আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২
কায়নাত খান কবিতা
সময় চলতে থাকে সময়ের নিজস্ব গতিতে।
সেই রহস্যময়ী রমণীকে একবার দেখার পর থেকেই পুরো লন্ডন জুড়ে খোঁজ লাগায় কিংশুক। নিজের গার্ডদের কড়া নির্দেশ দিয়ে সে বলে
—See her as a sister. Otherwise I’ll kill all of you.
কিংশুকের এই একটিমাত্র হুমকিতেই সবাই সেই রহস্যময়ী মেয়েটিকে নিজের বোন কিংবা মায়ের চোখে দেখতে শুরু করে। একজন আর্ট স্পেশালিস্ট দিয়ে মেয়েটির তৈলচিত্র আঁকিয়ে নেয় কিংশুক। সেই ছবির লক্ষাধিক ফটোকপি ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরজুড়ে। তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়, কিন্তু ফলাফল শূন্য।
এরপর কিংশুক সিদ্ধান্ত নেয়, কিছুদিন চায়নায় তাদের অফিসে বসবে। তার ধারণা ছিল মেয়েটির চেহারায় চাইনিজ মেয়েদের ছাপ রয়েছে। হতে পারে সে আসলেই চায়নিজ।
২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কিংশুক চায়নাতেই অবস্থান করে। এত বিশাল শহরে নিজের সমস্ত ক্ষমতা ও প্রভাব কাজে লাগায় সে
শুধু সেই মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।কিন্তু সেখানে
ও ফলাফল শূন্যই থেকে যায়।
দিন যত যেতে থাকে, কিংশুকের জেদ আর সেই রমণীকে পাওয়ার তীব্র বাসনা ধীরে ধীরে তার মনে পাকাপোক্ত হয়ে বসে। এতটাই ডেসপারেট হয়ে পড়ে সে যে, নিজের জন্য একটি আলাদা রুম তৈরি করে নাম দেয় ‘লাভ রুম’।
সেই ঘরে মেয়েটির পাঁচ শতাধিক ছবি আর্ট করে সাজিয়ে রাখে।
—পাতাল থেকেও যদি লুকাস, তোকে খুঁজে বের করবই।”
দিন যত যায়, কিংশুকের পাগলামিও তত বাড়তে থাকে একেবারে সাইকোর মতো। না হলে প্রথম দেখাতেই কেউ কারও নামে স্থায়ী ট্যাটু করে? আবার সেই মেয়ের ছবি এঁকে গোটা পৃথিবীজুড়ে কে খোঁজ চালায়?
আসলে একজন সাইকো লাভারের দ্বারা সবই সম্ভব।
বিশ্ব যখন করোনা মহামারিতে আক্রান্ত।ঠিক তখন কিংশুক লন্ডনে তার গ্র্যান্ডফাদারের কাছে চলে আসে। পুরো পৃথিবী তখন আতঙ্কে স্তব্ধ। প্রতিদিনই মৃত্যুর খবর দশ, বিশ, হাজার নয়—লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কোটি কোটি মানুষ হারাচ্ছে আপনজন।
করোনা যখন পুরোপুরি মহামারির রূপ নেয়,
এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের অন্যতম ধনী মানুষটিও তখন গৃহবন্দি।
ঠিক সেই সময়েই গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এক মর্মান্তিক খবর।
বিশ্বের তৃতীয় ধনকুবের ফাস্ট কিংস বাধ্যক্যজনিত কারণে এবং করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। খবরটি বিলবোর্ডের টপ নিউজ হয়ে ওঠে।
একেবারে একা হয়ে যায় কিংশুক। তার একমাত্র সঙ্গী ছিলেন তার গ্র্যান্ডফাদার, তিনিও তাকে ছেড়ে চলে যান। করোনার কারণে দেশ থেকে তার ফুপি, বোন কিংবা কোনো আত্মীয়ই আসতে পারেনি এই কঠিন সময়ে।
সময় গড়ায়। একাকিত্বে কিংশুক আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাকে থামানোর মতো কেউ আর নেই। মানুষের মৃত্যু যেন তার কাছে নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়।
কিন্তু কথায় আছে, টাকা কালোকে সাদা আর সাদাকে কালো বানাতে পারে। নিজের ক্ষমতা আর অর্থের জোরে সে বারবার বেঁচে যায়।
কিংশুক এতটাই হিংস্র হয়ে ওঠে যে, এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহসও কারও নেই।
পুরো পৃথিবী যখন করোনা নামক অভিশাপ থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে, ঠিক তখনই ২০২২ সালে কিংশুক সিদ্ধান্ত নেয়—সে দেশে যাবে।
কারণ ছিল তার ফুপি।
২০১৯ থেকে ২০২২ –এই তিন বছরে ভিডিও কল ছাড়া ফুপির সঙ্গে আর দেখা হয়নি। মাঝে মাঝে বোন কথা বলত, কিন্তু দেশের খানবাড়িতে ফুপির পালিত মেয়ের অত্যাচারের কারণে ঠিকমতো কথাও বলতে পারত না। উপরন্তু লন্ডন আর বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান–সব মিলিয়ে যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
ফুপি বারবার বলার পরও কিংশুক না আসায়, শেষমেশ তিনি নিজের মৃত্যুর কথা বলে তাকে ইমোশনাল করে দেশে নিয়ে আসেন।
২০২২ সালের ৩রা নভেম্বর
নিজের প্রাইভেট জেটে প্রায় ৯ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের জার্নি শেষে বাংলাদেশে পৌঁছায় কিংশুক। সঙ্গে থাকে তার বিশ্বস্ত বডিগার্ড ওমার ও টাইগার। লন্ডন থেকে মোট দুইটি জেট আসে।একটিতে কিংশুক, অন্যটিতে তার গার্ডরা।
এয়ারপোর্ট থেকেই পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তায় দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় তারা।
প্রথমে হেলিকপ্টারে যাওয়ার কথা থাকলেও, গার্ডদের সন্দেহের কারণে শেষ পর্যন্ত গাড়িতেই যেতে হয়। প্রায় সাতটি গাড়ির বহর এয়ারপোর্ট থেকে খানবাড়ির দিকে রওনা দেয়।
” খান-বাড়ি ”
লন্ডনের মতোই ডিজাইন করা খানবাড়ি।তবে এখানে সমুদ্র নেই। চারপাশে আরও কয়েকটি অভিজাত বাড়ি থাকলেও, সব থেকে বড় ও রাজকীয় ম্যানশনটি হলো খান ম্যানশন।
মূল ফটকে পৌঁছানোর আগে প্রায় ৭–৮ মিনিটের নীরব রাস্তা দু’পাশে বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা।
গাড়িগুলো একে একে ভেতরে ঢুকতে থাকে। কিংশুক গাড়ির ভেতর থেকে নিজের রকির দিকে তাকায়। সারাদিনের জার্নিতেও তাকে দেখে মনে হয়, এখনই ঝাঁপিয়ে পড়ে কাউকে কাবু করে দিতে পারবে।
রকি হলো কিংশুকের নিঃস্ব জীবনের একমাত্র সঙ্গী। পিট পুল জাতের কু’কুর।যেটা সব থেকে বেশি হিংস্র এবং মারাত্ম’ক। কিংশুক তাকেই নিজের সঙ্গী বানায়।
” ওয়াটস অ্যাপ ব্যাডি?”
রকি মাথা নেড়ে বোঝায় সে ঠিক আছে।কিংশুক নিজের সানগ্লাস ঠিক করে পড়ে।মাস্কটি ও সুন্দর মতো পড়ে ফেলে।করো’নার জন্য মোটামুটি সেল্ফ ডিস্টেন্স ম্যেইনটেন করে কিংশুক।এখনো পুরোপুরি করো:না যায়নি তাই সতর্ক থাকা ভালো!
খান বাড়ির বিশাল বড় গেট দিয়ে এক এক করে কিংশুকের গাড়িগুলো প্রবেশ করতে থাকে।ইউন্ডো অপেন করে কিংশুক খান বাড়ির ভিতরটা দেখতে থাকে! এখনই সব আগের মতোই আছে। শুধু আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে আছে কিছুটা।আভিজাত্য ঠিক একই রকম। হঠাৎ করে কিছু একটা দেখে কিংশুকের চোখ আঁটকে যায়।
” স্টপ দ্যা কার!”
হঠাৎ কিংশুকের ঝাঁঝালো আওয়াজ ভেসে আসতেই সব গুলো গাড়ি থেমে যায়! পুরো উইন্ডো অপেন করে দেয় কিংশুক!
ঠিক তিন বছর আগের মতো আজ ও সেই রহস্যময়ী মেয়েটি কিংশুকের চোখে পড়লো!
এমনিতে কিংশুক বাংলায় খুব কম কথা বলে, কিন্তু তার অজান্তেই ঠোঁটের আগালে চলে,
” গট ইউ বেবি গার্ল ”
খান বাড়ির বিশাল গার্ডেনে প্রাণ পণে দৌড়ে বেড়াচ্ছে! যেনো কেউ ধাওয়া করেছে! পড়নে আবার ও সেই সাদা ড্রেস পড়া! পার্থক্য শুধু ডিজাইনে! সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে কোথাও লুকানোর কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না! ঠিক তখনই চোখে পিছনে তার ফুপি একটি চ্যালা কাঠ নিয়ে তার পিছু পিছু দৌড় দিচ্ছে!
” বদ’জ্জাত মেয়ে, দ্বারা তুই আজকে!”
” এবারের মতো মাফ করে দাও মনি!”
” তোকে হাতের কাছে পায় শুধু আজকে! হেরে বদ’জ্জাত মেয়ে একটা! অরিন দ্বারা বলছি!”
অরিন!! নামটা বেশ কয়েকবার মুখে মুখে বলতে থাকে কিংশুক! তারপর গাড়ি থেকে নেমে শার্টের হাতা উপরে উঠাতে উঠাতে অরিন এবং আতিয়া বেগমের কাছে যেতে থাকে!
” বাদ”র মেয়ে একটা শেষমেষ আমার বিয়ে ঠিক করে এলি!”
” বিয়ে করা ফরজ মনি!”
” তোকে কাছের কাছে পায় আগে! ফরজ, নফল সব বুঝাবো! ”
অরিন স্টাচুর আশেপাশে এদিক থেকে ওদিক যেতেই থাকে! আর আতিয়া বেগম ও তাকে ধরতে থাকে! কিন্তু পারে না! বার বার ছুটে যায়! অন্য দিকে কিংশুক ও আসতে থাকে!
কিংশুক নিজের শার্টের হাতা উপরে তুলতে তুলতে চোয়াল শক্ত করে এসে অরিনের হাত ধরে খুব জোড়ে টান দেয়! কোনো রকম তাল সামলে অরিন যেই না মুখ তুলে তাকায় অমনি তার গাল বরাবর খুব জোড়ে চ’ড় পড়ে!
গাল ধরে দাড়িয়ে যায় অরিন! নড়াচড়া একদম বন্ধ! কী থেকে কী হয়ে গেলো? গাল ধরেই সামনের দিকে তাকায় অরিন! তার থেকে বেশ লম্বা একজন ব্যক্তি মাস্ক, এবং সানগ্লাস পড়ে দাড়িয়ে আছে! ঠিক ডাকাতের মতো! চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে অরিনের! এই প্রথমবার সে চ’ড় খেলো তাও এতো জোড়ে!
” এতোদিন সময় লাগলো সামনে আসতে? ”
কিংশুক খুব জোড়ে ধমকিয়ে উঠে অরিনকে! কিংশুকের ধমক শুনে চমকে উঠে অরিন! পরক্ষণেই মুখ শক্ত করে দু-কদম পিছিয়ে যায়! এবং স্টাচুর সাথে থাকা ছোটো চেয়ার এনে কিংশুকের সামনে রাখে! এবং তাতে উঠে দাড়ায়! কিংশুক কপাল কুঁচকে অরিন কী করতে আজগুবি কাজ করছে সেটা দেখতে থাকে!
চেয়ারে উঠে অরিন কিংশুকের গাল বরাবর খুব জোড়ে থাপ্প’ড় বসিয়ে দেয়!
হঠাৎ এতো জোড়ে থাপ্প’ড় খেয়ে ও, কিংশুকের বিন্দু মাত্র রাগ হয় না! কিন্তু তার রকি ঘেউ ঘেউ করে উঠে, সাথে গার্ডরা ও বন্দু’ক তা’ক করে সামনে আসতেই! ভয়ে গলা শুকিয়ে যায় অরিনের! কিংশুক হাতের ইশারা দিয়ে সবাইকে দূরে যেতে বলে! আর অরিনের দিকে তাকায়!
গার্ডরা দূরে যেতেই অরিন আবার ও পার পেয়ে যায়! সে কোমরে হাত দিয়ে, দাঁতে দাঁত পিষতে পিষতে বলে!
” হাত কে’টে অন্য হাতে ধরিয়ে দিবো! জানো আমি কে?”
কিংশুক মাস্ক সরিয়ে, অরিনের মুখ বরাবর তাকিয়ে হালকা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে উঠে!
” আমার বউ!”
ভ্যাবা-চেকা খেয়ে যায় অরিন! কিংশুক মাস্ক খুলতেই সে চিনে ফেলে! এটা তো কিংশুক আবির খান! তার মনির ভাইয়ের বড় ছেলে! বাইকারের বড় ভাই! অরিন ফেসবুক, ইন্সটা সব জায়গায় কিংশুককে ফলো দিয়ে রেখেছে! কিন্তু কিংশুকের সেটা অজানা! আজকে কিংশুককে সরাসরি দেখে তার আত্মা বের হয়ে যায়! মনি বলেছিলো বটে কিংশুক খুবই রাগি এবং গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ! কিন্তু মাস্ক পড়ার জন্য তাকে সে চিনতে পারেনি!
আবার হঠাৎ করে বলে উঠেছে আমার বউ! একই সময়ে ডাবল ঝটকা! শুকনো ঢোক গিলে অরিন! পিছন থেকে পুরো বিষয়টি বেশ ভালোমতোই দেখতে থাকে আতিয়া বেগম!
” কিং? ”
ফুপির ডাক কানে ভেসে আসতেই, কিংশুক পিছনে ফিরে তাকায়! তারপর হাত বাড়িয়ে ফুপির কাছে চলে যায়! জড়িয়ে ধরে ফুপিকে! এ সুযোগে অরিন খুব জোড়ে দৌড় দিয়ে পালায়!
কিংশুক তার ফুপিকে ছেড়ে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখে অরিন নেই! মনে ভয় বাসা বাধে কিংশুকের! আবার ও হারিয়ে ফেলার ভয়!
” কী দেখছিস কিং? ”
” হু ইজ সি?”
” মাই ডটার!”
কপাল কুঁচকে তাকায় কিংশুক তার ফুপির দিকে! কারণ তার জানা মতে তার ফুপি তো বিয়েই করেনি! তাহলে মেয়ে কোথায় থেকে এলো!
” তোমার মেয়ে?”
” হুম! তোর বোন!”
” আমার বোন হিসেবে একটু বেশিই ছোটো না?”
” হুম! তোর থেকে ৮ বছরের ছোটো! মনে নেই বলেছিলাম যে ওর কথা?”
হঠাৎ করে কিংশুকের স্মৃতি চারণ হয়! কিংশুকের মনে পড়ে তার ফুপি তো একটি মেয়েকে পালে! শুনেছিলো মেয়েটির মা তাকে এখানে রেখে আর আসেনি! আর বাবা ও খোঁজ নেয় নি! ইন্ডিয়ার টপ ডায়মন্ড ব্যবসায়ির মেয়ে রোজ আগার ওয়াল! কিন্তু সে এখানে এসে অরিন হয়ে যায়! নিজের ধর্ম ও পরিবর্তন করে!
কিংশুক বেশ কয়েকবার রোজের নাম শুনেছিলো! কিন্তু এই মেয়ে যে সেই মেয়ে সেটা সে জানতো না!
আতিয়া বেগম তুড়ি মেরে কিংশুকের ধ্যান ভাঙ্গায়!
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ১
” ওয়াট হ্যাপেন্ড কিং?”
” তোমার মেয়ের বয়স কতো ফুপি?”
” ১৮! কেন?”
” পারফেক্ট! ”
