আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫১
নাবিলা ইষ্ক
ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়ানো শান্ত নিজেকে স্বাভাবিক করল। কলিং বেল বাজিয়ে মুখটাকে ভীষণ গুরুগম্ভীর বানিয়ে রাখল। সে জানিয়ে ফিরেছে বাসায়। এতে এখুনি ঝুমুর দরজা খুলবে ছুটে এসে। তৃষ্ণার্ত চোখে চেয়েই থাকবে তাও শান্ত জানে। যখন শান্ত পাত্তা দেবে না অভিমানে ছলছল চোখে চেয়ে গাল ফোলাবে! অথচ তেমন কিছু হলো না। তার প্রত্যাশা মোতাবেক দরজা খোলেনি ঝুমুর। দরজা খুলে দিয়েছেন নুরী বেগম। ভদ্রমহিলা গাল ভরে হেসে বললেন –
‘ফিরছো বাপজান! শরবত বানাইয়া রাখছি তোমার লইজ্ঞা। নিয়া আসিই।’
ভদ্রমহিলা ভীষণ ব্যস্ত ভাবে রান্নাঘরের দিকে ছুটেছেন। শান্ত আলিশান ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমের সোফায় বোকার মতো বসল। আশেপাশে কোথাও ঝুমুর নেই। কোথা থেকে সৌরভ উড়ে এসে বসল তার পায়ের কাছে। দু-পা জড়িয়ে আহ্লাদে গদগদ হয়ে আলাপ শুরু করেছে। অথচ ওর কথায় বিন্দুমাত্র মনোযোগ দিতে পারল না শান্ত। তখুনি নুরী বেগম এলেন একগ্লাস শরবত নিয়ে। ধরিয়ে দিলেন শান্তর হাতে। শান্ত তখনো নজর বুলিয়ে যাচ্ছে চতুর্দিকে। কপালে পড়েছে কয়েকটি ভাঁজ। ঝুমুরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থেমে গেলো ফের। সে তো রেগে আছে ঝুমুরের ওপর। থোতায় লাথি মারা মেয়েটার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ তো তার করার কথা না। ঝুমুর কোথায়? আশ্চর্য! শান্ত গলাটা তুলল, প্রায় চিৎকার করে প্রশ্ন করল –
‘চাচি, আপনার কী খবর? মানিয়ে গুছিয়ে নিতে পেরেছেন? সমস্যা হয়নি তো?’
হয়তোবা বুঝতে পারেনি শান্ত ফিরেছে। নাহলে নিশ্চয়ই ছুটে বেরিয়ে আসতো। এখন যেহেতু সে গলা চড়িয়ে কথা বলছে তার আওয়াজে এই ছুটে আসলো বলে! অন্যদিকে নুরী বেগম থতমত খেয়েছেন। সে তো কালা না। দিব্যি ভালো শুনতে পান কানে। চোখ পিটপিট করে আওড়ালেন –
‘সব ঠিকই আছে, বাপজান। তয় আপনে….’
