আমার আলাদিন পর্ব ৬৬
জাবিন ফোরকান
১১ ই সেপ্টেম্বর, সাল ২০০১।
রাত আটটা প্রায়। হাসপাতালের নামাজকক্ষে সিজদায় লুটিয়েছেন সামিয়া। নামাজ শেষ করে দুহাত তুলে মোনাজাতে সমস্ত বিশ্বজাহানের জন্য লম্বা সময় নিয়ে দোয়া করলেন তিনি। মনটা আজ বড্ড অস্থির। নামাজকক্ষ থেকে বেরোতেই হাসপাতালের সেই চাপা অস্থিরতাটা আবারও মনে জেঁকে বসল। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা সমস্ত বিশ্বকে তাজ্জব বানিয়ে দিয়েছে। হাসপাতালটা ছোট, একটাই টিভিরুম আছে। সেখানে এখন ভর্তি থাকা রোগী, নার্স আর গুটিকতক ডাক্তারদের ভিড়। টেবিলের উপর বড়সড় একটা সাদাকালো টেলিভিশন চলছে। বিটিভিতে খবর দেখানো হচ্ছে। ঘণ্টাখানেক আগে সন্ধ্যার দিকে এর বীভৎস মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে সমস্ত পৃথিবী। যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে দুইটি বিমান আছ*ড়ে পড়েছে, যা মূলত পরিকল্পিত হা*মলা বলে ধারণা করা হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষের আহত নিহ*ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টিভিতে দেখা যাচ্ছে, দুটো সুউচ্চ বিধ্বস্তপ্রায় ইমারত দাউদাউ করে জ্বলছে ভয়ংকর আ*গুনে। আন্তর্জাতিক সম্প্রচারে খবরপাঠকের বিবরণ শোনা যাচ্ছে। ইংরেজি ভাষায় অনর্গল দেয়া হচ্ছে সতর্কবার্তা। আজ শুধু যুক্তরাষ্ট্র থমকায়নি, বরং থমকে গিয়েছে পৃথিবীটাই। তাই সুদূর বাংলাদেশেও সেই নিস্তব্ধতার ছোঁয়া লেগেছে। সমস্ত দিনটাই কেমন বিষণ্ন। হাসপাতালের টেলিফোন ব্যস্ত, ক্ষণে ক্ষণে কারো না কারো পরিবারের তরফ থেকে কল আসছে। সামিয়ার নিজের নোকিয়া মোবাইলটায় এই পর্যন্ত পাঁচবার ফোন দিয়ে ফেলেছেন আহমদ। বলেছেন, হাসপাতালে বেশি জরুরি কাজ না থাকলে যেন বাড়িতে চলে যায়। তিনি নিজে এসে নিয়ে যাবেন।
পাঁচ মিনিট দেখার পর আর নিউজ দেখতে ইচ্ছা হলোনা সামিয়ার। ভীষণ খারাপ লাগছে তার। পৃথিবীর মানুষগুলো এমন কেন? কেন নিজেদের মাঝেই যু*দ্ধ বিগ্রহ করে? ফলস্বরূপ নিষ্পাপদের জীবন যায়। শান্তির দিন বোধ হয় ফুরিয়েছে পৃথিবীতে। এর জের ধরে ভবিষ্যতে যে বিরাট কোনো ক্রাইসিসের মুখোমুখি পড়বে বিশ্ব সেটা সামিয়া ঠিকই বুঝতে পারছেন। ভাবতেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে। নাহ, আহমদ ঠিকই বলেছেন। একা একা এখানে খারাপ লাগছে। তাছাড়া কাজও নেই। বাড়িতে ছোট্ট সারিকা আর আহমদ একা আছেন। মেয়েটা নাকি মায়ের জন্য তটস্থ হয়ে আছে। চলে যাওয়াটাই মঙ্গল। রাত বাড়লে রাস্তাঘাটের অবস্থা কেমন হয়ে দাঁড়ায় সেটাও চিন্তার বিষয়। ভাবতে ভাবতে তিনি অ্যাপ্রোনের পকেট থেকে নিজের ফোন বের করে নিলেন আহমদকে কল করার উদ্দেশ্যে। ঠিক এমন সময়েই হাসপাতালের করিডোর থেকে খানিক চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ ভেসে এলো। ইমারজেন্সি রুমের দিকে একটা স্ট্রেচার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, দুজন ওয়ার্ড বয় এবং একজন নার্স ছুটে যাচ্ছে পিছু পিছু। এটা প্রাইভেট হাসপাতাল, হাতে গোণা কিছু ডাক্তার থাকেন, আজ অনেকেই বাড়িতে গিয়েছেন। সামিয়া সহ আর দুজন আছেন শুধু। তাই তিনিই দৌঁড়ে গেলেন। ইমারজেন্সিতে ঢুকতেই আরেক ভয়াবহ দৃশ্য দেখে সামিয়ার আত্মা শুকিয়ে গেল। স্ট্রেচারে শুয়ে আছে র*ক্তা*ক্ত এক নারী। চেহারাটা এমন বাজেভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছে যে পরনের এলোমেলো শাড়ি না দেখলে বোঝাই যেতনা ইনি নারী। তার পেটটা ভীষণ ফোলা, কাঁপছে প্রচন্ড। বুঝতে বাকি রইলনা, এই নারী সন্তানসম্ভবা।
এগিয়ে গেলেন সামিয়া। ওয়ার্ড বয় আর নার্স তাড়াহুড়ো করছে। সামিয়া নার্সকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি ব্যাপার? ওনার কি হয়েছে?”
“সামনের রোডে মাত্র অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে ম্যাম। গাড়ি এসে মে*রে দিয়েছে। রাস্তার কয়েকজন লোক ধরাধরি করে এসে দিয়ে গেল।”
সামিয়ার বুকটা মুচড়ে গেল পুরোপুরি। কি জঘন্য পরিণতি! ততক্ষণে ইমার্জেন্সির দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেকজন ডাক্তার এসে পড়েছেন। দ্রুত কন্ঠে আদেশ দিয়ে রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করে দিলেন। সামিয়া পিনার্ড স্টেথোস্কোপ নিয়ে এসে আহত নারীর ফোলা পেটে চাপলেন। হন্যে হয়ে খুঁজলেন বাচ্চার হার্টবিট। খুবই ক্ষীণভাবে শোনা গেল তা। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করলেন না তিনি। অপর ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে মাথা দুলিয়ে বাকিদের আদেশ ছুঁড়লেন,
“ইমারজেন্সি সি সেকশন করতে হবে। কল দ্যা অ্যানাস্থেটিস্ট! ওটি রেডি করুন, দ্রুত। আমি রোজিনা ম্যামকে কল করছি।”
ডাক্তার রোজিনা গাইনি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট। সামিয়ার ক্যারিয়ারের বছর কয়েক হয়েছে মাত্র। তিনি জুনিয়র লেভেলে আছেন। তাই সিনিয়রের সঙ্গে কথা বলা জরুরী। ডাক্তার রোজিনা কিছুক্ষণ আগেই ক্যান্টিনের দিকে গিয়েছেন। সামিয়ার অবশ্য যাওয়ার দরকার পড়লনা। এর আগেই রোজিনা এসে পড়লেন। অপরদিকে ওয়ার্ডবয় গিয়েছে ব্লাড ব্যাংকে। স্ট্রেচার টেনে ওটির দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় ইতস্তত করা হলো। হাসপাতালের রিসিপশন থেকে দুজন স্টাফ এলো, বলল,
“ম্যাম, ওনার সঙ্গে কোনো রিলেটিভ নেই। ক্যাশে টাকা জমা দিয়ে স্লিপ না দেখালে ওটির ওষুধ আর ব্লাড ইস্যু করতে পারছিনা। সরি।”
সামিয়ার মাথাটা ফট করে জ্বলে গেল। আগ্রাসী হয়ে গেলেন তিনি। রোজিনা কিছু বলার আগেই তিনি বলে বসলেন,
“কিঃ? একটা মানুষ এখানে ম*রে যাচ্ছে আর হাসপাতালের টাকা লাগবে?”
স্টাফ প্রচন্ড শান্ত। ক্যারিয়ারের শুরুতে ডাক্তাররা এমন আবেগী থাকতে পারে, দিনে দিনে সেই আবেগ কমে যায়। বাস্তবিক হয়ে উঠেন। এই যেমন সিনিয়র রোজিনা কিছু বলছেন না। কিন্তু সামিয়া ক্ষেপেছেন। স্টাফ ঠান্ডা গলায় জানাল,
“সরি ম্যাম। পেমেন্ট না করলে আমরা প্রোসেস করতে পারবনা এটাই নিয়ম। আননোন কেস, কালকে ম*রে গেলে বা লোক কে*টে পালালে এই অপারেশনের খরচ, ব্লাডের বিল, অ্যানাস্থেটিস্টের ফি কে দেবে? আমাদের চাকরি থাকবে?”
সামিয়ার নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা হলো। এদিকে স্ট্রেচারের নারীর অবস্থা কাহিল। দ্রুত প্রেশার নামছে, হার্টবিট হারাচ্ছে। র*ক্ত এখন স্ট্রেচার গড়িয়ে মেঝেতে পড়তে শুরু করেছে। রোজিনা হয়ত শেষমেষ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু বলার দরকার পড়লনা। স্ট্রেচার থেকে একটা র*ক্তা*ক্ত হাত বাড়িয়ে দিল নারী, সামিয়া পাশে থাকায় তার হাতটাই ধরতে পারল। চমকে উঠলেন সামিয়া। ঝট করে তাকালেন। নারীর ফাটা ঠোঁটজোড়া একটুখানি ফাঁক হলো, কিছু একটা ফিসফিস করতে করতে প্রচন্ড কাঁপতে থাকা র*ক্তা*ক্ত হাতটার দিকে দেখাচ্ছেন। প্রথমে বোঝা না গেলেও ভালোমত তাকানোর পর দেখা গেল, তার অনামিকায় একটা সোনার আংটি। সেই আংটির দিকেই ইঙ্গিত করছে সে। বোধ হয় হাসপাতালের বিল হিসাবে দেয়ার জন্য। সামিয়া ঝুঁকে গেলেন শোনার জন্য, তার কানে ভেসে এলো টানা টানা একটা কন্ঠস্বর,
“আ…মার…বাচ্চা…টাকে…বাঁচান।”
একজন মাই বোধ হয় পারে নিজে মৃ*ত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বাচ্চার জীবন বাঁচানোর আর্জি জানাতে। সামিয়ার বুকটা হুহু করে উঠল, কারণ তিনি নিজেও একজন মা। কঠিন কেইস তিনি পেয়েছেন, সত্য। সিনিয়রদের আন্ডারে জটিল অপারেশনে কাজ করেছেন। কিন্ত আজকের মতন এত হৃদয়বিদারক কিছু তার এ যাবৎ ক্যারিয়ারে মোকাবেলা করা হয়নি। সামিয়ার চোখে বিনা কারণে হালকা অশ্রুর রেখা জমলো। তার অবস্থা খেয়াল করে ডাক্তার রোজিনা এবার মুখ খুললেন,
“ফাইন। এই পেশেন্টের রেসপন্সিবিলিটি আমার আর সামিয়ার।”
সিনিয়র ডাক্তার বলায় এবার সাহস পেলেন সামিয়া। নারীর হাতটা শক্তভাবে ধরে দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকালেন স্টাফের দিকে।
“হ্যাঁ। ওটি রেডি হোক, অপারেশন শেষ হোক। এই পেশেন্টের সব খরচ আমি দেব। আর কোনো সমস্যা না থাকলে ইনজেকশন দিয়ে দেয়ার আগে চোখের সামনে থেকে দূর হোন, অমানুষ কোথাকার!”
অতঃপর আর তর্ক বিতর্কের সুযোগ রইলনা। স্ট্রেচার ঠেলে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। সমস্ত মেঝেতে টপটপ করে র*ক্ত গড়িয়ে ছাপ পড়ে গেল বিভীষিকার। মিনিট কয়েকের মধ্যে সবকিছু তৈরি হয়ে গেল। অ্যানাস্থেটিস্ট এসে এপিডুরাল অ্যানেস্থেশিয়া দিলেন যেন কোমর থেকে শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়। এমনিতেই দুর্ঘটনার কারণে এই নারীর অবস্থা আশঙ্কাজনক, উপরন্তু বাচ্চার শরীরে চলে যাওয়ার মতন ঝুঁকি নেয়া সম্ভব না। ঐভাবেই কাজ শুরু হলো। ডাক্তার রোজিনা নেতৃত্ব দিচ্ছেন অপারেশনের। পাশে সামিয়া তার অভিজ্ঞ ডান হাতের মতন কাজ করে যাচ্ছেন। জীবনে যখন প্রথম ডেলিভারি রুমে ছিলেন, তখন যেমন হাত কেঁপেছিল, আজও তেমনটাই হাত কাঁপছে সামিয়ার। এই অতি আবেগের অর্থটা তিনি ধরতে পারলেন না। মাথা নেড়ে মনে মনে সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে কাজে মনোযোগ দিলেন। নার্সরা ব্যস্ত ছোটাছুটি করছে ডাক্তারদের সরঞ্জাম এগিয়ে দিতে। এই অজ্ঞাত নারী অর্ধচেতন অবস্থায় আছেন। তার হার্টবিট স্বাভাবিক করতে চেষ্টার কমতি নেই কারো। ক্ষণে ক্ষণে চোখ মেলে তাকাচ্ছেন, খুঁজে বেড়াচ্ছেন যেন কিছু একটা।
দীর্ঘক্ষণ প্রচেষ্টার পর অবশেষে ছোট্ট নবজাতককে বের করতে পারলেন ডাক্তার রোজিনা। কিন্তু ছোট্ট ওই শরীরের মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কাদায় ভেজা এক পুতুল যেন, অবশ, পাথর। বুকটা কেঁপে উঠল সকলের। অপারেশন থিয়েটারে এক শীতল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
“বা…চ্চা…বা…চ্চা…”
প্রলাপ বকার মতন ফিসফিস করে যাচ্ছে নারীটি। ক্ষত বিক্ষত হাত উঠিয়ে ধরার চেষ্টা করছেন। আধখোলা চোখে র*ক্ত আর অশ্রুর মিশ্রণ। বারবার তার মুখ মোছার চেষ্টায় আছে নার্স। বুক চেপে এলো বুঝি সকলের। উপস্থিত এক শিশু বিশেষজ্ঞ দ্রুত এগোলেন। প্রতিক্রিয়াহীন বাচ্চাটাকে নিয়ে রাখলেন কাছের টেবিলের উপর। সামিয়া ছুটলেন সাহায্যের জন্য। বাচ্চাটার মুখে রাবার বাল্ব সাকশন দিয়ে মুখ নাক থেকে মিউকাস বের করা হলো। দ্রুত পরিষ্কার কাপড়ে মুছে পিঠ ঘষতে লাগলেন শিশু বিশেষজ্ঞ। অপরদিকে সামিয়া নাজুক পায়ের পাতা নিজের হাতে তুলে ঘষতে লাগলেন, হালকা চাপড় দিতে লাগলেন। তার বুকটা দুরুদুরু করছে। বেশ কয়েক অপারেশনে বাচ্চা কাঁদেনি এমন অবস্থা তিনি মোকাবেলা করেছেন। অথচ আজ এই মারাত্মক ভয় আর বুকের ভেতর নিগূঢ় টানের অর্থটা বুঝতে পারছেন না। তিনি শুধু এটুকু জানেন, এই বাচ্চাটাকে তার বাঁচাতেই হবে, বাচ্চাটাকে বাঁচতেই হবে যেভাবেই হোক!
যখন বাচ্চাটাকে নিয়ে একদিকে ব্যস্ততা, তখন অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা নারী সত্তার চেতনা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। সিনিয়র ডাক্তার বহু চেষ্টা করছেন, অথচ বিপি নামছে। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে তার। অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন কোনোকিছুই আর কাজে দিচ্ছেনা। ডাক্তার রোজিনা অ্যানাস্থেটিস্টের দিকে তাকালেন। তিনি মাথা ডানে বামে নাড়িয়ে না সূচক ইশারা করলেন। ডাক্তারদের আর কিছু করার নেই। লড়াইটা তারা হেরে গিয়েছে।
অপরদিকে পেডিয়াট্রিক কর্নারে চলছে আরেকটা জীবনকে বাঁচানোর যুদ্ধ। বাচ্চার মুখে অ্যাম্বু মাস্ক পরিয়ে ফুসফুসে অক্সিজেন পুশ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সামিয়া দুই আঙুল বাচ্চাটার বুকে চেপে চেপে সি পি আর দিচ্ছেন। অপর হাতে পিঠ আর তালু ঘষছেন।
“ক্রাই…জাস্ট ক্রাই…প্লীজ বেবি…ক্রাই মাই বেবি!”
সামিয়া আর্দ্র কন্ঠে বলতে লাগলেন প্রার্থনার মতন করে। বাচ্চাটা নিথর হয়ে রইল। অতঃপর তার কণ্ঠের বিপরীতে হঠাৎ করেই ছোট্ট নাজুক শরীরটা ঝটকা দিয়ে উঠল। কাশির মতন আওয়াজ হলো, বাচ্চাটার মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে পড়ল মিউকাস। তারপরই তীক্ষ্ণ ক্রন্দনধ্বনিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেল গোটা অপারেশন থিয়েটার। এতক্ষণ যাবৎ ডাক্তার নার্স সকলে বুকের ভেতর যে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিলেন, সেটা এবার বেরিয়ে এলো। সামিয়ার মাথাটা ঝুলে পড়ল। তার হাতের মাঝেই ছোট্ট ছোট্ট হাত পা ছুঁড়ে লাল টুকটুকে বাচ্চাটা তারস্বরে চেঁচিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। দৃশ্যটা তার চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে ফেলল। ঠোঁটে অতি ক্ষীণ এক পরিতৃপ্তির হাসি ফুটল তার। অজান্তেই একটি আঙুল ছটফট করতে থাকা নবজাতকের গাল ছুঁয়ে দিলেন তিনি, আপনমনে ফিসফিস করলেন,
“মাই স্ট্রং বয়!”
দুহাতে সাবধানে তুলে ধরলেন তিনি বাচ্চাটাকে। ঘুরে দাঁড়ালেন মায়ের বুকে দেয়ার জন্য। কিন্ত শরীরটা অস্বাভাবিক স্থির দেখে তিনি ডাক্তার রোজিনার দিকে তাকালেন। একটি নিঃশ্বাস ফেলে বিষাদমাখা নয়নে মাথা নাড়লেন রোজিনা। সামিয়ার শরীর হিম হয়ে এলো। পায়ে পায়ে পৌঁছালেন তিনি সদ্য মা হওয়া নারীর পাশে। ঝুঁকলেন, তার হাতে চেঁচিয়ে হাত পা ছুঁড়ে ক্রন্দনরত নবজাতককে দেখালেন,
“আপনার ছেলে হয়েছে।”
সামিয়ার গলা কাঁপল সামান্য। প্রায় অচেতন সেই নারী ভারী চোখের পাতা মেলে তাকাল। বীভৎস দেখাল তার বিকৃত মুখটা, অথচ একটুও টললেন না সামিয়া। ওই গাঢ় চোখ আবদ্ধ হলো নবজাতকের উপর। টপটপ করে উষ্ণ অশ্রু গড়াল চোখের কার্নিশ বেয়ে। ঠোঁট কাঁপল। সামিয়া বাচ্চাকে একটু এগিয়ে ধরতেই কোনোরকমে মাথাটা পাশ ফিরিয়ে সে ছেলের কপালে চুমু খেল। আপনমনে কিছু একটা বলল বোধ হয়, সামিয়া সেই অস্ফুট স্বর শুনতে পেলেন না। সেই নারী হাঁপালেন ভীষণ, চেতনা হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুতই। চোখের সামনে ধীরে ধীরে কালো পর্দা নেমে আসছে। সে জানে এই পর্দা আর কোনোদিন উঠবে না। অন্তিম মুহূর্তে একটি আঙুলে ছুঁয়ে দিলেন তিনি নবজাতকের ছোট্ট হাত, চোখের ইশারায় সামিয়াকে কাছে ডাকলেন। একটি ঢোক গিলে ঝুঁকলেন সামিয়া, এবার ওই নারীর ভাঙা ভাঙা শব্দগুলো শুনতে পেলেন,
“আম…আমার ছেলের…কেউ নেই…ও…ওরা আমার ছেলেকে…মে..রে ফেলবে…ফেলবে…ও..ওকে একটু… একটু দেখে…রাখ…বেন….”
বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠল সামিয়ার। দ্রুত শুধালেন,
“ওরা কারা? আপনার নাম কি?”
“দেখে…রাখ…বেন…ছেলে..আমার…রাখ…বেন…”
“প্লীজ, আপনি…!”
কিন্তু প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া আর সম্ভব হলোনা। নারীর হাতটা ঝুলে পড়ল। বিরাট এক শ্বাস টানল সে, অথচ সেই শ্বাসটা আর ছাড়া হলোনা। বুকেই রয়ে গেল, আজীবনের জন্য। মনিটরের একনাগাড়ে করে যাওয়া হার্টবিট হারানোর শব্দটাই শুধু ভেতরকার পিনপতন নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল। সামিয়া মূর্তিমান হয়ে রইলেন। তার বাহুতে ছোট্ট নবজাতক একনাগাড়ে কেঁদে যাচ্ছে। আশেপাশের ডাক্তার নার্সরা মাথা নুইয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। অথচ কোনোকিছুই বোধ হয় মাথায় আর ঢুকলনা তার। শুধু একটাই কথা কানে বাজতে লাগল, বারংবার,
—আমার ছেলের কেউ নেই। ওকে দেখে রাখবেন।
উপস্থিত শিশু বিশেষজ্ঞ এগিয়ে এলেন। হতবিহ্বল সামিয়ার হাত থেকে নবজাতককে নিতে গেলেন। অথচ অদ্ভুতভাবে দেখা গেল নবজাতক বাচ্চাটা নিজের হাতে মুঠো পাকিয়ে সামিয়ার গ্লাভস খামচে ধরে রেখেছে। সেই নাজুক মুঠো ছাড়ানোও যাচ্ছেনা এতটাই অস্বাভাবিক জোর। হালকা টান দিতেই বাচ্চার কান্নার জোর বাড়ল। সামিয়া মুখ নামিয়ে নিচে তাকালেন। শিশুটা যেন আঁকড়ে ধরে রেখেছে তাকে, ছাড়তে চাইছে না। শেষমেষ খানিকটা জোর কাটিয়েই ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে নেয়া হলো বাচ্চাটাকে। শিশু বিশেষজ্ঞ চলে গেলেন বাচ্চাটাকে নিয়ে, এন আই সি ইউর ওয়ার্মারে রাখার জন্য। বেশকিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করা জরুরী।
যেহেতু রোড অ্যাক্সিডেন্ট কেইস, তাই পুলিশকে খবর দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই নারী বাচ্চা জন্ম দিয়ে চলে গিয়েছেন না ফেরার দেশে। হাসপাতালের রিসিপশনে সেই নিয়েই আলোচনা পর্যালোচনা চলছে। পুলিশ সদস্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করছেন সবকিছু। তাদের সামাল দিচ্ছেন ডাক্তার রোজিনা। আপাতত হাসপাতালের ম*র্গে রাখা হয়েছে সেই অজ্ঞাতনামা নারীকে। তার হাতের আঙুল থেকে একটা সোনার আংটি বাদে আর কিছুই পাওয়া যায়নি যা পরিচয় নিশ্চিত করতে পারে। পুলিশ স্বজনের খোঁজ করবে, যদি হাসপাতালে কেউ যোগাযোগ করে তাহলে ভালো অন্যথায় বেওয়ারিশ গণ্য করা হবে। সামিয়া এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন এন আই সি ইউর সামনে। নবজাতককে ওয়ার্মারে রাখা হয়েছে। দায়িত্বরত ওয়ার্ড হেড আপাতত বাচ্চাটার খেয়াল রাখছেন। নিজের অজান্তেই ভেতরে প্রবেশ করলেন সামিয়া। দেখা যাচ্ছে বাচ্চাটা তখনো কেঁদে যাচ্ছে। অবস্থা শোচনীয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“দুধ পাওয়া যায়নি?”
ওয়ার্ড হেড মহিলাটি মাথা নাড়লেন। জানালেন,
“না। দুজন মা ভর্তি আছেন কিন্তু ওনারা কেউই শেয়ার করতে রাজী না। ফর্মুলা ভরসা। আনতে পাঠানো হয়েছে।”
সামিয়া শুকনো একটা ঢোক গিললেন। দুহাত মুঠো করে ফেললেন। দ্বিধা হলো ভীষণ। মনে হলো ভয়। কিন্ত তার মনে হঠাৎ ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটা। এই নবজাতক কি করুণভাবে তার গ্লাভস আঁকড়ে ধরে রেখেছিল! সেটা নিউবর্ন রিফ্লেক্স ছিল সামিয়া জানেন, তবুও দৃশ্যটা মাথা থেকে বের করতে পারছেন না। এমন সময়েই ফর্মুলা আনা হয়ে গেল। সেটা তৈরি করে নার্স এগোচ্ছিলই, ঠিক তখন সামিয়া বলে বসলেন,
“আমি…চেষ্টা করি?”
ওয়ার্ড হেড অবাক হয়ে সামিয়াকে দেখলেন। ভ্রু কপালে উঠে গেছে মহিলার।
“ইউ শিওর, ডক্টর?”
“জি।”
সামিয়া নার্সারিতে বসলেন। ওয়ার্ড হেডের নির্দেশে নার্স খুব সাবধানে বাচ্চাটাকে ওয়ার্মার থেকে বের করে নিয়ে এলো তার কাছে। কাঁপা কাঁপা হাতে বাচ্চাটাকে বুকে টেনে নিলেন সামিয়া। অত্যন্ত ধীরে একটু একটু করে পজিশন করলেন। প্রথমে বাচ্চাটা বুঝতে কষ্ট পেল, সামিয়া আগলে নিলেন। হাতের ফর্মুলার ছোট্ট ফিডিং কাপ থেকে একটু একটু করে ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে কান্না বন্ধ হয়ে গেল বাচ্চাটার। একমনে চুকচুক করে খেতে লাগল। সামিয়ার বুকে মুখ গুঁজে রইল। কেমন অনুভূতি হলো বোঝাতে পারবেন না সামিয়া। তবে এটুকু জানেন, মা হওয়ার অনুভূতির থেকে ভিন্ন কিছুই অনুভব করছেন না তিনি। অজান্তেই চোখে অশ্রু জমল তার। হতভাগা এই ছেলে! জন্মের সময়ই মা নামক আশ্রয়টা আজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে। অথচ তার কোলে নিষ্পাপ নাজুক হয়ে কি আবেশে ভেসে যাচ্ছে! সামিয়া আটকাতে পারলেন না অশ্রু। অজান্তেই ঝুঁকে এলেন। বাচ্চাটার ছোট্ট একটা হাত তার কাপড় আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। সেটা ছাড়িয়ে সেই হাতে চুমু দিয়ে সামিয়া ফিসফিস করলেন,
“আমার বাবাটা।”
ঠিক ওই মুহূর্তে নার্সারির বাইরে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে চোখে পড়ল সামিয়ার। দাঁড়িয়ে আছেন আহমদ। লোকটার চোখেমুখে বিস্ময়। পরনে সাদা শার্ট আর খাকি ফরমাল প্যান্ট, উপরে খাকি কোট। চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। একনাগাড়ে দেখে যাচ্ছেন তিনি ভেতরের দৃশ্য। স্ত্রীকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে যেতে এসেছিলেন তিনি। চিন্তা হচ্ছিল ভীষণ। তাই মেয়ে সারিকাকে মুন্সীবাড়িতে খালা খালুর কাছে রাখতে দিয়ে তিনি চলে এসেছেন। আগেও বেশ কয়েকবার এসেছেন বিধায় তাকে স্টাফরা চেনে, বাঁধা দেয়া হয়নি ঢুকতে। রিসিপশনের কাহিনী তিনি শুনেছেন। তখন থেকে স্ত্রীর জন্য উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে তার। সামিয়া স্বামীকে দেখেও একটুও উৎকণ্ঠিত হলেন না। বরং ধীরে সুস্থে বাচ্চাটাকে খাওয়ানো শেষ করলেন। দুধ দেয়ার পরপরই চোখ বুঁজে ফেলেছে। সামিয়া সাবধানে বাচ্চাটাকে ফিরিয়ে দিয়ে উঠলেন। বাচ্চাটাকে পুনরায় ওয়ার্মারে রাখা হলো। হেঁটে নার্সারির বাইরে এলেন সামিয়া। মুখোমুখি দাঁড়ালেন স্বামীর। আহমদ অবিশ্বাস নিয়ে চেয়ে আছেন। তিনি দুহাত বাড়িয়ে আহমদের হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিলেন। চোখে টলটল করে উঠল অশ্রু তার। আবেগে ভারী হয়ে আসা কন্ঠে জানালেন,
“কংগ্র্যাচুলেশনস ডিয়ার। আমাদের একটা ছেলে হয়েছে।”
আহমদ স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইলেন স্ত্রীর পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত অথচ পরিপূর্ণ মুখের দিকে। কয়েক সেকেন্ড তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া করতে পারলেন না। তারপর হুট করে স্ত্রীকে কাছে টেনে তার মুখটা ধরে কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। আহমদের শুকনো খটখটে চোখ দুটো অশ্রুর রেখায় জ্বলজ্বল করে উঠল। তিনি গভীর গলায় উচ্চারণ করলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ।”
বর্তমান।
বাড়ির হলজুড়ে পিনপতন নীরবতা। সকলে যেন কথা বলতেই ভুলে গিয়েছে। সামিয়া হতবিহ্বল দৃষ্টিতে সাইবানকে দেখে যাচ্ছেন। যুক্তি – তর্ক – গল্প সবকিছু আজ তালমিল হারিয়ে ফেলেছে। হাজার চেয়েও ছেলের প্রশ্নের বিপরীতে তিনি কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারছেন না। তার ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলো, অথচ শব্দ ফুরোল। সেই প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা ভাঙল আহমদের গুরুগম্ভীর কন্ঠস্বর,
“তুই এই বাড়ির ছেলে না, তোকে আমরা দত্তক নিয়েছিলাম।”
পিতার কথাটা কানে যেতেই দৃশ্যমানভাবে কেঁপে উঠল সাইবান। মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগেই যে ঠুনকো বিশ্বাসটাকে আঁকড়ে সে দাঁড়িয়েছিল, সেই বিশ্বাসটুকু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অরণ্য হয়ত মিথ্যা বলেছে, তাকে উত্তেজিত করতে চেয়েছে, এই পরিবারে ভাঙন ধরাতে চেয়েছে। অথচ আহমদ যখন নিশ্চিত করলেন, তখন তার আঁকড়ে ধরার আর কিছুই রইলনা। ভারসাম্য হারিয়ে ধপাস করে সে বসে পড়ল শেষ সিঁড়ির উপর। চোখেমুখে কালো ছায়া নেমে এলো, চোখে শূন্যতা আর হৃদয়ে নীরব হাহাকার। সামিয়া আর্তনাদ করে উঠলেন তৎক্ষণাৎ,
“আহমদ! কি বলছ তুমি এসব?”
আহমদ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ভ্রু কুঁচকে এলো তার,
“আর কতকাল সামিয়া? আর কতকাল ধরে সত্য ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারবে বলে মনে হয় তোমার?”
পিছনে থাকা ইরাম সুগন্ধার দিকে গেল। ইযানকে এগিয়ে দিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে আদেশ করল,
“কুচুপুকে নিয়ে ভেতরে যাও।”
সুগন্ধা দ্বিমত করলনা। এই পরিবারকে ব্যক্তিগত সময় দেয়া দরকার। তাই ইযানকে কোলে নিয়ে সে চুপচাপ অন্দরমহলে চলে গেল। অপরদিকে অনুরাগ পিছন থেকে নীরব আর আফনানের কাঁধে হাত রেখে ইশারা করল। বন্ধুর ছোট দলটা বাড়ির বাইরে চলে গেল, তারা আপাতত কিছুক্ষণ বাগানেই অপেক্ষা করবে। অভ্যন্তরে রয়ে গেল শুধু সাইবান, ইরাম, সামিয়া, আহমদ, সারিকা এবং মিসির যারা আদতে এই পরিবারের সদস্য।
“হোয়াট ননসেন্স!”
এবার আর সহ্য হলোনা সারিকার। থপথপ পা ফেলে সে পিতামাতার মাঝখানে দাঁড়াল। রীতিমত গর্জে উঠল,
“তোমরা পাগল হয়ে গিয়েছ, মম ড্যাড? সাই কোথা থেকে কি শুনে এসে তাল দিচ্ছে আর তোমরাও সেই তালে তালে নাচছ? আর ইউ গাইয স্টুপিড? সাই আমার ভাই, আমার আপন ভাই, মাই লিটল ব্রাদার!”
সামিয়া কিছু বলতে পারলেন না। ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। তার চোখেমুখে নীরব হাহাকার। চশমা খুলে চোখে শাড়ির ওড়না চাপলেন তিনি। সারিকা সাইবানের দিকে কয়েক পা এগোল,
“সাই, একদম কান দিস না তো এদের কারো কথায়! এরা সবাই পাগল হয়ে গিয়েছে। আর সবথেকে বড় পাগলটা হলো তুই। কিসের কি অ্যালবামে ছবি নেই, জন্মের সময়ের ছবি নেই দেখে তুই এটা ভেবে নিলি তুই দত্তক নেয়া? হ্যাঁ, মাঝে মাঝে আমি দুষ্টামি করে বলতাম অবশ্য তোকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছে কিন্ত তাই বলে…”
“এটা সত্য, মা।”
জমে গেল সারিকা। মা—শব্দটা তার ক্ষেত্রে খুব কম ব্যবহার করেন আহমদ। যখন করেন, তখন তিনি সিরিয়াস থাকেন। সারিকা রোবটের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে বাবার মুখোমুখি হলো। হাত কাঁপল তার,
“ড্যাড, তুমি মজা করছ, রাইট?”
ডানে বামে মাথা নাড়লেন আহমদ। মেয়ের চোখে চোখে তাকাচ্ছেন না তিনি, তাতেই বোঝা সম্ভব সবকিছু। তবুও বিশ্বাস হতে চাইলনা সারিকার। কীভাবে বিশ্বাস করবে সে? তার ভাই আসলে তার ভাই না? এটাও এখন তাকে মেনে নিতে হবে? সারিকার শরীর কেঁপে উঠল, সে আস্তে করে বলল,
“তা…তাহলে…সাই যা বলল সবটাই কি…সত্যি? ইরাম আপু…”
“তোর আপন বড় বোন।”
সারিকার শরীর থেকে বুঝি আত্মা বেরিয়ে গিয়েছে এমন অনুভূতি হলো। টলে উঠল সে। মিসির লম্বা কদমে কাছে পৌঁছে স্ত্রীকে বুকে আগলে নিল। প্রশ্ন করার অবস্থায় কেউই নেই আর। না সাইবান, না সারিকা। এবার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিল মিসির।
“কি বলছেন আপনারা, আব্বু, আম্মু? প্লীজ, দোহাই লাগে ছেলেমেয়েদের আর কষ্ট দেবেন না। সত্যি করে বলুন কেউ। সারিকা আর ইরাম আসলেই একে অপরের বোন? সাইবান যদি দত্তক নেয়া ছেলে হয় তবে ইরাম কি আপনাদের মেয়ে?”
একটা শক্ত ঢোক গিললেন আহমদ। উত্তর দিতে পারলেন না। এবারের উত্তরটা এলো সামিয়ার পক্ষ থেকে। চোখে আঙুল চেপে অশ্রু আটকে আর্দ্র কন্ঠে তিনি বললেন,
“ইরাম আমার আর আহমদের বড় মেয়ে, সারিকা আমাদের ছোট মেয়ে।”
এবার বোধ হয় বাক্য হারানোর পালা মিসিরের। আকাশটা তার মাথায়ও ভাঙল এবার। কি দিয়ে এই বাক্যের মোকাবেলা করা যায়? যেখানে সকল সম্পর্ক উলটপালট হয়ে গিয়েছে? গাঢ় নিস্তব্ধতা নেমে এলো চারপাশে। কারো মুখে রা নেই, কোনো টু শব্দ নেই। সেই নিস্তব্ধতা ভাঙল সামিয়ার অতি ক্ষীণ ফোঁপানোর শব্দে। চেহারায় দুহাত চেপে মাথা নিচু করে রেখেছেন তিনি, ধরা পড়া অপরাধীর মতন। সবাই ভাবল, এবার বুঝি সাইবান পাগলই হয়ে যাবে। ভাঙচুর শুরু করবেন, চিৎকার চেঁচামেচি করে পুরো এলাকা মাথায় তুলবে। অথচ তেমন কিছুই করলনা সাইবান। সেই যে ধপ করে সিঁড়িতে বসেছে, এখনো সেখানেই বসে আছে। তাকে দেখাচ্ছে পাথরে গড়া ভাস্কর্যের মতন।
সবাইকে হতবাক করে দিয়ে সেই ভাস্কর্যে হঠাৎ হাসি ফুটল। খুব অদ্ভুতভাবে হাসল সাইবান, পরিহাসের হাসি। চোখে একফোঁটা অনুভূতি নেই তার, নেই কোনো অশ্রু। অথচ ঠোঁটজুড়ে বিরাট প্রফুল্ল হাসি। প্রচন্ড অস্বাভাবিক। আর এটাই তার সবথেকে বিপদজনক রূপ।
“বাবা হতে গিয়ে আমার আর ছেলে হওয়া হলো না।”
খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল সাইবান। যেন এটা খুব বিনোদনের ব্যাপার। সিঁড়ির উপরেই চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল সে, তার অট্টহাসির শব্দে হলরুম কেঁপে উঠল বুঝি। সকলের বুকে তড়িৎ খেলে গেল, আতঙ্ক ঘিরে ধরল চারপাশ থেকে। পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে অত্যন্ত আয়েশ করে নাড়াতে নাড়াতে সাইবান বলে গেল,
“তাহলে এটাই ছিল এই বিয়ের কারণ, ব্রো?”
সামিয়া স্তব্ধ হলেন। তড়াক করে উঠে পড়লেন সোফা থেকে ছুটে গেলেন ছেলের দিকে, অশ্রু ফেলে হাহাকার করে বললেন,
“না না না! আমার ছেলে তুই! আমার ছেলে!”
“এজন্যই নিজের মেয়ের সাথে আমাকে বিয়ে দিয়েছ তুমি।”
তার কথায় একটুও কর্ণপাত করলনা সাইবান। শোয়া থেকে উঠে বসল। তার হাসিটা সরে গিয়েছে। চেহারায় নেমে এসেছে কালো ছায়া। চোখ দুটো ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে। শিরা উপশিরা জেগে উঠছে শরীরে। অশনি সংকেত।
“ডিভোর্সী, এক বাচ্চার মা, বয়সে বড় মেয়েকে কোন মা নিজের অবিবাহিত ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেয়? কোনোদিন দেয় না। শুনিনি আমি। অথচ তোমায় দেখেছি। তোমায় সেই কারণে ভক্তি করেছি। ভেবেছিলাম তুমি স্বার্থহীন। আর আজ জানলাম, ইট ওয়াজ স্বার্থ! জাস্ট স্বার্থ! তুমি নিজের মেয়েকে বাঁচাতে আমায় ফাঁসিয়ে দিলে? এত নিষ্ঠুর তুমি কীভাবে হলে? যদি নিষ্ঠুর হওয়ারই ছিল তবে আমায় নতুন জীবন দিলে কেন? কোনো একদিন খাবারে বিষ মিশিয়ে দিতে, আমি তোমার জন্য হাসতে হাসতে জীবন ত্যাগ করতাম!”
“না! বিশ্বাস কর! আমি তেমন ভাবিনি। আমি তো শুধু তোকে ভালো দেখতে চেয়েছিলাম। আমার মেয়েকে ভালো দেখতে চেয়েছিলাম। আমি…আমি…!”
সামিয়া বলতে পারলেন না। কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়লেন। অন্য সময় হলে এই দৃশ্যে সাইবান পুরো পৃথিবী উল্টে দিতে পারত, জ্বালিয়ে দিতে পারত তাদের যারা তার মায়ের কষ্টের কারণ। অথচ আজ, তীব্র শূন্যতা আর বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া কিছুই টের পেলনা সে। করুণ দৃষ্টিতে সে দেখল সামিয়াকে, সামান্য কাঁপল তার কণ্ঠ,
“খোদার পরে সবথেকে বেশি বিশ্বাস করেছি তোমাকে, আর তুমি আমার বিশ্বাসের দুয়ারে মোহর মেরে দিলে।”
“না বাবা, আমার আব্বু, আমার প্রাণটাই যে তোর! আমি কীভাবে তোকে স্বার্থপরতা দেখাই?”
সাইবান এবার তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার গলা গোটা বাড়িকেই বুঝি কাঁপিয়ে দিল,
“তাই? স্বার্থপর না? তবে এতদিন কেন বলোনি? এতদিন কেন সত্যটা আমায় জানাওনি? আরে! তুমি যদি আমাকে এই আদেশও করতে তুই আমার ছেলে না, তোকে ভালোবাসি না, আমার মেয়েকে বিয়ে করে সুখে রাখ, তবুও আমি হাসিমুখে বিয়ের পিঁড়িতে বসতাম! তোমার জন্য আমার জান কবুল! কিন্ত তুমি এভাবে আমায় নিয়ে খেললে কেন? আমার কাছ থেকে আমার সত্য লোকানোর অধিকার তোমায় কে দিয়েছে? কে?”
“আমি।”
সমস্ত বাড়ি আরেক দফায় নিস্তব্ধপুরীতে পরিণত হলো। সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেল। আপতিত হলো নিটল দন্ডায়মান স্নিগ্ধ রমণীর উপর। পায়ে পায়ে সামনে এগিয়ে এলো ইরাম। তার মুখটা শান্ত, একটু বেশিই শান্ত। বরাবর সাইবানের চোখে চোখ রাখল সে। জানাল,
আমার আলাদিন পর্ব ৬৫
“আলাদিন। তোমার সঙ্গে আমার বিয়ের আইডিয়াটা আম্মুর না, আমার ছিল। আমিই তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, যেন অরণ্যর হাত থেকে বাঁচতে পারি।”
সেদিন সাইবানের প্রথমবারের মতন মনে হলো, কান বলে কোনো অঙ্গ থেকে যদি সৃষ্টিকর্তা তাকে বঞ্চিত করত, তবে তা অপার রহমত হতো!
