Home আকাশপ্রিয়া আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৪

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৪

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৪
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

আবহাওয়া অধিদপ্তর এর মতে আজকে সমুদ্র উপকূল অঞ্চল গুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তাদের সতর্কতা বিষয়বস্তু–আজ রাতে ঘূর্ণিঝড় হওয়ার সম্ভাবনা তীব্র থেকে তীব্রতর। তবে সে বাণী কে আপাতত স্থগিত ঘোষনা করে আকাশদের এখানে ঝকঝকে সবকিছু। এখন মাসের মাঝামাঝি । পূর্ণিমা আসতে আরও সম্ভবত দিন পনেরো লাগবে। গোটা কয়েকটা তাঁরাও ঝলমল করছে আকাশজুড়ে । নিশুতি রাত হলেও, চাঁদ- তাঁরার আলোয় আলোকিত বাইরের দিকটা। এদিকটায় কটেজটা দেখে যে কেউ বন বিভাগের এর সদরদপ্তর বলে ভুল করতেই পারে। কটেজের সামনে দিয়ে মেইন রাস্তা অবধি একটা কার চলার মতো চওড়া রাস্তা। আর সেই রাস্তা টা বাদে আসেপাশে লম্বা চওড়া হরেক রকমের গাছপালায় পরিপূর্ণ। কতক গাছের নামও কখনো শোনা হয়নি সম্ভবত। পাখির কলতানে সর্বক্ষণ মুখর থাকে চারিপাশ। রাত্রী গভীর হলে ঝিঁঝি পোকার সাথে নানা জাতের জঙ্গুলে পশুপাখির হাকডাক কানে আসে। আজও তার ব্যাতিক্রম নয়। কটেজের সামান্য দূরেই একটা লেকের মতো। এদিকে যেকোনো কটেজের পশ্চিমের বেলকনি তে দাড়ালে সে লেকের জলের ঢেউ খেলা দেখতে পাওয়া যায়।

কটেজের নিস্তব্ধ ঘরজুড়ে দুজন মানব মানবির চাপা ঘন নিঃশ্বাস, শীৎকার, গোঙানি আর ঘড়ির টিকটিক এর শব্দ। বাহিরে অবশ্য পাল্লা দিয়ে নানাজাতের পোকার ডাকাডাকির আওয়াজ। তবে এই চার দেয়ালের ভিতরে এইমূহুর্তে নিজেদের তৈরি করে নেওয়া অন্য দুনিয়ায় থাকা নরনারীর, সেসব শব্দ কানে তোলার সময় কোথায়!
আজকের রাত প্রিয়ার জন্য ভীষন দীর্ঘ। আকাশ দীর্ঘ করছে আদতে। এ রাতের শুরু টা কখন ছিলো আর শেষটা কখন হবে তা হাতড়ে পাচ্ছে না মেয়েটা। বিধস্ত তনু দেহে বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই। হাত দুটোও অসাড় হয়ে আকাশের পিঠ জড়িয়ে রাখা।
আকাশের প্রলয়কারী রুপ যখন শান্ত হলো তখন রাতের মধ্যভাগ কেটে ভোররাতে গিয়ে ঠেকেছে সময়ের হিসেব।
দু দুটো ঘর্মাক্ত মানবদেহ একে অপরকে আকড়ে পরে আছে ফুলেল বিছানায়। প্রিয়া চোখ মেলে তাকাতে অবধি পারছে না। ঘনঘন শ্বাস পরছে দুজনেরই। মিলে থাকা দেহের সংস্পর্শে একে অপরের হৃদস্পন্দন তীব্র ভাবে অনুভব করছে। আকাশ খেয়াল করলো প্রিয়ার ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখটা। সময় নিয়ে উঠে বসলো। প্রিয়ার দিকে ঝুকে ভীষন নরম কন্ঠে ডাকলো।

— “পাখি?”
প্রিয়া উত্তর নিলো সাথে সাথেই। ছোট্ট অস্ফুটে আওয়াজ বের হলো শুধু।
—”হু।”
আকাশ কেনো ডাকলো এই মূহুর্তে তা সে নিজেও জানেনা। কোথাও একটা অপরাধবোধ কাজ করছে হয়তো বা। মেয়েটার বয়স ,নাজুক শরীর, মন মানসিকতা সবেতে নজর দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো তার। সব মাথা থেকে বের হয়ে ফ্লোরে হুটোপুটি খেয়েছে গোটা সময়। প্রেয়সীর চাঁপা আর্তনাদও শান্ত করতে পারেনি উথাল-পাতাল ঝড়কে। বাইরে ঝড় নাই থাকতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর দু একবার ভুল করেই ফেলতে পারে। তবে এই বদ্ধ ঘরের ভিতর আবহাওয়া অধিদপ্তর এর অনাকাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যত বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। আকাশের সাড়া না পেয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো প্রিয়া। কাঁপা কন্ঠে কোনোমতে বললো,
—” ঘুমাবো।”