বলতে পারলেন না ভদ্রমহিলা। শান্ত পুনরায় গলা হিমালয় ছুঁইয়ে বলতে লাগল –
‘ক্ষুদা লাগছে, চাচি। খাবার লাগান।’
নুরী বেগম বেয়াকুবের মতো নিজের কান চেপে ধরলেন। শান্তর চঞ্চল দৃষ্টি লক্ষ্য করে অবশেষে বুঝি বুঝলেন কিছু! বুঝবেন না? মেয়েটা দুটো দিন কতো কান্নাকাটি করল! দুজানার ভেতর যে মান-অভিমান চলছে ঠাওর করতে পেরেছেন। ঠোঁট টিপে নিঃশব্দে হেসে ফেললেন। ফিসফিস করে আগ বাড়িয়ে বললেন –
‘ঝগড়া হইসে? খুব কাইন্নাকাইট্টা এখন মাইয়াডা অভিমান করছে। একটু অভিমান ভাঙাও বউয়ের।’
শান্তর চোয়াল শক্ত হলো সাথে সাথে। অভিমান করেছে মহারানি! তার অভিমান ভাঙাতে হবে আবার! কতো বড়ো স্পর্ধা! শান্ত শিকদারকে লাথি মেরে আবার নিজে অভিমান করে বসে আছে! আওয়াজ শুনেও বেরিয়ে এলো না! শান্ত উঠে কদম বাড়াল বেডরুমের দিকে। দরজাটা একরকম শব্দ করে খুলে প্রবেশ করে বোঝাল ফাজলামোর মুডে সে নেই। ঝুমুরকে আছাড় মারবে অবাধ্য হলেই! অথচ সামনে তাকাতেই জমে গেলো পুরোপুরি! মাথার ভেতরটা বোধহয় ফাঁকা হয়ে এলো একমুহুর্তের জন্য! ড্রেসিং টেবিলের সামনে ঝুমুর বসে আছে। খুব মনোযোগের সাথে লম্বা চুলে চুরুনি চালাচ্ছে। ওমন আওয়াজেও ফিরে তাকাল না। পরনে খুবই ফিনফিনে পাতলা, মসৃন কাপড়ের খোলামেলা নাইটি। শরীরের ভাঁজ চোখের সামনে আরও জোড়ালো ভাবে ফোটাতে চমৎকার কাজ করছে! ফর্সা কাঁধে চেয়ে শান্তর মুখটা হা হয়ে খুলে আছে। চিরুনি রেখে ঝুমুর উঠে দাঁড়াল। ঘুরে বিছানায় এলোমেলো হয়ে থাকা কম্ফোর্টার গোছাতে ব্যস্ত হলো। দু-হাতে সোনার বালা, নাকে সোনার নাকফুল। সব মিলিয়ে শান্তর চোখ ঝলসে গেলো। ঝুমুর খুব নিপুণ ভাবে লোকাল হাত দুটোর কম্পন। লজ্জায় বুজে আসতে চাওয়া চোখজোড়া স্বাভাবিক রাখল। নীরবতা ভাঙল শান্তর সম্মোহিত কণ্ঠ –
‘তুই কি আমাকে মে রে ফেলার প্ল্যান করেছিস!’
মুখটা আড়াল করে চোখ বুজল ঝুমুর। লজ্জায় দমবন্ধ হয়ে আসছে। সময় অপচয় করা যাবে না। এখুনি সে বেরিয়ে যাবে। অন্যরুমে প্রবেশ করে ঘাপটি মারবে। আজ রাতের জন্য আর বেরুবে না সে। দ্রুতো কম্ফোর্টার গুছিয়ে রেখে, সুতি একটা ওড়না গায়ে জড়িয়ে শান্তকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতেই শান্তর হুঁশ ফিরল পুরোপুরি! চোখ বড়ো করে প্রায় দৌড়াল পেছনে –
‘এগুলো পরে তুই রুম থেকে বেরুচ্ছিস কেনো, বেয়াদব!’
শান্ত অবুঝ, তখনো বুঝে উঠতে পারেনি ঝুমুরের মতিগতি। ঝুমুর ততক্ষণে দ্রুত গতিতে পাশের রুমে ঢুকে দরজা লক করে ফেলেছে। দরজায় মাথা ঠুকে লজ্জা নিঃশব্দে হেসে ফেলল! শান্ত সব ভুলে সমানে দরজায় করাঘাত করছে –
‘ঝুমুর! ঝুমুর! এসবের মানে কী?’
বলতে বলতে অধৈর্য্য ভঙ্গিতে দরজায় এমনভাবে আঘাত শুরু করল যেন ভেঙে ফেলবে! নুরী বেগম, সৌরভ তার হট্টগোলের আওয়াজে চলে এসেছে। তাদের তাজ্জব দৃষ্টির সামনে শান্ত প্রায় আর্তনাদ করে উঠল –
‘মানে কী এসবের? দরজা লাগিয়েছিস কেনো? দরজা খোল।’
নুরী বেগম এযাত্রায় কিছু বলার সুযোগ পেলেন, ‘ঝুমুর তো কইল আইজ এই ঘরে থাকব।’
শান্ত আকাশ থেকে পড়ল, ‘তা থাকুক, দরজা লাগিয়েছো ক্যানো?
‘একা থাকব কইল।’
শান্ত প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘একা থাকবে মাই ফুট!!’
ঝুমুর হাসছে, হাসতে হাসতে শুয়ে পড়েছে বিছানায়। বাইরে তখনো শান্ত ঝামেলা করে যাচ্ছে। শাসানো হচ্ছে তাকে। একসময় শোনা গেল পরাজিত কণ্ঠ শান্তর –
‘আচ্ছা, সরিইই। শুনেছিস? আম সরিই। শান্ত শিকদার ইজ সরি। আর এড়াব না। কখনো না। তুই থোতায় কেনো, বুকেও লাথি মারিস কিচ্ছু বলব না। ঝুমুর, দরজা খোল। প্লিজ!’
ঝুমুর লজ্জায় বালিশে মুখ গুঁজল। মন গলেছে তার। উহুঁ, তাও সে এই দরজা আজ আর খুলবে না। ধীরে ধীরে সময় পেরুল, থামল শান্তর দরজা পেটানো, আহাজারি। ঘড়ির কাঁটা করছে রাতের দুটোয়। ঝুমুর ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ দরজা খোলার মৃদু শব্দে ঘুমটা ছুটে গেলো। ঝুমুর ফিরে তাকাতেই চমকে উঠল। শোয়া থেকে উঠে বসতেও পারেনি। শান্ত দরজা লক করে, ডুপ্লিকেট চাবিটা কোথাও একটা ছুঁড়ে ফেলেঝড়ের গতিতে এসে ঝাপিয়ে পড়ল পাতলা গড়নের শরীরটার ওপরে। ঝুমুর ডুবল ভারি শরীরটার নিচে।
‘কী ভেবেছিলি? আমার থেকে ছাড় পাবি? ছাড়ব তোকে? প্রয়োজনে আমি দরজা ভেঙে ফেলতাম। এখনো চিনিসনি তোর শান্তকে?’
ঝুমুর একটা শব্দও আর উচ্চারণ করতে পারল না। তাকে কোনোপ্রকারের সুযোগই দেওয়া হলো না।
‘মম, দিস ইজ মি। ক্যান ইউ বিলিভ ইট? কী টাইনি আমি!’
রোযা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল অ্যালবামের ছবগুলো। সদ্য জন্মানো থেকে সাত বছরের হৃদির প্রতিটা মুহূর্তের ছবি আছে। একটা ছবিতে তার দৃষ্টি অনেকটা সময় আঁটকে থাকল। ছবিটি এমন –
আদিল মির্জার সুঠাম দেহে শুভ্র রঙা একটা শার্ট জড়ান। বোতাম লাগানো নেই। খোলা, শক্ত বুকে একহাতে বাচ্চা হৃদিকে জড়িয়ে রেখেছে। হৃদির নাকের ডগায় চুমু বসিয়েছে।
আদিল তেমন পরিবর্তন হয়নি। কয়েক বছর আগে যা এখনো তাই দেখায়। হৃদি একেক করে আরও অনেক সব ছবি দেখাচ্ছে। রোযাও নিপুণ দৃষ্টিতে দেখছে। আরেকটা ছবি এমন –
হৃদি সবে হাঁটতে শিখেছে। বাগানে দুহাত শূন্যতে তুলে টুকটুক করে হেঁটে এগুতে চাচ্ছে। তার থেকে দুহাত দূরত্ব রেখে সামনেই দু-পায়ের ওপর ভর দিয়ে বসেছে আদিল। দু-হবাড়িয়ে রেখেছে মেয়ের জন্য, বাচ্চাটা দু-গাল ভরে হাসছে বাবার দিকে তাকিয়ে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে শান্ত, এলেন। তারা হাসছে।
ছবিটা দেখে শান্তিতে রোযার চোখ দুটো ভরে গেলো। এমন আরও চমৎকার সব ছবি দেখে সারাবেলা কাটল মা-মেয়ের। বেশ কটাদিন ধরে আদিল বাড়ি ফিরলেও তেমন বেশিক্ষণ থাকছে না। সম্ভবত শুধু চোখের দেখা দেখতেই তার বাড়ি ফেরা। এতো ব্যস্ততা কীসের রোযার বুঝে আসে না! জীবনের কোনো নিয়মশৃঙ্খলা নেই মানুষটার! এইতো দুপুরের দিকে এসে গোসল নিয়ে একসাথে লাঞ্চ করে পুনরায় বেরিয়ে গিয়েছে। কী এক হট্টগোল বয়ে যায় তখন! সে বাড়ি ফিরলে মনে হয় সুনামি বইছে। আর বেরিয়ে গেলে সুনসান নীরবতা।
‘মম…’
