আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৪
কায়নাত খান কবিতা
—- আপনি… আপনি উল্টো পাল্টা কিছু করেন নি তো আমার সাথে?”
—- কখনো শুনেছিস বিড়ালের সামনে মাছ রাখা আছে আর সে সেটা খায়নি?”
এই একটিমাত্র বাক্যই অরিনের পায়ের নিচ থেকে সমস্ত দৃঢ়তা উপড়ে নিয়ে, তাকে শূন্যতার কিনারায় দাঁড় করিয়ে দেয়। তার মানে সে যেটা চায়নি সেটাই হয়েছে। তার অজ্ঞান হওয়ার সুযোগটা বেশ ভালো মতোই লুফে নিয়েছে কিংশুক।
—– আই হেট ইউ কিং।”
—– আই লাভ ইউ টু রোজ”
একজন জ্ঞানহীন মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিল কিং। সেই আঘাতে অরিন প্রচণ্ডভাবে ভেঙে পড়ে। তার চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে নামতে থাকে, আর মুহূর্তের মধ্যেই তার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অসহায় এক কম্পন। সেই কাঁপুনিতে কিংশুকের ঘুম আলগা হয়ে ওঠে।কারণ সে তখন অরিনের ক্ষুদ্র শরীরের ওপর নিজের সমস্ত ওজন ছেড়ে দিয়ে নির্ভার হয়ে শুয়ে ছিল। অরিনের অস্থিরতা তার সেই নির্লিপ্ত আরামকেও ভেঙে দিতে শুরু করে।
—– ঘুমে ডিস্টার্ব হলে মেরে বাইরে পুঁতে রেখে আসবো।”
অরিনকে ঠান্ডা মস্তিষ্কে ধমকিয়ে কিংশুক নির্বিকারভাবে তার ওপরই আরাম করে শুয়ে থাকে। যেনো দুনিয়াতে মতো সবচেয়ে সুখী মানুষ সেই মুহূর্তে আর কেউ নেই। কিন্তু অরিন পারে না নীরব থাকতে, পারে না স্বস্তি খুঁজে নিতে। কিংশুকের ভার তার ক্ষুদ্র শরীরের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছিল। প্রতিটা নিঃশ্বাসে সে হিমসিম খাচ্ছিল। তবু করার কিছু নেই। সে জানে, কিংশুককে রাগিয়ে তুললে কোনোভাবেই রেহাই মিলবে না। তাই সমস্ত কষ্ট গিলে নিয়ে, কোনো শব্দ না করে, অরিন চুপচাপ শুয়ে থাকে।নিজের ভাঙনের শব্দটুকুও লুকিয়ে রেখে।
——-তোর শরীরে এতো হাড্ডি কেন বউ? আমার ঘুমোতে অসুবিধা হচ্ছে।”
এমনিতেই কিংশুকের অসহনীয় ভার। তার উপরে খোঁটা। কিছুতেই চুপ থাকতে পারে না অরিন।
—–এতোই যখন অসুবিধা শুয়ে আছেন কেন?”
কিংশুক ধীরে অরিনের বুকে রাখা নিজের মাথা তুলে নেয়। তার মুখ এগিয়ে আসে অরিনের মুখের খুব কাছাকাছি। নিচু, ভারী কণ্ঠে কিছু একটা বলে
—– আদর লাগবে?”
কথা শেষ হতেই কিংশুক নিজের ঠোঁট অরিনের ঠোঁটের দিকে নামিয়ে আনে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই অরিন মুখ ঘুরিয়ে নেয়, ভয়ের আর অনুনয়ের মাঝামাঝি এক অসহায়তায়।
—না… প্লিজ।
—- ইউ কান্ট স্টপ মি বেবি গার্ল। ”
কিংশুক হঠাৎই অরিনের খুব কাছে চলে আসে। তার উপস্থিতিটাই অরিনের শ্বাস আটকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কোনো কথা না বাড়িয়ে অরিনের ওষ্ঠে নিজের ওষ্ঠ ডুবিয়ে দেয় কিংশুক। পরম যত্নে আদুরে পরশ নিতে থাকে সে।তার হাত দুটো বেসামাল ভাবে অরিনের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করতে শুরু করে। মুহুর্তের মধ্যে কম্পন তুলে দেয় অরিনের ছোট্টো শরীরটাই।
নিজেকে বাঁচাতে দুই হাতে ভর দিয়ে সে আপ্রাণ চেষ্টা করে কিংশুককে দূরে সরানোর, কিন্তু কিংশুক অনড় পাথরের মতো নিশ্চল। অরিনের সমস্ত শক্তি যেন সেই প্রতিরোধেই নিঃশেষ হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর, অবশেষে কিংশুক থেমে যায়। সরে পরে সে।
আর অরিন পড়ে থাকে বিছানায়। হাঁপাতে হাঁপাতে ভেতরে ভেতরে ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায় অরিন।
তার বুক জুড়ে শুধু দমবন্ধ করা এক নিঃশব্দ কান্নার রোল ছুটে চলে।
