Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫০

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫০

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫০
অরাত্রিকা রহমান

মিরায়া নিশ্চিত হলো তার ঠোঁটে এই মুহূর্তে যার রাজত্ব সে তার স্বামী। মিরায়ার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু কণা চোখের পলক ফেলার সাথে সাথে গড়িয়ে পড়লো চোখের কার্নিশ বেয়ে।
রায়ান মিরায়ার ঠোঁটের মিষ্টত্ব শুষে নিতে নিতে হাঁটুর উপর ভর দিয়ে বসা অবস্থা থেকে উঠে মিরায়াকে ঠেলে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সেও বিছানায় উঠে গেল মিরায়ার উপর। মিরায়া কিছু বলার, করার বা বোঝার সুযোগই পাচ্ছে না, অজানা ভয়ে রায়ানের শার্টের কলার দুই হাতে খামচে ধরলো, হয়তো ভাবছে এটাও তার কল্পনা যদি এখন আগলে না রাখে রায়ান আবার হারিয়ে যাবে। মিরায়া কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া করছে না, তার ঠোঁটের কোনো গতিবেগ নেই তবে তাতে রায়ানের কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সে নিজের মতো করেই চুমু খেয়ে যাচ্ছে একবার উপরের ঠোঁটে একবার নিচের ঠোঁটে আঁকড়ে ধরছে।

সময় যত গড়াচ্ছে রায়ানের সংযম তত ক্ষুণ্ন হচ্ছে। রায়ান ঠোঁট ছেঁড়ে মিরায়ার গলায় মুখ ডুবিয়ে ছোট ছোট চুমু দিয়ে সম্পূর্ণ কন্ঠদেশ ভিজিয়ে দিতে থাকলো। রায়ান আর না পারতে মিরায়ার কানের কাছে গিয়ে অশান্ত মায়াবী কন্ঠে আবদারে সুরে জিজ্ঞেস করলো-
“পাখি এই মুহূর্তে যদি তোমাকে একটু গভীর ভাবে ছুঁই তোমার
কি কষ্ট হবে?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মিরায়া কানে রায়ানের কন্ঠ যেতেই তার সমস্ত শরীরে বিদ্যুত প্রবাহের ন্যায় শিহরণ খেলে গেল। লজ্জায় মেয়েটা কুঁকড়ে যাচ্ছে তবে চোখ খোলার সাহস করলো না। রায়ান মিরায়ার মায়াবী মুখের দিয়ে তাকালো একবার, মুখটা শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে, গাঁয়ে জ্বর আছে ভালোই, সদ্য চুমু খাওয়া গোলাপি ঠোঁট গুলো ফুলে গেছে কিছু টা, হালকা কাঁপছে। রায়ান মিরায়ার কপালে এসে থাকা চুল গুলো সরিয়ে আদর করে একটা চুমু এঁকে দিলো। ঠিক পর মুহূর্তেই আবারো ঠোঁটের দিকে অগ্রসর হতেই রায়ানের চোখ পড়লো মিরায়ার পরিহিত গাউনের দিকে। বউয়ের অন্য কারো জন্য করা সাজসজ্জা রায়ানের মেজাজ বিগড়ে দিলো। চোখ দুটো সাথে সাথে লাল হয়ে উঠলো রায়ানের। রায়ান মিরায়ার উদ্দেশ্যে গম্ভীরভাবে বলল-
“হৃদপাখি, অন্যের জন্য তোর এমন সাজসজ্জা আমার চোখ
ঝলসে দিচ্ছে। it’s not fair, right? Let me ruin it for you, okay? Take this fu**cking dress off.”

মিরায়া চোখ খুলে মিটিমিটি রায়ানকে দেখলো একবার- রায়ানের চোখে হিংস্রতা স্পষ্ট পরিলক্ষিত। মিরায়া ভয়ে পেয়ে রায়ানের থেকে প্রথমবারের মতো ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করতেই রায়ান মিরায়াকে আটকে ধরলো। মিরায়ার চোখ বড় বড় করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল-
“ছা..ছাড়ুন আমাকে। ছোবেন না আপনি। leave.. খাস… ছাড়ুন।”
রায়ানের কানে মিরায়ার কোনো কথা গেলো না, সে মিরায়ার চোয়াল চেপে ধরে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“এই ড্রেস পড়ার সাহস কিভাবে হলো তোর? কার জন্য সেজেছিস? অন্যের বউ হওয়ার খুব শখ জেগেছে? আমি কি মরে গেছি? ওই কথা বল, আমার জন্য অপেক্ষা করলি না কেন? তুই বলেছিলি আমার জন্য অপেক্ষা করবি তুই। এই তোর অপেক্ষার নমুনা?”

মিরায়া একটু আগের কমল আদুরে গলায় কথা বলা মানুষ টার আর এখনকার রায়ানের মধ্যে মিল পাচ্ছে না। কিন্তু রায়ানের কথায় তার পুরোনো ঘা তে লবণ পড়লো। মিরায়া নিজের শক্তি প্রয়োগ করলো রায়ানকে সরাতে কিন্তু পুরুষালি শক্তির সামনে তার শক্তি খাটানো নিতান্তই পিঁপড়ার শক্তির সমতুল্য। রায়ান মিরায়ার দুই হাত একসাথে তার একহাতের মধ্যে নিয়ে উপরে চেপে ধরে মিরায়ার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবালো আবার মিরায়া অবাক হলো রায়ানের কাজে। অনেক চেষ্টা করেও ঠোঁট বা হাত কিছু রায়ানের আয়ত্ত থেকে ছাড়াতে পাড়ছে না। ঘরে শুধু মিরায়ার বাকহীন শব্দ-“উউউমমম.. উউউমম..!”
আওয়াজ বিরাজমান।

