আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৬
অরাত্রিকা রহমান
স্তব্ধ ঘরে ঠিক মাঝবরাবর থাকা প্রসস্থ বিছানাটায় মিরা জুলিয়েট কে কোলে নিয়ে বসে আছে। জুলিয়েট ইদানিং মিরার কাছাকাছি থাকতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তার ইচ্ছে হলেই লাফিয়ে মিরার কোলে চোরে বসে থাকে। বোবা প্রাণিটা এভাবেই তার আদরের দাবি জানায় এখন। মিরা প্রোগ্রাম শেষে একটা কুইক শাওয়ার নিয়েছে- যেভাবে নাচানাচি করেছে শাওয়ার না নিলে আর শান্তিতে ঘুমাতে হতো না তার। জুলিয়েট তার কোলে বসার পর থেকে আহ্লাদে জুলিয়েটের ফোলা পেটে হাত বুলিয়ে আদর করে যাচ্ছে মিরা। জুলিয়েট আজ কোনো এক বিশেষ কারণে কথা বলছে না মিরার সাথে। মিরা তার বাচ্চা মেয়েটাকে এতোটা চুপচাপ দেখে নিজে থেকেই বকবক করা শুরু করলো-
“জুলি..কি হয়েছে তোর? রোমিও কি কিছু করেছে? কিছু তে কষ্ট পেয়েছিস? পেটে ব্যাথা হচ্ছে বুঝি?”
মিরার অনবরত প্রশ্নের প্রকোপে পড়ে জুলিয়েট মুখ উঠিয়ে মিরার দিকে চাইলো। দুচোখের রং ভিন্ন হওয়ায় মিরার বরাবরই বুঝতে সমস্যা হতো জুলিয়েটের তাকানোর মানে। কিন্তু আজ সে স্পষ্ট দেখলো বিড়ালটার ছলছল চোখে একরাশ মায়া। কিন্তু নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করার ক্ষমতা ও তো প্রাণী টার নেই। মিরা বুঝলো জুলিয়েট প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকেই কেমন যেন হয়ে গেছে। মিরা জুলিয়েটকে হাতে তুলে নিয়ে বিড়াল টার মাথায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে নিজ থেকে বুঝিয়ে বলল-
“এমন মনমরা হয়ে থাকতে নেই সোনা। বরের উপর এতো রাগ কেন তোর? ছেলেটা তো সাড়া দিন তোর পেছন পেছন ঘুরে। হয়তো এখনো ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। তোকে কতই না ভালোবাসে তবু ওকে সহ্য করতে না পারার কারণ কি?”
জুলিয়েট মিরার কথা কতটুকু বুঝলো কে জানে। সঙ্গে সঙ্গে মুখটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে নিল। মিরা বুঝে নিল জুলিয়েট এই ব্যপারে কিছু শুনতে চায় না। সে পুনরায় জুলিয়েটের ফোলা পেটের উপর হাত বুলাতে বুলাতে একটু দ্বিধান্বিত জিজ্ঞাসা মূলক সুরে বলল-
“জুলি.. আমার পেটটা তোর পেটের মতো বড় হচ্ছে না কেন? তোর পাপা কি তাহলে ঠিক বলে- আমি কি সত্যিই পর্যাপ্ত খাই না? বেবি টা যেন বড়ই হতে চাইছে না।”
-“হৃদপাখি..রোমিও বাইরে দাঁড়িয়ে কেন?”
কোলে অনুতপ্ত মুখো ভাব ভঙ্গি ধরা রোমিওকে নিয়ে রায়ান ঘরে প্রবেশ করলে মিরা চমকিত হয়ে সেদিকে খেয়াল করলো। রায়ানের প্রশ্নের জবাবে কি বলা উচিত না বোঝায় তার সকল উত্তর গলার মাঝেই দোমে গেল। জুলিয়েট এক মূহুর্ত দেরি না করে মিরার কোল থেকে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে ওই ঘর থেকে প্রস্থান করলো। মিরা অবাক চোখে সেই দিকে তাকিয়ে আছে। রায়ান নিজেও বেশ অবাক- আজ তার কাছেও আদর খেতে এলো না বিড়াল টা। জুলিয়েট কে চলে যেতে দেখে রোমিও ও আর সেখানে থাকার ইচ্ছে পোষণ করলো না। সেও রায়ানের কোল থেকে লাফ দিয়ে নেমে ড্যাং ড্যাং করে জুলিয়েটের পিছন পিছন চলে গেল। উক্ত দৃশ্য অবলোকন করে রায়ান মিরা উভয়ই আশ্চর্য। মিরার মুখে চিন্তার ছাপ দেখে রায়ান কথা ঘুরিয়ে বলল-
“দুটো বাচ্চাই ভালো ম্যানারস শিখেছে। আমাদের একা ছেড়ে দিয়ে কি সুন্দর চলে গেল দেখলে?”
মিরা রায়ানের দিকে তাকালো। সে রায়ানের কথায় একমত প্রকাশ করতে পারলো না-
“মোটেও তেমন কিছু না। রোমিও ওকে কিছু করেছে আমি সিওর। জুলি তো এমন করে না কখনো। ইদানিং এমন করছে। রোমিওর থেকে দূরে দূরে থাকে আর রোমিও ওর পিছন পিছন ঘুরে।”
মিরার কথা শুনে রায়ানের মুখ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সামান্য আওয়াজে বিড়বিড় করলো-
“যেমন মা তেমন মেয়ে। বিড়ালের পরিবর্তন চোখে পড়ছে অথচ নিজেরও যে এক অবস্থা তা চোখে পড়ে না। প্রেগন্যান্ট বউ সামলানো কি এতো সোজা! পুরুষ হলে না বুঝতো- কত ধৈর্য লাগে।”
রায়ান দরজা বন্ধ করে সোজা গিয়ে মিরার পাশে বসে মিরার চোখে চোখ রাখলো। মিরাও চোখ বড় বড় করে সেই ধারা অব্যাহত রেখে বলল-
“এভাবে কি দেখছেন?”
রায়ান কিছু না বলে মিরার গুটিয়ে রাখা পায়ের দিকে খেয়াল করে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“পা ব্যাথা করছে?”
মিরা একটু থতমত খেয়ে নিজের পা এপাশ ওপাশ করে উল্টে দেখতে দেখতে বলল-
“না তো..পা ব্যাথা করবে কেন? আমার পায়ে কি লেগেছে?”
রায়ান হাফ ছেঁড়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা
আলমারি দিকে এগিয়ে গেল। আলমারি থেকে রাতে পড়ার জন্য একটা টি-শার্ট ও ট্রাউজার বের করে গলায় টাওয়াল ঝুলিয়ে ওয়াশ রুমের দিকে চলে গেল। মিরা কৌতুহলে বিছানা থেকে নেমে হাঁটাহাঁটি করে আনমনে বলল-
“কি অদ্ভুত! পায়ে তো ব্যাথা করছে না। তাহলে উনি ওমন বললেন কেন?”
১৫ মিনিট পর, ভেজা চুল মুছতে মুছতে রায়ান ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এলো। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে কেবল ডীম লাইট টা জ্বালানো। রায়ান বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখলো মিরা সম্পূর্ণ বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। তথাকথিত ভাবে বললে- বিছানার কোনো এক অংশও অন্য কারো শোয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের ভেজা টাওয়ালটা কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে মিরার দিকে ঝুঁকে মিরার কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তার গায়ে কাঁথা মুড়ে দিল। এরপর নিজের লেপটপ টা নিয়ে ঘরের অন্য কণার সোফায় বসে পড়লো। বিয়ের ঝামেলায় অফিসের কাজ সামলাতে একটু হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। অবসর সময় বলতে কেবল এই রাত টুকুই যখন সে একটু অফিসিয়াল কাজ নিয়ে মাথা ঘামাতে পারে। সোফায় বসে একের পর এক মেইল আর ডকুমেন্টস চেক করতে শুরু করলে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কাজের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিল রায়ান। মিনিট ত্রিশেক পর একটা ছায়া এসে পড়লো তার লেপটপের উপরিভাগে। রায়ান চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো মিরা স্থির দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। মেয়েটার টলমলে চোখে অপরিপক্ক ঘুমের রেশ লেগে আছে এখন। রায়ান হালকা চমকে উঠে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“আর ইউ ওকে হার্ট বার্ড? উঠে গেছো কেন?”
অপর পাশ থেকে আহ্লাদী কাঁদো কাঁদো স্বর ভেসে এলো-
“হাবি..আমার ভীষণ পা ব্যাথা করছে। ঘুমাতে পারছি না।”
এই কথায় রায়ানের ইচ্ছে হলো বলতে-” কেন ব্যাথা করবে? পায়ে কি লেগেছে?” এতো নাচানাচি হৈ হুল্লোড় করার পর পা ব্যাথা ধরা বাধা বিষয়। মূলত রায়ান সে জন্যই তখন জিজ্ঞেস করেছিল মিরাকে তার পা ব্যাথা আছে কিনা। তখন অনুভব না হলেও এখন সেটা মিরার অনুভব হচ্ছে। রায়ান কথা না বাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে উঠে মিরাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল-
“এই জন্য কাঁদতে হয় বোকা মেয়ে? আমার স্ট্রং বউ না তুমি? এদিকে এসো।”
রায়ান মিরাকে একটু সামলে নিয়ে তাকে সোফার একদিকে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে অন্য দিকে রায়ান নিজের বসে মিরার পা দুটো নিজের কোলে তুলে নিয়ে আলতো হাতে টিপে দিতে দিতে বলল-
“ঘুমানোর চেষ্টা করো পাখি। ব্যাথা সেড়ে যাবে। আমি আছি তো।”
মিরা চোখজোড়া বন্ধ করে নিল। রায়ান এক হাত লেপটপে অন্য হাতে মিরার পা টিপছে। কয়েক মিনিট চেষ্টা করেও মিরা ঘুমাতে ব্যর্থ। মিটিমিটি চোখ দুটো খুলে রায়ানের দিকে আড় চোখে তাকালো। ছেলেটা মনোযোগ সহকারে কাজ করছে দেখে মিরার বিরক্ত অনুভব হলো। নিজের পা দুটো হঠাৎ রায়ানের কোল থেকে নামিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আবদারের সুরে বলল-
“কোলে নিন।”
রায়ান একটু অবাক হলেও তর্কে গেল না। মিরা দুই দিকে পা দিয়ে রায়ানের মুখোমুখি হয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে বসলো। রায়ান মিরার এলো মেলো চুল গুলো গুছিয়ে কানের পিছনে গুঁজে দিতে দিতে বলল-
“এভাবে বসলে তো কাজ করতে পারবো না পাখি।”
-“তো কাজ করতে হবে না। বাদ দিন। আমি এভাবেই বসবো।”
রায়ান মিরার মাথা তার কাঁধের উপর নুইয়ে দিয়ে আবার কাজে মনোযোগ দিয়ে বলল-
“এভাবে থাকো তাহলে, কেমন? আমি ম্যানেজ করে নিবো।”
মিরার মোটেও পছন্দ হলো না বিষয়টা। তাকে কোলে বসিয়ে রেখে রায়ান কাজ কিভাবে করতে পারে! এই ব্যাপার টা তার হজম হচ্ছে না। মিরা রায়ানের মাথায় পিছনের একগুচ্ছ ভেজা চুলে নিজের আঙুল গলিয়ে দিয়ে ধীরে আঙুল গুলোকে সঞ্চালন করতে করতে বলল-
“কাজটা কি খুব ইমপোর্টেন্ট?”
-“হুম…!”
-“আমার থেকেও?”
রায়ান এক গাল হেঁসে মিরার পিঠে হাত রেখে মিরার কাঁধে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখলো। সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে দেহটা আরো গুটিয়ে গেল। মিরা নিজের শিরদাঁড়ায় অদ্ভুত শিরশির শিহরণ অনুভব করলো। মিরা মাথা উঠিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রায়ানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-
“এই যে মিস্টার, গোটা সন্ধ্যা ওভাবে হা করে তাকিয়ে থেকে কি ভাবছিলেন শুনি।”
রায়ান একটু অবাক হয়ে মিরার চোখের দিকে তাকালো। হঠাৎ কি মনে করে মিরা তাকে এমন প্রশ্ন করলো কে জানে। তবে সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল-
“তুমি একবার বলেছিলেন না- তোমার জন্য যেন একটা কবিতা লিখে ফেলি? একটা কবিতাই লিখছিলাম। তখনি হঠাৎ করে তুমি হাসলে, আর ছন্দ রা সব এলোমেলো হয়ে গেল।”
মিরা ভ্রু উঁচিয়ে নিল। রায়ানের কথা তার বিশ্বাস হলো না হয়তো-
“তাই নাকি? অসমাপ্ত কবিতা টুকুই শোনান তবে।”
রায়ান গলায় খাঁকাড়ি দিল, যেন আবৃত্তি করার পূর্ণ প্রস্তুতি নিল। অতঃপর সুমিষ্ট কণ্ঠে কবি কবি ভাব নিয়ে বলল-
“কবিতার নাম-আমার হৃদপাখি। লিখেছেন – রিভান চৌধুরী রায়ান।” এককথায় মিরা মুচকি হেঁসে উঠলো।
রায়ানের নিজের আবৃত্তি অব্যহত রাখলো-
“কত সুন্দর তুমি- প্রেমে পড়েছি আমি ।
মায়াবী তোমার আঁখি, দিওনা আমায় ফাঁকি।
অপরূপ তোমার এই হাসি, আর আমি…
আমি তোমাকে ভালোবাসি!”
মিরা রায়ানের এমন ছন্দময় কবিতা শুনে মিষ্টি হেঁসে উঠল। রায়ান মিরার হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে পলকহীন তাকিয়ে থেকে মেয়ে টার গালে আলতো করে চুমু দিয়ে পুনরায় মিরার মাথা নিজের কাঁধে নুইয়ে দিয়ে বলল-
“যা শুনতে চেয়েছ তা শোনা শেষ। এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পড়ো।”
মিরা কিছু টা সময় ওভাবে থাকলো কিন্তু একবার ঘুমের বেঘাত ঘটায় এখন আর তার ঘুম আসছে না। নীরবতার ব্যাপ্তি একটু দীর্ঘ হলে মিরা আর চুপ থাকতে পারলো না।
-“হাবিইই..!”
-“শুসস, বেবি। আই এম চেকিং এ্যান ইমপোর্টেন্ট মেইল। কিপ কুয়াইট ফর সাম টাইম। তোমার আওয়াজ আমাকে ডিস্ট্রিক্ট করছে।”
মিরার এই বাধ্যবাধকতা পছন্দ হলো না। তৎক্ষণাৎ চুপ করে গেল। অভিমানী মন এখন কেউ চাইলেও তাকে কথা বলতে দেবে যদি রায়ান না বলে। মিরা নিস্ক্রিয় অবস্থায় রায়ানের কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে রইল। চোখের পাতা এখনো খোলা। বেশ কিছু টা সময় মিরাকে চুপচাপ দেখে রায়ানের হঠাৎ মনে হলো তার কথা হয়তো তার আহ্লাদী বউয়ের মনে লেগেছে। সে মিরার কানে কানে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“আমার লক্ষ্মী বউ জান..মাথায় কি ঘুরছে তোমার বলো তো?”
মিরা নিজের আহ্লাদী ভাব বাদ দিল। একটু ম্যাচিউর ভঙ্গিতে দ্বিধায় জিজ্ঞেস করলো-
“আচ্ছা, যদি আমি চুপ করে থাকি, তাহলে আপনার ভালো লাগবে?”
রায়ান নিজের ধারণা সঠিক বুঝে গম্ভীর পরিবেশ টা একটু স্বাভাবিক করতে শান্ত গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো-
“ঠিক কখন চুপ থাকার কথা বলছো?”
মিরা প্রশ্নের কারণ না বুঝে-“কখন মানে..!”
রায়ান দুষ্টু ভঙ্গি যে এক গাল বাকা হেঁসে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল-“Sometimes I like it when You are loud..”
-“কিহ্..!” হঠকারিতায় মিরা উল্টো প্রশ্ন করে বসলো। ঠিক পরের মূহুর্তেই রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলে কথাটার মানে মিরার মস্তিষ্কে ধরা পড়লো। সে সজোরে রায়ানের কাঁধে ঘুষি মেরে ছেলেটার চুল ধরে মাথাটা ঘুরিয়ে বলল-
“ইউ আর সাচ আ ব্যাড বয়।”
রায়ান খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে এক হাতে মিরার কোমর এবং অন্য হাতে মিরা হাত ধরে ফেলে একই দুষ্টু ভাব নিয়ে বলল-
“Yes, I am your Bad boy without d and o..”
