মনে বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষোভ বা কষ্ট নেই, এটা নিয়ে তার কিছুই যায় আসে না। সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে ঈশানের ওই লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে যে চোখে সে স্পষ্ট অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছে, যে চোখে লুকিয়ে আছে এক তীব্র হারানো যন্ত্রণা, এক বুক চাপা কষ্ট আর গভীর ভালোবাসা।
ধীরে ধীরে নিজের টলমলে শরীরটাকে কোনো রকমে সোজা করে ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়াল সে। ব্যথায় আর ক্লান্তিতে শরীরটা যেন আর চলছেই না, মনে হচ্ছে এই বুঝি সে আবার মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। শুভ্রা দেয়ালে হাত দিয়ে ভর করে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আবার ঈশানের একদম সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ঈশানের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত, ভাঙা গলায় বলল,
—- “ঠিক আছে, আমি আপনার চোখের সামনে থেকে চিরতরে চলে যাচ্ছি। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা আপনিও খুব ভালো করে শুনে রাখুন আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমার এই ভালোবাসা বিন্দুমাত্র মিথ্যা বা কোনো ভুল নয়। যদি এই সমাজ আর পরিবারের চাপে এই ভালোবাসার জন্য শেষমেশ আমার প্রাণটাও হারাতে হয়, তবে আপনি প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন। ক্ষমা করে দিয়েন আপনাকে এভাবে ভালোবাসার জন্য, আপনার অজান্তেই আপনাকে বড্ড বিরক্ত করার জন্য, আর আমার এই অবুঝ মনের কারণে আপনাকে এত বড় আঘাত দেওয়ার জন্য। ভালো থাকবেন সবসময়।”
কথাটা বলেই শুভ্রা নিজের গাল বেয়ে পড়া শেষ চোখের পানিটুকু হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল। তারপর এক মুহূর্তও আর না দাঁড়িয়ে উল্টো ঘুরে ছাদ থেকে নিচে নেমে আসার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। ঈশান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে শুভ্রার এভাবে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। শুভ্রার প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে সাথে ঈশানের মনে হতে লাগল তার ভেতর থেকে যেন আসল প্রাণপাখিটাই বের হয়ে চলে যাচ্ছে, তার জীবনের একমাত্র আলোটা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। শুভ্রা যখন ছাদের দরজার কাছাকাছি পৌঁছে গেল, ঈশান আর কোনোভাবেই নিজের ভেতরের সেই ভালোবাসার বাঁধকে ধরে রাখতে পারল না। সব নিয়ম, সব বাধ্যবাধকতা আর নিজের তৈরি করা দেয়াল এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে শুভ্রাকে পেছন থেকে সজোরে জড়িয়ে ধরল। শুভ্রার পিঠের সাথে নিজের বুকটা মিশিয়ে, তার কাঁধের ওপর মুখ লুকিয়ে ঈশান এবার নিজেই ডুকরে কেঁদে উঠল। আচমকা ঈশানের এই শক্ত বাঁধন আর তার গায়ের চেনা সুবাস পেয়ে শুভ্রার পায়ের গতি থমকে গেল। তার সারা শরীর মুহূর্তের মধ্যে একদম বরফ হয়ে জমে গেল। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে ঈশান তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছে। ঈশান শুভ্রার কাঁধে মুখ গুঁজে রেখেই অপরাধবোধে ভরা, ভাঙা গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,
—- “আই অ্যাম সো সরি শুভ্রা। আই অ্যাম রিয়ালি সরি আমি তোমাকে কোনোদিনও মারতে চাইনি। নিজের ভেতরের অসহায়ত্বের রাগের মাথায় হাতটা উঠে গেছে, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি শুধু চাই তুমি অনেক ভালো থাকো, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সুখে থাকো। হয়তো হয়তো এটাই আজ আমাদের জীবনের শেষ দেখা। এরপর আর কোনোদিন আমাদের দেখা হবে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে তুমি আমার জীবনের এক পরম সুন্দর, মধুর অথচ না-পাওয়া স্মৃতি হয়ে থাকবে। আই নো, আমি ঈশান সেই স্মৃতিটাকেই সারাজীবন নিজের বুকের গভীরে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকব।”
কথাগুলো শেষ করেই ঈশান শুভ্রাকে নিজের বাঁধন থেকে আলতো করে ছেড়ে দিল। সে শুভ্রাকে আর একটা কথা বলার বা তার মুখটা দেখার সুযোগ পর্যন্ত দিল না। এক বুক কান্না আর শূন্যতা নিয়ে ঈশান বড় বড় পা ফেলে ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল, আর চৌধুরী বাড়ি থেকে সোজা বাইরের অন্ধকারের মাঝে বেরিয়ে গেল। চৌধুরী বাড়ি থেকে একছুটে বের হয়ে এসে ঈশান যেন এক জ্যান্ত লাশ হয়ে গেল। চারপাশটা তখন একদম নিঝুম, সুনসান নীরবতা। মাথার ওপর কালচে আকাশ আর পিচঢালা কালো রাস্তা ছাড়া তার এই বুকফাটা আর্তনাদ শোনার মতো আর কেউ নেই।
কিছু দূর গিয়েই নিজের ভেতরের সব শক্তি যেন এক নিমেষে হারিয়ে ফেলল সে। আর দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা রইল না। মাঝ রাস্তায় ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ঈশান। দুই হাতের তালু একসাথে আকাশপানে মেলে ধরে, অবাধ্য চোখের নোনা জল আর বুকের ভেতর জমানো সমস্ত ক্ষোভ, অভিমান আর তীব্র যন্ত্রণা এক করে সে রাতের আকাশ কাঁপিয়ে এক বুকফাটা চিৎকারে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,
—- “হ্যাঁ ঈশ্বর। হ্যাঁ আল্লাহ। আজ আমি তোমাদের দুজনকেই ডাকব। দুজনের কাছেই আজ আমার এই অভাগা আত্মার শেষ জবাবদিহি চাই। আমার জন্ম যদি তোমরা একটা হিন্দু ঘরেই দিলে তবে কেন, কেন আমাকে একটা মুসলমান মেয়ের ওপর এভাবে উন্মাদের মতো দুর্বল করে দিলে? হিন্দু আর মুসলিমের প্রেম এই সমাজে কখনো এক হতে পারে না এই নির্মম সত্যটা জানা সত্ত্বেও কেন আমাকে এভাবে নিষ্ঠুরভাবে সেই মুসলমান মেয়েটার ভালোবাসার জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললে? যেই ভালোবাসার কোনো ভবিষ্যৎ নেই, যেই মিলনের কোনো পরিণতি নেই তবে কেন আমার এই শূন্য বুকে সেই নিষিদ্ধ ভালোবাসার জন্ম দিলে তোমরা? যাকে আমি কোনোদিন নিজের করে পাবো না, যাকে কোনোদিন ছোঁয়া আমার ভাগ্যে নেই তবে কেন সেই মানুষটাকে এভাবে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, আমার প্রতিটা শিরা-উপশিরায় আর আমার অবুঝ আত্মার সাথে চিরতরে গেঁথে দিলে তোমরা? উহ্ নিতে পারছি না আর। এই তীব্র জ্বলন্ত কয়লার মতো যন্ত্রণা আমি সইব কী করে? আমি যে আর পারছি না। আমার এই পাঁজরের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, আমার কলিজাটা যেন কেউ টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। আমার বুকে কতটা কষ্ট হচ্ছে তোমরা ওপর থেকে কি কেউ তা দেখছ না? তাহলে আজ কেন তোমরা দুজনেই এভাবে চুপ করে আছ? কেন কোনো অলৌকিক কিছু ঘটাচ্ছ না? হয় জাত-ধর্মের সব দেয়াল গুঁড়িয়ে দিয়ে ভিক্ষা হিসেবে ফিরিয়ে দাও আমার সেই শুভ্রাকে আর তা যদি না পারো, তবে এই মুহূর্তে এই বুকফাটা যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্তি দাও। চিরতরে তুলে নাও আমাকে তোমাদের কাছে আমি আর এই জ্যান্ত মরণ সইতে পারছি না।”
ঈশানের সেই আকাশ-বাতাস কাঁপানো আর্তনাদ আর ডুকরে ওঠার শব্দে যেন রাতের অন্ধকারও স্তব্ধ হয়ে গেল। দুই হাত আকাশে মেলে ধরে সে পিচঢালা রাস্তার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে পাগলের মতো কাঁদতে লাগল, যার প্রতিটি ফোঁটা জল যেন তার না-পাওয়া ভালোবাসার এক একটি জীবন্ত দলিল।
রিদি ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরে দেখল, শুভ্র কপালে একটা হাত দিয়ে বিছানায় একদম সোজা হয়ে শুয়ে আছে। তার চোখের কোণে আর কপালে ভাঁজ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, হয়তো প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে। রিদি আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ এসে শুভ্রের পাশে বিছানায় বসল। সে পরম মমতায় শুভ্রের কপাল থেকে তার হাতটা সরিয়ে দিল, তারপর নিজের নরম আঙুলগুলো দিয়ে আলতো করে শুভ্রের মাথা টিপতে লাগল। শুভ্র কোনো বাধা দিল না, রিদির হাতের ছোঁয়ায় খানিকটা আরাম পেয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ দুটো বন্ধ করল। রিদি মাথা টিপতে টিপতেই মনের ভেতর জমে থাকা কৌতুহলটা আর চেপে রাখতে পারল না। সে খুব নিচু গলায় প্রশ্ন করল,
—- “আচ্ছা শুভ্র ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
শুভ্র চোখ বন্ধ রেখেই শান্ত কণ্ঠে বলল,
—- “হুম, বল?”
রিদি আঙুলের চাপ একটু হালকা করে বলল,
—- “আপনি কি শুভ্রা যে ঈশানকে ভালোবাসত, এই কথাটা আগে থেকেই জানতেন?”
শুভ্র একদম স্বাভাবিকভাবে, বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে আলতো করে বলল,
—- “হুম।”
কথাটা শুনেই রিদির চোখ জোড়া এক নিমেষে কপালে উঠে গেল। সে মাথা টেপা থামিয়ে দিয়ে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
—- “মানে? কী বলছেন এসব। আপনি আগে থেকেই সব জানতেন?”
—- “হুম।”
রিদি এবার আর নিজেকে সামলাতে না পেরে বলল,
—- “সব জানা সত্ত্বেও আপনি এতদিন শুভ্রাকে কিচ্ছু কেন বলেননি? কেন চুপচাপ ছিলেন?”
শুভ্র এবার ধীর পায়ে নিজের চোখ দুটো মেলল। আয়নার মতো পরিষ্কার চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে এক বুক গভীরতা নিয়ে বলল,
—- “কী বলব। যে ভালোবাসার তীব্র নেশায় আমি নিজে চব্বিশটা ঘণ্টা পাগল হয়ে থাকি সেখানে অন্য কারও পবিত্র ভালোবাসার মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ানোর মতো আপদ আমি নই। যদিও শুভ্রা আমার নিজের বোন, কিন্তু দিনশেষে ভালোবাসা জিনিসটা ভীষণ সম্মানের, যার অসম্মান আমি কোনোদিন করতে পারি না। একজন কাপুরুষের মতো ভালোবাসার আসল মানে ও গভীরতা বুঝেও, আমি শুধু জাত-ধর্মের দোহাই দিয়ে আরেকটা নিষ্পাপ ভালোবাসার মাঝে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারব না।”
মুগ্ধ নয়নে শুভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল রিদি। কোনো ভাই নিজের বোনের এত বড় একটা সত্য জানা সত্ত্বেও নিজে থেকে কিচ্ছু না বলে, এভাবে পরম মমতায় শান্ত থাকতে পারে তা হয়তো এই শুভ্রকে চোখের সামনে না দেখলে সে কোনোদিন বিশ্বাসই করতে পারত না। শুভ্রের এই বিশাল মনের পরিচয় পেয়ে রিদি খুশিতে আর আবেগে আলতো করে শুভ্রের কাঁধে একটা থাপ্পড় মেরে বলল,
—- “শুভ্র ভাই, আপনি জাস্ট জিনিয়াস।”
শুভ্র এক ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। রিদি তখন নিজের হাসি থামাতে না পেরে শুভ্রের কাঁধে আবার একটা থাপ্পড় মেরে আহ্লাদী গলায় বলল,
—- “কী জিনিয়াস ভাই আপনি। সত্যি, অনেক জিনিয়াস ভাই আপনি। বলতেই হয়, এমন জিনিয়াস একটা মাল শেষমেশ আমিও পেয়েছি।”
বার বার রিদির মুখে এই ‘ভাই’ ডাক শুনে শুভ্র এবার চরম বিরক্ত হলো। সে বিছানা থেকে ধড়ফড় করে উঠে সোজা হয়ে বসল। তারপর এক ঝটকায় রিদির হাত ধরে টান দিয়ে তাকে নিজের একদম বুকের কাছে টেনে নিল। রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্র নিজের বাঁ হাত দিয়ে রিদির কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, আর ডান হাত দিয়ে রিদির মুখটা চেপে ধরে গাল দুটো টিপে দিল। শুভ্রের হাতের চাপে রিদির গাল দুটো একদম বেলুনের মতো ফুলে উঠল। শুভ্র তার চোখের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলল,
—- “এই শালী। এত ভাই ভাই করিস কেন রে। এভাবে নিজের জামাইকে কেউ ‘ভাই’ ডাকে। আর একটা বার ভাই বললে কানের নিচে দেব একটা।”
গাল চেপে ধরায় রিদির মুখটা অদ্ভুত আটকে গেছে, কিন্তু সে শুভ্রের এই হুমকিতে একটুও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে ওভাবেই চোখ দুটো বড় বড় করে, ফুলে থাকা গালে কোনো রকমে আওয়াজ বের করে বলল,
—- “অ্যাঁ। বিয়ে হয়েছে তাতে কী হয়েছে? বিয়ের আগে তো আপনি আমার আপন মামাতো ভাই ছিলেন। আমি এতটা পাষাণ হৃদয়ের মেয়ে নই যে বিয়ের পর আপনাকে আমার ভাইয়ের লিস্ট থেকে এক টানে কেটে দেব। তাই আপনি এখন থেকে আমার ‘জামাই ভাইয়া’। আমি একাধারে দুটোরই সম্মান করতে জানি, বুঝেছেন?”
রিদির এমন লজিকহীন, বাচ্চার মতো অবুঝ কথা শুনে শুভ্র এই মুহূর্তে হাসবে নাকি কাঁদবে তার কিছুই ভেবে পেল না। তবে পরক্ষণেই তার মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল সে। মুখের অবয়বে একটা কৃত্রিম মায়া আর গভীর ভালোবাসার হাসি ফুটিয়ে শুভ্র নিজের মুখটা রিদির মুখের একদম কাছাকাছি নিয়ে এলো। রিদির কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ঠিক এক ইঞ্চি দূরত্বে নিজের ঠোঁট দুটো থামিয়ে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
—- “তাহলে তুইও খুব ভালো করে শুনে রাখ, ফুঁপির ব্যাটারি। বিয়ের আগে তুইও তো আমার আপন ফুপাতো বোন ছিলি। তাহলে আমার ওই একই লজিকে এখন থেকে তুইও আমার ‘বউ আপু’। তোর মতো আমিও কিন্তু পুরোনো আর নতুন দুটো সম্পর্কেরই সমান সম্মান করতে জানি। বুঝেছিস এবার ফুঁপির ব্যাটারি?”
—- “ফুঁপির ব্যাটারি।”
রিদি তীব্র বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে শুধায়। শুভ্র তার মুখের একদম কাছাকাছি থেকেই চোখের পলক না ফেলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
—- “জ্বি, আমার কিউট বউ আপু।”
—- “না মানে, ফুঁপির ব্যাটারি আবার কী। এ কেমন অদ্ভুত নাম।”
রিদি শুভ্রের বুকটায় আলতো ধাক্কা দিয়ে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করতে করতে প্রশ্ন করে। শুভ্র এবার রিদির নরম গালে নিজের এক আঙুল দিয়ে আলতো করে সুড়সুড়ি দিতে থাকে। তার চোখের চাউনিটা মুহূর্তেই বদলে যায়, এক বুক নেশালো আর গভীর মায়াবী গলায় ফিসফিসিয়ে বলে,
—- “এই যে তোর মতো একটা অসম্ভব সুন্দরী ব্যাটারি ফুপি দুনিয়াতে ডাউনলোড দিয়েছে, তুই তো আসলেই একটা ব্যাটারি রে। যার চার্জ ফুরিয়ে গেলে আমার এই বুকভরা আদর দিয়ে আবার ফুল চার্জ করতে হয়।”
শুভ্রের এমন হুট করে গভীর ও রোমান্টিক হয়ে যাওয়া দেখে রিদি লজ্জায় একদম লাল হয়ে যায়। সে চট করে শুভ্রের দিক থেকে নিজের মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে অভিমানের সুরে বলে,
—- “কিহ। কী অসভ্য একটা মানুষ আপনি। ছাড়ুন আমাকে, আমি এখন গিয়ে শুভ্রার সাথে ঘুমাবো। আপনার মতো দুষ্টু লোকের সাথে আমি এক রুমে থাকবোই না।”
শুভ্র রিদির এই কিউট রাগ দেখে আরও একটু কাছে ঘেঁষে আসে। সে রিদির কোমরটা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হেসে বলে,
—- “এই যে দেখছিস, তোর ব্যাটারির চার্জ আসলেই একদম ফুরিয়ে গেছে। এখন যে তোকে সচল করতে আমার প্রচুর আদরের প্রয়োজন, সেটা আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি।”
রিদি শুভ্রের এই বাহুবন্ধন থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য এবার বিছানায় জোরেশোরে ছটফট করতে শুরু করে। সে হাত-পা নেড়ে বলতে থাকে,
—- “লাগবে না আমার কোনো আদর। ছাড়ুন বলছি রাত হয়েছে এবার ঘুমাতে দিন।”
শুভ্র রিদির কোনো কথাই কানে তোলে না। সে নিজের মুখটা রিদির গলার একদম কাছে নিয়ে যায় এবং তার নরম ঘাড়ের ত্বকে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিয়ে একদম ফিসফিসিয়ে এক অদ্ভুত অধিকার খাটানো গলায় বলে,
—- “তোর না লাগলেও আমার তো লাগবে।”
শুভ্রের ঠোঁটের সেই তপ্ত ছোঁয়া আর গলার কাছে তার উষ্ণ নিশ্বাস লাগতেই রিদির সারা শরীর শিউরে ওঠে। সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে অবশ হয়ে আসা গলায় কোনো রকমে মৃদু স্বরে বলে,
—- “উহহ্ ছাড়ুন না প্লিজ।”
রিদির এত নড়াচড়া আর ছটফটানিতে শুভ্র এবার সত্যি সত্যি বেশ বিরক্ত হলো। মনে মনে ভাবল নিজের বৈধ স্বামী একটু আদর করতে চাইছে, তাতেই এভাবে হাত-পা ছোঁড়ার কী আছে। অন্য কোনো পরপুরুষ তো আর তাকে ছুঁয়ে দেয়নি। চরম বিরক্তিতে সে এক ঝটকায় রিদিকে নিজের বুক থেকে সরিয়ে দিল। তারপর বিছানার অন্য পাশে একদম উল্টো ঘুরে শুয়ে রাগ মেশানো গলায় বলল,
—- “এহ্। যা তো বা’ল, ছুঁচলামই না তোকে। তাতে কী এমন ক্ষতি হলো আমার। যা এখান থেকে, এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ।”
শুভ্রের এমন হুট করে দূরে ঠেলে দেওয়া আর মুখের কথা শুনে রিদি মুহূর্তেই বুঝে গেল যে তার আদরের জামাইটা এবার মারাত্মক অভিমান করেছে। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে মুখ টিপে একটা হাবলা মার্কা মিষ্টি হাসি দিল। তারপর ধীর পায়ে বিছানায় শুভ্রের একদম গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। শুভ্রের চওড়া কাঁধের ওপর আলতো করে নিজের একটা হাত রেখে আহ্লাদী গলায় ডেকে বলল,
—- “এই যে আমার রাগূ জামাই শুনুন না একটু।”
শুভ্র কোনো কথা না বলে এক ঝটকায় রিদির হাতটা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল। মুখটা আরও গোমড়া করে গম্ভীর গলায় বলল,
—- “ডাকবি না একদম আমাকে।”
রিদি এবার একটু জেদ ধরল। সে দমে না গিয়ে আবার শুভ্রের কাঁধে জোর করে হাত রাখল, তারপর কণ্ঠস্বরে আরেকটু রসিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
—- “ওগো শুনছো?”
শুভ্র এবার আর বিছানায় শুয়েই রইল না। সে আবার রিদির হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বিছানা থেকে সটান উঠে দাঁড়াল। মুখে আর একটা শব্দও না ছুড়ে সে সোজা হেঁটে ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে চলে গেল। ব্যালকনির রেলিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে, নাইট ট্রাউজারের দুই পকেটে হাত ঢুকিয়ে সে একদম সোজা হয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। অভিমানী জামাইকে এভাবে একলা ফেলে রাখা তো আর যায় না। তাই রিদিও বিছানা থেকে নেমে টিপটিপ পায়ে ব্যালকনিতে চলে এলো। সে শুভ্রের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল, কিন্তু শুভ্র তার দিকে এক পলকও তাকাল না। রিদি মুচকি হেসে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে একটু উঁচিয়ে উঠল। তারপর হুট করেই শুভ্রের গলার দুপাশে নিজের দুহাত গলিয়ে দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শুভ্র কিছু বলার আগেই রিদি তার ডানহাতের আঙুল দিয়ে শুভ্রের নাকটা আলতো করে টিপে দিল, আর শুভ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি সুরে গেয়ে উঠল,
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৭১
রাগ কইরো না মনের মানুষ,
মাফ কইরা দাও আমারে,
মনেরও মন্দির থেইকা,
ভালোবাসি তোমারে,
আমি মাছ তুমি বরশি,
টান দিলেই আসবো,
তোমার ওই চরণ তলে,
গড়ায় গড়ায় কাঁদবো,
