আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৫
কায়নাত খান কবিতা
—- কীহহহহহহ?”
—— বাংলাতেই বলেছি।”
এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিংশুক অরিনের পানে। কিংশুকের চোখ দুটোতেই নিজের সর্বনাশটা স্পষ্ট দেখতে পায় অরিন।
কিংশুকের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধবোধ নেই, নেই লজ্জার ছায়া। আছে কেবল একধরনের নির্লিপ্ত অধিকারবোধ, যা তাকে মুহূর্তে মুহূর্তে অস্থির করে তোলে।
অরিন তাকিয়ে থাকে কিংশুকের দিকে, অবাক হয়ে ভাবে একজন মানুষ কীভাবে এতটা নির্লজ্জ হতে পারে?
হায়া, লজ্জা, শরম এই শব্দগুলো কি তার অভিধানে কখনো ছিল না?
মনের ভেতর প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমে ওঠে, কিন্তু ঠোঁট নড়ে না। সে নীরব, জমে থাকা বিস্ময়ের মতো।
এই নীরবতাই যেন কিংশুককে আরও কাছে টেনে আনে।
এক ঝটকায় সে অরিনকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়।
তারপর পরম যত্নে, অদ্ভুত কোমলতায়, অরিনের ভেজা চুল আর শরীরের গড়িয়ে পড়া পানির বিন্দুগুলো মুছতে থাকে।
কিংশুকের আঙুলে কোনো তাড়া নেই। শুধু একান্ত মনোযোগ, যেন এই মুহূর্তটুকুই তার সমস্ত সময়।
সবশেষে, তয়েলটা অরিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে কোমর জাপ্টে ধরে কিংশুক।
——ক্লোজেটের ভেতর তোর ব্যবহৃত সব জিনিসই আছে।
পনেরো মিনিট। এর এক সেকেন্ডও বেশি না। রেডি হয়ে আমার সামনে আসবি।
না-হলে!”
নিজের মুখটা অরিনের কানের লতিকা বরাবর নামিয়ে আনে কিংশুক। কিংশুকের উষ্ণ নিঃশ্বাস উপচে পড়ে অরিনের কাঁধে
দুজনের মাঝ যেন অল্প বাতাসটুকুও চলাচলের যো নেই।
—-আমি আমার স্টাইলেই তোকে রেডি করে দেবো।”
অরিনের কানের লতিতে হালকা আদুরে পরশ একেঁ দিয়ে চলে যেতে থাকে কিংশুক।শুকনো ঢোক গিলে অরিন।
কারণ সে বুঝে যায়, সে ঠিক কোন স্টাইলের কথা বলছে।
সেই বোঝাটাই বুকের ভেতর ভার হয়ে নামে। কিংশুক এমন একজন লোক যাকে থামানো বা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাওয়া মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা।
কিংশুক এগিয়ে যেতে যেতে আবার ও দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে যায়।অরিন তখন ও তার যাওয়ার পানেই তাকিয়ে ছিলো।
আবার ও ফিরে তাকায় কিংশুক অরিনের পানে। মাথাটা সামান্য বাকিয়ে।ঠোঁটের কোণে একটুখানি দুষ্টু হাসি টেনে এনে বলে
—-বাই দ্যা ওয়ে। কালকে তোর ড্রেস আমিই চেঞ্জ করেছিলাম।”
কিংশুকের কথায় যেন মুহূর্তেই সাত আসমান ভেঙে অরিনের মাথার ওপর আছড়ে পড়ে।
এক ঝলকে নিজের দিকে তাকায় সে।আর তখনই বাস্তবতাটা চোখে পড়ে।এই এত কিছুর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় সে খেয়ালই করেনি, কখন তার গায়ের জামা-কাপড় বদলে গেছে।সে এখন নরমাল একটা নাইটি পড়া।অথচ অদ্ভুতভাবে নাইটিটার রঙ, কাট, সবকিছুই যেন কিংশুকের সকালের ট্রাউজারের সঙ্গে নিঃশব্দে মিলে গেছে।
এই মিলটাই তাকে সবচেয়ে বেশি বিব্রত করে তোলে।
লজ্জার ভারে অরিন চোখ বুজে ফেলে, মুখটা ফিরিয়ে নেয়।যেন চোখ বন্ধ করলেই এই মুহূর্তটা মুছে যাবে।
কিন্তু মুহূর্ত মুছে না। কিংশুক আবার ও একেবারে কাছে এসে দাঁড়ায় অরিনের।
এতটাই কাছে, যে অরিন বুঝে যায় চোখ বন্ধ করেও কিছু আড়াল করা যাবে না। এতো মানুষ থাকতে তার পাল্লা পড়লো একটা নোবেল প্রাপ্ত সাইকোর সাথে।
কিংশুক অরিনকে ঘুরিয়ে নেয় নিজের দিকে।
—–তুই হালাল আমার জন্য বউ। তোকে দেখার অধিকার আমার আছে।”
কথাটি বলেই কিংশুক আর এক মুহূর্ত দেরি করে না।
নরম করে অরিনের কপালে একটুখানি চুমু রেখে দেয়।
তারপর কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সে ঘুরে চলে যায়।
অরিন কিছু বলে না।সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে, নিঃশব্দে, কিংশুকের সরে যেতে থাকা অবয়বটার দিকে তাকিয়ে।
দরজার আড়ালে মানুষটা মিলিয়ে যাওয়ার পরও,
কপালে লেগে থাকা সেই স্পর্শটা যেন আরও অনেকক্ষণ রয়ে যায়। লোফাতে জেল ভরে নিজের কপালটি ঘোষতে থাকে অরিন। কিন্তু সব কিছু কী আর পানির শ্রোতে মিলিয়ে যায়? হাঁটু ভাজ করে বসে পরে অরিন। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে।
—- বড্ড ঘেন্না লাগে এই ছোঁয়া টা আমার। দম বন্ধ লাগে আমার। কেন আপনি সাধারণ মানুষের মতো হলেন না কিং?”
নিজেই নিজের সাথে পাগলের মতো প্রলাপ বকতে থাকে অরিন। কিন্তু আফসোস তার এই প্রলাপ শোনার জন্য কেউ নেই। তাকে এক বিন্দু পরিমাণের শান্তনা দেওয়ার মতোন ও কেউ নেই। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাড়ায় অরিন। তাকে ১৫ মিনিটের মধ্যে রেডি হতে হবে।
অরিন খুব তাড়াহুড়ো করে নিজেকে গুছিয়ে নেয়, তারপর বেরিয়ে আসে।দরজার মুখে এসে থমকে যায় সে।
কিংশুক দাঁড়িয়ে আছে দু’হাত ভাঁজ করে, নিখুঁত স্থিরতায়।যেন অপেক্ষাটাও তার কাছে একধরনের শিল্প।অরিনকে সাদা চুড়িদারে দেখে কিংশুক দ্বিতীয়বারের মতো থেমে যায় নিজের ভেতরেই। তার মনে পড়ে যায় সেই ২০১৯ সালের কথা। যখন প্রথম বার সে দেখেছিল কিশোরী অরিনকে।সে-দিন ও সে ঠিক এই রকম ভাবে সাদা রং এর গাউন পরে ছিল।যাকে দেখে থমকে গেছিলো কিংশুকের হার্টবিট। আজকে আবার ও সেই প্রথম দিনের ন্যায় অনুভূতি হচ্ছিল কিংশুকের। অরিনকে দেখে আবার ও তার হার্টবিটের গতি ফাস্ট হতে থাকে।
সাদা চুড়িদার, ভেজা চুল সব মিলিয়ে অরিন যেন আরও দ্বিগুণ সৌন্দর্য নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কিংশুকের।এই সৌন্দর্যে কোনো সাজের বাড়াবাড়ি নেই, আছে একধরনের স্বচ্ছতা, যা চোখ সরাতে দেয় না কিংশুককে।
কিংশুক ধীর পায়ে অরিনের কাছে চলে আসে।
কথা না বলে আলতো করে অরিনের হাত ধরে,ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়।তারপর পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে।অধিকার নয়, বরং নিঃশব্দ আশ্রয়ের মতো।
কিংশুক মুখটা নামিয়ে রাখে অরিনের কাঁধে
—-কী আছে তোর মাঝে বউ? কেন আমি বারবার পাগল হয়ে যায় বলতো?”
অরিন কিছু বলে না।চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।ঠিক যেমন কেউ নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে লুকিয়ে রাখতে চায়, ঠিক সে-রকমই।
কিংশুক ধীরে ধীরে অরিনের পিঠের দিক থেকে চুলগুলো সরিয়ে দেয়।আঙুলের স্পর্শে কোনো তাড়া নেই।আছে শুধু একরাশ নীরবতা, যা শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলে যায়।
খুব ডীপলি ঠোঁটের ছোঁয়া একেঁ দেয় অরিনের পিঠের ভাজে। কেঁপে উঠে অরিনের সর্বাঙ্গ।
—- ডোন্ট মুভ জান।”
কিংশুক আবার ও অরিনের পিঠে ডিপলী চু’মু খায়।
অরিন হঠাৎ করেই বুঝে যায়।কিছু একটা হতে চলেছে তার সঙ্গে।এই নীরবতা, এই কাছাকাছি থাকা, এই নিঃশ্বাসের দূরত্বসব মিলিয়ে মুহূর্তটা বিপজ্জনকভাবে বদলে যাচ্ছে।নিজেকে বাঁচাতে হলে এখনই কিছু একটা করতে হবে, না হলে আর সময় থাকবে না।
কিংশুকের চুম্বন নামতে যাওয়ার ঠিক মাঝখানেই
কাঁপা গলায়, তাড়াহুড়ো করে অরিন বলে বসে
——আমার খুব খিদে পেয়েছে।”
কিংশুক মুখ তুলে নেয় অরিনের পিঠ হতে।
—-সরি বউ। তোকে কাছে পেলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। খাবি চল।”
কথাটা বলেই কিংশুক অরিনকে সঙ্গে নিয়ে নিচে নামতে শুরু করে।যত নিচে নামে, অরিনের বিস্ময় তত বাড়ে।এত সুন্দর একটা বাড়ি।চোখ জুড়িয়ে যায়। চারপাশে আধুনিকতার নিখুঁত ছোঁয়া, আলো,ছায়ার হিসেবি ব্যবহার, দেয়ালজুড়ে নীরব বিলাস।বিদেশি বাড়িগুলো এমনই হয়।ডিজিটাল আর স্মার্ট জীবনের ছাপ লুকিয়ে থাকে প্রতিটি কোণে।কিন্তু অরিনের চোখ আটকে যায় অন্য জায়গায়।এতগুলো সার্ভেন্ট।
তার মনে প্রশ্ন জাগে।কিংশুক তো এখানে একাই থাকে, তাহলে এত লোকের দরকার কেন?নাকি এই বাড়িতে আরও কেউ থাকে?কিন্তু না,বাড়িটা অদ্ভুতভাবে নীরব, শুধু মানুষের উপস্থিতি আছে, জীবনের কোলাহল নেই।
হাঁটতে হাঁটতে তারা এসে দাঁড়ায় এক বিশাল ডাইনিং টেবিলের সামনে।দেখে মনে হয়, একসঙ্গে দশ–পনেরো জন অনায়াসে বসে খেতে পারবে।
কিংশুক চেয়ারের দিকে হাত বাড়ায়, টেনে অরিনকে বসায়, তারপর নিজেও পাশে বসে পড়ে।সার্ভেন্টরা নিঃশব্দে এগিয়ে আসে।এক এক করে খাবার সাজানো হতে থাকে।পরিমিত, নিখুঁত, দৃষ্টিনন্দন।
কিংশুক ধীরে ধীরে প্লেট থেকে খাবার তুলে নেয়,
আর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অরিনের মুখের সামনে ধরে
—- হা করো বউ।”
—হুমম?”
—- হা করো।”
কিংশুকের এতটা ঠান্ডা আচরণ দেখে অরিন সত্যিই অবাক হয়ে যায়।এই মানুষটাই,যার উপস্থিতি এতক্ষণ ধরে তাকে কাঁপিয়ে রেখেছিল,এখন কতটা স্বাভাবিক কতটা শান্ত।আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, সে তাকে এত সুন্দর করে তুমি বলে ডাকছে।
অরিনের কাছে ব্যাপারটা যেন ঠিক মেলাতে পারে।একই মানুষ, অথচ দুই রকম ছায়া।সে চুপচাপ কিংশুকের হাত থেকে খাবার খেতে থাকে।
প্রতিটা লোকমা যেন প্রশ্নের মতো নেমে আসে গলায় কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু সাহস হয় না।
খাওয়ার এক পর্যায়ে হঠাৎ কিংশুক বলে ওঠে
—-এখানে যতগুলো চেয়ার ফাঁকা আছে, সবগুলো ভরা চাই আমার।”
কথাটা শুনে অরিন থমকে যায়।প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে কিংশুকের দিকে তাকায় সে।কিংশুক কী বলছে একদমই বুঝতে পারে না সে। এই এতগুলো চেয়ার গুলোঅরিন কীভাবে ভরাবে?কিংশুক কি অন্য মানুষদের ডাকার কথা বলছে?
নাকি এর ভেতরে অন্য কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে?
কিছুই পরিষ্কার হয় না তার কাছে।
অরিন শুধু কিংশুকের দিকে তাকিয়ে থাকে নীরব, বিভ্রান্ত।
—–একটা ফুট বল টিম চাই আমার। খেয়ে শক্তি কর। সামান্য চু’মু খেলেই অজ্ঞান হওয়া যাবে না।”
অরিনের আর বুঝতে বাকি থাকে না কিংশুক কাদের দিয়ে টেবিল ভরানোর কথা বলছে। সে কী মুরগির ফার্ম নাকি? এতো বাচ্চা কোথায় পাবে সে?
—আর খাবো না পেট ভরে গেছে আমার।”
—কথায় নাকি খাবারে?”
—-খাবারেই! ”
কিংশুক একজন সার্ভেন্টকে ইশারা করে অরিনকে রুমে পাঠিয়ে দেয়।
রুমে ঢুকে অরিন চারপাশটা ভালো করে দেখতে থাকে।
ঘরটা বেশ বড়। একটু অতিরিক্তই বড়।
সবকিছুতেই একধরনের নিখুঁত বিলাস, ঠিক যেন কোনো সেলিব্রিটির ব্যক্তিগত আশ্রয়।আলো, আসবাব, দেয়ালের রং, সবই পরিকল্পিত, ঠান্ডা সৌন্দর্যে মোড়া।
দেখতে দেখতে অরিন পা বাড়ায় বেলকনির দিকে।
কিন্তু সেখানে পৌঁছে যা দেখে, তার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।
নিচে কয়েকজন লোক দু’জন মানুষকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিংশুক।হকিস্টিক হাতে।একটুও দ্বিধা নেই তার ভঙ্গিতে, বিন্দুমাত্র দয়া নেই চোখে।নির্মম আঘাতগুলো যেন তার কাছে স্বাভাবিক কোনো কাজ।এই ভয়ংকর রূপ অরিন নতুন করে দেখছে না।আগেও দেখেছে।আর যতবারই সে কিংশুককে এভাবে দেখে,ততবারই তার ভেতরের ভয়টা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে।আর এক মুহূর্ত দাঁড়াতে পারে না সে।চুপচাপ বেলকনি ছেড়ে রুমের ভেতরে চলে আসে।ফ্লোরে বসে পড়ে।কোনো শব্দ ছাড়াই কাঁদতে থাকে।কি করবে সে?এ কোন জায়গায় এসে পড়েছে?এখান থেকে পালানোর কোনো পথ আছে কি?
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৪
আর কিংশুকের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবে কীভাবে?
এইসব প্রশ্নে মাথা ভারী হয়ে আসে তার।
ঠিক তখনই নীরবতার ভেতর হঠাৎ দরজায় কারো পিং দেওয়ার নোটিফিকেশনের শব্দ কানে আসে
