Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৮

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৮

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৮
কায়নাত খান কবিতা

কিংস ম্যানশনের নিচতলার সুবিশাল বেসমেন্টে, সোনালি শিকের এক খাঁচার ভেতর নিথর হয়ে পড়ে থাকে অরিন।জ্ঞানহীন, নিঃশব্দ, যেন প্রাণহীন এক প্রতিমা। তার ঠিক সামনেই, চেয়ার বসে পায়ের ওপর পা তুলে নিস্তরঙ্গ আয়েশে সিগারের ধোঁয়া উড়াতে থাকে কিংশুক। ধোঁয়ার পাক খেতে খেতে বেসমেন্টের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, আর তার ঠান্ডা চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকে খাঁচার ভেতর নিথর শরীরটির ওপরে।

—Where your very existence is made of me, escaping from there? My cute little baby girl..!..
জ্ঞানহীন অরিনের দিকে কিংশুক তাকিয়ে থাকে বিকৃত এক দৃষ্টিতে।
সে দৃষ্টি এমন, যেন চোখ দিয়েই ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করবে।
নীরবতার আড়ালে জমে ওঠে এক ভয়ংকর আকাঙ্ক্ষা, যা তার দৃষ্টিকে করে তোলে আরও হিংস্র।
অরিনের বেইমানির কথাগুলো বারবার ফিরে আসে কিংশুকের মনে।একটার পর একটা সিগারে টান দিতে থাকে কিং।যার ফলে তার আঙুলে, ধোঁয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চায় স্মৃতিগুলো।
কিন্তু যতই ধোঁয়ায় ঢেকে ফেলতে চায়, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেই বেইমানির স্মৃতি গুলো।
কিছুতেই সে স্মৃতি মন থেকে মুছে যায় না, বরং আরও গভীর হয়ে ক্ষত হয়ে বসে থাকে।
আবারও কি অরিন তার ভালোবাসাকে পুঁজি করল?

বিশ্বাসের সেই জায়গাটাকে সে ফের ব্যবহার করল নিজের স্বার্থে ভালোবাসার নামে?।
খাঁচার ভেতরে অরিন নিথর হয়ে পড়ে থাকে। গুটিসুটি দেহটা ছড়িয়ে আছে অসাড়তায়, শ্বাসের ক্ষীণ ওঠানামাই শুধু জানান দেয়। সে এখনো বেঁচে আছে।
কিন্তু সেই ক্ষীণ শ্বাস নেওয়াটুকুই যেন কিংশুকের চোখে বিঁধে যায়।নিঃশব্দ খাঁচার ভেতর অরিনের বুকের ওঠানামা তার দৃষ্টিকে বারবার টেনে আনে।

বারবার তার মনে ধ্বনিত হয়, এই নারীকে সবকিছু উজাড় করে ভালোবাসার পরও কি সে বেইমানি করল?
এক ফোঁটা শব্দ না করেই হাত তোলে কিংশুক। সামান্য এক ইশারাতেই দু’জন লেডি গার্ড সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, আদেশ বুঝে নেওয়ার মতো করে। কিংশুকের চোখে তখন কোনো দয়া নেই, শুধু নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তের স্থিরতা।
কিংশুকের ইশারা মিলতেই দু’জন লেডি গার্ড এগিয়ে আসে। দু’টি বালতি ভরা বরফমিশ্রিত ঠান্ডা পানি একসাথে ছুড়ে মারে খাঁচার ভেতরে। মুহূর্তেই নিথর দেহটার ওপর নেমে আসে হিমশীতল আঘাত
নিস্তব্ধতার বুক চিরে ভেঙে পড়ে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
বরফমিশ্রিত পানির হিমশীতল ঝাপটা খাঁচার ভেতর পড়তেই অরিনের নিথর দেহটা কেঁপে ওঠে। হঠাৎ শ্বাস আটকে এসে ভাঙা নিঃশ্বাসে বুক ওঠানামা করে তার। ঠোঁট কাঁপে, চোখের পাতা ভারী হয়েও সামান্য নড়ে
অচেতনতাকে ভেদ করে যন্ত্রণা ধীরে ধীরে তাকে টেনে আনে বাস্তবে।
বুক ভরে বাতাস টানতে গিয়ে কাশিতে ভেঙে পড়ে সে। চোখ দু’টো ধীরে ধীরে খুলে আসে,ঝাপসা দৃষ্টিতে শুধু লোহার শিক, ভেজা মেঝে আর নিজের কাঁপতে থাকা শরীর। শরীরের প্রতিটা স্নায়ু যেন একসাথে চিৎকার করে ওঠে।

নিজের অবস্থানটা পুরোপুরি উপলব্ধি করতেই অরিন ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। হঠাৎ বুকের ভেতর দম আটকে আসে, হাঁপাতে হাঁপাতে খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে সে। কাঁপতে থাকা হাতে ভেজা মেঝে আঁকড়ে ধরে, চোখ দুটো ছুটে বেড়ায় লোহার শিকের ফাঁকে ফাঁকে। শরীর তখনো বরফশীতল, অথচ ভয়ের ঘামে চুপচুপে। বাস্তবতার নির্মম সত্যটা মুহূর্তে তাকে চেপে ধরে। সে বন্দি, এক খাঁচার ভেতর।
মাথার ভেতর হঠাৎ প্রশ্নটা বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ে, তাকে কি সত্যিই খাঁচার ভেতরে বন্দী করা হয়েছে? বুকের ভেতরটা পাথরের মতো ভারি হয়ে যায় , শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার। চোখের সামনে বাস্তবতা স্পষ্ট হলেও মন তা মানতে চায় না। সে কি তবে আর মানুষ নয়। একটা বন্দী প্রাণী?
এদিক–ওদিক ভালো করে তাকাতেই অরিনের চোখ গিয়ে থামে খাঁচার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কিংশুকের ওপর। মুহূর্তেই তাদের চোখে চোখ পড়ে যায়।

ভয়ে অরিনের গলা একেবারে শুকিয়ে যায়। কথা বলতে চাইলে ঠোঁট নড়ে, কিন্তু শব্দ বেরোয় না। আতঙ্কে কণ্ঠনালী শক্ত হয়ে আসে।নিঃশ্বাসটুকুও যেন গলার ভেতর আটকে থাকে।
অরিন কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায় । কেবল অসহায় চোখ তুলে তাকায় সে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে অরিনের খাঁচার ঠিক সামনে হাটু পেড়ে বসে কিংশুক । লোহার শিকের একেবারে কাছাকাছি তার মুখ নেমে আসে এতটাই কাছে যে তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অরিন টের পায়। চোখে তখন কোনো রাগ নেই, কোনো উত্তেজনাও না শুধু ঠান্ডা, হিসেবি এক নিষ্ঠুর শান্তি। সেই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

—— পালালি কেন?”
অরিনের কাছ থেকে কোনো উত্তর আসে না। ঠোঁট কাঁপে, চোখে আতঙ্ক জমে ওঠে, কিন্তু শব্দ জন্ম নেয় না।
বেশ কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকে কিংশুক। কোনো কথা বলে না, কোনো নড়াচড়াও না, শুধু সেই নিস্তব্ধতা দিয়ে চাপ সৃষ্টি করে। তারপর হঠাৎ করেই ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে,
—— সোনার খাঁচাটি পছন্দ হয়েছে জান?”
কিংশুকের মুখে হঠাৎ কথাগুলো শুনে চমকে ওঠে অরিন। মনে হয়, কেউ যেন ভেতর থেকে মেরুদণ্ডটা ভেঙে দিয়েছে তার। তাহলে কি সে সত্যিই বন্দী? শুধু লোহার শিকের পেছনে নয়। সোনায় মোড়া এক খাঁচায়? চকচকে নিরাপত্তা, বিলাসী আয়োজন। সবই কি তবে এই বন্দিত্ব ঢাকার মুখোশ? এই সোনার খাঁচাই যে সবচেয়ে ভয়ংকর কারাগার, তা সে হাড়ে হাড়ে টের পায়।

কিংশুক ধীরে উঠে গিয়ে হাতে তুলে নেয় মেঝেতে পরে থাকা পাইপটি। ধাতব নলের ভেতর দিয়ে বরফমিশ্রিত পানি গড়িয়ে আসে নিস্তব্ধতার মাঝে টুপটাপ শব্দটা অস্বস্তিকরভাবে স্পষ্ট। পাইপটা তার হাতে নড়তেই ঠান্ডা জলের ছিটে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে, আর সেই শব্দে অরিনের শরীর কেঁপে ওঠে। কিছু না বলেই কিংশুক তাকিয়ে থাকে পানির ধারার মতোই তার দৃষ্টিও ঠান্ডা, নির্দয়।
পাইপের মুখটা পুরোপুরি অরিনের দিকে ঘুরতেই সে থরথর করে কাঁপতে থাকে। ভয় আর অসহায়তায় শরীরটা সঙ্কুচিত হয়ে আসে, হাঁটু ভেঙে যেতে চায়।

—-Oh jaan, you are poison, but sweet like hell..
কথাটা বলেই কিংশুক নির্দ্বিধায় পাইপটা অন করে দেয়। হিমশীতল পানির প্রথম ঝাপটা অরিনের শরীরে পড়তেই সে থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে। শ্বাস কেঁপে যায়, বুকের ভেতরটা যেন জমে আসে বরফে।
হাত জোর করে কিংশুকের কাছে মাফ চাইতে থাকে অরিন। কিন্তু কিংশুক তো কিংশুকই। সে মেতে আছে আজ এক ভয়ংকর খেলায়।
হাত জোড় করে কিংশুকের সামনে মাফ চাইতে থাকে অরিন।কাঁপতে থাকা কণ্ঠে, ভাঙা শ্বাসে। কিন্তু কিংশুক তো কিংশুকই। তার চোখে করুণা নেই, দয়া নেই। আজ সে মেতে উঠেছে এক ভয়ংকর খেলায়। যেখানে ক্ষমা শব্দটার কোনো মূল্য নেই, আর যন্ত্রণাই একমাত্র নিয়ম।

হঠাৎ করেই খুব জোরে কান্নায় ভেঙে পড়ে অরিন। হাত বাড়ালেও, চাইলেও, এই খাঁচা ভেঙে বাইরে আসার কোনো উপায় নেই। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে এলোমেলো হয়ে আসে, বুকের ওঠানামা ক্ষীণ হয়ে যায়। একসময় কান্নাটাও স্তিমিত হয়ে পড়ে
আর আস্তে আস্তে তার শরীরটা নিথর হয়ে যায়, যেন সমস্ত শক্তি তাকে ছেড়ে চলে গেছে।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৭

আস্তে আস্তে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে অরিনের। কাঁপতে থাকা দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়, শব্দগুলো দূরে সরে যায়। একসময় চোখ দু’টো নিভে আসে সম্পূর্ণ
অচেতনতার অন্ধকারে সে তলিয়ে যায় সে। শুধু কানে ভেসে আসতে থাকে কিংশুকের তিক্ত কথা গুলো।
—— জলদি মর বউ। তোকে কবর দিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে আমার।”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৯