Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৯

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৯

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৯
কায়নাত খান কবিতা

কথায় রয়েছে সময় এবং স্রোত কারো জন্য থেমে থাকে না। সময় তার নিজস্ব গতিতে চলতেই থাকে।
আজ দুদিন হলো অরিন জ্ঞান হীন। এই দু-নি দুনিয়ার সাথে কোনো স্বাক্ষকতা হয়নি তার। র’ক্তের স্রোতে যখন পুরো বাথটাব ভরে লাল রং এ রঙ্গিন হয়ে যায়, তখন ও অরিনের চোখ দুটো পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে নিভু নিভু করছিলো। হয়তো কিংশুক এসে তাকে বাঁচাবে এই ভরসায়। কিন্তু ভাগ্যের খেলায় যেন অরিন গো হারা হেরে যায়। কিংশুক আসেনি তাকে বাঁচাতে। অরিনের নিথর শরীরটা পরে থাকে বাথটবে। যদি পুরো বাথটাব ভর্তি পানি থাকতো তাহলে হয় তো অরিন এতোক্ষণে পরপারে চলে যেতো। কিন্তু পানি কম থাকায় এ যাত্রায় বেঁচে যায় অরিন।

অরিনের যখন জ্ঞান ফেরে, তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করে খান বাড়িতে নিজের কক্ষে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে অরিন তার মনি, মা এবং বাইকারকে দেখতে পায়। সবাইকে একসঙ্গে দেখে চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরে অরিনের। আজ দু-বছর পর অরিন দেখছে তার মনিকে। ফোনে বাইকারের সঙ্গে কথা হলে ও, কথা হতো না শুধু মনির সাথে। কারণ ছিলো কিংশুকের ভয়। যদি মনি আবেগে বর্ষীভূত হয়ে কিংশুককে তার ঠিকানা সম্পর্কে বলে দেয়। সেই ভয়ে কথা বলেনি সে মনির সঙ্গে। আজ দু-বছর পর আতিয়া বেগমকে দেখে খুব মন চাইলো তাকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু শরীরের শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে বিছানাতেই শুয়ে রইলো সে,

_মনি..” অরিনের কন্ঠে ফুটে উঠে এক বুক ফাটা আর্তনাদ। যেন সে চাইছে তার মনিকে কাছে।
_ এক বার খোঁজ নিলে কী হতো অরিন?”
চোখ বন্ধ করে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অরিন। আজ সে অপরাধী তার মনির কাছে। এই অপরাধের কোনো ক্ষমা হয় না। আর না কোনো অযুহাত দিয়ে নিজের দোষ ঢাকা যায়।
_তুমি কী আমাকে মাফ করে মনি?” অরিনের সোজাসাপটা কথায় কিছুটা গলে যায় আতিয়া বেগম। কোনো প্রকারের ভণিতা না করে অরিন সোজা ক্ষমা চেয়ে নেয় তার মনির কাছে।

_ এতো বড় হওনি যে, মাকে ইমোশনাল ফুল বানাবে।” খানিকটা অভিমান করেই কথাটি বলেন আতিয়া বেগম। অরিন তার হাত বাড়িয়ে দেয় আতিয়া বেগমের পানে।
_তোমার হাতটা একটু দেবে মনি? অনেক দিন ছুঁয়ে দেখিনা তোমাকে।” অরিনের চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পরতেই থাকে। আতিয়া বেগম ও এবার নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না। ছোটো থেকে লালন পালন করে বড়া করা মেয়েকে কী নিজের ওরসজাত সন্তানের চাইতে কম?”
উঠে এসে জড়িয়ে ধরে অরিনকে।অরিন শুধু নিজের হাত দুটোই মেলতে পারে।উঠে বসার মতো শক্তি সে দু-দিন আগেই ক্ষইয়ে বসেছে।

