Home আকাশপ্রিয়া আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫২

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫২

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫২
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

কারোর চোখেই এখনো ঘুম এসে পৌঁছায়নি। সারাদিনের ধকল, আর কাঁদা মাখা শরীরে শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হতে হতে অনেকটা সময় চলে গিয়েছে। তবে আয়োজন করে শুতে গিয়েছে সবাই। অয়ন শিয়াকে বুকে জড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বোনের চিন্তায় সারাদিন কী অবস্থাই না হয়েছে! শিয়া কাঁদছিল এতক্ষণ। এখন থেমেছে। তবে ক্ষণে ক্ষণে ফুঁপিয়ে উঠছে। ওদিকে বাকিদেরও তাই। রাতুলকে খানিক আগেই রিয়ানের হাসপাতাল থেকে কল করা হয়েছিল। এখন সুস্থ আছে। তবে হাসপাতালে থাকতে হবে কয়েকটা দিন। রেদেয়ানের চোখে রাজ্যের ঘুম। কিন্তু কালকের প্রেজেন্টেশনের ফাইলটা রেডি না করলেই নয়। শুধু রাকিবই ঘুমিয়েছে বলতে গেলে। তবে সেটা বিশ মিনিটের বেশি হয়নি।

গভীর নিশুতি রাতে কটেজের আশেপাশে ঝোপঝাড়ের ঝিঁঝিঁ পোকা সহ হাজারো পশুপাখির আওয়াজ কানে এসে বাজছে। বৃষ্টি খানিকটা কমেছে।
সৌমি বারান্দায় বসে ঘোর অন্ধকারে সেই বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শুনতে ব্যস্ত।
আচমকা সবারই নিজেদের ধ্যান ভাঙল আকাশের কণ্ঠে। বদ্ধ দরজার বাইরে থেকে আকাশের ডাক কানে এসে বাজছে। আজকের দিনের ভয় সবার মধ্যেই এখনো বিদ্যমান।
সুতরাং হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসতে সময় লাগল না কারোর। রাকিবের কাঁচা ঘুম ভেঙে ওই প্রথম দৌড়ে এল। বাকিরাও একে একে বেরিয়ে এল বৈকি।
আকাশ করিডোরে দাঁড়িয়ে। সবাই বের হতেই হাত বাড়িয়ে সুইচবোর্ড চেপে করিডোরের আলো জ্বালাল। আকাশের ঘরের দরজায় গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়া। অয়ন সবার আগে আকাশের দিকে ছুটল। এরকম হাঁকডাকের কারণ কী হতে পারে সবাই অধীর আগ্রহে চেয়ে আছে। অয়ন ব্যস্ত কণ্ঠে শুধাল,

— “কী হলো ভাই? কোনো সমস্যা?”
আকাশ খেয়াল করলো কটেজের সকলেই এসেছে। সৌমির দুর্বল শরীরে চিন্তিত মুখে এসে দাঁড়িয়েছে শিয়ার পাশে। এক এক করে সবার মুখে তাকিয়ে আকাশ রাশভারী কণ্ঠে বললো,
—”আমি প্রিয়াকে বিয়ে করতে চাই।”
খানিক দম নিয়ে পুনরায় বললো,
—”এবং সেটা আজই।”
আকাশের কথায় মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো সকলে। ওদিকে প্রিয়া মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে। হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ বুঝলো না কেউই। অয়ন ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে ঠান্ডা গলায় বললো,
—”তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু হুট করে…”

অয়ন কথা শেষ করতে পারে না। আকাশ নিজের কাঁধে ছোঁয়ানো ভাইয়ের হাতে হাত রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
—’আজ না হয় কিছু হয়নি। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যে বাস্টার্ডটা ঘটাবে না তার কি গ্যারান্টি? ও না করলেও নিলয় তালুকদার আছে ওর সাথে। সে তো সহজে পিছু ছাড়ার মানুষ নয়। তাছাড়া আমি দু বছর এরকম দ্বিধা দ্বন্দ্ব মাথায় করে, ওকে হারিয়ে ফেলার চিন্তা নিয়ে বাঁচতে পারবো না। আমি প্রিয়াকে বিয়ে করবো। এবং সেটা আজকেই।”
আকাশের চিন্তার কারণ ওরা বোঝে। রিয়ান যে একা ছিলো না এসবে সেটাও জেনেছে। নিলয় তালুকদার রিয়ানের জন্য প্রিয়াকে নিয়ে আসেনি। সে প্ল্যানটা সাজিয়েছিল মূলত প্রিয়াকে নিজের করতে। ওখানে আহত সৌমিকে বাঁচিয়ে পাঠিয়েছিল নিলয়ই। সবটা তার পূর্ব পরিকল্পনা মাফিকই হতো। রিয়ান আর সৌমির বিয়েটা হলে সে সেখানে গিয়ে প্রিয়াকে নিয়ে আসতো। তবে সেই পরিকল্পনায় বাধা পড়ে প্রথমে ওখানে সৌমির যাওয়া,আর পরবর্তীতে আকাশদের ওখানে পৌঁছে যাওয়ায়। পুলিশ জানিয়েছে সবটা। নিলয়ের এক সাগরেদকে ধরেছে পুলিশ। তাছাড়া রিয়ান নিজেও হাসপাতালে পুলিশের জিম্মায়। চিন্তার এখনো অনেক কিছুই আছে। আকাশ কথাগুলো শেষ করে তাকালো শিয়ার দিকে। এবার শীতল কণ্ঠেই বললো,

—’তোমাদের বাবা-মা দেশে নেই। সেই সূত্রে তুমিই প্রিয়ার গার্জেন। আমার তোমাকে জানানো সবচেয়ে বেশি দরকার। তবে আশা রাখি তুমি বাধা দেবে না। আমার ওপর বিশ্বাস..”
—”তোমার ওপর কতটা বিশ্বাস আছে সেটা আমাকে মুখে বলতে হবে আকাশ? আমার বোনের জন্য তুমি সবসময় সবটা উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। সেটা কি আমি জানি না? কিন্তু বাবা-মা কে জানানোর বিষয়টা?”
আকাশ শ্রাগ করলো শুধু। ঠান্ডা গলায় বললো,
—”তোমার যদি মনে হয় আংকেল আন্টিকে জানাবে, আমি নিজে কথা বলবো। আর যদি মনে করো ঘরোয়া ভাবে সবটা থাকবে। তাদের অযথা চিন্তা দেওয়া উচিত নয়। তাহলে তারা যখন দু বছর বাদে ফিরবেন তখন তারা যেভাবে আয়োজন করতে চান আমরা আবার সেভাবেই আয়োজন করবো। এটা আমাদের মধ্যে থাকবে। আমি সবকিছুতেই স্বচ্ছন্দ। তোমার কি মনে হয়?”
শিয়া খানিকক্ষণ ভাবলো। একটু এগিয়ে গিয়ে প্রিয়াকে কাছে এনে দাঁড় করালো। এক হাতে বোনকে জড়িয়ে নরম কণ্ঠে বললো,

—”আকাশ বিয়ে করতে চাচ্ছে তোকে। আজই। তুই কি রাজি?”
প্রিয়া ছলছল চোখে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো আকাশের দিকে। আকাশ তার দিকেই তাকিয়ে। শুধু আকাশ নয়, করিডরে উপস্থিত সকলেই প্রিয়ার জবাবের অপেক্ষায়। প্রিয়া নাক টানলো। দ্রুত মাথা নাড়লো। মুখে বললো,
—“আমিই চেয়েছি প্রথমে। আজ বিয়ের কথা আমিই বলেছি ওনাকে।”
উপস্থিত সকলের চোখেমুখে যেন খুশির দ্যুতি ছড়িয়ে পড়লো। শিয়া বোনকে জড়িয়ে ধরলো। অয়নও হাত রাখলো প্রিয়ার মাথায়। প্রিয়া ভাইয়ের দিকে তাকালো।
—“তাহলে তো আর কথাই নেই। সত্যিই তো। কী দরকার যখন সবাই রাজি। তাহলে দু বছর কিসের অপেক্ষা? দু বছর পর ব্যান্ড বাজিয়ে আমার বোনটাকে চৌধুরী বাড়ি নেবো। তবে তার আগেই আমার ভাইয়ের নাম হালাল করে ফেলবো।”
রাতুল হাসিহাসি মুখে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। সবাই আকাশের কাছে চলে এল। রাতুল দুষ্টু স্বরে বলল,
—“ডাবল হওয়ার এত তাড়া, ভাই? আগে তো বলিসনি।”
রাকিব সাথে সুর মেলাল।
—“মুখে বলেনি। কিন্তু ওর কাজকারবার কি বোঝায়নি? আজব মানুষ তোরা। বউ কাছে পাওয়ার তাড়া কার না থাকে?”

বন্ধুদের হাসিঠাট্টাতেও কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না আকাশের চোখেমুখে। সে তো প্রিয়ার খুশি দেখতে ব্যস্ত। সব আলোচনা জোর কদমে চলল। রাকিবরা এরই মধ্যে তুশি আর রাকাকে রওনা দিতে বলে দিয়েছে। শিয়া একা সবকিছু সামলাতে পারবে না। তার ওপর সৌমি তো অসুস্থই। দিনের আলো ফুটতে ফুটতে ওরা চলে আসবে। রিমিকেও আসতে বলা হয়েছে। এই বৃষ্টির রাতে কিছু করার চেয়ে দিনের আলো ফুটলেও যা করার তা করা হবে। শুধু বাড়ির মানুষ থাকবে। ঘরোয়া আয়োজন একেবারে। কাজী ডেকে কাবিন আর কালেমা পড়ানো হবে। আপাতত বিষয়টা নিজেদের মধ্যেই রাখা হবে। কারণ বিয়েশাদি নিয়ে দুজনের বাবা-মায়েরই বড়সড় পরিকল্পনা সাজানো আছে। শিয়ার বিয়েটা এরকম হুটহাট তাড়াহুড়োয় হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের বাবা-মা এমনিতেই ভীষণ আপসেট ছিলো।
বারংবার বলেছে যে প্রিয়ার বিয়ে দু বছর পর ধুমধাম করে দেবে। এখন এসব জানিয়ে তাদের মন খারাপ করে দেওয়ার মানেই হয় না।

ফজরের আজান পরতেই অয়ন তাড়া দিলো সবাইকে একটু ঘুমিয়ে নিতে। এত ধকলের পর সামান্য বিশ্রাম নিতে না পারলে কালকের কোনো কিছুই শরীরে কুলোবে না। ঘরে গেলো সকলেই। তবে অয়ন আকাশের সাথে তখনো বসেই আছে বসার ঘরে। আকাশের চোখেমুখে কোনো উচ্ছ্বাসই নেই। শিয়া চলে যেতে গিয়েও ফিরে এলো দু’ভাইকে এভাবে ঠায় সোফায় বসে থাকতে দেখে। এসে বসলো নিজেও অয়নের পাশে। আকাশকে অবলোকন করলো। কপালে তিন-চারটে ভাঁজ ফেলে চোখমুখ কুঁচকে বসে আছে। মুখে রাজ্যের অন্ধকার ছেয়ে আছে যেন।
—“আকাশ?”
শিয়ার ডাকে মুখ তুললো আকাশ। ছোট্ট করে জবাবও দিল।
—”হু।”
—”কোনো কিছুতে আপসেট?”
—”সেরকম কিচ্ছু নয়।”
—”বিয়েটা কি প্রিয়ার জোরাজোরিতে করছো? তুমি এখন বিয়েটা না চাইলে আমি প্রিয়াকে বোঝাবো। ও তো ছোট মানুষ। বোঝালেই বুঝবে।”