কিংশুক কিছু না বলে কয়েক মুহূর্ত অরিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই দৃষ্টিতে কোনো ভাষা নেই নির্বিকার, ঠান্ডা। তারপর নিঃশব্দে উঠে ওয়াশরুমে চলে যায়। ভেতরে দীর্ঘ এক ঠান্ডা শাওয়ার নেয় সে।
কিছুক্ষণ পর শুধু একটি তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে আসে কিংশুক। আর অরিন ঠিক আগের মতোই জড়বস্তুর মতো বসে থাকে, নড়াচড়া নেই, চোখে নেই কোনো স্পষ্ট অনুভূতি। কিন্তু কিংশুককে এই অবস্থায় দেখে হঠাৎ অরিনের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। লজ্জা আর অস্বস্তির চাপে সে তড়িঘড়ি করে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে নিজের মুখ ঢেকে ফেলে।
অরিনের এই অস্থিরতার দৃশ্য ধরা পড়ে কিংশুকের চোখে ও। সে নিজের মতো করে রেডি হতে থাকে। কিংশুক আয়নায় নিজের দিকেই মনোযোগী। আর অরিন, ব্ল্যাঙ্কেটের আড়াল থেকে, একটু পর পর লুকিয়ে লুকিয়ে তাকায় তার দিকে।ভয়ের সঙ্গে মিশে থাকা এক অনুচ্চারিত অস্তিরতা কাজ করছিল অরিনের মাঝে।
—— লুকিয়ে দেখার কিছু নেই বউ, আমি পুরোটাই তোমার। মন খুলে দেখো।”
অরিন আমতা আমতা করে ব্ল্যাঙ্কেটের আড়ালে নিজের মুখ লুকিয়ে ফেলে। এভাবে ধরা পড়ে যাবে এই কল্পনাটুকুও কখনো তার মনে আসেনি।
——এখন মুখ লুকিয়ে কী লাভ বলো, সেই তো সবই দেখবো মন ভরে।”
—— ছিঃ”
——এখন যত ছিঃ টিঃ করার করে নাউ বউ। রাতে অন্য আওয়াজ করবে।”
রাগ আর লজ্জায় অরিনের মুখটা টকটকে লাল হয়ে ওঠে। মানুষ ঠোঁটকাটা হয় শুনেছিল সে। কিন্তু এমন ঠোঁটকাটা! রোমান্সে যেন সে পিএইচডি করা।এই ভাবনাতেই অরিনের ভেতরটা আরও গুলিয়ে যায়।
এরপর কিংশুক রেডি হয়ে ধীর পায়ে অরিনের কাছে আসে। কোনো কথা না বলে, হঠাৎই তাকে কোলে তুলে নেয়।
——এ কী করছেন?”
অরিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই এক ভয়ংকর নীরব অথচ স্পষ্ট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অরিনের পানে । অর্থাৎ তাকে প্রশ্ন করাটা সে খুব একটা পছন্দ করেনি। অরিন আর কিছু বোঝার আগেই সব বুঝে যা। নুইয়ে নেয় মাথা।
কিংশুক আর দেরি করে না। তাকে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। শাওয়ারের নিচে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ঝর্ণা ছেড়ে দেয়।
—-কালকে থেকে একসাথে শাওয়ার নিবো। আজকে একা একা করো।”
কথাটা বলেই কিংশুক ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে যায়। আর অরিন শাওয়ারের নিচে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে নড়াচড়া নেই, চিন্তাগুলোও যেন জমে গেছে। কী করবে? কীভাবে করবে? কিছুই পরিষ্কার নয় তার কাছে। তার আগে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়।সে আসলে এখন কোথায় আছে?
মনে মনে পালানোর ফন্দি আঁটতে থাকে অরিন। আর যায় হোক একজন সাইকোপ্যাথের সাথে কিছুতেই নয়।
ভয় আর অনিশ্চয়তার মাঝেই হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হয়। ফিরে তাকায় অরিন। দু-হাতে ভেজা শরীরটা ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে।
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৩
টাওয়াল হাতে কিংশুক আবার ভেতরে ঢোকে। সে সোজা অরিনের কাছে এগিয়ে আসে শুধু কাছে যাওয়া নয়, নীরবে তার শরীরের পানি মুছতে শুরু করে। বেশ অস্বস্তি লাগে অরিনের। সে হাত দিয়ে বার বার কিংশুককে থামানোর চেষ্টা করলে ও কাজ হয় না। কিংশুক চোখ বড় বড় করে তাকায় তার পানে। চুপসে যায় অরিন।
—– ড্রেস খোল।”
—-কীহহহহহ?”
