Home আমির হাওলাদার আমির হাওলাদার পর্ব ১

আমির হাওলাদার পর্ব ১

আমির হাওলাদার পর্ব ১
ইলমা বেহরোজ

‘আমির ভাই, এই মালটা দেখেন। type 56 ।’
আমির ভ্রু কুঁচকে রাইফেলটা হাতে নিল। ওটার ওজন আর ফিনিশিং দেখে অবিকল AK-47 মনে হচ্ছে। সে চেম্বার চ্যাক করল, তারপর ট্রিগার টেনে শুধু ক্লিক শব্দটা শুনল। বলল, ‘মালটা তো দেখছি পুরাই AK-47 ’
কেরামত হাতের তালু কচলাতে কচলাতে বলল, ‘আরে না ভাই, এই জন্যই তো আপনের কাছে আসলাম। এইটা ভাই চীনারা বানাইছে, হুবহু সোভিয়েত AK-47 এর মতন। দেখতে কন আর পারফরম্যান্স কন, একদম এক। কিন্তু কারিশমা হইলো অন্য জায়গায়। দামে এইটা অরিজিনাল মালের থেইকা অনেক সস্তা।’
আমির রাইফেলের ব্যারেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কোয়ালিটি ড্রপ করবে না তো? ফায়ারের সময় হাত থেকে উড়ে গেলে তো খবর আছে।’

‘আরে না ভাই, চীনারা এইখানে কোনো ছাড় দেয় নাই। জ্যাম হওয়ার ভয় নাই। এই মাল যদি একবার চীন থেইকা সরাসরি কন্টেইনারে ভইরা আনাইতে পারি আর দেশের বাজারে ছাড়তে পারি…ভাই রে, পুরা বাজার গরম হইয়া যাইবো। লাখ লাখ না, কোটি টাকা আয় হবে। সামনে নির্বাচনের সময় ক্যাডাররা এই সস্তা আর কড়া মালের জন্য পাগল হইয়া যাইবো।’
আমির রাইফেলটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, ‘কাস্টমস আর কোস্টগার্ড একটু কড়া হয়েছে।’
‘সেই জন্যই তো ভাই আপনের কাছে আসা। এই চালান দেশে ঢুকানোর ক্ষমতা আপনের ছাড়া আর কারো নাই। আপনে শুধু একবার হাত দেন আমির ভাই, আমাগো ভাগ্য খুইলা যাবে। এক শিপমেন্ট মাল যেমনে পারেন আনানোর ব্যবস্থা করেন।’

আমির চুরুট ধরাল। বলল, ‘টাকা আর রুটের চিন্তা আমি করতেছি। তুই চীনার সঙ্গে ডিল কনফার্ম কর।’
কেরামত মাথা নেড়ে সায় দিতে যাবে, ঠিক তখনই কোনো আগাম সংকেত ছাড়াই দড়াম করে খুলে গেল আমিরের অফিস কামরার ভারী সেগুন কাঠের দরজাটা। প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকে পড়লেন এমপি বজলুল হক।
সাধারণত এমপি আসার আগে তার পিএস ফোন দেয়, বাইরে গানম্যানরা পজিশন নেয়, আজ সেসবের বালাই নেই।
এমপির অনাহূত উপস্থিতিতে ঘরের ভেতরের শান্ত পরিবেশটা এক নিমেষে থমথমে হয়ে গেল। আমির ইশারা করলে কেরামত টেবিল থেকে তার ফাইলটা তুলে মাথা নিচু করে দ্রুতপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দরজার পাল্লাটা নিঃশব্দে টেনে দিয়ে গেল।

বজলুল হক চেয়ারে বসেই বললেন, ‘আমির সাহেব, বাড়াবাড়ি কইরা ফেলাইতেছেন! কমিশনার সাবের কানে অলরেডি খবর গেছে, আপনি মানুষ চালান করতেছেন। ফিশিং ট্রলারে মাছের বদলে মেয়ে মানুষ পাচারের এই মরণখ্যাল আমি আর সইতে পারুম না। পার্টি থেইকা চাপ আছে। আপনার জন্য আমার চেয়ার নিয়া টানাটানি শুরু হইছে। পার্সেন্টেজ আর প্রোটেকশন মানি দুইটাই ডবল করতে হইবো।’’
আমির শান্তভাবে অ্যাশট্রেতে চুরুটটা ঘষে নিভিয়ে দিয়ে বলল, ‘চেয়ারের চিন্তা ছাড়েন হক সাহেব। চেয়ারটা কার টাকায় কেনা, সেটা ভুলে যাইয়েন না।’

‘আপনিও ভুলে যাইয়েন না, আমরা সরকার। আমার একটা সিগন্যালে আপনার ফ্যাক্টরি আর গোডাউন এক রাতে মাটির সাথে মিশায়া দিতে পারি। বড় বেশি উঁচুতে উইঠা গেছেন আপনি।’
আমির বজলুল হকের দিকে একটা খাম এগিয়ে দিল। যেখানে কিছু গোপন ছবি রাখা। ক্রুর হাসি হেসে বলল, ‘উঁচুতে তো আমি এমনি উঠিনি হক সাহেব, আপনাদের কাঁধে পাড়া দিয়েই উঠছি। এই যে ছবিগুলা দেখতেছেন, গত মাসে আপনার ছেলেপেলেরা আমার চালানের পাহারা দিছে, সেইখানে আপনার নিজের ছোট ভাইও ছিল। আমি ডুবলে কিন্তু একা ডুবব না, পুরো দল নিয়ে তলাব।’

ছবিগুলো দেখে বজলুল হকের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, ‘আপনি আমারে ব্ল্যাকমেইল করতেছেন? এই সাহস কই পান? আমরা না থাকলে আপনার এই নারী পাচারের সিন্ডিকেট এক সপ্তাহও টিকবে না।’
আমির শব্দ করে হেসে উঠল এইবার। যেন কৌতুক শুনল মাত্র। বলল, ‘টিকবে না? হক সাহেব, আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন, এই যে মফস্বলের ছেলেপেলেদের নিয়া এসে ঢাকা শহরে মিছিল করান, তাদের হাতে চায়না পিস্তলটা কে তুলে দেয়? আপনাদের নির্বাচনী ফান্ডে কয়েক কোটি কালো টাকা কে সাদা করে দেয়? আমি ছাড়া উপায় আছে আপনাদের? আমি না থাকলে আজ আপনি সংসদে না, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকতেন। আপনারা হলেন আমার পালিত হায়েনা। আমি মাংস ছুঁড়ে দেই বলেই আপনারা কামড়া-কামড়ি করে আমার সাম্রাজ্য পাহারা দেন। আমারে কামড়াতে আসিয়েন না হজম করতে পারবেন না।’

‘আপনি কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করতেছেন। আমরা সরকার চালাই, আমরা পলিসি মেকার। আমরা এদেশের রাজা।’
আমির চেয়ার ছেড়ে উঠে বজলুল হকের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আপনারা মনে করেন আপনারা দেশ চালান? ভুল! আপনারা হলেন আমার দাবার বোর্ডের একেকটা বোড়ে। আমি আপনাদের হাতে একটা খেলনা (অস্ত্র) ধরিয়ে দেই, আর আপনারা খুশিতে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে নিজেদের লোকের রক্ত ঝরান। আমার চোখে একেকটা দল মানে কী জানেন? একেকটা বলদের গোয়াল! আমি সামনে ঘাস ছড়িয়ে দেই, আর আপনারা সেই ঘাসের লোভে আমার কন্টেইনার পার করার রাস্তা পরিষ্কার করে দেন। কারে গরম দেখান আপনি?’
বজলুল হক রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, ‘আপনি কি বলতে চান আমরা আপনার গোলাম?’

‘গোলাম না বলে পার্টনার বলেন, শুনতে ভালো লাগবে। আপনাদের রাজনীতি চলে আমার কালো টাকায়, আমার অস্ত্রে… আর আমার ব্যবসা চলে আপনাদের স্ট্যাম্পে। কিন্তু মাথায় উঠতে চাইলে এটা মনে রাইখেন, স্ট্যাম্প মারার জন্য হাত থাকলেই চলে…এখন সেটা আপনি মারেন বা অন্য কেউ! হাত হলেই হলো। যে অস্ত্র আমি আপনাদের দিছি, সেইটার নল আপনার দিকে ঘুরাতে আমার ছেলেদের এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। রমজানের আগে দয়া করে নিজের মাথা গরম করবেন না। আমারটাও করবেন না। ইফতারের দাওয়াতটা পকেটে নিয়া শান্তিমতো চল যান।’

‘এর ফল কিন্তু ভালো হবে না আমির। তুমি অনেক কথা বইলা ফেলছো।’
বজলুল পূর্ব পরিচয়ের সম্বোধনে চলে গেলেন।
‘ফল তো আমি প্রতিদিন ভোগ করি। এই যে চিংড়ির এক্সপোর্ট দেখতেছেন, এর ভেতরে কতজনের কলিজা পাচার হয়ে গেছে তার খবর আপনার ডিজি সাহেবও জানে না। যান, গিয়া নিজের দল সামলান। কালকের মধ্যে আপনার একাউন্টে ফান্ডের টাকা পৌছে যাবে। এখন আসুন।’
আলমগীর জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল, এমপি বজলুল হকের গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে আমিরকে সংশয় নিয়ে বলল, ‘লোকটা এম্পি, তার হাতে সরকারি ক্ষমতা। সে যদি সত্যি সত্যি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আমাদের বিপক্ষে দাঁড়ায়? উনি এক ফোনে তোর ফ্যাক্টরি সিল করে দিতে পারে!’

‘তাহলে উনি নিজেও ডুববে। আমাদের কাছে কি কম অস্ত্র আছে? এই দেশে যোগ্য ব্যক্তির চেয়ে অযোগ্য ব্যক্তিরাই বেশি আসনে বসে। অযোগ্য লোকেদের এটাই সুবিধা, একটু ভয় দেখাইলে এরা কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে।’
‘আমার চিন্তা হচ্ছে। উনি সংসদে বসে! তুই একজন এম্পিকে ‘বলদ’ বললি? যদি ও ওপর মহলে আমাদের ব্যবসার লিস্টটা ধরিয়ে দেয়?’
‘বজলুল হক এম্পি হয়েছে আমার টাকায়। ওরে এম্পি আমি বানিয়েছি৷ দুই বছরেই শুয়ো** বাচ্চা, নিজের অতীত ভুলে গেছে৷ ও যদি আমাকে ডুবাতে চায়, তবে রশিতে টান দেওয়ার আগেই ওর নিজের গদি ফাঁস হয়ে ওর গলায় ঝুলবে। ও’রে আমার খুব ভালো করে চেনা আছে।’
আলমগীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

আমির বলল, ‘বজলুল হককে নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা কোরো না। ও এখন বাড়িতে গিয়ে শান্ত মাথায় নিজের লাভ-ক্ষতির খতিয়ান মেলাবে। আমিরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক জ্ঞান ওর আছে। বজলুল অন্য দশটা সাধারণ এমপির মতো না। ওর টিকে থাকাটাই নির্ভর করে আমার দাক্ষিণ্যের ওপর। ও ভালো করেই জানে, ও আমার মাকড়সার জালে আটকে গেছে।’
‘সে তো তুইও আটকে আছিস আমির। তোর সঙ্গে আমরাও একটা বৈশ্বিক মাকড়সার জালে আটকা পড়েছি। জালটা দিন দিন বড় হচ্ছে, জটিল হচ্ছে।’

আমির কিছু বলল না। ধীর পায়ে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। বাইরে তখন বিকেল হচ্ছে। দূরে কোথাও একটা গাড়ির হর্ন একবার ডেকে থেমে গেল।
নারী পাচার আর অস্ত্রের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট এখন তার হাতের মুঠোয়। মধ্যপ্রাচ্যের মসনদে বসে থাকা প্রভাবশালী মন্ত্রী, রাজপুত্র, তেলের টাকায় ফোলা অহংকারী আমিরদের বিকৃত শখের যোগানদাতা সে। দিনের আলোয় যারা ধর্মের ঝান্ডা বহন করে মিছিলে হাঁটেন, রাতের অন্ধকারে তাদের সেই মুখোশের আড়ালের পচা মুখগুলো আমির চেনে হাতের তালুর মতো। তাদের এমন সব ব্যক্তিগত পাপের দলিল, কলঙ্কিত নথিপত্র আমিরের জিম্মায় আছে, যেগুলো একবার জনসমক্ষে এলে ওরা তাসের ঘরের মতো ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
তারাও জানে আমিরের জীবনের দুর্বল শিরাটির কথা। পদ্মজা। তার স্ত্রী। ভুবনমোহিনী এক রূপসি, যার পায়ের নখ থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত কোথাও কোনো কলঙ্কের ছায়া নেই।

জানালার কাঁচে সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। তীক্ষ্ণ চোয়াল, শান্ত চোখ, ঠোঁটের কোণে চুরুটের ধোঁয়া।
এক অদৃশ্য আন্তর্জাতিক লবিস্ট চক্র পাহাড়ের মতো তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভূ-রাজনৈতিক দাবার খেলায় আমির এমন এক ‘স্মুথ অপারেটর’, যার একটি ইশারায় বিদেশের গডফাদাররা এদেশের মসনদ এক রাতের মধ্যে উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তারা আমিরকে পাহারা দেয় নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে। তার মতো নিখুঁত যোগানদাতা এই অঞ্চলে আর দ্বিতীয়টি নেই বলে।

একদিকে দুবাই-কুয়েতের হারেমে নারী পাচারের অন্ধকার বাজারে সে কুড়িয়েছে প্রশ্নাতীত বিশ্বস্ততা। অন্যদিকে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের চালান এনে এদেশের ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদদের মাথায় পরিয়ে দিচ্ছে দম্ভের মুকুট। আমির জানে তার মূল্য কতখানি! তার পতন মানে অনেক বড় বড় প্রাসাদের ভিত নড়ে ওঠা।
আলমগীর খুব নিচু গলায় বলল, ‘তোর যদি কোনোদিন ইচ্ছে হয় এখান থেকে বেরোনোর?’
আমির ঘুরে দাঁড়িয়ে চুরুটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, ‘এই খেলায় প্রবেশপথ আছে বড় ভাই, প্রস্থানপথ নেই। এখান থেকে বের হতে চাওয়া মানেই নিজের মৃত্যুপরোয়ানা সই করা। তবে যতদিন এই ময়দানে আছি, রাজার মতোই খেলব।’

আলমগীর প্রসঙ্গ পালটে বলল, ‘মন্ত্রী সাহেব আগামীকাল তোকে তার বাড়িতে ডেকেছেন।’’
আমির ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘সালাহউদ্দিন তারিক?’’
‘হুম। উনার গলার স্বর মোটেও সুবিধাজনক ছিলনা।’
আমির স্থির হয়ে দাঁড়াল।
চার চালানের বকেয়া পাওনা শোধ না করায় সে চুক্তি ভেঙে বিরোধী দলকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে, এই সংবাদ নিশ্চয়ই মন্ত্রীর কানে পৌঁছে গেছে। বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ দ্রুত ছড়ায়! কানে আসন্ন ঝড়ের গর্জন শোনা যাচ্ছে।
সালাহউদ্দিন তারিক রাষ্ট্রযন্ত্রের দাঁতনখ নিয়ে বহু পুরনো শত্রুকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সে কি এবার তাকে পিষে ফেলবে? তার ছদ্মবেশ ভেঙে, তার কাচের গম্বুজে ঢিল ছুড়ে পদ্মজার নিষ্পাপ পৃথিবীটাকে খান খান করে দেবে?
নাকি আমির তার তুখোড় চতুরতা দিয়ে মন্ত্রী আর বিরোধী দল দুই পক্ষকেই দাবার ঘুঁটি বানিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেবে?
চুরুটের আগুন নিভে আসছে। আমির সেদিকে তাকাল না।
সে ইতোমধ্যে পরের চাল ভাবতে শুরু করেছে।

আমির গাড়ি থেকে নেমে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াল। রাত হয়ে গেছে। বাতাসে শিশিরের হালকা ছোঁয়া। আকাশে অসংখ্য তারা। কিন্তু এসবের দিকে মনোযোগ দেওয়ার ফুরসত নেই তার।
কবির, কুত্তার বাচ্চা কবির… ও আগে জানায়নি পদ্মজা দুপুরে তাকে খুঁজে অফিসে গিয়েছিল, আর এই না-জানানোটাই বুকের ভেতর শূলের মতো বিঁধছে। পদ্মজা কী মনে করে ফিরে গেছে কে জানে। ওর মুখে কি বিষণ্নতার ছায়া পড়েছিল? চোখ কি একটুও ভিজেছিল? নাকি সেই চিরচেনা নিরুদ্বেগ হাসিটা মুখে রেখেই ফিরে গেছে যে হাসি দেখলে আমিরের মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সুখ বুঝি ওই একটা হাসির কাছে হার মেনে গেছে।
আমির দ্রুতপায়ে হাঁটতে লাগল। প্রতিদিন দেখা হয় পদ্মজার সঙ্গে। প্রতিটি সকাল, প্রতিটি সন্ধ্যা। তবু প্রতিদিন ফেরার সময় মনে হয় সে দীর্ঘ এক মরুপথ পাড়ি দিচ্ছে। বুকের ভেতর এমন সুখের স্রোত জেগে ওঠে যেন এটাই প্রথম দেখা, যেন এই মুহূর্তের আগে পৃথিবীটা কখনো এত রঙিন ছিল না। কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য!

এমন প্রলয়ঙ্কারী প্রেম কেন জন্মাল হৃদয়ে? কে বুনে দিয়ে গেছে এই আগুনের বীজ? এতো সুখ একটা মানুষের মধ্যে কী করে থাকতে পারে? ওতটুকু একটা শরীরে, ওতটুকু একটা হাসিতে? পদ্মজার কথা মনে পড়লে, তার কাছাকাছি যেতে চাইলে…শরীরের প্রতিটি কোণ পুড়ে যায় কীসের যেন এক দহনে। অথচ এই পোড়াতেও এত সুখ যে সে চায় না আগুন নিভুক, চায় না এই দহন থামুক। বরং আরও জ্বলুক, আরও পুড়ুক। এই আগুনের নামই তো পদ্মজা, আর পদ্মজাই তার সমস্ত পৃথিবী।
আমির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপতেই ভেতর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। মুহূর্তের মধ্যেই কপাট খুলে গেল। পদ্মজা আগে থেকেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিল। দরজা খুলতেই আমিরের চোখের সামনে ফুটে উঠল ‘পদ্মজা’ নামক ফুলটি। সৃষ্টিকর্তা যেন তার সমস্ত নিখুঁত কারুকার্য দিয়ে এই মেয়েটিকে গড়েছেন; যার সৌন্দর্যের কাছে সকল সৌন্দর্যও ম্লান হতে বাধ্য।
পদ্মজা মৃদুস্বরে সালাম দিল, ‘আসসালামু আলাইকুম।’’

‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম।’
বলতে বলতে আমির পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরল। আলতো করে চুমু খেল ওর কপালে। উনিশ-বিশ বছরের তরুণী পদ্মজার মাথাটা ঠিক আমিরের হৃদপিণ্ড বরাবর ঠেকে গেল।
পরক্ষণেই নিজেকে একটু ছাড়িয়ে নিয়ে অস্থির গলায় বলল, ‘আপনার সাথে জরুরি কথা ছিল। অফিসেও গিয়েছিলাম, পাইনি। কোথায় ছিলেন?’
আমির পদ্মজার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল সোফার দিকে, নিজে বসল, পদ্মজাকেও নিজের কোলে বসিয়ে বলল, ‘এই অধমকে কেন খুঁজছিলেন রানী সাহেবা? বলুন, আপনার কথা শুনতে এই বান্দা সদা প্রস্তুত।’
‘হেয়ালি করবেন না। জরুরি কথা।’
আমির তৎক্ষণাৎ নিজের মুখভঙ্গি এমন করল যেন কোনো উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় মিটিংয়ে বসেছে। গম্ভীর হয়ে বলল, ‘জি ম্যাডাম, বলুন শুনি।’

‘নিলুফারের কথা মনে আছে আপনার?’
আমির একটু ভাবল। নিলুফার পদ্মজার কলেজের বন্ধু। যখন পদ্মজা তার তিন মাস বয়সী কন্যা পারিজাকে হারিয়ে ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছিল, তখন নিলুফার প্রায় প্রতিদিন আসত। চুপ করে পদ্মজার পাশে বসে থাকত। কথা বলত, হাসাত, কখনো কাঁদত। পদ্মজাকে শক্ত রাখার চেষ্টা করত। এমন বন্ধুকে কি ভোলা যায়?
‘মনে আছে। কেন, তার কি বিয়ে ঠিক হয়েছে?’
পদ্মজা মাথা নেড়ে বলল, ‘না! ওকে গত কয়েকদিন ধরে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। নানাবাড়ি গিয়েছিল, সেখান থেকে একদম উধাও হয়ে গেছে।’

‘কোনো প্রেমিকের হাত ধরে পালায়নি তো?’
পদ্মজা চোখ পাকাল। বলল, ‘আপনার যত আজেবাজে চিন্তা! ওর প্রেমিকই ওকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। ওদের তো খুব শীঘ্রই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।’’
‘পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে?’’
‘দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুলিশ কেমন যেন গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে। তেমন কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। আপনার সাথে তো বড় বড় মন্ত্রী আর এমপিদের উঠাবসা। আপনি কি একটু তদবির করতে পারেন না? অন্তত পুলিশ যেন একটু সিরিয়াসলি তদন্ত করে।’ পদ্মজার চোখের কোণে জল টলমল করছে।
আমির স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কপাল কুঁচকে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সংশয়ের সুরে বলল, ‘এত বড় একটা মেয়ে, জনবহুল শহর থেকে হুট করে এভাবে গায়েব হয়ে গেল?’
‘কেউ কিডন্যাপ করলে? ধর্ষণ, খুন, গুম তো এখন প্রতিদিনের খবর হয়ে গেছে। আমি ভাবতেও পারছি না নিলুফারের সঙ্গে এমন কিছু…’ গলা আটকে গেল ওর।
‘আচ্ছা, আমি দেখছি। অস্থির হয়ো না।’

আমিরের কথায় পদ্মজার মনের ওপর চেপে বসা ভারী পাথরটা যেন কিছুটা হালকা হলো। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আমিরের শার্টের কলারটা ঠিক করে দিয়ে বলল, ‘এখন যান ফ্রেশ হয়ে আসুন। শরীর থেকে ঘামের গন্ধ বের হচ্ছে, এভাবে ঘাম নিয়ে বসে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে।’
‘যাচ্ছি। খাবার রেডি করো না আবার। আব্বা আসছিলেন, উনার সাথেই বাইরে এক জায়গায় খেয়ে নিয়েছি। তবে তুমি যদি চাও, এই অধম আরেকবার পেটপূর্তি করতে রাজি আছে।’
পদ্মজা বিষ্ময়ে থেমে গেল। বলল, ‘আব্বা শহরে এলেন অথচ বাসায় এলেন না, কেন?’
‘আগামীকাল আসবেন। আজ উনার কোন এক পুরোনো বন্ধুর বাসায় গেছেন। অনেকদিন পর দেখা তো, তাই সেখানেই রয়ে গেলেন।’

‘ছেলের বাড়ি দোরগোড়ায় রেখে উনি বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটাতে গেলেন? অদ্ভুত!’
‘উনার মর্জি! আসো তোমাকে খাইয়ে দিই।’
পদ্মজা আমিরের কোল থেকে সরে গিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। চলতে চলতেই বলল, ‘আজ রোজা ছিলাম, ইফতারি করে পেট ভরে গেছে। রাতে আর কিছু খাব না।’
আমির মনে করার চেষ্টা করল ক্যালেন্ডারের পাতাটা।
‘আজ কি সোমবার?’
পদ্মজা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল। সোমবার আর বৃহস্পতিবার প্রিয় নবী করীম (সা.) রোজা রাখতেন। পদ্মজা অতি নিষ্ঠার সাথে এই সুন্নত পালন করে আসছে এক বছর যাবৎ।
সে রান্নাঘরে ঢোকার আগে শাসনের সুরে বলল, ‘এসে যেন দেখি হাত-মুখ ধুয়ে বাবু হয়ে বসে আছেন।’
আমির সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, ‘নিলুফার ঠিক কোথা থেকে নিখোঁজ হয়েছে?’

পদ্মজা ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘নারায়ণগঞ্জ। ওর খালার বাসা থেকে।’’
শব্দটা কানে পড়তেই আমিরের পায়ের গতি একটু থমকে গেল! এত সামান্য যে পদ্মজা হয়তো খেয়াল করেনি। নারায়ণগঞ্জ! সপ্তাহখানেক আগেই তার ছেলেরা নারায়ণগঞ্জ থেকে দুটো মেয়েকে নিয়ে এসেছে! তাদের মধ্যে নিলুফার নেই তো?

আমিরের জন্য রাখা খাবারগুলো গরম করে যত্ন করে গুছিয়ে রাখল পদ্মজা। মনার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল, মনা ঘুমিয়ে পড়েছে। এই বাড়িতে কাজের মেয়ে হয়ে এসেছিল ও, কখন যে ঘরের মেয়ে হয়ে গেছে তা টেরই পায়নি। বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, যেভাবে কেবল আপনজনের ঘরেই ঘুমানো যায়। পদ্মজা হাত মুছতে মুছতে উপরে উঠে গেল।
আমির দরজার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে আছে, সামনে ছড়িয়ে আছে তার লিগ্যাল ব্যবসার কাগজপত্র। খুলনার পাইকগাছা আর সাতক্ষীরার ঘের থেকে আসা তাজা বাগদা আর গলদা চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করে সে পাঠাত ইউরোপ আর আমেরিকার বাজারে, যেখানে এই চিংড়ির দাম আর চাহিদা দুটোই ছিল আকাশছোঁয়া মর্যাদায়। আমদানিতেও সে ছিল সমান দূরদর্শী।

মানুষের ঘরে ঘুরো দুধের চাহিদা বাড়ছে দেখে ডেনমার্ক আর অস্ট্রেলিয়া থেকে আনত বড় বড় কন্টেইনার ভর্তি মিল্ক পাউডার, মালয়েশিয়া থেকে আসত পাম অয়েল, ব্রাজিল থেকে চিনি, আর ইলেকট্রনিক্সের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখে সিঙ্গাপুর আর জাপান থেকে আনত রঙিন টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার, আর ঘরোয়া বিলাসজাত নানা পণ্য। একদিকে এই বিস্তৃত সাম্রাজ্য, যেখানে পদ্মজা আসার পর থেকে সোনা ফলছে…অন্যদিকে অন্ধকারের জগৎ, যেখানে নারী পাচার আর অস্ত্র ব্যবসার শিকড় এতটাই গভীরে গেছে যে চাইলেই উপড়ে ফেলা যায় না। এতদিক সামলে আবার পদ্মজাকে সব অন্ধকার থেকে দূরে রাখার যে কঠিন যাত্রা…মাঝেমধ্যে ক্লান্ত লাগে। সব ছেড়ে পদ্মজাকে নিয়ে সন্ন্যাস নিতে ইচ্ছে করে। যেখানে শুধু তারা দুজন, শুধু আলো, শুধু শান্তি। কিন্তু তার তৈরি বিষবৃক্ষ সেটা কখনো হতে দেবে না৷ গিলে ফেলবে নিজের প্রভুকেই। সেও বোধহয় চায় না৷ তিলে তিলে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য চাইলেই ছাড়া যায় না৷

‘পিঠে কী হয়েছে?’
পদ্মজার আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর শুনে আমির চমকে ঘুরে তাকাল। পদ্মজা ততক্ষণে দরজা থেকে ছিটকে সরে এসেছে তার দিকে।
আমিরের কাঁধের নিচে একটা টাটকা ক্ষত। মনে হচ্ছে, কেউ ধারালো কিছু দিয়ে আড়াআড়িভাবে কেটে দিয়েছে। পদ্মজার বুকটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরল। ভেতরটা কেমন অসাড় হয়ে আসছে।
‘কথা বলছেন না কেন? কী করে হয়েছে এটা?’
‘শান্ত হও। বড় কিছু না।’
‘বড় কিছু না মানে? এটাকে বড় না বললে বড় কোনটাকে বলবেন? আপনি মানুষ? এত বড় ক্ষত নিয়েও স্বাভাবিক ছিলেন, টুঁ শব্দটিও করলেন না!’
‘ওষুধ লাগিয়েছিলাম। ঠিক হয়ে যাবে।’
‘কী ওষুধ লাগিয়েছেন যে দেখাই যাচ্ছে না? রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে।’

পদ্মজা আর কথা বাড়াল না। কথায় সময় নষ্ট করার মেয়ে সে নয়। একটা ছোট কৌটা আর পরিষ্কার সুতি কাপড় বের করে আনল। তখনকার দিনে ঘরোয়া দাওয়াইয়ের চল ছিল ঘরে ঘরে। রাসায়নিকের চেয়ে প্রকৃতির দাওয়াইয়ে বিশ্বাস ছিল মানুষের বেশি। একটা ছোট পিরিচে সে তৈরি করল কাঁচা হলুদের রস আর খাঁটি নিম তেলের মিশ্রণ। তারপর আলতো হাতে শুকনো রক্ত পরিষ্কার করতে করতে বলল, ‘কার সঙ্গে মারামারি করেছেন?’
‘মারামারি করেছি কেন মনে হচ্ছে?’
‘এমনি মনে হচ্ছে।’
আমির একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘রিদওয়ান এসেছিল।’
এটুকুই যথেষ্ট। পদ্মজা যা বোঝার বুঝে গেছে। এই দুজন সামনা-সামনি হলে যা হওয়ার কথা, তা-ই হয়েছে, যা সবসময় হয়। সে কথা না বাড়িয়ে হলুদের প্রলেপটা আলতো করে লাগাতে শুরু করল পিঠে। আমির একটু কেঁপে উঠল, পশম খাড়া হয়ে গেল গায়ের।

পদ্মজার চোখ টলমল করে উঠল। বলল, ‘খুব জ্বলছে?’
আমির হাসল। কী করে সে বোঝাবে, ক্ষতের জ্বলুনিটা পদ্মজার শীতল হাতের স্পর্শে উল্টো মিলিয়ে যাচ্ছে!
বারান্দা থেকে বাতাস আসছে৷ শীতের শেষ বাতাস, পর্দাগুলো উড়ছে অলসভাবে।
পদ্মজা প্রলেপ লাগাতে লাগাতে বলল, ‘ওই লোককে এড়িয়ে চলতে পারেন না?’
‘পারলে কি আর লাগতাম? আমি কি যেচে মারামারি করার মানুষ?’
আমিরের পিঠের পেছনে পদ্মজা, তবুও সে টের পাচ্ছে পদ্মজা কাঁদছে। আর শুধুমাত্র এই কারণেই আমির আর নিজে মারপিটে নামে না। লোক পাঠায়, নিজেকে আড়ালে রাখে, যতটা সম্ভব নিরাপদ থাকার চেষ্টা করে। এই শরীর তার নিজের নয়, এই শরীর পদ্মজার। শুধুই পদ্মজার। তাইতো সে ব্যথা পেলে পদ্মজা কাঁদে!

পদ্মজা হঠাৎ ঝুঁকে আমিরের ক্ষতস্থানে একটা আলতো চুমু এঁকে দিল। সেই স্পর্শ পাওয়ামাত্র আমিরের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল, মিষ্টি স্রোত নেমে গেল। লাজুক পদ্মজাও জেনে গেছে প্রেমিকের ক্ষতের ঔষধ কোনো হাকিম বা বৈদ্যের কাছে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় প্রেমিকার ঠোঁটে!
আমির হাসল। গলা নামিয়ে বলল, ‘ভালো লেগেছে।’
লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল পদ্মজার মুখ। সে উঠতে যাবে, আমির পেছন না ফিরেই বলল, ‘আরেকবার দেবে?’
তারপর ঘুরে তাকাল।
সেই দৃষ্টি এতটাই হৃদয়হরণকারী, এতটাই ব্যাকুল অনুনয়ে ভরা যে মনে হলো সারাজীবনের সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত তৃষ্ণা, সমস্ত আকুলতা এসে ওই দৃষ্টিতে গলে গেছে। যে দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে ‘না’ বলার ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। পদ্মজা হার মানল, আবার পালঙ্কে বসল। আলতো করে আরেকটু চুমু এঁকে দিল ক্ষতস্থানে।
আমির আবার বলল, ‘আর একবার।’

পদ্মজা আবার দিল। এবার একটু বেশি সময় নিয়ে।
আমির এবার চোখ বুজল। প্রাণভরা একটা নিঃশ্বাস নিল। স্বপ্নের ভেতর থেকে কথা বলছে এমনভাবে বলল, ‘শেষবার।’
পদ্মজা এবার আর একটা দুটো নয়, পরপর কয়েকটা চুমু দিল। তারপর উঠতে গেল, এবার সত্যিই চলে যাবে বলে ঠিক করল। এক পা বাড়াতেই আমির বিদ্যুৎবেগে ঘুরে উঠে দাঁড়াল, পেছন থেকে দু’হাতে পদ্মজাকে জড়িয়ে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল।

ভাঙা চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ছিল আমিরের প্রশস্ত বুকে, পদ্মজার মুখে।
আমির এক হাতে পদ্মজার পেট জড়িয়ে রেখে অন্য হাতে চুল তুলে নিল, মাথাটা আলতো করে নত করে মুখ ডুবিয়ে দিল রেশমি কালো, ঘন চুলের গভীরে। চোখ বুজল। সময় নিয়ে ঘ্রাণ নিল।
এই ঘ্রাণ নেওয়াই আমিরের রাতের প্রার্থনা। এখানে কোনো শব্দ নেই, কোনো আয়াতও নেই…শুধু আছে একটু উষ্ণতা, একটু সুবাস, আর বুকের ভেতরে চুপচাপ বলে ওঠা, “শুকরিয়া। হাজার শুকরিয়া।”
পদ্মজা জোরহীন গলায় বলল, ‘ছাড়ুন। আমার কাজ আছে।’
আমির চুলে নাক ডুবিয়ে রেখেই বলল, ‘এই রাতেরবেলা তোমার কী এমন কাজ?’
‘আছে, আছে। পরীক্ষা আছে, পড়তে হবে, সময় নষ্ট করা যাবে না।’
কথাগুলো বলল বটে, কিন্তু ঠোঁটের কোণ মানল না। সেখানে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। সে জানে, আমিরের কাছ থেকে এত সহজে ছাড়া মেলে না। কখনো মেলেনি। সে শিকারি, দুর্দান্ত এক শিকারি। যে একবার শিকার ধরলে ছাড়ে না, বরং এমনভাবে আঁকড়ে রাখে যে শিকারও ভুলে যায় পালাতে চেয়েছিল কিনা।
আমির বলল, ‘ঘড়ির কাঁটা না হয় আজ রাতটুকু আমার জন্য একটু বিশ্রাম নিক।’
পদ্মজা আর কথা বলল না। আমিরের বাহুবন্ধনে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিল। আমিরের সর্বগ্রাসী চুমু কবুল করে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বাহুবন্ধনে।

আমির ভালোবাসে শিল্পীর মতো। তাড়াহুড়ো নেই, অধৈর্য নেই। মায়া নিয়ে, যত্ন নিয়ে ভালোবাসে।
পদ্মজা একসময় চোখ খুলল পিটপিট করে। চোখের সামনে চাঁদ দেখতে পেল। তারা কখন বারান্দার দরজা অবধি চলে এসেছে টেরই পেল না। পা দুটো আমিরের পায়ের উপর, পিঠ আমিরের বুকে। চাঁদের আলো তাদের দুজনকে একসঙ্গে ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
পদ্মজা হঠাৎ আবেগি হয়ে বলল, ‘যদি নিলুফারের মতো আমিও হারিয়ে যাই?’
‘মহাবিশ্বের সব আলো নিভিয়ে দেব, নক্ষত্রদেরও বাধ্য করব তোমাকে খুঁজে আনতে।’
‘তাও যদি আর ফিরে না আসি?’
‘সময়কে থামিয়ে দেব৷ দরজায় পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত।’

‘যদি নিজের ইচ্ছেতে ছেড়ে যাই?’
‘ছায়া হয়ে সঙ্গে থাকব।’
‘যদি কোনোদিন ঘৃণা করি?’
‘সেই ঘৃণাটুকুও আতরের মতো গায়ে মেখে নেব।’
‘যদি আমাদের মাঝে বিশাল কোনো দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়?
‘আমি সেই দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব, না হয় নিজেই সেই দেয়ালের ইট হয়ে তোমাকে আগলে রাখব।’
‘আর..আর যদি মরে যাই?’

আমির পদ্মজার কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনল। একদম কানের লতি ছুঁয়ে ফেলল তার উষ্ণ নিঃশ্বাস। বলল, ‘মস্ত বড় এক দিঘির পাড়ে পাশাপাশি দুটো কবর হবে। আকাশ থেকে জ্যোৎস্না নামলে সেই দুই কবর একসাথে স্নান করবে, শ্রাবণের বৃষ্টিতে দুজন একসাথে ভিজবে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে আমি তখন তোমার কানে কানে বলব,’দেখো পদ্মবতী, আমাদের বিচ্ছেদ ঘটানোর সাধ্য খোদ নিয়তিরও নেই।’
পদ্মজার বড্ড ভালো লাগছে৷ বড্ড ভালো। নারী কথাতেই সুখের অথৈ সাগরে ডুবে যেতে পারে। আর এই মানুষটা জানে ঠিক কোন কথাটা বললে সে ডুবে যাবে, কোন শব্দটা তার হৃদয়ের কোন দরজা খুলে দেবে।
‘এত কথা কোথায় শিখলেন?’
‘যখন তোমাকে দেখলাম। যখন তোমার প্রেমে পড়লাম।’
‘এতো কেন ভালোবাসেন?’
‘সেই উত্তর আমার কাছে নেই।’
‘আমার মাঝে মধ্যে খুব ইচ্ছে করে আপনার ভালোবাসার গভীরতা মেপে দেখতে।’
আমির এবার মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াল। শক্ত করল হাতের বাঁধন। গর্ব নিয়ে বলল, ‘অতল সাগরের কূল পেলেও আমিরের ভালবাসার তল পাবে না, পদ্মবতী।’
‘তবে আপনিই বলুন, ঠিক কতটা ভালোবাসেন?’

আমির আর একবার দীর্ঘ শ্বাস টেনে নিল, নাক পদ্মজার ঘাড়ে নামিয়ে আনল, চিরচেনা সুবাস বুকভরে টেনে নিল, যে সুবাস তার কাছে আদিম নেশার মতো। এই নেশা মস্তিষ্ককে অবশ করে দেয়, হৃদপিণ্ডকে সজাগ করে তোলে, এই নেশা তাকে প্রতিদিন নতুন করে পাগল বানায়, প্রতিদিন নতুন করে পথহারা করে দেয়। তারপর ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল, ‘যতটা ভালোবাসলে কেউ কারোর জন্য মরে যেতে পারে। যতটা ব্যাকুল হলে স্রষ্টার কাছে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়া যায়। আমি ঠিক ততটাই পথভ্রষ্ট তোমার মায়ায়।’
আবেগের প্রবল জোয়ারে পদ্মজা নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাল। এক লহমায় ঘুরে দাঁড়িয়ে চট করে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়াল সে। দুহাতে আমিরকে লতাগুচ্ছের মতো জড়িয়ে ধরল। তার উত্তপ্ত বক্ষপিঞ্জরে মুখ লুকিয়ে ফেলল। সেখানটায় আমিরের শরীরের পৌরুষদীপ্ত ঘ্রাণ আরেক মায়াবী মাদকতা তৈরি করে রেখেছে।
খোলা বুকে মুখ ঘষে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আমিও আপনাকে ভালোবাসি৷ খুব ভালোবাসি।’
আমির মুহূর্তের মধ্যে এক হ্যাঁচকা টানে পদ্মজাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। ওর পেশীবহুল হাতের বাঁধন দুর্ভেদ্য দেয়ালের মতো। ধীর পদক্ষেপে সে গিয়ে দাঁড়াল খোলা বারান্দায়। মাথার ওপর রুপালি চাঁদ তখন পূর্ণ যৌবন নিয়ে আকাশ আলো করে হাসছে।

আমির আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তারপর গলা চড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, ‘দেখ চাঁদ, চেয়ে দেখ…তোর তো নিজের কোনো আলো নেই, ধার করা আলো নিয়ে বড়াই করিস। তাও আবার বুকে একরাশ কলঙ্ক নিয়ে বসে আছিস! আর এদিকে দেখ, আমার বুকের দিকে চেয়ে দেখ। একদম নিখুঁত, একটুও খুঁত নেই, পৃথিবীর সমস্ত পূর্ণিমাকে লজ্জা দেওয়ার মতো এই নিখুঁত নারী আমার মতো এক বুনো শ্যামবর্ণকে ভালোবাসে! তুই তো সারারাত একা পুড়ে খাক হোস, তোর কি হিংসে হচ্ছে না রে? যা, যাহ মেঘের আড়ালে গিয়ে মুখ লুকা। তোর চেয়েও অনেক বেশি উজ্জ্বল চাঁদ আমার বাহুতে বন্দি, তোকে আর কী প্রয়োজন?’

আমিরের কথা শুনে পদ্মজা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। আমিরের গলায় মুখ লুকিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠল। হাসল আমিরও।
আকাশে, বাতাসে কী আনন্দ! কী আনন্দ!
যেন পৃথিবীর সমস্ত সুখ আজ রাতে ডানা মেলে উড়ে এসে নেমে পড়েছে তাদের চরণে। জমা হয়েছে এই বারান্দায়, এই মুহূর্তে, এই দুটো মানুষের নিঃশ্বাসের ভেতরে।

আমির হাওলাদার পর্ব ২