বারান্দায়~
এইদিকে সোরায়া মাহিরের বুকে বলা চলে লেপ্টে আছে। মাহির দাঁতে দাঁত চেপে সোরায়া কে ধরে আছে। ভিতরের আবহাওয়ার আন্দাজ করতে পারছিল দুইজনেই। তবে অনুভূতি দুজনের দুই রকম- সোরায়া একদিকে ভয়ে ও লজ্জায় মাহিরের সাথে লেগে আছে আর মাহির নিজেকে সামলাতে ভেতর ভেতর যুদ্ধ করছে। শরীর বাঁধ মানছে না আর মন সায় দিচ্ছে না কিছু করার জন্য। ঘরের ভিতরের আবহাওয়ায় বারান্দার আবহাওয়া প্রভাবিত হতে দেরি হবে না আর কিছু সময় এভাবে নীরবতা থাকলে। মাহির নিজের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল তাই আর চুপ না থেকে সোরায়ার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলো।

মাহির হালকা কেশে জিজ্ঞেস করলো-“সোরায়া.. কিছু ফিল করতে পারছো!?”
সোরায়া মাহিরের বুকে মাথা রেখেই মাথা উপর নিচ ঝাঁকিয়ে বলল-“হুম, পারছি তো।”
মাহির একটু গভীর নিশ্বাস নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো সোরায়া কে-“কি ফিল করতে পারছো?”
সোরায়া একটু কাঁদো কাঁদো মুখ করে জবাব দিলো-“আপুর অনেক কষ্ট হচ্ছে।”
সোরায়ার জবাবে মাহির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-“কিহ!কার কি হচ্ছে?”
সোরায়া এবার বিরক্ত হলো মাহিরের বারবার প্রশ্ন করাতে। সে মাহিরের থেকে হঠাৎ দূরে সরে এসে চোখ ছোট ছোট করে বলল-

“বুঝতে পারছেন না কি হচ্ছে? আমার আপুর কষ্ট হচ্ছে। শুনতে পাচ্ছেন না কিছু? কেমন শব্দ আসছে ঘর থেকে!”
মাহির বুঝলো না সে কিভাবে রিয়েক্ট করবে এখন। সে তো প্রশ্ন করেছিল মাহিরের জন্য কিছু ফিল হচ্ছে কিনা তা জানতে আর সোরায়া ঘরে কি হচ্ছে তা নিয়ে বলছে। তার মানে এতোটা সময় যখন মাহির নিজেকে কন্ট্রোল করছিল সোরায়া তার কাছে ছিল বলে ওই সম্পূর্ণ সময়টাই সোরায়া ঘরে কি হচ্ছে সেই দিনে মনযোগ দিয়ে রেখেছিল। মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ওই মেয়ে তোমার কি ফিলিংস নেই? একটা যুবক ছেলের বুকে এমন পরিবেশে এতোক্ষণ লেপ্টে থাকার পর বলছো তোমার আপুর কষ্ট হচ্ছে। আরে তাহলে আমার কি হচ্ছে ধারণা আছে তোমার?”
সোরায়া হা হয়ে তাকিয়ে আছে মাহিরের দিকে, তার মাথায় কিছু ঢুকলো না। সোরায়া সত্যি মিরায়ার কথাই ভাবছিল, মাহিরের কাছাকাছি থাকার বিষয়টা তার মাথাতেও আসেনি তখন। মাহিরের উদ্ভট কথায় সোরায়া খেপে গিয়ে প্রশ্ন করলো-

“কি..! কি হচ্ছে আপনার? কি ধারণা করবো?”
মাহির হঠাৎ সোরায়ার হাত ধরে টেনে কাছে নিয়ে এসে তাকে ঘুরিয়ে নিজের বুকে সোরায়ার পিঠ লাগিয়ে দাঁড়া করিয়ে হঠাৎ আঁতকা পিছন থেকে আরো কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“এবার কিছু ফিল করতে পারছো?”
সোরায়ার হতবাক, তবে আচমকা নিজের পিছনে শক্ত কিছু একটার উপস্থিতি বুঝতেই চোখ বড় বড় করে মাথা তুলে ঘাড় ঘুরিয়ে মাহিরের দিকে পিছনে তাকিয়ে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলে মাহির আবারো আঁকড়ে ধরলো সোরায়ার কোমর। সোরায়া এবার খুব ভয়ে ভয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-
“সসস.. স্যার…! কি করছেন? আমার ভয় করছে, ছাড়ুন আমাকে।”

মাহিরের হঠাৎ ধ্যান ভঙ্গ হলো-“মাহির, কি করছিস এসব! বাচ্চা মেয়ে ও।” মাহির সাথে সাথে সোরায়াকে বাঁধন মুক্ত করলো। সোরায়া ছাড়া পেয়েই দূরে সরে গেল। মাহির নিজের মাথার চুল খামচে ধরলো, তার অনুশোচনা হচ্ছে এখন নিজের কাজে। মাহির অপরাধ বোধ থেকেই সোরায়ার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে বলল-
“সোরায়া, I am sorry. I didn’t mean to..আমাকে ভুল বুঝো না।”
সোরায়া ভয়ে এক পা পিছিয়ে গিয়ে মাহির কে কথা পাল্টে বলল-
“স্যার, রায়ান ভাইয়া কে থামতে বলুন না। আমার কেমন কেমন লাগছে। আর আপুর ও…”
মাহির একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। রায়ান কে থামাবে এমন সময় এই ক্ষমতা তার নেই। আর এমন টা করাও উচিত হবে না, যতোই হক স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার। তবে এমন অস্বস্তিকর পরিবেশ সহ্য করা রিস্কের, কখন কি হয়ে যাবে তা বলা যায় না।

ঘরের ভিতরে রায়ানের হিংস্রতা বাড়ছে ধীরে ধীরে। রায়ান মিরায়ার গলার দিক থেকে গাউনটা নামিয়ে ফেলল টেনে। মিরায়ার শরীরে ওই গাউন তার সহ্য হচ্ছিল না। রায়ান যখন মিরায়ার জামা নিয়ে ধস্তাধস্তি শুরু করে তখনি মাহির বারান্দা থেকে জোরে চেঁচিয়ে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-
“রায়ান… Stop whatever you are doing.”
রায়ানের কানে কথাটা পৌঁছাল না হয়তো। মাহির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার চেঁচিয়ে বলল-
“রায়ান…I said stop it. সোরায়া আছে এখানে।”
রায়ান হঠাৎ থেমে গেলো। তার মাথা ঝিমঝিম করছে যেন কোনো নেশা করেছে এই মাত্রই। হাপাচ্ছে খুব জোরে জোরে। আচমকাই রায়ান খেয়াল কারলো মিরায়া আর তার থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করছে না। রায়ান নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে মিরায়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো মিরায়ার চোখ দুটো বন্ধ কেমন যেন প্রাণহীণ হয়ে শুয়ে আছে রায়ানের নিচে। রায়ান আশ্চর্য হয়ে চিন্তিত গলায় মিরায়ার গালে কয়েকবার ট্যাপ করে ডাকলো-
“oh shit, মিরা..এই মিরা..পাখি চোখ খুলো‌। open your eyes, damn it…”

কিন্তু কোনো কিছুতেই যখন মিরায়ার চোখ খুললো না রায়ান বুঝতে পারলো মিরায়া জ্ঞান হারিয়েছে। এমন মুহূর্তে মিরায়ার জ্ঞান হারানোতে রায়ান বাধ্য হলো নিজেকে সামলাতে। রায়ান মিরায়ার উপর থেকে উঠে বিছানা থেকে নামলো। মিরায়ার গায়ে জ্বর ছিলো তার উপর এতো বড় শক, আর তার উপর রায়ানের পাগলামি- সবটা মিলিয়ে এমন কিছু হওয়াতে রায়ান এর কাছে মিরায়ার জ্ঞান হারানোটা স্বাভাবিক ঠেকলো। তার মনে হলো- এমনটা খুব সম্ভবত হওয়ারই ছিল। রায়ান নিজেকে শান্ত করে নিয়ে ঘরের চারপাশটা দেখলো মাহির বা সোরায়া কেউ নেই। এইদিকে ওরা যে বারান্দায় তা সে খেয়াল করে নি।
রায়ান ঘর থেকেই মাহির সোরায়ার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো-

“কোথায় তোরা? ঘরে তো কাউকে দেখছি না।”
সোরায়া চুপসে গেলো রায়ানের আওয়াজে এখন মিরায়ার কোনো আওয়াজ ছিল না তাই শান্তি পেল ভেবে হয়তো এখন মিরায়া ঠিক আছে। মাহিরের ইচ্ছে করছিল বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে দিতে লজ্জায় ও অস্বস্তিতে। মাহির রায়ানের প্রশ্নের উত্তর করলো-
“বারান্দায় আছি। এখন কি ঘরে আসা যাবে ? অন্তত ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ দে ভাই।”
রায়ান মনে মনে বিড়বিড় করলো-“যাক এতো টুকু বুদ্ধি হয়েছিল যে বোনুকে সরিয়ে নিয়ে গেছে।” রায়ান একবার বিছানায় অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা মিরায়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো, এমন অবস্থায় মাহির ঘরে ঢুকতে পারবে না তাই রায়ান বলল-

“মাহির তুই বারান্দায় থাক আমি আসছি। চড়ুই কে ঘরে পাঠা। আর হ্যাঁ, ভয় নেই কিছু হচ্ছে না এখানে।”
মাহির হয়তো বুঝতে পারলো কেন রায়ান শুধু সোরায়াকে যেত বলল। সোরায়া ভয়ে ভয়েই ঘরের ভেতর গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। রায়ানের অস্বস্তি হচ্ছিল কিন্তু প্রকাশ করছিল না। রায়ান একটু থেমে পরে সোরায়া কে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-
“মিরায়ার জ্ঞান নেই। আমি বারান্দায় যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি এই নোংরা জামা চেন্জ করে ভালো কিছু পড়িয়ে দে ওকে। আর হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি করবি সময় নেই আমাদের যেতে হবে।”
কথাটা বলেই যখন রায়ান বারান্দায় চলে গেল, সোরায়া দৌড়ে বিছানার কাছে গেল মিরায়ার জ্ঞান নেই শুনে। আর সাথে সাথে তার চোখ কপালে উঠে গেল সেই দৃশ্য দেখে- বিছানা পুরো অগোছালো, মিরায়া চোখের কাজল আর ঠোঁটের লিপস্টিক লেপ্টে আছে, জামার একদিক কাঁধ অব্দি নামানো, যেন মনে হচ্ছে মহাযুদ্ধ হয়েছে একটু আগে শুধু এই সাজের বিরুদ্ধে। সোরায়া তাড়াতাড়ি মিরায়াকে ওই অবস্থায় তুলে বিছানায় হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে দ্রুত তার জামা কাপড় চেঞ্জ করে সব রকমের সাজসজ্জা মুছে দেয়। আর এই একই সময়ে বারান্দায় অন্য কাহিনী চলছে।