আকাশের মুখ এবারে সত্যিই মলিন হয়ে এলো। প্রিয়া কাঁদছিলো গোটাটা সময়। শুরুতে আদরের তীব্রতা মেয়েটাকে আঘাত করতে না পারলেও পরে নিজের মধ্যেই ছিলো না আকাশ। প্রিয়ার গ্রীবা দেশে আলতো হাত এগিয়ে মেয়েটার নেতিয়ে যাওয়া শরীরটা তুলে নিলো নিজের কোলে। অন্য হাতে হাটুর নিচে গলিয়ে পাঁজা কোলে নিয়ে দিলো। শীতল ললাটে ভেজা চুমু আকলো শব্দ করে। প্রিয়া নিজের কেঁপে কেঁপে ওঠা শরীরেও স্পষ্ট টের পেলো আকাশের শরীরের উষ্ণতা। আকাশের গলায় পেচিয়ে ধরার শক্তিটুকুও নেই তার। আকাশ খানিকক্ষণ বুকে আগলে রেখে ওকে নিয়ে বিছানা ত্যাগ করতে যাবে তার আগেই শোনা গেলো প্রিয়ার বিধ্বস্ত কন্ঠস্বর।
—”আ-আবার কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
আকাশ প্রিয়ার পাতলা নগ্ন শরীরটা নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্টে বুকে জড়িয়ে রেখে উত্তর দিলো,
—”শাওয়ার নিতে।”
আকাশের ঘর্মাক্ত উদাম বুকে নাক ঘষলো প্রিয়া। আধো গলায় বললো,
—”আ-আপনার জ্বর খুব।”
আকাশ নিজেও টের পাচ্ছে সেটা। জ্বরের তীব্রতায় চোখ বুজে আসছে। দরকার ছিলো ওষুধ খেয়ে লম্বা একটা ঘুমের। সেটা না করে টেনেটুনে রাত টা করে ফেললো লম্বা। শরীরের ধকলে এখন দাড়িয়ে থাকাই কষ্টকর।
—”হুম। কিন্তু ফ্রেশ তো হতেই হয়।”
—”আ-আমি পারবো। আপনার গায়ে প্রচুর জ্বর। নামিয়ে দিন আমাকে।”

প্রিয়ার এই ফাঁকা বুলিতে হাসি পেলো আকাশের। মেয়েটার কন্ঠস্বরই বুঝে নিতে হচ্ছে খুব কষ্টে। সেখানে ওকে দাড় করিয়ে দেওয়া মাত্রই যে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাবে তা বুঝতে দেরি হওয়ার কথা নয় আকাশের।
বেশ সময় নিয়ে প্রিয়া কে ফ্রেশ করিয়ে, নিজেও শাওয়ার নিয়ে আসলো একেবারে। অসময়ের গোসলে দ্বিগুণ ঝিমাচ্ছে মাথাটা। ক্লান্ত শরীরে প্রিয়ার দূর্বল শরীরটা নিজের কাছে টেনে এনে মুখ গুঁজল মেয়েটার নরম সত্তায়। মেয়েটার পরনে পাতলা একটা নাইটি। আকাশের উদাম শরীরে কোমড়ে কোনোমতে জড়িয়ে একটা ট্রাউজার।
—”আ-আপনি ওষুধ নিয়ে আসুন। জ্বর বাড়ছে তো।”

আকাশ নড়াচড়া করে না। প্রেয়সীর কোমড় আকড়ে বক্ষজোড়ার ভাজে মুখ গুঁজে থাকে। মেয়েলি নেশাক্ত ঘ্রান এসে নাকেমুখে বারি খাচ্ছে। বডি ওয়াশের ঘ্রান মিশ্রিত হয়ে আরও উন্মাদের মতো ঠেকছে নিজেকে।
আকাশের তো এর আগে কখনোই জ্বর এতো তীব্রভাবে এসে হানা দেয়নি। একবেলা ওষুধই এনাফ। আজ তার ব্যাতিক্রম। এই মেয়েটার শরীরের নেশায় জ্বর কমছে না। এটা আসল কথা।
নিশীথের আধার কেটে খানিক বাদেই দিনের আলো ফুটতে শুরু করবে। ফজরের আজান হচ্ছে। প্রিয়া এরইমধ্যে ঘুমিয়েও পরেছে। নিশ্বাস ভাড়ি হতেই বুকের ভাজ থেকে মুখ তুলে কনুই এ ভর করে গালে হাত ঠেকিয়ে আধশোয়া হলো আকাশ। সামনে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে তার প্রথম প্রেম,প্রথম ভালোবাসা।
লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট ছিলো বুঝি সেটা! আকাশ মৃদু হাসে। হাত বাড়িয়ে আঙুলের আকিঁবুকিঁ করে প্রিয়ার নরম কোমল মুখখানায়। মখমলের মতো তুলতুলে। সদ্য আঠারো পেরিয়ে উনিশের কাছাকাছি। এই মেয়েটাকে দেখে মাস সাতেক আগে থমকে গিয়েছিলো আকাশের হৃদপিণ্ড। ভুলে গিয়েছিলো পলক ফেলতে! মেয়েটা নীল শাড়ি পরা ছিলো সেদিন, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিলো পাহারের বুকে।
আকাশ গ্রীবা বাড়িয়ে আলতো চুমু আকলো প্রিয়ার ঠোঁটে। একবার, দু’বার। তৃতীয়বারে গিয়ে পুনরায় খেই হারালো। ঘুমের ঘোরেও মেয়েটা টের পেলো আকাশের আগ্রাসী আদর। শ্বাস নিতে না পেরে নড়েচড়ে উঠলো। বিছানার এলিয়ে থাকা হাতে সরাতে চাইলো আকাশকে। কাঁচা ঘুম সবেই। এতো গভীর স্পর্শে ভেঙে যেতে সময় লাগলো না। আকাশ এর দৃষ্টিতে যখন দৃষ্টি মিললো তখন হয়তো হুশ হলো আকাশের। অস্থির ভঙ্গিতে ছেড়ে দিলো। নিজের ঠোঁট কামড়ে প্রিয়ার মুখ আজলায় নিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো,

