আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৪১
সালমা খাতুন
মায়াকে যেই কেবিনে রাখা হয়েছে, সেই কেবিনে আবির আরমানকে নিয়ে ধীরে ধীরে প্রবেশ করলো। আরমান এখন একটা হুইলচেয়ারে বসে আছে। সাথে আরমানের মা ও প্রবেশ করলো কেবিনে আর দুইজন ডক্টর। বাকি সবাই বাইরে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, ডক্টর এতোজনকে একসাথে ঢুকতে নিষেধ করেছে, রোগীর কেবিনে।
আরমানের হৃদয় মুচড়ে উঠলো, মায়ার ফ্যাকাশে, ও শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখে। মায়া তখনো নির্জীব। আবির একেবারে মায়ার বেডের পাশে আরমানেকে নিয়ে গেলো। আরমান বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলো— “মায়া! আমার মায়াবতী, আমার পিচ্চি মায়াবতী।”
আবারো দুই ফোঁটা পানি আরমানের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো। আরমান ওর ভালো হাতটা রাখলো মায়ার এক হাতে। অসহায় গলায় জিজ্ঞাসা করলো ও— “কি হয়েছে আমার মায়ার? ও এখনো জ্ঞানহীন কেনো?”
মায়ার চিকিৎসা করা ডক্টর বলল— “বলছি আপনাকে সব। তবে প্লিজ আপনি বেশি স্ট্রেস নিবেন না। শান্ত হয়ে শুনবেন আমার কথা গুলো। আপনার অবস্থাও ভালো নয়, কিন্তু আপনি যেহেতু কিছুটা জেনেই গেলেন তাই পুরোটা জানাচ্ছি আপনাকে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আরমান অনুভূতি শূন্য চোখে তাকালো সেই ডক্টরের দিকে। উনি বলতে শুরু করলেন— “প্রথমত আপনার স্ত্রীকে ড্রাগস দেওয়া হয়েছিল। এক ধরনের ভয়ঙ্কর ড্রাগস। সাধারণত এই ড্রাগস আমাদের দেশে পাওয়া যায় না। আর ওই ড্রাগস এর ফলেই আপনার স্ত্রীর মিসক্যারেজ হয়েছে, অ্যাক্সিডেন্ট এর অনেক আগেই। সম্ভবত তিন সপ্তাহ মতো হবে গর্ভধারণ করেছিলেন উনি। আর ওই ড্রাগস এর বিষয়ে জানার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে ব্লাড স্যাম্পেল, রিপোর্ট আসলেই বলতে পারবো ওই ড্রাগস কেনো দেওয়া হয়েছিল উনাকে।
আর অ্যাক্সিডেন্টে উনার ব্রেনের হিপ্পো ক্যাম্পাস অঞ্চলটি সম্পূর্ণভাবে ড্যামেজড। এই অংশটাই মানুষের মেমোরি রেজিস্ট্রেশন, স্টোরেজ ও রিকল-এর মূল কেন্দ্র। পারলে ‘ক্যামেলিয়া ডিসুজা’ এর সাথে যোগাযোগ করুন। টপ নিউরোসার্জন দের মধ্যে উনি একজন।”
আরমান অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করলো— “কি বলতে চাইছেন ডক্টর? স্পষ্ট করে বলুন।”
ডক্টর— “স্পষ্ট করে এখন বলা সম্ভব হচ্ছে না। উনার জ্ঞান ফিরলেই, বুঝতে পারবেন কেনো বলছি কথা গুলো। আর প্লিজ এখানে বেশিক্ষণ থাকবেন না এতে উনার ও ক্ষতি হবে আর আপনারও।”
কথা গুলো বলেই ডক্টর দুজন বেরিয়ে গেলেন। আরমান আবিরের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় জিজ্ঞাসা করলো— “আবির কি বলল ডক্টর? আমি কিছুই বুঝলাম না। আর মায়াকে ড্রাগস দেওয়া হয়েছিল, আর তার ফলেই আমার অনাগত সন্তান দুনিয়ার মুখ দেখতে পেলো না।”
কথটা বলেই চোখ বন্ধ করে নিলো আরমান। এরপর যখন চোখ খুলল তখন ওর চোখে যেনো আগুন জ্বলছে। আরমানের বলা কথা গুলো যে কারোর হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করবে—”কে করেছে এই কাজ? আমি তোকে একদিন সময় দিচ্ছি, এর মধ্যে তাকে আমার সামনে হাজির কর। ছাড়বোনা, কিছুতেই ছাড়বোনা আমি তাকে। ভয়ঙ্কর শাস্তি পেতে হবে তাকে, আর ওই শাস্তি আমি তাকে নিজে দেবো।”
আবির যেই ছেলেটা হাসিখুশি থাকতো সব সময় সেই ছেলেটার গলায়ও আজ গম্ভীর ভাব স্পষ্ট— “হুম খুঁজে তো বের করবোই তাকে। আর আরো একটা বিষয়, তুই হয়তো খেয়াল করিস নি। আমার মনে হয় অ্যাক্সিডেন্ট টা সুন্দর পরিকল্পনা করে সাজানো হয়েছে। আমি ইতিমধ্যেই খোঁজ লাগাতে শুরু করেছি। তোদের যেখানে অ্যাক্সিডেন্ট টা হয় ওখান থেকে সামান্য দূরে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। রাতের অন্ধকার থাকলেও বজ্রপাতের আলোয় যতটুকু বোঝা গিয়েছে, লরিটা মায়াকে আঘাত করার জন্যই ওর দিকে ধেয়ে আসছিল। এবং ঘটনার পরপরই লরিটা না থেমে বেরিয়ে যায় খুব স্পিডে।”
আরমান প্রচন্ড অবাক হলো আবিরের কথা গুলো শুনে। অবাক গলাতেই বলল— “কিন্তু কে? মায়ার বিষয়ে তো তেমন কেউ জানেই না।”
আবির— “হুম ওটাই তো ভাবনার বিষয়। আচ্ছা তুই চিন্তা করিস না, আমি দেখছি বিষয়টা। চল তোকে তোর কেবিনে যেতে হবে। তুই এখনো অনেক টা অসুস্থ, এইখানে এইভাবে থাকা ঠিক নয়।”
আরমান— “প্লিজ আবির কিছুক্ষণ একা থাকতে দে আমাকে ওর কাছে।”
আবির কিছু বলল না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আরমানের কাঁধে একবার হাত দিয়ে বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে।
আরমান ঘুরে তাকালো মায়ার শুকিয়ে যাওয়া মুখটার দিকে। মাথায় ব্যান্ডেজ করা। আরমান নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে মায়ার পুরো মুখে স্পর্শ করলো। অসহায় গলায় কিছুটা অভিযোগের সুরে বলল— “কেনো মায়াবতী? কেনো আর একটু অপেক্ষা করলে না? আমি তো সব ঠিক করে দিতাম। একটু বিশ্বাস রাখা যেতো না আমার উপর?”
কথাটা বলেই আরমান নিজের বলা কথাতেই তাচ্ছিল্য হাসলো।
“কিভাবেই বা রাখবে আমার উপর বিশ্বাস? বিশ্বাস রাখার মতো কোনো কাজই তো করিনি আমি। জানি অনেক অনেক ভুল করেছি আমি, কিন্তু দেখো সেই ভুলের শাস্তি এতোটাই কঠিন যে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ টাও পেলাম না। আজ নিজের ভুলের জন্য নিজের অস্তিত্বকে হারালাম।”
এই পর্যায়ে আরমানের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। আরমান হাত রাখলো অচেতন মায়ার পেটের উপর— “এইখানে, ঠিক এইখানে ছিল আমারই এক অংশ। পারলাম না তাকে রক্ষা করতে। তোমার সাথে করা অন্যায় গুলোর জন্য আজ নিয়তি আমাই এইভাবে শাস্তি দিলো। কিন্তু নিয়তি কি জানে? আমার সাথে সাথে তোমাকেও শাস্তি দিলো? আমি নাহয় দোষ করেছিলাম, ভুল করেছিলাম, অন্যায় করেছিলাম, কিন্তু তুমি তো কোনো ভুল করোনি। তাহলে এমন টা কেনো হলো? সে কি পারতো না আমাদের মাঝে থেকে যেতে?”
আরমানের চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। বড়ো বড়ো করে শ্বাস নিচ্ছে।
“এই মায়াবতী!! চোখ খুলো প্লিজ। আর কতক্ষন এইভাবে ঘুমিয়ে থাকবে? আমার যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, বিশ্বাস করো ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। জ্বলছে বুকের ভিতরটা। ভীষণ ভাবে জ্বলছে। আমি যে আর পারছিনা।”
আরমান কথা গুলো বলতে বলতে বেডের এক পাশে পড়ে থাকে মায়ার হাতের উপর মাথা ঠেকিয়ে দিলো। ঠিক তখনি আরমান অনুভব করলো মায়ার হাত নড়ছে। ধরফর করে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলো আরমান। মায়ার চোখের পাত কাঁপছে। হয়তো এখনি চোখ খুলবে। হুম ধীরে ধীরে মায়া তার চোখ খুলছে। আরমানের চোখে পানি অথচ মুখে হাসি ফুটে উঠলো। চিৎকার করে ডাক দিলো আবিরকে— “আবির!! আবির ডক্টরকে ডাক, মায়ার জ্ঞান ফিরছে।”
আবির দরজার কাছেই ছিলো, ওখানে আরমানের পরিবারের সবাইও ছিল। আরমানের ডাকে ভিতরে প্রবেশ করলো কয়েক জন। আবির গেলো ডক্টরকে ডাকতে।
এদিকে মায়া চোখ খুলে চারপাশ দেখছে ফ্যালফ্যাল চোখে। আরমান ওর হাতটা রাখলো মায়ার মাথায়। স্নেহের সাথে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল আরমান— “মায়া!! তু..তুমি ঠিক আছো? কোথাও কি কষ্ট হচ্ছে?”
আরমানের গলার আওয়াজে মায়া তাকালো ওর দিকে। মায়ার মুখে কোনো অনুভূতি নেই, কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।
সামিরা— “মায়া আপু! আপু এখন কেমন আছো তুমি? তোমার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে? না! না! এখন আর আপু বলবো না। তুমি তো এখনো আমার ভাবী মনিই আছো। আজকে থেকে আবারো ভাবী মনি বলা স্টার্ট করলাম।”
মায়া তাকালো সামিরার দিকে। কিন্তু কোনো উত্তর দিলো না। এরপর মায়া রুমে থাকা সকলের দিকে তাকালো, তারপর হঠাৎই ধরফর করে উঠে বসলো ও। এরপর মায়া বেডের এক কোনে গিয়ে বুকের কাছে হাঁটু ভাঁজ করে গুটিয়ে বসলো। মুখ লুকালো হাঁটুর কাছে।
সবাই মায়ার এমন অপ্রত্যাশিত ব্যাবহারে অবাক হয়ে গেলো। আরমান এগিয়ে গেলো মায়ার কাছে। মায়ার গায়ে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
আরমান— “কি হলো মায়া, এমন করছো কেন? তোমার কি কোথাও কষ্ট হচ্ছে?”
হঠাৎই মায়া আরমানের হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলো দিলো। অদ্ভুত ভাবে চিৎকার করে উঠল— “নাহ!! নাহ!!”
তখনি ডক্টরের আওয়াজ শোনা গেলো— “প্লিজ সবাই কেবিন টা একটু খালি করুন। এতো জন থাকবেন না, পেশেন্ট এর প্রবলেম হবে।”
ডক্টরের কথায় ধীরে ধীরে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো, শুধু রয়ে গেলো, আরমান, আবির, সাবিনা বেগম আর আনজুমা বেগম এবং ডক্টর। বাকি সবাই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কেবিনের দিকেই তাকিয়ে আছে।
এদিকে আরমান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে। মায়া কেমন যেনো অস্বাভাবিক আচারণ করছে। মায়ারা মুখে অতিরিক্ত ভয়ের ছাপ।
ডক্টর— “আমারা যেটার আশঙ্কা করছিলাম সেটাই হয়েছে। She has lost her memories. আর এটাই স্বাভাবিক। আগেই বললাম, উনার ব্রেনের হিপ্পো ক্যাম্পাস অঞ্চলটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আঘাত লাগার কারণে। আর রিপোর্টও এসে গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই উনাকে ড্রাগস দেওয়া হচ্ছিল। আর ওই ড্রাগস টা উনাকে দেওয়া হচ্ছিল উনার স্মৃতি নষ্ট করার জন্যই। অ্যাক্সিডেন্টে আঘাত না লাগলেও কিছুদিন পর উনি এমনিতেই উনার স্মৃতি হারিয়ে ফেলতেন, এই কারণেই এই ড্রাগস দেওয়া। অ্যাক্সিডেন্টে লাগা আঘাত আর এই ড্রাগস দুটোই খুব ভালো ভাবে উনার ব্রেনে ইফেক্ট করেছে, আর যার ফলে উনি মানসিক ভারসাম্য ও হারিয়ে ফেলছেন।”
ডক্টরের বলা কথা গুলো শুনে আরমানের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। সেই সাথে শাহরিয়ার পরিবারের সবাইও ভীষণ বিস্মতি হলো। আরমান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, বেডের এক কোনে, দুই হাঁটু বুকের কাছে জড়ো করে তাতে মুখ লুকিয়ে বসে থাকা মায়ার দিকে।
ওর মায়াবতী ওকে ভুলে গেছে, ভুলে গেছে ওদের বিয়ে, ওদের সম্পর্ক, ওকে গভীর ভাবে ভালোবাসা, সব। সব ভুলে গেছে।
আর সবচেয়ে কঠিন সত্য— ওর মায়াবতী ওকে দেখে ভয়ও পাচ্ছে। আর এই কঠিন সত্যটা নিতে পারল না আরমানের হৃদয়।
সমস্ত শরীর হঠাৎ করে নিস্তেজ হয়ে এল, মনে হল সমস্ত পৃথিবীটা যেন তার বুকের ওপর চেপে বসেছে। ধীরে ধীরে জ্ঞান হারালো আরমান।
অন্যদিকে…
“আমি পেরেছি। কিছুটা হলেও পেরেছি, আরমানকে শেষ করতে। হ্যাঁ! চেয়েছিলাম আরমানের মায়াবতীকে চিরতরে পরপাড়ে পাঠাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আরমান ঠিকই তাকে বাঁচিয়ে নিলো।”
কথা গুলো উচ্ছাসিত কন্ঠে বলে উঠলো ব্যাক্তিটি। এরপরই সেই ব্যাক্তিটি পাগলের মতো হেসে উঠলো। হাসতে হাসতেই বলে উঠলো— “কিন্তু আরমানের বাচ্চা? আরমানের অস্তিত্ব? সেটা তো মিটে গেলো। আরমান তার মায়াবতীকে বাঁচাতে পারলেও বাঁচাতে পারলো না নিজের অস্তিত্বকে। বাঁচাতে পারলো না মায়ার স্মৃতিকে। আরমানের মায়াবতীর স্মৃতি থেকে আরমান ফুরুৎ।”
শেষের কথাটা কিছুটা নাটকিয় ভঙ্গিতে বলল।
“মায়াবতীর মন মস্তিষ্ক থেকে মুছে গেলো আরমান। হা হা হা। এভাবেই.. ঠিক এভাবেই শেষ হতে হবে আরমানকে। এটা তো সবে শুরু। আরো..আরো অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে আরমানের জীবনে। আমি কিছুতেই আরমানকে সুখী হতে দেবো না। একটু একটু করে শেষ করে দেবো আরমানকে। ছিনিয়ে নেবো আরমানের মায়াবতীকে। মায়াবতীর মাঝেই আছে আরমানের প্রাণ ভোমরা। আর সেই প্রাণ ভোমরাকেই শেষ করবো আগে। এতে আরমান নিজে নিজেই শেষ হয়ে যাবে। হা হা হা হা হা।”
কেটে গেছে দু’টি দিন।
আরমান জ্ঞান হারানোর প্রায় ছয় ঘণ্টা পর ধীরে ধীরে চোখ খুলেছিল। প্রথমে চারপাশের সবকিছু যেন অস্পষ্ট, ঝাপসা। পরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল আলো, দেয়ালের রং, মানুষজনের মুখ… শুধু মায়ার নামটিই ছিল আড়ালে বন্দি।
জ্ঞান ফিরলেও শরীর আবারও খারাপের দিকে ঢলে পড়েছিল। এখন কিছুটা স্থিতিশীল হলেও, ওর ভিতরটা যেন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ।
মায়ার কথা কেউ তুলতে সাহস করছে না। কারণ ও নিজেই সেই বিষয়ে একটিও শব্দ করেনি। না অভিমান, না অভিযোগ—একটা সম্পূর্ণ শূন্যতা ঘিরে রেখেছে ওকে।
আরমান যেন আর আগের মানুষটা নেই। তার মুখে কোন স্পর্শ নেই অনুভূতির—না দুঃখ, না রাগ, না কান্না… শুধু এক অদ্ভুত নির্জীবতা।
শরীরটাও চোখে পড়ার মতো ভেঙে পড়েছে। পেটানো গড়ন যেন কয়েক রাতেই কেমন নুয়ে গেছে। চোখের নিচে জমেছে ক্লান্তির কালো ছায়া।
সেভ না করার কারণে গালে জমে উঠেছে একরকম এলোমেলো, অগোছালো দাঁড়ির রেখা। যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বড় হয়েছে, ঠিক যেমন করে বেড়েছে আরমানের ভেতরের তীব্র নিঃসঙ্গতা।
এই আরমানকে দেখে মনে হয় না, এটা সেই আগের গম্ভীর রগচটা জেদী আরমান শাহরিয়ার ।
এই আরমান… যেন ভাঙা আয়নায় প্রতিফলিত এক অচেনা ছায়া। নিঃসঙ্গ, নিঃশব্দ, নিঃপ্রাণ।
এই দুই দিন আরমান হাসপাতালে নিঃশব্দে কাটালেও আর কিছুতেই এখানে থাকতে রাজি নয় ও। আজকেই বাড়ি ফিরতে চাই। বাকি চিকিৎসা ও বাড়ি থেকেই করাবে। আর কেউ ওকে রাজি করাতে পারেনি হাসপাতালের থাকার জন্য। ডিসচার্জ এর সমস্ত ব্যাবস্থা হয়ে গেছে।
হুইলচেয়ারে বসে ধীরে ধীরে শাহরিয়ার ম্যানশনের মূল ফটক পেরিয়ে এলো আরমান শাহরিয়ার। নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল চারপাশে।
সকলের চোখ জলে ভিজে উঠল। কেউ কখনো কল্পনাও করেনি যে, এই চিরদম্ভী ছেলেটিকে এভাবে হুইলচেয়ারে ফিরতে হবে। এই দৃশ্যটা যেন কাউকে বিশ্বাস করাতে চাইছে না— তবুও এটাই বাস্তব।
সাবিনা বেগম ছুটে এলেন ছেলের কাছে। তাঁর কণ্ঠে মাতৃত্বের ছোঁয়া, কাঁপা হাতে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“আব্বু… কষ্ট হচ্ছে না তো?”
আরমানের কণ্ঠ ছিল নিঃসাড়, অনুভূতিহীন—
“নো, মম।”
চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে নিয়ে সাবিনা বেগম আবার বললেন,
“আমি আর তোর ছোট্ট আম্মু, দুজনে মিলে তোর জন্য রান্না করেছি। সব তোর পছন্দের। তেল-মশলাও কম দিয়েছি। খাবি চল।”
আরমান শুধু তাকিয়েই বলল—
“এখন না, মম… একটু পর।”
ঠিক তখনই বেজে উঠল দরজার কলিং বেল।
রুবি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো দেখে মুহূর্তেই ঘরের বাতাস পাল্টে গেল। শাহরিয়ার পরিবারের সকলের মুখে বিস্ময়ের ছায়া, শুধু বাদ আরমান ও আবির।
পুলিশ।
বাড়ির ভেতরে দৃঢ় পায়ে প্রবেশ করল কয়েকজন পুলিশ অফিসার।
আরমানের বাবা চমকে উঠে বললেন,
“এ কী! বাড়িতে পুলিশ কেন?”
একজন অফিসার গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন,
“অপরাধী যেখানে থাকবে, পুলিশ তো সেখানে যাবেই, মিস্টার শাহরিয়ার।”
ভ্রু কুঁচকে তাকালেন আনোয়ার শাহরিয়ারের।
“অপরাধী! এই বাড়িতে?”
আবির এগিয়ে এসে দৃপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
“হ্যাঁ আঙ্কেল, অপরাধী। মায়ার অপরাধী। সেই ব্যক্তি যিনি দিনের পর দিন মায়াকে ড্রাগস খাইয়ে স্মৃতি লোপ করিয়ে দিচ্ছিলেন। অফিসার, অ্যারেস্ট করুন তাঁকে।”
সঙ্গে সঙ্গে আবির একটি নির্দিষ্ট দিকে আঙুল তুলল।
সবাই ঘুরে তাকাল সেই দিকেই। সোজা গিয়ে থেমে গেল দৃষ্টির রেখা—মিসেস মুনজিলা বেগমের উপর।
হ্যাঁ, মাইশার মা।
মুনজিলা বেগম চমকে উঠলেন। মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। হঠাৎ জড়িয়ে পড়া কণ্ঠে বলতে লাগলেন—
“আ… আমি কিছু করিনি। আবিরা, তুমি মিথ্যে বলছ। আমি ড্রাগস দিইনি মায়াকে। বিশ্বাস করো…”
চারপাশের মানুষ নির্বাক। কারও ঠোঁট কাঁপছে, তো কেউ চোখের পলক বার বার ঝাপটাচ্ছে। বাড়ির সমস্ত সার্ভেন্ট গুলোও উপস্থিত হয়েছে ড্রয়িংরুমে।
আরমান তখন নিস্পৃহ গলায় বলে উঠল—
“আবির, প্লিজ… তাড়াতাড়ি এই নাটক শেষ কর। শরীর ভালো নেই। মাথা ধরেছে খুব।”
তখনই এক পুলিশ অফিসার এক মহিলা কনস্টেবলকে চোখের ইশারা করলেন।
কনস্টেবলটি এগিয়ে গেল।
সবাই মনে করল, মিসেস মুনজিলা বেগমকেই গ্রেপ্তার করতে এগোচ্ছে সে।
কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে কনস্টেবল টি তাঁকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল, মিসেস মুনজিলা বেগমের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা—মিসেস আনজুমা শাহরিয়ারের দিকে।
তারপর হ্যান্ডকাফ উনার সামনে তুলে ধরে, ঠান্ডা কণ্ঠে উচ্চারণ করল—
“You are under arrest, Mrs. Anjuma Shahriar. মিস্টার আরমান শাহরিয়ারের স্ত্রীকে বেআইনিভাবে ড্রাগস দেওয়ার অপরাধে আপনাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।”
এক মুহূর্তের নিঃস্তব্ধতা যেন সময়কে থমকে দিল।
মাটির সঙ্গে গড়িয়ে পড়ল পারিবারিক বিশ্বাসের ভরসা। সকলেই স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে রইল আনজুমা বেগমের দিকে। কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
আমার নিষ্ঠুর ভালবাসা পর্ব ৪০
আর ঠিক তখনই, সবাইকে আশ্চর্য্যের শেষ সীমানায় পৌঁছে দিয়ে, আনজুমা বেগম চুপচাপ মাথা নিচু করে দুই হাত মুঠো করে বাড়িয়ে দিলেন কনস্টেবলের দিকে।
কোনো কথার প্রয়োজন ছিল না আর। তার সেই নীরব সমর্পণই যেন স্বীকার করে নিল—অপরাধ, প্রতারণা… এবং এক চিরস্থায়ী বিশ্বাসঘাতকতা।
