Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৪১

আমার আলাদিন পর্ব ৪১

আমার আলাদিন পর্ব ৪১
জাবিন ফোরকান

সাইবান আলাদিন।
ছেলেটা যেন আস্ত একটা রহস্যের বাক্স। অদ্ভুতুড়ে এক গোলকধাঁধা। যাকে ইরাম যত সমাধান করতে চায়, ততই নতুন নতুন ধাঁধার মায়ায় জড়িয়ে যায়। যখনই মনে হয়, ব্যাস, এটুকুই। এর চেয়ে বেশি অনন্যসাধারণ হওয়া সম্ভব নয়। তখনি সাইবান এমন কিছু করে বসে যে ইরাম অত্যাশ্চর্য্য হতে বাধ্য হয়। এই ছেলেটার লিমিট কতটুকু? জানা নেই রমণীর।
গিজার বসানোর কারণে পানিটা উষ্ণ। রাতের বেলায় শরীর ছুঁয়ে যেতেই কেমন আরাম বোধ হচ্ছে। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে কাকভেজা হয়ে রাত্রির সকল ক্লান্তি ধুয়ে মুছে ফেলছে ইরাম। লেকের ধারে, স্ট্রিট লাইটের নিচে স্বামীর বলে যাওয়া কথাগুলো বারবার তার কানে বেজে চলেছে।

—আমি কোনো ডিল চাইনা। আমার শুধু আপনাকে আর পোটলাকে চাই।
ছেলেটার প্রতি কোনোকালে কোনো প্রত্যাশা রাখেনি ইরাম। অথচ সে তার প্রত্যাশাকে দুমড়ে মুচড়ে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উঠে গিয়েছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। একজন যুবকের পক্ষে কি আদৌ সম্ভব এভাবে চিন্তাভাবনা করা? একজন ডিভোর্সী নারী, বয়সে বড়, অন্য এক পুরুষের ঔরসজাত সন্তান; এতকিছু মেনে নিয়ে কি সত্যিই সবকিছুকে নিজস্ব বলে আপন করে নেয়া যায়? ইরাম যে শঙ্কায় এত মাস ভুগে এসেছে, সেই শঙ্কাগুলো সাইবানের আবেদনে কেমন যেন ফিকে হয়ে যায়। হ্যাঁ, ছেলেটা ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, যেমন নয় ইরাম নিজেও। কিন্তু সে তো নিজের ভুলগুলোকে কোনোদিন যথাযথ ধরে বসে থাকেনি। তথাকথিত ‘মেইল ইগো’ ছেলেটার চালচলনে কোনোদিন প্রকাশ পায়নি। অথচ ইরাম তো সেই হিসাবে নিজের ভুলগুলোকে ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তারপরও কি ছেলেটা কোনোদিন পিছিয়ে গিয়েছে? বরং ইরাম দুই পা পেছালে সাইবান চার পা এগিয়ে এসেছে।

উষ্ণ পানি ইরামের ত্বক ছুঁয়ে গেল। শ্যামলা ত্বকে লালচে বরণ ফুটল। শুধু শরীর নয়, আজ উষ্ণতা ছুঁয়েছে তার অন্তরকে। জীবনকে আরও একবার নতুন রঙে রাঙাতে ইচ্ছা হচ্ছে। খুব কি ভুল হবে যদি আরেকটিবার বিশ্বাস করা যায়? এক যুবক তার প্রতিজ্ঞায় চির ধরিয়ে ফেলেছে। বাঁধ বসানো অনুভূতিগুলো কেমন জোয়ারে পরিণত হয়েছে। এই তান্ডব ইরামের মনের দূর্গ নাড়িয়ে ফেলেছে। হ্যাঁ, স্বভাবে সে বেপরোয়া, অপ্রতিরোধ্য গেঞ্জি! উপস! জেন জি! তবে নিজের পরিবারের ক্ষেত্রে দুর্দমনীয় হিমালয়। যে ইরামকে অব্দি দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করেছে আজ। অতি সূক্ষ্ম এক হাসি ছুঁয়ে গেল রমণীর ঠোঁটে। চোখ বুঁজে উষ্ণ পানির বিচরণ অনুভব করল সে প্রাণভরে। ভেজা ঠোঁটে বিড়বিড় করল আপনমনে,
“আমার আলাদিন।”

গোসল সেরে সুতি কাপড়ের অ্যামব্রয়ডারি করা একটি গোল জামা পড়ল ইরাম। এগুলো নতুন কেনা। গতমাসে সামিয়ার আর সারিকার সাথে শপিংয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন তার খালা ওরফে শ্বাশুড়ি কিনে দিয়েছেন। বেশ আরাম আছে এগুলোতে। চুল মুছতে মুছতে বাথরুমের বাইরে বেরোল সে। সামনের দৃশ্যটি তাকে মুগ্ধতায় গ্রাস করল বিনা কারণেই।
বিছানায় আরামে ঘুমাচ্ছে ইযান। সে আসার পর খানিকটা খাওয়াতেই কাদা হয়ে গিয়েছে একেবারে। দিন দুনিয়ার কোনো হুশ নেই, নিদ্রাচ্ছন্ন। ছোট ছোট হাত দুখানা মুখের দুই পাশে মুঠ করে রাখা। ইরাম গোসল করতে যাওয়ার সময় ঢেকে যায়নি ইযানকে, অথচ এখন একটা পাতলা চাদর দিয়ে ছোট্ট শরীরটা ঢাকা। কাজটা কার বুঝতে কিছুই বাকি রইলনা ইরামের। বুক ভরে উঠল তার তৃপ্তিতে। যার জন্য এতকিছু, এত সংগ্রাম, এত লড়াই, সেই ছোট্ট মানুষটা ভালো আছে। এর থেকে বেশি কিছু কোনোদিন ইরামের চাওয়ায় ছিলনা। তোয়ালে রেখে ঘুরে তাকাল সে। রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দা আছে একটা। সেই বারান্দার দরজা খোলা। সেখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাইবান। ইরামের আগেই গোসল সেরেছে সে। একটা ঢোলা হাফহাতা শার্ট আর ট্রাউজার পরনে। শার্টের বুকের দিককার বোতামগুলো খোলা। গলায় ঝুলতে থাকা একটা সিলভার চেইন চকচক করছে। চুলগুলো এখনো আধভেজা। তাকিয়ে আছে সুদূর আকাশপানে। বাতাসের ঝাঁপটা এসে গায়ে লাগছে। তাকে দেখাচ্ছে কোনো শিল্পীর হাতে গড়া সুনিপুণ এক ভাস্কর্যের মতন। ইরাম তাকিয়ে রইল অনেকটা সময়। অতঃপর পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল বারান্দার ভেতরে। দাঁড়াল সাইবানের পাশে।

“আকাশে কি দেখছ?”
নরম গলায় শুধাল ইরাম। সাইবান তার দিকে তাকাল না, আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখেই উত্তর দিল,
“তারা গুণছি।”
“তারা গুণে শেষ করা যায় না।”
“যতদিনে আপনি জবাব দেবেন, ততদিনে শেষ হয়ে যাবে।”
ইরাম মাথা ঘুরিয়ে সরু দৃষ্টিতে তাকাল,
“কি জবাব চাও তুমি?”
“সেটা আপনি বুঝে নিন।”
বুকে দুবাহু বেঁধে স্বামীকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল সে। সাইবানের নয়নজোড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে যাচ্ছে আকাশে ছড়িয়ে থাকা অগণিত তারাদের। তার কালো চোখের মাঝে অসীম সৌন্দর্য নিয়ে প্রতিফলন ঘটছে সেসবের। যেন তারা আকাশে নয় বরং সাইবানের চোখে ফুটেছে। ইরাম নরম গলায় বলল,
“তুমি বাস্তব সম্পর্ক চাও, আমাদের ভবিষ্যৎ চাও। সবই শুনলাম এবং বুঝলাম। কিন্তু আমার মনে হয়না তোমার ধারণা আছে তুমি কি চাইছ।”

এবার সাইবান চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। ইরামের মুখে ঘোরাফেরা করে ঠোঁটের উপর থামল তা এক সেকেন্ডের জন্য। পরক্ষণেই আবার চকিতে চোখে উঠে এলো, নয়নে নয়ন মেলালো।
“আমি না বুঝে জেদ করছি? তাই মনে হয় আপনার?”
ইরাম মাথা দোলাল। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল,
“তুমি জেদ করছনা। তোমার চাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তুমি বুঝতে পারছনা জীবনটা অনেক বড়। আজ বর্তমান একরকম, কাল সেটা নাও থাকতে পারে। মানুষের মন পরিবর্তন হতে দুই সেকেন্ড সময়ও লাগেনা। সেখানে বছরের পর বছর ধরে একসঙ্গে চলাটা কঠিন।”
চোখ তুলে স্বামীর গভীর দৃষ্টিমাঝে সরাসরি তাকাল ইরাম, বলল,
“তোমার আর আমার জন্য সেটা আরও কঠিন। কারণ, আমাদের বয়সের বিভেদ। আর পাঁচটা সাধারণ দম্পতির সঙ্গে নিজেদের তুলনা করাটা কঠিন। তুমি ভবিষ্যতে আরও ম্যাচিওর হবে, তোমার চিন্তা ধারায় পরিবর্তন আসবে। এটা জাগতিক নিয়ম। দোষের কিছু নয়।”
একটি ঢোক গিলল ইরাম, তার কন্ঠস্বর অনেকখানি মিইয়ে এলো,
“আর কিছু বছর পর আমার চুলে পাক ধরবে, শরীর ভেঙে যাবে, চেহারার জেল্লা কমে যাবে। তখনো কি তোমার আমাকে মনে ধরবে?”

গাঢ় নীরবতা। রেলিংয়ের উপর হাত চেপে বসল ইরামের। বাতাসের প্রবাহ এসে এলোমেলো করে দিয়ে গেল তার হালকা ভেজা চুলগুলো। মিনিটখানেক নৈঃশব্দ্য রাজ করল। অতঃপর, অতি ধীরে তার কাছে সরে দাঁড়াল সাইবান। রেলিংয়ের উপর রাখা তার হাতটার উপর নিজের বিশাল হাতটা রাখল। সব শীতলতা যেন তৎক্ষণাৎ দূরীভূত হয়ে গেল। ইরাম টের পেল উষ্ণতার আচ্ছাদন। সূক্ষ্ম হাসল সাইবান।
“আমার কাছে টাইম মেশিন থাকলে আমি সবার প্রথমে কি করতাম জানেন?”
কানের কাছে গভীর কন্ঠটা বাজল বুঝি। রমণী এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে অবাক হলো। তবুও শুধাল,
“কি করতে?”
“অতীতে গিয়ে সেই সময়টায় আপনাকে দেখতাম যখন আপনি একজন নারী থেকে একজন মা হয়ে উঠছিলেন।”
পাশ থেকে সরে পিছনে দাঁড়াল সাইবান। ইরামের কাঁধে মাথা ঠেকাল। জড়িয়ে ধরে একটি হাত রাখল অর্ধাঙ্গিনীর উদরের মাঝে,
“পোটলা যখন এইখানটায় বসবাস করত, তখন আপনাকে কেমন লাগত দেখার ইচ্ছা আমার আমৃত্যু মিটবেনা।”
একটু থেমে সে যোগ করল,

“আপনার ফোলা পেট, ভারী শরীর, খিটখিটে মেজাজ, বাচ্চামো ব্যবহার, চামড়ার স্ট্রেচ মার্কস দেখার জন্য যে যেকোনো কিছু সওদা করতে পারে, তার কাছে আপনার পাকা চুল গলিত জোছনা।”
ইরাম নির্বাক হয়ে রইল। কেমন অনুভূত হচ্ছে তা ব্যাখ্যা করাটা মুশকিল। বুকের ভেতর ঝড় উঠেছে। যে ঝড় এত সহজে দমবেনা আজ। অভ্যন্তরে যে সত্তাটাকে ইরাম বন্দী করে রেখেছে, আজ সে দুয়ারে কড়া নেড়ে স্বাধীনতা চাইছে। আর কত দূরত্ব? আর কত লুকোচুরি? একটুখানি ভালোভাবে বাঁচার অধিকার কি তার নেই?
টালমাটাল এই দোলাচলের মাঝেই তার কানে ভেসে এলো,
“আপনার প্রতিটা রূপই এই অধমের চোখে প্রবল আকর্ষণীয়, ইরাম।”
এ যেন এক নিগূঢ় আহ্বান। হাজার চাওয়া সত্ত্বেও এই আহ্বানের সামনে নিজেকে রোখা গেলনা। কাঁপা কাঁপা একটি হাত ইরাম নিজের উদরে চেপে বসা পুরুষালী হাতটার উপর রাখল। আঙুলগুলো জড়িয়ে গেল তার নরম আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে।

“আলাদিন?”
“হুম?”
ডাকের বিপরীতে যখন উত্তরটা ভেসে এলো, তখন ইরামের খুব মধুর অনুভূতি হলো। নিজেকে স্বাধীনতা দিল সে। এলিয়ে দিল শরীরটাকে, স্বামীর বুকের বিপরীতে। সাইবান আরো শক্তভাবে তাকে জড়িয়ে কাছে টেনে নিল। ঘাড়ে মুখ গুঁজল। সদ্য গোসল সেরে আসায় ইরামের শরীরের শীতল সুবাসটুকু তাকে মাতোয়ারা করে দিচ্ছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। ইরাম আকাশের তারাদের দিকে চেয়ে বলল,
“একটা সম্পর্কের মূলভিত্তি বিশ্বাস। যেখানে বিশ্বাসের বাস, সেখানে নিষিদ্ধ সর্বনাশ। আমি তোমাকে কতটুকু বিশ্বাস করি জানিনা, তবে তুমি আমার জীবনের এমন কিছু সত্য জানো যার সম্পর্কে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির ধারণা নেই। ইউ নো মাই ডার্কেস্ট সিক্রেট, মাই ডার্কেস্ট পাস্ট। কিন্তু সেই হিসাবে আমি তোমার সম্পর্কে কতটুকু জানি?”
সাইবান থমকাল। মুখ তুলে খানিকটা বিস্ময় নিয়ে তাকাল অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। ইরাম তার আঙুলগুলো শক্তভাবে চেপে ধরে নিজেদের মেলানো হাত দুটো দেখতে দেখতে বলল,
“যদি তুমি আমাদের মাঝে সত্য চাও, তবে তোমাকেও সত্য হতে হবে। আমি জানিনা তুমি আমাকে বিশ্বাস করো কিনা। যদি মনে হয়, এক বিন্দু হলেও করো, তাহলে তোমাকে বুঝতে আমাকে একটুখানি সাহায্য করো, কেমন?”

সাইবানের আঙুলগুলো ইরামের আঙুলের মাঝে এতটা জোরে চেপে বসল যে রমণী এবার রীতিমত ব্যথা পেল, তবুও নিজের হাত সরিয়ে নিলনা। স্বামীকে সময় দিল। সাইবানের চেহারা শক্ত হয়ে গিয়েছে, চোখজোড়া থেকে নমনীয় ভাব বিদায় নিয়ে কেমন বিষণ্নতা ভর করেছে। অবশেষে ঝুঁকে ইরামের কাঁধে কপাল ঠেকাল সে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আপনি কবে থেকে জানেন?”
তার কণ্ঠটা হালকা ভাঙা শোনাল। ইরাম জবাব দিল,
“আমি জানিনা। তোমার কাছ থেকে জানতে চাই। তুমি বললে তবেই আমি জানব।”
কিছুক্ষণ নীরব হয়ে থাকল সাইবান। ইরাম ভাবল, কোনো প্রতিক্রিয়া আসবেনা। হয়ত সে অতটাও কাছাকাছি যেতে পারেনি এই ছেলেটার, যতটা কাছাকাছি গেলে মনের কথাগুলো একেবারে লুকিয়ে না রেখে খোলাখুলি বিনিময় করা যায়। অথচ তার আলাদিন তাকে আরও একবার পরিপূর্ণভাবে হতবাক করে দিল। আগের তুলনায় শান্ত হয়ে বলল,

“আমাকে একটু সময় দিন, একটুখানি গুছিয়ে নিই। আমি আপনাকে নিজে থেকে সব বলব।”
ব্যাস। আর পারা যায়না। এতকিছুর পর আর ফিরিয়ে দেয়া মানায় না। ইরামের বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। মনে হলো, যেন শ্বাস আটকে যাবে তার। সাইবান বলে গেল,
“আর থ্যাঙ্কস, আমার মতন মহাবোকামি না করে আপনি সরাসরি আমার কাছে এসেই জানতে চেয়েছেন। আমি দাম্পত্য জীবনে এখনও কাঁচা, হালটা আপনাকেই শক্ত হাতে ধরতে হবে।”
সহসাই উল্টো ঘুরে দাঁড়াল ইরাম। দুর্বোধ্য হৃদয় চেপে দুহাত তুলে সাইবানের মুখটা চেপে ধরল।
“তোমাকে কি কোনো বাহানাতেই আটকানো যাবেনা?”
মৃদু হাসল সাইবান। ইরামের হাতে বিড়ালছানার মতন নিজের মুখ ঘষতে ঘষতে বলল,
“তালা আটকায় চাবিতে, মাছ আটকায় বড়শিতে, আর আমি আটকাই আপনাতে।”
ঝুঁকে এলো সে, স্তব্ধ অর্ধাঙ্গিনীর সন্নিকটে থেমে প্রাণভরে তার ভ্রু জোড়ার ভাঁজ, চেহারার লালিমা এবং ঠোঁটের কাঁপুনি খেয়াল করল। বৃদ্ধাঙ্গুলে ছুঁয়ে দিল সেই ঠোঁট। ইরাম শিউরে উঠল, পরক্ষণে ফিসফিসিয়ে বলল,

“পরে যেন বলোনা আমি তোমায় সাবধান করিনি।”
“আপনি তো আমার জন্য গোটা একটা বিপদ সংকেত, আসতে যেতে সাবধানতা ভাসে, তবুও যাই বারবার পিছলে।”
নরম ঠোঁটের উপর নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিল সাইবান। প্রথমটায় আলতোভাবে। ইরামের সমস্ত শরীর কাঁপল। হাত দুখানা ঠেলে দূরে সরাতে চাইল এই প্রণয়কে। অথচ আজ তা পারা গেলনা। নব সূচনা গ্রাস করল তাকে। নতুন প্রত্যাশা, আশা, ভরসা এবং স্বপ্নের উদয় ইরামকে আর নির্বিকার থাকতে দিলনা। সাড়া দিল সে। সাইবান তাতে সেকেন্ড খানেকের জন্য জমে গেল। বুঝি এমন নিগূঢ় উৎসাহ আশা করেনি। ঠিক পরমুহূর্তেই সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
দুহাতে ইরামকে কাছে টেনে নিজের সাথে পুরোপুরি মিশিয়ে ফেলল সাইবান। অর্ধাঙ্গিনী তার শক্তপোক্ত শরীরের ভার স্পষ্ট টের পেল। সঙ্গে তীব্র আবেগের উদগীরণ। ইরামের চোখজোড়া বুঁজে গেল। সে শুধু অনুভব করে গেল, তার ঠোঁটের মাঝে সাইবানের ঠোঁটের আগ্রাসী বিচরণ। এক হাতে তার চুল আঁকড়ে ধরল স্বামী, কোমরে আঙুল চেপে ঠেলে দিল রেলিংয়ের উপর। সিমেন্টের থামে পিঠ ঠেকল ইরামের। না চাইতেও সামান্য গুঙিয়ে উঠল সে।

“আই ওয়ান্ট ইউ, মাই প্রেশিয়াস।”
ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে তার ঠোঁটের বিপরীতে ফিসফিস করল সাইবান। তার উজ্জ্বল চেহারাটা কেমন যেন রক্তিম আভা ধারণ করেছে। কপালে চুল এলোমেলো হয়ে পড়েছে। ভ্রু পিয়ার্সিং অশনি সংকেতের মতন চিকচিক করছে। আর ওই চোখজোড়ায় যেন জনম জনমের মোহ। ইরাম বিমুগ্ধ চেয়ে দেখল। সাইবান তার নাকের ডগায় চুমু খেয়ে আবারও বলল,
“এত আদর আর বুকে রাখা যায় না, আজ আমার আদরিণী হয়ে যান না?”
ইরাম মৌখিক কোনো উত্তর করলনা। দুহাত বাড়িয়ে স্বামীকে কাছে টেনে প্রথমে তার কপালে চুমু দিল। অতঃপর পুনরায় সেই ঠোঁটের ভাঁজে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। সাইবানের আঙুল তার চুলের মাঝে চলে গেল, আঁকড়ে ধরল যেন সমস্ত অস্তিত্বকে। ইরাম নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার সাহস করল। চোখ বুঁজে ফেলতেই মনে হলো, যেন অসংখ্য হাত তাকে চারিপাশ থেকে জাপটে ধরতে চাইছে। হাজারো স্মৃতি ভাসল মানসপটে। অন্ধকার ঘর, চিৎকার, শরীরী দাগ, র*ক্ত, উন্মাদ করা হাসি, বিকৃত উদযাপন। শরীর কাঁপল সেই দুঃসহ স্মৃতির তাড়নায়। তবে আজ নিজেকে সরিয়ে নিলনা সে। নিবেদন করল এই বেপরোয়া ঘূর্ণিঝড়ের সামনে। পরিণতি কি হবে? জানা নেই তার।
ইরামের শরীরটাকে সটান শূন্যে তুলে ফেলল সাইবান। যেন পুতুলমাত্র। হনহন করে হেঁটে বারান্দা থেকে চলে এলো রুমের ভেতর। বিছানার একপাশে সযত্নে শুইয়ে রাখল। ইরাম উঠে বসার সুযোগটুকুও পেলনা। এর আগেই সাইবানের ভারী শরীর চেপে এলো তার উপর। হাত দুটো চেপে ফেলল ম্যাট্রেসে। অর্ধাঙ্গিনীর ঠোঁট পেরিয়ে চিবুক, কালের লতি ছুঁয়ে গেল তার অধরজোড়া। নেমে এলো আরও নিচে। গলা আর কাঁধের সংযোগে, ঠিক যেখানে উন্মত্ত হয়েছে ইরামের পালস, সেখানে একটা কামড় বসিয়ে দিল সাইবান।

“আলাদিন!”
রমণীর মনে হলো, তার ধর থেকে আত্মা বোধ হয় বেরিয়েই গেল। নামটা অজান্তেই মুখ ফস্কে বেরিয়ে এলো আবেদন নিয়ে। হাসল সাইবান, আবেশিত গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আপনার আলাদিন।”
ইরামের গলায় মুখ গুঁজে দিল সে। তার মাতাল করা ছোঁয়ায় কম্পিত হতে লাগল রমণীর সর্বাঙ্গ। প্রাণভরে অনুভব করল সাইবান, নিজের শরীরের ভারের নিচে অর্ধাঙ্গিনীর প্রতিটা কম্পন, প্রতিটা প্রতিক্রিয়া, প্রতিটা দ্রুত নিঃশ্বাস। দারুণ মুগ্ধতা গ্রাস করল তাকে। আপনা আপনি ইরামের পিঠের নিচে হাত চলে গেল তার। জামার বোতামগুলো খুলতে লাগল, সময় নিয়ে, একটা একটা করে। উন্মুক্ত হওয়া কাঁধে ছুঁয়ে দিল নিজের ঠোঁট, যত গভীরভাবে সম্ভব, যতবার পারা যায়। বাদ দেয়া যাবেনা এক ইঞ্চি ত্বকও। ইরামের বাম কাঁধ রেঙে উঠল তার আদরের চিহ্নে। অসীম তৃপ্তি হলো এই দখলদারিত্বে। পিঠের মাঝে হাত বুলিয়ে ইরামের কানের লতিতে কামড় বসাতেই হঠাৎ,

“আআআ…উয়াআআআ!”
জমে গেল উভয়ে। ঘোর থেকে বেরিয়েছে এমন দৃষ্টিতে তাকাল একে অপরের দিকে। টকটকে লাল হয়ে ওঠা মুখে চেয়ে রইল ইরাম স্বামীর মুখপানে, তারপরই মাথা কাত করে দেখল পাশে। বিছানায় আরেকটু দূরে শুয়ে হাত পা ছুঁড়ে কাঁদছে ইযান। এক মুহূর্তের জন্য তার কথা মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিল দুজনের! ভীষণ লজ্জাবোধ হলো ইরামের। সাইবানের বুকে হাত ঠেকিয়ে ঠেলল,
“সরো, কুচুপু কাঁদছে।”
অথচ একচুল নড়লনা সাইবান। মাথা কাত করে তাকিয়ে থাকল ইযানের ছটফট করতে থাকা শরীরের দিকে। তার চেহারা কেমন যেন শক্ত হয়ে গিয়েছে। ভ্রু জোড়ার মাঝে তীব্র টানটান ভাঁজ, কপালের পাশের শিরা উপশিরা জেগে উঠেছে, গলার দিকটায় ধমনী স্পষ্ট দপদপ করছে। কাছাকাছি থাকায় শরীরে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া উত্তাপটাও ইরাম স্পষ্ট টের পাচ্ছে। ইস্ত্রিকে বিদ্যুৎ দিলে যেমন ধীরে ধীরে গরম হয়ে ওঠে, সাইবানও ঠিক তেমন গরম হয়ে যাচ্ছে। আরেকটু হলেই বাষ্পীয় ইঞ্জিনের মতন তার মাথা থেকে ধোঁয়া বেরোনো শুরু হতে পারে। ইরাম উঠতে চাইল, এবার খানিকটা জোরেই ধাক্কা দিল,
“আলাদিন?”

ধপ করে তার কাঁধে মাথা গুঁজে ফেলল সাইবান। ছেলেটার শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। দুই হাতের আঙুল বিছানার চাদর এত শক্তিতে আঁকড়ে ধরেছে যে আঙুলগুলো ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে। ইরাম ফিসফিস শুনতে পেল নিজের কানে,
“তামান্না ভাটিয়া…তামান্না ভাটিয়া…ধুরু জাউরার বাচ্চাটা! তামান্নাও আর কাজের না!”
এক লাফে ইরামের উপর থেকে উঠে পড়ল সাইবান। ধুপধাপ পা ফেলে হনহন করে এগিয়ে গিয়ে এক হাতে খাবলা দেয়ার মতন করে ইযানকে তুলে ফেলল। ইযানের কান্না থেমে গেল হঠাৎ করেই, অশ্রুসজল চোখে সে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল পিতার দিকে, যেন নিজেও অবাক হয়ে গিয়েছে। ইরাম হতবিহ্বল চেয়ে দেখল, সে নিশ্চিতভাবে জানে, ইযান কথা বলতে পারলে বলত, “এটা কোন ধরণের বেয়াদবি, আব্বু?” তার মুখ থেকে বেরোল,
“গুউউ?”
“তোরে গুয়ের পোটলায় বাইন্দা পিসা দিয়া অ্যাকসের ওসাইতে পারতাম!”
সাইবানের মুখ থেকে বরিশাইল্লা ভাষা বেরিয়ে গিয়েছে। ইরাম ফ্যালফ্যাল করে শুধু দেখে যাচ্ছে কান্ড। ইযানও কম যায়না। কত্ত বড় সাহস বাপে ওনাকে গালি দেয়! সেও ছোট্ট পা তুলে বুক বরাবর লাথি হাঁকিয়ে খেঁকিয়ে উঠল,

“আগা…গু!”
“এউক্কা পাক্কা মারমু এইহানে, ফ্ল্যাশ হবি যাইয়া লেট্টিনে!”
সত্যি সত্যি ছুঁড়ে দেয়ার ভঙ্গি করল সাইবান। তার বাহুর মাঝে সাপের মতন হাত পা জড়িয়ে আঁকড়ে ধরে ফেলে ইযান নিজের শক্ত মাড়ির এক ভয়ানক কামড় বসিয়ে দিল বৃদ্ধাঙ্গুলে। সূচ ফোঁটার মতন একটা ব্যথা হলো। সাইবান ঝটকা দিয়ে উঠল,
“আহ!”
ভারসাম্য হারিয়ে বিছানায় বসে পড়ল সে। ইযান তার হাত থেকে নেমে গড়িয়ে গেল ম্যাট্রেসের উপর। কার্যসিদ্ধি হাসিল হয়েছে। বিজয়ীর ভঙ্গিতে মাথা তুলল সে। তাতেই দেখা গেল নিচের মাড়ির উপর সাদা সাদা সুঁচালো কিছু একটা, একেবারে জ্বলজ্বল করছে।
“কোদালের খোঁচানি!”
গর্জে উঠল সাইবান। ইরাম যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে এতক্ষণে। দ্রুত ইযানকে বুকে টেনে নিল সে।
“দেখি দেখি, আমার কুচুপুর দাঁত উঠেছে!”
একটি আঙুল ঢুকিয়ে সন্তপর্নে পরীক্ষা করল ইরাম। কিছুদিন থেকেই সে বুঝতে পারছিল, জায়গাটা শক্ত ছিল, দাঁত উঠবে শীঘ্রই। আজ সকালেও মুখ পরিষ্কার করার সময় সুঁচালো লেগেছে। তবে তখনো দাঁত ভালোভাবে বেরোয়নি। এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট একটুখানি। ইরামের মাঝে ইযান একেবারে গলে গেল। মাতৃহৃদয় আনন্দে নেচে উঠল। জড়িয়ে ধরে অসংখ্য চুমু খেল সে ছেলেকে।

“আমার আব্বু, আমার সোনাটা। কত্ত বড় হয়ে গিয়েছে। আমার কুচুপুটা! দাঁত উঠেছে তোমার? হ্যাঁ? কত্ত সাহসী আমার আব্বুটা, উম্মাহ্, উম্মাহ্!”
খিলখিলে গলায় হাসল ইযান, মায়ের আদরে উত্তেজিত হয়ে পড়ল,
“আআ..গুগু!”
“শাহেনশাহে চেরাগুল্লাহ্ পোটলায় কিবরিয়াদিনের গুয়ের সময় হয়ে গেছে। ওকে তেরো চামচ গু খাইয়ে পুক্কুর গু মাথায় তুলে দেয়া হোক। শালা পাঙ্গাসের বাচ্চা!”
লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল সাইবান। ইরামের বুকে লেপ্টে থাকা ইযানের দিকে আঙুল তুলে হুংকার দিল,
“খা তুই খা! ঝোলার খাওনডা খা!”
উল্টো ঘুরে হনহন করে হেঁটে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সাইবান। যাওয়ার সময় দরজাটা এত জোরে লাগিয়ে দিল যে ঠাস করে শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। প্রথমটায় স্তব্ধ হয়ে রইল ইরাম এবং ইযান দুজনেই। পরক্ষণেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। ছেলের কপালে কপাল ঘষতে ঘষতে ইরাম বলল,
“আব্বু তো চেতে গেছে রে, কুচুপু!”
“আ..বা…গুউউ!”
বহুদিন বাদে প্রাণখুলে হাসল ইরাম।

শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল ইরাম। বলা বাহুল্য, সাইবান সত্যিই গত রাতে আর রুমে আসেনি। ব্যাপারটা কি হলো? এতই রাগ? সেই রাগের কথা মনে আসলেও ইরামের হাসি পাচ্ছে এখন। তাই ঘুম ভাঙতেই সে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল। ইযান মহারাজ রাতের দরবার শেষ করে এখন নিদ্রাবিশ্রামে আছেন। তাকে শুইয়ে রেডি হয়ে ইরাম নিচে নেমে এলো। কাঠের সিঁড়িতে ক্যাচক্যাচ শব্দ হলো। সাইবান অভিমানীটাকে এখন না আবার তোষামোদ করে ম্যানেজ করতে হয়!
নিচে নামতেই বেশকিছু খাবারের সুঘ্রাণ নাকে গেল ইরামের। সামনের দৃশ্য দেখে তার পদক্ষেপ সিঁড়ির মাঝেই থেমে গেল। বিস্মিত নয়ন মেলে দেখল সে। নিচের বসার ঘরটা মরিচবাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। পুরাতন দিনের বিয়েবাড়িতে যেমন রঙিন কাগজ ত্রিভুজের মতন কেটে কেটে ঝোলানো হতো, তেমন ঝোলানো হয়েছে। কয়েকজন কর্মী নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে এখনো। টি টেবিলের সামনে মেঝেতে বসে অনুরাগ। রঙিন কাগজ কেটে কেটে দিচ্ছে সে, পাশেই সুগন্ধা বসে বসে ঝালর বানাচ্ছে। মিসির সোফায় বসে বেলুন ফুলিয়ে রাখছে। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে বুঝি নব্বই দশকের কোনো অনুষ্ঠানবাড়িতে ঢুকে পড়েছে কেউ। ইরাম অবাক হয়ে সামনে এগোল। অবশেষে চোখ গেল তার ওই মানুষটার দিকে। সারারাত কোথায় ছিল বুঝতে বাকি রইলনা।

আমার আলাদিন পর্ব ৪০

দেয়ালের কাছে চেয়ারের উপরে সাইবান। আঠা দিয়ে একটা পোস্টার টানাচ্ছে সে। সেই পোস্টারে লিখা—আজ আপদের ঝন্মদিন! কিন্তু জ এর বদলে ভুলে ঝ লিখে ফেলেছে, সেটা আবার নতুন করে লিখারও প্রয়োজনবোধ করেনি। ঝ কেটে ওখানেই বানান ঠিক করে লিখেছে আবার,
—আজ আপদের জন্মদিন।
সাইবান সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই মার্কার হাতে নিয়ে কী যেন দেখল। হতবাক ইরাম খেয়াল করল, সেই লাইনটাও আবার কেটেকুটে সাইবান ওই কাটাকাটির মাঝখানেই লিখল,
—আজ আপদকে জন্ম দিন।

আমার আলাদিন পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here