—”সরি পাখি। এক্সট্রিমলি সরি… আর বিরক্ত করবো না। ঘুমাও। সত্যি বিরক্ত করবো না।”
প্রিয়া ঠোঁট টিপে হাসলো। ফ্যাকাসে হয়ে থাকা মলিন মুখে সে হাসি দৃশ্যমান হলো না। আকাশের চোখজোড়া তখন অস্বাভাবিক রক্তিম। প্রিয়া ইশারায় বালিশে মাথা রাখতে বললো। আকাশ রাখলো। প্রিয়ার দিক ঘুরে শুলো মাথার নিচে একহাত রেখে। প্রিয়ার নিজের ব্যাথায় জর্জরিত শরীরটা এগিয়ে নিয়ে ঘেষে গেলো আকাশের বলিষ্ঠ দেহের সাথে। নিজের হাত টা এগিয়ে আকাশের পেট আকড়ে ধরলো।
—-”জ্বর জাঁকিয়ে এসেছে। বুঝতে পারছেন না? নাকি জ্বরে মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে! ঘুমান এখন।”
আকাশ প্রিয়ার আধভেজা চুলে হাত গলিয়ে দিলো মাথাটা টেনে এনে চেপে ধরলো নিজের বুকের সাথে। শান্ত অথচ ভীষন কামুক গলায় বললো,
—” আই ওয়ান্ট মোর, পাখি।”
ঝনঝন করে উঠলো প্রিয়ার কান। সাদা হয়ে যাওয়া রক্তশূণ্য মুখটাতে রাজ্যের রঙ এসে ধরা দিলো। লজ্জায় রাঙা হয়ে গেলো মুখটা। মানসপটে ভেসে উঠলো গোটা রাতের আকাশের করা পাগলামি। চিনচিন ব্যাথায় জর্জরিত শরীর জানান দিচ্ছে আকাশ কতটা গভীরে টেনেছিলো তাকে। প্রিয়া আকাশের বুকে মুখ লুকিয়ে থাকে। মিনমিন গলায় বলে,
—”আ-আমার শরীর খারাপ লাগছে…”
চোখবুজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশ। বউকে কাছে পেয়ে পাগল হয়ে গিয়েছে। কি বলছে,কি ভাবছে,কি চাইছে খেয়ালই করতে পারছে না সে।
আকাশ আর কোনো সাড়াশব্দ করে না। প্রিয়াকে কাছে টেনে নেয়। শক্ত করে চেপে রাখে বুকের ভিতর।

সৌমির যখন হাসপাতালের দু’শ তিন নাম্বার কেবিনের সামনে এসে দাড়ালো তখন সবে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। সারারাত না ঘুমাতে পারার দরুন চোখের নিচে কালো দাগ বসে গিয়েছে, রক্তিম হয়েছে আখিজোড়া। মাথায় অসহ্য ব্যাথা। কেবিনের সামনে একজন হাবিলদার বসা। হিসেব মতো রিয়ান এখন জেলে থাকার কথা। নেহাৎ গুরুতর অসুস্থ তাই পুলিশ পাহাড়ায় হসপিটালে ভর্তি।
পুলিশকে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে সৌমি যখন কেবিনে ঢুকলো তখন রিয়ান বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। বিদ্রুপের হাসি হাসলো সৌমি। শব্দহীন চেয়ারটা টেনে এনে বসলো পাশে।
কাল সারারাত ছটফট করেছে। হুট করে দু’দিনের মধ্যে কারোর প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে পারে কি-না জানা নেই সৌমির। তবে তার গর্ভের সন্তারের বাবা হিসেবে যতটুকু চাওয়া যায় একটা মানুষ কে। আজকাল রিয়ানকে সে ততটুকু চাওয়া শুরু করেছে।
নিজের এই পরিবর্তনে নিজেই হতভম্ব হয় সে। যতবার ভাবতে বসে ততবার খেয়াল হয় কতটা ভালোবাসার কাঙালিনী সে।

—” দুদিন হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে রিয়ান। ভাবতে পারো? আমি…তোমাকে বিয়ে করেছি? তোমার সন্তান নিজের গর্ভে নিয়ে ঘুরছি! ভাগ্য আমাদের কোথা থেকে কোথায় এনে দাড় করালো দেখতে পাচ্ছো? এই সন্তানকে আমি একটু আঘাতের কথা ভাবতে পারছি না। দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া তো দূরে থাক! এটা কি খোদার মর্জি?”
রিয়ান এর সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। সৌমি খেয়াল করলো সে নিজে কাদছে। চোখ দিয়ে অঝোরে নোনাজল গড়িয়ে পরছে। তার কেনো মনে হচ্ছে কেউ নেই তার। এই সন্তানও কি তার মতো করেই বড় হবে? কোনো এক অসুস্থ পরিবেশে?
না চাইতেও কান্নার শব্দ বাধ মানলো না। হু হু শব্দ করে কেঁদে ফেললো মেয়েটা।
রিয়ানের সেন্স ছিলো। সুতরাং ঘুম ভেঙে গেলো কারোর কান্নার আওয়াজে। চোখ মিটিমিট করলো। তার হাতের ওপর মাথা ঠেকিয়ে কাঁদছে কেউ। ওষুধের রেশ,সাথে ঘুমের রেশ। সবমিলিয়ে একটা নামই মাথায় আসলো তার। অস্ফুটস্বরে ডেকে উঠলো,

—”প-প্রিয়া?”
পরিচিত কন্ঠে অন্য নাম শুনে ঝট করে মুখ তুললো সৌমি। রিয়ান তাকিয়ে। তবে তাকে আশা করেনি। করলে প্রিয়ার নামে ডাকতো না। রিয়ানের ভুল ভেঙেছে বইকি। সৌমিকে দেখে রাজ্যের বিরক্তি এসে হানা দিলো চোখেমুখে। নিজের হাত সরিয়ে নিলো তৎক্ষণাৎ। দরজার দিকে তাকিয়ে খুঁজলো কাউকে।
—”তোমাকে এখানে আসার পারমিশন দিয়েছে কে?”
—”তো কি প্রিয়া কে দিতো?”
—”শাট আপ সৌমি। এখানে কি কাজ তোমার! “
—”প্রিয়ারই বা কি কাজ?”
বিরক্তির পরিমাণ বাড়লো বই কমলো না। সকাল সকাল হাসপাতালের বেডে ঘুম ভেঙে তার জীবনের আরেক রোগ সামনে বসা দেখতে তার মোটেই ভালো লাগলো না। আর সৌমির এই হেয়ালি তো আরও পোষালো না অসুস্থ শরীরে। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—”ফাঁসিয়ে দিয়েছো ভাই তুমি আমাকে। “
মলিন হাসলো সৌমি। শান্ত গলায় বললো,

—”তোমার বউ তার ওপর তোমার অনাগত সন্তানের মা আমি,রিয়ান। যা ফাসানোর তুমি আমাকে ফাঁসিয়েছো।”
ইশশ এই কথাগুলো আরও যন্ত্রণা দেয় রিয়ানকে। অশান্তিতে মস্তিষ্ক ফেটে যেতে চায়।
—”তোমার মতো মেয়ে কারোর বউ হওয়ার যোগ্য? মা হওয়ার যোগ্য? “
—”তুমিও তো বাবা বা স্বামী কোনোটারই যোগ্য নও। তবুও আমি মেনে নিয়েছি।”
বাঁকা হাসলো রিয়ান। বাঁকা গলায় বললো,
—”তুমি মেনে নেওয়ার কে! আমি মানি না সেসব। না ওই বিয়ে। আর না তো ওই সন্তান।”
—”এটা তোমার সন্তান রিয়ান।”
অশ্লীল হাসলো রিয়ান। চোখ বুজে এলো হাসির তীব্রতায়।
—”প্রমান কি?”
স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সৌমি। তবে নিজেকে সামলে তৎক্ষণাৎ ফোন থেকে ডিএনএ রিপোর্ট খানা ধরে রিয়ান এর মুখের সামনে। তা দেখেও ভাবান্তর হলো না রিয়ানের মধ্যে। বরং দ্বিগুণ বিদ্রুপের সুরে বললো,
—” তোমার বাপের যত টাকা। ডিএনএ রিপোর্ট আর এমন কি!”
দীর্ঘশ্বাস ফেলো সৌমি। এ সবই তার পাপের ফল। পাপ সম্পর্ক,সেই পাপের ফসল নিয়ে এতো যুদ্ধ। সৌমি শান্ত, ভীষন শান্ত আজকে।

—”কার জন্য এতো নাটক করছো? প্রিয়া? জানতে না আমি মা হচ্ছি? তার পরও গিয়েছিলে ওকে বিয়ে করতে?”
—”ভালোবাসি আমি ওকে।”
রিয়ানকে পোড়াতে শব্দ করে হাসলো সৌমি। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো। কেবিনের বদ্ধ জানালা হাট করে খুলে দিলো। কয়েদির মতো ট্রিটমেন্ট। বাইরের আলো দেখতে পাওয়ার উপায় নেই জানালা খুলেও।
সৌমি পিছন না ফিরেই বললো,
—” প্রিয়া আকাশের আদরে ছটফট করেছে কাল গোটা টা রাত। তারপরও চাই ওকে?”
রিয়ান স্তম্ভিত হয়ে গেলো।
—”মানে? “
—”বাচ্চা নও তুমি। বিয়ে করেছে কাল প্রিয়াকে আকাশ। ওদের বাসর রাত ছিলো কাল। দেখো গিয়ে রাতের ঘুম এখনো হয়তো ঘুমাতেই পারেনি মেয়েটা। তোমার বন্ধু…”
টেবিলের ওপরে রাখা কাঁচের গ্লাস ছুড়ে দিলো রিয়ান দেয়াল লক্ষ করে। শব্দ করে খানখান হয়ে গেলো সেটা। দু-তিন টুকরো এসে সৌমির হাত পায়ে কেটেছিড়ে গেলো। সৌমি নির্বাক হয়ে দাড়িয়ে। মুখে কোনো ব্যাথার ছাপ নেই।
—”রেগে লাভ কি! বিশ্বাস হয় না? প্রমান লাগবে এটারও? গাধা তুমি, রিয়ান। একে অপরকে ভালোবাসে ওরা। জোর খাটিয়ে সব হয়? “
রিয়ানের তপ্ত চোখের দৃষ্টিতে ভষ্ম করে ফেলতে চাইলো সৌমিকে। সৌমি বাঁকা হাসি উপহার দিলো রিয়ানকে। ঠান্ডা মেজাজে সে আজকে।

—” জেল থেকে আমি না ছাড়ালে বাঁচতে পারবে না তুমি। তবে বের হলে আমার দায়িত্ব নিতে হবে।এমন শর্ত আমি দেবোনা। উহু। আমি পরনির্ভরশীল নারী নই। তোমার মতো রাস্কেল এর দুর্গন্ধযুক্ত কথা জাস্ট এই বাচ্চাটার জন্য সহ্য করা। না হলে সৌমি ভালোবাসায় এতোটাও অন্ধ হবে। এ ভাবা অন্যায়। কিছুক্ষণ আগে অব্দিও অন্য ধারনা ছিলো। তবে শুনে রাখো। নিজ থেকে যদি না শুধরাও, তাহলে আমি জোর করবো না। একটা সময় আসবো যখন তুমি হাড়েহাড়ে টের পাবে। কিন্তু তখন আমার কথা বাদই দাও। এ বাচ্চাকেও আমি ছুঁতে দেবো না তোমাকে। সেদিন টের পাবে রাগে,জেদে অন্ধ হয়ে নিজের কি হারিয়েছো।”
সৌমি দাড়ায় না আর। হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। সৌমির কথাগুলো কানে নিলো রিয়ান। তবে মন অবধি হয়তো পৌছাতে পারলো না।

মিষ্টি রোদ এসে ছড়িয়ে আছে গোটাঘর জুড়ে। কয়েকখানা সূর্য রশ্মির তীর্যক রেখা ছুঁয়ে দিয়েছে প্রিয়ার মুখ। নড়েচড়ে উঠলো প্রিয়া। নিজেকে আবিষ্কার করলো আকাশের বেডরুমে। কালো বেডশিটের ওপর ফুলের ছড়াছড়ি। তার ওপর একে অপরকে আকড়ে ধরে শুয়ে আছে আকাশ-প্রিয়া।
আকাশের পেশল বাহুতে মাথা রাখা তার। রোদ পরেছে আকাশের চোখেমুখেও। সে নিজেও চোখমুখ কুচকে আছে। তিরতির করে কাঁপছে চোখের পাপড়ি। প্রিয়া নিজের হাত তুলে আড়াল করলো রোদ। কাঁপতে থাকা চোখের পাতা স্থির হলো আকাশের। প্রিয়া মিষ্টি হাসলো। বারংবার সরিয়ে নিচ্ছে হাত। ততবার চোখ কুঁচকে ফেলছে আকাশ। লোকটাকে বিরক্ত করতে বেশ লাগছে। আরও একটু বিরক্ত করার নিমিত্তে নাক চেপে ধরলো প্রিয়া।
—”উমমম্ পাখি…”
আকাশ চোখমুখ কুচকে ফেলায় ঠোঁট টিপে হেসে ফেললো প্রিয়া। তবে ছাড়লো না। উল্টো ফিসফিস করে বললো,
—”কি যেনো বলেছিলেন! কার যেনো দম অনেএএএক। এখন এতটুকুতে ছটফট করছেন?”
আকাশ ঘুম ঘুম চোখে তাকালো। ঘুম ভেঙে চোখ খুলতেই দেখলো–পাশে শুয়ে তার ভালোবাসা, তার স্ত্রী, তার প্রেয়সী। এরকম একটা অভাবনীয় সকাল বহুদিন এর স্বপ্ন তার। প্রিয়ার মুখজুড়ে দুষ্টু হাসি।
আচমকা প্রিয়া অনূভব করলো একটা ভারি শরীরের নিচে চাপা পরেছে সে। তার এলোমেলো চুলগুলো একহাতে গুছিয়ে সরিয়ে দিলো মুখের ওপর থেকে। গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করলো প্রেয়সীর মুখের প্রতিটি ভাজ। হাস্কিস্বরে বললো,

