আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি
বহু বছর আগে এক দল টেরোরিস্টের আগমন ঘটেছিল সুদূর লন্ডন থেকে বাংলাদেশে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কী তা গোয়েন্দা সংস্থা সঠিকভাবে তুলে ধরেনি কোথাও। বা সেই দলটিকে দেশ থেকে আদৌ চিরতরে নির্মূল করা গেছে কি না তাও জনসাধারণের কাছে পরিষ্কার না। তবে গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী আশ্বস্ত করেছিল সন্ত্রাস দমনে তারা যথেষ্ট তৎপর এবং তাতে তারা জয়ীও হয়েছে। সকলে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে।
ওই দলটির মধ্যে ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি চরিত্র আয়মান ও আলিয়া, জমজ দু’বোন। যারা শুধু দেখতেই অবিকল একইরকম ছিল না। ছিল কখনও একে অপরের ঢাল, একে অপরের আত্মা, আবার কখনও একে অপরের চরম শত্রুও। সন্ত্রাসবাদ দুনিয়াতে ওদের পরিচয় ছিল কনট্র্যাক্ট কিলারস৷ জন্মসূত্রে বাংলাদেশী হয়েও তারা দেশদ্রোহীদের দলে নাম লেখায় লন্ডনে বসবাসকালীন। এর থেকেও চাঞ্চল্যকর গল্প হলো, গোয়েন্দা সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জায়িন মাহতাব; যার সাহায্যেই ওই টেরোরিস্ট পুরো দলটিকে ধরতে না পারলেও দেশ থেকে তাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। আবার সেই মানুষটিই টেরোরিস্ট অথবা কনট্র্যাক্ট কিলার আয়মানের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এবং যৌথভাবে দু’জন সমাজবিরোধীদের জগতে অবৈধ নানান কাজে লিপ্ত হয়৷ এক সময় সারা পৃথিবীর কাছে তারা দুজন দাগী অপরাধী হিসেবেও পরিচিতি পায়। তাদের দুজনকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে আজও শিকারী তিমি বা Killer whales বলে অভিহিত করে থাকে সকলে। বিগত একুশ বছর ধরে জায়িন ও আয়মান নিখোঁজ সারা পৃথিবীর কাছে। আজও তারা দুজন যদি জীবিত থাকে তবেও সকল দেশের প্রশাসন বিভাগের কাছে ‘Most wanted criminal’।
দীর্ঘ বিশ বছর পর এই জায়িন ও আয়মান, দুজন অপরাধীর নানা ধরনের রসায়ন প্রশাসন বিভাগে চর্চা হচ্ছে আজ-কাল। এর কারণ, দেশে পুনরায় সেরকমই একটি টেরোরিস্ট দল অবস্থান করছে বলে ধারণা করছে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ উভয়ই। তবে ওদের ধ্বংসযজ্ঞের নমুনা এখন অবধি না মিললেও গোয়েন্দা বিভাগ গোপনসূত্রে তথ্য সংগ্রহ করেছে, পূর্বের চেয়েও আরও শক্তিশালী এবং ভয়ানক একটি সন্ত্রাস দলের আগমন ঘটেছে দেশে। যারা দেশের আনাচে-কানাচে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যে, তাদের চিহ্নিত করা ভীষণ মুশকিল এবং দমন করাও হবে বেশ কঠিন। এবার তাদের পরিকল্পনাও খুবই জটিল। কোথায় কীভাবে আক্রমণ হবে বা ভিন্ন কোনোভাবে দেশের ক্ষতি সাধন করবে কি না তারা, এ নিয়ে সতর্ক থাকতে এবং অতি দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকার থেকে প্রশাসন বিভাগ অত্যন্ত চাপে আছে। দিনে দিনে এদের বিস্তার এবং আধিপত্য শুধু বাড়তেই থাকবে বলে আশঙ্কা করেছে প্রশাসন।
প্রতিবেদনটা পড়া শেষে নিহাদ ল্যাপটপটা ঠাস আওয়াজে বন্ধ করে। একই কথা, একই ঘটনা পড়তে পড়তে সে প্রচণ্ড বিরক্ত! চোখের রিমলেস চশমাটা খুলে চোখজোড়া ডলতে ডলতে স্বগতোক্তি করে, ‘এক জিনিস ঘুরেফিরে বললে কি আর পড়তে মজা লাগে? নতুন গল্প আজও কোনো রিপোর্টার, সাংবাদিক, পুলিশ, গোয়েন্দা, কেউই জানাতে পারল না। শেম অন ডিপার্টমেন্ট!’