মিরা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ থেকে মাথায় কিছু অক্ষরের বিয়োজন করে বিয়োগফল বের করলো। সাথে তার ঠোঁটে আবিষ্কৃত হলো একটা সন্তুষ্টির হাসি। দুষ্টু মিষ্টি এই প্রেমান্দোলনে মিরা বরাবর রায়ানের কাছে হাড়ে। এভাবে আরো আধ ঘন্টার বেশি পার হলো। মিরা রায়ানের সাথে অনবরত আলোচনা করে যাচ্ছিল কাল বিয়ের বিষয়ে আর রায়ান নবীদের অফিসিয়াল কাজ আর বউয়ের বকবকানি উভয়ই সামলে নিচ্ছিল। কাজের সমাপ্তি ঘটলে রায়ান লেপটপ টা বন্ধ করে মিরার পিঠে হাত রেখে মেয়েটার গলার ভাঁজে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল। সকল ক্লান্তির সমাপ্তি যেন এই খানেই হয় ছেলেটার। রায়ান ওভাবেই কিছু সময় বসে রইল। পুরুষ মন একটু একটু করে বেসামাল হয়ে পড়ছে। রায়ান একটা শুকনো ঢোক গিলে ফিসফিস করে মিরাকে বলল-
“হৃদপাখি, আমার সুগার ফল করছে। আই নিড মাই ফেবারিট সুইট নাও।”
মিরার কোনো সাড়া শব্দ নেই। রায়ান এবার আবদারের সুরে বলল-
“বেইবি প্লিজ..! তুমি বলেছিলে আজ নিজের কথা রাখবে। আর আজ নিজের দাবি আদায় করার অনুমতি ও কিন্তু আমার আছে। তুমি নিজে সেই অনুমতি দিয়েছো।”
মিরার কোনো প্রতি উত্তর না পেয়ে রায়ান নিজের মুখ উঠিয়ে অধৈর্য হয়ে মিরার দিকে তাকালো। চোখ বন্ধ, ক্লান্তি ভরা মুখ টা একদম নিস্তেজ। মিরার ঘুমে আচ্ছন্ন মুখটা রায়ানের চোখের অশান্ত ভাব কমিয়ে দিল। রায়ান স্বল্প আওয়াজ দিলো-
“মিরা..মিরা…হৃদপাখি..!”
মেয়েটার কোনো হেলদোল নেই। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে ওভাবেই কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ধীর পায়ে হেঁটে বিছানায় নিয়ে গিয়ে সাবধানে মিরাকে নিজের বুকে জড়িয়ে শুইয়ে মেয়েটা কপালে আদরের পরশ এঁকে দিয়ে আনমনে বলল-
“My tired headache… Sleep well..”
রাত-২টা~
-“হ্যালো কে..?”
-“হ্যালো, জুঁই…কিরে তুই কি ঘুমাচ্ছিস?”
জুঁই সোরায়ার এমন প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে বলল-
“তুই আমাকে রাত দুইটায় ফোন দিয়েছিস আমি ঘুমাচ্ছি কিনা জিজ্ঞেস করতে? তোর ঘুমের সময় হয় নি? তোর না কাল বিয়ে গাঁধী।”
সোরায়া নিজের ঘরের এক কোণায় থাকা সুসজ্জিত দোলনায় বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল-
“আরে কাল বিয়ে বলেই তো ঘুম আসছে না। জানিস একটু আগে রিলস স্ক্রল করতে করতে দেখলাম এক মেয়ে এক গ্রুপে পোস্ট করেছে ১৮ বছর বয়সে হাসবেন্ডের ব্যাড টাচের শিকার হয়েছে সে।”
-“তো…!”
-“দোস্ত বিয়ের পর যদি আমায় বরের নজর খারাপ হয়? তখন আমার কি হবে?”
জুঁই বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে সোরায়ার উদ্দেশ্যে দাঁত কটমট করতে করতে বলল-
“আগে নিজের নজর ঠিক কর তুই।”
সোরায়া ফোনের স্ক্রিনে বাঁকা চোখে তাকালো। কিন্তু জুঁইয়ের কথায় সে নিজেও কোনো এক পর্যায়ে এক মত যত যাই হোক-উপন্যাস প্রেমি বলে কথা। সোরায়া সে কথা পিছনে ফেলে জুঁইকে জিজ্ঞেস করলো-
“সকালে গায়ে হলুদ আমার। তুই না এসে পৌঁছালে আমি গায়ে হলুদ মাখবো না। তুই কাল কখন আসবি বলতো।”
-“ট্রেনেই আছি। সকাল সকালই পৌঁছে যাবো চিন্তা করিস না। তোর বিয়ে আর জুঁই আসবে না এটা হতেই পারে না তাছাড়াও মাহির স্যারকে জিজু বলে খেপানোও বাকি।”
সোরায়া জুঁইয়ের কথায় মজা পেয়ে শব্দ করে হাসলো। অপর পাশ থেকে জুঁই কৌতুহলী হয়ে সোরায়া কে জিজ্ঞেস করলো-
“সোরা..কাল যে তোর বিয়ে..কবুল বলার প্রেক্টিস করেছিস? কিভাবে কবুল বলবি।”
-“আরে ধুরু, এসব নেকামি কে করে ভাই। কবুল বলতে বলবে যখন বলে দিবো। প্রেক্টিস করার কি আছে। আচ্ছা শোন খুব ঘুম পাইছে আমি ঘুমাই কেমন? কার সকালে উঠতে হবে আবার। টাটা। তুই তাড়াতাড়ি চলে আসিস।”
জুঁই ঠিক বুঝলো না হঠাৎ সোরায়ার চোখে ঘুম জুড়ে আসার কারণ। তবে তারও খুব ঘুম পাচ্ছিল তাই আর কথা বাড়ালো না-
“আচ্ছা দোস্ত, তুই ঘুমা। কাল দেখা হচ্ছে।”
সোরায়া হঠাৎ পা দোলানো থামিয়ে দিয়ে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে লাফ দিয়ে দোলনা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আনমনে বিড়বিড় করলো-
“আল্লাহ, এতো বড় বিষয়টা কিভাবে মিস করে গেলাম। কথায় আছে, প্রেক্টিস মেকস আ ম্যান পারফেক্ট। জীবনের প্রথম আর একমাত্র বিয়ে আমার কবুল বলার পারফেক্ট হওয়া চাই। আই সুড প্রেক্টিস।”
সোরায়া দৌড়ে আলমারি থেকে নিজের একটা লাল ওড়না বের করে নিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আয়নার দিকে চোখ রেখে মাথায় ওড়না দিয়েই বলে উঠলো- “কবুল..!”
বলেই একটা মৃদু চিৎকার দিয়ে ওড়না দ্বারা নিজের মুখটা লজ্জায় ঢেকে নিল দুই হাতে। পুনরায় আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলতে গেল-“আলহামদুলিল্লাহ , ক..! এ্যাঁ, ছেলেদের কণ্ঠ মনে হচ্ছে কেন?”
একটু কাশি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে গলার স্বর একটু নরম করে বলার চেষ্টা করলো এবার-“আলহামদুলিল্লাহ, কবুল..! আরে ধুর, এতো অভিনয় করবো কেন আমি।” নিজের আচরণে মেয়েটা বড্ড অসন্তুষ্ট হলো। সে আনমনে ভাবলো-” আচ্ছা আমি যদি কবুল না বলি তাহলে? শুধু মাথা উপর নিচ করলে হবে না?” পরবর্তীতে আবার নিজেই নিজের যুক্তি খন্ডন করলো- “অবশ্যই না, কেন? আমি কি বোবা নাকি?”
-“আবার ট্রায় করি। স্যারের দিকে লাজুক তাকিয়ে বলবো- আলহামদুলিল্লাহ কবুল। ওকে ওকে ডান। প্রথমে নিচের দেখবো (সে নিচু করলো নজর) পরে উনার দিকে তাকাবো (আয়নার দিকে তাকালো) আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো-“ছিঃ ছিঃ। এতো ড্যাস্পারেট! না না এতো ড্যাস্পারেট লাগতে দিলে চলবে না। আবার আবার হয়নি এটা।”
সোরায়া এবার ভালো করে মাথায় কাপড় দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন শান্ত করলো। একবার নিচু মুখটার উঁচু করে আয়নায় তাকালো আবার মাথাটা নিচু করে নিয়ে মৃদু ভাবে সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে বলল- আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
বলার পর সাথে সাথে নিজের মুখ দুই হাত দিয়ে ঢেকে নিলো লজ্জায়-“আয় হায়য়য়..কি লজ্জা কি লজ্জা!”
মজার ছলে আরেকবার সে এভাবে বলার চেষ্টা করলো। লজ্জার রেশ একটুও কমলো না। আরেকবার বলতে যাবে তখনি সোরায়ার মাথায় অন্য চিন্তা ভর করলো-
“হায় আল্লাহ, তিন বার কবুল বলে ফেলছিলাম। এই ঘরে কোনো জ্বীন থাকলে তার সাথে আমার বিয়ে হয়ে যাবে না তো? উপন্যাসে তো জ্বীন আরা মানুষের ও বিয়ে হয়। আস্তাগফিরুল্লাহ। আমি ঘুমাই যাইগা।”
সোরায়া আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে ওড়না টা ছুড়ে ফেলে বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে শুয়ে পড়লো। আর এই এক ঘুমে তার সকাল।
সকাল-৭টা~
সকালের নরম আলোটা এখন পুরো উঠান জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। নাতিশীতোষ্ণ বাতাসে কাঁচা হলুদ বাটা আর গাঁদা ফুলের মিষ্টি গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত উৎসবের আবেশ তৈরি করেছে। বড় খোলা উঠানটার এক পাশে বাঁশের মাচায় হলুদ আর সবুজ কাপড় ঝোলানো, মাঝখানে গোল করে পাটি বিছানো— সেখানেই একটু পর বসবে দিনের সবচেয়ে আদরের মানুষটা। বাড়ির মেয়ে বউরা যেন আজ সূর্যের আগেই জেগে উঠেছে। খোলা উঠোনে মিরা কাঁচা হলুদ বাটছে, আর রিমি ঠিক তার পাশে বসেই ফুল গেঁথে মালা বানাচ্ছে, গ্রামীণ নিয়মে হলুদ বাটার সময় কোনো প্রকার কথা বলার নিয়ম নেই বলে রিমি মিরাকে জ্বালাতে ইচ্ছে মতো বকবক করছে। মিরা চেয়েও কোনো কিছুর প্রতি উত্তর করতে পারছে না। রিমির ফুলের মালা গাঁথা শেষ হলে সোরায়ার জন্য কাঁচা ফুলের গহনা বানাবে ভেবে রেখেছে। মিরার বোবা অবস্থা দেখে রোকেয়া বেগম উঠান ঝাড়ু দিতে দিতেই হেসে উঠছেন। রামিলা চৌধুরী সবার জন্য নাস্তা তৈরি যে ব্যস্ত। আশে পাশের চুড়ির টুংটাং শব্দ, স্টিলের থালা রাখার ঠকঠক আওয়াজ, আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসা গানের দুই লাইন— সব মিলিয়ে সকালটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট কাজ নিয়েও কতো ব্যস্ততা মেয়েদের। অথচ বাড়ির ছেলেদের এখনো কোনো হদিস নেই। কেউ হয়তো এখনো কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে, কেউ বিছানায় শুয়েই ফোন স্ক্রল করছে। মিরা অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সম্পুর্ন হলুদ বেটে শেষ করে উঠে কোমর টানা দিয়ে বলল-
“ওহ আল্লাহ, চুপচাপ থাকা এতো কষ্টের আজ বুঝলাম। আমি আর কখনো কারো বিয়ের হলুদ বাটবো না। কি অদ্ভুত নিয়ম রে বাবা।”
রোকেয়া বেগম হেঁসে বললেন-“বাড়ির ভেতরে যা তো। সোরা কে ডাক গিয়ে। দেখে মনে হচ্ছে যার বিয়ে তার হুস নেই পাড়াপড়শির ঘুম নেই। কনে এতো দেরি করে ঘুম থেকে উঠে কখনো?”
রিমি মজার ছলে বলল- “যার বর বিয়ের আগে থেকেই বউকে বাচ্চা বাচ্চা ডাকে ওই কনের দেরি করে ঘুম থেকে উঠা মানা যায় খালামণি।”
হঠাৎ করেই মিরার ফোন বেজে উঠলো। মিরা নিচু হয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিল।
-“কে ফোন করেছে মিরু?”
-“যার কথা বললি সে।”
-“মাহির ভাই?”
-“হ্যাঁ.. দাঁড়া রিসিভ করে কথা বলি আগে।”
মিরা ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে মশকরা করে বলল-
“আসসালামুয়ালাইকুম জামাই রাজা। কি অবস্থা আপনার?”
অপর পাশ থেকে ব্যস্ত কণ্ঠ শোনা গেল-
“ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাবি, না সরি আপু। ধুর কি ডাকবো কনফিউজড হয়ে যাই।”
-“আরে একটা ডাকলেই হলো। এতো ব্যস্ত হওয়ার কি আছে।”
মাহির একই তাড়াহুড়োতে বলল-“ভাবি প্লিজ আপনার গুনোধর হাসবেন্ড কে বলুন আমার কল ধরতে। আজকে ওর আর রুদ্রর সম্পূর্ণ দিন বর পক্ষের হয়ে থাকার কথা। মারা দুটোকে কখন থেকে কল দিচ্ছি দুটোর একটাও তুলছে না। এইদিকে ঢাকা থেকে সবাই রিসোর্টে এসে উঠেছে। গায়ে হলুদের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। ওরা কখন আসবে?”
মিরা এক নজর রিমির দিকে তাকালো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহির কে ভরসা দিয়ে বলল-
“আহা, মাহির ভাই, এতো টেনশন নিচ্ছেন কেন? আচ্ছা আপনি রাখুন আমি গিয়ে ডাকছি ওনাকে।”
-“জি আচ্ছা ভাবি।”
মিরা ফোনটা রাখতে যাবে তখনি মাহির আমতা আমতা করে আরো কিছু বলতে চাইলো-“ভাবি ভাবি, ওয়েট।”
মিরা ফোনটা আবার কানে ধরলো-“জি মাহির ভাই, বলুন।”
মাহির গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আমার বউ টা কি করছে?”
মিরা মাহিরের কথায় না হেঁসে পারলো না। সে মাহিরকে একটু জ্বালাতে তুচ্ছার্থে বলল-
“আপনার বউয়ের তো কোনো হেলদোলই দেখা যাচ্ছে না মাহির ভাই। দুঃখের কথা কি বলবো বলুন তো বোনটা তো আমারই। এখনো ঘুম থেকেই ওঠে নি সে। যাই হোক এখন আপনার হয়ে যাচ্ছে। ওর ঘুমটা আপনি সামলে নিয়েন কেমন? আমি রাখি এবার।”
মিরা মাহির কে আর কিছু বলতে না দিয়ে ঠাস করে কলটা কেটে দিল। এদিকে মাহিরের উচ্ছ্বসিত মুখটা কেমন চুপসে গেলো তার বউ এখনো ঘুমোচ্ছে শুনে।
মিরা হাঁসি মুখে ঘরের দিকে যেতে নিলে রিমি কৌতুহলে প্রশ্ন করলো-“কি রে কি বললো মাহির ভাই?”
মিরা পিছন ফিরে-“তোর আর আমার বর কে আজকের জন্য ধার চাইছে। ভাবছি দিয়ে দিবো। একদিনের ব্যাপার। একদিনের জন্য সিঙ্গেলস হয়ে বায়াই দের সাথে মজা নিলে মন্দ হবে না। কি বলিস?”
রিমি বেশ খুশি মনে বলল-“এটা আবার জিজ্ঞেস করা লাগে? দিয়ে দে দিয়ে দে। আজকে আর আমাদের ভর লাগবে না।”
মিরা পা নাচিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
-“একটু ঘুমাতে দেখলেই হওয়া। আল্লাহ আমার বউটা এমন কেন? কি এমন চাই আমি? ঘুম থেকে উঠে বউটা কে নিজের সাথে লেপ্টে থাকতে দেখবো এইটুকু চাওয়া কি আমার অন্যায়?”
-“রায়ান…হাবিইই…! উঠুন..!”
নিজে নিজে খিটখিটে মেজাজে বিড়বিড় করছিল রায়ান। আর তখনই তার খিটখিটে মেজাজের উৎস তার কাছে হাজির হলো তার নামের বিলাপ পারতে পারতে। মিরার উপস্থিতি অনুভব হতেই রায়ান গম্ভীর মুখ ধারণ করে নিল। মিরা নাচতে নাচতে ঘরে প্রবেশ করে বিছানার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে একনাগাড়ে বলা শুরু করলো-
“মাহির ভাই কল দিয়েছিল। আপনাকে আর রুদ্র ভাইয়াকে জলদি যেতে বলেছে। বর যাত্রী আপনাদের অপেক্ষায়। মাহির ভাই অনুরোধ করলো আপনাকে যেন আজকের জন্য বর পক্ষকে দিয়ে দেই। সো মিস্টার হাবি..আজকের জন্য আপনি মুক্ত। সাথে আমিও।”
বাকি সব কথার ভীরে রায়ানের মনোযোগ থমকালো “মুক্ত” শব্দটায়। রায়ান ধৈর্য ধরতে নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে বাঁকা হাসলো। সে বিছানা থেকে উঠে মিরার সামনে বুকে হাত বেঁধে বলল-
“কি বললে? আরেকবার বলো..।”
মিরা রায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু পিছিয়ে গেল। একটু শ্বাস নিয়ে বলল-
“ওওই মাহির ভাই…!”
-“রিপিট দ্যা লাস্ট লাইন বেইবি..! আজকে তুমি কি? মুক্ত.. রাইট? এটাই তো বললে?”
মিরা নিজের কথার ভুল বুঝতে পারলো। রায়ান মিরার দিকে এক পা এগিয়ে গেলে মিরা এক পা পিছিয়ে গেল। মিরার গলায় সব জবাব জড়িয়ে গেল। আমতা আমতা করে তবু নিজের কথা বোঝানোর চেষ্টা করলো-
“আআ..আমি তা বলি নি।”
রায়ান শান্ত হেঁসে মিরার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল-
“তুমি যা বলতে চাইছো তাই বলো শুনি।”
মিরা নিজের চোখের পাতা নিচু করে নিয়ে বলল-
“আপনি আজকে বর পক্ষ আমি কনে পক্ষ তাই আর কি মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে।”
রায়ান মিরার থুতনি ধরে মুখটা নিজের দিকে উঁচু করে দৃঢ় প্রত্যয়ে বলল-
“আমরা যে পক্ষেরই হই না কেন পাখি, ইউ আর মাইন। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
মিরা ঢোক গিলে মাথা হ্যা সূচক নেড়ে রায়ানের কোমর জড়িয়ে তার প্রসস্থ বুকের মাথা রেখে বলল-
“সামান্য স্লিপ অফ টাং, এমন করতে হবে তাই? ভয় লাগছে আমার।”
রায়ান মিরার ভীতু মুখটা দেখে মনে মনে নিজেকে বলল-
“ভীতু বউই বেশি কিউট লাগে। এখন থেকে আহ্লাদী পনা কমিয়ে দিতে হবে যা বোঝা যাচ্ছে। নয় তো এই বউ কে সামলানো যাবে না। কি সাহস! বলে কিনা আজ সে মুক্ত..!”
ঠিক পরেই মিরা রায়ানের থেকে দূরে সরে আলমারির সামনে গিয়ে গায়ে হলুদে কি পড়বে তা চিন্তা করতে করতে আলমারি থেকে দুটো হলুদ রংয়ের শাড়ি বের করে রায়ানকে
জিজ্ঞেস করলো-
“কোনটা পড়বো?”
রায়ান দুটো শাড়ির একটার দিকেও তাকালো না। সোজা মিরার দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল-
“কাল যেটা কিনে দিয়েছিলাম সেটা পড়ো।”
মিরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল- “কাল আবার কি কিনে দিয়েছেন?”
রায়ান দুষ্টু হেঁসে বলল- “কিছু না..!”
মিরা রায়ানের ইঙ্গিত বুঝে পায়ে স্লিপার খুলে হাতে নিয়ে রায়ানের দিকে ছুড়ে মারলো রায়ান অন্য দিকে সরে গিয়ে সেটা ডজ করলো। মিরা নিজের হাতে যেকোনো একটা শাড়ি রেখে অন্যটা আলমারি ভেতর থেকে দিয়ে রাগী গলায় বলল-
“আমি শাওয়ার নিতে যাচ্ছি।”
রায়ান মাথায় হাত রেখে মিনমিনে জিজ্ঞেস করলো-
“এটা ইনফরমেশন না ইনভিটেশন বললে ভালো হতো।”
মিরা নিজের আরেক পায়ের স্লিপার খুলে রায়ানের দিকে ছুড়ে মেরে বলল-
“বুঝে নিন এবার ইনফরমেশন না ইনভিটেশন ছিল।”
রায়ান এবারও অন্যদিকে সরে গিয়ে জুতো ডোজ করলো। মিরা রাগে খটমট করে ওয়াশ রুমে ঢুকে গেল। রায়ান ফেলে মাহির কে কল দিল কথা বলতে। সাথে রুদ্র কে ডাকতে গেল।
গায়ে হলুদের আয়োজন প্রায় শেষ। সবাই রেডি হয়ে নিচে নেমে গেছে। রুদ্র আর রায়ান ও রেডি বর পক্ষের সাথে যুক্ত হতে। রিমি মিরা দুজনেই রেডি হয়ে রান্না ঘরে গেলে রামিলা চৌধুরী তাদের খেয়ে নিতে বলেন। মিরার খাওয়া শেষ হলে রোকেয়া বেগম মিরাকে উদ্দেশ্যে করে বললেন-
“মিরা..তুই একটু সোরাকে গিয়ে খাইয়ে দে তো। এখন না খেলে আবার সেই কখন খাবে তার ঠিক নেই। এরপর আর সময় হবে না। সাজ গোজের ব্যাপার আছে।”
মিরা সোরায়ার জন্য খাবার নিয়ে ড্রয়িং রুমে যেতেই দেখলো সোফায় রায়ান তার লেপটপ নিয়ে বোসের আছে আর সোরায়া তার পাশেই বসে আছে। মিরা সেদিকে এগিয়ে গিয়ে রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-
“নাস্তা করেছেন?”
রায়ান লেপটপে নজর রেখে বলল- “না, পড়ে খাব। একটা ফাইল দেখছি।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় বসলো। যেহেতু সোরায়া কে খাইয়ে দিচ্ছেই ভাবলো রায়ানকেও খাইয়ে দেবে। রুটির এক টুকরো নিয়ে রায়ানের মুখের সামনে ধরে বলল-
“পরে খেতে হবে না। এখন ফাইল দেখতে দেখতে খেয়ে নিন।”
রায়ান মুখ সরিয়ে নিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল-“মিরা প্লিজ, বললাম তো পরে খেয়ে নিবো আমি।”
মিরা আর জোর করলো না। খাবারটা রায়ানের পাশে বসে থাকা সোরায়ার দিকে এগিয়ে ধরে বলল-
“বনু তুই খা তো। যার যখন খিদে পাবে খেয়ে কূল পাবে না। আমি শুধু শুধু চিন্তা করছি।”
সোরায়া হা করে খেতে এগোতে যাবে তখনি রায়ান তার খাবার সোরায়ার দিকে যেতে দেখায় ছো মেরে মিরার হাত ধরে খাবার টা নিজের মুখে নিয়ে নিলো। মিরা আর সোরায়াদুজনেই অবাক হয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। রায়ান খাবার চিবোতে চিবোতে মিরাকে বলল-
“খিদে পেয়েছে। পরে সময় হবে না। খাইয়ে দাও।”
সোরায়া অভিমানী গলায় বলল-
“কিন্তু এটা তো আমার জন্য এনেছে আপু। তুমি রান্নাঘরে গিয়ে খাও।”
রায়ান সোরায়ার মাথায় গাট্টা মেরে বলল-
“বন্ধুর বউ বলে কিছু বলছি না। সম্পর্ক আর আগের মতো নেই। বোন প্লাস শালি থেকে এখন আমার ভাবিও হয়ে গেলি। মানে কি এক জ্বালায় আছি। চুপ চাপ রান্নাঘরে গিয়ে খেয়ে আয়। আমার বউএখন আমাকে খাওয়াবে।”
সোরায়া মাথায় হাত ডলতে ডলতে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল-
“যত্তসব নাটক। স্যার আসুক, তোমার নামে বিচার যদি না দিয়েছি। বলবো তুমি আমাকে খেতে দাও নি আমার আপুর হাতে তাও বিয়ের দিনে আবার মেরেছোও।”
রায়ান মুখের খাবার টুকু গিলে বলল-
“আরে যা যা, তোর স্যার ও আমাকে ভয় পায়। আমি ওর প্রিন্সিপাল। গিয়ে পেট ভরে খেয়ে আয় যা।”
সোরায়া চলে গেলে রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে হা করে বলল-
“খিদে পেয়েছে বললাম তো। খাওয়াচ্ছো না কেন?”
মিরা কিছু বলার চেষ্টা ও করলো না। কেমন নিজের চোখ উল্টিয়ে ঘুরিয়ে নিলো। রায়ান দুষ্টু হেঁসে মিরার চোখে চোখ রেখে বলল-
“I can give you a good reason to roll your eyes for me baby.. want me to?”
মিরা সঙ্গে সঙ্গে মাথা ডানবামে নাড়ে অসম্মতি জানালে রায়ান হা করে বলল-“এখন এমন কিছু না চাইলে চুপচাপ খাওয়াও।”
মিরা বাধ্য বউয়ের মতো দায়িত্ব নিয়ে রায়ান কে খাইয়ে দিলো।
গায়ে হলুদের আগেই জুঁই এসে পৌঁছালো রহমান বাড়ির উঠোনে। সোরায়া তার প্রিয় বান্ধবী কে দেখে দৌড়ে তার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। বাড়ির সবার সাথে পরিচয় আলাপ শেষ হলে তারা সবাই গায়ে হালুদের অনুষ্ঠান শুরু করার তোরজোর শুরু করলো। রায়ান রুদ্র মিলে রওনা দিল মাহিরদের রিসোর্টের উদ্দেশ্যে। তারা একেবারে বর যাত্রীর সাথে বিয়ের আসরে আসবে।
সোরায়া কে রেডি করিয়ে উঠোনের মাঝবরাবর বসানো হলো। সবাই তাকে ঘেরাও করে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁচা ফুলের গহনায় সুসজ্জিত নতুন বউয়ের চেহারার চমক সবার চোখে লাগার মতো। মিরা নিজের চোখের গেল কণা হতে কাজলের একটা ক্ষুদ্র অংশ সোরায়ার কানের পিছনে লাগিয়ে দিয়ে সবার নজর থেকে তার সন্তান সুলভ ছোট্ট বোনটার কল্যাণ কামনা করলো। জুঁই সোরায়া কে দেখে বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল-
“সোরা রে, তোকে কি সুন্দর লাগছে রে। মাশাআল্লাহ। পুরো একটা হলুদ পরী।”
মিরা হেঁসে বলল-“সময় আসুক, তোমাকেও এমন হলুদ পরী সাজাবো।”
সবাই হেঁসে জুঁইকে খেপানোর বৃথা চেষ্টায় ব্যর্থ। জুঁই হতাশাগ্রস্থ কণ্ঠে বলল-
“আর বলো না আপু, আমার হাতের সবার বিয়ে হয়ে বাচ্চা হয়ে যাচ্ছে। আর আমি এখনো পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছি।”
সোরায়া জুঁইয়ের কুঁচি টেনে বলল- “সবার সামনে আমার মান সম্মানন খাইছ না প্লিজ। বিয়ের শখ একটু লুকিয়ে রাখ।”
আচ্ছা অনেক হয়েছে এবার শুরু করো তবে। জুঁই সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল- “মেহেদী যে আমি আস্তে পারি নি তাই বলে কি আজকের আনন্দ মিস যাবে? গান কই আমি কি নাচবো না?”
রিমি জুঁইয়ের কথায় তাল দিয়ে বলল- “অবশ্যই, শুধু তুমি কেন সবাই নাচবে।”
অতঃপর হাসি মজার মধ্যেই গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হলো। গান বাজলো সজোরে জুঁই সোরায়াকে ঘিরে মিরা আর রিমি কে সহ নাচতে লাগলো-
“দুরু দুরু বুক কাপে কেন আজ ভয়ে লাজে মরি।
জাদুর এই কাঠি ছুঁইয়ে দিল যেন এক পরী..
নিজেরই কাছে নিজে আজই তাই অচেনা যে আমি,
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৫
যেন বদলে গেলাম এক পলকে..
এলো যে এলো খুশির লগন ,
এলো যে এলো খুশির লগন
আসবে সে তাই লাজে রাঙা মন,
আসবে সে তাই লাজে রাঙা মন,
মেতেছে আনন্দে আজ প্রাণ যে..”