—”আমি যে এতো সহজে হাঁপাই না সেটায় এখনো সন্দেহ আছেই পাখি? কাল রাতের পারফরম্যান্স এনাফ ছিলো না?”
আকাশের লাগামছাড়া কথায় লজ্জাবতী লতার মতো মিয়িয়ে গেলো প্রিয়া। উষ্ণ ভাপ বের হচ্ছে দু কান থেকে। এলোমেলো দৃশ্য নামিয়ে নিলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে দু হাতে সরাতে চাইলো আকাশকে। আকাশ সরলো তো না-ই। বরং নিজের ভারি শরীরের ভার ছেড়ে দিলো প্রিয়ার ছোট্ট শরীরের ওপর।
—”ইশশশ সরুন। মরে যাবো তো। আপনার শরীরের ভার কত আন্দাজ আছ? উফফ।”
আকাশ নাক ঘষলো প্রিয়ার কন্ঠদেশে। শিউরে উঠলো মেয়েটার গোটা শরীর। বুকের ওপরে ঢেকে থাকা কমফোর্টার আলতো হাতে সরিয়ে দিলো আকাশ। দুধেআলতা শরীরে পারপেল স্টেইনগুলো জ্বলজ্বল করছে।
আকাশ বিছানায় গা এলিয়ে মুখ গুজে রইলো প্রিয়ার কন্ঠদেশে। প্রিয়া নরম হাতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আকাশের চুলে।
—”ভালোবাসি পাখি।”
আকাশের মুখে এই কথাটা কাল রাত থেকে অগুনতি বার শুনছে প্রিয়া। যতবার শুনছে ততবার চোখের পানি এসে জমছে। আকাশ এর দৃষ্টি এড়ায়নি সেটা। মেয়েটা যে ভীষন খুশি হয় এই শব্দটা শুনে এটা বোঝে সে। প্রিয়া আধো ঘুমে নাক ঘষলো আকাশের উদাম বুকে। হুট করেই বিবাহিত তারা! বিশ্বাস হয়? এতোদিন কাছে আসতে কত হেজিটেশন,কত বাঁধার কথা মনে আসতো। অথচ আজ! আজ হুট করেই একটা নতুন দিনের সূচনা হলো স্বামীর বুকে। তার ভালোবাসার পুরুষের বুকে। গত একটা রাতে বদলে গেলো অনেককিছু। তার নারী জীবন পূর্ণতা দিলো তার বৈধ পুরুষ। কোনো এক অভাবনীয় স্বপ্নের মতো সবটা। প্রিয়া মৃদু হেসে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,
—”আমরা সত্যিই বিবাহিত? “

প্রিয়ার এহেন প্রশ্নে শব্দ করে হেসে ফেললো আকাশ। প্রিয়ার নাক চেপে ধরে কপালে ভেজা চুমু আঁকলো। এতক্ষনে মেয়েটা বলে কি! আকাশ হাস্কিস্বরে বললো,
—”রাতে সব আমার নামে উৎসর্গ করে সকালে উঠে বিয়ের কথা মনে পরছে না? বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ান। আই থিংক মনে পরে যাবে। আঘাতে আগাত না পেলে অনূভব হয়না না?”
লোকটার সাথে স্বাভাবিক কোনো কথা বলাই যেনো যায়না। কি বললো সে,আর লোকটা কি জবাব দিলো।
—”ইশশ কি বাজে কথা। সহজ কথার সহজ উত্তর দিলেই হয়।”
—” এতো আদরের পরও বিবাহিত কি-না এ প্রশ্ন করলে কি বুঝবো আমি? ম্যাডাম কি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আবসর আদর চান?”
—”বাজে লোক। চুপ করুন।”
—“মুখ চুপ করাতে পারি। কিন্তু… ”
—“কিন্তু? ”
—“আমি এখন আবার একটু বাজে হবে। রাতের মতো। আবার একটু সহ্য করে নিও হ্যা? আমি প্রাণপনে চেষ্টা করবো জেন্টাল থাকার। যদি কারণবশত কথা না রাখতে পারি, ক্ষমা করে দিয়ো হ্যা?”
প্রিয়া বাক বিহ্বল হয়। তবে প্রতিবাদ বা থামনোর কোনো সুযোগই দেওয়া হয়না তাকে।

ডাইনিং টেবিলের আহার পর্ব মোটামুটি শেষের দিকে। । অয়ন বেরিয়েছে অফিসের কাজে। বাকিদের আজকের দিনটা বাড়িতেই থাকতে বলে গিয়েছে। দুদিন হলো যা ঝক্কি যাচ্ছে!
রাকা,তুশির অফিসে সপ্তাহ খানেকের ছুটি পেয়েছে। বিধায় আর কয়েকটা দিন থেকেই যাবে এখানে। তুশি সৌমির পাতে খাবার তুলে দিতে দিতে রাতুলের দিকে
তাকিয়ে বললো,
—”আমাদের ছোট সাহেব ওঠেনি বুঝি এখনো?”
ঘড়ি দেখলো রাতুল। খাবারের লোকমা মুখে তুলে চিবুতে চিবুতে বললো,
—”সদ্য বিবাহিত পুরুষ সে। একটু আধটু তো ঘুমাবেই।”

কথা শেষ হলো না। তার আগেই সিড়িতে পায়ের শব্দে ঘুরে তাকালো সকলে। ধীরেসুস্থে প্রিয়া নামছে। গায়ে সুতির একটা শাড়ি। নতুন বউ বউ লাগছে। শিয়া মুগ্ধ হলো নিজের বোনকে দেখে। প্রিয়াকে দেখেই রাকিব,রেদোয়ান উঁকি দিলো ওপরের দিকে। আকাশের টিকি টা অবধি দেখতে পাওয়া গেলো না।
প্রিয়া এসে বসতেই খুকখুক শব্দ পাওয়া গেলো গোটা টেবিল জুড়ে। এরই মধ্যে শিয়ার চোখ রাঙানো লক্ষ্য করলো সবাই। তবে সে-সবে পাত্তা দিলে তবে তো। বন্ধুর বউ,মজা করাই যায়। তবে প্রিয়ার দিকে তাকালে ইতস্তত বোধ করে সকলে সত্যি বলতে। তাদের সবার থেকে বেশ ছোট মেয়েটা। আকাশকে বিরক্ত করার জন্য হলেও প্রিয়াকে অপদস্ত করতে পারে না তারা। রিমির পাশেই বসলো প্রিয়া।
—”গুড মর্নিং।”
মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো সকলে। কারোর উত্তর না পেয়ে মুখ তুলে তাকাতেই রাতুল মাথা নেড়ে লম্বা টানে উত্তর নিলো।

—”গুড মর্নিং মিসেস চৌধুরী। আপনার স্বামীর সকাল হয়নি এখনো?”
সকাল সকাল সবার মুখে স্বামী শব্দটা বেশ লাগলো প্রিয়ার। মৃদু হেসে জবাব দিলো,
—”ওনার তো জ্বর। সকালে বেরেছে খানিকটা। তাই ডাকিনি।”
বাকিরা কিছু না বললেও কথা বলে উঠলো রিমিই।
—” কোন হিসেবে এখন গুড মর্নিং? “
—”হ্যা?”
—”বললাম মর্নিং এখন?”
ঝট করে বসার ঘরের দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালো প্রিয়া। চুপসে গেলো মুখখানা। ইমব্যারেসিং ব্যাপার স্যাপার। ঘড়ির কাটা টিকটিক করছে দুপুর আড়াইটায়। প্রিয়া ঠোঁটে ঠোঁট টিপে নাথা ঝুকালো প্লেটের দিকে। ঘুম ভেঙে শাওয়ার নিয়ে ঝটপট পালিয়ে এসেছে আকাশের থেকে। সময় দেখার কথা মাথাতেই আসেনি।
রিমি আবার কিছু বলবে তখনই হাজির হলো সয়ং আকাশ। রাতুলদের চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠলো এ যাত্রায়৷ প্রিয়াকে তো কিছু বলতে পারছিলো না। দম বন্ধ লাগছিলো যেনো।
আকাশ আসতেই নিজের প্লেট হাতে জায়গা ছেড়ে দিলো রিমি। আকাশ স্বাভাবিক ভাবেই বসলো প্রিয়ার পাশে। প্রিয়া মুখ তুলেও তাকাচ্ছে না। অজানা কারণে লজ্জা লাগছে তার।

—”বিবাহিত পুরুষ। এতোবেলা অবধি ঘুমে ছিলেন?”
রাতুলের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনা আকাশ।কথা বললেই ফাজিলগুলো যা তা বকা শুরু করবে। শিয়া খাবার দেয় প্লেটে।
—”ভাই কোথায়?”
—”অফিসে। “
—”আজ তো… “
—”আমাদের এক ক্লায়েন্ট নাকি আরজেন্ট মিট করতে চেয়েছে। তাই না চাইতেও যেতে হলো।”
মাথা নেড়ে খাওয়ায় মন দিলো আকাশ। সৌমি বসা মুখোমুখি। মেয়েটা এসব হৈ হল্লার মধ্যে নেই যেনো। শান্ত হয়ে খাবার খাচ্ছে।
আকাশ গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—”রিয়ান কে নিয়ে ভেবেছো কিছু?”
সৌমি মুখ তুললো না। ওভাবেই জবাব দিলো,
—”আমি আজ রাতের ফ্লাইটে ঢাকা ফিরবো আকাশ।”
—”রিয়ান?”
—”ও ইন্টারেস্ট না।”
—”কথা হয়েছে?”

সৌমি মুখ তুললো। একে একে সবার দিকে তাকালো। আজ সকালে তার বের হওয়ার কথা অবগত নয় কেউ-ই। তবে লুকালো না সে।
—”সকালে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ও আমাকে বা আমার বাচ্চাকে মানতে নারাজ।”
প্রতিবাদ করে উঠলো রাকা। কঠিন গলায় বললো,
—”তা কি করে হয়? বিয়ে হয়ে গেছে তোদের। বাপ হবে ও তোর বাচ্চার। এখন দায় এড়াতে চাইলে কি করে হবে!”
হাসলো সৌমি। মলিন সে হাসি। ভরা প্লেটেই পানি ঢেলে দিলো। আজকাল খাওয়ার রুচি হয়না। খেতে পারে না কিছু।
—”জোর করে কিছু পাওয়া যায়? রিয়ান তো জোর করে পেতে চাইলো প্রিয়াকে। প্রিয়া কি হতো ওর? আমাদেরও তেমন। আমি চাইলেই ও আমার হবে কেনো!”
উপস্থিত কারোর কাছেই কোনো জবাব নেই এর। ভালোবাসায় জোর চলেনা। একদম চলেনা। মন থেকে কেউ না চাইলে দায়বদ্ধতা ঠুকরে দেওয়া যায়না তার ওপর। আকাশ খাবারে মন দিয়ে স্বাভাবিক গলায়তেই বললো,
—”তোমার বাবা কাল দেশে ফিরেছেন। তুমি সম্ভবত ফোন ধরছিলো না। আমাকে খানিক আগে কল করে খোঁজ নিচ্ছিলেন। বিয়ের কথাটা জানাও নি?”

—”উহু।”
—”বাচ্চাটার বিষয়ে কি ভাবলে?”
—”আমার সন্তান ও। এই সন্তান পৃথিবীতে আনতে রিয়ান কে আমার কোনো দরকার নেই। ও নিজ থেকে বাচ্চাকে অস্বীকার করেছে। আমার এতে কি করার থাকতে পারে! আমার পরিচয়ে মানুষ হবে ও।”
—”আর তোমাদের বিয়ে?”
উঠে পরলো সৌমি। ট্যিসুতে হাত মুছতে মুছতে বললো,
—”খানিক সময় দেবো। যদি ফেরে তবে সব ঠিক করে নেবো। না হলে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে অ্যাবরোড সেটেল হয়ে যাবো।”
সৌমি আর দাড়ায় না। ছলছল চোখে চলে যায় নিজের রুমে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো উপস্থিত সকলেই। কারোর কিচ্ছু করার নেই। আকাশকেও এ নিয়ে জিজ্ঞেস করার সাহস হয়না। এমনিই রিয়ানের ওপর যা রেগে আছে। বাড়তি কথায় আবার ক্ষেপে না যায়। খাওয়ার টেবিলে বাকিটা সময় কোনো এক অদৃশ্য বাধায় আর হাসিঠাট্টা উঠলো না। কেনো যেনো সবারই মনে হলো সে পরিস্থিতি এখন নেই।
—”রিমি, তোমার বাবার নাম্বার টা যে একবার লাগতো। “
আকাশের আচমকা কথায় মুখ তুললো রিমি। সেও সামনাসামনি প্রায়। রাতুল আর প্রিয়ার দিকে একনজর তাকিয়ে বললো,

—”ভাইয়া…”
—”কেনো তাই তো?”
—”না মানে…”
—”রাতুলকে ভালোবাসো তো?”
টেবিলে বসা সকলে এ যাত্রায় নড়েচড়ে উঠলো। টুংটাং চামচের শব্দ বন্ধ হলো। রাকা,তুশি,রাকিব,রেদোয়ান, শিয়া সকলেই হতবুদ্ধি হয়ে তাকালো ওদের দিকে।
—”বাসো কি? রাতুল ভালোবাসে তোমাকে।”
রিমি কিয়ৎক্ষন ইতস্তত করে মিনমিন গলায় বলে,
—”আমাকে বলেছে উনি।”
—”শালা! প্রেম করিস। আমরা জানিনা?”
লাফিয়ে উঠলো রাকিব। আকাশে হাতের ইশারা স্থির হয়ে বসতে বললো ওদের। কাজের কথায় সবসময় লাফালাফি এগুলোর।
রিমির দিকে তাকিয়েই ঠান্ডা সুরে বললো,
—” তোমার কি চাওয়া?”
নত মস্তিষ্ক আরও নত হয় রিমির। প্লেট ভর্তি খাবারে এলোমেলো নাড়াচাড়া করে। বিরবির করে বলে,
—”আমিও চাই। “

মৃদু হাসির রেখা ফুটলো আকাশের মুখে। এখানে আকাশ আর রাতুল ছাড়া উপস্থিত সকলেই হা করে তাকিয়ে আছে। রাতুল আর রিমি! কবে হলো,কখন হলো জানতেই পারলো না কেউ-ই। প্রিয়াও একই পরিমাণ হতভম্ব হয়েছে। তার জানা মনে রিমির এনগেজমেন্ট হয়ে গিয়েছে কয়েকদিন আগে। যদিও হুট করেই। তবুও। কিন্তু রাতুল ভাই! তাকে নিয়ে তো কখনো কিছু বলেনি মেয়েটা।

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৩

—”তোমার বাবার কাছে আমি, অয়ন ভাই নিজে যাবো। ইনফ্যাক্ট আমরা সকলেই যাবো। তোমার টেনশন করার কারণ নেই। যা মানানোর আমি আছি।”
রিমি আলতো মাথা নাড়ায়। রাতুল বন্ধুর দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি দেয়। খেয়াল হয় বাকি সবাই চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে তাকে।

আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৫