আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৫
কায়নাত খান কবিতা
” প্যারানয়েড পারসোনালিটি ডিসওর্ডার? ”
” হুম!”
” মানে?”
” তখন কিংশুকের ১৩ বছর বয়স, যখন ওর মায়ের পর:কীয়ার জন্য ওর বাবা সুইসাইড করে। ছোটো বয়সে এতো ধাক্কা নিতে পারেনি। তারপর থেকে শুরু হয় পারসোনালিটি ডিসওর্ডার। কখনো একদম শান্ত হয়ে যেতো, কখনো একদম অশান্ত, কখনো নিজের হাত পা নিজেই কাট”ত, আবার কখনো মেয়ে লোক দেখলেই তাকে খুন করতে চাইতো। ”
আতিয়া বেগমের বলা প্রতিটি কথায় অরিনের মস্তিষ্ককে নাড়িয়ে তুলে, যখন সেন্স ফিরে তখন তার পাশে আতিয়া বেগম এবং বাইকার ছাড়া আর কাউকে দেখেনি অরিন। তাদের দেখা মাত্রই নিজের আবেগ প্রকাশ করে ফেলে অরিন। আতিয়া বেগম ও ঠিক করে এতোদিন যেই সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলেন উনি, সেটা এবার প্রকাশ করার পালা। না-হলে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। আতিয়া বেগম চেয়েছিল কিংশুকের বিয়ে টা অরিনের সাথে দিয়ে তাকে আবার ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু কিংশুকের আচরণ দিন দিন এতোটাই ভয়াবহ হতে থাকে, যতটা উনি কল্পনা ও করেননি। তাই না চাইতে ও সত্যি টা তুলে ধরে অরিনের সামনে।
” তোর থেকে একটা জিনিস লুকিয়ে রেখেছি অরিন!”
” কোন জিনিস মনি?”
নিজের মনকে শক্ত করতে আতিয়া বেগম। যেহেতু আজকে সে সব বলতে বলে ঠিক করেছে, সেহেতু সব বলাই উচিত। লুকিয়ে রাখা মানে অরিনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।
” ক্যাটরিনা বা আমি বাংলাদেশে কেন থাকি জানিস? ”
” কারণ তুমি নিজের শেকড় ছাড়তে চাওনি। ”
” অর্ধ সত্যি।”
আতিয়া বেগম অরিনের হাত চেপে ধরে। পাশে বসে থাকা ক্যাটরিনাকে ও দেখে। ক্যাটরিনা চোখ দিয়ে আস্ত করে সে পাশে আছে তার।
” কিংশুক ক্যাটরিনাকে খু’ন করতে চেয়েছিল। ”
কয়েক মূহুর্তের জন্য চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করে অরিন। কান যেন স্তব্দা লেগে যায় । সে তো নিজের বোনকে খুব ভালো বাসে। তাদের মধ্যে বন্ডিং ও ভালো তাহলে?
” ওর মাথায় এটা সেট হয়ে গেছিল যে, সব মেয়ে লোক খারাপ প’রকীয়া করে। ছু’রি দিয়ে ও ক্যাটকে আ ঘাত করতে যায়। যখন আমাকে দেখতো তখন ও ওর সহ্য হতো না। যার জন্য আমি ক্যাটকে নিয়ে চলে আসি। আর ও থাকে লন্ডনে পাপার সাথে। যত বড় হতে লাগলো ততই হিংস্র। ডাক্তার দেখিয়ে ও লাভ হয়নি।কারণ ও নিজের রোগকে একস্পেট করতে পারেনি। ও নিজেকে সুস্থ দাবি করে। যার জন্য কখনো চিকিৎসাই হয় নি। এভাবে ও বড় হতে থাকে, আর মেয়েদের প্রতি ঘৃণা। ”
অরিনের মাথায় যেনো পুরো আকাশটায় ভেঙে পরে। তার মানে সে একটা সাইকো প্যাথের পাল্লায় পড়লো। অরিন কিংশুকের আচরণকে অভার পজেসিভ ভেবেছিলো, কিন্তু তার পিছনে যে এতো বড় সত্যি লুকিয়ে রয়েছে সেটা জানা ছিলো না অরিনের।
” কিন্তু উনি আমাকে কে পছন্দ করলো মনি?”
” সেটা তো আমি ও বুঝতে পারিনি কেন। ও যখন বললো তোকে বিয়ে করতে চাই তখন আমি বিন্দু মাত্র বিশ্বাস করিনি। কিন্তু তোর প্রতি ওর অবসেশন দেখার সাথে সাথে ওর মাঝে পরিবর্তন ও দেখি। ও অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছিল অরিন।”
” তাহলে এতোদিনের অত্যা চার কে কী বলবে মনি?”
আতিয়া বেগম কিছু ক্ষণের জন্য চুপসে যায়। কারণ কিং শুকের আচরণ এখন ভয়ংকর। তাকে আটকানো যাচ্ছে না কোনো কিছুতেই।
” তুই আমার ছেলেকে বিয়ে কর অরিন।দেখবি ও অসুস্থ হয়ে গেছে। ”
” আর যদি না হয় মনি? তখন?”
অরিনের কথার কোনো উত্তরই ছিলো না আতিয়া বেগমের কাছে। যেখানে কিংশুক নিজের রোগটাকে শিকার করতে পারেনি, সেখানে ভবিষ্যতে কখনো শিকার করবে বা তার চিকিৎসা করবে কি-না সন্দেহের বিষয় ।
” মনি। আমি তোমার নিজের হলে পারতে এমন সাইকো প্যাথের সাথে বিয়ে দিতে?”
আতিয়া বেগম উঠে দাড়ায় । কোনো কথা না বলে চুপচাপ বেরিয়ে যায় অরিনের রুম থেকে। এভাবে কথার কোনো রেসপন্স না পেয়ে ক্যাটরিনার কোলো কান্নায় ভেঙে পরে অরিন। যার পারসোনালিটি ডিসওর্ডার রয়েছে সে কী কখনো ভালো জীবনসঙ্গী হতে পারবে?
”অরিন আমার বউ না হলে, ওকে ম’রতে হবে! ”
” কিং ”
হাতে থাকা রিমোট কন্ট্রোলটি টি-টেবিলে রেখে, কিংশুক আতিয়া বেগমের মুখোমুখি দাড়ায়! তার মুখে নেই কোনো চিন্তার ছাপ! আচ্ছা একটা মানুষ ঠিক কোন পর্যায়ে গেলে তার মুখ দেখলে কোনো এক্সপ্রেশন আন্দাজ করা যায় না??
আতিয়া বেগম কী বলবে কিছু ভেবে পায় না! না সে কিংশুককে থামাতে পারবে! আর না অরিনকে তার হাতে তুলে দিতে পারবে!
যেখানে ভালোবাসা কম ক্ষোভ জমা হয়ে থাকে বেশি, সেখানে কী আদোও সুখে থাকা সম্ভব?
” অরিন তোকে ভয় পায়! পাগলামি বন্ধ কর!”
” পাগলামি তো করিনি মনি! বিয়ে করবো বলেছি! বাই হোক অর বাই কোক! ‘
” টাকা দিয়ে কী সব পাওয়া যায় কিং? ”
আতিয়া বেগমের কথা শুনে উচ্চশব্দে হেসে উঠে কিংশুক! ললাটে চিন্তার ভাজ পড়ে আতিয়া বেগমের!
” আমি বিশ্বের তৃতীয় ধনকুবের নাতি! চাইলে রাতকে দিন আর দিনকে রাত বলাতে পারি! আমি খু’ন করলে ও সেটা এক্সসিডেন্ট হিসেবে গন্য হবে! তার সামনে তোমার এই এক রত্নি মেয়েকে দুনিয়া থেকে গায়েব করা কোনো ব্যাপারই নয় মনি!”
টাকা! তাই তো! টাকাই তো সব! যেখানে টাকা দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, একটি পরিকল্পিত দূরঘটনাকে নিহাত ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া যাচ্ছে, সেখানে একটি মেয়েকে গায়েব করা আর কী এমন আহামরি কাজ??
কোনো শব্দ ছাড়াই কিংশুকের কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে আতিয়া বেগম! এখন তাকে শক্ত হতে হবে! মেয়েকে বোঝাতে হবে! জীবনে বাঁচাটা জরুরি! কীভাবে আছি সেটা নয়! প্রাণ একবার গেলে আর ফেরত আসবে না! কিন্তু বেঁচে থাকলে অনেক কিছু করা যাবে! এখন আবেগ নয়! বরং বিবেগ দিয়ে ভাবতে হবে!!
আতিয়া বেগম চলে যাওয়ার পরপরই কিংশুক আবার ও স্ক্রিন অন করে! যেখানে সে সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে অরিনকে দেখছে!
একটা মানুষের স্বাধীনতা বলতে কিছু জিনিস থাকে! যা একান্তই তার! কিন্তু অরিনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার ‘স’ ও দেওয়া হয়নি!
” খান_বাড়ি”
খান বাড়িতে এসে আতিয়া বেগম সোজা অরিনের রুমে চলে যায়! এখন তাকে বোঝাতে হবে! নিজের করা ভুলের মাসুল তাকেই দিতে হবে!
ক্যাটরিনার কোলে মাথা দিয়ে অনবরত কেঁদেই চলেছে অরিন! থামা-থামির কোনো নাম গন্ধ নেই! আজকে যে তার কৃতকর্মের ফল সে হারে হারে পাচ্ছে!!
” রাজি হয়ে যা অরিন! কিছু দিনের মধ্যে বিয়ে হবে!”
আতিয়া বেগমের ঠান্ডা, কিন্তু আদেশময় বাক্য কানে আসতেই উপরে চোখ মেলে তাকায় অরিন! তার এই চার লাইনের বাক্যে ছিলো কঠিন আদেশ! যেন অরিনকে রাজি হতেই হবে!
” ম..মনি..?!!
আতিয়া বেগম চলে যায় কক্ষ থেকে! অরিন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে! তার শেষ আশা-ভরসা টুকু ও আজ শেষ হয়ে গেলো!
নিজের বোকামির ফল যে অরিন এভাবে পাবে সেটা কল্পনা ও করতে পারেনি সে৷ একটা সামান্য মজা তারপর একটা সাইকো প্যাথের পাল্লায় পরা। পুরো জীবনটায় একটা ইউ টার্ন নিয়ে নেই অরিনের।
—সময় তখন বিকেল ৪ টার কাছাকাছি।
কিংশুকে একের পর এক ফোন দিয়ে ব্যস্ত পায় অরিনের নাম্বার। সিসি ফুটেজ অন করে দেখে কারো সাথে কথা বলছে সে। রাগে নিজের চোয়াল শক্ত করে ফেলে কিংশুক।
তাহলে কি অরিন বিয়ের আগেই পরকীয়া করছে? কিংশুকের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না তার? অন্য কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে? রিমোট কন্ট্রোলটি সোজাসুজি বড় স্ক্রিনে ছুড়ে মা রে। তারপর হনহনিয়ে বেরিয়ে পরে।
” টাইগার! ”
” বস!”
” আই নিড সামথিং। ”
” অলরাইট বস।”
কিংশুক বেরিয়ে পরে বাড়ির উদ্দেশ্যে। আজকে অরিনের পরকীয়া করা চিরতরে শেষ করে ছাড়বে সে।
” খান ম্যানশন ”
” আমি জানি না আমি করবো। কিন্তু এই বিয়েটা করা সম্ভব নয়। ”
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মুঠোফোনে নিজের বান্ধবীর সাথে কথা বলছিল অরিন। এখন একমাত্র তারাই পারে তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে।
” আমার মুক্তি চাই..!”
” সেটা তো সম্ভব নয় বেবি গার্ল। ”
কিংশুকের কন্ঠস্বর কানে ভেসে আসতেই পিলে চমকে উঠে অরিনের। ভয়ে ভয়ে পিছনে ফিরে তাকায় সে। দুপুরে ঘটনা এখনো মস্তিষ্কে জেগে বসে রয়েছে। তার উপরে আবার তার সামনে উদয় হলো কিংশুক।
কিংশুক এক পা এক পা করে অরিনের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। অন্য দিকে অরিন এক পা এক পা করে পিছয়ে যেতে থাকে। এভাবে পিছিয়ে যেতে যেতে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে যায় অরিনের।
কিংশুক এক হাত অরিনের মাথা বরাবর দেয়ালে রেখে, আরেক হাত পকেটে ঢুকিয়ে অরিনের মুখ বরাবর নিজের মুখ নিয়ে যায়।
” কখন কল দিয়েছিলাম।”
অরিন তাড়াতাড়ি করে নিজের ফোন অন করে। কিংশুক যে কল দিয়েছিল সেটা অরিন জানে।কিন্তু সে তো ইচ্ছে করেই ধরেনি।এখন কি বলবে?
” কি.. কিছু ক্ষণ আগে।”
” কত ক্ষণ? ”
কিংশুকের ঠান্ডা কন্ঠের জেরা করা ও অসম্ভব ভয়ংকর ভাবে অরিনের কানে যাচ্ছিল।
” ২৭ মিনিট আগে।”
” ২৭ মিনিট। হুম।”
খুব জোড়ে অরিনের গ লা চে পে ধরে কিংশুক। এতোটাই জোড়ে ছিলো যে অরিনের চোখ প্রায় লাল হয়ে গেছিল।
” কি…কিং ”
নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজের গলা থেকে কিংশুকের হাত সরাতে চাই অরিন। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। কিংশুক ও প্রচন্ড রেগে যায়।
” আমার থেকে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট অন্য কেউ? এই গলায় রাখবো না আজকে।”
অরিনের চোখ দিয়ে অনবরত পানি বেরিয়ে আসে। এক পর্যায়ে নিজের হাত ও কিংশুকের হাত থেকে সরিয়ে নিচে ঝুলে ফেলে অরিন। মুখ প্রায় নীলচে ভাব ধারণ করেছে। ঠিক তখন কিংশুক অরিনকে ছেড়ে দেয়।
” সরি..সরি..বেবি গার্ল। কথা বলো প্লিজ। ”
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১৪
কিংশুক অরিনের গা লে বা’রি দিয়ে থাকে, কিন্তু অরিনের মুখ একদম শক্ত হয়ে যায় । মুভমেন্ট ও হয় না শরীরের। প্রচন্ড রকমের ভয় পেয়ে যায় কিংশুক। সে তাড়াতাড়ি করে অরিনকে কোলে তুলে দৌঁড়ানো শুরু করে।
” কেন করো এমন জান। কেন আমার অবাধ্য হও।”