রায়ান বারান্দায় গিয়ে একটু ঠান্ডা বাতাস নিতে বুকে আড়াআড়ি ভাবে হাত বেঁধে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এই দিকে মাহির তো রেগে ফায়ার হয়ে তাকিয়ে আছে রায়ানের দিকে এমন আচরণের জন্য। রায়ান ও খেয়াল করছে কিন্তু কিছুই বলছিল না‌। মাহির এক পর্যায়ে বলল-“তোর মনে হয় না তোর নিজেকে এ্যাক্সপ্লেইন করা উচিত?”
রায়ান সোজা তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল-“কেন? কি এ্যাক্সপ্লেইন করা লাগবে আমার? বউ আমার, আমি যা ইচ্ছা করবো। কার কি?”
মাহির তুচ্ছ হেঁসে বলল-“Are you serious? তোর শালি অনেক ছোটো। ওর সামনে কেন করলি এটা? আমাদের সামনে কেন? বাইরে যেতে বললেই হতো।”
রায়ান তেমন একটা মাহিরের কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল-“Hit of the moment এ হয়ে গেছে। খেয়াল ছিলো না তোরা ঘরে আছিস। খেয়াল থাকলে তোদের সামনে করতাম নাকি?!”
রায়ানের এমন বেপরোয়া ভাব দেখে মাহির রেগে বলল-“তোর এই খেয়াল না থাকার জন্য নিজের স্টুডেন্টের সামনে কতটা লজ্জায় পড়তে হলো আমাকে একবার ভাব।”
সোরায়া মাহিরের স্টুডেন্ট জেনে রায়ান অবাক হয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-“কিহ্? সোরা তোর স্টুডেন্ট?”

মাহির অবশেষে রায়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরে হেয়ালি করে বলল-“জ্বি হ্যাঁ। আমি তোর শালির কলেজের টিচার। আপনার একমাত্র সুন্দরী শালি আমার স্টুডেন্ট। Not just a student but…”
রায়ান মাহিরের – “বাট!” বলাতে সন্দেহ করে কিছু একটা আগাম ভেবে আওড়ালো -“fu*ck!”
মাহির সাথে সাথে বলল-“What!?”
রায়ান মাহিরের মুখমুখি দাঁড়িয়ে চোখ তীক্ষ্ণ করে বলল-
“Don’t tell me, তোর স্টুডেন্ট ক্রাস আমার শালিই। I swear I will kill you for real.”
মাহিরের হঠাৎ কাশি উঠলে শুকনো ঢোক গিলে বারান্দায় সোজাসুজি তাকিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে দৃঢ় তবে নিচু গলাতেই বলল-“yeah, She is the one.” মাহিরের মনে চলছিল রায়ান কিভাবে বুঝলো এই কথা।
রায়ান ঠোঁট কামড়ে তুচ্ছ হেঁসে মাহিরকে নিজের মুখমুখি করে নিয়ে শার্টের কলার ধরে বলল-“ওই আর কোনো মেয়ে পাইলি না ক্রাস খাওয়ার জন্য? শেষ মেষ সব ছেড়ে আমার শালি কেন?”
মাহির রায়ানের দুই হাত নিজের হাত দিয়ে ধরে একটু অসহায় গলায় বলল-“আমি তো তোর শালির থেকে মুভ অন করেই গেছিলাম। এখন আমি কিভাবে জানবো তোর শালির প্রেমে পড়েই, তোর শালির উপর থেকে মন উঠে গেছে? I tried bro, but it didn’t work.”

রায়ান মাহিরকে ছেঁড়ে দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে নিলো। হঠাৎ রায়ান মাহিরের প্যান্টের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে মাহির কে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলো-
“এই হাল কি করে হলো তোর? ওই কি ভাবিস উল্টা পাল্টা। ঘরেও চড়ুইয়ের সাথে লেপ্টে ছিলি, এখানেও…। সাহস হয় কিভাবে ওকে ছোঁয়ার? আমি আমার বউ নিতে এসেছি না তোরটা খুঁজতে?”
মাহির স্বাভাবিক ভাবেই বলল-“মনে হয় আমারটা খুঁজতেই এসেছিস। ভাগ্য গুনে, আল্লাহর রহমতে এবার নিজের বউটাও নিয়ে যেতে পারবি। Thank you, বলা লাগবে না।”
এরপর নিজেই নিজের দিকে মাথা নিচু করে চেয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল-“এই হাল তোর জন্যই হইছে। হাড়ামি, ঘরে মানুষ রেখে নির্লজ্জের মতো কাজকর্ম করিস। আর একটু হলে বারান্দায় ও কিছু হয়ে যেত।”
রায়ান আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল-“I dare you to do anything wrong. আমার বোনের সাথে উল্টো পাল্টা কিছু করলে তোকে খুন করে জেলে যাবো দেখিস।”
মাহির স্বাভাবিক ভাবেই প্রস্তাব রেখে বলল-“ডেয়ার দিতে হবে। উল্টো পাল্টা কিছু এখন করবো না। যা করার ওকে নিজের জন্য হালাল করে পরেই করবো।”
রায়ান মাহিরকে আবার মরতে উদ্যত হয়ে থেমে গিয়ে নরম তবে গম্ভীরভাবে শাশিয়ে বলল-
“খোদার কসম মাহির, আমার বোনের কোনো ক্ষতি হলে বা যদি তোর থেকে কষ্ট পায় কোনো কারণে আমি তোকে দেখে নেবো বলে দিলাম।”

মাহির বুঝলো রায়ানের দিক থেকে আর কোনো বাধা নেই, শুধু বড় ভাই হয়ে বোনের ভালোর চিন্তা করছে এতো টুকুই। সত্যি বলতে আগেও যে তার কোনো আপত্তি ছিল তা নয়। মাহির যথেষ্ট ভালো ছেলে তা রায়ান জানে। তাই সোরায়ার জন্য মাহির কে অস্বীকার করার কোনো কারণ ছিল না- যেখানে মাহির নিজে চাইছে বিষয়টা এগোতে। মাহির রায়ান কে জড়িয়ে ধরে খুশি তে বলল-
“খোদার কসম আমি দিচ্ছি তোকে, সোরা আমার মন আকাশের একমাত্র চড়ুই পাখি হয়ে থাকবে। কখনো কোনো কিছুর কষ্ট হবে না ওর। আর তোর মতো সম্বন্ধী পাইলে তো…।”
রায়ান নিজেকে মাহিরের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-” খুশি হওয়ার কিছু নাই, চড়ুই না মানলে পায়ে ধরেও লাভ হবে না। আর হ্যাঁ, আমার বউ যদি না মানে তাহলেও কিছু হবে না। মাথায় ঢুকিয়েনে।”
মাহির কিছু বলার আগেই সোরায়া ঘর থেকে জোরে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-
“ভাইয়া, তোমরা ঘরে আসতে পারো। আমি সব ঠিকঠাক করে দিয়েছি।”

রায়ান মাহির সোরায়ার কথায় ঘরের ভিতর গেল। রায়ান সাথে সাথে বিছানা থেকে মিরায়াকে কোলে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে গেল, পিছন পিছন সোরায়া মাহির ও নিচে নামলো। ড্রয়িং রুমে শফিক রহমান দাঁড়িয়ে আছেন, রোকেয়া বেগম দরজা খুলে দিয়েছিলেন রায়ান মাহির মিরায়ার ঘরে যাওয়ার অনেকক্ষণ পর। রায়ান নিচে নেমে কোনো দিকে তাকিয়ে মিরায়াকে নিয়ে সোজা সদর দরজার দিকে যেতে নিলে শফিক রহমান রায়ানের সামনে গিয়ে পথ আঁটকে দাঁড়ান। তার হাতে ছিলো বিশাল এক বন্দুক, বংশ পরম্পরা থেকেই এই বন্দুক তার কাছে ছিল। শফিক রহমান বন্দুক তুলে রায়ানের দিকে তাক করে আদেশ করলেন-
“শেষবারের মতো বলছি, আমার মেয়ে কোথাও যাবে না। আর এক পা সামনে এগোলে গুলি করতে আমি দ্বিতীয় বার চিন্তা করবো না।”

রায়ান মিরায়ার অবস্থা দেখে বুঝতে পারছিল শফিক রহমানের রাগ যথেষ্ট যৌক্তিক। এই সময় তার কোনো প্রকার বেয়াদবি পরিস্থিতি আরো বিগড়ে দেবে। রায়ান ঠিক করল ঠিক ভাবে সব বুঝিয়ে বলবে-“খালু আমি…!”
-“রায়ান থাম। কাউকে কোনো প্রকার কৈফিয়ত দিতে হবে না।” রায়ান কিছু বলার আগেই রোকেয়া বেগম জোর গলায় কথাটা বলে রায়ানের সামনে এসে দাড়ালেন। শফিক রহমান সম্পূর্ণ অবাক চোখে তাকিয়ে রোকেয়া বেগমের নাম উচ্চারণ করলেন-“রোকেয়া?!”

রোকেয়া বেগম শক্ত মনে দৃঢ় চিত্তে নিজের পরিচিতি স্বীকার করে অভয় বাণী পাওয়ার উদ্দেশ্যে বললেন-
“হ্যাঁ, আমি রহমান বাড়ির একমাত্র বউ, যে কি না নিজের ভাসুরের মেয়েদের জন্য নিজের মাতৃত্বের বিসর্জন দিয়েছি, সেই মিসেস রোকেয়া রহমান- আজ নিজের স্বামীর কাছে নিজের মাতৃত্বের মূল্য হিসেবে এই বাড়ির বড় মেয়ের সংসার দাবি করছি, তার স্বামী সুখ দাবি করছি, আমার মেয়ের স্থায়ী পরিচয়ের দাবি করছি।”
শফিক রহমান এর আগে কখনো রোকেয়া বেগমের মুখে এই ধরনের কথা শোনেন নি। কখনো নিঃসন্তান হওয়ার আফসোস বা সন্তানের দাবি তিনি করেন নি। আজ সেই জায়গায়, নিজের মাতৃত্বের মূল্য চাইছেন মেয়ের সংসার রক্ষার্থে। হঠাৎই শফিক রহমান বন্দুক নিচু করে চেঁচিয়ে উঠলেন-
“রোকেয়া…তোমার মাথা ঠিক আছে? কি বলছো এসব?”

রোকেয়া বেগমের চোখে মুখে দ্বিধা খুঁজে পাওয়া গেলো না। তিনি একই ভাবে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন-
“আজ যদি তুমি পথ না ছাড়ো। আমি এই বাড়ি ছেড়ে আমার মেয়েদের নিয়ে চলে যাবো। ওরা যতটা তোমার ঠিক ততটাই আমার। আইন অনুযায়ী মিরা রায়ানের স্ত্রী, সুতরাং ওকে নিজের কাছে রাখার অধিকার আমার নেই। যার বউ সে নিয়ে যাবে তা নিয়ে মাথা ব্যাথাও নেই। বাকি তোমার ইচ্ছে। নিজের বাকি জীবন টা একা কাটাতে চাইলে থামাতে পারো ওদের। প্রয়োজনে আমি আইনি পদক্ষেপ নেব মিরার ভবিষ্যতের জন্য। আমার মেয়ে যাকে চায় তাকে পাবে, যেকোনো মূল্যে হক। মা হয়ে মেয়ের জীবন আমি নষ্ট করতে দেব না।”

রায়ান মাহির সোরায়া ঠায় দাঁড়িয়ে রোকেয়া বেগমের তীব্র প্রতিবাদের সাক্ষী হচ্ছে। মায়েরা সন্তানের সুখের জন্য নিজের ঘর উজার করতেও দ্বিধা করেন না, সুখ ত্যাগ করা তো তর্কের বিষয়েও পড়ছে না। শফিক রহমান স্ত্রীর এমন রূপে যতটা না অবাক তার থেকেও বেশি নিজেকে অপরাধী মনে করছেন- তার মনে হচ্ছিল তিনি একজন নারীর সর্বোচ্চ সুখ কেড়ে নিয়েছেন, আর সাথে যাদের মাঝে তার দুনিয়া ছিলো তাদের উপর থেকেও অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। রোকেয়া বেগম রায়ানের দিকে ফিরে মিরায়ার মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে একটা স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে বললেন –

“আমার মেয়ে আমার বড়ো আদরের। আপা কে বলিস ওর যত্ন নিতে যদিও আমি জানি ওর অবহেলা হবে না। আর হ্যাঁ কখনো এই বাড়িতে যেন আমার মেয়ে একা না আসে। পরেরবার দুইজন একসাথে আসবি হাসি মুখে। খালামণি জামাই আদর করতে পারলাম না আজকে, আফসোস থেকে যাবে নয়তো।”
রায়ান তৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে রোকেয়া বেগম কে ওয়াদা করলো-
“আমি রায়ান চৌধুরী তোমাকে কথা দিচ্ছি নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা অব্দি তোমার মেয়ের সঙ্গ ছাড়বো না। ওর দায়িত্ব থেকে আমার শেষ অবকাশ কেবল আমার মৃত্যুর মাধ্যমে হবে।
তবে হ্যাঁ জামাই আদর পেতে একদিন অবশ্যই আসবো। আমার পছন্দের খাবার রান্না করবে কিন্তু।”
রোকেয়া বেগম হাসি মুখে রায়ানের মাথাও হাত বুলিয়ে দিয়ে তার কপলে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে বললেন-

“অনেক ধকল গেছে তোর উপর দিয়েও। চল এবার এগিয়ে দেই তোদের। কে কি করবে আমি বুঝে নেব।”
শফিক রহমান হঠাৎ কেমন দূর্বল হয়ে পড়লেন। সহধর্মিণীর সঙ্গ ছাড়া সকল পুরুষ মানুষ দূর্বল, আজ তার প্রমাণ চোখের সামনে। তার পায়ের নিচের ভিত্তি হঠাৎ সরে যাচ্ছে এমন মনে হলো। রায়ান মিরায়াকে নিয়ে দরজার দিকে এগোল, শফিক রহমান এখনো সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। রোকেয়া বেগম তার পাশ কিটিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেন। রায়ান মিরায়াকে কোলে নিয়ে শফিক রহমানের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো। রোকেয়া বেগম শুধু রায়ান কে দেখে যাচ্ছেন। সোরায়া মাহির ও অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।
রায়ান মাথা নিচু করে নিজের আত্ম স্বীকারোক্তি দিলো শফিক রহমানের কাছে-

“খালু আমি জানি আমি আপনাকে হতাশ করেছি। হয়তো অনেক ক্ষোভ জমে আছে আপনার মনে। তবে আমি খুব বেহায়া হয়ে গেছি আপনার মেয়ে যখন থেকে আমার জীবনে এসেছে। বলতে পারেন সেই সূত্রেই এই মুহূর্তেও আপনার সামনে মাথা নিচু করে বেহায়ার মতো আপনার মেয়েটাকে চাইছি। দেবেন আমায়? আপনার অনুমতি ছাড়া আপনার মেয়ে কখনো আমাকে মেনে নেবে না। আমি বেপোরোয়া, কিন্তু দায়িত্ব জ্ঞানহীন নই। কতোটা সুখি করতে পারবো ওকে সেটা না বলতে পারলেও, আমি থাকতে দুঃখ কষ্ট কখনো ওর ছায়া স্পর্শ করতে পারবে না এইটা বলতে পারি। এই ভিক্ষুক কে কি নিজের মেয়েটাকে দান করবেন খালু?”

রোকেয়া বেগমের চোখে অশ্রু টলমল করে উঠলো। মাহির সোরায়া শফিক রহমানের দিকে অধির আগ্রহে তাকিয়ে আছে। শফিক রহমানের মন ঠিক কতোটা গলিত হলো বলা মুশকিল। চোখে মুখে কেমন অপারগতার ছাপ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু পিতৃতুল্য মন মেয়ের সুখের লোভে পড়তে বাধ্য। হয়তো তাই তিনি রায়ানের সামনে বসে মিরায়ার দিকে তাকিয়ে আলতো করে কপালে আদর করে বললেন-
“ভালো থাকিস মা। তোর চাচা হয়তো তোকে বুঝতে ব্যর্থ ছিলো।”
মিরায়াকে কথা গুলো বলে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে পায়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। রায়ানের উদ্দেশ্যে কিছু না বললেও মিরায়ার জন্য করা দোয়া তার সম্মতির সাক্ষী।
অতঃপর রায়ান মিরায়াকে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে রোকেয়া বেগমের থেকে বিদায় নিয়ে বাগান বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবে বলে পা এগোতেই খেয়াল করলো মাহির মুখ ঝুলিয়ে নিজের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রায়ান মাহির কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো-

“কিরে যাবি না? দাঁড়িয়ে আছিস কেন গাড়িতে ওঠ।”
মাহির একবার সোরায়ার দিকে তাকালো। সোরায়া মাহির কেই দেখছিল তখন। দুইজনের চোখ মিলতেই সোরায়া চোখ সরিয়ে নিলে মাহির উপায় না পেয়ে রায়ানের কাছে গিয়ে বলল-
“দোস্ত, ভাবি তোকে দেখে কিভাবে রিয়েক্ট করবে তার ঠিক নেই। আপন কেউ থাকলে পরিস্থিতি সামলাতে একটু সুবিধা হবে। সোরায়া কে আমাদের সাথে নিয়ে গেলে হয় না?”
রায়ানের বুঝতে আর বাকি থাকলো না মাহিরের মুখ চুপসে থাকার কারণ কি! রায়ান একবার সোরায়ার দিকে তাকাতেই দেখলো সোরায়ারও বেশ মনমড়া। আর সত্যি বলতে বাহিরের বলা কথা সম্পূর্ণ ফেলে দেওয়ার নয়। মিরায়ার জন্য সোরায়া কে লাগবে।

রায়ান মাহিরের কথায় তাকে বলল-“ঠিক আছে যা নিয়ে আয় সোরা কে।”
মাহির খুশি হলো তবে একটু দ্বিধা নিয়ে বলল-“আমাকে খালামনি চেনেনা। আমি কিভাবে উনার সামনে থেকে সোরাকে নিয়ে আসবো। কেমন দেখাবে?”
রায়ান এখন মিরায়া ছাড়া আর কিছু ভাবতে চাইছিল না তাই মাহিরের কথায় বিরক্ত হয়ে বলল- “রায়ান চৌধুরীর বউয়ের প্রয়োজন পড়বে এমন সব জিনিস আমার বউয়ের কাছে থাকা চাই। গিয়ে ওকে নিয়ে আয়- এখন নিজের ইচ্ছায় এলে ভালো না এলে তুলে নিয়ে আয়। আমি আমার বউকে নিয়ে যাচ্ছি, এবার কি করবি নিজের টা নিজে বুঝে নে।”

রায়ান মাহির কে কথাটা বলেই নিজে গাড়িতে উঠে বসলো। তবে মাহিরের শুধু অনুমতির দরকার ছিলো যা সে পেয়ে গেছে এখন আর তাকে আটকায় কে। মাহির দৌড়ে সোরায়ার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আমাদের সাথে বান্দরবান যাবে? ভাবির তোমাকে দরকার পড়তে পারে তাই বলছি।”
সোরায়ার ষোলোআনা ইচ্ছে আছে যাওয়ার তবে প্রথমেই হ্যাঁ বলে দিলে একটু খারাপ দেখায় তাই সে ভাব নিয়ে বলল-
“না আমি যাবো না। ইচ্ছে নেই।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোকেয়া বেগম সোরায়া কে উৎসাহিত করতে বললেন –
“যা গিয়ে একটু ঘুরে ঢাকা চলে যাস। একমাস হয়ে গেছে পড়ার সাথে দেখা নেই। একটু ঘুরে মাথা ফ্রেস করে আবার আগের মতো পড়ায় দিবি।”
সোরায়া চাচির উদ্দেশ্যে বলতে গেলো-“চাচি আমার…!”
সোরায়ার কথা শেষ করার আগেই মাহির রোকেয়া বেগমের উদ্দেশ্যে বলল-

“খালামণি একদম ঠিক বলেছেন। আপনি চিন্তা করবেন না , আমি সোরায়ার ক্লাস টিচার। আমি ওর পড়ার দিকে খেয়াল রাখবো। মাঝে মাঝে ঘুরা ঘুরি করা উচিত বাচ্চাদের মাথা ফ্রেস থাকে।”
রোকেয়া বেগম মাহিরের কথায় মিষ্টি হাসলেন। এই দিকে সোরায়া বাঁকা চোখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ মাহিরের এমন পরিবর্তন তার ভালো লাগলেও খুব অদ্ভুত ঠেকছিল। রোকেয়া বেগম সোরায়ার জামা কাপড় গুছিয়ে দিয়ে বিদায় জানিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। সোরায়া মাহির কে হঠাৎ বলল-
“আমি আপনার সাথে যাবো না। লোকেশন দিন একা চলে যাবো।”
মাহির এক ঝটকায় সোরায়াকে কোলো তুলে নিলো কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই। সোরায়াও ভয়ে মাহিরের গলা জড়িয়ে ধরলো। নিজেকে শুন্যে আবিষ্কার করে সোরায়া হকচকিয়ে গিয়ে বলল-
“স্যার, নামান আমাকে। কি করছেন? পড়ে যাবো আমি। ”

মাহির সোরায়াকে নিয়ে গাড়ির দিকে এগতে এগোতে সামনের দিকে তাকিয়ে বললো-
“সময় নষ্ট করার সময় নেই। তাই তর্ক না করে নিজেই নিয়ে যাচ্ছি। কেন? আমার কোলে ওঠার শখ চলে গেছে?”
সোরায়ার আগের বারের তার বলা কথা গুলো মনে পড়তেই চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। সোরায়া আশা করে নি মাহিরের মাথায় আগের কথাগুলো এখনো আছে। মাহির সোরায়াকে গাড়িতে বসিয়ে দিতে দিতে বলল-
“তুমি ঠিক বলেছিলে, তোমাকে আমি কোলে নিতে পারবো। Trust me, একটুও কষ্ট হয়নি।”
তবে গাড়ির দরজা লাগাতে লাগাতে বলল –
“তবে একটা ক্যালকুলেশনের ভুল হয়ে গেছে, ৪৫ কেজির ফিল পেলাম না, Try hard and gain weight. আমি ৪৫ কেজি কোলে নিয়ে ফিল করতে চাই।”
সোরায়া থতমত খেয়ে গেলো। এই মাহির সেই মাহির কিনা তার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। নবীনবরণের দিন যা অনুভব করেছিলো একই অনুভূতি খেলা করছে মনে। এমন অস্বস্তিকর অবস্থায় ঠিক মতো কিছু বলতেও পারলো না মেয়েটা। এরপর মাহির ও গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়। রায়ান মিরায়াকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে আগেই।

বাগানবাড়ি ~
রুদ্র রিমিকে নিয়ে বাগান বাড়িতে এসে পৌঁছেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। বাড়ির কেয়ারটেকার যিনি ছিলেন তিনি রুদ্রর কথা মতো সবার ঘর ঠিক করে রেখে ছিলেন আগেই। রুদ্র রিমিকে আসার পথে সব ঘটনা খুলে বলেছে রায়ান মিরায়ার ব্যপারে তবে রিমির এতো দিন কোনো খোঁজ খবর না থাকার বা তার আঘাত পাওয়ার কারণ নিয়ে রুদ্র কিছু জিজ্ঞেস করে নি। মনে হয়েছিল কয়েকবার তবে রিমিকে সইচ্ছায় কিছু বলতে না দেখে সে ধরে নিয়েছিল রিমি এই ব্যাপারে হয়তো কথা বলতে চায় না। আর তাছাড়া সে রিমিকে এতদিন পর আবারো দেখতে পেয়ে খুব খুশি ছিলো, তাই অতীতের সময়ে কি হয়েছে তার ব্যাখ্যা শুনতে চেয়ে বর্তমানের আনন্দ নষ্ট করতে চায়নি রুদ্র।
রায়ান বিদেশে যাওয়ার পর দীর্ঘ ১০ বছরে বাগানবাড়িতে আসা হয় নি রুদ্রর। রিমি রুদ্র যে যার যার ঘরে ছিল। রিমি এর আগে কখনো এমন বাগানবাড়ি দেখেনি তাই নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে পায়চারি করছিল বাড়ির ভেতরে। বাড়িটা ভীষণ বড়ো, সুন্দর করে সাজানো। একটু রেস্ট নেওয়ার পর রিমি বাড়িটা ঘুরে দেখতে করিডোর দিয়ে হাটছিলো এমন সময় পিছন থেকে বাড়ির কেয়ারটেকার রিমিকে ডেকে বললেন –

“আপা মনি? এইদিকে কি যান?”
রিমি চমকে গিয়ে ঘুরে তাকিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল-
“কোথাও না কাকা। বাড়িটা ঘুরে দেখছিলাম একটু । অনেক সুন্দর।”
কেয়ারটেকার হেঁসে রিমির কথায় সম্মতি দিয়ে উপদেশ স্বরূপ বললেন-
“আফা এক কাম করেন, ছোট বাবা (রুদ্র) যে কন আপনারে বাড়িটা ঘুইরা দেহাইতে। একলা একলা গুলাই ফালাবেন। বাড়িডা বড়ো আছে। আমিই দেহাইতাম তোয় ছোট বাবা কইলো বড় বাবা (রায়ান) আর তার বউসহ আরো কেডা কেডা নাহি আইবো রাইয়ের খাওনের যোগারের এক চিন্তা আছে।”
রিমি মিষ্টি হেঁসে বললো-“সমস্যা নেই কাকা। আমি রুদ্র কেই বলবো বাড়ি দেখাতে। আপনি ব্যস্ত হবেন না। নিজের কাজ করুন।”

কেয়ারটেকার রিমিকে আঙুল উঁচিয়ে সিঁড়ির উপরে রুদ্রর ঘর দেখিয়ে রিমিকে বলল- “ওইযে ওইডা ছোট বাবার ঘরে, আপনি যান আমি বরং কামে যাই। কিছু লাগলে বইলেন।”
রিমি একবার রুদ্রর ঘরের দিকে তাকিয়ে পরে আবারো কেয়ারটেকার কাকার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। কেয়ার টেকার নিজের কাজে ফিরে যাওয়ার পর রিমি ধীরে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে রুদ্রর রুমের দিকে পা বাড়ালো। তারও একা একা ভালো লাগছিল না। আর মিরায়া রায়ান ও এখনো এসে পৌঁছায় নি।
রুদ্র নিজের ঘরে একা বসে থাকতে থাকতে বোর হচ্ছিল। রিমির ঘরে যাবে কথা বলতে বা সময় কাটাতে মনে সংশয় দেখা দিচ্ছিল রিমি কি ভাববে না ভাববে এই নিয়ে। রুদ্রর ঘরে তার ছোট বেলার একটা পুরোনো গিটার ঝুলে ছিলো দেয়ালে। ফ্রেস হওয়ার পর সেটা নিয়েই পরে ছিলো সে। দেয়াল থেকে নামিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে নিয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে টুংটাং শব্দ করছে ঠিক মতো বাজছে কিনা দেখতে। গিটার হাতে এলে রুদ্র অন্য এক দুনিয়ায় চলে যায়। শিল্প যেখানে, আবেগ সেখানে ভীর করবেই। হঠাৎই আজকের দিনে রিমিকে আবার ফিরে পাওয়ার কথাটা মাথা আসতেই রুদ্রর মুখের এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। রুদ্র কে শুরু থেকে শেষ অব্দি রিমির প্রতি টান বেশ ভাবালো-“কি এমন আছে মেয়েটার মধ্যে? এত কেন অদ্ভুত টান অনুভব হয় ওনার জন্য। কত সাধারণ বাহ্যিক রূপ অথচ কি অসাধারণ সুন্দর লাগে? কেন?”
হঠাৎ কি যেন একটা ভেবে রিমিকে মনে করেই গিটারটা বাজিয়ে গান ধরলো তবে গানের লাইন গুলো যেন কেবল শব্দ নয় মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে রুদ্রর-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৪৯

Tujhe paa ke jawab mila hai asal
TU hai woh sawaal Khuda ka
TU mila hai yeh meri Dua ka asar
TU mujhse door na jaana
Teri nazron ka dil pe houa hai asar
TU mera mehboob hai jaana
Teri ulfat mein jeeta har pal
Tu ik tohfa hai Khuda ka

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫০ (২)