Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৭

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৭

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৭
কায়নাত খান কবিতা

জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথ ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে অরিনের হাত-পা ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে আসে।
বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায় শ্বাস, তবু থামার উপায় নেই।পেছনে তাকানোর মানে শুধুই সর্বনাশ।
চারদিকে ইতিমধ্যে গার্ডদের ছায়া ছড়িয়ে পড়ে।তাকে খুঁজে ফেরার নীরব অথচ তীক্ষ্ণ তৎপরতা।
মাঝে দু–একবার টর্চের আলোয় অরিনের অবয়ব ক্ষণিকের জন্য ধরা পড়লে ও, পরমুহূর্তেই সে গাছপালার ঘনত্বে নিজেকে মিশিয়ে নেয়।
জঙ্গলের অন্ধকারই তখন তার একমাত্র আশ্রয়।
কিংশুকের কবল থেকে পালানো তার পক্ষে এতটা সহজ ছিল না।
প্রতিটি পদক্ষেপে সে যেন টের পাচ্ছিল, কিংশুক নামক ভয়ংকর মানুষের অস্তিত্বকে।

” কিছুক্ষণ পূর্বে”
কিংশুক চলে যাওয়ার পর বেলকনির দিকটা একবার দেখে মোটামুটি আন্দাজ করে নেয় অরিন।কোথায় গেলে তাকে সহজে পাওয়া যাবে না, আর কোথায় গার্ডের নজর তুলনামূলক কম।
এই মুহূর্তে কিংশুক তার কাছে নেই। পালানোর জন্য এর চেয়ে সুবর্ণ সুযোগ আর কখনোই পাবে না সে।
কিন্তু বিপত্তি বাঁধে উচ্চতাকে ঘিরে।
বেলকনি থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরের দূরত্বটা বেশ বেশি এক লাফেই নামতে গেলে হাত-পা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাই সব থেকে।

পরক্ষণেই অরিনের চোখে ভেসে ওঠে সকালের সেই দৃশ্য। কাবাটে সাজানো রাখা একের পর এক শাড়িগুলোর।
সেগুলো তো কাজে লাগানো যায়। এই মুহূর্তে এর চেয়ে ভালো উপায় আর কীই বা হতে পারে?
এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে যায় কাবাটের কাছে। তাড়াহুড়োয় কয়েকটা শাড়ি টেনে বের করে আনে, তারপর একটার সঙ্গে আরেকটা শক্ত করে গিট দিতে থাকে।
কিংশুক কখনোই চায় না অরিনকে কেউ দেখুক।সে কারণেই বেলকনির নিচের অংশটা প্রায় ফাঁকাই ছিলো।
এই সুযোগটাই নিঃশব্দে কাজে লাগায় অরিন, ভয় আর বুদ্ধির মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক অসম্ভব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সাহসীকতা দেখিয়ে ফেলে সে।

বেলকনিতে শাড়ির গিট বাঁধা দড়ি ধরে ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে অরিন।
হৃদপিণ্ডটা যেন বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়, তবু দাঁত কামড়ে ধরে সে নিজেকে সামলায়।
ঠিক তখনই বিপত্তি বাঁধে।
নিচে পা ছোঁয়াতেই হঠাৎ তেড়ে আসে কিংশুকের কুকুর রকি। গর্জন আর ছুটে আসা ছায়াটায় মুহূর্তে জমে যায় অরিনের শিরদাঁড়া।
কিংশুক মানুষের পাহারায় খুব একটা বিশ্বাস না রাখলেও, অরিনের নিরাপত্তার দায়িত্ব সে দিয়ে রেখেছিল তার পালতু কুকুরটির হাতেই।
এই অপ্রত্যাশিত সত্যটা অরিনের সম্পূর্ণ অজানা ছিল আর সেই অজানাই এবার তার পালানোর পথে দাঁড়িয়ে গেল সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে।

জঙ্গলের অন্ধকার পথ ধরে প্রাণপণে ছুটতে থাকে অরিন।পায়ের নিচের মাটি, গাছের শেকড়।কিছুই আর টের পায় না সে। ঠিক তখনই ভেদ করে ওঠে তীক্ষ্ণ সাইরেনের শব্দ।নীরব জঙ্গল মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে। সে বুঝে যায়, পালানোর খবর ছড়িয়ে
সরদ দরজায় হেলান দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে কিংশুক।
অদ্ভুত এক শান্ত মুখে, অতি আরাম করে সে দেখতে থাকে।অরিন কীভাবে পালানোর চেষ্টা করছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সব গার্ড এসে জড়ো হয় বাড়ির সামনের প্রাঙ্গণে।
নিঃশব্দে, সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে তারা।যেখানে কিংশুক নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার একটিমাত্র আদেশের অপেক্ষায় থমকে থাকে সবাই, বাতাস পর্যন্ত যেন শ্বাস আটকে রেখেছে।

—- ওকে যে টাচ করবে, তার হাত কেটে কুকুরকে খাওয়ানো হবে। সো বি কেয়ারফুল।”
কিংশুকের হাতের সামান্য ইশারা পেয়েই সবাই নেমে পড়ে অরিনকে আটকাতে।
তবে নির্দেশটা ছিল স্পষ্ট, সাবধানতা একটাই। অরিনকে এক জায়গায় ঘেরাও করতে হবে, কিন্তু কেউ তাকে স্পর্শ করবে না।
একবারও যদি কেউ ভুলে ও তার চুল অব্দি স্পর্শ করে তাহলে সেই হাত আর থাকবে না।
—বোকা বউ…
আমার কাছ থেকে পালানো কি এতটাই সোজা”

” বর্তমান”
গাছের ঘন ছায়ার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে অরিন।
প্রচণ্ড হাঁপাতে থাকে সে।বুকের ভেতরটা যেন ভয়ের বাসা বাঁধে , তবু সে নড়তে সাহস পায় না।এক মুহূর্তের শব্দই যে সবকিছু শেষ করে দিতে পারে।
এদিক ওদিক তাকাতেই অরিনের চোখ গিয়ে পড়ে খোলা রাস্তার দিকে। যা তার অবস্থান থেকে বেশ খানিকটা দূরে।
তবু সেই দূরত্বের মাঝেই সে খুঁজে পায় সামান্য স্বস্তি, বাঁচার একটুখানি আশ্বাস।
মনে হয়, এবার বুঝি সে পারবে।কিংশুক নামের সেই ভয়ংকর সাইকোপ্যাথের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে।
ধীরে ধীরে সে দিকেই এগোতে থাকে অরিন।
প্রতিটি পা ফেলবার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা যত কাছে আসতে থাকে, ততই তার বুকের ভেতর মুক্তির আশাটা গাঢ় হয়ে বাসা বাঁধে।

যেন আর মাত্র কয়েকটা পদক্ষেপ, আর এই দুঃস্বপ্নের থেকে চিরতরে মুক্তি।
রাস্তার একেবারে কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে যায় একটি বিশাল গেট।
মুহূর্তেই থমকে যায় অরিনের পা, বুকের ভেতরটা ধসে পড়ে।
এতক্ষণ যেটাকে সে জঙ্গল ভেবে আশ্রয় মনে করেছিল, সেটাই আসলে ছিল কিংশুকের বাড়িরই বিস্তৃত অংশ পালানোর পথ নয়।
মুহূর্তের মধ্যেই অরিনের চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে।
পায়ের নিচের মাটিও আর ঠিকমতো টের পায় না সে।
পরক্ষণেই অরিন টের পায়,তার খুব কাঁধে কারো গরম নিঃশ্বাস।
মুহূর্তে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায় তার সর্বাঙ্গ, রক্ত যেন শিরায় শিরায় জমে আসে।
তলপেটে হঠাৎ কারো হাতের অস্তিত্ব টের পেতেই শিউরে ওঠে অরিন।
এক মুহূর্তে নিঃশ্বাস আটকে আসে তার, শরীরটা অবশ হয়ে যায় আতঙ্কে।
ঠিক তখনই তার কাঁধে মুখ রাখে কিং।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৬

—— Are You lost baby girl? ”
কিংশুকের কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসা মাত্রই অরিন আর নিজেকে সামলাতে পারে না।
সেন্স হারিয়ে ফেলে সে, আর পরক্ষণেই নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ে কিংশুকের বুকের ওপর
ভয়, ক্লান্তি আর অসহায়তার সবটুকু একসঙ্গে ভেঙে পড়ে সেই মুহূর্তে।
শক্ত হাতে অরিনকে সামনে নেই কিং।
—– যেখানে তোর অস্তিত্বটাই আমিময়। সেখানে আমার থেকে পালানো বোকামি ছাড়া কিছুই নয়।”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৮