__ আই মিসড ইউ মনি।” খুব শক্ত করে আতিয়া বেগমকে জড়িয়ে ধরে কথাটি বলে অরিন। পরদিকে আতিয়া কান্নার স্রোতে মুখ থেকে কিছু বেরই করতে পারে না। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে অরিনের কপালে চু’মু খায় তিনি। তারপর হাত দিয়ে অরিনের চোখের পানি মুছে দেয়।
পরক্ষণেই অরিন খানিকটা বিচলিত হয়ে পড়ে। আজ অনেক দিন পর সে তার মনিকে এত কাছ থেকে দেখলে ও কিংশুকের ভয় তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। তার ওপরে সে এখন কিংশুকের বাড়িতেই রয়েছে। ভয় কী আর শেষ হয়? অরিন আশেপাশে তাকাতে শুরু করে।
কিছুক্ষণ আগেও তো সে কিংশুকের কাছে ছিল। তাহলে এখানে এল কীভাবে?
এই সব প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে খেতেই তার কানে ভেসে আসে মনির কণ্ঠ।
_কিংশুক আশেপাশে নেই, অরিন। চিন্তা করিস না।”
মনির কথায় অরিনের বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে যায়। তবে কি সে সত্যিই কিংশুকের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে?কিন্তু কীভাবে?আর অচেতন অবস্থায় তার সঙ্গে কী হয়েছিল তার সাথে? এখানেই বা কীভাবে এলো সে?

__ মনি কিং?” অরিনের কথায় ভেসে ওঠে স্পষ্ট ভয়। সে এখনো স্পষ্ট ভাবে জানতে চাইছে, কিংশুক কী আছে তার আশেপাশে, না-কি নিরাপদ?
পাশ থেকে আইরিন বেগম অরিনের হাত শক্ত করে চেপে ধরে তাকে ভরসা দেয়_ কিং নেই অরিন।ও আর আসবে না।” আইরিন বেগমের কথায় কিছুটা ভার কমে যায় অরিনের বুকের। কিন্তু তারপর তাকে এটা ভাবায় সে কীভাবে এলো এখানে? আর এতো সহজে কিং তাকে কীভাবে ছেড়ে দিলো? হাজারটি প্রশ্ন ঘুরপাক করতে থাকে অরিনের মনে। কিন্তু উত্তরটা আপাতত সে নিজে ও জানতে চায় না। একটি কালো অধ্যায় শেষ হয়েছে তার জীবনে। এটাই সব থেকে বড় কথা। কীভাবে শেষ হলো সেটা না হয় আস্তেধীরে জেনে নিবে সে।

অরিনের পুরোপুরি সুস্থ হতে বেশ কয়েক দিন সময় লেগে যায়।চোখের পলকে ১৭ টি দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। আস্তে আস্তে অরিন অনেকটাই সুস্থ্য হয়ে যায় । ঠিক মতো চলাফেরা করতে পারে সে, যদিও শরীর এখনো দুর্বল। তবু ও চলার মতো গতি ফিরে পায় সে।
এই ১৭ টি দিন সে কিংশুকের ছায়ামূর্তিও দেখেনি।তাহলে কি সত্যিই কিংশুক নামের সেই অভিশাপ তার জীবন থেকে সরে গেছে?কারো কাছে কোনো উত্তর খুঁজতে যায়নি অরিন। কারণ তাকে ইচ্ছে করে জানানো হয়নি ঠিক কী হয়েছিলো ১৭ দিন আগে। তাই অরিন ও আগ বাড়িয়ে কিছু জানার চেষ্টা করেনি।

—সময় এগোতে থাকে সময়ের গতিতে।পরিবেশ অদ্ভুতভাবে শান্ত, ঠান্ডা, বিষণ্ন।কোথাও একজন মানুষ দুই আঙুলের ফাঁকে সিগারেট ধরে নিশ্চুপে ধোঁয়া ছাড়ছে।তার চোখ দেওয়ালে টাঙানো এক মেয়ের ছবিতে স্থির।রাতটা অস্বাভাবিক রকম শান্ত।
এতটাই শান্ত যে, এই নীরবতার ভেতরেও নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে কিংশুক।
লন্ডনের এই ঘরটা অন্ধকারে ডুবে আছে। জানালার বাইরে হালকা বৃষ্টি নামছে -টুপটাপ শব্দে কাচে আছড়ে
হাতের আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটটা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে, অথচ কিংশুকের চোখ এক জায়গা থেকেই নড়ছে না।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৮

দেয়ালে টাঙানো অরিনের ছবিটায় আটকে রয়েছে। সাদা ড্রেস,চুল এলোমেলো, একদম বেবি গার্ল। কিংশুকের বেবি গার্ল।
কিংশুক ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি টানে।
এ হাসিতে আনন্দ নেই, আছে এক ধরনের বিকৃত নিশ্চয়তা।
__ তাকে দিলাম ক’দিনের স্বস্তি আর সে ভাবল সারাজীবনের মুক্তি। বোকা বউ।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪০