আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৪০
সালমা খাতুন
দিন পেরিয়ে রাত নেমেছে। আর সেই রাতের নিকষ কালো অন্ধকার নেমে এসেছে শাহরিয়ার পরিবারে। শহরের সবচেয়ে আলো ঝলমলে এই হাসপাতাল ভবনের নির্দিষ্ট দুটি আইসিইউতে তখনও নিঃশব্দে লড়াই করে চলেছে জীবন আর মৃত্যুর সঙ্গে, দুটো ভালোবাসার মানুষ।
নীচের তলার আইসিইউ— সেখানে শুয়ে আছে মায়া তালুকদার, নিঃসাড়, স্তব্ধ।
আর তার ঠিক উপরেই, ওপরতলার আইসিইউতে নিথর হয়ে শুয়ে আছে আরমান শাহরিয়ার— যাকে বাঁচানোর সম্ভাবনা ডাক্তার রা মাত্র দশ শতাংশ বলেছে।
আর দশ শতাংশ… এর মানে তো প্রায় না থাকারই সমান।
শাহরিয়ার পরিবারের মানুষ গুলোর শ্বাস যেন এখন হাসপাতালের কাঁচের দেয়ালেই আটকে আছে। কারও চোখে এখন আর পানি নেই— কিভাবে থাকবে, কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শেষ। চোখ মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে সবার।
শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাস, নিস্তব্ধতা আর ব্যথা মেশানো দৃষ্টি ঘুরে ঘুরে আটকে আছে হাসপাতালের করিডোরে।
ডাক্তারদের চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ আর ক্লান্তির ছাপ। সিস্টেমে আরমানের রক্তচাপ কখনো হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে, আবার হঠাৎ কমে যাচ্ছে। ওর শরীরটা যেন আর কোনোভাবেই সাড়া দিচ্ছে না।
কিন্তু তবুও… ডাক্তাররা তাদের চেষ্টায় কোনো কমতি রাখেনি। কারণ আরমানের চোখের পাতায় তখনো একটু সারা ছিল, যেনো সে বলছে— “আমি বাঁচতে চাই, ফিরতে চাই মায়াবতীর কাছে। বলতে চাই না বলা কথা গুলো।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ওদিকে, নীচতলার আইসিইউ রুমের সামনে এখনও বসে আছে আবির আর ছোটো আম্মু।
মায়ার শরীরে যে ভয়ঙ্কর ড্রাগস পাওয়া গেছে, আরমান মায়াকে ধাক্কা দেওয়াই মায়ার মাথা গিয়ে বারি খাই রাস্তার পাশে থাকা ছোটো পুলে। ভয়ংকর রকমের আঘাত লেগেছে মায়ার মাথায়। ব্লাড লসের পরিমাণ টাও অনেকটা বেশী। তার উপর ভয়ংকর ড্রাগস—আর ওই ভয়ংকর ড্রাগস এর প্রভাবেই হয়েছে মিসক্যারেজ। মেয়েটা এর পর কতটা নিতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে ডাক্তারদের।
রক্তের মধ্যে পাওয়া ড্রাগস, পরিক্ষার জন্য বড়ো ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। মায়ার বিষয়ে এখনো সিউর ভাবে কিছু বলেনি ডাক্তারা।
ছোটো আম্মুর মুখে কোনো ভাষা নেই। একদিকে আরমান আবার আর একদিকে নিজের মেয়ের সমতুল্য মায়া—শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে উনি আইসিইউ এর দিকে।
আবির চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বসে আছে, ঠোঁট নড়ছে ধীরে ধীরে। যেনো সে উপড়ওয়ালার কাছে দোয়া করছে— আরমান আর মায়া ফিরে আসুক।
উপরে, ডাক্তারদের চিৎকারে আইসিইউ কেঁপে উঠছে।
“সিস্টোলিক প্রেশার ড্রপ করছে… CPR! 1… 2… 3… CLEAR!”
পুনরায় চেষ্টা। আরেকবার ইলেকট্রিক শক দেওয়া হলো।
হঠাৎ এক মুহূর্তে মনিটরের স্ক্রিনে একটা ছোট্ট স্পাইক। তারপর… একটানা হার্টবিট। খুব দুর্বল, খুব কাঁপা কাঁপা… কিন্তু জীবিত।
সেই একটানা শব্দ যেন পুরো হাসপাতাল ভবনে আলো জ্বেলে দিল।
ডাক্তার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল—
“He’s back. Heartbeat’s stabilizing… unbelievable.”
কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। যে মানুষটির বাঁচার চান্স ছিল মাত্র দশ শতাংশ, তাকে তারা ফিরিয়ে এনেছে। না, শুধু তারা না। মানুষটির বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছা, তার প্রিয় মানুষটির প্রতি অসম্পূর্ণ টানটাই তাকে বাঁচিয়ে তুলেছে। সব থেকে বড়ো কথা উপরওয়ালা তার হায়াত রেখেছে…
চোখদুটো এখনো পুরোপুরি খুলেনি আরমান, তবে তার শরীর সাড়া দিচ্ছে ডাক্তারদের চিকিৎসায়।
আরমান ফিরে এসেছে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছে সে— মায়ার স্পর্শহীন ভালোবাসার ডাকে সাড়া দিয়ে। যার ভালোবাসা ছিল না-কথায় বলা, কিন্তু প্রতিটি নিঃশ্বাসে লেখা। এখন অপেক্ষা শুধু— চোখ মেলে তাকানো, আর সেই কথাগুলো… যা বলা হয়নি এখনো।
আর ঠিক তখনই নিচের তলার আইসিইউ থেকেও খবর আসে—মায়া এখন স্থিতিশীল। অবচেতন হলেও বিপদমুক্ত। কিন্তু কিছু একটা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ডাক্তাররা, মায়ার জ্ঞান ফিরেলেই সবকিছু জানাতে পারবে।
আবির ছোটো আম্মুর দিকে তাকাল। মুখে কোনো কথা নেই। শুধু মনে মনে ভাবলো— “এরা দু’জন একে অপরের জন্যই বেঁচে আছে।”
পরের দিন ভোরবেলা….
এখনো আইসিইউতেই আছে আরমান। পরনে হাসপাতালের পোশাক, একটা পায়ে এবং হাতে প্লাস্টার করা। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। শরীরে অনেক জায়গায় ব্যান্ডেজ।
ধীরে ধীরে চোখের পাতা কিছুটা কেঁপে উঠলো ওর। হাতের আঙুল গুলো নড়ে উঠলো। জ্ঞান ফিরছে আরমানের। কিন্তু এই রুমে এখন কেউ নেই। আরমানের পরিবারের সবাই এখন একটু পাশের একটা ফাঁকা কেবিনে রেস্ট নিচ্ছে। ওরা আরমানকে দেখেছে দূর থেকেই। ডক্টর জানিয়েছে, আরমানের জ্ঞান ফিরলে আবারো একবার চেকআপ করে নর্মাল কেবিনে শিফট করা হবে।
হঠাৎই আরমান চোখ খুললো। যেনো খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে পড়েছে। মায়া! ওর মায়াবতী ঠিক আছে তো? জ্ঞান ফেরার সাথেই সাথেই প্রথমে এটাই ওর মনে প্রশ্ন জাগলো।
চেষ্টা করলো হাত পা নড়ানোর কিন্তু পারলো না। নিজের শরীর টাকেই নিজের কাছে ভীষণ ভারী লাগছে ওর। চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকালো। বুঝলো ও এখন হাসপাতালে। এরপর হঠাৎই ভালো হাতটা দিয়ে অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেললো, ধরফর করে উঠে বসলো বেডের উপর। আর সাথে সাথেই ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো ও। শ্বাস নিচ্ছে বড়ো বড়ো করে। পুরো শরীর মনে হচ্ছে ব্যাথায় ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু না— ওর এভাবে বসে থাকলে হবে না। খোঁজ নিতে হবে মায়াবতীর। মায়া কি ঠিক আছে?
আরমানের একটা হাত ভেঙে গেছে, আর একটা হাতে সামান্য কাটা ছেঁড়ার জন্য ব্যান্ডেজ করা। সেই ভালো হাতটাতেই লাগানো ছিল স্যালাইনের ক্যানোলা। ওই হাতটা তুলে নিয়ে গেলো প্লাসটার করা হাতটার কাছে। একটানে স্যালাইনের পাইপ টেনে ছিঁড়ে ফেললো। সাথে সাথে টপটপ করে রক্ত পড়তে শুরু হলো। কিন্তু ওর সেই দিকে কোনো ধ্যান নেই। তখনো শ্বাস নিচ্ছে বড়ো বড়ো করে। এরপর তাড়াহুড়ো করে নামতে চাইলো বেড থেকে, একটা পা প্লাস্টার করা, পড়ে যেতে নিলো কিন্তু বেড ধরে নিজেকে সামলে নিলো। মেঝেতে পা রাখতেই পুরো শরীর দিয়ে একটা ব্যাথার চোড়া স্রোত বয়ে গেলো যেনো। মাথা ঘুরে উঠলো। কিন্তু না তবুও থামলো না ও।
ভাঙা পা নিয়েই খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে এলো আইসিইউ থেকে। দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে গেলো ও। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, হাঁপাচ্ছে। তবুও থেমে থাকলে চলবে না। টলমলে পায়ে মাতালের মতো এগিয়ে গেলো। তখনি ছুটে এলো দুজন তরুণ নার্স। আরমানকে ধরতে চাইলো।
“একি স্যার! আপনি এভাবে উঠে এসেছেন কেন? আপনার শরীরের অবস্থা ভালো না।”
আরমান ওদেরকে থামিয়ে দিয়ে রাগী চোখে তাকালো। দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করলো— “ম..মায়া কো.. কোথায়?”