আকাশ দু হাতে মুখ ডললো। সোফায় গা এলিয়ে বসলো। বাইরের দমকা বাতাসে ড্রয়িং রুমের আধখোলা জানালার সব পর্দাগুলো ওড়াউড়ি করছে। সেদিকে তাকিয়ে ভাবলেশহীন জবাব দিলো,
—”প্রিয়ার থেকে বোধহয় বেশি আমিই চাই।”
শিয়া আর অয়ন চোখাচোখি হলো। দুজনের মুখেই মৃদু হাসির রেখা দেখা গেলো।
—“তবে এতোটা আপসেট কেন?”
দীর্ঘশ্বাস ফেললো আকাশ। সত্যিই আপসেট। একটু বেশিই আপসেট। কাছের মানুষ এভাবে হারিয়ে ফেলার ভয়, এর আগেও একবার পেয়েছে। অয়নের যখন অ্যাকসিডেন্ট হয়। তারপর আজকে। নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে অসহায় মানুষ বলেই তার মনে হচ্ছিলো। সেই হারিয়ে ফেলার যে ভয়! সেটা মস্তিষ্ক থেকে সরতেই চাচ্ছে না। ট্রমা হয়ে গেড়ে বসেছে।

—“সেরকম কিছু নয়। আজ পুরো ঘটনাটা যেভাবে সলভ হয়েছে সেটা না হয়ে এদিক-সেদিক হয়ে গেলে কী হতো, সেটাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু।”
আকাশ নিজের মনের কথা সচরাচর কারও কাছে প্রকাশ না করলেও আজ অয়ন আর শিয়ার কাছে কিভাবে যেন বলে ফেললো। অয়ন শিয়া দুজনেই বুঝতে পারছে আকাশের মনের অবস্থা।
—”ভাই, এত ভাবছিস কেন? সব ঠিক হয়ে গিয়েছে আল্লাহর রহমতে। কাল দিনটাও ভালোভাবে পার হয়ে গেলে আর চিন্তা কিসের?”
—”প্রিয়া ছোট এখনো। ওর গোটা জীবন পড়ে আছে। বিয়ের বাঁধনে বেঁধে তার জীবনে এর কোনো রকম প্রভাব পড়বে কিনা সেটাও চিন্তার বিষয়।”
—”বিয়েটা তাহলে…”
—”করবো। আর অপেক্ষা সম্ভব না আমার পক্ষে। ওর চিন্তায় মরে যাচ্ছিলাম। ওকে হারানোর ভয় নিয়ে আমার আর একটা দিনও পার করা সম্ভব না।”
শিয়া এবারে কথা বলে উঠলো। আকাশ কে শান্ত কন্ঠে বললো,
—”প্রিয়া টা ছোট। সত্যি বলতে একটু আহ্লাদীও। ছোট থেকো এভাবেই বড় হয়েছে। তবে যতটা ইমম্যুচয়র মনে হয় বয়স হিসেবে। ততটা মোটেই নয়। এতো ভেবো না। তুমি পাশে থাকলে ও সব ঠিক রেখেই নিজের জীবনেও এগিয়ে যাবে।”

ফজরের আজান দিয়েছে বেশখানিকটা সময় হয়ে গিয়েছে। অয়ন শিয়া আকাশের সাথে কথা বলে নিজেদের রুমে চলে গিয়েছে এরইমধ্যে। আকাশ ধীর পায়ে এসে পৌছুলো প্রিয়ার ঘরে। ঘরের দরজা বন্ধ হয়নি। ঘুমিয়েছে কি! ঘুমানোরই কথা। তবে দরজা খুলতেই চোখে পরলো বিছানায় হাটু ভাজ করে বসে আছে প্রিয়া।
—”ঘুমাওনি কেনো এখনো?”
—”আপনিও তো ঘুমান নি।”
আকাশ এসে বসলো বিছানায়। বারান্দায় একটা বাতি জ্বালা শুধু। পুরো ঘরময় আধার। আকাশ গম্ভীর কন্ঠে সাফাই দিলো,
—”কাজ করছিলাম।”
—”বসে বসে গল্প করছিলেন।”
—”ওটা কাজ নয়? কাজের কথাই তো হচ্ছিলো।”
—”ওই আরকি।”
—”ওই আরকি বললে তো হবে না ম্যাডাম। বিয়ে করবো বলে নাচতে নাচতে সবার কাছে স্বীকার করলেন। বললেই তো আর হয়না। অনেক কাজ থাকে,প্রসেস থাকে। সে-সব এর চিন্তা তো আমাকেই করতে হবে।”
প্রিয়া ঠোঁট উল্টালো। ভ্রু জোড়ার মাঝে ভাজ ফেলে বললো,

—”করবেন না তাহলো বিয়ে।”
আকাশের মুখে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো এক মূহুর্তের জন্য। ডান ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—”করবো না? সিওর তো? তুমি বললে সবাই কে আবার ডেকে মানা করে লম্বা ঘুম দেই একটা।”
আকাশের হেয়ালিতে রাগ হলো প্রিয়ার। দুমদাম কিল বসিয়ে দিলো আকাশের শক্তপোক্ত বাহুতে। ব্যাথা অবশ্য সেই পেলো। আকাশ প্রিয়ার হাত টেনে একদম কাছে টেনে আনলো। তুলতুলে ফোলা গালে হাত গলিয়ে দিয়ে মেয়েটার মাথা এনে ঠেকালো নিজের বুকে। প্রিয়া স্পষ্ট শুনতে পেলো ধুকপুক শব্দ টা। কি জোরেই না হচ্ছে।
বাইরের বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে দুজনকেই। প্রিয়া দু হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো আকাশের কোমড়। দুজনের হৃদয়ই এই মূহুর্তে বেশ অশান্ত। আকাশ প্রিয়ার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে শীতল কণ্ঠে বললো,
—”বিয়ে টা তে তোমার সত্যিই সমস্যা নেই তো? হুট করে,আবেগের বশে কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার জিনিস এটা নয়। পরে আফসোস হবো না তো?”
প্রিয়া যেনো একটু অবাকই হলো। হাতের বাঁধন দৃঢ় করে শুকনো চুমু আকলো আকাশের বুকে। গাঢ় করে মুখ ডুবিয়ে বললো,

—”ভালোবাসার মানুষ কে হালাল করে পাচ্ছি। এটাতে আফসোস হবে?”
—”তবুও।”
—”আমাকে এতো টা বাচ্চা মনে হয়?”
—”নও?”
—”মোটেই না। “
নিঃশব্দ হাসলো আকাশ। প্রিয়ার খোলা চুলে অনবরত হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।
—”এখন রেস্ট করো। কাল আবার আরেকদফা ঝক্কি যাবে সারাটাদিন। শরীর খারাপ করবে।”
প্রিয়া এ যাত্রায় মুখ তুললো। আকাশের মুখটা একদম শুকনো হয়ে আছে। চোখমুখ রক্তিম। জ্বর কমনি একটুও। বরং বাড়বে মনে হলো। নিজের নরম হাল বাড়িয়ে দিলো আকাশের খসখসে পুরুষালি গালে।
—”ঘুমান গিয়ে আপনিও। সব ঠিক আছে।”
মাথা নাড়লো আকাশ। প্রিয়া উষ্ণ ললাটে ভেজা চুমু একে উঠে গিশে বন্ধ করে দিলো বারান্দা আর জানালা। প্রিয়াকে শুয়িয়ে চলে এলো নিজের ঘরে। অসহ্য মাথা যন্ত্রণা হচ্ছে। ভালোরকম জ্বর এসে চেপে ধরলো অসময়ে।

ঝকঝকে রোদ মাথায় নিয়ে নতুন একটা দিনের সূচনা। অবশ্য সকাল পেরিয়ে সময় এরইমধ্যে দুপুরের অংশে প্রবেশ করে ফেলেছে। বেলা গড়িয়ে ঘড়ির কাটা এসে ঠেকেছে দুপুর বারোটায়। তুশি,রাকা দুজনেই এসে পৌঁছেছে এগারো টার দিকে। তাদের আসাতে ঘুম ভেঙেছে কটেজের সকলের। অয়ন গিয়েছিল ভাইকে ডাকতে। তবে জ্বর দেখে এতো দ্রুত ডাকাডাকি করেনি। তারাই সব গুছিয়ে নিচ্ছে। শিয়ারা সকলে রান্নাঘরের দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে। কাজি সাহেব আসবেন দুপুরের নামাজের পরপরই।

ক্যালেন্ডারে তারিখ মে মাসে পনেরো তারিখ। বাংলা হিসেবে জৈষ্ঠ্যের পয়লা দিন। বৃষ্টি একদম নেই। প্রকৃতি যেন সারা রাতের কঠিন তান্ডবের পর আজ শান্ত হয়েছে। প্রকৃতি ধুয়ে মুছে সাফ একদম। যেদিকে তাকানো হচ্ছে সব গাছপালা একদম চকচক করছে। আধভেজা গাছগাছালি গুলো রোদের আলো পরতেই চিকচিক করছে।
সকাল সকাল বাজার করে নিয়ে এসেছে অয়ন আর রাতুল গিয়ে। রাকিব আর রেদোয়ান গিয়েছে অফিসে একটু দেখভাল করতে। আজকে একটা ইম্পরট্যান্ট মিটিং ছিলো ডিলারদের সাথে। তাদের কেউ একজনের না গেলেই নয়। আকাশের একদিকে শরীর ভালো নেই তার ওপর বেচারার আজ বিয়ে। বন্ধু হিসেবে তাদের তো একটা দায়িত্ব আছে। বিয়ের বর কে কি করে তারা আজ কাজে যেতে দেয়।
ড্রইং রুমের সোফায় চা খেতে খেতে বিয়ের আলাপই করছে অয়ন আর রাতুল। শিয়ারা সকলে সেই যে রান্নাঘরে ঢুকেছে। এদিকে আকাশ-প্রিয়ার জন্য কিছু শপিং করতে বের হওয়া দরকার। এখন না হলে সেটা কখন! শুধু রান্নাঘরে পড়ে থাকলে কি করে চলবে। যোহরের আজান দিলে বেলা পেরিয়ে বিকেল হতে আর কতক্ষণ! যদিও মার্কেট কাছেই,তবুও সেগুলো এনে প্রিয়াকে রেডি করারও ও একটা ব্যাপার আছে।ওদিকে রান্নাঘরের দায়িত্ব রাকা আর সৌমি কে দিয়ে শিয়া তুশি আর প্রিয়া কে সাথে নিয়ে ছুটলো অয়নের সাথে। সৌমি যদিও সব কাজে অষ্টরম্ভা। নামে আরকি সাহায্য তার। তাছাড়া রিমি তো আছেই।

রাতুল আড়চোখে বারংবার দেখছে ব্যস্ত রিমি কে। মেয়েটির সমস্যা কি! এক মূহুর্তের জন্য তাকাচ্ছে না তার দিকে। আজব মেয়ে একটা। কখন থেকে সে নিজে ভেবলার মতো তাকিয়ে আছে,ভুলেও যদি তাকায়। রিমি এখানে এসে পৌঁছেছে তবুও আধঘন্টা হলে। পৌছানোর কথা বাড়িতে জানানো হয়নি এখনো। ফোনটা সম্ভবত রাখা প্রিয়ার ঘরে। সে কথা মন পরা মাত্র ওপরে ছুটতেই রাতুল ও ছুটলো তাঁর পিছু পিছু।
মাকে জানিয়ে সবেই ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য দরজা অবধি এসেছে, ওমনিই সমানে পরলো রাতুল। রিমি অল্পর জন্য আকাশ পাতাল এক করে চিৎকার করেনি। রাতুল স্থির চোখে তাকিয়ে এগিয়ে গেলো,সমান তালে রিমিও পেছালো।
—”ইগনোর করার কারণ?”
রিমি স্থির চোখে তাকায়। সর্বদা হাসিখুশি, চঞ্চল কন্ঠস্বর ক্ষনিকের জন্য এমন গম্ভীর হলে কেমন একটা অন্যরকম শোনায়। রিমি মিহি কন্ঠে জবাব দেয়,

—”ইগনোর কেনো করবো?’
—”কেনো করবে বা করছো সেটা তো তুমি জানো। আমি তো কারন টা জানতে চাচ্ছি জাস্ট।।”
আচমকা ছলছল চোখজোড়া নামিয়ে নিয়ে। আড়ষ্ট হয়ে দাড়িয়েই রইলো। রাতুল একই প্রশ্ন পুনরায় করলো এ বারে। রিমির মুখে কোনো উত্তর না পেয়ে বলা যায় বেশ বিরক্ত এসে হানা দিলো তার চোখমুখে।
প্রিয়ার ঘরের দরজা পা দিয়ে আটকে হেলান দিলো সেটায়। বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে দাড়ালো।
—”আমি কথা বলতে গেলেই পালাই পালাই করো কেনো?”
—”কি কথা বলবেন। জলদি বলুন।”
রাতুল বুঝতে পারছে না মেয়েটার এমন করার কারণ। তার কথা শোনারও যেন আগ্রহ নেই।
—”আমি কি তোমার সাথে বাজে ব্যবহার করেছি কখনো? “
রাতুলের নরম কন্ঠে ঝট করে মাথা তোলো রিমি। লোকটার কন্ঠস্বর আর গম্ভীর বা কঠিন নেই। আগের মতো হয়ে এসেছে এক সেকেন্ডেই ৷ রিমি নিজেই ওড়নায় এক কোনা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে আছে৷ ঠোঁট কামড়ে ধীর গলায় বলে,

—”নাহ। কখনো না।”
—”তাহলে এরিয়ে চলছো কেনো আমাকে।”
—”কি বলার সেটা না বললে কি করে বুঝবো।”
—”তুমি তো শুনতেই চাচ্ছো না।”
—”সময়ের কাজ সময়ে না করলে পরে সেটার লাভ কি? যাই হোক। কি বলবেন জলদি বলুন। নিচে কাজ আছে।”
রাতুল কিয়ৎক্ষন চুপ করে রইলো। আজ মন মানছে না। সবটা বলে দেবে আজ। আর কতদিন মনের কথা মনে চেপে রাখবে। জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ঠাণ্ডা সুরে বললো,
—”আই থিংক…”
ঠিক সেদিন রাতের কথার সুর,কথার ধরন। রিমি চুপ করে রইলো রাতুলের কথাগুলো শোনার জন্য। রাতুল আজ আর সময় নিলো না। ঝট করেই বলে ফেললো,

—”রিমি, আই থিং আই লাভ ইউ।”
ক্ষনিকের জন্য রিমির হৃদপিন্ড কাজ করা বন্ধ করে দিলো যেনো। ভুলে গেলো চোখের পলক ফেলতেও। পাতলা ঠোঁট জোড়া মাঝে হা হয়ে গেলো। অস্ফুটে উচ্চারণ করলো,
—”ক-ক-কি বললেন?”
রাতুল দু’ কদম এগিয়ে দূরত্ব ঘোচালো মেয়েটার সাথে। ফিসফিস গলায় বললো,
—”প্রেমে পরে গেছি তোমার। ভালোবাসি। সারাজীবন বাসতে চাই।”
ধীর অথচ স্পষ্ট স্বীকারোক্তি রাতুল। রিমির আখিজোড়া থেকে টপটপ করে অশ্রুবন্যা বয়ে গেলো। রাতুল ব্যস্ত হলো সেটা মুছতে।
—”কাদার মতো কি বললাম। কাঁদছো কেনো?”
রিমি কেন কাঁদছে তা সে নিজেও জানে না। রাতুলের ভালোবাসার স্বীকারোক্তি তে খুশির অশ্রু এটা, নাকি তার বিয়ে ঠিক হয়েছে সেই দুঃখের। বুঝে উঠলো না সে। তবে রাতুলের হাতটা আলগোছে সরিয়ে দিলো। নিজেই নিজের হাতের উল্টো পিঠে মুছলো কান্না। রাতুলের দিকে স্বাভাবিক দৃষ্টি তে তাকিয়ে স্পষ্ট দেড়াজে বললো,

—”ভালোবাসেন এটা জেনে আমি কৃতজ্ঞ। সম্মান করি আপনার ভালোবাসার। কিন্তু… “
—”কিন্তু? “
—”আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। আমার হবু স্বামী নেভি তে আছে। সামনে ডিসেম্বর এ আসবে। তখন আমাকে নিয়ে যাবে।”
রাতুলের মাথার ওপর এ যাত্রায় বজ্রপাত হলো। রিমির বিয়ের কথাবার্তা চলছে এ কথা আকাশ বলেছিলো তাকে। কিন্তু বিয়ে এরইমধ্যে ঠিকও হয়ে গিয়েছে। তা কি করে হয়। রাতুলের চোখমুখ অসহায় ঠেকলো এ যাত্রায়। বুকের ভিতর তোলপাড় করে উঠলো।
—”তা হয়না রিমি। আমি ভালোবাসি তোমাকে। এ বিয়ে কি করে করতে পারো তুমি!”
রিমি ভ্রু কুঁচকালো। স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
—”না পারার কি আছে? আপনি আমাকে ভালোবাসেন সেটা আজ বলছেন। অথচ আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে আজ থেকো আরও পনেরো দিন আগে। “
রাতুল আকাশ থেকে পড়ে। কি বলবে যেনো বুঝতে পারে না। রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
—” আবার বলছি, আপনার ভালোবাসাকে সম্মান করি আমি। তবে ভাগ্যে না থাকলো ভালোবাসার কোনো দাম নেই। ভালো থাকবেন।”

রিমি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পা বাড়াতেই রাতুল স্পষ্ট ভাষায় প্রশ্ন করে বসলো,
—”তোমার কি আমার প্রতি কোনো ফিলিংস নেই?”
রিমি থমকে দাড়ায়। চলে যেতে চেয়েও পা যেনো থমকে থাকে। মাথা নিচু করতেই মেঝেতে গিয়ে ঠেকে তার অশ্রুকনা। কোনোমতে কান্না আটকে বলে,
—”বাবা মার প্রতি আমার যে ভালোবাসা, তার সামনে এ পৃথিবীর কিছুই টিকবে না। সুতরাং এসব প্রশ্নই বৃথা।”
—”তারা যদি অনুমতি দেয় আমাকে। তাহলে?”
রিমির বুকের ভিতরটা হু হু করে ওঠে যেনো। ইচ্ছে হয় ঘুরে উঠে জাপটে ধরতে মানুষ টাকে। কিন্তু সেটা করার সময় আর নেই। ঠান্ডা স্বর শোনা যায় রিমির।
—”সেটা অসম্ভব। বাবা এক কথার মানুষ। “
—”যদি আমি পারি রাজি করাতে।”
—”মিথ্যা বিশ্বাস কেন করতে বলছেন?”
রাতুল নিঃশব্দে হাসলো। দু পা পিছিয়ে মুখোমুখি হলো রিমির। দ্বিধাহীনভাবে দু হাত বাড়িয়ে ধরলো রিমির নরম কোমল হাতের কবজি।

—”তাকাও আমার দিকে।”
রিমি তাকালো। ঝরঝর করে চোখের পানি গাল গড়িয়ে গেলো। রাতুলের মুখে এখনো হাসি।
—”ভালোবাসা দেখলেই বোঝা যায় রিমি। আমার প্রতি তোমার কিছু আছে। এটা টের না পেলে আমি সত্যিই এগোতাম না। হতে পারে দেরি হয়ে গিয়েছে,কিন্তু সব হাতের বাইরে চলে যায়নি। আমি শেষ অবধি লড়াই করে তোমাকে নিজের করে নেবো। তুমি শুধু বলো তোমার বাবা মা স্বেচ্ছায় খুশি মনে তেমাকে আমার হাতে দিলে তুমিও ভালোবাসার পূর্ণতা দিতে আমার হাত ধরবে। যদি বলো ভালোবাসিনা…”
রাতুলের কথা শেষ হতে দেয় না রিমি। দু হাতে জড়িয়ে ধরে রাতুলকে। শব্দ করে কেঁদে ফেলে।
—”এতো দেরিতে কেনো বললেন ভালোবাসি। আমি অপেক্ষা করছিলাম তো। হুট করে সেদিন এসে বিয়ে ঠিক করে গেলো। আমি মানা করার সময়টা অবধি পেলাম না।আমি এখন কি করবো।”
রাতুল শুকনো চুমু আকলো রিমির সিঁথি তে। হাতের বাধন শক্ত করে বললো,
—”কিচ্ছু না। শুধু বলো ভালোবাসি। বাকিটা আমি সামলে নেবো।”
রিমি ফুঁপিয়ে ওঠে। ভালো তো বাসে সে মানুষ টাকে। ভীষন ভালোবাসে। এতদিন সুপ্ত এই কথাটা মনে গহিনে লুকিয়ে রেখেছিলো। সেদিন অয়ন শিয়ার বিয়েতে টের পেয়েছিলো আকাশের বোন এরিন ও ভালোবাসে রাতুলকে। তার তীব্র ধারণা হয়েছিলো রাতুলের সাথে আকাশের এতোটা ভালো সম্পর্ক। রাতুল নিশ্চয় বন্ধুর বোন বাদে তার কাছে আসবে না। এই কষ্ট থেকে আগেই সরে আসতে চেয়েছিলো সে। তদুপরি হুট করে বাবা বিয়ে ঠিক করলে, না করে নি অনেকটা এই জেদেই। রিমি ফুঁপিয়ে জবাব দেয়,
—”ভালোবাসি তো। ভালোবাসি আপনাকে।”

ঘড়ির কাটা আপন গতিতে ঘুরতে ঘুরতে এসে ঠেকেছে বিকেল পাঁচটার কাঁটায়। আজ যোহরের পরেই বিয়ে পরানোর কথা থাকলেও রাকিব ,রেদোয়ান একপ্রকার আটকে গিয়েছিলো অফিসের কাজে। তাছাড়া অয়ন, শিয়াদের শপিং করে ফিরে প্রিয়া কে সাজাতে সাজাতে দুপুর কখন যে গড়িয়ে গিয়েছে তার হিসেবেই নেই। রান্নার কাজ চেপেছে সকাল সকালই। ওদিকে রাতুল কাজি সাহেবকেও নিয়ে হাজির করিয়েছে। বসার ঘরে অপেক্ষমাণ সকলেই। প্রিয়া বা আকাশ কেউ-ই এখনো নিচে নামেনি।
প্রিয়া কে ঘরোয়া ভাবেই সাজাচ্ছে। পার্লার থেকে লোক আনতে চাইলেও প্রিয়ার নিষেধেই আনেনি। ঘরোয়া বিয়ে তে এতো সাজগোছ এর কি আছে। আকাশ দের অফিসের দু চারজন এসেছে। অয়ন সকলের সাথে নিচে বসা। কাজি সাহেবও সেখানেই।
আকাশ পাঞ্জাবি টা গায়ে জড়াতেই ওপাশ থেকে শোনা গেলো খুকখুক শব্দ। আকাশ ফিরেও তাকালো না। বিছানায় তার অতি সভ্য বন্ধুগুলো চিৎকাত হয়ে শুয়ে আছে। তখন থেকে সময় অসময় এমন খুকখুক করতে ব্যাস্ত। আকাশ গায়ে পারফিউম ছড়াতেই সে শব্দ জোড়ালো হলো। আকাশ আয়নার মধ্য দিয়েই তপ্ত দৃষ্টিপাত করলো বন্ধু দের দিকে। কনুইয়ে ভর দিয়ে শুয়ে সবগুলো একমনে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
রাতুল ফিচেল কন্ঠে বললো

—”জীবনে প্রেম,ভালোবাসা তোর দ্বারা হবো না। বলতে বলতে শেষমেশ বিয়াইনকে ছক্কা মেরে বিয়ে করে নিলি ভাই? “
রাকিব হা হা করে অশ্লীল হাসি হেসে উঠলো। রাতুলের সাথে তাল মেলালো,সে আর রেদোয়ানও।
—”একেবারে যা বলেছিস। ওর হবু শশুর বলে গেলো দু বছর বাদে এসে বিয়ে। ব্যাটার তা সহ্য হচ্ছে না। ওইটুকু বাচ্চা মেয়ে। তাকে বিয়ে করতে অস্থির।”
আকাশ বন্ধুদের দিকে না ফিরেই কড়া ধমক লাগালো একটা।
—”শাট আপ। বাজে বকিস না।”
—”সে বললে হচ্ছে না। বাজে কোনটা! তুমি যে আজ রাতে বাজে বাজে কাজ করবে। ওইযে আমরা ফুল আনিয়ে রেখেছি। তুমি কবুল বলতে নিচে গেলেই লোকজন ঘরটা সাজিয়ে ফেলবে। ময়দানে রাতে তুমি আর তোমার বউ বাজে কাজে লিপ্ত হবে। তার বেলায়?”
আকাশ হাতের হেয়ারব্রাশ জোরেই ছুড়ে দিলো রাতুলের দিকে। বেচারা ক্যাচ ধরতে গিয়েও ধরতে পারলো না। সজোরে এসে লাগলো তার বাহুতে। চোখ-মুখ অন্ধকার করে ফেললো।
—’শালা বউ পেয়ে বন্ধুদের মারধর করা শিখে গেছিস? “
রাতুলের ফালতু অভিনয়ে দৃষ্টিও দেয় না আকাশ। পাঞ্জাবির কলার ঠিক করতে করতে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বন্ধু দের উদ্দেশ্য করে বলে,
—”অভিনয় খুব বাজে করিস। চল দেরি হচ্ছে। ননসেন্স একেকটা।”

বসার ঘরে যখন বর কনে কে নিয়ে আসা হলো তখন মাগরিব এর আজার হচ্ছে। কোনো ধরনের সাজসজ্জা করা হয়নি গোটা কটেজ। রাতুলরা খানিক আগে ফুল নিয়ে এসেছে। শুধু আকাশের ঘর টা ডেকোরেশন করা হচ্ছে বাসর এর জন্য। তাছাড়া গোটা কটেজ নিত্যদিনের মতোই ছিমছাম। হাতে গোনা কয়েকজন উপস্থিত। প্রিয়ার গায়ে রোজ পিংক রঙের একটা বেনারসি। গায়ে তেমন একটা ভারি গহনার ছোয়া নেই। পাতলা দোপাট্টা টা বুক অবধি টেনে রাখা। চুলে জুই ফুল পেঁচিয়ে ভারি খোপা করে রাখা।
মেয়েটাকে এই রুপে দেখে আকাশ এহনাজ এর হৃদপিণ্ড পিষ্ট হলো যেনো। শ্বাস আটকে এলো ভীষনভাবে। স্পষ্ট খেয়াল করলো ঘোরার বেগে ছুটতে থাকা হৃদপিন্ড টাকে। পাতলা দোপাট্টার আড়ালে থাকা পরীর মুখটা দেখে অন্তর কাঁপছে তার। হাত ভর্তি চুড়ি। মেহেদী লাগানোর সময় টুকু অবধি পায়নি মেয়েটা। আকাশের মনে মনে এবারে বেশ আফসোস হলো। মেয়েদের বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকে,প্রিয়ারও সে-সব ছিলো নিশ্চয়। শিয়ার মতো ধুমধামে সবটা হবে। এটাই মনেপ্রাণে সেও চাইতো হয়তো।
কাজি সাহেব সময় নষ্ট করে না। সর্বপ্রথম বর কনেকে সাক্ষর করায় রেজিস্ট্রি কাগজে। প্রিয়ার সময় লাগলো বেশ খানিকটা। কম্পিত হাতে বল পেতেই সময় লেগে গেলো। শিয়া হাত চেপে রাখলো বোনের। বেশ সময় নিয়ে সাক্ষর শেষ হলো। আইনি কাজ শেষ হতেই আকাশ নির্দ্বিধায় এসে বসে প্রিয়ার পাশে। মানুষ টার শরীরের কড়া পারফিউম এর গন্ধে ছেটাছিটি করে তার শ্বাসপ্রশ্বাস। আড়ষ্টভাবে বসে থাকে সেভাবেই। কাজি সাহেব পাশের সোফাতেই বসে আছে। প্রথমে ছোট্ট করে খুতবা পড়লেন,সূরা পড়া শেষ করে গেলেন কবুল বলার দিকে।
আকাশ সময় নিলো না মোটেই। স্পষ্ট কন্ঠে উচ্চারণ করলো,

—”আলহামদুলিল্লাহ কবুল,আলহামদুলিল্লাহ কবুল,আলহামদুলিল্লাহ কবুল।।”
আকাশ নিজের পুরুষালি তপ্ত হাত রাখলো প্রিয়ার শীতল হাতে। প্রিয়া অনুভব করলো মানুষটার শরীরের জ্বর এক ফোটাও কমেনি। কাজি সাহেব আলহামদুলিল্লাহ বলে প্রিয়াকে জিজ্ঞেস করতেই সেও সময় নিলো না। ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো, তবে দেরি করলো না একদমই। আকাশের সাথে তাল মিলিয়ে, নিজের হাতের ওপর আলতো হাতে চেপে রাখা আকাশের হাতের দিকে তাকিয়ে বললো,
—”আলহামদুলিল্লাহ কবুল,আলহামদুলিল্লাহ কবুল,আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
আশেপাশে উপস্থিত সকলেই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো। কানে ভেসে এলো রাতুল,রাকিব দের উচ্ছ্বাস। রাকা,তুশিদের মেয়েলি কন্ঠও একই সাথে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।
কবুল পড়ানো শেষ হতেই আকাশ হুড়মুড়িয়ে উঠে প্রিয়ার সামনে এসে বুকে চেপে ধরলো প্রিয়া কে। ছেলেটার অস্থিরতা বোধহয় একটু কমলো। ছটফট করা হৃদয় নিয়ে হাঁটু ভেঙ্গে বসে বসলো প্রিয়ার সমানে। প্রিয়া ভেজা চোখে তাকিয়ে রইলো স্বামীর দিকে। মলিন মুখটাতে একরাশ প্রাপ্তি। সবাইকে হতভম্ব করে দিয়ে প্রিয়ার সাথে সাথে আকাশের গাল গড়িয়ে পরলো নোনাজল।
প্রিয়া আকাশের শক্ত গাল দু হাতের আজলায় নিয়ে আদুরে গলায় বললো,

—”মিস থেকে মিসেস হয়ে গেলাম চৌধুরী সাহেব। এখন? হুম? ভয় কাটলো? আমি যে আপনার এটা বিশ্বাস হলো? এ জীবন,সে জীবন,আজীবনের জন্য এক হয়ে গেলাম। মৃত্যু তেও ভয় রইলো না আমাদের। “
কথাটা শেষ করেই প্রিয়া আলতো চুমু আকলো আকাশের তপ্ত কপালে। এক গা জ্বর নিয়ে লোকটি বসে আছে। যে বসে আছে প্রিয়াকে জড়িয়ে সেই কঠিন আকাশ এহনাজ চৌধুরী ইনি নয় । ইনি প্রিয়ার পাগল প্রেমিক। যে কি না প্রিয়া কে হারিয়ে ফেলার ভয়ে কাল থেকে কাদছে ক্ষনে ক্ষনে। বাচ্চাদের মতো অবুঝ হয়েছে। ভয়ে আকড়ে ধরে রাখছে প্রিয়া কে। উপস্থিত সকলেই একচোখ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছে আকাশ আর প্রিয়ার দিকে। হারানোর ভয় থেকে সেই জিনিসকে নিজের করে নেওয়া যে কতটা প্রাপ্তির, কতটা খুশির। তা হয়তো অয়ন,শিয়া আর এদিকে আকাশ-প্রিয়া দুই দম্পতিই খুব ভালো করে টের পেলো তাদের জীবনদশায়।
প্রিয়া নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,

—”আপনি এখনো এরকম ভিতুর মতো ভয় পেয়ে বসে আছেন কেনো জানতে পারি কি আমি? বিয়েটা তো হয়েই গেলো। আর তাছাড়া আপনাকে এ রুপে দেখে অভ্যস্ত নই আমি।”
—”এক মূহুর্তের জন্য তোমাকে হারিয়ে ফেলার যে ভয় আমার মন,মস্তিষ্কে এসে গেঁথে গিয়েছিলো। সেই ক্ষতের তীব্রতায় এখনো জর্জরিত আমি। এরকম দিন আর আমাদের জীবনে ভুলেও আসলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত পাখি।”
প্রিয়া স্থান কাল ভুলে জড়িয়ে ধরলো আকাশকে। কাজি সাহেবকে বিদায় দিতে অয়ন রা সকলে বাইরে গিয়েছে। বাড়ির মেয়েরা এখানে শুধু। মিটিমিটি হেসে উল্টো ঘুরলো প্রায় সকলেই। প্রিয়া মিহি কন্ঠে বললো,
—”বৈধ সম্পর্কের জোর কতটা সেটা জানেন না? আমার গন্তব্য আপনাতে শুরু,আপনাতেই শেষ। আপনি যেদিন হারিয়ে যাবেন। আমার অস্তিত্ব সেদিনই মুছে যাবে। গোটা এক আকাশ সমান ভালোবাসা একত্র করলেও আমার আপনার ভালোবাসার পরিমাণ করা সম্ভব নয়। এই হালাল সম্পর্কের জোরেই খোদার কাছে আজীবন একে অপরকে চেয়ে নেবো। আমাদের এই বেনামি সম্পর্কের নাম হয়েছে আজ একটা। এতো সহজেই সেই নাম মুছে যেতে দেবো ভেবেছেন?”

আকাশ তন্ময় হয়ে শুনে যায় তার সমানে বউ সেজে বসে থাকা ওই বাচ্চা মেয়েটার কথা। মেয়েটা সত্যিই ম্যাচুয়র। একদম পানির মতো। সময় উপযোগী সব আকার ধারনে সক্ষম। দরজায় হট্টগোল শুনতে পাওয়া গেলো। অয়ন,রাতুল রা সকলে ফিরে এসেছে। আকাশকে ওভাবে হাঁটু গেড়ে প্রিয়ার সামনে বসে থাকতে দেখে গিয়েছে সেই তখন। এখনো ছেলেটা ওভাবেই বসে আছে। উপস্থিত সকলেই মিটমিটি হেসে এদিক ওদিক দৃষ্টি সরাতে ব্যাস্ত। রাতুল দীর্ঘশ্বাস ফেলো এসে দাড়ালো রিমির পাশে। ফিসফিস করে বললো,
—”তোমার দুলাভাই কে দেখে কি মনে হচ্ছে যানো? আমাদের সকলকে এখন নিজ দায়িত্বে নিজেদের রুমে গিয়ে দরজা লক করে বসে থাকতে হবে। যে আবেগঘন পরিস্থিতিতে আছে। হুশ খুয়িয়ে এখানেই বাসর…”
রিমি একপ্রকার চমকে তাকালো রাতুলের দিকে। তাকাতেই লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিলো। লোকটার মুখে ব্রেক নাই নাকি! রিমি নাক সিটকে সরে এলো রাতুলের পাশ থেকে। আবার কি বলতে কি বলে লজ্জায় ফেলে দেবে।
আকাশ প্রিয়ার হাত নিয়ে ছোঁয়ালো নিজের চোখে। সঙ্গে সঙ্গেই ভিজে উঠলো প্রিয়ার হাতের উল্টোপিঠ। ভেজা চুমু আকলো আকাশ প্রিয়ার দু’হাতেই। প্রিয়া দু’হাতের আজলায় আকাশকে কাছে টেনে আরেক দফা চুমু আকঁলো তপ্ত ললাটে। আকাশ সেই নরম হাতের ওপর নিজের হাত রাখলো। প্রিয়া দৃষ্টি তে দৃষ্টি মিলিয়ে শীতল অথচ ভরাট গলায় গেয়ে উঠলো,

—”আর নয় সময়, উদ্দেশ্যহীন মিছিলে
তুমি সেই পূর্ণতা,আমার অনূভবে…
আকাশের গান কানে আসতেই হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠলো বন্ধুরা একেকজন ছুটে এসে পরলো আকাশের কাছে। আকাশকে রাতুলে টেনে তুললো একপ্রকার সেখান দেখে।
—”দোস্ত এখানে আর রোমান্টিক হতে হবে না। বিশ্বাস কর। তোদের ভয় পাচ্ছি আমরা। ডিনার করে বাসর ঘরে যাবি? নাকি তোদের এখানেই সুযোগ দিয়ে আমরা নিজেদের ঘরে গিয়ে নিজ দায়িত্বে ছিটকিনি লাগিয়ে বসে থাকবো।।”

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫১

আকাশ রেগে গেলো না বন্ধুূের লেগপুলিং এ। ধমক দিতে গিয়েও হেসে ফেললো। লাজুক মুখে একই সাথে হেসে ফেললো প্রিয়াও। ঘোমটার আড়ালের সেই নিঃশব্দ হাসি দৃষ্টিগোচর হলো না কারোই। আকাশকে এতক্ষণ পর প্রানখুলে হাসতে দেখে শান্ত হয়েছে তার মনও।

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৩