বালিশের পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিয়ে সময়টা দেখল রাত দু’টো বেজে একুশ মিনিট। কোলের ওপর থেকে ল্যাপটপটা সরিয়ে বিছানাতে রেখে নেমে পড়ল সে। পায়ে স্লিপার ঢুকিয়ে, আলস্যতায় দু’হাত টানটান করে দু’দিকে ছড়িয়ে, বিড়বিড় করে আবারও স্বগতোক্তি করল, ‘চলো ছদ্মবেশী নিহাদ, জ্যোতি ফোতি না কিরণ মরণকে একটু স্মরণ করে আসি। ওহো…স্মরণটা যেন আবার কে? জ্যোতি ফোতির বড়ো বোন, রাইট?’ বলে নিজের ওপর নিজেই হেসে ওঠে।
ছাদের দরজাটাই আগে তালা ঝুলিয়ে রাখতেন ঝুমুর। নিহাদের জন্যই আজ সে কাজটা করা হয়নি৷ ঘুটঘুটে আঁধারে সিঁড়ি অতিক্রম করে সে কিরণের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে৷ আজ রাতে ঝুমুর বাসাতে ফিরতে পারেননি। সুহাইলের বোনের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। চৌত্রিশ বছর বয়সে সে মা হতে পেরেছে বহু চেষ্টার পর। সন্তান জন্মদান তার জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। নানারকম ক্রাইসিস ছিল তার প্রেগন্যান্সিতে৷ তবুও একটি সন্তান লাভের আশায় ঝুঁকি নিতে পিছপা হয়নি সে।
বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিহাদ বিরক্তি নিয়ে মাথা চুলকে কাউকে উদ্দেশ্য করে গালি ছুঁড়ে বিড়বিড় করল, ‘এখন এই পুচকে মেয়ের জন্য না কি চোরের মতো বেলকনিতে বেঁয়ে উঠতে হবে! অসহ্য!’
ফোনটা মিউট করে সে অতি সাবধানতায় বাসার নিচে নেমে আসে। সামনের বাড়ির বদমাশ ছেলেটার আবার নজরে না পড়ে সে ভয়টাও কাজ করছে। সৌরভ ছেলেটা বড্ড চতুর। গোল গোল চোখের উজ্জ্বল চাউনি খুবই তীক্ষ্ণ ওর বেলায়৷ একবার এই ছেলের চোখে সন্দেহভাজন হলে ওর যে কাজে এখানে আসা তা তো সম্পন্ন হবেই না। উলটে সুহাইল কাকুকেও সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
কিরণের ঘরের বেলকনি বরাবরই সৌরভের শোবার ঘর। জানালাটা হাট করে রাখা সে ঘরের। আল্লাহই জানে পাঁজি ছেলেটা ঘুমিয়েছে কি না! এখানে আসার আগেই নিহাদ সবার ব্যাপারেই খোঁজ নিয়েছিল। তখনই জানতে পেরেছে স্মরণের সঙ্গে সৌরভের খুবই কাছের সম্পর্ক। তবে সেই কাছের সম্পর্কটা কেমন কাছের তা ঠিক পরিষ্কার জানা যায়নি৷ হতে পারে বন্ধুত্বপূর্ণ, কিংবা ছোটো ভাই আর বড়ো বোন ধরনের, আবার এও হতে পারে সৌরভ পছন্দ করে স্মরণকে। তাই নিহাদ কোনোভাবে ধরা পড়লে কিরণ বা ঝুমুর স্মরণকে এ খবরটা না জানালেও সৌরভ ঠিকই জানাবে তাকে। আর তখন স্মরণ এখানে চলে আসবেই। কিন্তু হুকুম আছে স্মরণের অনুপস্থিতিতেই কাজগুলো করতে হবে নিহাদকে৷
দোতলার বেলকনিতে পৌঁছতে খুব বেশি কষ্ট করতে হলো না নিহাদকে। তার কর্মজীবনে এমন চোরের মতো কাজবাজ বহুবারই করতে হয়েছে। এমন চোরামির জন্য ওকে প্রশিক্ষণও নিতে হয়েছে বটে। এখন কথা হচ্ছে কিরণ বেলকনির দরজাটা না আটকে ঘুমালেই হলো। নয়ত দেওয়াল বেঁয়ে বেঁয়ে এত কষ্ট করে বেলকনিতে আসাটাই মাঠে মারা যাবে৷
রেলিং ধরে ঝুলে থাকা অবস্থা থেকে উপরে উঠে আসার সময় অন্ধকারে না দেখার ফলে হঠাৎ টেবিলের ওপর হুড়মুড় করে পড়ল ও। তাতে শব্দ যতটুকু হয়েছে তাই ঢের ওর ধরে পড়ে যাবার জন্য। ঘাপটি মেরে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তাই রেলিং ঘেঁষে। নাহ, কারও জেগে ওঠার আভাস পেল না। সাবধানতা অবলম্বনে এই গরমের কষ্ট গিলে মানকি টুপিটা পরতেই হলো এবার৷ এরপর দরজার নব্ ধরে ঘুরাতেই দরজাটা খুলে গেল। মনেমনে পুচকে কিরণকে বিশাল এক চুমু দিলো নিহাদ। তবে বিপদ বাড়ল আবারও৷ ঘরে কিচ্ছু দেখার জো নেই। এইটুকু বাচ্চা মেয়েটার কি অন্ধকার ঘরে ঘুমাতে ভয় লাগে না? বাহ্, পুরো পরিবারই মনে হচ্ছে সাহসী পালোয়ান ধরনের। প্রশংসাযোগ্য! যদিও ঘর অন্ধকার করে ঘুমানোটা অতটাও সাহসীকতার পরিচয় দেয় না। ওই যে সন্ধ্যায় কিরণের কথার বাক পটুতা দেখল সে! তাতেই আন্দাজ করে নিয়েছে বেশ স্মার্ট আছে মেয়েটা।
আঁধার ঘরে কোথায় কী আছে তা দেখা না গেলেও নিহাদ চোখ বুজে মনে করল গত মাসেই দেখা এই ফ্ল্যাটের ভেতরের প্রতিটি চিত্র। ঝুমুরের ঘরে জানালাটার থাই ভেঙে যাওয়ায় জানালা মেরামত করতে যে স্পাই ছদ্মবেশ ধরে মিস্ত্রি সেজে এসেছিল, তার দৌলতেই ঘরের প্রতিটি কোণার ভিডিয়ো রেকর্ড দেখতে পেয়েছিল সে। এই বেলকনির দরজা বরাবরই কিরণের ঘরে ঢোকার মূল দরজা৷ নাক বরাবর হেঁটে সত্যিই সামনে দরজা মিলল। ঘর থেকে বেরিয়েই বসার ঘর। নিহাদ কিরণের ঘর থেকে বের হওয়ার পর দরজাটা এপাশ থেকে লক করে দিতে ভুলল না৷ ঠিক হাতের ডানেই একটু এগিয়ে ঝুমুরের শোবার ঘরটা। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে চলে এলো ঝুমুরের ঘরে৷ আলমারির চাবির গোছাটা খোঁজার পালা এবার৷ সাধারণত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আলমারিতেই থাকে৷ তাই শুরুতে নিহাদ আলমারিটাই টার্গেট করল। তবে চিন্তার বিষয় হলো চাবির গোছা ঝুমুর সঙ্গে করে নিয়ে গেছে কি না! এই নারী দেখতে যতটা সরল, মূলত সে ততটাই চালাক৷ অবশ্য একে চালাক হতে বাধ্য করেছে তার মরহুম গোয়েন্দা স্বামী। না হলে নিজে সুন্দরী এবং তার চেয়েও বেশি সুন্দরী দুই কন্যা নিয়ে এতগুলো বছর একা একা নিরাপদে টিকে থাকা চারটেখানি কথা না। উপরন্তু আবার সুহাইল শেখের সুনজর ছিল এ পরিবারের ওপর। কিন্তু আফসোস! পছন্দের এই চাচা মানুষটিকে ভবিষ্যতে একটা ধাক্কা খেতেই হবে। কে জানে আগামীতেও ঝুমুরকে তার বিবাহ করা সম্ভব হবে কি না!
বিচিত্ররকম চিন্তাগুলো করতে করতেই নিহাদ চাবির গোছা খুঁজতে থাকল৷ অবশেষে সেটা অনুমানের ভিত্তিতে পেয়েও গেল ড্রেসিং টেবিলের একদম নিচের ড্রয়ারে। সে একদমই তাড়াহুড়ো করছে না। কারণ, তড়িঘড়ি কাজে সব সময় ফাঁক কিংবা কোনো ভুল থেকেই যায়৷ নানান পরিকল্পনা করেই সে এসেছে আজ।
আলমারির চাবিটা সব থেকে লম্বাটাই হয়ত। লকে চাবিটা দিতেই অকস্মাৎ মাঝ পিঠে শক্ত কিছু একটা ঠেকল বোধ হয়। নিহাদের অভিজ্ঞ মন সহসাই বুঝে গেল সে ধরা পড়ে গেছে। হ্যাঁ, আর ওর পিঠের মাঝে এই মুহূর্তে হতবন্দুক তাক করা। বাহ্! এত সচেতন! বেশ চতুর! খুব বেশি ঘাবড়ে না গেলেও নিহাদ সমর্পণের ভঙ্গিতে দু হাত উঁচু করে ফেলল চকিতেই। পেছনের নারী কণ্ঠ থেকে তখন আদেশ এলো, ‘টেক অফ য়্যোর মানকি হ্যাট অ্যান্ড গিভ মি দ্য ফোন।’ বলেই ওর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলো সে।
-‘ওকে, দিচ্ছি।’ কণ্ঠে মেকি গম্ভীর সুর ধরে বলল নিহাদ।
ফোনের আলোয় সে আড়চোখে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় দেখতে পেল পেছনের নারীটি কিরণ ছাড়া অন্য কেউ নয়। স্বস্তি পেল খুব। দেরি না করে ফোনটা তুলে দিলো কিরণের হাতে। আঁধারে কিরণের মুখের অভিব্যক্তি খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু তার রাশভারী গলায় বোঝা যায়, একদম ইগল চোখেই নিহাদের দিকে চেয়ে পিস্তল তাক করে আছে সে। বেজায় অবাক নিহাদ! এই আঠারো বছরের বাচ্চা মেয়েটা একদম প্রফেশনাল স্টাইলে পিস্তল তাক করে আছে কী করে? নিশ্চয়ই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব? রেজা হক মারা গেছে বহু বছর হলো। তবে ডক্টর ঝুমুর? এত অভিজ্ঞ তিনি! হতেই পারে। অবাক হওয়ার কিছু নেই। মেয়েদের সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব তো রেজা হক তার হাতেই তুলে দিয়ে গেছেন।
কিরণ ফোনটা হাতে নিতেই হঠাৎ মেসেজ টোন হলো। স্ক্রিনে একটা বিদেশী নাম্বার ভেসে উঠল। সে নাম্বার নিচে বার্তা এসেছে, ‘Did you get?’
মেসেজটাই চোখ বুলাতেই কিরণের ভ্রদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ পড়ল। ওদের ঘরে কোনো স্পাই ঢুকেছে তবে! কীসের খোঁজে? নিহাদের দিক থেকে একটু পলের জন্য মনোযোগ সরে গেল ওর৷ নিহাদও সেটুকু সময়ের সুযোগটা নিতে ভুলল না। ওর ধূর্ত চাউনি আয়নায় দেখা কিরণের মতিগতিকেই লক্ষ রাখছিল যে। চোখের পলকেই যেন পেছন ফিরে কিরণের হালকা ওজনের দেহটাকে নিজের দু’হাতের মাঝে কব্জা করে নিলো সে। পিস্তল ধরে রাখা ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরতেই প্রচণ্ড ব্যথায় ককিয়ে উঠে হাতের মুঠো শিথিল হয়ে এলো কিরণের। পিস্তলটা কেঁড়ে নিতে সময় নিলো না তখন নিহাদ। মেকি গম্ভীর কণ্ঠে নিহাদ বুকের সাথে কিরণকে পিঠমোড়া করে জাপটে ধরে শুধাল, ‘বাচ্চাটা, তুমি ঘর থেকে বের হলে কী করে?’
কিরণ জবাবের পরিবর্তে চেঁচিয়ে উঠতেই নিহাদ দ্রুত ওর মুখ চেপে ধরল। আর ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। পকেট থেকে ক্লোরোফর্ম মেশানে রুমালটা বের করে চেপে ধরল কিরণের নাকে। জ্ঞান হারানোর আগ মুহূর্তে কিরণ শুনতে পেল, ‘একটু দুষ্টুমি করতেই হলো, বাচ্চা।’
বেলকনিতে তখন ধপাস করে কিছু পড়ার আওয়াজ পেয়েই চমকে উঠেছিল কিরণ। যে রাতে ঝুমুর বাড়িতে থাকেন না সে রাতে কিরণ রাতভর ফোনে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়, মুভি দেখে, ড্রামা দেখে। আজও তাই-ই করছিল সে। তার সাথে অবশ্য শিউলিও ঘুমিয়েছিল। আওয়াজটা পেয়েই কিরণ প্রথমে ভয় পেলেও সাহস করে ঘরের ডিম লাইটটা বন্ধ করে দেয়, তারপর শিউলিকে কাঁথা দিয়ে ঢেকে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। চুরি করার মতো ওর ঘরে তেমন কিছুই নেই। তাই ও ধারণা করেছিল চোর ওর ঘর খোঁজাখুঁজি করে ড্রয়িং রুমেই আসবে। তারপর মায়ের ঘরে ঢুকবে। হয়েছেও তাই। তখন হাতে রড নিয়েই তৈরি হয়েছিল আর লুকিয়ে ছিল রান্নাঘরে। কিন্তু চোরের বেশভূষা দেখে কেন যেনই ওর মনে হলো পুরুষটা কোনো ছিঁচকে চোর নয়। তার চেয়েও বড়ো কিছু হবে। শুধু রড নিয়ে তার সঙ্গে যদি পেরে না ওঠে! তাই আরও সাহস করে স্মরণের ঘর থেকে লাইসেন্স করা পিস্তলটা খুঁজে নিয়ে বিড়াল পায়ে এসে দাঁড়ায় মায়ের ঘরে। চুপটি করে দরজার পিছে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করে চোরের কাজ। যখনই আলমারিটা খুলতে যায় নিহাদ তখনই নিজের চূড়ান্ত সাহসিকতার পরিচয়টা দেয় কিরণ।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে কয়েকটা গালি উপহার করল নিহাদ। কিরণকে এতটা সহজভাবে নেওয়া উচিত হয়নি ওর। তখনই ওর ঘরটাই সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে তারপর লক করা উচিত ছিল। ঝুমুরের বিছানার মাঝে অচেতন কিরণকে একবার দেখে পুনরায় কাজে লেগে পড়ল সে দরজা আটকে। শিউলি ওদিকে মরার মতো ঘুমাচ্ছে। ভুল করেছে কিরণও৷ শিউলিকে জাগিয়ে তাকেও সতর্ক থাকতে বলে আসা উচিত ছিল।
মাহতাব শেখ তার ছেলে, ছেলেবউ আর নাতি-নাতনিদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের হুকুম রেখেছেন কড়াকড়ি। সেই থেকেই তাওসিফের সকল গুনের মধ্যে সব থেকে প্রশংসাযোগ্য হলো মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্তই নামাজ আদায়। কিন্তু গতকালের ঝক্কি সামলে উঠতে একটু কষ্ট হচ্ছে তার। তাই আজ আর ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়া হয়নি। নামাজ শেষে কড়া এক মগ লাল চা বানিয়ে ছাদে আসলো। আসার পর থেকেই পূর্ণ মনোযোগ গিয়ে আটকাচ্ছে চিলেকোঠার ওই ঘরটায়। যেখানে তার জীবনে নতুন প্রবেশ করা মানুষটির বসবাস৷ হয়ত সে ঘুমাচ্ছে, নয়ত কাঁদছে। নামাজ পড়তে উঠলে তাকেও ছাদেই দেখা যেত এই সময়। তামান্না কতটুকু খেয়াল রাখতে পারছে কে জানে! দীধিতি বোকার মতো কোনো অঘটন না ঘটালেই হয়।
কী থেকে কী ঘটে গেল গতকাল ওদের জীবনে! ওই তিনটি মানুষ কারা ছিল তা জানা যায়নি এখনও৷ পুলিশ যখন ওই ফুডকোর্টে এসে সিসিটিভি রেকর্ড দেখে আর তাওসিফের পরিচয় জানতে পারে, তারপর আর একটি মুহূর্তও ব্যয় করেনি তারা। জাকির শেখ ও মাহতাব শেখের কাছে খবর পৌঁছে দেয়। পুলিশ তাদের টিম নিয়ে তাওসিফ আর দীধিতিকে যখন উদ্ধার করে তখন সন্ধ্যা। জাকির শেখ এসে তাওসিফের পাশে দীধিতিকে দেখেই রাগে দিশাহারা হয়ে যান। কোনো বিচার বিবেচনা ছাড়ায় তিনি রেগেমেগে ওকে শুট করতে উদ্যত হন৷ একবার এই মেয়েটির জন্যই নাওফিলের কত বড়ো ক্ষতি হলো। আবার সে তাওসিফকে এখন শিকার বানিয়েছে! কোনো শত্রুপক্ষেরই লোক হবে দীধিতি৷ এটাই জাকির শেখ বিশ্বাস করেন৷ প্রথমবার নাওফিলের জন্য কিছু করতে পারেননি ওকে৷ দ্বিতীয়বার যখন সুযোগ পেলেন তখন তাওসিফ বাধা হয়ে দাঁড়াল৷ পিস্তলটা কেঁড়ে নিয়ে অনুরোধ গলায় তাওসিফ বলেছিল, ‘বড়ো কাকু প্লিজ, ওকে কিছু করবেন না। ওর কোনো দোষ নেই৷ আমাকে সেইফ করতে গিয়েই ও বিপদে পড়েছে। আর আপনি দেখছেন না ওর হাল! ওর সঙ্গে খুব খারাপ কিছু হয়েছে।’
দীধিতির হাল সে সময় সত্যিই বেহাল ছিল। মহিলা কনস্টেবল ওকে যতটা সম্ভব ছেঁড়া কাপড়ের ফাঁক গলে নগ্ন শরীরটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করছিল। দীধিতিকে লাগছিল তখন নির্জীব, নিষ্ক্রিয়। ওর করুণ পরিণতি বুঝতে কারোরই বাকি ছিল না। কিন্তু জাকির শেখকে দমানো তবুও মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল৷ তিনি গলা ফাটিয়ে বলে যাচ্ছিলেন, ‘জাহান্নামে যাক ও! ও নিশ্চয়ই একটা ক্রিমিনাল আর ধড়িবাজ মেয়ে! ওকে আমি আলাদাভাবে পানিসড করব। তাহলেই সত্যটা বেরিয়ে আসবে। ওর শেখ পরিবারের ছেলেদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্য আছে, তাওসিফ। আমার হাতে ওকে ছেড়ে দে।’
এমন হুমকি-ধমকির পর তিনি তেড়েও গিয়েছিলেন দীধিতিকে মারতে। তাকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। কিন্তু তাওসিফ এমনিতেই নিগূঢ় অপরাধবোধে ভুগছিল। দীধিতি তো ওর জন্যই আততায়ীদের চোখে পড়ে। নয়ত কি আজ এত খারাপ কিছু হত মেয়েটার সাথে? ওকে কোনো এক গুদামঘরে নিয়ে চেয়ারে বেঁধে বন্দি করে রাখা হলেও দীধিতিকে রাখা হয়েছিল কোথায় তা ও জানে না। তবে গুদামঘরের পেছন থেকে অনবরত দীধিতির চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসছিল। শত চেষ্টা করেও পারেনি তাওসিফ বাঁধন খুলে ছুটে যেতে। ওকে পাহাড়া দিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদুটোকে বহুবার অনুরোধ করেছিল দীধিতিকে অন্তত ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সে অনুরোধ তো রাখেইনি তারা, অধিকন্তু নিজেরাও সামিল হয়েছিল।
ফর্সা ত্বকে স্পষ্ট থাপ্পড়ের দাগ, আলুথালু চুল, নাক বেঁয়ে রক্তি গড়িয়ে আসা, ঠোঁট কেটে যাওয়া আর দীধিতির ক্ষত বিক্ষত দেহের দিকে একবার তাকানোর পর দ্বিতীয়বার দেখার সাহস আর ক্ষমতা হয়নি তাওসিফের। শুধু একটা কথায় মনে আসছিল ওর, দীধিতির সর্বনাশের জন্য দায়ী সব থেকে বেশি সে-ই। মেয়েটা হয়ত আর পারবে না স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। যদি আত্মহত্যা করে বসে! এই দুশ্চিন্তা, নিজের অপরাধবোধ আর চাচার ক্ষুব্ধ মনোভাব। সব কিছু থেকে ওই মুহূর্তে মনে হয়েছিল তাওসিফের, মেয়েটিকে আগলে রাখার দায়িত্ব ওরই নেওয়া উচিত৷ নয়ত আজ এভাবেই দীধিতিকে ফেলে গেলে এক অমানুষ, কাপুরুষতার পরিচয় দেওয়া হবে৷ আগেপিছে তাই না ভেবে তখন সে বলে ফেলেছিল, ‘আমি ওকে ভালোবাসি, বড়োকাকু। ওকে বিয়ে করব আমি। আপনি ওকে কিচ্ছু করবেন না।’
ভাবলেশহীন দীধিতিকে আঁকড়ে ধরে পুলিশের গাড়িতে করে তক্ষুনি চলে যায় সে কোর্ট ম্যারেজ করতে। জাকির শেখের অভিব্যক্তি দেখারও তোয়াক্কা করেনি। আইনিভাবে বিবাহটা সত্যিই খুব জরুরি ছিল তখন৷ নয়ত চাচার যে ক্রোধ সে দেখেছিল, তাতে দীধিতিকে রক্ষা করা অসম্ভবই ছিল।
কিন্তু এখন? এখন কীভাবে শেখ পরিবারে দীধিতিকে নিয়ে প্রবেশ করবে সে? কেউ-ই তো মেনে নেবে না ওকে। অন্য কারও মেনে নেওয়ার প্রশ্নটা ভাবার আগে নিজের মেনে নেওয়ার কথাটায় তো খেয়ালে আসেনি তাওসিফের। ছোটো ভাইয়ের পছন্দের মেয়ে দীধিতি। জীবনেও সে কল্পনা করেনি ছোটো ভাইয়ের পছন্দের কাউকে নিজের সঙ্গে জড়াবে। তাছাড়াও তাওসিফের ব্যক্তিগত কিছু চাওয়া ছিল অর্ধাঙ্গিকে নিয়ে৷ যা দীধিতির মাঝে এক কিঞ্চিৎও নেই। খু্ব সহজ হবে না এই সম্পর্কটা বয়ে বেড়ানো৷ জানে না আগামীতে কী লিখে রেখেছেন আল্লাহ পাক ওদের ভাগ্যে!
-‘আমাকে স্বীকৃতি দিতে পারবেন তো, তাওসিফ?’
কম্পিত, ভাঙা গলায় হঠাৎ চমকাল তাওসিফ। ফিরে দেখে আবিষ্কার করল এলোমেলো চেহারার দীধিতিকে। তখন আকাশটা একটু একটু করে ফরসা হচ্ছে৷
-‘শরীর ঠিক আছে এখন?’ খুব নরম গলায় শুধাল তাওসিফ।
-‘আমার প্রশ্নটার উত্তর দিন।’
-‘বিয়ে যখন করেছি তখন স্বীকৃতি কেন দেব না?’
-‘আমি মনের স্বীকৃতির কথা জানতে চাইছি।’
-‘আপনি নাওফিলকে ভালোবসতেন, দীধিতি?’
-‘নাহ। চেয়েছিলাম বাসতে।’
ঠোঁট চেপে ধরে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাওসিফ তাকিয়ে থাকল দীধিতির দিকে। মেয়েটা কি ট্রমা থেকে বেরিয়ে এসেছে? এত জলদি! না কি ট্রমাতে আছে বলেই এমন প্রসঙ্গে কথা বলতে পারছে? চোখজোড়ার চাহনি একদমই শীতল, পলক পড়ছে খুব ধীরে। বুঝতে পারছে না তাওসিফ দীধিতির চোখের ভাষা। একবার মনে হচ্ছে দীধিতি গতকাল সন্ধ্যার মতোই নির্জীব৷ আবার মনে হচ্ছে সে আগের মতোই স্বাভাবিক।
-‘আমি আপনাকে নিজের ভাইয়ের পছন্দের কেউ বলেই জেনে এসেছি। তাই আপনাকে নিয়ে আমার মধ্যে খানিক কৌতূহল ছাড়া কখনই এ ধরনের ভাবনা উদয় হয়নি যা অনুচিত। নাওফিল যখন জানতে পারবে আপনি আমার স্ত্রী। তখন ওর মনের অবস্থা কী হবে আমি সেটা নিয়ে এখন বেশি চিন্তিত। জানি না আপনাকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারব কি না! তবে দায়িত্ব পালনে আর আপনার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটুও হেলাফেলা করব না। আমার সময় প্রয়োজন, দীধিতি।’ বলেই তাওসিফ দূর আকাশে উদাসী দৃষ্টি স্থাপন করে।
-‘নাওফিলের দুঃখ কষ্ট নিয়ে আমি একটুও চিন্তিত না। আমি ওর ব্যাপারে কোনো কথা বলতেও চাই না, শুনতেও চাই না। ওকে আমি সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষই মনে করি না।’
তাওসিফের মনে হলো ভারী অভিমান জমে ছিল দীধিতির এ কথায়। এই বিয়েটা আদতে তাওসিফ মেনে নিতে পারছে না। এ কথা স্বীকারও করার উপায় নেই৷ যদি সম্ভব হত এক্ষুনি দীধিতিকে নাওফিলের দায়িত্বে বুঝিয়ে দিত। এতটাই বোঝা মনে হচ্ছে দীধিতি নামের মেয়েটাকে! শুধু একটা কারণেই। তা হলো নাওফিলের ভালোবাসা দীধিতি। নাওফিল সুস্থ হয়ে ফেরার পর কীভাবে কী সামাল দেবে পরিস্থিতি? এই চিন্তায় সারাটা রাত ঘুমাতে পারেনি সে।
-‘শুনতে না চাইলেও আপনাকে শুনতে হবে, দীধিতি। কারণ, নাওফিলও আমার পরিবারের অংশ। আপনাকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাবার পর না চাইলেও নাওফিলের মুখোমুখি হতে হবে৷ তাছাড়া আমি যতটুকু জেনেছি শুরুতে না হলেও শেষে আপনিই নাওফিলের প্রতি আগ্রহী ছিলেন৷ শুধু একটা ইন্সিডেন্টের জন্য নাওফিলের প্রতি জন্মানো আপনার অনুভূতি নষ্ট হয়ে যাবে? দীপ্তর সঙ্গে কেন ওরকম খারাপ হয়েছে তার কারণটাও তো জানা উচিত আপনার। হতেও তো পারে দীপ্তও কোনো অপরাধী।’
-‘কী অপরাধ দীপ্তর?’ চোখের পানি সাবধানে মুছে নিলো দীধিতি।
প্রশ্নটায় তাওসিফ ওর মুখোমুখি দাঁড়াল, ‘আমি নিজেও সঠিক জানি না। নাওফিল গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে শুধু বলেছিল আপনার আর রুমানের যেন কোনো ক্ষতি না করা হয়৷ এমনকি দীপ্তও ক্লিয়ার করে কিছু জানায়নি নাওফিল কেন ওকে আটকে রেখেছিল।’
কথাগুলো বলার সময়ই তাওসিফ দীধিতির চোখের পানি খেয়াল করেছে। চেয়েও পারছে না কান্না রোধ করতে। এবার মনে হচ্ছে দীধিতি সত্যিই বিধ্বস্ত! গতকালের অপ্রত্যাশিত ঝড়ে সে তছনছ, ভঙ্গুর এক নারী! হঠাৎ নিচে বসে পড়ল সে৷ তাওসিফ দ্রুত এগিয়ে এলেই দীধিতি কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল, ‘আপনি শুনতে চাইছেন আমি কি নাওফিলকে ভালোবাসিনি কখনও? তাই না? আমি জানি না নাওফিলের জন্য আমার মনের অনুভবগুলো কেমন? এর ব্যাখ্যা কী আমার জানা নেই। শুধু চাই ওর মতো একটা সাইকোপ্যাথ আমার জীবন থেকে দূরে থাকুক। সেদিনের পুলিশ অফিসার ওকে খুনী বলেও সন্দেহ করে। ও হয়ত সত্যিই ওর বাবা-মায়ের মতো হয়েছে। শুরু থেকেই ওর কুৎসিত মানসিকতার সাথে পরিচয় করিয়েছে আমাকে। তারপরও আমি কী করে ওকে বিশ্বাস করলাম! ও আমার জীবনে আসার পর থেকে আমার সঙ্গে শুধু খারাপটাই হয়েছে৷ ও একটা অভিশাপ আমার জন্য, এই পৃথিবীর জন্যও। ঠিক ওর বাবা-মায়ের মতো।’
শেষোক্ত কথায় তাওসিফ ধমকে উঠল, ‘তুমি ওর সম্পর্কে, ওর বাবা-মায়ের সম্পর্কে কতটুকু জানো?’
দীধিতি থমকাল, অনেকটা ব্যথিতও হলো তাওসিফের এহেন অভিব্যক্তিতে। কিন্তু তাওসিফ নিজেকে সংযত করল না, কঠিন গলায় বলে চলল, ‘ওর বাবা-মায়ের কথা বাদ দিলাম। নাওফিলকে তুমি চেনোই না। কারণ, নাওফিল নিজেকে চেনায়নি তোমার কাছে। তোমার সঙ্গে শুরুতে ও যা যা করেছে তা শুধুই আমার বড়ো কাকুর ওপর রাগ আর জিদ থেকে।
ডেডবডি সম্পর্কিত যে ঘটনাগুলোর স্বাক্ষী তুমি তা শুধু ও তোমাকে দেখায়নি, পুলিশ অবধি ভিডিয়োগুলো পৌঁছে দিয়েছে স্বেচ্ছায়। শুধুই জাকির শেখের ইমেজ নষ্ট করতে। নিজেকে বিপদে ঠেলে দিয়ে হলেও ও চায় জাকির শেখের পতন ঘটুক। নিজের বাবা-মায়ের ধ্বংসের পেছনে দায়ী করে ও বড়ো কাকুকে। কিন্তু ও বিশ্বাস করতে চায় না বড়ো কাকু নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসে ওকেই। যতটা ভালোবাসত তার ছোটো ভাই জায়িনকে। বড়ো কাকু শুধু চেয়েছিল ছোটো কাকু যেন আইনের কাছে সমর্পণ করে, অন্যায় স্বীকার করে। কয়েক বছর জেল হওয়ার পর বড়ো কাকু নিজেই ছোটো কাকুকে মুক্ত করে আনত। এটাই চেয়েছিল সে। এ জন্যই ছোটো কাকু দেশে ফিরলে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে চেয়েছিল। তার ক্ষতি করার জন্য নয়। আজও কাকু নিজের প্রাণের ছোটো ভাইয়ের জন্য নীরবে কাঁদে। আর তার ছেলেকে কতখানি ভালোবাসতে পারে তা কল্পনাও করার মতো নয়৷ আফসোস, নাওফিল খু্বই বোকা। শুধু জানে রাগ আর অকারণ জেদ দেখাতে৷ তাই নিজেকে চেয়েছিল জায়িন মাহতাব রূপে তৈরি করতে, আর তোমাকে আয়মান মেহরিন রূপে। শুধুমাত্র বড়ো কাকুকে শাস্তি দিতে আর কষ্ট দিতে। তারপর হয়ত হঠাৎ করেই ও তোমাকে ভালোবেসে ফেলে। কিন্তু নিজের জীবনটাকে ও নিজেই ধ্বংস করবে বলে শেষ পর্যন্ত চায়নি তোমাকে নিজের সঙ্গে জড়াতে। আর রইল কক্সবাজার খুনের রহস্য? যে ছেলেদুটো খুন হয়েছিল তারা মূলত নাওফিলকেই মারতে এসেছিল। ওর সঙ্গে ছুরি নিয়ে হাতাহাতিও হয়েছিল। কিন্তু দাদা বা বড়ো কাকু কেউ-ই ওকে কখনও একা ছাড়েন না। নাওফিলের আড়ালে ওর পেছনে সব সময়ই বডিগার্ড নিয়োজিত রাখেন বলে সেদিন ও বেঁচে গিয়েছিল৷ তাদের হাতেই কিলারদুটো খুন হয়৷ রাজনৈতিক ইস্যুর কারণে বেশিরভাগই নাওফিল টার্গেট হয় শক্রদের কাছে৷ আমি, আমার ভাই আর আমার বোর সবখানে নিজেদের পরিচয় হাইড করে চললেও নাওফিল কখনও তা করেনি। আবার দাদারও সব থেকে আদরের নাতি বলে দাদা ওর ছোটো থেকেই ওকে সবখানে সাথে নিয়ে বেড়াতেন। এ সূত্রেও প্রত্যেকে ওকেই চেনে বেশি। দীধিতি, তোমার আমার সম্পর্কটার পরিণতি শেষ অবধি কী হবে তা বলতে পারছি না। তোমাকে বিয়ে করার কারণ শুধু আমার অপরাধবোধ নয়। তোমাকে সুরক্ষিত রাখতেই নিজের সঙ্গে তোমাকে জুড়ে নিয়েছি। কিন্তু আজ যদি তোমার আর নাওফিলের মাঝে একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকত, এই দায়িত্বটা ও-ই নিতো। তবে ভবিষ্যতে তোমরা যদি একে অপরকে চাও, আমি তখনও তোমাদের চাওয়াকে প্রাধান্য দেব।’
-‘এমনটা আমি কখনই চাইব না, তাওসিফ। বিয়ে সম্পর্কটা নিয়ে আমি মোটেও ছেলেখেলা করতে রাজি নই। আমি আপনার পরিচয়েই কেবল শেখ মেনশনে থাকতে চাই।’ কান্না স্বরেই খুব শক্তভাবে মতামত জানাল দীধিতি।
তাওসিফ বিপরীতে কোনো জবাবই দিলো না। স্থানু, অনুভূতিশূন্যের মতো বসে থাকা দীধিতিকে কিছুক্ষণ শুধু পরখ করে বিনা বাক্য ব্যয়েই ছাদ থেকে নেমে এলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে তারপর একটা মেসেজ লিখে পাঠাল, ‘শি ওয়াজ গ্যাঙ রেপড্। বাট হার এক্সপ্রেশন ইজ নট দ্যাট অফ আ র্যাভিশড। হাও স্ট্রেঞ্জ!’
-‘সোথ ইট’স অল সো আ মিস্ট্রি।’ ফিরতি মেসেজে জবাবটি এলো।
তাওসিফ প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে টাইপ করল, ‘আমাকে কেন এর মধ্যে টানলি তোরা?’
এর উত্তরে একবার চুমু দেওয়ার ইমোজি এলো। আরেকবার জবাব এলো, ‘বিকজ য়্যু আর আওয়ার ডিয়ারেস্ট এল্ডার ব্রাদার।’
ছোটো ছোটো পর্ব পড়তে রাজি আপনারা? ধরুন ৮০০-১০০০ শব্দের মধ্যে? তাহলে সপ্তাহে দুই/তিনদিন দিতে খুব একটা কষ্ট হবে না। আমি লেখার সময় পাই না সত্যি। আবার সামনে রোজার মাস। তখন নিয়মিত লেখা আরও মুশকিল হবে আমার। সাসপেন্স, থ্রিল, মিস্ট্রি, রোমান্টিক, চারটি ক্যাটাগরির সমন্বয়ে লেখার জন্য আমার ভাবার সময় লাগে, গোছানোর সময় লাগে। যাতে ফাঁক না থেকে যায়। আর থাকলেও যাতে সেটা সামনে পূরণ করে দেওয়া যায়। আশা করি আমার সমস্যাটা বুঝবেন আপনারা৷ আর হ্যাঁ, এই পরিচ্ছদে যতগুলো চরিত্র হাইলাইট হবে তাদের সকলের মাঝেই ছোটো-ছোটো রহস্য আছে।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৮
যেগুলো নাওফিল আর দীধিতির সাথে সম্পর্কিত৷ তাই নিহাদ, কিরণ, সৌরভ, তাওসিফ, ঝুমুর, সুহাইল, কাউকেই অবহেলা করবেন না। গত পর্বে কিরণকে যারা নিব্বি বলেছেন তাদের মন্তব্যটা আমাকে ব্যথিত করেছে, হতাশ করেছে। তাদের নিব্বি ভাবার যুক্তি দেখেও আমি হতাশ। সারা উপন্যাসে প্রতিটি চরিত্রই একেকটা রহস্য। সেখানে আমি অকারণে নিব্বি চরিত্র তৈরি করব আমার উপন্যাসে? লেখক হিসেবে খারাপ হলেও এতটাও নিম্নরুচির লেখক বোধ হয় না আমি। সিন্ধু ইগল যারা পড়েছেন তাদের জন্য চমক আছে একটু। জায়িন আর আয়মানকে না পেলেও তাদের প্রতিচ্ছবি অতি শীঘ্রই দেখতে পাবেন সামনে। তবে তারা কেউ নাওফিলও না, দীধিতিও না।
