Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৯

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৯

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৯
কায়নাত খান কবিতা

ভয় আর ভালোবাসা কখনো একই পথে, একই তালে হাঁটে না।
যেখানে ভয় জন্ম নেয় সেখানে ভালোবাসা নিঃশব্দে সরে যায়,
আর যেখানে ভালোবাসা গভীর হয়, সেখানে ভয়ের কোনো আশ্রয় থাকে না।
যাকে ভয় করা হয়, তাকে কখনো হৃদয় দিয়ে ভালোবাসা যায় না।
ভয়ের ছায়ায় জন্ম নেওয়া অনুভূতি ভালোবাসা নয়।তা কেবল আত্মরক্ষার নীরব অভ্যাস।
অরিনের মনে কিংশুকের প্রতি ভয় এতটাই গভীরভাবে শেকড় গেড়েছিল যে, সেই ভয়ের জমিতে ভালোবাসার একটি ছেঁটে ফোটাও জন্ম নেওয়ার সুযোগ পায়নি।

কিংশুক খুব গভীরভাবে চাইত, অরিন যেন তাকে ভালোবাসে।
কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, ভালোবাসা কখনো জোর করে আদায় করা যায় না।
ভয়ের দেয়াল ভেঙে না ফেললে সেখানে ভালোবাসার দরজা খোলে না।
ভোরের নরম আলোর ছিটেফোঁটা চোখেমুখে এসে পড়তেই অরিনের চোখের পাতা ধীরে ধীরে কেঁপে ওঠে, পিটপিট করে সে আস্তে আস্তে চোখ খুলে ফেলে।
চোখ মেলতেই তার দৃষ্টির সামনে উদোম, প্রশস্ত এক বুক ছাড়া আর কিছুই ভেসে ওঠেনি।
শুকনো গলা বেয়ে একফোঁটা ঢোক গিলে নেয় অরিন। অজান্তেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন টানটান হয়ে ওঠে।
ধীরে ধীরে সে মুখ তুলে উপরের দিকে তাকায়।দৃষ্টিতে জমে থাকে অচেনা শঙ্কা আর নিঃশব্দ বিস্ময়।
মুখটা পুরোপুরি উপরের দিকে তুলতেই সে দেখে।কিংশুক চোয়াল শক্ত করে, একদৃষ্টে তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।দৃষ্টিতে জমে আছে কঠিন নীরবতা।যেন চোখ দিয়েই গিলে খাবে তাকে।

কিংশুকের চোখ দু’টি অস্বাভাবিক লাল।ঠিক যেন নেশায় ডুবে থাকা কিংবা সারারাত জেগে থাকার পর মানুষের চোখ যেমন অস্বাভাবিক লাল হয়ে ওঠে।কিংশুকের চোখও তেমনি, ক্লান্তি আর দমিয়ে রাখা আগুনে রঙিন।
কিংশুকের চোখে চোখ পড়তেই অরিন তাড়াতাড়ি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। সামান্য নড়াচড়া করতেই টের পায়।সে এখনো কিংশুকের শক্ত বাহুতলের ভেতরেই আবদ্ধ।
কিংশুক অরিনকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।বাহুর চাপে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার দখল আর দমবন্ধ করা উপস্থিতি।
এতো জোরে চাপ প্রয়োগের ফলে কিঞ্চিৎ ব্যাথা অনুভব হয় অরিনের। নিজের অজান্তেই মুখ ফুটে এক অচেনা ব্যাথার গোঙানি বের হয়ে আসে তার মুখগহবর হতে।

—- ঘেন্না লাগে না আমার ছোঁয়া? খুব ঘেন্না লাগে? আমি ধরতেই তোর শরীর জ্বলে উঠে।’’
কিংশুককে বোঝানোর মতো কোনো ভাষাই যেন অরিনের জানা নেই।শব্দের অভাবে তার অনুভূতিগুলো কেবল নিঃশব্দেই আটকে থাকে।
অবুঝকে বোঝানো সম্ভব। কিন্তু যিনি বুঝে ও অবুঝ থাকে তাকে কীভাবে বোঝানো যায়?
যে জানে না, তাকে শেখানো যায়।কিন্তু যে সব জেনেও না বোঝার অভিনয় করে,তার কাছে কোনো ব্যাখ্যাই পৌঁছায় না।
নিজের এমন করুণ অবস্থার কথা ভেবে অজান্তেই অরিনের চোখ ভিজে ওঠে।নীরবে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুর ধারা।
কিন্তু অরিনের এই নীরব অশ্রুগুলোই অদ্ভুতভাবে কিংশুককে ভীষণ অশান্ত করে তোলে।
কিংশুক অরিনকে আরও শক্ত করে জাপ্টে ধরে।আলিঙ্গনের নামে সেই চাপে জমে ওঠে দমবন্ধ করা অস্থিরতা। অরিনের পেশিগুলো যন্ত্রণায় টানটান হয়ে ওঠে, ব্যথার তীব্রতায় যেন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।ভারী হয়ে আসে তার নিঃশ্বাস, বুকের ভেতরটা চাপা কষ্টে ভরে যায়।

—- খুব লাগছে কিং। প্লিজ ছেড়ে দিন।’’
অরিনের এই আর্তনাদই যেন কিংশুকের ভেতরের হিংস্রতাকে আরও উসকে দেয়। মুহূর্তে সে অরিনের গাল শক্ত করে চেপে ধরে।চাপে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার নিয়ন্ত্রণ আর দমিয়ে রাখা ক্ষোভ গুলো।
—- এখন ও তো ঠিকমতো ছুঁতেই পারলাম না, তাতেই লাগলো।’”
কিংশুক হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে অরিনের হাত শক্ত করে ধরে তাকে টেনে তোলে। পাঁজা-কোলে তুলে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে থাকে কিংশুক। অরিন তখন নিঃশব্দ এক জড়বস্তু।শুধু কিংশুকের গলা আঁকড়ে ধরা ছাড়া কোনো উপায় নেই তার।ঠোঁট দুটো কাঁপলেও কোনো শব্দ বেরোয় না। বের হলেই কিংশুকের ক্রোধের মুখে পড়তে হবে যে।তাই চুপচাপ তার গলা আঁকড়ে ধরে তাকে অরিন।
কিংস ম্যানশনের সুবিশাল গার্ডেন চত্ত্বরের বিপরীত পাশে জঙ্গলের মাঝ বরাবর পা রাখতেই অরিনের ভয় দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। কয়েকজন লোক মাটি খুঁড়ে কিছু একটা করছে। কী হচ্ছে,তা বোঝার ক্ষমতা তখন আর নেই অরিনের। শুধু বুকের ভেতরটা ধুকধুক করতে থাকে।
মাটি খোঁড়া শেষ হলে লোকগুলো সরে দাঁড়ায়। কিংশুক অরিনের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিয়ে।

— —জানিস, এটা কীসের খাদ?
অরিন কোনো উত্তর দেয় না। প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে শুধু কিংশুকের পানে তাকিয়ে থাকে।
—তোকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার খাদ।’’
মুহূর্তেই অরিনের শরীর অবশ হয়ে আসে। কিছু বোঝার আগেই কিংশুক তাকে ছুঁড়ে মারে সেই গর্তের ভেতর। আগের রাতের সোনার খাঁচায় বন্দী তার ওপর এই আছড়ে পড়া।সব মিলিয়ে যন্ত্রণায় যেন তার শরীর ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
অরিন আর্তচিৎকার করে কেঁদে ওঠে। এত ব্যথা কি তার ক্ষুদ্র শরীর নিতে পারবে? হাত আর মাথায় আঘাত পেয়ে সে গর্তের তলাতেই পড়ে থাকে। উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই তার।
উপরে দাঁড়িয়ে কিংশুক নির্বিকারভাবে সেই দৃশ্য দেখে। এক বিন্দু দয়াও তার চোখে ভাসে না। নিজের ভালোবাসাকেই সে যেন নিজ হাতে ধ্বংস করছে।

—তোকে নিজের হাতে জ্যান্ত কবর দেব, বউ।’’
কথা শেষ করেই সে গর্তে মাটি ফেলতে শুরু করে কিংশুক। অরিন প্রচন্ড আকুতি মিনতি করতে থাকে। কিন্তু তার এই আকুতি মিনতি কিংশুকের কান অব্দি পৌঁছায় না। সে সুন্দর মতো মাটি ঢালতে থাকে।
প্রায় অর্ধেক মাটি অব্দি চাপা দিতেই অরিনের চিৎকারে থেমে যায় কিং। চুপচাপ বসে পরে করবে পাশে। ততক্ষণে অরিনের গলা অব্দি মাটি দেওয়া শেষ।

—– কিং প্লিজ। আমি মরে যাবো তো। প্লিজ কিং।’’
কিংশুক এমন ভাবে বসে থাকে যেন সে, শুনে ও শুনতে পাচ্ছে না অরিন কী বলতে চাচ্ছে।
— প্লিজ কিং। ‘’
খুব জোরে জোরে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কেঁদে উঠে অরিন।
—যেহেতু আমার সাথে থাকবি না, সেহেতু মর!’’
—থাক..থাকবো কিং… আমি আর পালাবো না!’’
—তোকে বিশ্বাস নেই, বউ। আজ নিজের হাতেই তোকে মাটিতে পুঁতে ফেলব।’’
অরিন কাঁদতে কাঁদতে প্রচন্ড আকুতি মিন্তি করতে থাকে। তাও যদি এ যাত্রায় কিংশুকের মন গলে যায়।
কিংশুক চুপচাপ অরিনের মুখের কাছে এসে চুল ঠিক করতে করতে বলে।

—আর পালাবি?’’
—না…!’’
—আমি যা বলব, শুনবি?’’
—হ্যাঁ…!’’
—আমি যা বলব, রিপিট করবি। তাহলেই বাঁচবি।’’
—হ্যাঁ… করবো।’’
—বল—কিংশুক, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’’
অরিন চুপ করে থাকে। ঠিক কতটা অমানুষ হলে মানুষ এমন করে?
কিংশুক আবার মাটির দিকে হাত বাড়াতেই সে অরিন তাড়াহুড়ো করে বলতে শুরু করে।

— বলছি! বলছি!’’
—বল!’’
—কিংশুক… আমি আপনাকে ভালোবাসি।’’
কিংশুকের ঠোঁটে একচিলতে হাসি খেলে যায়।
—বল, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’’
—আপনাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’’
—বল, আমি তোমার সন্তানের মা হতে চাই।’’
অরিন থমকে যায়। ভালো বাসার কথাটিই অনেক কষ্টে বলেছে সে। এখন আবার সন্তান?
—বলবি, নাকি?
—না… না… বলছি…আমি আপনার সন্তানের মা হতে চাই।।

এরপর আর একটাও কথা বলে না কিংশুক। ধীরে ধীরে অরিনকে গর্ত থেকে তুলে নেয়। প্রচণ্ড ব্যথায় সে দাঁড়াতে পারে না, পড়ে যায় মাটিতে। সঙ্গে সঙ্গে কিংশুক তাকে কোলে তুলে নেয়।
রুমে নিয়ে গিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢোকে। ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে অরিন কাঁপতে থাকে,ঠান্ডা আর যন্ত্রণায়। অল্প সময়েই কিংশুক তাকে বের করে আনে। তোয়ালে দিয়ে যত্নে শরীর মুছিয়ে দেয়। অরিনের অস্বস্তি সে উপেক্ষা করে নিজের মতো করেই কাজ চালিয়ে যায়।
কাপড় পরিয়ে, চুল শুকিয়ে, ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে দেয় তাকে।তারপর নিঃশব্দে বলে

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৮

— তোকে পাওয়ার জন্য আমি সব করতে পারি, বউ… এমনকি তোকে খুনও।’’
মাথা নুইয়ে কিংশুকের ঠান্ডা কন্ঠের থ্রেট শুনতে থাকে অরিন।
— আমার হয়ে থাক। রানি করে রাখবো। বেশি তেড়ি করলে জ্যান্ত পুতে আসবো।’’

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩০