Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪০

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪০

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪০
কায়নাত খান কবিতা

রাত তখন কাঁটায় কাঁটায় দুইটা।নিশ্চুপ প্রকৃতি।জনমানবশূন্য রাস্তা।কোনো আলোর রাত্রিমা নেই।এ কি শুধু রাতের গভীরতা, নাকি কাউকে কাছে পাওয়ার তীব্র বাসনার অশুভ আভাস?
মেডিসিন খেয়ে অরিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঠিক তখনই এক বিশাল দেহের ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে তার ঘরে ঢুকে পড়ে। বিছানার কিনারায় হাঁটু গেড়ে বসে সে। আঙুল বুলিয়ে দেয় অরিনের গালে
_তুই আমার অনেক শখের বউ।” অরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে নিরেট ভঙ্গিমায় কথাটি বলে কিং। তার হাত এবার অরিনের গাল হতে ঠোঁটে নেমে আসে।

_লোকজন বলে, অরিন নাকি কিংশুকের শখের বউ। মানুষের শখের কত কিছুই থাকে-আর আমার শখ তুই।নিজের শখের জিনিস ছাড়া থাকতে কতটা কষ্ট হয়, সেটা তুই বুঝবি না, বউ।”
পরক্ষণেই কিংশুক শক্তপুক্ত ভাবে অরিনের ভ্রুললাটে আদুরে পরশ একেঁ দেয়।
_ তোকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়া আমার জন্য কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। কিন্তু তুই অসুস্থ। মায়ের কাছে কয়দিন থাক। আমাকে সামলাতে তোর অনেক শক্তির দরকার।”

কিংশুক মুখ গুঁজে দেয় অরিনের উন্মুক্ত গলার ভাঁজে। খুব জোরে জোরে অরিনের উন্মুক্ত গলার ভাঁজের আবেদনীয় ঘ্রাণ শোষণ করতে থাকে কিং। এক অন্য মহো ভর করে তার মাঝে। বেশ কয়েকটি টুকরো টুকরো চু’মু খেতে থাকে কিং। চু’মুর মাঝেই হালকা জোরে অরিনের কন্ঠদেশে দাঁতের তীব্র দংশন চালায় কিং। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে অরিন। একটা দূরস্বপ্ন দেখলে মানুষের ভিতর থেকে যেমন ভাবে শুকিয়ে আসে, অরিনের ও ঠিক তাই হলো। ভিতর থেকে খুব শুষ্ক অনুভব করলো অরিন। মুহুর্তের মধ্যে ওঠে ঘরের সমস্ত লাইট অন করে দেয় অরিন। আশেপাশে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখে সে, নাহ! কিং কোথাও নেই। তাহলে কী সে দূরস্বপ্ন দেখলো? বাস্তবতার কাছাকাছি ও স্বপ্ন হয়? এতো বাস্তব স্বপ্ন? প্রচন্ড ঘামাতে থাকে অরিন। এসিতে ও যেন তার ঘাম ছুটে যাচ্ছে।

পাশে থাকা পানি ভর্তি গ্লাসটি হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পুরোটা পান করে নেয় অরিন। তারপর ও যেন অস্বস্তির রেশ কাটে না। কিছু ক্ষণ সারা রুমে পায়চারি করতে থাকে সে। মাথা ভর্তি টেনশন। চিন্তা একটাই, কী হয়েছিলো ১৭ দিন আগে? কিংশুক এতো সহজে তাকে কীভাবে নিজের থেকে দূরে রাখলো? এটা তো দূরস্বপ্নের মতো।
চিন্তারা এতোটাই সূক্ষ্ম, তার কপাল হতে ঘাম ঝড়তেই থাকে।
নাহ! এভাবে আর হবে না। মুখে পানির ঝাপটা দিতেই হবে এবার। না-হলে তার ক্লান্তি দূর হবে না। মনের ক্লান্তি দূর হলে ও শরীরের ক্লান্তি কিছুতেই যাবে।

অরিন ওঠে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার তার। ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাড়াতেই পিলে চমকে ওঠে অরিনের। মুখমণ্ডল হতে সমস্ত চুল কানের পিঠে নিয়ে একদম আয়নার কাছে চলে যায় অরিন। নিজের গলাটি স্পষ্ট ভাবে দেখতে থাকে। এখনো ও কাম:’ড়ের দাগ স্পষ্ট । তবে কী কিং সত্যিই এসেছিলো? ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে অরিনের। ট্যাপ অন করেই মুখে কিছু ক্ষণ পানির ঝাপটা দিতে থাকে সে। তারপর নিজের গলার ভাঁজে চোখ পরে তার। দাগ স্পষ্ট। তাহলে কিছু ক্ষণ পূর্বে ওটা স্বপ্ন ছিলো না। কিং এসেছিলো। অরিন পানি নিয়ে নিজের গলায় দাগের জায়গা টুকুতে ঘষতে থাকে। যেন পানি দিলেই দাগ উঠে যাবে।তাই জোরে জোরে ঘোষতে থাকে সে।

গলার ভাঁজে ঘষতে ঘষতে একদম লাল করে ফেলে অরিন।কিংশুকের কোনো ছোঁয়াই সে আর নিজের শরীরে রাখতে চায় না।কিংশুকের ছোঁয়া তার যতটা অসুস্থ লাগে, তার থেকেও বেশি ভয় পায় সে কিংশুককে। পৃথিবীতে এখন একমাত্র একজন মানুষই আছে, যাকে অরিন ভয় পায়। তাকে দেখলেই সেই সময়গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। কতটা নির্দয়ভাবে তাকে আঘাত করেছিল সে। বিন্দুমাত্র দয়া ছিল না অরিনের প্রতি।এতটা ঘৃণা কেন তার ওপর?
গলা ঘষতে ঘষতে হঠাৎ মনে হলো।কেউ যেন তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।পরিবেশটা ও অদ্ভুত ভারী লাগছে তার। কিন্তু ওয়াশরুমে তো সে ছাড়া আর কারও থাকার কথা নয়। তাহলে…?
তড়িঘড়ি করে মুখে পানির ঝাপটা দেয় অরিন, তারপর বেসিনের আয়নার দিকে তাকায়।হঠাৎ আয়নায় চোখ পড়তেই ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে তার। থরথর করে কাঁপতে থাকে অরিনের সারা শরীর।ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে আসে এক ভারী, পুরুষালি কণ্ঠ

_এত গভীরভাবে স্পর্শ করব যে, দুনিয়ার কোনো পানিই তোকে শুদ্ধ করতে পারবে না।”
_আপনি…?”
_অন্য কাউকে আশা করেছিলি, বেবি গার্ল?”
কিংশুকের কণ্ঠ শুনেই অরিন ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করে নেয়, দু’হাতে জামার দু’পাশ খামচে ধরে।
_না… এটা হতে পারে না। কিংশুক এখানে আসতেই পারে না। _না! না! এটা স্বপ্ন… এটা আমার স্বপ্ন।
চোখ বন্ধ করেই কথাগুলো বিড়বিড় করে বলতে থাকে অরিন। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে চোখ খুলে সামনে তাকায়।না, কিংশুক নেই।তাহলে এতক্ষণ কি সে কল্পনাই করছিল?নাকি কল্পনাও কখনো কখনো সত্যের মতো ভয়ংকর হয়ে ওঠে? তাহলে গলার দাগ? চোখ হুট করেই গলার পানে চলে যায় অরিনের। কোনো দাগ বা চিহ্ন নেই তার গলায়। তাহলে কিছু ক্ষণ পূর্বে কী ছিলো? পুরোটা কী শুধুই তার কল্পনা? হয়তো কিংশুকের ভয় মনে এতোটাই জেগে বসেছে যে, দু-দন্ড শান্তিতে চোখ বন্ধ করে ও রাখতে পারে না অরিন।

সকালবেলা
দেরিতে ঘুম ভাঙে অরিনের। কড়া ওষুধের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে তার। আতিয়া বেগম ও তাকে ডেকে তোলে না।এই ঘুমটাই এখন তার সুস্থতার জন্য দরকার। নিজ থেকে না উঠলে ডাকার দরকার নেই তার। তাই তাকে ডাকা হয় না। নিজ থেকে ওঠে নিচে চলে যায়। নাস্তা শেষ করে চুপচাপ খান ম্যানশনের বিশাল হল রুমে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে অরিন। এই কয়দিন বাইরের যাওয়া তো দূরের কথা, সদর দরজায় ও যায়নি সে। সব সময় বাড়িতেই থাকতে হয় তাকে।
সারা ক্ষণ বাসায় বন্দি থেকে থেকে অরিনের মনে খানিকটা একঘেয়েমি জমে উঠেছিল। ক্যাটরিনা তাই ঠিক করে_তাকে নিয়ে কোথাও একটু ঘুরতে যাবে। সারাক্ষণ চার দেয়ালের ভেতর থাকলে মনটা আরও ভারী হয়ে উঠবে, সেটা সে ভালোই জানে। সবার অনুমতি নিয়ে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দু’জনে বেরিয়ে পড়ে-হিজল বিলের দিকে।

আজ বহুদিন পর অরিন খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে গভীর করে নিঃশ্বাস নেয়। আহা! কী অপূর্ব দৃশ্য। মনে হয়, জীবনটা যেন আবার নতুন করে ধরা দিচ্ছে তার কাছে। কিন্তু সে যে শান্তিতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।সেটাই যেন আরেকজনের দম বন্ধ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কিংশুক কখনোই চায়নি অরিনকে বাইরের পৃথিবীর কেউ দেখুক। তার ইচ্ছা ছিল অরিন থাকবে চার দেয়ালের ভেতর, কেবল তারই পৃথিবী হয়ে।কিন্তু অরিন কি এত সহজে সেই শৃঙ্খল মেনে নেবে?
হঠাৎ ফোন আসায় ক্যাটরিনা একটু দূরে সরে যায়। রিসোর্টের বিপরীত পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে।
অরিন চুপচাপ বসে থাকে ফুড কোর্টে। আশপাশে তেমন কেউ নেই।ভালোই হলো। একটু একা থাকা যায়।
কিছুক্ষণ পর ওয়েটার এসে ফুচকার একটা বড় প্লেট রেখে যায় তার সামনে।
অরিন একা বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে, শান্ত মনে নিঃশ্বাস নেয়। আশ্চর্যের বিষয়।এত জনবসতির জায়গা, অথচ আজ যেন অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ। মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে।

তবে সে বিষয়টাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না।
ঠিক তখনই।এক পিস ফুচকা মুখের দিকে তুলতেই হঠাৎ কেউ যেন বাজ পাখির মতো থাবা মারে।এক মুহূর্তে তার হাতের ফুচকাটা কেড়ে নিয়ে নিজের মুখে ঢুকিয়ে নেয় সেই মানুষটি। খুব গভীর ভাবে চুমু খায় অরিনের হাতে। ভয়ে অরিনের শিরদাঁড়া বেয়ে কাঁপুনি নেমে আসে। চোখ তুলে তাকাতেই সবকিছু থমকে যায়।দৌড় দিতে চেয়েছিল অরিন। চিৎকার করতে চেয়েছিল।কিন্তু তার আগেই শক্ত হাত জোড়া তার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়।
_You can run, but I’ll find you. Once I claim something, it never slips from my grasp.
তাকে এতদিন পর সামনে দেখে অরিন যেন বরফ হয়ে যায়। প্রাণপণ চেষ্টা করে নিজেকে ছাড়াতে।কিন্তু ব্যর্থ হয়। তার সমস্ত শক্তি কিংশুকের কাছে তুচ্ছ।

_আমার জীবনের শান্তি খেয়ে হচ্ছিল না? এখন বাইরে খুসকা খেতে এসেছো।
অরিনের মুখ থেকে যেন কোনো আওয়াজ বের হয় না।ভয়ে একদম জমে যায় অরিন। তার ওপরে সে কিংশুকের বাহুর মাঝে আবদ্ধ। এতোটা শক্ত করে ধরা হয়েছে তাকে, যেন হাড্ডি গুলো ভাঙার উপক্রম হয়ে এসেছে। ব্যাথায় কাতরাতে থাকে অরিন।
— প্লিজ কিং।… ছেড়ে দিন”
কিংশুক ঠাণ্ডা হেসে বলে — তোকে তো ধরতেই পারলাম না ঠিকমতো। ছাড়বো কীভাবে? “
অরিন ভেঙে পড়ে। কান্নায় তার কথা আটকে আসে।
__তোর মা কী ভেবেছিলো বলতো? স্টাফকে কিনে নিয়ে, বিয়ের কাগজ গায়েব করে আমাকে তোর কাছ থেকে দূরে রাখতে পারবে?একটা কাগজ আমাকে আটকাবে তোর কাছে আসা থেকে? বোকা জনগন। এই দুনিয়ায় এমন কোনো শক্তি নেই।যে তোকে আমার থেকে আলাদা করবে।”
কথাগুলো বলতে বলতে কিংশুকের কণ্ঠে ভয়ংকর দৃঢ়তা জমে ওঠে। অরিন ও বুঝে যায় কী হয়েছে ১৭ দিন আগে। মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে যায় সে।

__দরকার হলে তোর লাশ নিয়ে সংসার করবো, এখানে তো তুই জীবন্ত। জীবন্ত মানুষকে ছেড়ে দেবো?”
কিংশুকের প্রতিটি হুংকারে যেন সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে অরিনের। তার কথার তেজ এবং ধার আরো ক্ষত বিক্ষত করে তোলে অরিনকে।
___আমি ম’রে গেলে ও আপনার হবো না।”
__ম’র তাহলে।”
অরিনের চোখে এক ঝলক অন্ধকার নেমে আসে।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৯

একটা তীব্র শব্দ ভেসে ওঠে চারপাশে।অরিন আর কিছু বোঝে না।সব অন্ধকার হয়ে যায়।
_ভালো প্রেমিক আমি নই জান। আমার না হলে মা’রতে ও দু-সেকেন্ড লাগবে না।”
অরিন কিছু বলতে যাবে তার আগেই শরীরের সমস্ত শক্তি কমে আসে তার। রক্তাক্ত হাতটি ঝুলতে থাকে।
__আমি না-হয় তোকে দুনিয়া থেকে বাঁচালাম। কিন্তু আমার থেকে তোকে কে বাঁচাবে জান?”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪১