আমার আলাদিন পর্ব ৬৪
জাবিন ফোরকান
গাড়ি চলছে কোর্টের উদ্দেশ্যে। প্রথমটায় সবাই কোর্টে আসার আগ্রহ দেখালেও শেষমেষ শুধু অনুরাগকে সাথে এনেছে সাইবান। সামিয়া, সারিকা এমনকি মিসিরও চেয়েছিল সঙ্গে আসতে। তবে এত ঝামেলা করাটা অনুচিত হবে বিধায় তাদের বাড়িতেই অপেক্ষারত রাখা হয়েছে। এই মুহূর্তে প্যাসেঞ্জার সিটে বসে আছে সাইবান। তার উরুর উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে ইযান। গায়ে জামা থাকলেও কোনো প্যান্ট নেই। কারণ মাত্র কিছুক্ষণ আগে গাড়ির ভেতরেই ডায়পারে বড় কাজ সেরে ফেলেছে সে। ইরাম সঙ্গে প্রয়োজনীয় জিনিস সব এনেছে বলেই রক্ষা। ওয়েট টিস্যু দিয়ে ছেলেকে ভালোমত মুছে দিচ্ছে সে। অপরদিকে কটমট করে ছেলেকে চোখ রাঙাচ্ছে সাইবান।
“কি মনে হয় রে পোটলা? তোর বাপ টয়লেট ব্যবসায়ী? গলায় কমোড বেঁধে ঘুরবে তোর জন্য?”
ইরাম চোখ উল্টে স্বামীর হাতে পাউডার এগিয়ে দিল। জানে, ছেলে আর বাবা এক কিসিমের। কারো থেকে কেউ কম যায়না। সাইবান পাউডার উপুড় করে ইযানের পিছনে ঢেলে সপাত করে একটা চাপড় বসিয়ে দিল।
“বাপের বাড়ি গাড়ি দখল করতে হবেনা, হেগে ভাসিয়ে দে। কি দিনকাল এলো রে বাবা! মানুষজন জিজ্ঞেস করলে কি বলব? আমার পোটলা গাড়িতে হাগে?”
“বা…গু! গুগু!”
“অ্যাই চোপ! জজ সাহেবার সামনে হাগিস না খবরদার! সোজা পূর্ব দিকে পাক্কা মেরে বলব এই খবিশটা আমার না।”
বিপরীতে পা তুলে সাইবানের বুক বরাবর লাথি হাঁকিয়ে দিল ইযান। ছোট্ট দুহাত মুঠো পাকিয়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলল,
“গাগা…গুবা…আবা…আম আম!”
“উফ! চুং চাং এক্ষণ বন্ধ কর। চাইনিজরা তোকে তাদের দোসর ভেবে পোটলায় বেঁধে পাঁচার করে দেবে!”
“ইয়া! উয়াআআ!”
সে কি মিছিমিছি কান্না ইযানের। সঙ্গে সপাত সপাত লাথি ঘুষি। থাকবেই না। সে কিছুতেই সাইবানের কাছে থাকবেনা। বাইন মাছের মতন শরীর ঝটকা দিতে দিতে আম আম করতে লাগল। ইরাম শেষমেষ ছেলেকে নিজের কোলে নিয়ে ব্যাগ থেকে নতুন একটা ডায়পার বের করে পরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আলাদিন। আমার কুচুপুকে আর জ্বালাতন করোনা তো।”
“ইশ, দেখ দেখ, মায়ের কাছে কেমন বিচার বসাচ্ছে দেখ! আসিস তুই আমার কাছে আরেকবার। হেগে পুক্কু দেখিয়ে বলিস, বা…গু! মুছে দাও! শিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষে দেব একদম!”
“আলাদিন!”
স্বামীর মুখ বন্ধ করতে তার ঠোঁট বরাবর আলতো চাপড় দিল ইরাম। নিজের হাতটা এরপর আর ফেরাতে পারলনা। সটান তার কব্জি ধরে ঠোঁটে চেপে ধরল সাইবান। চোখে ফুটল জ্বলজ্বলে অনুভূতি। ইরামের তর্জনী মুখে ঢুকিয়ে হালকা কামড় দিল। কেঁপে উঠল ইরাম। সাইবান তীর্যক হেসে ফিসফিস করল,
“উমমম…ডেলিশিয়াস।”
“কুচুপুর গু ধরেছি। ডেলিশিয়াস তো হবেই।”
“নাউজুবিল্লাহ! ওয়াক!”
ইরামের বেখাপ্পা কথা শুনে ঝটকা দিয়ে দূরে সরে গেল সাইবান। তার চেহারায় বিকৃতি ফুটল। গলা চেপে ধরে বমি নিবারণ করতে চাইল। শেষমেষ উপায়ান্তর না পেয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে একদলা থুথু ফেলল।
“ওয়াক! ওয়াক…!”
এতক্ষণ চুপচাপ নীরবের পাশে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকলেও এবার আর মন্তব্য না করে পারলনা অনুরাগ। গিয়ার ধরে নিজের মুখ ঘষে ইরামকে বলল,
“এর সাথে কীভাবে সংসার করছেন বৌদি? আমি হলে ফুলশয্যার রাতেই ডিভোর্স দিতাম।”
“ভবিষ্যতে ডিভোর্স কেইস লড়তে হলে প্লীজ আমাকে জানাবেন। একদম ফ্রীতে ব্যবস্থা করে দেব।”
সঙ্গত করল নীরবও। সাইবান মুখ বাঁকিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ করে বলল,
“মদ সিগারেট দিয়ে কালসাপ পুষেছি একেকটা!”
পরক্ষণেই গাড়ির দরজায় ঘুষি দিয়ে সে খেঁকিয়ে উঠল,
“শুধু একবার বিয়ে হোক তোদের। রাসলীলা কাকে বলে এমনভাবে দেখাব যে পুক্কুর লুঙ্গি মাথায় উঠে যাবে শালা!”
“সুগার ড্যাডি ক্ষেপেছে রে!”
নীরব মুখ টিপে হাসতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল সাইবান। পায়ের কেডস খুলে ছুঁড়ে মারল। গাড়ির উইন্ডশিল্ডে গোত্তা খেয়ে সেটা নীরবের কোলের উপর পড়ল।
“ভুলে হাতের আঙুলের চাপ পড়ে ফারিয়ার হোয়াটসঅ্যাপে তোর নাঙ্গাপুঙ্গা ছবি শেয়ার হয়ে গেলে সাইবান দায়ী নয়।”
“ইয়া! সাইবান!”
গর্জে উঠল নীরব। কেডস জুতোটা পাল্টা ছুঁড়ে মারল বন্ধুর দিকে। নিজের সিটে বসে ইরাম কপাল চাপড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ছেলেগুলো কোনোদিন শুধরাবে না। না শুধরাবে তাদের দলনেতা।
খুনসুঁটির মাঝেই কোর্টে পৌঁছে গেল তারা। প্রাঙ্গণে গাড়ি থামতেই সারা রাস্তা রীতিমত বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে আসা দলটা কেমন শান্ত আর গম্ভীর হয়ে গেল। ইরাম তাদের অনুভূতি বদলের অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে অবাক না হয়ে পারলনা। কিছুক্ষণ আগে তাদের গাড়িটা দেখলে যে কেউ বলত হয়ত সবাই মিলে পিকনিকে যাচ্ছে। অথচ এখন চারপাশে গুরুগম্ভীরতা। ইযানকে নিয়ে নামল ইরাম। সত্যিই ছেলে তার পিতার সাথে গোস্সা করেছে। নিজের হাতে থাকা ইদানিং কালের প্রিয় খেলনা, একটা ডায়নোসর প্লাশি নিয়েই ব্যস্ত সে। সাইবানও কম যায়না। ছেলেকে মুখ ভেংচে আই ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিমায় হেঁটে গেল সামনে। ইযান বিপরীতে হাতের ডায়নোসরের গলা কামড়ে ধরল, যেন ওখানে আলাদিনের গলা আছে। কোর্টে পৌঁছানোর রাস্তাতেই ইরাম অর্ধেক ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। বাকি দিন কীভাবে কাটাবে ভাবনার বিষয়। তবে এখন অত ভেবে কাজ নেই। ধীরে ধীরে বারান্দার উপর উঠে গেল সে। ঠিক তখনি নজরে এলো দৃশ্যটি। এজলাস কক্ষের বাইরে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য।
অরণ্যর পরনে একটা নীল সিল্কের শার্ট আর কালো ফরমাল প্যান্ট। শার্টের উপরের দিককার বোতাম খানিক খোলা। চুলগুলো বোধ হয় শীঘ্রই কেটেছে। পরিপাটি করে আঁচড়ানো, গুটিকতক কপালের আশেপাশে লুটিয়ে আছে। চোখে সরু সিলভার রিমের চশমা। এক হাতে চায়ের প্লাস্টিকের কাপ ধরা। পাশে দাঁড়ানো অর্চি বড়ুয়ার দুই জুনিয়র অ্যাডভোকেট। তাকে কিছু বুঝিয়ে বলছে আর সে চুমুক দিতে দিতে শুনছে। ইরাম পৌঁছাতেই অরণ্য মাথা কাত করে তাকাল। তার চোখের মণিগুলো কেমন যেন অস্বাভাবিক গাঢ় দেখাল। ইরামের চোখে সরাসরি তাকিয়েই চায়ে লম্বা চুমুক দিল সে। অবিচলিত দৃষ্টি তার প্রাক্তনের শরীরে ঘুরপাক খেল। আটকাল তা চুমকি বসানো কামিজের ভাঁজে ভাঁজে। সর্বশেষে স্থির হলো ঠিক ইযানের উপর। নিজের প্লাশি কামড়াতে কামড়াতে বড় বড় মায়াবী চোখ মেলে পাল্টা তাকাল ইযান। ছোট্ট মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলনা। বরং আবারও ফিরে গেল নিজের খেলনায়। অরণ্য হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। এক পা সামনে বাড়ালেও এর বেশি কিছু করা সম্ভব হলোনা। এর আগেই স্ত্রী সন্তানকে আড়াল করে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল দীর্ঘদেহী সাইবান। তার সুগঠিত গঠনের কারণে পিছনে থাকা ইরাম আর ইযান দুজনই আড়াল হয়ে গিয়েছে। ডার্ক জিন্সের পকেটে দুহাত ভরে মাথা কাত করে অরণ্যকে দেখল সাইবান। জিভ বের করে অকারণে নিজের শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বাঁকা হাসল। তার চোখে ঝুলল সতর্ক সংকেত। কথা বলার কোনো প্রয়োজন পড়লনা। অরণ্য পেছাতে বাধ্য হলো।
ফারহানা ইয়াসমিন বরাবর ১০ টায় এজলাসে বসেন। এক মিনিটও এদিক সেদিক হয়না কখনোই। আজও ব্যতিক্রম ঘটলনা। ফারহানা পৌঁছাতেই মামলার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেল। ইরাম বেঞ্চে বসে রইল খানিক তটস্থ হয়ে। ইযান এত মানুষের ভিড়ে অভ্যস্থ না হলেও বিশেষ হেলদোল নেই। খেলনা নিয়ে আপন জগতেই ব্যস্ত সে। মায়ের কোলে আছে অর্থ তাকে পৃথিবীর কোনো কলুষতা ছুঁতে পারবেনা। যেন মনেপ্রাণে সেটা জানে অবুঝ শিশুটি। আজ মামলার ডাক আসতে অন্যান্য দিনের তুলনায় কম সময় লাগল। আধ ঘণ্টা বাদেই পেশকার মামলা নং ঘোষণা করলেন। বাদী এবং বিবাদী উভয় পক্ষের আইনজীবী সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ফারহানা কাগজে কিছু লিখতে লিখতে জিজ্ঞেস করলেন,
“শিশুটি উপস্থিত আছে?”
“জি মহামান্য।”
শিশির চৌধুরী তৎক্ষণাৎ জানালেন। ফারহানা মুখ তুলে সামনে তাকালেন। ইরামের কোলে বসে খেলতে থাকা ইযানকে দেখলেন। যথারীতি তার কঠোর চেহারায় কোনো অনুভূতির দেখা মিললনা। তিনি অনুমতি দিতেই প্রথম বক্তব্য শুরু করলেন অর্চি।
“ইওর অনার, আপনার কাছে ইতোমধ্যে সকল তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। বিবাদী পক্ষের প্রশ্ন ছিল আমার মক্কেল এই নয় মাস কোথায় ছিল? এতদিন কেন সন্তানের দাবী করেননি? মানবিক কোণ দিয়ে দেখতে গেলে তালাকের পর বাদী খুবই বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। হতাশায় নিমজ্জিত ছিলেন। যার দরুণ সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার মতন মানসিকতা তার ছিলনা। এমনকি তিনি সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্নও হয়েছিলেন, আপনাকে প্রেসক্রিপশনের কপিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু নয় মাসে তিনি একটুও খোঁজ নেননি, এটা একটা মিথ্যাচার। বরং মামলার আগেও তিনি নিজের ছেলেকে বহুবার দেখতে চেয়েছেন, কিন্তু তার সাবেক স্ত্রী সেই সুযোগ তাকে দেননি।”
“অবজেকশন ইওর অনার।”
ঠান্ডা গলায় বললেন শিশির চৌধুরী। এক পা সামনে বাড়ালেন। শক্ত কন্ঠে ঘোষণা করলেন,
“মানবিক বিবেচনাবোধ দিয়ে আদালত চলে না। তালাকের পর শুধু উনিই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ছিলেন? শিশুর মা কোনো অংশে কম ভোগান্তিতে ছিলেন নাকি? তবুও তিনি নিজের সন্তানকে আগলে রেখেছেন, বড় করে তুলেছেন তিল তিল করে। তাই এমন যুক্তি হাস্যকর।”
“যদি হাস্যকর হয়েই থাকে, তবে বলবেন প্লীজ আপনার মক্কেল কেন প্রথমেই কাস্টাডির বিষয়টা নিশ্চিত করেনি? তিনি অবুঝ নন, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষিত নারী। তবে ওনার অবশ্যই জানা উচিত ছিল আজ নাহয় কাল সন্তানের ভরণপোষণের ব্যাপারটা উঠবেই। তিনিও বা কেন চুপচাপ ছিলেন? ওনাকে তো বলা হয়নি সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে।”
ফারহানা দৃঢ় চোখে উভয় পক্ষের উকিলের দিকে তাকালেন।
“উত্তেজিত হবেন না। শান্তিপূর্ণভাবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করুন।”
শিশির এবং অর্চি উভয়ে অন্যদিকে ঘুরে তাকালেন। অর্চির দিকে ফিরে ফারহানা বললেন,
“আপনার বক্তব্য শেষ করুন।”
অর্চি মাথা দুলিয়ে জুনিয়র অ্যাডভোকেটের কাছ থেকে একটা কাগজ নিয়ে পেশকারকে দিলেন। পেশকার ফারহানার টেবিলে কাগজটা জমা দিতেই তিনি চশমা ঠিক করে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। অর্চি সামান্য একটু হাসলেন। এক নজর শিশিরের দিকে চেয়ে পরক্ষণে দৃপ্ত গলায় বললেন,
“মহামান্য, আপনার সামনে যেটা পেশ করা হয়েছে সেটা এই মামলার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিতে যথেষ্ট। এমনকি আদালতকেও থ বানিয়ে দিতে পারে।”
ক্ষণিকের জন্য গুঞ্জন উঠল চারপাশে। ইরামের বুকটা কেমন যেন মোচড় দিল। ভ্রু কুঁচকে ফারহানা কাগজটা দেখছেন। তাতে কেমন ভয় হচ্ছে ইরামের। শেষমেষ তার ভয়টাই সত্য হলো। অর্চি ব্যক্ত করলেন,
“আপনি যেটা দেখছেন, সেটা এই কেইসের মূল আকর্ষণ, নয় মাস বয়সী শিশু ইযানের সরকারি জন্মনিবন্ধন। একটু ভালো করে দেখুন ইওর অনার, পিতার নামের জায়গায় কি শোভা পাচ্ছে? আমার মক্কেলের নাম? উঁহু, বরং তার সাবেক স্ত্রীর বর্তমান স্বামীর নাম যে আদতে শিশুটির জৈবিক পিতাই নন!”
গুঞ্জন হুট করেই থেমে গেল। পিনপতন নীরবতা নেমে এলো চারপাশে। বেঞ্চে বসে থাকা নীরব আর তার সঙ্গী দ্বিতীয় জুনিয়র অ্যাডভোকেট দুজন নিজেদের কপাল ঘষল। অবশেষে সবচেয়ে বড় চালটা চেলেছে বাদী পক্ষ। এটার আশঙ্কাই ছিল এতদিন। সিনিয়র অ্যাডভোকেট শিশির চৌধুরী অবশ্য তুলনামূলক বেশ শান্ত। মামলার লাগাম তার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে চেহারা দেখলে বোঝা দুষ্কর। ফারহানা কাগজটা কয়েক দফায় দেখলেন। অর্চি আগুনে ঘি ঢেলে জানালেন,
“ইওর অনার, আপনার হাতের কাগজটা সরকারিভাবে ভেরিফাইড। এখন সরকারি নথিপত্রে কোন উদ্দেশ্যে, কীভাবে জৈবিক পিতার বদলে অন্য কারো নাম বসানো যায় সেই প্রশ্ন রাখছি আদালতের কাছে।”
ফারহানা সকলকে এড়িয়ে সরাসরি সাইবান আর ইরামের দিকে তাকালেন। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন,
“এই নথিপত্র নিয়ে আপনাদের বক্তব্য কি? আদালত কি এর সত্যতা যাচাই করবে?”
“এটা সত্য।”
ইরাম কিছু বলতে পারলনা, এর আগেই জবাব দিল সাইবান। তার চেহারায় কোনো অনুভূতি নেই, শুধু শূন্যতা। ফারহানা জিজ্ঞেস করলেন,
“এই নথিতে শিশুটির পিতার নাম হিসেবে আপনার নাম রয়েছে। আপনি কি এটা অস্বীকার করছেন?”
“না।”
“আপনার নাম ইচ্ছাকৃতভাবে এই নথিতে দেওয়া হয়েছিল?”
“জি। আর এই কাজ আমি করেছি। আমার স্ত্রীর সঙ্গে এর সম্পৃক্ততা নেই।”
এক সেকেন্ড নীরব থেকে ফারহানা আবার বললেন,
“আপনি জানতেন যে আপনি শিশুটির জৈবিক পিতা নন?”
“জানতাম।”
“যা করেছেন তা রাষ্ট্রের সঙ্গে ধোঁকা। এটা জানেন?”
এবার নিশ্চুপ সাইবান। এজলাসের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। সকলেই বুঝি নিজেদের নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। অরণ্য নিজের বেঞ্চে বসে বুকে দুবাহু বেঁধে এমন বিনোদন নিয়ে সব দেখছে যেন সিনেমা হলে এসেছে। ক্ষণে ক্ষণে তার চোখ ইরাম আর ইযানের উপর স্থাপিত হচ্ছে। ইরাম নিজের জায়গায় মূর্তিমান। সামান্য নড়লেই বুঝি কোনো কেলেংকারী ঘটে যাবে। চেহারা ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে তার। ফারহানা অর্চির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“দ্যা লার্নড কাউন্সিল মে প্রোসিড।”
“ইওর অনার, আমি বিবাদী পক্ষের বর্তমান স্বামী মিস্টার সাইবান আলাদিনকে উইটনেস বক্সে আনার অনুমতি চাইছি।”
“অনুমতি দেয়া হলো।”
সাইবান বেঞ্চ থেকে বেরিয়ে এলো। তার দৃষ্টি বিনিময় ঘটল শিশিরের সঙ্গে। ওই অভিজ্ঞ চোখজোড়ায় সে প্রশান্তি দেখতে পেল। যেন তাকেও শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। পরক্ষণে একনজর নীরব আর অনুরাগের দিকে তাকিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াল সাইবান। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার সে এখানে দাঁড়িয়েছে। অর্চি ধূর্ত দৃষ্টিতে তার সামনে এসে দাঁড়াল। মহিলার ঠোঁটে এক কুটিল হাসির দেখা মিলল।
“মিস্টার সাইবান আলাদিন। আপনার বিয়ের কত মাস চলছে? আদালতকে জানাবেন যদি খুব বেশি ব্যক্তিগত না হয়ে থাকে।”
সাইবানের হাত পিছনে মুষ্টিবদ্ধ হলো। একটি ঢোক গিলে উত্তর করল,
“ছয় মাসের বেশি।”
“ওহ। নতুন বিয়েই বলা চলে। এর অর্থ আপনার স্ত্রীর ছেলে ইযান জন্মের সময় আপনি নিশ্চয়ই উপস্থিত ছিলেন না? নাকি ছিলেন?”
দাঁতে দাঁত ঘষল সাইবান।
“ছিলাম না।”
অর্চির হাসিটা এবার বিস্তৃত হলো।
“আচ্ছা। তবে ধরে নিলাম আপনি জানতেন না আপনার সঙ্গে বিবাদীর বিয়ে হবে। না তো আপনি শিশুর জন্মের সময় তার স্বামী ছিলেন। তারপরও কোন হিসাবে জন্ম নিবন্ধনে নিজের নাম শিশুটির পিতার জায়গায় দিয়েছেন? আপনি কি জানতেন না ইযানের জৈবিক পিতা কে? নাকি আপনার স্ত্রী আপনাকে কিছুই জানায়নি? জানানো উচিত ছিল না তার? এভাবে তথ্য গোপন করাটা তো কুটিল মানসিকতার লক্ষণ।”
“দেখুন। যা করেছি আমি করেছি। কথা বললে আমার সাথেই বলুন। দোষ দেয়ার হলে আমাকেই দিন। আমার ওয়াইফকে এর মাঝখানে টানবেন না।”
কর্কশ আর গুরুগম্ভীর গলায় বলল সাইবান। তার চোখজোড়া শক্ত হয়ে উঠেছে। অপর বেঞ্চ থেকে ইশারায় তাকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে নীরব, কিন্তু সাইবান সবকিছুকে উপেক্ষা করছে।
“অবজেকশন, মাই লর্ড। প্রশ্নগুলো আমার মক্কেলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ।”
শিশির চৌধুরী বলে উঠলেন। তাতে ফারহানা বললেন,
“সাসটেইন্ড। আপনি মূল প্রসঙ্গে ফোকাস করুন।”
অর্চিকে সাবধান করলেন ফারহানা। অর্চি মাথা দুলিয়ে পুনরায় সাইবানের দিকে তাকালেন,
“আমার প্রশ্নটা আরেকবার সাজিয়ে করছি। আপনি জেনেবুঝে ইযানের জৈবিক পিতার পরিচয় এড়াতে নিজের নাম ব্যবহার করেছেন। হ্যাঁ নাকি না?”
“আমি সেভাবে করিনি। ইযান আমাদের কাছে ছিল। আর অরণ্য মির্জার কোনো খোঁজ পর্যন্ত ছিলনা। ওই মুহূর্তে আমি আবেগের বশে কাজটা করেছি কারণ আমি চাইনি আমার সন্তান সমাজের আর পাঁচটা মানুষের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ হোক।”
“এই তুচ্ছ কারণে আপনি সরকারি নথিতে ভুল তথ্য দেবেন? দুঃখিত, তবে যেহেতু এই দেশের মানুষ ধর্মের প্রতিও বিশ্বাসী, তাই আপনাদের ধর্ম অনুযায়ী বলছি, জৈবিক পিতার নামের স্থানে সৎ পিতার পরিচয় ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।”
“আমি ওইভাবে ভাবিনি।”
“তবে কীভাবে ভেবেছেন?”
অর্চির গলা কঠোর হলো। তাতে সাইবান না চাইতেও কোণঠাসা হয়ে পড়ল। দুহাতে আঁকড়ে ধরল কাঠের কাঠামোটি। ইরাম রুদ্ধশ্বাস চেয়ে রইল। ওই মুহূর্তে তার ইচ্ছা হলো, কোনোভাবে কিছু বলতে। তবে পারলনা। তার পাশে বসা অনুরাগ তীক্ষ্ণ চোখে তাকে সাবধান করল। ইরাম যদি অনুমতি ছাড়া হস্তক্ষেপ করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
“ইওর অনার। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে ওনার উদ্দেশ্য সৎ ছিল কিন্তু কায়দাটা আপত্তিজনক। তাই…”
“অবজেকশন, ইওর অনার। আমি উইটনেসের সঙ্গে কথা বলছি।”
শিশির বলতে নিলেও অর্চি তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানাল। ফারহানা বললেন,
“অবজেকশন সাসটেইন্ড। কন্টিনিউ।”
অর্চিকে অনুমতি দিলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় সাইবানের প্রতি মনোযোগী হলেন অর্চি।
“আদালতে চুপ করে থাকা মানে নিজের অন্যায় স্বীকার করে নেয়া। আপনি তবে স্বীকার করে নিচ্ছেন আপনার অন্যায়?”
সাইবান এবার নিজেকে আর রুখতে পারলনা। তার চোখজোড়া জ্বলে উঠল। কাঠের ফ্রেমে গেঁথে গেল আঙুলের নখ। রীতিমত গর্জে উঠল সে,
“হ্যাঁ! করেছি! যদি কোনো নাজুক সত্তাকে ভালো রাখা, তার পরিচয় নিশ্চিত করা, দায়িত্বজ্ঞানহীন বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অন্যায় হয়ে থাকে তবে আমি অন্যায় করেছি।”
“একদম গলা চড়িয়ে কথা বলবেন না। এটা আদালত, আপনার বাড়ি না। কিসের মহান দরদী আপনি? কোন অধিকারে আপনি বাচ্চার পরিচয় বদলান? দেশের আইনপ্রণেতা আপনি? ওইভাবে ভাবেননি তো কীভাবে ভেবেছেন?”
অর্চি ঝুঁকে এলেন, চোখে চোখ রেখে প্রত্যয়ী কন্ঠে বললেন,
“আমি বলি আপনি কীভাবে ভেবেছেন। একজন সন্তানের দুনিয়া থেকে তার জৈবিক পিতার অস্তিত্ব মুছে ফেলতে চেয়েছেন। জন্ম না দেয়া সত্ত্বেও নিজেকে সেই আসনে অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে আসন শিশুটির বাবার। এটাই আপনার প্রশ্নবিদ্ধ অধিকারবোধের পরিচয় দেয়। আপনি একজন পিতাকে তার নিজের সন্তানের সামনেই খারাপ, কর্তব্যহীন, নীচ প্রমাণ করতে চেয়েছেন। সমাজকে দেখাতে চেয়েছেন, যে তার সত্যিকার বাবা কতটা খারাপ মানুষ হলে সন্তানের খবর পর্যন্ত নেয়না। এটাই আপনার উদ্দেশ্য ছিল!”
“না! এসব আমার কথা না আপনার কথা!”
“তাহলে আপনার কথা বলুন। অস্বীকার করতে পারেন আপনি ইযানের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাননি? অস্বীকার করতে পারেন তার জৈবিক পিতার উপর আপনার ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই?”
“না কিন্তু…”
সাইবানের সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করেছে। বুকের ভেতর বন্দী রাখা ভয়াল দানবটা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। না না না, সম্ভব না। আদালতের মাঝখানে কিছুতেই না। শক্তভাবে চোখ বুঁজে ফেলল সাইবান। তার আঙুলগুলো র*ক্ত হারিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলছে সে, হাঁপাচ্ছে ভীষণ। শিরা উপশিরা এমনভাবে ফুলে উঠেছে যেন ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে তার। অবস্থা বেগতিক দেখে শিশির হস্তক্ষেপ করতে চাইলেন,
“অবজেকশন মাই লর্ড!”
কিন্তু উত্তেজনাকর মুহূর্তে বিন্দুমাত্র ছাড় দিলেন না অর্চি। প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগলেন বারংবার। সাইবানকে বলে গেলেন,
“কোনো কিন্তু না! একটা শিশুর জীবন ছেলেখেলা মনে হয় আপনার? খেয়াল খুশিমত যা নয় তাই করবেন?”
“চুপ করুন…প্লীজ! আমি এমন কিচ্ছু ভাবিনি!”
এক হাত কানে চাপল সাইবান। অর্চি বলে গেল,
“এমনটাই ভেবেছেন। ইগো স্যাটিসফাই করতে চেয়েছেন। অধিকার না থাকা সত্ত্বেও অধিকার ফলাতে চেয়েছেন। বাবা শব্দটা সবার জন্য নয়…”
“বা…..!!”
আমার আলাদিন পর্ব ৬৩
এজলাসের ভারী উত্তেজনা এক লহমায় ছিন্ন করে ফেলল তীক্ষ্ণ এক আওয়াজ। জমে গেল সকলে। সাইবান হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁপতে কাঁপতে মাথা কাত করে তাকাল। ইরামের কোলে ছটফট করছে ইযান। নিষ্পাপ শিশুটির দুই চোখ উপচে বইছে অশ্রু। হাতের ডায়নোসর প্লাশিটা সে ছুঁড়ে ফেলে দিল। দুই হাত সামনে বাড়িয়ে সাইবানের কাছে যেতে ক্রন্দনরত চিৎকার ছুঁড়ল,
“বা!”
থমকে রইল গোটা জগৎ। সাইবান নিজের দৃষ্টি ফেরাতে পারলনা। ফেরাতে পারছেনা কেউই।