“প্লিজ স্যার!! আপনার অবস্থা ভালো নয়! এভাবে থাকলে আরো ক্ষতি হবে আপনার।”
বলেই ছেলেটি এগিয়ে গেলো আরমানকে ধরার জন্য, আরমান তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ভয়ঙ্কর গলায় হুংকার ছাড়লো— “আমি প্রশ্ন করেছি মায়া কোথায়? আমার সাথে তাকেও নিশ্চয় হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে, কোথায় আমার স্ত্রী?”
এই অবস্থাতেও আরমানের গম্ভীর গলায় বলা কথা গুলো যেনো ভিতর কাঁপিয়ে দিলো দুই তরুনের। আরমানের চোখ লাল হয়ে আছে। কেমন যেনো ভয়ঙ্কর লাগছে ওকে। ওখানে থাকা একজন নার্স ভীতু গলায় বলল— “নীচের তলায় আছেন উনি। জেনারেল কেবিনে দেওয়া হয়েছে উনাকে।”
আরমান আর ওখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন মনে করলো না। আবারো টলমল পায়ে এগিয়ে গেলো। সামনেই ওর চোখে পড়লো সিঁড়ি। ভাঙা পা নিয়েই সেই সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করলো। কিন্তু দূর্ভাগ্য বশত এই শরীর নিয়ে সামলাতে পারলো না নিজেকে। মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো সিঁড়িতেই, আর তারপর গড়াতে গড়াতে একেবারে নিচের তলায় গিয়ে পড়লো। পিছনে সেই নার্স দুটো ছুটে আসছে। ওরা তাড়াতাড়ি এসেও কিছু করতে পারলো না, এর মধ্যে যা হওয়ার হয়ে গেছে।
আরমান এতোকিছুর পরেও উঠে বসার চেষ্টা করছে। নার্স দুটো ছুটে এসে আরমানকে ধরে উঠিয়ে বসালো। আরমানের অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেলো দুজন। আঘাত পাওয়া শরীরে আবারও আঘাত লেগেছে। কপালের কাছটা কেটে গেছে, ব্যান্ডেজ করা জায়গা গুলো থেকে আবারো তাজা রক্ত বেরিয়ে এলো। কপালে কেটে যাওয়া জায়গা টা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ঠিক চোখের কাছে।
এতোকিছুর পরেও আরমানের কোনো ভাবান্তর নেই। ও আবারও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তাই নার্স দুটো ওকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলো। এরপর আরমান উঠে দাঁড়িয়ে আবারও কোনোরকমে দেওয়াল ধরে ধরে টলমল পায়ে প্লাস্টার করা পা টা টেনে টেনে এগিয়ে যেতে শুরু করলো। পাগলের মতো একের পর এক কেবিনের দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলতে শুরু করলো। আপ্রান চেষ্টা মায়াবতীকে খুঁজে বের করার। মুখে বিড়বিড় করছে— “মায়া!! কোথায় আমার মায়াবতী? আমার মায়াবতী ঠিক আছে তো?”
পিছন থেকে আরমানের বাবা, চাচা, মা, সবাই ছুটে আসছে। আরমানকে থামতে বলছে। কিন্তু কারোর কোনো কথা আরমানের কানে ঢুকছে না।
দূর থেকে আবির এই দৃশ্য দেখে চমকে উঠলো। ছুটে এসে আরমানকে জড়িয়ে ধরলো। আরমান থেমে গেলো, আহত লাল চোখে তাকালো আবিরের দিকে। গলা থেকে বেরিয়ে এলো মাত্র দুটো বাক্য— “আমার মায়াবতী কোথায় আবির? ও ঠিক আছে তো?”
আবিরের চোখ ছলছল করছে। ছুটে এসেছে আরমানের পরিবারের সবাই। আরমানের মা ও ছেলের এমন অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লো। আরমান শুধু একবার অনুভূতি শূন্য দৃষ্টিতে তাকালো নিজের মায়ের দিকে।
সাবিনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলল— “কেনো এমন পাগলামী করছিস বাবা? মায়া ঠিক আছে, তুই একটু শান্ত।”
হঠাৎই মিসেস মুনজিলা বেগমের বলা কথাটা সবার কানে ঝঙ্কার তুলল যেনো— “একটা চরিত্রহীন মেয়ের যেনো এতো পাগলামি সাজে না।”
আরমান রক্ত লাল চোখে তাকালো উনার দিকে। মুনজিলা বেগম আরমানকে এভাবে তাকাতে দেখে, মুখ বেঁকিয়ে বলল— “এভাবে তাকানোর কি আছে? কার না কার বাচ্চা এতোদিন পেটে নিয়ে ঘুরছিল তার ঠিক নেই। ওই সব মেয়েকে তো চরিত্র হীনই বলে।”
এরপর উনি আবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “কি ভেবেছিলে কেউ জানতে পারবে না? সত্যি কথা কোনোদিন চাপা থাকে না, হুম। আমি ঠিকই শুনেছি ডক্টরের, কথা গুলো। এতদিন কার না কার বাচ্চা পেটে নিয়ে ঘুরছিল, কিন্তু এখন সেই বাচ্চা নাকি আবার নষ্টও হয়ে গেছে। এই ধরনের পাপ কাজ করলে, চরিত্রহীন মেয়েদের সাথে এমনই হয়। আচ্ছা তুমি এই কথা সবার থেকে লুকাতে চাইছিলে কেনো? ওই চরিত্রহীন মায়াতো খুব আবির ভাইয়া! আবির ভাইয়া! করতো, তোমার সাথে আবার রাত কাটিয়ে পেট বাধ….”
যেই নোংরা কথাটা উনি বলতে যাচ্ছিলেন সেটা আর শেষ পারলেন না উনি। কথাটা শেষ করার আগেই আরমান নিজেকে আবিরের থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ালের সাথে গলা চেপে ধরলেন মুনজিলা বেগমের। চোখ দিয়ে যেনো আগুন ঝড়ছে। বাকি সবাইও ভীষণ অবাক হয়েছে মুনজিলা বেগমের বলা কথা গুলো শুনে। সবার চোখে মুখে বিস্ময় ছাপ।
আরমান হুংকার দিয়ে বলে উঠলো, “আমার মায়াবতীর নামে আর একটাও বাজে কথা বললে আপনার জীভ টেনে আমি ছিঁড়ে ফেলবো। আমার মায়াবতী চরিত্রহীন নয়। আমার মায়াবতী পবিত্র। আমার মায়াবতীকে আপনার ওই অপবিত্র মুখ দিয়ে আর একবার চরিত্রহীন বললে আপনাকে এই দুনিয়া থেকে বিদায় করতে আমার এক মূহুর্ত সময় লাগবে না।”
আরমান যেই হাত দিয়ে মুনজিলা বেগমের গলা চেপে ধরেছে সেই হাত থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত উনার শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে, সবাই চেষ্টা করছে আরমানকে থামানোর। মুনজিলা বেগমের অবস্থা ইতিমধ্যে খারাপ হয়ে গেছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে নিঃশব্দে। জীভ বেরিয়ে এসেছে অনেকটা।
মিসেস সাবিনা বেগম— “আরমান ছেড়ে দে বাবা, উনি মারা যাবে তো। আর উনি ঠিকই বলেছে, আমিও শুনলাম মায়া প্রেগন্যান্ট ছিল। চরিত্রহীন না হলে মায়ার পেটে বাচ্চাটা কোথা থেকে এলো?
সব হয়েছে ওই মেয়ের জন্য। আজ ওর জন্যই তোর এমন অবস্থা।”
আরমান মিসেস মুনজিলা বেগমকে ছিটকে ফেলে দিয়ে রক্ত লাল চোখে ওর মায়ের দিকে তাকালো। গর্জে উঠলো ওর মাকে উদ্দেশ্য করে— “জাস্ট শ্যাট আপ মম!! তুমিও যদি আমার মায়াবতীর নামে চরিত্রহীনের ট্যাগ লাগাও তাহলে আমি ভুলে যাবো যে তুমি আমার মা। আমার মায়াবতী চরিত্রহীন নয়। ও পবিত্র। মায়ার পেটে থাকা বাচ্চাটা ছিল আমার। ওটা আমার অস্তিত্ব। আমার রক্ত। আমার হালাল সম্পদ। যেটাকে আমি রক্ষা করতে পারলাম না।”
মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লো আরমান। কেউ কখনো তাকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখেনি,
যে মানুষটা ছিল পাথরের মতো গম্ভীর, সেই মানুষটাই আজ কান্নার ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে।
চারপাশ নিস্তব্ধ, মুখে মুখে বিস্ময়…সবাই যেন ভুলে গেছে— এই মানুষটাও ভাঙতে পারে।
আবির আরমানের কাছে বসে ওকে ধরলো। আরমান অসহায় চোখে তাকালো আবিরের দিকে, ভাঙ্গা গলায় বলল— “প্লিজ আবির। একবার নিয়ে চল না আমাই মায়ার কাছে। জানিস ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার, কিন্তু এই শারীরিক কষ্টের থেকেও হৃদয়ের দহন অনেকটা বেশি। এই চোখ ভীষণ ভাবে তৃষ্ণার্ত, এক পলক মায়াবতীকে দেখার জন্য। এই হৃদয় ভীষণ ভাবে ব্যাকুল, মায়াবতীর স্পর্শ পাওয়ার জন্য। আমি যে আর পারছি না। বিশ্বাস কর ভীষন কষ্ট হচ্ছে আমার। আর..আর আ..আমার অস্তিত্ব টাও কি সত্যিই বিলীন হয়ে গিয়েছে?”
আরমানের এমন ভাঙা কণ্ঠে উচ্চারিত আকুলতা শুনে, আবির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না— চোখ বেয়ে নেমে এলো নিঃশব্দ অশ্রু। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড় করালো আরমানকে। পাশেই থাকা একটা চেয়ারে বসালো ওকে।
আবির— “মায়া এখন ঠিক আছে আরমান। তোকে নিয়ে যাবো আমি ওর কাছে। কিন্তু তুই একবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে। তোকে যদি মায়া এই ভাবে দেখে তাহলে ও আরো কষ্ট পাবে। তুই কি চাস মায়া আরো বেশি কষ্ট পাক?
আরমান বাচ্চাদের মতো দুইদিকে মাথা নাড়ালো। আবিরো আবারো বলল, “পাঁচ মিনিট এখানে চুপটি করে বসে থাক। কথা দিচ্ছি আমি তোকে নিয়ে যাবো মায়ার কাছে।”
আবির কথাটা বলেই ডক্টরের দিকে ইশারা দিলো। আরমানের চিকিৎসা করা ডক্টরাও ছুটে এসেছে খবর শুনে। ডক্টর নার্স ও আরো কিছু পাবলিক লোক এ ভরে আছে করিডোর টা। সবাই হতভম্ব, শক্ত পোক্ত গম্ভীর কাঠখোট্টা মানুষটার এমন গভীর ভালোবাসা দেখে।
ডক্টর ও নার্স এগিয়ে এসে আরমানের আবার আঘাত পাওয়া জায়গাগুলো ড্রেসিং করিয়ে দিতে লাগল। অন্য একজন বড়ো ডক্টর সবাই কে যে যার কাজে ফিরে যেতে বলল। ধীরে ধীরে মানুষে ভর্তি থাকা করিডোর ফাঁকা হলো।
ডক্টর— “কিন্তু উনার এইভাবে থাকাটা রিস্ক হয়ে যাই। রীতিমত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন উনি। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব উনাকে বেডে নিতে হবে।”
আবির— “হ্যাঁ বুঝতে পারছি। কিন্তু ওকে একবার মায়াকে না দেখালে ওর পাগলামি থামবে না বরং আরো বেড়ে যাবে।”
আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৩৯
অন্য ডক্টর এবং আরমানের বাবাও সাই দিলো আবিরের কথায়। ধীরে ধীরে ওইভাবেই আরমানের আবার আঘাত পাওয়া জায়গাগুলো ড্রেসিং করিয়ে দিলো। স্যালাইন এর পাইপ টেনে ছিঁড়ে ফেলায় সূচ টাও একেবারে বেঁকে গিয়ে হাত টা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। সেই জায়গাটাও ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে দিলো। আরমান চোখ বন্ধ করে পেছনের দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে, নির্বাক এক মূর্তির মতো। এত কিছুর পরেও তার মুখ থেকে একটা আহ্ পর্যন্ত বের হয়নি। কেবল চোখ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ ধারা। হ্যাঁ, আরমান কষ্ট পাচ্ছে। নিজের করা ভুলের অনুশোচনা তাকে বিদ্ধ করছে। নিয়তি তার ওপর যেন কঠিনতম এক আঘাত হেনেছে।