ডেকে হৃদি চোখ ডলল। ঘুম ধরেছে তার। রোযা উঠল সোফা থেকে। দুহাত বাড়াতেই কোলে চলে এলো রোযার। হৃদি ছোটোখাটো গড়নের, পাতলা। বোঝার উপায় নেই সাত বছরের বাচ্চা সে। এখনো এইটুকুন লাগে। এইজন্যই রোযা এখনো কোলে নিতে পারে। রোযা কদম বাড়াতেই নূরজাহান এসে দাঁড়াল। বলল –
‘ম্যাডাম, আমায় দিন। আমি নিচ্ছি।’
হৃদি গুঙিয়ে মাথা নাড়িয়ে বোঝাল, যাবে না। মায়ের গলা জড়িয়ে পড়ে থাকল কাঁধে। রোযা হেসে নিজেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলো। পিছুপিছু এলো নূরজাহানও। সেদিন রোযা পুরাতন ছবিটা দেখে অনেক প্রশ্ন করেছিল নূরজাহানকে। বিপরীতে চুপ ছিলো নূরজাহান। একটা শব্দও বলল না। শুধু জানিয়েছে, ছবিতে ছিলো আদিল মির্জা আর তার মৃত বাবা-মা। অথচ এতো বছর ধরে ্রোযা এই বাড়িতে কাজ করেছে কখনো শোনেনি তাদের সম্পর্কে। না কখনো কোনো ছবি দেখেছে, যেন কোনো অস্তিত্বই নেই। এতো বড়ো বাড়ি, আর বাবা-মায়ের একটা ছবিও নেই? আর হৃদিকেও সে কখনো বলতে শোনেনি নিজের দাদা-দাদি সম্পর্কে। অর্থাৎ আদিল কখনো বলেওনি। অথচ ছবি দেখে মনে হলো, একটি হাসিখুশি পরিবার। বাবামায়ের পাশে ছোটো আদিলের হাস্যোজ্বল মুখটা এখনো ভাসছে। রোযা গতকাল মির্জা পরিবার নিয়ে অনলাইনে সার্চ করেছিল। কিছু আসেনি। কী হয়েছিল? কেনো সব এমন ধোঁয়াশা!
‘নায়ায়ায়া!’
হৃদিকে বিছানায় শুইয়ে রোযা সরতে চাইলে বাচ্চাটা গুঙিয়ে হাত চেপে ধরল। রোযা পাশেই বসল তাই। মাথায় হাত বুলোতে থাকল। নূরজাহান পাশে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। একপর্যায়ে শুধু আস্তে করে বলল –
‘আপনি আমার ওপর রাগ করবেন না ম্যাডাম।’
রোযা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাথা দুলিয়ে বলল, ‘রাগ করিনি। আপনার অবশ্যই কারণ আছে না বলার। আমি বুঝেছি।’
নূরজাহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তবে বিপরীতে কিছু বলল না। রোযা চোখ বুজল, পুনরায় ভাসল ছবিটা। ছবিটায় মহিলার মুখটা অস্পষ্ট। পুরাতন ছবি তো। মুখ গুলো কেমন যেন আবছায়ার মতন হয়ে গিয়েছে। তারপরও বোঝা যাচ্ছিল, চমৎকার সুন্দরী একজন নারী সে। সিল্কের শাড়ি পরনে, চুলে খোঁপা করা। আর পাশের পুরুষের ঠোঁটে ছিলো মৃদু হাসি। রোযা আচমকা বলে ওঠে –
‘ছবিতে কী ছিলো জানি না! তবে ভীষণ মায়া কাজ করছিল। কী উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে ছিলো সাদাকালো ওই ছবিটাতে!’
নূরজাহানের কোনো উত্তর এবারও পেলো না রোযা। হতাশ ভঙ্গিতে ফিরে তাকাতেই চমকে উঠল রীতিমতো। নূরজাহানের চোখ দুটো লাল হয়ে গিয়েছে। জলে ভাসা ভাসা হয়ে আছে। পলক ফেললেই গাল বেয়ে জল গড়াবে। অথচ পলক ফেলতে নারাজ ভদ্রমহিলা। রোযা বিছানা ছেড়ে চটজলদি নেমে এসে ধরল তার কাঁধ। চিন্তিত হয়ে আওড়াল –
‘আমি কি কিছু ভুল বললাম?’
নূরজাহান মাথা দুলিয়ে দু-হাতে চোখ মুছে স্বাভাবিক হলেন। মৃদু হাসতে চেয়ে বললেন –
‘না ম্যাডাম, ভুল না। ছবিতে আছে একটা সুন্দর জীবনের করুণ পরিনতি। তাই বোধহয় মায়া লাগছে।’
রোযা শ্বাস আটকে আসে। করুণ পরিনতি! তারমানে কি আদিলের বাবা-মা সাধারণ ভাবে ম রেনি? এইজন্যই কি ওভাবে কাঁদল নূরজাহান? নূরজাহান চলে যেতে উতলা হলো –
‘রেস্ট করুন ম্যাডাম। প্রয়োজনে ডাকবেন।’
নূরজাহান বেরিয়ে গিয়েছে। অথচ রোযা অনেকটা সময় নড়তে পারল না। দাঁড়িয়ে থাকল এক জায়গায়। রোযা কানের ভেতরে আদিলের বলা কিছু কথা পুনরায় কানে বেজে বেড়াল –
‘আঠারো বসন্ত সুখের চাদরে কাটিয়ে বাকিটা বসন্ত জীবিত লা শের মতন কাটিয়েছি। স্বর্গ থেকে নেমে পড়েছি নরকের মতন এই কালো দুনিয়ায়।’
রোযার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হলো হঠাৎ! আঠারো বসন্ত অর্থাৎ আদিলের তখন আঠারো বছর। সবে যুবক সে! ওই সময় হারিয়ে বাবা-মা? একসাথে? মার্ডা র? সহস্র প্রশ্ন রোযার মাথার ভেতরে। অথচ এসম্পর্কের জিজ্ঞেস করতে তার দ্বিধা কাজ করছে। সবকিছু লক্ষ্য করে যা সে বুঝতে পারল, আদিল অতীত থেকে পালিয়ে বেড়ায়। অতীত কতটা পোড়ালে তা এভাবে পুঁতে রাখা হয়? আর সেই অতীত সম্পর্কে সে কীভাবে জিজ্ঞেস করবে? বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না? যেখানে পুরাতন কর্মচারী নূরজাহান নিজেও বলতে চায় না! রোযা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে ট্যাব নিয়ে বসল রুমের এককোণে রাখা সোফায়। গতবারের বোকামি করল না। আদিল মির্জার নাম নয়, এবারে সে ওসমান মির্জা নাম দিয়ে সার্চ করল। সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে এলো কিছু তথ্য –
ওসমান মির্জা ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম বিতর্কিত ব্যবসায়ী। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডে অত্যন্ত প্রভাবশালী নাম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ছিল এবং অপরাধ জগতের অনেক গোষ্ঠী তার নির্দেশ মেনে চলত। ২০০৪ সালে স্ত্রী সহিত রহস্যজনক ভাবে তাকে হ ত্যা করা হয়। কে বা কারা মে রেছে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। এ নিয়ে বহু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে।
রোযা মনোযোগ সহ পড়ল ওসমান মির্জা নিয়ে পুরাতন একেকটা আর্টিকেল। ওখানে কোনো খোলা বিশ্লেষণ নেই। কোনো ছবি নেই। রোযা ফাঁকা, অন্যমনস্ক মস্তিষ্কে বসে রইল।
আদিলের ছায়াও দেখেনি তিনদিন হলো বলে! বাড়িতে পা রাখেনি লোকটা। রোযা বরাবরই ভীষণ পর্যবেক্ষণ করা নারী। তার চোখে পড়েছে একটা ব্যাপার। কিছুদিন যাবত কেমন এক চাপা মন খারাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আদিলের মধ্যে নয়, সে মানব বড়ো নির্বিকার। তাকে হাসতে দেখা যায় না বললেই চলে। খুবই কম। আর কথা, তাও কম। তবে তার কাছের বডিগার্ড অর্থাৎ শান্ত-এলেন, ক্লান্ত ওদের মধ্যে রোযা লক্ষ্য করেছে। সচরাচর ওরা যেমন গম্ভীর থাকে কাজের সময়, অসময়ে ভীষণ মজারও হয়। হাসতে, ফাজলামো করতে দেখা যায় চারদেয়ালের ভেতর। ইদানিং তা নয়। ওরা কেমন যেন চোখমুখ করে রাখে! যেন চাপা কষ্ট, উন্মাদনা লুকোনো! আদিল বাড়ি না ফিরলেও তার ডান হাত বা হাত প্রতিদিন এসে বাড়ি জুড়ে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে যায়। আদেশ করে শক্ত গার্ডের। তবে আজ সারাদিনে কাউকে চোখে পড়েনি। শান্ত, এলেন, ক্লান্ত, ধ্রুব… আদিলের কাছের একটা বডিগার্ডও নেই। রোযার অশান্তি লাগছে। কিছু হলো কী? হঠাৎ এমন পরিবর্তন কেনো হলো, রোযা বুঝতে পারছে না! তবে তার তীব্র আগ্রহ জন্মাতে শুরু করেছে যেভাবে একটা ছোটো বীজ থেকে গাছের জন্ম হয়। এতো রহস্যময় কেনো সব? সাথে এই প্রকৃতি! কিছুদিন ধরে নিউজ হচ্ছিল ঝড় হবে। এইতো আজ হৃদিকে নিয়ে শপিংমল থেকে ফেরার পরে থেকে তীব্র বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সন্ধ্যা সাতটা এখন, এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে হচ্ছে। বাইরে ঝড় বইছে, যেমন হাওয়ার গতি তেমন বৃষ্টির। বজ্রপাতের শব্দ, গাছ ভেঙে পড়া্র শব্দে মুখরিত। নভেম্বরের সময়, এই বৃষ্টি, ঝড় দিয়ে শীত নামাচ্ছে প্রকৃতি। রোযার চিন্তা বাড়ল। জানালা থেকে সরে আসবে তখুনি হঠাৎ দরজায় শব্দ পড়ল, চমকাল রোযা! নূরজাহান এসে দাঁড়িয়েছে। চোখমুখে তাড়া –
‘ম্যাডাম, নিচে আসুন।’
রোযার বুকটা ধক করে উঠল কেন যেন! কিচ্ছু জিজ্ঞেস করতে পারল না। তাড়াহুড়ো কদম ছুটল। বেরিয়ে সোজা ধরল সিঁড়ি। নামতে নামতে তাকাল দুয়ারের দিকে। ভেজা শান্ত দাঁড়িয়ে আছে। টপটপ করে পানি পড়ে ভেসে যাচ্ছে ফ্লোর। চোখ লাল, বিধ্বস্ত অবস্থা! রোযা আঁতকে ওঠে! কণ্ঠ হিমালয় ছোঁয় –
‘কী হয়েছে?’
তীব্র শীতে শান্তর ঠোঁট নীল হয়ে আছে তখনো। কাঁপছে, অথচ কণ্ঠে কী অসহায়ত্ব জড়ানো –
‘ম্যাডাম, প্লিজ বসকে ফিরিয়ে আনুন। বস…’
শান্ত বড়ো করে শ্বাস টেনে নিলো। রোযার কদম বাড়ল ক্রমশ, ‘কী হয়েছে? কোথায় সে?’
‘সাথে চলুন ম্যাডাম।’
রোযার সাদা গাউন, সাদা ওড়না দৌড়ানোর ফলে উড়ল। রোযা বৃষ্টির ধার ধারল না। উঠে বসল গাড়িতে। শান্ত ড্রাইভিংয়ে উঠে বসেছে। ভীষণ দ্রুতো ড্রাইভ করছে সে। যে একটু দেরি করতে কিছু হয়ে যাবে! রোযা কোনো প্রশ্ন করল না। তার চিন্তায় গলাটা বন্ধ হয়ে আছে। গাড়ির গতি যেন ঝড়ের গতির চেয়েও দৃঢ়তার প্রকাশ করছে। গাড়ি কতক্ষণ চলল রোযা জানে না। তীব্র বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট পরিষ্কার না। তারপরও সে অবশেষে সামনে দেখতে পেলো এক আলিসান ম্যানশনের। পুরাতন বৃহত্তম ম্যানশন। যার দরজাই একটা সাধারণ বাড়ির সমান। খোলা লোহার বিশাল দরজাটা ইতোমধ্যে খোলা। গাড়িটা সোজা প্রবেশ করেছে। ড্রাইভওয়ে ধরে ছুটল অনেকটা সময়। ম্যানশন পেরিয়ে, ম্যানশনের পেছনে ছুটছে। ওই জায়গাটা পারিবারিক কবরস্থান। গাড়ি থেমেছে, শান্ত বেরিয়ে ছাতা মেলে ধরল। রোযা এখান থেকে স্পষ্ট দেখছে একটা সুঠাম দেহ দু-হাঁটু ভেঙে বসে আছে তীব্র বৃষ্টি, ঝড়ের মধ্যে। রোযার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। সেই দেহের দিকে চেয়ে থেকেই বেরিয়ে এলো সে। শান্তর কণ্ঠ ভেঙে এলো প্রায় –
‘পাঁচ ঘণ্টা হচ্ছে, ম্যাডাম। ফিরিয়ে আনুন প্লিজ!’
থামে শান্ত। ফের আওড়ায় –
‘আজ, আজ মৃত্যুবার্ষিকী বড়ো স্যারের, বড়ো ম্যাডামের।’
রোযার দৃষ্টি এক শরীরে নিবদ্ধ থাকল। বজ্রপাতের চিহ্ন ভাসল মাথার ওপরে। তীব্র শব্দে কাঁপল ভুবন। নড়চড় নেই শরীরটা। রোযা কল্পনা করতে পারছে না, নভেম্বরের মতন এমন ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে তীব্র ঝড়-বৃষ্টিতে পাঁচ ঘণ্টা একইভাবে একটা মানুষ কীভাবে বসে থাকতে পারে! শান্তর দিকে তাকাল না রোযা। মাথায় ওড়না তুলে হাত বাড়িয়ে ছাতাটা নিলো সে। কদম বাড়াল দ্রুতো। প্রথম কদমের চেয়ে দ্বিকদমে তাড়া ক্রমশ বেশি হচ্ছিল। যত কাছে এলো ততোই যেন রোযার ভেতরে কিছু একটা হচ্ছিল! দুমড়েমুচড়ে উঠছিল হৃৎপিণ্ড। চোখে পড়ল দুটো পাশাপাশি কবরের নাম –
‘ওসমান মির্জা, গুলনাহার।’
মধ্যেই আদিল মির্জার শরীর। মাথাটা নুইয়ে আছে। রোযা ছাতাটা বাড়িয়ে ধরল মাথার ওপরে। মুহুর্তে নিজে ভিজে জবজবে হয়ে গেলো। শক্ত বৃষ্টির ফোঁটা রোযা অনুভব করতে পারল না যেমন। শুধুই দেখল অনড় শরীরটা। আদিল ফিরে তাকাল না। যেই কণ্ঠ ভেসে এলো তা পরিচিত শোনাল না –
‘সরে যা… ‘
রোযা কদম আরেকটি বাড়াল। আরও দৃঢ়ভাবে ধরল ছাতাটা। অবশেষে বলল –
‘যতক্ষণ আছেন, আমিও এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকব।’
মাথাটা ঝড়ের গতিতে ফিরল। আদিলের অবিন্যস্ত চুল, রক্ত লাল চোখ, নীল হয়ে আসা মুখে চেয়ে রোযা আরও দৃঢ় গলায় বলল –
‘আপনি না ফিরলে আমিও ফিরছি না।’
আদিলের দৃষ্টি পড়ে না। পড়ে না রোযারও। মাথার ওপরে তখন কালো মেখ, বজ্রপাতের দাগ, আওয়াজ। বৃষ্টির শব্দ ক্রমশ বাড়ছে। বাতাসের গতি অস্বাভাবিক। রোযা হঠাৎ করে নুইয়ে এলো, হাতটা বাড়িয়ে ছুঁলো কপাল। মনে হলো সে ঢিপ ফ্রিজের কোনো বস্তু ধরেছে। কনকনে ঠান্ডা শরীর! রোযা সময় অপচয় করল না আর। ফাঁকা হাতে টেনে ধরল নীল হয়ে আসা হাতটা –
‘আসুন, ফিরবেন আমার সাথে। কী হলো? উঠুন।’
আদিল নড়ল, মুহূর্তে চোখ বুজল শক্ত করে। কপালে ভাঁজ পড়ল কিছু। বসে যাওয়া কণ্ঠে বলল অবশেষে –
‘আসছি, গাড়িতে উঠে বসো। ভিজো না।’
রোযা স্পষ্ট দেখল হাঁটু দুটো গেঁথে গিয়েছে মাটিতে, ‘হাত ধরুন।’
আদিল তাকাল বাড়ানো হাতটার দিকে। রোযা ভিজছে, কাঁপছে। আদিল চোখ বুজল। সময় নিয়ে হাতটা ধরল ঠিক তবে নিজের ওজন নিজেই বয়ে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়াতে গেলে হেলেদুলে প্রায় পড়তে নিলো। রোযা সঙ্গে সঙ্গে ছাতা ফেলে দুহাতে সামলাতে চাইল আদিলকে। নিজেই আদিলের একটা হাত নিজের কাঁধে এনে ভার রাখার ইশারা করল। রোযা দেখল প্রায় ভেঙে আসা হাঁটু দুটো। কদম বাড়াতে বাড়াতে বলল –
‘নিজের শরীরের সাথে এতো অত্যাচার করবেন না। ভবিষ্যতে সমস্যা দেখা দিবে।’
আদিল ফ্যাকাসে মুখে চেয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আওড়ায়, ‘বয়স্ক বলছো আমাকে?’
‘উহুঁ, তবে বয়স কমও না, আবার বেশিও না। মাঝামাঝিতে তো।’
আদিল কাশল, হেলেদুলে পড়তে গিয়েও ফের সটানভাবে দাঁড়াল। ওজন ছাড়ল না রোযার ওপর। ফিসফিস করে বলে গেলো –
‘চিন্তা করবেন না, মিসেস মির্জা। নব্বই বছরের বুড়ো হলেও আপনার ভার, দায়িত্ব তোলার সামর্থ্য এই আদিল মির্জার থাকবে।’
রোযার হৃৎপিণ্ড থমকে গেল বোধহয়। অথচ কী স্বাভাবিক ভাবে মুখ চালালো! যেন সেই বাক্যের প্রভাব তার ওপর পড়েনি। অথচ ভেতরে হিমালয় ভেঙেচুরে পড়ার মতন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো।
‘নব্বই বছর! এতটা বাঁচবেন?’
‘বাঁচব, আপনাকে নিয়েই বাঁচব।’
রোযার চোখের পাপড়ি কাঁপল। অগোচরে ঢোক গিলল দুটো। বুঝল আদিলের অবস্থা বেগতিক। দ্রুতো দু-হাতে সামলানোর চেষ্টা করল লম্বাচওড়া, বিশাল শরীরটা।
‘আমি কাউকে কখনো মন থেকে চাইনি। যদি চাই, মৃত্যু পর্যন্ত চাইব।’
আদিল বোধহয় হাসল। শোনা গেলো –
‘অপেক্ষায়….’
আদিলের চোখমুখ বুজে আসছে। রোযা আঁতকে ওঠে। সজাগ রাখতে ভালোভাবে নিজের সাথে নিয়ে গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলে যায় দ্রুতগতিতে –
‘শুনুন…’
‘বলো… ‘
শান্ত এসে ছাতা ধরেছে তাদের মাথার ওপরে। এলেন, ক্লান্ত, ধ্রুব সব আরও অনেক গার্ডস চারিপাশে। সবার অবস্থাই ভীষণ খারাপ।
রোযা দৃষ্টি নুইয়ে রেখে বলে হঠাৎ –
‘আপনার এমন তুমি-আপনির সংমিশ্রণের রহস্য কী?’
আদিলের চোখ বন্ধ, ‘খারাপ লাগে?’
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫০
‘তা নয়…’
আদিল চোখ মেলল। মাথাটা ঘুরিয়ে তাকাল রোযার মুখে –
‘আপনিটা আসে সম্মান থেকে, তুমিটা আসে ভালোবেসে।’
