আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৮
অরাত্রিকা রহমান
চৌধুরী বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রুদ্র রিমি। ঠিক তাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে মিরায়া। চোখে আশ্চর্যতা, রুদ্রর যেখানে রিমিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফেরার কথা সেখানে তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে বলে মনে তার বহু প্রশ্ন জেগেছে। কিন্তু প্রশ্নের জায়গা গুলো ও গুলিয়ে যাচ্ছে। রায়ান মিরায়ার আওয়াজে দরজার সামনে আসতেই রুদ্রকে খেয়াল করলো। রুদ্র রিমির এক হাত ধরে আছে। রায়ান কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পারলো কিন্তু কি হয়েছে তা আন্দাজের বাইরে।
রায়ান রুদ্র কে পা থেকে মাথা অব্দি দেখলো- রুদ্রর পরিহিত শার্ট এর উপরের বোতাম ছেঁড়া, চুল এলোমেলো, হাতে শুকনো রক্তের দাগ পুরো অগোছালো একটা অবস্থা। মিরায়ার নজর রিমির দিকে- রিমির গায়ে রুদ্রর কোর্ট টা জাড়ানো, চোখ মুখ মলিন, স্তব্ধ পাথরের মতো শুধু দাঁড়িয়ে আছে, চোখ মেলাচ্ছে না মিরার সাথে। দেখে মনে হচ্ছে অনেক কিছু পুষে রেখেছে ভেতরে যা বাইরে বের করার সাহস নেই। মিরা রিমির দিকে এগিয়ে গিয়ে রিমির গালে কাঁধে হাত রেখে কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল-
“কি হয়েছে রিমি…বাড়ি যাস নি?”
রিমি মাথা নিচু করে ছিল মিরার সামনে। মিরা রুদ্রর দিকে এক নজর দেখলো রুদ্র ও কিছু বলছে না। মিরা হঠাৎ চিন্তিত হয়ে গেলো। এবার একটু বেশি জোর দিয়ে রিমিকে জিজ্ঞেস করলো-
“রিমি কি হয়েছে রে? আংকেল আন্টি কি তোকে বোকেছে এতো দিন বাড়ির বাইরে থাকার জন্য? বল না জান। কি হয়েছে? চিন্তা হচ্ছে আমার।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রিমি মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, দেখেও বোঝা যাচ্ছে কান্না আটকাতে চাইছে তবে সেটা বৃথা চেষ্টা। রায়ান রুদ্র কে দেখছে- রায়ান জানে রিমির ফ্যামিলি প্রবলেম তবে মিরাকে রিমি কখনো কিছু বলে নি আর মিরার কাছে ফ্রেন্ডশিপে ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড কখনো ম্যাটার করে নি। মিরা খেয়াল করলো রিমি কাঁদছে, যেহেতু রিমিকে জিজ্ঞেস করেও লাভ হচ্ছে না তাই মিরা রুদ্র কে জিজ্ঞেস করলো-
“রুদ্র ভাইয়া হয়েছে টা কি বলবে আমায়? রিমি কাঁদছে কেন? তোমরা এভাবে এই অবস্থায় কেন?”
রুদ্র মিরাকে কিভাবে কি বলবে না বুঝে রায়ানের দিকে তাকালো, রুদ্র রায়ান কে ইশারা করতেই রায়ান মিরাকে শান্ত করতে বলল-
“মিরা, relax, let’s talk about later..ওদের সময় দেও একটু।”
-“আরে কিসের সময় দিবো? এই রিমি কি হয়েছে বল আমাকে? তাকা আমার দিকে। আমার চোখে দেখ। বলবি কি হয়েছে?”
মিরা রায়ানের কথা তুচ্ছ জ্ঞ্যান করে রিমির কাঁধে হাত রেখে বারবার একই প্রশ্ন করতে লাগলো। রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে রিমির থেকে দূরে সরাতে পিছন থেকে মিরাকে আঁকড়ে ধরে সংবরন করার চেষ্টা করলো।
-“রায়ান ছাড়ুন আমাকে। আমি রিমির সাথে কথা বলতে চাইছি তো।”
-“মিরা, listen..Let it be for a while..আমরা পরে কথা বলি।”
-“আমি এখনি কথা বলব ওর সাথে। রুদ্র ভাইয়া তুমি কিছু বলছো না কেন? কাঁদছে কেন রিমি?”
মিরাকে দেখে রিমির আবেগ আরো নিজের গতি হারালো। রিমি মিরার চোখে চোখ রাখলে মিরা রিমির অশ্রু সিক্ত চোখ স্পষ্ট দেখতে পেল।
-“পাগল নাকি! এভাবে কাঁদছিস কেন? আংকেল আন্টি বোকেছে তো কি হয়েছে? আমি উনাদের বুঝিয়ে বলব তুই আমাকে তোর বাড়ি নিয়ে যাবি কাল ঠিক আছে?”
কথাটা বলার সাথে সাথে রিমি রুদ্রর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মিরাকে জাপটে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। যে সে কান্না নয়- একদম শ্বাসরোধ করে আসা কান্না। মিরা হতবাক হয়ে স্থির হয়ে গেল মুখে কোনো কথা নেই। রিমি হাওয়াও করে কেঁদে যাচ্ছে।
-“আ..আআমার কে..কেউ নেই..। আ..আমার কেউ নেই।”
রিমির কথা গুলো মিরার বুক কাঁপিয়ে দিলো। হঠাৎ রিমি এমন কথা কেন বলছে সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু এই মুহূর্তে যেকোনো প্রশ্নের চেয়ে রিমিকে সামলানো টা তার বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। মিরা নরম হাতে রিমির মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“আমি আছি তো তোর সাথে। কেন কাঁদছিস তুই? আমি আছি।”
রুদ্র নিজের হাতের মুঠো শক্ত করে নেয় রিমিকে কাঁদতে দেখে। রায়ান রুদ্রর কাঁধে হাত রেখে একটু শান্ত করতে চাইলো। এইদিকে মিরাকে জড়িয়ে ধরে রিমি এমন ভাবে কাঁদছে যেন তার দুনিয়া পাল্টে গেছে। মিরা চেয়েও তাকে শান্ত করতে পারছে না। রুদ্র রিমির কান্না নিয়ে পারছিল না বলে মিরার উদ্দেশ্যে বলল-
“রিমিকে উপরে নিয়ে যা মিরা।”
মিরা রুদ্রর দিকে তাকালো প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে। রুদ্র আর কিছু বলল না বলে রায়ান মিরাকে বলল-
“মিরা, রিমিকে উপরে তোমার রুমে নিয়ে যাও। একটু টাইম দাও ওকে। Let’s talk later.. okay?”
মিরা পরিস্থিতি বুঝে রায়ানের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো আর রিমিকে শান্ত করার চেষ্টা করে উপরে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। মিরা রিমিকে উপরে নিয়ে গেলে রায়ান রুদ্রর দিকে এগিয়ে গেল।
রায়ান-“শাওয়ার নিয়ে নিচে আয়। কথা আছে।”
রুদ্র-“ভাইয়া, আম্মু আব্বু কে ডাকো। আমার কিছু বলার আছে। আমার যা বলার সবার সামনেই বলবো। আসছি।”
এই বলে রুদ্র উপরে নিজের ঘরে চলে গেলে রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“আল্লাহ জানে কি করে ফেলেছে..! আব্বু আম্মু কিভাবে নেবে সব কে জানে।”
মিরা রিমিকে ঘরে এনে বিছানায় বসিয়ে মিরা রিমির দুই গালে হাত রেখে কথা বলার চেষ্টা করলো।
-“জান আমার চুপ কর। আমি আছি তো তোর সাথে। চুপ চুপ, আর কাঁদে না। আমাকে বল কি হয়েছে। আমি সব ঠিক করে দেব।”
রিমির হেঁচকি উঠে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। মিরা আবারো রিমিকে জড়িয়ে ধরলো-
“হয়েছে তো, চুপ। আর কাদিস না। ফ্রেস হয়ে নিবি আয়। এভাবে কাঁদলে হবে?”
মিরা কথাটা বলেই যখন রিমির গা থেকে রুদ্রর কোর্টটা সরায় তার চোখ তৎক্ষণাৎ বড়বড় হয়ে উঠলো। রিমির পরিহিত জামার হাতার দিক ও পিঠের পিছনের অংশের কাপড় সম্পুর্ণ ছেঁড়া। দেখে মনে হচ্ছে যেন কেউ জোরজবরদস্তি করে টেনে ছিঁড়েছে। মিরা রিমির এমন বাহ্যিক অবস্থা দেখেই রিমির দিকে তাকালো। রিমি অজানা কারণে লজ্জায় ঘৃণায় মিরার থেকে চোখ সরিয়ে নিল। মিরা আন্দাজ করতে পারলো খুবই বাজে কিছু হয়েছে তার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। মুখের ভাবেও সেই পরিস্থিতি কল্পনা করে তার ঘৃনা ধরে যাচ্ছিল। মিরা রিমিকে একটু স্বাভাবিক ভাবে বোঝালো যে সে এখন সুরক্ষিত।
-“চুপ চুপ। কিছু হয় নি তো। কিছু হবেও না। দেখ আমরা সবাই আছি তো। যাই হয়ে থাকুক না কেন, সেটা আর হবে না। তুই আমার সাথে আছিস এখন। একদম সেফ।”
মিরা রিমিকে তখন মায়ের মতো আদরে মুড়ে নিয়েছিল। সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল একটু স্বাভাবিক অবস্থা তে রিমিকে আনতে। এরপর মিরা রিমিকে নিয়ে সোজা ওয়াশ রুমে যায় এবং তাকে গোসল করিয়ে নিয়ে আসে। নিজের জামাকাপড় পড়িয়ে দিয়ে আবার বিছানায় এনে রিমিকে শুইয়ে দেয়।
-“জান, তুই একটু রেস্ট নে কেমন। আমি তোর জন্য গরম দুধ আনি গিয়ে। এই যাবো আর এই আসবো।”
মিরা রিমির পাশ থেকে যেতে নিলে রিমি মিরার হাত ধরে আটকায়। মিরা থামে, খেয়াল করে রিমির সম্পূর্ণ শরীর এখনো কাঁপছে। এমন ভয় পেয়েছে মেয়েটা, যে মুখেও কিছু আসছে না বলার মতো। তবে মিরা সেই তীব্র নীরবতার মাঝেও আওয়াজ খুঁজে নিলো। হাঁসি মুখে রিমির পাশে বসলো।
-“চাস না আমি কোথাও যাই? আচ্ছা যাবো না। এখানেই আছি, তোর সাথে। ভয় নেই, কোথাও যাবো না।”
মিরা রিমির কাছে বসলে রিমি ধীর গতিতে মিরার কোলে মাথা রেখে শুলো। মিরাও বিভিন্ন কথা বলে রিমির মাইন্ড ডাইভার্ট করার চেষ্টা করলো। প্রায় মিনিট খানেক পরই ক্লান্ত শরীরে রিমি মিরার কোলেই ঘুমিয়ে পড়ে। মিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেঁড়ে নিজের কোল থেকে রিমির মাথাটা আলতো করে সরিয়ে বালিশের উপর রেখে রিমির কপালে হাত রাখলো- আকস্মিক ঘটনায় রিমির জ্বর চলে এসেছে। মিরা ধীরে ঘর থেকে বেরোল রুদ্রর সাথে কথা বলতে।
রাত ঠিক তখন ১১টা~
ড্রয়িং রুমে রামিলা চৌধুরী ও রায়হান চৌধুরী সোফায় বসে। রুদ্র ঠিক তাদের সামনের সোফায় বসে আছে আর রায়ান রুদ্রর পাশে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে। সোরায়া ও সিরিয়াস মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। মিরা ড্রয়িং রুমে এলে রায়ান মিরার দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিজ্ঞেস করলো-
“Are you ok? উপরে সব ঠিক আছে তো?”
মিরা উপর নিচ মাথা নাড়লো। রামিলা চৌধুরী ও রায়হান চৌধুরী কে রিমি যে এখন এই বাড়িতে অবস্থান করছে তা জানানো হয়েছে তবে রুদ্র এখনো কিছু বলে নি। সবাই মিরার অপেক্ষায় ছিল। রামিলা চৌধুরী রিমির অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করলেন চিন্তিত হয়ে-
“মিরা, রিমি কি ঠিক আছে?”
-“হুম, ঘুমাচ্ছে এখন। তবে গায়ে বেশ তীব্র জ্বর।”
রায়হান চৌধুরী মিরার উদ্দেশ্যে বললেন-
“জ্বর বেশি হলে এখনি বল। আমাদের ফ্যামিলি ডক্টর কে কল দিয়ে আসতে বলি।”
-“না বাবা, সিরিয়াস জ্বর না। ঘুম থেকে উঠলে ওষুধ দিয়ে দিলেই হবে। চিন্তা করো না।”
রায়ান মিরার মুখ দেখে বুঝতে পারছিল মিরা নিজেও অনেকটা সোক খেয়ে গেছে এসবে। মিরার হাত কাঁপতে দেখে রায়ান দ্রুত মিরার কাছে গিয়ে তার দুই হাতের মাঝে নিয়ে আবদ্ধ করে বলল-
“তুমি নিজে আগে চিন্তা বাদ দেও। কিছু হয় নি। আর হবেও না। সব ঠিক আছে। রিমিও ঠিক আছে।”
মিরা বড় নিশ্বাস ত্যাগ করতেই রায়হান চৌধুরী রুদ্র কে জোর গলায় জিজ্ঞেস করলেন-
“আচমকা এসব কিভাবে হলো রুদ্র? তুই থাকতে এমন পরিস্থিতি কিভাবে তৈরি হয়? আসলে কি হয়েছে সেটা এখন বল। মিরাও চলে এসেছে।”
রায়ান বাবার চিন্তা বা কৌতুহল বুঝতে পারলো কিন্তু রুদ্র সেই থেকে মাথা নিচু করে বসে আছে দেখে একটু সময় চাইলো রুদ্র স্বার্থে-
“আব্বু, আমি বলি কি , অনেক রাত হয়েছে। আজ বরং থাক।…”
-“থাকবে কেন ভাইয়া? আমি বলবো বলেই সবার উপস্থিতি চেয়েছি।”
রুদ্র রায়ানের কথার প্রেক্ষিতে নিজের সিদ্ধান্ত জানালো।
রামিলা চৌধুরী একটু চিন্তিত অধৈর্য হয়ে রুদ্র কে জিজ্ঞেস করলেন-
“সেই কখন থেকে বসে আছি। মেয়েটার হয়েছে কি এই চিন্তা শেষ হচ্ছে না। আর তার উপর তুই কিভাবে কি হলো তাও বলছিস না।”
মিরা-“সত্যি ভাইয়া, আর সহ্য হচ্ছে না। অনেক হয়েছে। এবার কি বলবে তুমি, রিমিকে ওর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পর কি এমন হয়েছে?”
রুদ্র সবার কথায় কয়েক ঘন্টা আগের ঘটনা বর্ণনা করা শুরু করলো।
(ফ্লেশব্যাক)
সন্ধ্যা ৭টা~
অপ্রস্তুত একটা মুহূর্তের পর রুদ্র অশান্ত মন নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির উপর হেলান দিয়ে। নিজের মনে হাজারটা দ্বন্দ্বের পর সে অবশেষে আনন্দ অনুভব করলো প্রথমবার তার মনের মানুষের ছোঁয়াতে। রুদ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাঁসি নিজের মুখে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনমনে বলল-
“You are my destiny Rimi..You are ought to be mine..”
রুদ্র গাড়িতে উঠতে নেয় বাড়ি ফেরার জন্য। ড্রাইভিং সিটে বসতেই রুদ্র খেয়াল করলো রিমির ফোন ব্যাগ সব গাড়িতেই রয়ে গেছে। হঠাৎ তাড়াহুড়ো তে দুজনের কারোরই মনে নেই ব্যাগপত্রের কথা। রুদ্র এতে খুশিই হলো- অন্তত এই বাহানাতে রিমিকে আরেকবার দেখতে তো পাবে সে। রুদ্র হাসিমুখে গাড়ি ঘুরিয়ে রিমির বাড়ির দিকে গেল।
এইদিকে রিমির ঠিক খেয়ালই নেই যে সে তার ব্যাগ বা ফোন কিছুই গাড়ি থেকে নিয়ে নামে নি। সে রুদ্রর অদ্ভুত আচরণের মাঝেই ডুবে ছিল আর তার মাঝেই সে নিজের বাড়িতে যায়।
রিমির বাড়ির চাবি রিমির কাছে ছিল যেটা রুদ্রর গাড়িতে। বাড়ির একদম কাছে গিয়ে হঠাৎ রিমির চাবির কথা মাথা এলে তার খেয়াল হলো সে তো কোনো কিছুই নিয়ে নামেনি গাড়ি থেকে। এখন বাড়িতে ঢুকবে কি করে। তবে রিমি দূর থেকে খেয়াল করে দরজায় কোনো প্রকার তালা দেখতে পেল না। এমন কি কাছে আসার পর দরজায় হাত দিয়ে দেখলো দরজাও খোলা, শুধু চাপিয়ে রাখা হয়েছে। এই বাড়ির চাবি কেবল রিমি আর তার ভাইয়ের কাছেই থাকে, যেহেতু সে নয় তার মানে এখন বাড়িতে তার ভাই আছে।
রিমি এক সেকেন্ডের জন্য দ্বিধা করলো ভিতরে যেতে, তবে করার তো কিছু নেই। এই রাতের বেলা যাবেই বা কোথায়? রিমি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে দরজা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকতেই দেখলো ঘরের মেঝেতে বসে রিমির ভাই আর তার আরো দুইজন সঙ্গী মিলে নেশা করছে। রিমির দিকে তিন জন একসাথে তাকায়। রিমির উপস্থিতি তাদের বিরক্ত করলো হয়তো। চার দিন, টানা চার দিন ধরে এই ঘরটা যেন মানুষ ভুলে গেছে। মেঝেতে ছড়ানো খালি বোতল, কিছু ভাঙা, কিছু আধখানা। সিগারেটের ফিল্টার, পোড়া দিয়াশলাই, ঘামে-নেশায় মেশানো এক অদ্ভুত পচা গন্ধ। জানালার পর্দা খুলে গেছে, বাতাস ঢোকে কিন্তু দুর্গন্ধ বেরোয় না। রকি আর তার দুই বন্ধু—বাবু আর লালু—মেঝেতে বসে, দেয়ালে ঠেস দিয়ে নেশার ঘোরে হাসাহাসি করছে।
“কি হচ্ছে টা কি এই ঘরে?”
১ম জন-“এই মালটা কে রে? যত্তসব…!”
“আমি জিজ্ঞেস করছি, এই ঘরে এইসব কি হচ্ছে? এটা কি নেশা করার জায়গা?”
২য় জন-“তুই কে বে শালি? এইডা আমার বন্ধু রকির (রিমির ভাই) বাড়ি। ওই রকি? কস না কেন কিছু। কেডা এইডা?”
রিমির ভাই রিমির দিকে আড় চোখে দেখে বলল-
“আরে এইডা? এইডা একটা মা*গি। চাইর দিন পরে আইজ ফিরলো। কোন বড় লোকের পোলার লগে চো**তে গেছিল কেডা জানে।”
-“ভাইয়া..?”
১ম জন-“ভাইয়া…কি কয় এই মা*গি? তোর বোইন এইডা?”
রকি-“এই হারামজাদি আমার বোন হইবো কোন দুঃখে? তোরা মাল খা তো।”
সবাই একসাথে অনেক জোরে হেঁসে উঠলো। রিমি নিজের ভাইয়ের এমন ব্যবহারে অভ্যস্ত কিন্তু বাইরের কিছু লাফাঙ্গার সামনে নিজের বোনকে এত বাজে ভাষায় পরিচয় করিয়ে দেওয়া রিমির মনে ঘেন্না ধরিয়ে দিল। রিমি রাগের মাথায় নিচু হয়ে একটা মদের বোতল উঠিয়ে মেজে যে ছুঁড়ে মেরে চেঁচিয়ে উঠলো-
“এটা আমারও বাড়ি। এখানে এসব আমি একদম সহ্য করবো না। বেরিয়ে যাও এখনি এখান থেকে।”
কাচ ভাঙার শব্দে ঘর কেঁপে উঠল। তিনজনই উঠে দাঁড়াল।
রকি গর্জে উঠল—
“তুই এইডা কী করলি! মাথা খারাপ নাকি?”
ঠিক তখন বাবু হেসে বলল—
“আরে এত চিল্লাস কেন! বোতল ভাঙছে তো কী হইছে? সুন্দরী মাইয়ার উপরে চিল্লাচিল্লি ভালা লাগে না।।”
রিমি তাকিয়ে রইল ভাইয়ের দিকে। এই সেই ভাই—যার সামনে দাঁড়িয়ে এইটা ফালতু ছেলে এভাবে কথা বলছে, অথচ চোখে কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো লজ্জা নেই। লালু আর বাবু রিমিকে উপর নিচ অব্দি দেখে ধীরে এগিয়ে এসে কণ্ঠ নামিয়ে লালু বলল—
“রকি, আজকে নেশা করার জন্য তো কিছু বাকি নাই, রাইতটার জন্য তোর বোইনটারে আমাগোরে দিয়া দে। কি মাল রে ভাই , কি তেজ, দেখাই নেশা ধইরা যাইতাছে। তোর বোইনের বদলে তোর এক মাসের সব খরচ আমাগোর। রাজি?”
ঘরটা হঠাৎ খুব ছোট হয়ে গেল। রকি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর নেশার ঘোরে হেসে বলল—
“এক মাসের খরচ যদি ঠিক থাকে…নিয়া যা। যা মন চায় কর।
রিমির শরীরটা যেন বরফ হয়ে গেল। রকির কথাটা শেষ হতেই ঘরটার বাতাস বদলে গেল। রিমি এক পা পিছিয়ে গেল। বুকের ভেতর ধক করে উঠল। রকির কথাটা শেষ হতেই ঘরটার বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। নেশার গন্ধ, ভাঙা কাচ আর মানুষের হাসির মধ্যে একটা অচেনা শীতলতা ঢুকে পড়ল। রিমি এক পা পিছিয়ে গেল। বুকের ভেতর ধক করে উঠল—এটা ভয় নয়, এটা বিশ্বাস ভাঙার শব্দ। তার চোখ স্বাভাবিকভাবেই ভাইয়ের দিকে গেল।
—”ভাই…য়া?”
এই একটা শব্দেই ছিল সব অভিযোগ, অনুরোধ, আর সেই শিশুকালের নির্ভরতা। কিন্তু কোনো উত্তর এল না। রকি দাঁড়িয়ে রইল। চোখে কোনো লজ্জা নেই, নেই কোনো প্রতিবাদ। নেশার ঘোরে ঠোঁটের কোণে একটা আলস্যভরা হাসি। রিমির বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। এই মানুষটাকে সে ভাই বলে ডেকেছে? এই মানুষটার কাছেই সে নিরাপত্তা খুঁজেছে? ঠিক তখন বাবু আর লালু ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
তাদের পায়ের শব্দে মেঝের কাচ কেঁপে উঠল। নেশায় চোখ লাল, দৃষ্টিতে কৌতুক আর নিষ্ঠুরতা মিশে।বাবু আর লালু ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। নেশায় চোখ লাল, মুখে বিকৃত হাসি।
—”ভয় পাস ক্যান? আপসে মাইনা গেলে কষ্ট দিমু না আমরা।”
বাবু হাত বাড়াল। রিমির কিছু বোঝার আগেই এমন কিছু হলো বলে। রিমির শরীরটা আচমকা শক্ত হয়ে গেল। তার ভেতরের সবকিছু চিৎকার করে উঠল—এখান থেকে বেরোতে হবে। সে আচমকা ঘুরে দরজার দিকে ছুটতে চাইল। কিন্তু লালু পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার জামার পিছনের অংশটা মুঠো করে ধরল—ছেঁড়া কাপড়ের শব্দে রিমির চিৎকার বেরিয়ে এল-“আআআহ্..!”
কাপড় ছেঁড়ার শব্দটা ঘরের ভেতর কেমন অস্বাভাবিক জোরে বাজল। রিমির মুখ থেকে চিৎকার বেরিয়ে এল। এই চিৎকারে ছিল ভয়, অপমান, আর ভাইয়ের সামনে ভেঙে পড়ার লজ্জা।
সে ঝাঁকুনি দিল। বাবু সামনে থেকে তার হাত চেপে ধরল।
নখ বসে গেল বাহুতে। ব্যথায় রিমির চোখে পানি চলে এলো, কিন্তু সে কাঁদল না। কাঁদার চেয়ে তখন তার বেশি মনে হচ্ছিল—এটা কি সত্যি? সত্যি কি এসব হচ্ছে তার সাথে? রকি তখনো দাঁড়িয়ে, চুপচাপ নেশার ঘোরে হাসছে। এই দৃশ্যটাই রিমিকে ভেঙে দিল।ভাইয়ের চোখে সে তখন আর মানুষ নয়—একটা জিনিস যার শরীরের বদলে সে নিজের নেশার যোগার করছে।
-“আমার থেকে দূরে যান। আমার কাছে আসবেন না। আল্লাহর দোহাই লাগে আমার এতো বড় ক্ষতি করবেন না। আমি তো আপনাদের বোনের মতো। ছেড়ে দিন আমায়।”
রিমি কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে বলল।
লালু দাঁত বের করে বলল—
—”এত চিল্লাস কেন? মজা হবে অনেক। সুযোগ তো দে।”
রিমি দু’হাতে ধাক্কা দিল। এক পা দিয়ে লাথি মারল। কিন্তু তিনজনের শক্তির কাছে সে একা। তার জামার হাতা আরেক টানে ছিঁড়ে গেল। কাঁধে বাতাস লাগল। শীতল, অথচ অপমানজনক। এমন অবস্থায় একটা মেয়ে আর কত নিজেকে সামলাতে পারে! রিমি নিজের শরীরটাকে দু’হাতে ঢেকে ফেলে ভয়ে কুঁকড়ে গেল ঘরে এক কোণায় দেয়ালের সাথে। অঝড়ে কাঁদছে মেয়েটা কিন্তু সামনের মানুষ গুলো আর মানুষ নেই তারা এখন পুরোপুরি পশুর রূপ ধারন করে নিয়েছে।
-“প্লিজ দয়া করুন আমায়। আমার সাথে কিছু করবেন না। আপনাদের যত টাকা লাগে আমি দেব। আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ। আমার কাছে আসবেন না, আমি চেঁচাবো নয়তো।”
রিমি উপায় না পেয়ে চেচাতে চাইলে লালু সাথে সাথে এসে রিমির মুখ ধরে ফেলল-
“আরে চুপ যা রে শালি। চিৎকার কইরা লাভ নাই।”
রিমি হাত পা ছুড়তে লাগলে বাবু এসে রিমির হাত পা ধরে। রিমি তখন অসহায় হয়ে দুই চোখ বন্ধ করে সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাইলো-
“আল্লাহ তুমি সহায় হও। আমার রক্ষা করো আল্লাহ। কিছু একটা করো।”
এমন সময় হঠাৎ রুদ্র রিমির বাড়ির সামনে এসে পৌঁছালো আর রিমিকে ডাকলো-
“রিমি..রিমি..!”
রিমি ঘর থেকে রুদ্রর আওয়াজ শুনে সাথে সাথে নিজের চোখ খুলে তাকালো দরজার দিকে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে শুকরিয়া আদায় করলো। মনে সাহস ফিরে পেল নিজেকে রক্ষা করার। কিন্তু রুদ্র কে ডাকার সুযোগ ছিল না।
-“রিমি.. শুনছেন! আমি রুদ্র..আমি আপনার ব্যাগ গুলো দিতে এসেছি।”
ঘরের ভিতরে কোনো শব্দ নেই। বাকিরাও রুদ্রর আওয়াজে সাবধান হয়ে গেছে। রিমির মনে হলো তার কিছু একটা করতে হবে। নিজের অবশিষ্ট সাহস টুকু যুগিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার মুখের উপর রাখা লালুর হাতে সজোরে কামড় বসালো। মুখের উপর থেকে হাতটা সরে যেতেই রিমি ভাঙা গলায় চিৎকার করলো-
“হেল্প.. প্লিজ..!”
রিমির আওয়াজ স্পষ্ট ছিল রুদ্রর শোনার জন্য। রুদ্রর কানে রিমির এমন অসহায় চিৎকার পৌঁছাতেই রুদ্রর বুক কেঁপে উঠলো।
-“রিমি..রিমি..দরজা খুলুন। কি হয়েছে..?”
লালু দ্বিতীয় বার আবার রিমির মুখে চেপে ধরে। রুদ্র আর রিমির আওয়াজ না পেয়ে এক লাথি তে দরজা ভেঙে ফেলে যেন এক সেকেন্ডের অপেক্ষা অনেক বেশি সময় নষ্ট।
একটা বিকট শব্দে দরজাটা আর খুলল না, ভেঙে পড়ল।
কাঠের পাল্লা ছিটকে গিয়ে দেয়ালে আছড়ে লাগল। ধুলো উড়ল। ভাঙা কাঠের গন্ধ আর পুরনো নেশার গন্ধ একসাথে মিশে গেল। রুদ্র ঘরে ঢুকল। সে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল।
এই এক মুহূর্তে তার চোখ ঘরের চারপাশটা গিলে নিল—মেঝেতে ভাঙা বোতল, ছড়িয়ে থাকা সিগারেটের ফিল্টার, উল্টে থাকা চেয়ার, দেয়ালে হাতের ছাপ। চার দিনের নোংরামি আর মানুষহীনতার চিহ্ন স্পষ্ট। তার বুকের ভেতর রাগ জমতে শুরু করল। তারপর তার চোখ আটকে গেল ঘরের এক কোণে। ওখানে কুঁকড়ে বসে আছে রিমি।
মেঝেতে বসে, হাঁটু বুকের কাছে টেনে, ছেঁড়া জামা দু’হাতে চেপে ধরা। চুল এলোমেলো, মুখ নিচু, শরীরটা কাঁপছে—শীতের জন্য না, ভয় আর অপমানের জন্য। তার চারপাশে বাবু আর লালু দাঁড়িয়ে, নেশায় চোখ লাল, মুখে বিকৃত কৌতুকের ছায়া। এই দৃশ্যটাই রুদ্রর মাথার ভেতর কিছু একটা ভেঙে দিল। তার কানে তখন আর কোনো শব্দ ঢুকছে না। রক্ত যেন কানে গর্জন তুলছে। সে আর ভাবল না। এক ঝটকায় এগিয়ে গিয়ে বাবুকে কলার ধরে রিমির কাছ থেকে টেনে সরিয়ে দিল। বাবু কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুদ্রর ঘুষিতে সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। লালু ঘুরে দাঁড়াতে চাইতেই রুদ্র তাকে ধাক্কা মেরে দেয়ালের দিকে ছুড়ে দিল। চেয়ার উল্টে পড়ল, বোতল গড়িয়ে গিয়ে ভাঙল। রকি কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
নেশার ঘোরে মুখ বেঁকিয়ে হাসছিল। রুদ্র তার দিকে তাকাল।
এই তাকানোয় কোনো চিৎকার ছিল না, কোনো হুমকিও না—ছিল এমন এক নীরব আগুন, যা মানুষকে ভিতর থেকে ভস্ম করে দেয়। রকি পিছিয়ে গেল। রুদ্র তখন আর মারতে থাকল না। সে ঘুরে গেল রিমির দিকে। মেঝেতে বসে পড়ল তার সামনে, যেন নিজেকে নিচু করে তার চোখের সমান হতে চায়। রিমির চোখ তখন ফাঁকা, পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে বুঝতে পারছে না সে কোথায় আছে।
—”রিমি…”
রুদ্র খুব ধীরে বলল।
—”আমি এসে গেছি। আর কেউ কিছু করবে না।”
এই কথাটা রিমির কানে ঢুকল কি না, জানা গেল না। তার শরীর তখনো কাঁপছে। রুদ্র তখন তার ছেঁড়া জামার দিকে তাকাল। এই দৃশ্যটা তার বুকের ভেতর ছুরি বসাল। সে কোনো প্রশ্ন করল না। নিজের কোট খুলে খুব সাবধানে, খুব সম্মানের সাথে রিমির কাঁধে জড়িয়ে দিল। এই ছোঁয়ায় কোনো তাড়া ছিল না, কোনো দাবি ছিল না—শুধু নিরাপত্তা। ঠিক তখনই রকি হেসে উঠল- হাসিটা কুৎসিত, নেশায় ভেজা।
—”এই লাট সাবের সাথে গেছিলি! চার দিন ধরে ফোসটিনস্টি করে আইসোস! ঠিকই করছিলাম তোর হাত-পা পুড়াইয়া! তোরেই জেন্ত পুরাইয়া দেওয়া উচিত আছিলো!”
এই কথাগুলো শোনার সাথে সাথেই রিমির ভেতরের বাঁধটা ভেঙে গেল। সে জোরে জোরে কাঁদতে লাগল। এমন কান্না—যেখানে শব্দ আছে, কিন্তু ভাষা নেই। আর সেই কান্নার মাঝেই রুদ্র সব বুঝে গেল। দেড় মাসের নিখোঁজ থাকা, হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ, হাসপাতালের হঠাৎ দেখা, রিমির হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ- সব কিছুর পেছনের আসল কারণ। আসলে রিমি টাকা দেয়নি বলেই—তার নিজের ভাই তার হাত আর পা গরম লোহার দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। এই উপলব্ধিটা রুদ্রর চোখ অন্ধ করে দিল। সে আবার রকির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
এবার মার ছিল না শুধু—ছিল ঘৃণা, প্রতিশোধ আর বিচার। কয়েকটা আঘাতের পর সে নিজেই থামল, কারণ রিমির কান্না তখনো চলছিল। সে দ্রুত ফিরে এল রিমির কাছে।
রিমিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এই জড়িয়ে ধরায় ছিল না প্রেম—ছিল আশ্রয়, ছিল ভরসা।
—”চুপ…চুপ। শান্ত হন। কিচ্ছু হয় নি। আমি আছি। আর কিছু হবে না।”
একটু পরেই উঠোনে লোক জমল। ফিসফাস, কৌতূহলী চোখ, চাপা আলোচনা। পুলিশ এল। হাতকড়া পরানো হলো অপরাধীদের। কিন্তু সমাজ তখনো থামল না। বাড়ির সামনে ভীরের মাঝে লোকজনের সমালোচনা আরো বারলো।
—”এই মেয়ের কি আর বিয়ে হবে নাকি? নিজের ভাই যে মেয়ে শরীর বিক্রি করে ওই মেয়ের সাথে কে জাড়াবে? না জানি এর আগে কত এমন হয়েছে।”
—” হ্যাঁ তাই তো, কে জানে কী কী হয়েছে! আদতেও মেয়ের চরিত্র কেমন কে জানে।”
রিমি তখন পাথরের মতো শুধু বসে বসে লোকের কথা গুলো শুনছে তবে সব শব্দ যেন তার শরীর ছুঁয়ে ফিরে যাচ্ছে। অনুভূতিগুলো এখন মৃত। তার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে একটু আগে তার সাথে কি হয়েছে। চোখের পানি চোখের গন্ডি পার করতে চাইছে না। সবকিছুই তুচ্ছ মনে হচ্ছে।
কিন্তু রুদ্র পারল না রিমির উপর আসা সব অপমানজনক কথা গুলো সহ্য করতে। সে সামনে এগিয়ে এসে জোর গলায় প্রতিবাদ করে বলল—
“আপনাদের লজ্জা করে না? আপনাদের ঘরেও তো মেয়ে আছে! কিভাবে বলতে পারেন একটা মেয়েকে নিয়ে এমন কথা? এতে এই মেয়েটার কি দোষ?”
লোকজন তবু থামল না—”ভুল তো নয়। এমন মেয়েকে কে বিয়ে করবে? যার ভাই এমন তার নিজের চরিত্র কেমন হবে?”
রুদ্র নিজের মনকে সামলাতে পারলো না। সে তৎক্ষণাৎ রিমির হাত ধরে নিজের পাশে দাঁড়া করিয়ে ঘোষণা করলো-
“আমি করবো। আমি এমন মেয়েকেই বিয়ে করবো। একবার না—হাজারবার করতেও রাজি। এমন মেয়েকে বিয়ে করে নিজেকে আমি ভাগ্যবান মনে করবো।”
দয়া করে না, রিমিকে সম্মান দিয়ে রুদ্র নিজের কথা উপস্থাপন করলো। কেউ হাসল। কেউ সন্দেহ করল।
“হাহ্! সব মুখের কথা এইসব। মেয়েটাকে ব্যবহার করে ছেড়ে দেবে।”
রুদ্র এক মুহূর্ত দেরি করল না। রিমির অসম্মান থামাতে সেই মুহূর্তে তার যা ঠিক মনে হলো তাই করলো।
—”কাজি ডাকুন। আজ এই মুহূর্তে আমি রিমিকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে আপনাদের এই নোংরা জায়গা থেকে নিজের সাথে নিয়ে যাবো। যেই মেয়ে আপনাদের জন্য লজ্জার কারণ সেই মেয়ে কে আমি আমার সম্মান বানিয়ে এখান থেকে নিয়ে যাবো।”
রিমি তখন রুদ্রর দিকে তাকাল। তার চোখে ছিল না আনন্দ, না স্বস্তি, ছিল ভয় আর প্রশ্ন।সে ভাবছিল—
“সে কি এতটাই তুচ্ছ হয়ে গেছে, যে এখন তাকে সুরক্ষা দিতে। কারও নিজের জীবন সামনে আনতে হয়?”
এই প্রশ্নটাই তখন তার ভেতরে সবচেয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রইল।
রিমি নীরবতা ভেঙে রুদ্র কে সোজা নজরে জিজ্ঞেস করলো-
“আমাকে বিয়ে করে আমাকে করুণা করতে চাইছেন?”
রুদ্র রিমির দিকে অবাক চোখে তাকালো। রুদ্রর মনের কোনো জায়গায় এই “করুণা” শব্দটি নেই। রুদ্র রিমিকে চায় আর এটা কোনো রকম ভাবনা চিন্তার ভেতরে ছিল না। রুদ্র রিমির কথা শুনে অনেকটা ভেঙে গেছিল-
“আপনার কি তাই মনে হচ্ছে রিমি?”
রিমি নিজেও জানে রুদ্র ওকে ভালোবেসে সে নিজেও রুদ্র কে পছন্দ করে কিন্তু এর মাঝে এখন যে পরিস্থিতি তাতে কখনোই সে রুদ্র কে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দিতে পারে না। বিয়ে করা কোনো সহজ সমাধান নয়। এটার প্রভাব পরবে রুদ্র জীবনে।
-“বড় মনের পরিচয় দিতে নিজের সাজানো গোছানো
জীবন টা এলোমেলো করবেন না রুদ্র।”
রুদ্রর কাছে রিমি ছাড়া আর কিছুই তখন গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল না। রিমির সাথে সে এলোমেলো জীবন পার করতেও রাজি।
-“আমি যদি সেই এলোমেলো জীবন আপনার হাতে তুলে দেই- গুছিয়ে দিতে পারবেন না?”
রিমি রুদ্রর অনুভূতি বুঝতে পারলো কিন্তু তার মন মানছে না।
-“বিয়ে ছেলে খেলা নয় রুদ্র। কি জবাব দেবেন সমাজে?
কে আমি? কি পরিচয় আমার?”
রিমির কথায় রুদ্রর সিদ্ধান্তে কোনো প্রকার পরিবর্তন হয় নি। রুদ্র রিমির হাত শক্ত করে ধরে নিজের মনের কথা রাখলো রিমির সামনে-
“আমার পূর্ণতা আপনি। আমার বউ..এর বাইরে আপনার কোনো পরিচয় সমাজের জানার প্রয়োজন নেই। I don’t care about that..”
-“But I do.. I do care..আমার না থাকলেও আপনার চারপাশের মানুষ জন, আপনার পরিবার, তারা যে সমাজের মানুষ এসব নিয়ে আমি কেয়ার করি।”
রুদ্র হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো-
“সব সময় শুধু সমাজ কি বলবে, সমাজ কি করবে.. আমাদের চাওয়ার কি কোনো মূল্যই নেই?
রিমি কাঁদতে কাঁদতে বলল-
“আচ্ছা, ঠিক আছে। মানছি,সব কিছুই মূল্য হীন। আপনিই বলুন, কিসের মূল্য আছে তাহলে?”
-“That I fucking love you damn it..I love you Rimi..Can’t you feel it? Am I not worth of Your love..? আমার মাঝে কি সমস্যা আছে বলুন আমি ঠিক করে নিব নিজেকে।”
রুদ্র রিমিকে নিজের কথা চেয়েও বোঝাতে পারছিল না বলে সে নিজেও ক্লান্ত। আর কিভাবে বোঝাবে ছেলেটা যে শুধু সামনের মানুষ টা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তার চারপাশের মানুষ গুলো না। রুদ্র নিজের সর্বোচ্চ টুকু রিমির কাছে নিজেকে তুলে ধরল।
রিমি রুদ্রর কথার উপর আর কোনো কথা বলতেই পরলো না। হয়তো তার তেমন সুযোগ ও ছিল না। তার পর এলাকার সকলে মিলেই রিমি আর রুদ্রর বিয়ে দেয়। কোনো প্রকার আয়োজন নেই, সাজ সজ্জা নেই, কোনো হাসি নেই- দুইজন এলোমেলো অবস্থায় এক কাপড়ে, রিমির মাথায় শুধু একটা ওড়না দিয়ে রুদ্র রিমিকে নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে তাকে গ্রহণ করেছে। দুইজনে অন্য ঘরে থেকে একে অপরের জন্য কবুল বলেছে, কাগজে সাইন করেছে। এভাবেও বিয়ে হয়, কেউ ভাবে নি, তবে হলো ঠিকই।
(বর্তমান)
রুদ্র নিজের দেখা ও জানা অংশ টুকু সবার সামনে বলল। উপস্থিত সবার চোখে পানি। রায়ান মিরাকে একহাতে ধরে আছে। দুনিয়ার বাস্তবতা আজ কতটা নিষ্ঠুর পর্যায়ে গেছে তা ভাবারও অযোগ্য। রামিলা চৌধুরী রায়হান চৌধুরী দুইজনেই সম্পূর্ণ নীরব। রুদ্র নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে মা বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল-
“আমি জানি আমি তোমাদের না জানিয়ে অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সত্যি বলতে আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত না। আমি রিমিকে ভীষণ ভালোবাসি। এটা হওয়ার ছিল তবে এভাবে হয়তো না। রিমির আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর ওনার জন্য আমার পরিবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার আশা থাকবে তোমরা সবাই ওনার চোখে আমাকে ছোট হতে দেবে না। মিরা ভাবিকে যেভাবে ভালো বাসো একই ভাবে ওনাকে আপন করে নাও। উনি অনেক খারাপ এটা পরিস্থিতির মাঝে আছে এখন, একটু একসাথে মিলে সামলে নাও। প্লিজ।”
মিরা পিছন থেকে বলে উঠলো-
“কেন? আমাকে যেমন ভালোবাসে তেমন কেন বাসবে?”
রুদ্র পিছনে ঘুরে মিরার দিকে তাকায়। মিরা চোখের পানি মুছতে মুছতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“আমাকে যতটা ভালোবাসে সবাই, তার চেয়ে বেশি ভালোবাসা পাবে তোমার বউ। ওর জন্য তো আমার মতো একটা জা ও আছে। আমার থেকেও ভালোবাসা পাবে। বাকিদের থেকেও পাবে। তো বেশি ভালোবাসাই তো হলো।”
রুদ্র হেঁসে মিরাকে একবার জড়িয়ে ধরলো। পিছন থেকে রায়ান রুদ্রর কাঁধে হাত রেখে বলল-
“রিমির জীবনে না পাওয়া বড় ভাইয়ের সুরক্ষা দিতে আমি থাকবো। এটা নিয়ে তোর ভাবতে হবে না।”
তার পর পরই রামিলা চৌধুরী দাঁড়িয়ে উঠে বললেন-
“ছেলে আমার কতো দায়িত্ববান হয়েছে। তুই ভাবলি কি করে তোর মা বাবা তোর সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করবে? আর হ্যাঁ রিমি যদি আর কখনো বলে ওর কেউ নেই অনেক বকা খাবে আমার কাছে। তোর বউকে আগের থেকে বলে দিস। মায়েরা অনেক বকা ঝকা করে। ছেলের বউ বলে ছেড়ে কথা বলবো না আমি। এই বাড়িতে বউ রা মেয়ের সমান।”
রায়হান চৌধুরী তৎক্ষণাৎ উঠে বলল-
“আচ্ছা রিমির কি কি পছন্দ খেতে বল তো? কাল আনিয়ে রাখবো। ভালো লাগবে হয়তো। নতুন নতুন মেয়ের বাবা হয়েছি মনে হচ্ছে, কিভাবে মেয়ের মন ভালো করতে হয় তা তো জানা নেই। কেউ আইডিয়া দে।”
সবাই রায়হান চৌধুরীর কথায় কান্নার মাঝে ও হেঁসে উঠলো। কিন্তু হঠাৎ সোরায়া মুখ ভার করে বলল-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৭ (২)
“ধুর এটা কোনো কাজ করলে তুমি? এখন তো আমি কনফিউজড হয়ে গেছি। রিমি আপু ডাকবো না ভাবি? আপু আমাকে ননদ বানাবে না বোন? আমি কি এখন দুষ্টমি করতে পারবো আগের মতো? পরে আবার সিরিয়ালের কুটনি ননদ গুলোর মতো মনে করবে না তো আমাকে? কি চিন্তা কি চিন্তা..!”
সোরায়ার কথায় যেন ষোলকলা পূর্ণ হলো। রুদ্র সবাইকে কৃতজ্ঞতার নজরে দেখলো। আজ তার সত্যি নিজের পরিবারকে নিয়ে গর্ব হচ্ছে। তথাকথিত সমাজে এমন পরিবার কয়জনেরই বা হয়।
