Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৫

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৫

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৫
ইসরাত জাহান দ্যুতি

ভাঙা ডান পা’টা আগের মতো হতে তিনটি মাস সময় লেগে গেল। কিরণ জীবনে ভাবতে পারেনি, এত বড়ো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে ওর সঙ্গে।
মাস তিন আগের কথা।
তিনদিন পরেই ছিল কিরণের এইচএসসি পরীক্ষা। বান্ধবীদের সঙ্গে কলেজ থেকে অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে ফেরার পথে ফোনে ফ্লেক্সিলোড করার আশায় দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিল ওরা চারজন। মধ্য দুপুরের কাঠফাটা রোদে অতি মাত্রায় গরমে নাজেহাল পথে ঘাটের সকলেই। উপরন্তু ব্যস্ত সড়কে বিরতিহীন দৌঁড়ে চলা বড়ো বড়ো গাড়িগুলোর ঘনঘন হর্ন কী যে বিরক্ত করছিল কিরণকে! ওড়নার আঁচলটা দিয়ে ঘামে জর্জরিত নগ্ন ঘাড়টা মুছে নিচ্ছিল রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আর বিড়বিড় করে গাড়িচালকগুলোকে গালিগালাজ করে যাচ্ছিল। বেখেয়ালে থাকার কারণে দেখতে পায় না, বাঁ দিক থেকে উড়োজাহাজের গতিতে আসা এক বাইক হঠাৎ ওর কাছাকাছি এসে গতি ধীর করেছে৷ যখনই সে রাস্তামুখো হয়ে ফিরে দাঁড়াল আর অমনি বাইকে বসা হেলমেট মাথায় দুটো ছেলে দিনে-দুপুরে জনসম্মুখে ওর সঙ্গে নোংরামো করে গেল। ঘটনাটা এমন ছিল–

বাইকচালকের পেছনে বসা ছেলেটি ওর বুকের ওপর মেলে রাখা ওড়নাটা সিংহের থাবার মতো খামচে ধরে টেনে নেয় আর তক্ষুনি বাইকচালক গতি বাড়িয়ে এগিয়ে যায়৷ যারা দেখেছে তারা সকলেই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ওদেরকে ধরার আগেই ওরা পগারপার। কিরণের বুকের স্পর্শকাতর স্থানে সাংঘাতিক আঘাত লাগে। ব্যথায় চিৎকার করে ওঠারও সুযোগ পায়নি সে। ওড়না জামার কাঁধে সেফটিপিনসহ আটকে ছিল বলে সেটা টান খেতেই ও হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাঝ রাস্তায়। চলন্ত আরেকটা বাইক তখনই আবার ওর ডান পায়ে এসে আঘাত করে। ভাগ্যক্রমে যদিও সেই লোকটি ওকে দেখা মাত্রই বাইক থামানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতে সে নিজেও বাইক থেকে ছিটকে পড়ে যায় সামনেই৷ সেই দুপুরে মূল সড়কে এক হুলুস্থুল অবস্থা। যশোর পত্রিকায় সেদিনের দুর্ঘটনাটা ছাপা হয়ে গেছে। বাদ নেই এ ঘটনা কারও জানারই।

পরীক্ষাটা আর দিতে পারেনি কিরণ। সুস্থ হতেই চলে গেল অনেকগুলো দিন। কিন্তু মানসিক অবস্থা দিনকেদিন ভীষণ খারাপ হয়ে যেতে থাকে ওর। বন্ধুরা সবাই কিছুদিন পরই পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাবে। তারপর কেউ-ই আর এখানে থাকবে না। চলে যাবে যেখানে যে সুযোগ পায় পড়ার। তবে এই তিন মাসে প্রতিটি বন্ধুই ওর বাড়ি বয়ে এসে যতটা সময় সম্ভব সঙ্গ দিয়ে গেছে, বিষণ্নতা থেকে বের করে আনতে নানান জায়গায় ঘুরেফিরে বেরিয়েছে, বড়োবোন এসে কতগুলো দিন থেকে গেছে ওর কাছে।
আজ কলেজে নবীনদের বরণ করা হবে। ওদের খোলামেলা কলেজ প্রাঙ্গণে নবীন বরণ উৎসব খুব আয়োজন করে করা হয়৷ গান গাইতে আর নাচতে, পেশাদার শিল্পী ডেকে আনা হয় এখানে। কিরণের পা যেহেতু এখন পুরোটাই ঠিক, ওর বন্ধুরা পরিকল্পনা করেছে আজ সবাই শাড়ি পরে কলেজের অনুষ্ঠান দেখতে যাবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটা শুরু হয় দুপুর থেকে। ওরা সে সময়ই কলেজ যাবে। তবে প্রস্তুতি নিতে নিতেই মেয়েগুলোর দুপুর পার হয়ে যাবে বলে কিরণের মেয়ে বন্ধুগুলো সব কিছু নিয়ে সকাল সকাল চলে এসেছে ওর বাসায়। কিরণের মা নাশতা আর দুপুরের রান্না করে রেখে চলে গেছেন হাসপাতাল। পেশায় একজন গাইনী বিভাগের ডাক্তার তিনি। আজ বেলা দশটা থেকে দুপুর অবধি সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখবেন। তারপর বিকাল চারটা থেকে আবার রাত আটটা অবধি রোগী দেখবেন নিজের চেম্বারে, রাত ন’টায় প্রাইভেট ক্লিনিকে যাবেন দু’টো সিজারিয়ান অপারেশন করতে। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বেজে যাবে তার। যশোরে তিনি বেশি খ্যাতিসম্পন্ন একজন গাইনেকোলোজিস্ট হিসেবে পরিচিত তার অনেক। তাছাড়া তার স্বামী ছিলেন গোয়েন্দা বিভাগের বেশ বড়ো অফিসার। কিন্তু এ বিষয়টি প্রাণপণ গোপন রাখার চেষ্টা করেন তিনি। তাই এখনও অনেকেই তা জানে না।

কিরণকে শাড়ি পরিয়ে, চুল আঁচড়িয়ে গুছিয়ে দিচ্ছিল নুপুর। অনেক বড়ো চুল হওয়াই কিরণ একা একা চুল যত্ন করতে হিমসিম খায়। দীর্ঘকেশী কিরণের সৌন্দর্য ওর বড়ো বোনের মতো নয়। ওদের দুবোনের মাঝে গায়ের রঙে, চুলের দীর্ঘতায়, চোখ-মুখের আকৃতিতে, পা থেকে মাথা অবধি সব কিছুতেই ভিন্নতা। কেউ বুঝতেই পারে না ওরা সম্পর্কে আপন বোন হতে পারে। একটুখানিও মিল নেই ওদের দুজনের মাঝে। অথচ দু’বোনই পুরুষ চোখের নজর কাঁড়তে পারে সহজেই। সুন্দর বলা হয় দুজনকে দু’রকম। যেমন ওর বড়োবোন স্মরণের সৌন্দর্য দূর থেকে দেখলেও টের পাওয়া যায় মেয়েটি নিঃসন্দেহে রূপবতী। কিন্তু কিরণকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে উজ্জ্বল শ্যামলা গাত্রবর্ণের সাদামাটা দেখতে একটা মেয়ে কেবল। অথচ কাছ থেকে যতই দেখা যায় ওকে, ততই ওর সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। অর্থাৎ কিরণের চোখে-মুখের লাবণ্যতা আর মায়া শুধু কাছ এলেই বোঝা যায়।

গোমরা মুখ করে থাকা কিরণের চোখে আইলাইনার পরিয়ে দিতে দিতে নুপুর কড়া আদেশ করল, ‘এই ছেমরি, সাজায় দিচ্ছি কি মুখখানা হাঁড়ির মতো করে রাখার জন্য? আমাদের ম্যাথ টিচার স্বয়ং তোকে দাওয়াত দিছে। যেয়ে স্যারের সাথে আগে দেখা করবি। এরকম মুখ করে থাকবি না কিন্তু।’
-‘আকাশ স্যারের বদলে নতুন এক স্যার আসছে কলেজে। এই অনুষ্ঠানের পরই তো আকাশ স্যারও চলে যাবে কলেজ থেকে৷ তাই যাওয়ার আগে স্যার তার সব স্টুডেন্টদের সাথে আজকে আনন্দ, বিনোদন করে কাটাবে। রিতুর কাছে নাকি সেদিন বারবার করে তোকে আসার কথা বলছে।’ জানাল সুস্মিতা।
কিরণ সবই শোনে, আকাশ স্যার কেন ওকে বারবার করে আসতে বলেছে তাও বোঝে। হয়ত স্যারের প্রণয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেওয়ার জন্য অপমানের শোধ নেওয়ার সুযোগটা আজই নেবে ওর থেকে। ভর্ৎসনাগুলো স্যারের কী হতে পারে? রাস্তার মাঝে বখাটে ছেলেদের কাছ থেকে নির্যাতিত হওয়া আর পরীক্ষায় এক বছর পিছিয়ে যাওয়া? এ নিয়েই তো অপমান করবে ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুযোগে।
অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে আসার দিনই ওকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল লোকটা৷ কিরণ সে সময়গুলোতে ছিল বেশ সাহসী আর প্রতিবাদী ব্যক্তিত্বের। যে স্যারকে দুটো বছর শ্রদ্ধার চোখে দেখে আসলো সে, তার কাছ থেকে হঠাৎ এ ধরনের অনৈতিক প্রস্তাবকে তার মুখের ওপরই প্রত্যাখ্যান করে চলে এসেছিল। এ গল্পটা সেদিন বান্ধবীদের বলার সুযোগ হয়নি। এরপর কেটে গেল তিনটি মাস। আশ্চর্যভাবে এই তিনমাসে নিজেকে ও আবিষ্কার করে বড়ো বোনের মতোই একেবারে নাজুক শ্রেণীর মানুষ হিসেবে৷

পাড়ার মহিলাগুলো শুভাকাঙ্ক্ষী রূপে রোজ বাড়িতে এসে “আহারে! ইসরে!” বলে সান্ত্বনা দিয়ে যায়, আর ওর ভেতরের দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী সত্ত্বাটাকে ওই সান্ত্বনা বাণীর মাঝে থাকা তাচ্ছিল্য আর তিরস্কারে দুর্বল করে যায়। পথে ওকে দেখলেই লোকমুখে শুরু হয়ে যায় তিন মাস আগের দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণ। সমালোচনারও ঝড় বয়ে যায় ওদের দু’বোনকে নিয়ে। বাবা ছাড়া তারা এতিম মেয়েদুটো মানুষ হতে পারেনি, মায়ের অতি আদরে দিনদিন উগ্র হয়ে গেছে, উচ্ছন্নে গেছে! অশালীন হয়ে চলাফেরা করার কারণে আজ তাই তো কিরণের এই অবস্থা। না জানে বড়ো মেয়েটা আবার ঢাকায় পড়ার নাম করে কী নোংরামো করে বেড়াচ্ছে! নীরবে তা শুনে যেতে হয় কিরণকে। প্রতিবাদী ভাষাটা হঠাৎ করেই ওর মাঝ থেকে উবে গেছে। ওদের মা-ও বোবার মতো সবার কথা চুপচাপ শোনেন। জবাব দেওয়ার চিন্তা মাথাতেও আনেন না। এই যশোর জেলায় এসেছেন তিনি বিশ বছর যাবৎ৷ স্মরণের বয়স তখন দেড় বছর। স্বামীর সঙ্গে ছোট্ট একটি সংসার সাজিয়ে দশটা বছর কতই না সুখে কাটিয়েছেন। তারপর একদিন সেই স্বামীর ছায়া হারিয়ে ফেললেন আর বিষাক্ত বাস্তবতা প্রতিটি দিন নির্মমভাবে উপলব্ধি করে টিকে থাকলেন মেয়েদু’টিকে নিয়ে একা একাই। যদি কোনো লেখক জানত তার জীবন সংগ্রামের গল্প, তাহলে তা নিয়ে গোটা একটা উপন্যাস লিখে ফেলতে পারত।

ক্যান্টনমেন্ট কলেজের প্রবেশ দ্বারে অনিক, নাবিল আর সুজন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে ওদের চার রূপসী বান্ধবীদের জন্য। যারা কঠোর আদেশ জারি করেছে, কলেজে ঢুকবে ওরা সাত বন্ধু এক সঙ্গে। যেন সবার নজর কাঁড়ে ওদে সেভেন স্টার দলটা। কিন্তু সেই দল থেকে কিরণ নামক তারাটা যে তিন মাস আগে খসে পড়ে গেছে, তা তো সকলেই জানে। তাহলে এই ঢং করার মানে কী? তাই কিরণকে জোর করেও নিজেদের সঙ্গে নিতে পারেনি নুপুররা। কিরণ এসেছে ওদের পিছুপিছু আলাদা রিকশা করে। ওরা ছ’জন কলেজে ঢোকার পর ও ঢুকবে। এতে বন্ধুরা নাখোশ হলেও কিরণের জেদের কাছে হার মানতেই হয়।
মিনিট পাঁচেক পরই একটা রিকশা এসে দাঁড়ায় অনিকদের সামনে। সেখান থেকে নেমে আসে সুস্মিতা, রিতু আর নুপুর। অনিক কিরণের কথা জিজ্ঞেস করতেই সুস্মিতা জানায়, ‘আমাদের ভিতরে চলে যাইতে বলছে আগে। তারপর ও আসবে। মাইয়াটা বিশাল ঘাড়ত্যারা রে!’

কথা বলতে বলতে ওরা কলেজের ভেতরে চলে গেল। কিরণের রিকশাটা এসে থামল তখন একটি কালো গাড়ির পিছে। গাড়িটা গেটে প্রবেশ করবে না কি সামনে আরও এগোবে, কিছুই বুঝছে না কিরণ। অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে আছে গেট জুড়ে৷ রিকশা থেকে নেমে ফাঁক দিয়ে চলে যাবে ভেতরে, এমনটা ভাবতেই আরেকটা সাদা গাড়ি এসে থামল কালো গাড়িটির পিছে। এই গাড়িটা চেনা কিরণের। মেয়র সোহাইল শেখের গাড়ি। তিনি আজ আমন্ত্রিত এখানে। এবার কালো গাড়ি থেকে নেমে এলো সে গাড়ির মানুষটি৷ গেটের সামনে ভিড় জমে গেল তাদের মালা পরিয়ে বরণ করার জন্য।
কিরণও হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল অদূরেই। ওর ধারণা কোনো এমপি, মিনিস্টার হবে কালো গাড়ির মানুষটি। কিন্তু সোহাইল শেখ গাড়ি থেকে নেমে এসেই ওই ব্যক্তিটির কাঁধ জড়িয়ে ধরে দাঁড়াল গেটের মুখে। কলেজের শিক্ষক আর শিক্ষার্থীরা একত্রে তাদের বরণ করে নিলে তারা সরাসরি মঞ্চে এসে বসল। কিরণ পলকহীন তাকিয়ে থাকে সোহাইলের পাশে বসা মানুষটির দিকে। সফেদ পাজামা পাঞ্জামিতে এতদিন সব থেকে সুদর্শন সে ভাবত সোহাইলকে। অথচ তার পাশের মানুষটি ধারণা ভুল প্রমাণিত করায় কিরণ এতটুকুও খুশি না৷ ও চায় ওর দেখা সুন্দর মানুষ শুধু সোহাইলই হোক৷ কিন্তু নতুন মানুষটি কে? দাড়ি-গোঁফ বিহীন ফর্সা লম্বাটে মুখ, ছোটো ছোটো চোখ, পাতলা ঠোঁট, চওড়া বুক, ঢেউ খেলানো চুল আর দীর্ঘ উচ্চতা৷ কোথায় যেন একটা মিল আছে সোহাইলের মুখের সঙ্গে৷ মিলটা কী হতে পারে? কিরণ কি সেই মিলটাই খুঁজছে? না কি লোকটির প্রতি শুধু আকর্ষণবোধ থেকে নিষ্পলক দেখছে?

তিনটি মাস মানুষের জীবনের গতিধারা বদলে দিতে যথেষ্ট একটি সময়৷ অথবা তিনটি মিনিটও। দীধিতির জীবনের মোড় ঘুরেছে তিনটি মাসে। অনার্সের পরীক্ষা শেষেই বিসিএস কোচিং শুরু করেছে, রাত আটটা অবধি টিউশনিও করাচ্ছে চারটা, পাশাপাশি মাস্টার্সেও ভর্তি হয়েছে। মিরপুরের দু’রুমের সেই বাসাটা ছেড়ে দিয়ে অনুপমাদের চিলেকোঠার ঘরটা ভাড়া নিয়ে থাকছে ও আর তামান্না। তন্বী চলে গেছে পরীক্ষার পরই। শিহাবের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা চলছে তার। বিয়েটা পারিবারিকভাবে এ বছরই হয়ে যাবে তাদের। বিয়ের পর শিহাবের খুব একটা ইচ্ছা নেই তন্বীকে দিয়ে চাকরি করানোর। তবে তন্বীর খুব বেশি ইচ্ছা থাকলে স্কুলের চাকরির চেষ্টা করতে পারবে শুধু। তাছাড়া মাস্টার্সও করবে সে দীধিতির সঙ্গেই।

আর নাওফিল! তার জীবনের দিক বদলে গিয়েছিল সেদিন মাত্র তিনটি মিনিটের মাথায় একটা গুলিতে। বিস্ময় নিয়েই সে যখন কৈফিয়ত চেয়েছিল দীধিতির কাছে, ‘তুমি পুলিশকে ইনফর্ম করেছ, দীধি?’ ভীত দীধিতি নিরুত্তর থেকে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতেই পুলিশের আগমন ঘটে সেখানে। নাওফিল রেগে গিয়ে চকিতেই প্যান্টের পিছে গুজে রাখা পিস্তলটা তাক করে সোজা দীধিতির কপাল বরাবর। দীপ্ত বিছানায় বসে তখন ছটফট করে বলে, ‘তুই এতটা অমানুষ হতে পারিস না, নাওফিল! ওকে ছাড়!’
-‘মীর জাফরের বাচ্চা নাটক থামা!’ চেঁচিয়ে ওঠে নাওফিল দীপ্তর ওপর। পুলিশের এএসপি বাঁধন আর পাঁচজন কনস্টেবল একই সঙ্গে বন্দুক তাক করে তখন ওর দিকে। চেইন লাগানো চাবির রিংটা অনামিকা আঙুলের ডগায় রেখে ঘুরাতে ঘুরাতে বলে, ‘আপনি নিজেকে বড্ড তামিল হিরো ভাবতে শুরু করেছেন, বাঁধন। সেই কক্সবাজার থেকে আমার পিছু নিয়েছেন আপনি৷ সিনেমা বানাবেন? আর আমাকে আপনার সিনেমার ভিলেন রোল দিতে চান? স্যরি, আমি ভিলেনের লিড করব না একদমই। আমার চেহারার সঙ্গে তো মানায় না সেটা।’

-‘আজ-কাল দেখতে সুন্দর মানুষগুলোকেই দেখি সবখানে ভিলেন হতে। আমিও তাই তেমনই ভাবছি।’
নাওফিলের চোখে চোখ রেখে প্রচণ্ড জোর গলায় বলল সে।
তেত্রিশ বছর বয়সী বাঁধন গরম রক্তের মানুষ নয় একেবারেই। সে প্রচণ্ড ঠান্ডা মস্তিষ্কেই সব থেকে বড়ো বড়ো কেসগুলো হ্যান্ডেল করে। নিজের প্রতি তার আত্মবিশ্বাসটাও অপরিসীম। আজকে সে এখানে ভেবেই এসেছে, কোনোকিছুকে পরোয়া না করে খুনের আসামী হিসেবে সন্দেহযুক্ত নাওফিলকে আজ প্রমাণসহ হাতেনাতে ধরে হাতকড়া পরিয়ে জেলে পুরবেই। সেটা এক রাতের জন্য হলেও। কারণ, এক রাতই যথেষ্ট সাংবাদিক, রিপোর্টারদের দৌলতে সারা দেশে প্রচার হয়ে যাওয়ার জন্য৷ শিল্প মন্ত্রী মাহতাব শেখের নাতি অথবা এমপি জাকির শেখের একমাত্র পুত্র একজন কিডন্যাপার এবং মার্ডারার, উভয় অপরাধের মামলা ঠুকে দেবে আজই। সে চায় নাওফিল উত্তেজিত হয়ে অন্তত যে কোনো একজনকে হলেও গুলি করে বসুক।
কিন্তু বাঁধন সাহেব বিশাল এক ভুল করলেন এক জায়গাতেই। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও যে মানুষের বিপদ ডেকে আনে তার উদাহরণ আজ এএসপি বাঁধন চৌধুরী। স্বভাবজাত ধীরস্বরে নাওফিল তাকে আদেশ করে, ‘বাঁধন, পিস্তল কোমরে গুজে যেভাবে এসেছেন সেভাবেই বিদায় নিন আপনার সঙ্গীদের নিয়ে।’
-‘ওকে।’ স্থির দৃষ্টিতে নাওফিলের চোখে চেয়েই সঙ্গে আসা কনস্টেবলদের অনুগামীর মতো বলল বাঁধন, ‘চলুন সবাই।’

কিন্তু তারা বিস্ময় নিয়ে সমস্বরে প্রতিবাদ জানাল, ‘কেন স্যার? আপনি ওনার কথা কেন শুনছেন?’
বাঁধন জানতই না তার সামনের সুন্দর, সরল চেহারার ছেলেটা তার জন্মদাতা পিতার মতোই যে কোনো মানুষকে অতি দ্রুত সম্মোহন করে নিতে পারার গুণটা আয়ত্ত করেছে প্রিয় মনিমার কাছ থেকে। জানলে চোখে চোখ রেখে কথা বলার বোকামিটা কখনই করত না। নাওফিলের প্রচেষ্টা ব্যর্থ যায়নি। বাঁধন ওদের ধমকে বলল আবারও একই কথায়৷ আর ঠিক তখনই রুমান মইয়ের শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে নাওফিলের বাহুতে গুলি করে বসে৷ সেই আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পায় বাঁধন। ততক্ষণে জাকির শেখও এসে পড়েন। নাওফিলের আর্তনাদ ধ্বনি আর রক্তাক্ত হাত দেখে তিনি চিৎকার করে ছুটে যান ওর কাছে, বুকের সাথে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন, ‘বাস্টার্ড! তোদের কলিজা বের করে নেব আমি! কত বড়ো কলিজা তোদের তা দেখে নেব!’

এরপর? জানে না দীধিতি আর কিছুই। নাওফিল কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুই জানে না। দীপ্ত প্রায়ই কল করে কথা বলতে চায় খুব, দেখা করতে চায় খুব, সরাসরি বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছে ওকে সুস্থ হয়েই। সুযোগ দেয়নি দীধিতি৷ একবার শুধু ওর থেকে জানতে পেরেছে বাঁধন চৌধুরী বদলি হয়ে রাঙামাটি চলে গেছেন আর রুমানের চাকরিটা নেই-ই। এসবের পিছে কার হাত তা তো বোঝাই যায়। তবে রুমানের কোনো আক্ষেপ নেই এ নিয়ে। সে নাওফিলের দেওয়া ফ্ল্যাটটাও ফিরিয়ে দিয়েছে। এখর চাকরির চেষ্টা করে যাচ্ছে অন্যসব জায়গায়। আরও একটি ক্ষতি হয়েছে রুমানের। সবুজ, শিহাব, রাতুল, তুষার, ওরা আর কেউ-ই ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখেনি। তন্বী ঝামেলা করেছিল একবার শিহাবের সঙ্গে এ নিয়ে। নাওফিলের এত বড়ো অপরাধের পরও কেন সে এখনও তাকেই সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে? এর উত্তরে শিহাব পরিষ্কার করে কিছু বলেনি। শুধু ওর আর তন্বীর মাঝে যেন তৃতীয় কোনো ব্যক্তি না আসে সেই অনুরোধটুকু করেছে তন্বীকে৷ ভালোবাসার কাছে দুর্বল হয়ে তন্বী তা মেনেও নিয়েছে।
টিউশনিগুলো হাতের কাছাকাছিই পেয়েছে দীধিতি। যার জন্য পায়ে হেঁটেই যাতায়াত করার সুবিধাটুকু পেয়েছে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৪

এই টিউশনিগুলো স্রেফ নিজের জ্ঞানচর্চার জন্যই৷ বিসিএস পরীক্ষার জোরদার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে, তামান্না আর অনুপমা এক সঙ্গে৷ আর অনুপমার বাবার অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে তাওসিফ শেখ সপ্তাতে দু’দিন ওদের তিনজনকে গ্রুপ স্টাডি করায়। এতে কে কতটা উপকৃত হয়েছে জানা নেই। কিন্তু দীধিতি ভীষণরকম বিরক্ত আর অতিষ্ট তাওসিফকে প্রতিটি দিন চোখের সামনে দেখতে পেয়ে। নাওফিলের কাছের মানুষ আর ওর মতোই প্রায় দেখতে তাওসিফকে এখন অকারণেই অপছন্দ করে সে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here