আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৬ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি
গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার পর জাকির শেখ শুধু অপেক্ষা করেছিলেন ছেলের সুস্থ হওয়ার জন্য৷ তারপর নাওফিল সুস্থ হতেই মাহতাব শেখকেও না জানিয়ে তিনি ছেলেকে পাঠিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়া জেরিনের কাছে৷ এর প্রধান কারণ দু’টি৷ প্রথম কারণ, নাওফিলের মানসিক অসুস্থতা৷ দ্বিতীয় কারণ, রাজনৈতিক স্বার্থ।
জাকিন মনে করেন আয়মানের যেমন মানসিক রোগ ছিল– প্রচণ্ড পাষাণ হৃদয়, আপন মানুষকে ভালোবাসলেও তাদের বিশ্বাস করতে না পারা, মাঝেমাঝে তাদের শত্রু ভাবতেও দ্বিধা না করা। নাওফিলও ঠিক মায়ের রোগটিই পেয়েছে। সাইকোলজিস্ট জেরিনই আয়মানের এই সমস্যাটা প্রথম চিহ্নিত করেছিলেন, পাশাপাশি সাইকোথ্যারাপিও করতেন আয়মানকে। তবে সেটা সন্তান জন্ম দেবার পর নিজ তাগিদে আয়মানই নিজেকে সব রকম খারাপ অভ্যাস আর দোষ থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। আবার জায়িনও যে হাইপারসেক্সুয়ার ডিজঅর্ডারে ভুগত বলেই নারীসঙ্গ ছাড়া অস্থির হয়ে পড়ত, এই ডিজঅর্ডার সম্পর্কিত ব্যাপারটাও বিস্তারিত প্রথম জেরিনই রেজার কাছে বলেছিল। এরপর অবশ্য জায়িনকে এ বিষয়ে সচেতন করতে এবং চিকিৎসা নিতে বলতে সাহস পায়নি রেজা। জায়িনও অবশ্য পরবর্তীতে আয়মানের সঙ্গে সংসার করাকালীন আয়মান ছাড়া দ্বিতীয় নারীকে কাছে টানার সুযোগ পায়নি৷ কারণ, সে তখন আয়মানকে হাসিল করতে ও কাবু করতেই নিজের অবসর সময়টা ওর জন্য বরাদ্দ রাখত। যখনই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হত না তখনই জোরজুলুম করে হলেও আয়মানকেই কাছে টানত। একটা সময় আয়মানও সহজ হতে যায় ঘনিষ্ঠতায়।
ওদের দুজনের সব থেকে কাছে মানুষ ছিল আলিয়া, জেরিন, রেজা আর জায়িনের চার বন্ধু। এ ক’জন মানুষই দেখেছে ওদেরকে কাছ থেকে। স্বার্থের জন্য তথাকথিত সংসার নামক জীবনে জায়িন আয়মান কখনও একে অপরকে আদতে ভালোবেসেছে কি না, তা কেউ-ই সঠিকভাবে বলতে পারবে না। কেউ বিশ্বাস করে, ওরা দুজন কোনোদিনও দুজনকে ভালোবাসেনি। আবার কারও বিশ্বাস উলটো। আয়মান শুধু সন্তানকেই না, জায়িনকেও ভালোবেসেছিল। এ যুক্তির কারণ, সন্তান কোল ছাড়া হওয়ার পরও আয়মান জায়িনকে ছেড়ে যায়নি৷ এবং দুনিয়ার কাছে দুজন দাগী আসামি হওয়ার সময়ও দুজন এক সঙ্গেই ফেরারি হয়। বিপদে এক মুহূর্তের জন্যও জায়িন আয়মানকে ত্যাগ করেনি। তা কি স্ত্রী হিসাবে ভালোবেসে আর মায়া থেকে, না কি স্রেফ নিজের ক্রাইম পার্টনার বলেই স্বার্থের জন্য? তা সঠিক বলা সম্ভব নয়। সারা পৃথিবী ওদের সম্পর্কটাকে কেবল স্বার্থ পূরণ হিসেবে দেখলেও মূলত ওরা দুজন ওদের সম্পর্কটাকে ঠিক কীভাবে ভাবত তা কেবল ওরাই বলতে পারবে।
জাকির শেখ আর নাওফিলের মাঝে যে দ্বন্দ তা আজ ষোলো বছর ধরে চলছে৷ কিন্তু তাদের মাঝের দ্বন্দ সব সময়ই সকলের অগোচরে। প্রত্যক্ষ বা সরাসরি নয়। আর দ্বন্দটা শুধুই নাওফিলের দিক থেকে। সাড়ে চার বছর বয়সের স্মৃতিটুকু অধিকাংশ বাচ্চাদের মস্তিষ্কেই ঝাপসা হয়ে আসে। অথচ খুব শাণিত মস্তিষ্কের নাওফিল আজও মনে রেখেছে, শেখ বাড়ির বাউন্ডারির ওপাশে যে বাংলো বাড়িটা রয়েছে সেখানে এক গভীর রাতে কেউ ওকে দাদীর ঘর থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় সেই বাংলোতে নিয়ে গিয়েছিল। তার বুকের মাঝে থাকা অবস্থাতেই ঘুম ভেঙেছিল ওর। ধুকপুক ধুকপুক আওয়াজ চলছিল অনর্গল সেই বুকটার ভেতর। নাওফিল চুপটি করে সেই শব্দ শুনে যাচ্ছিল কৌতূহল নিয়ে। ওর ভাবনাতেও ছিল না সেই মানুষটি জাকির শেখ, জাহিদ শেখ কিংবা মাহতাব শেখ ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে৷ ও তো ভেবেছিল তাদের কারও বুকের মধ্যেই জড়িয়ে আছে। বাংলোতে পৌঁছনোর পর তা বুঝতে পেরেছিল সেই মানুষটিকে ও সব সময় দেখে না। তবে কিছুদিন আগেও সেই মানুষটির বুকেই ও থাকত বেশি। কখনও আব্বু, কখনও আব্বুজান বলেও ডাকত তাকে। দেশে আসার পর অনেকদিন এই মানুষটিকে না দেখতে পেয়ে, মা’কে কাছে না পেয়ে খুব কান্নাও করত সে। কিন্তু ধীরে ধীরে মিহাদ আর নিহাদের সর্বক্ষণ সঙ্গ পেয়ে তাদের ভুলে যেতে থাকল এক সময়, রাত হলে দাদী বা নতুন মা খুশির কোলের ওম পেয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে যেতেও শিখে গেল।
ওর দু গাল হাতের মাঝে আগলে ধরে ওই মানুষটি হঠাৎ খুব মৃদুস্বরে আবেগ প্রকাশ করছিল, ‘জান! আমার আব্বুজান! আমাকে আপনার মনে পড়ে না? মামকে মনে পড়ে না? মাম খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে আপনার জন্য। আব্বুজানও ভালো নেই আপনাকে ছাড়া! যাবেন না মামের কাছে?’
আর তারপর! তারপরই বাংলোর চারপাশে আচমকা হই হই রই রই পড়ে গেল। চারদিক থেকে প্রখর আলোর রশ্মি ছুটতে লাগল ওদের দুজনকে ঘিরে। সেই মানুষটি বুকের ভেতর ওকে বেখেয়ালেই খুব শক্ত করে চেপে ধরে ভিত চেহারায় শুধু এদিক ওদিক দেখছিল আর কী যেন বলে চলছিল বিড়বিড় করে। শিশু নাওফিল ব্যথায় তখন কেঁদে উঠতেই হঠাৎ গুলি ছোড়াছুড়ির বিকট শব্দও ভেসে আসে। মানুষটিও লুকোনোর বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছিল সে সময়। চাইছিল ওকে নিয়ে বাংলো থেকে বেরিয়ে যেতে। এক সময় তা পেরেছিলও। কিন্তু পথিমধ্যে হাতে পিস্তল নিয়ে পুলিশের সাথেই জাকির শেখ দাঁড়িয়ে বাধ সাধেন। হুঙ্কার ছেড়ে বলেন, ‘তোকে জানে মারতে আজকে এক মিনিটও সময় নেব না আমি। যদি জাদকে এক্ষুনি না আমার কোলে ফিরিয়ে দিস আর নিজেকে সমর্পণ না করিস পুলিশের কাছে!’
-‘জান, ও জান। ওর নাম জাদ নয় ভাইজান। ও আমার বাচ্চা, আমার জান। এমন কেন করছ তুমি ভাইয়া? আমাকে ভালোবাসো না? আমি তোমার ছোটো ভাই না?’ খুব আর্ত কণ্ঠে বলেছিল মানুষটি।
জাকির শেখ সেদিন জবাবে বলেছিলেন, ‘কে তুই? চিনি না আমি তোকে। আমি চিনি শুধু তোকে ক্রিমিনাল হিসাবে। যাকে মেরে পিস করে কাটলেও আমার আত্মা জুড়াবে না।’
এহেন হৃদয়বিদারক বাক্য শুনে জায়িনের চোখ ছেড়ে উষ্ণ, আর্দ্র কণা বিসর্জন হয়ে গড়িয়ে পড়েছিলে নাওফিলেরই কপালে। তা দেখে কান্না করে বসেছিল ছোট্ট নাওফিলটাও৷ কাউকে কাঁদতে দেখলে আপনা থেকেই ওর কান্না পেয়ে যেত যে! কিন্তু জাকির শেখ তাতে আরও মরিয়া হয়ে বাচ্চা ছেলেটার মন না বুঝে জায়িনের বুক থেকে ওকে কেড়ে নিতে উঠে পড়ে লাগেন।
পারেনি সে রাতে জায়িন মানুষটি ফিরে যেতে নাওফিলকে নিয়ে৷ পুলিশের কাছে ধরা পড়লেও ওকে আটকে রাখা যায়নি। কী করে যেন গাড়ি থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাস্তার মাঝেই, পুলিশরা গাড়ি থামিয়ে সতর্ক হতে হতেই সে পালিয়ে যায়।
চির স্মরণীয় ওই রাতের একটুখানি স্মৃতিও ম্লান হয়নি নাওফিলের মন, মস্তিষ্ক থেকে। আর জাকির শেখের ধারণা ওইটুকু বাচ্চাটা তা কি আর মনে রেখেছে?
জায়িন আর আয়মান নিজেদের নামের প্রথম আর শেষ অক্ষর দিয়ে জান নামটাই নির্ধারণ করেছিল নাওফিলের জন্য। জান বলেই ওকে ডাকত ওরা দুজন। জাকির যখন ওকে দেশে নিয়ে এলেন তখন সেই নাম বদলে মিহাদ আর নিহাদের সাথে দুই চাচা মিলিয়ে রাখলেন ডাকনাম জাদ । যার অর্থ- কঠোর পরিশ্রমী, বিজয়, সাফল্য। আর দাদা মাহতাব শেখ রাখলেন নাওফিল বিন জায়িন। কিন্তু নামের শেষে জাকির বিন জায়িন কোনোভাবেই মেনে নিলেন না। শুধু হলো নাওফিল শেখ জাদ। দাদা ছাড়া বাড়িতে নাওফিল জাদ সম্বোধনই পায় সকলের থেকে।
খুব ছোটোবেলার ওই রাতের ঘটনার প্রভাব নাওফিলের মস্তিষ্কে আর হৃদয়ে কঠিনভাবে প্রভাব ফেলে এগারো বছর বয়স থেকে। জাকির শেখ তখন নতুন নতুন রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন বাবার সঙ্গে। নাওফিলের কাছাকাছি খুব কম সময়ই থাকতে পারতেন তিনি। তবে এই নাওফিলকে নিজের কাছে নিয়ে আসার পরিকল্পনা থেকেই তিনি জীবনে দ্বিতীয় নারীকে গ্রহণ করেছিলেন। খুশিও মন প্রাণ উজার করেই ভালোবেসে যাচ্ছেন আজও নাওফিলকে। কিন্তু নাওফিল যতই বুঝতে শিখল প্রতিদিন, ততই আশেপাশের মানুষ আর আত্মীয় স্বজন থেকে শুনতে থাকল নিজের বাবা-মায়ের নামে অসংখ্য ভর্ৎসনা আর জাকির শেখের জন্য শুধুই প্রশংসা। যিনি নিজের ছোটো ভাইয়ের সন্তানকে জন্ম দেওয়া সন্তান থেকেও বেশি ভালোবাসেন, দায়িত্ব নিয়েছেন মানুষের মতো মানুষ করার। চুরি করে ভাইয়ের থেকে না নিয়ে এলে বাচ্চা ছেলেটাও নিশ্চয়ই বড়ো হয়ে বাবা-মায়ের মতো সন্ত্রাস হত! তবে রক্ত বলেও তো কথা থাকে৷ না জানে বড়ো হলে বাপ মায়ের ধারাও পেতে পারে আবার।
সত্যিই কি তাই হত? এগারো বছরের কিশোর নাওফিলকে এগুলো খুব ভাবাত৷ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে নাওফিল মিষ্টভাষী আর খুব মিশুক ছিল ছোটো থেকেই। কিন্তু এই নানানরকম আলোচনা আর সে রাতের পুরো ঘটনার স্মৃতি নাওফিলকে উদাসীন করে তোলে দিনদিন। তাছাড়াও বাবা হিসেবে জাহিদ শেখকে তার দুই ছেলের জন্য যেমন দেখত ও, জাকির শেখকে তেমনভাবে দেখা যায়নি কখনও। তাকে কাছেই পায়নি ও সেভাবে! আবার কাছে পেলেও তিনি খুব একটা বাবা স্নেহে কথাও বলতেন না ওর সাথে। তার কণ্ঠে গম্ভীরতায় বেশি প্রাধান্য পেত। অন্যায় করলে, ভুল করলে সব থেকে বেশি শাসনটনও তিনিই করতেন। আর সেটা আজও।
জাকির শেখকে নিয়ে মনের মধ্যে বিদ্বেষ, রাগ ষোলো সতেরোটা বছর ধরে একটু একটু করে নাওফিলের অন্তরে জন্ম নিয়েছে। নাওফিল খুঁজে চলেছে নিজের বাবা-মা’কে, একটি মাত্র খালামনিকে আর বোনের মৃত্যুটা আদৌ সত্য কি না তার রহস্য। যার জন্য জাইমাকেও খুঁজতে বাদ রাখছে না সে৷ যদি জাইমার মাধ্যমে আলিয়ার কোনো হদিস মিলে থাকে! সেই আশায়। চাইলেই এই খোঁজের মাধ্যমটা জাকির শেখ হতে পারত। যিনি অনেক কিছুই জানেন। কিন্তু নাওফিল জানে, এ জীবনে জাকির শেখ কখনই তাকে কিচ্ছু খুঁজে পেতে সাহায্য করবেন না। তাই তো দীধিতির পরিচয় আর ওর উদ্দেশ্য জানার পর থেকে বাধ্য হয়ে আবারও ওকে নিয়ে নতুন এক পরিকল্পনা করে ফেলল। যাকে ভালোবাসতে না চেয়েও ভালোবেসে ফেলল বলে নিজের এলোমেলো জীবন থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিলো। আজ আবার তাকেই না চাইতেও খেলার গুটির মতো ব্যবহার করতে হচ্ছে। অপরাধবোধ খুব হলেও নাওফিল তার চেয়েও বেশি চায় জাকির শেখের শাস্তি। তবে ধ্বংস নয়।
বিমানবন্দর থেকে সরাসরি নিজের ফ্ল্যাটে এসেছে নাওফিল। ইয়াসিফ ওকে আর তাওসিফকে নামিয়ে দিয়ে জরুরি কাজে চলে গেছে সে। শেখ বাড়ি থেকে দাদীর কল আসছে, জাকির শেখের স্ত্রী খুশিও কল করে যাচ্ছেন লাগাতার তাওসিফকে। নাওফিলের নির্দেশে বেচারা তাওসিফ কল রিসিভ করতে পারছে না তাদের। সব সময় ভাইদের কারণে মসিবতে পড়ার জন্যই বোধ হয় তার জন্ম! জাকির শেখ চাননি নাওফিল এত তাড়াতাড়ি দেশে ফিরুক। সেই রাগেই নাওফিল গেল না তাদের কাছে।
ফ্ল্যাটের লক খোলার আগেই ওরা দু ভাই লক্ষ করল দরজা ভেতর থেকে লক করা। এই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আজ সাত মাস যাবৎ দেশেই ছিল না। তাহলে ভেতরে কে থাকতে পারে! তাওসিফ ভ্রু’কুটি করে প্যান্টের পেছন থেকে লাইসেন্স করা পিস্তলটা বের করে নিলো৷ এই বিশেষ জিনিসটি উপহার পেয়েছে সে স্বয়ং মাহতাব শেখ থেকে। সেদিনের কিডন্যাপ ঘটনাটির পরই এই উদ্যোগ তার৷ তাওসিফ মোটেই এসব পকেটে নিয়ে বহন করতে রাজি ছিল না। কিন্তু ইয়াসিফ যখন বলল, আজ-কাল সত্যিই ওদের শত্রুসংখ্যা বেড়েছে। ব্যবসায়িক কারণেও, রাজনৈতিক কারণেও। যেহেতু তাওসিফ দেহরক্ষী নিয়ে চলতে নারাজ— তাই নিজেকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে। একমাত্র ইয়াসিফের কথাকে গুরুত্ব দিয়েই আজ এটি প্যান্টের পেছনে রেখেছে সে।
নাওফিল ওকে হাত উঠিয়ে থামতে ইশারা করল, ওটাকে জায়গামতো রাখারও নির্দেশ দিলো। তারপর কলিংবেল চাপতেই ভেতর থেকে মিনিট দেড়েক পরই কেউ এসে দরজাটা খুলল।
তুষার! সে অভ্যর্থনা জানাতে থালা থেকে গাদা আর গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছুঁড়তে থাকল নাওফিলের মুখ ভরে৷ পেছনে এসে দাঁড়াল তখন সবুজ, শিহাব, রাতুল৷ মুখভর্তি হাসি তাদের৷ এক সুরে বলে উঠল, ‘অভিনন্দন, আমাদের ভবিষ্যত জননেতা! অভিনন্দন।’
-‘নিব্বি পোলাপান একেকটা! চল পথ ছাড় সবগুলো!’ বিরক্তিতে ধমকেই উঠল তাওসিফ।
লাগেজ নিয়ে সে গটগট করে ভেতরে এসেই ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। এতে কেউ ওর অভিব্যক্তি নিয়ে ভ্রুক্ষেপও করল না। ওরা জানে তাওসিফ নিজেই একটা বিরক্তিকর মানুষ৷ যার বেশি মানুষের মধ্যে থাকতে ভালো লাগে না, প্রেম করতে ভালো লাগে না, গান শুনতে ভালো লাগে না। আরও অনেক অস্বাভাবিক আচরণ রয়েছে তার মধ্যে। তার জন্য কেউ ওর আশেপাশেও ভিড়তে চায় না। উপরন্তু বড়ো ভাই!
-‘এর জন্যই তোদেরকে আগেভাগে কিছু বলতে চাই না। সবগুলো এত ড্রামাটিক কেন তোরা?’ নাওফিল কাঁধের ওপর থেকে, মাথার ওপর থেকে ফুলগুলো ঝাড়তে ঝাড়তে ভেতরে এলো।
রাতুল বলল, ‘ড্রামার তো শুরুই হলো না, উডবি লিডার। দাঁড়াও একটু, সবুর করো।’
সবুজ হা হা করে হাসতে হাসতে বলল, ‘আর সবুর করতে হবে না। পিছে তো দেখো।’
বলতে বলতেই সবাই দরজার পানে তাকাল। রুমান চোরের মতো চেহারা করে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখাচ্ছে উদ্বাস্তু মানুষদের মতো। নাওফিল কতক্ষণ ওর হাল দেখে শেষে বলল, ‘কোনো সাহায্য চাইতে এসেছেন? কিন্তু আমি তো এই সময় কোনো যাকাত দিই না।’
সবাই এক সঙ্গে হাসির সুর তুলল। তাওসিফও ফোন স্লাইড করতে করতে ঠোঁট টিপে হাসল। রুমান অনেক আগেই অনুতপ্তবোধ করছে। এমনকি দীপ্তর সঙ্গেও এক চোট মারামারি হয়ে গেছে ওর। তবে সেদিনের ঘটনা থেকে একটা শিক্ষা ও অর্জন করেছে। সব সময়ই স্বচক্ষে দেখা ঘটনাও ভুল হতে পারে। মামা, খালুর লবিং ছাড়া এই বাজারে সরকারি চাকরি পাওয়া এতটাও সহজ না। জাকির শেখ সম্পর্কে খালু ছিলেন বলেই যত সহজে চাকরিটা পেয়েছিল সে আবার তত সহজেই হারিয়েও গেছে। মাফ চেয়েছে সে একবার খালুর কাছে। কিন্তু তিনি মুখ তুলে তাকিয়েও দেখেননি ওকে। নিজের অপরাধবোধ থেকে ডিপ্রেশনেও ভুগেছে সে এতদিন। তাই তো চাকরির খোঁজও করাও ছেড়ে দিয়েছে।
মাথা নত করে ভেতরে এসে সে নিঃশব্দেই নাওফিলকে জড়িয়ে ধরল, ‘মাফ কর না ভাই! এতদিন আমার কল তুলিসনি। আজকে কথা না বললে আমি তোকে ছাড়বই না।’
-‘ক্লাস ফাইভে থাকতে একবার রাগের চোটে তুই আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলি, জাদ। আমি কিন্তু হসপিটালে শুয়েও তোকে খুঁজেছি তাও।’ তাওসিফ ফোনে চোখ আটকেই বলল তখন।
নাওফিল ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে উত্তর দিলো, ‘তুই বড়ো তাই তোর মনও বড়ো। আমি ছোটো তাই আমার মনও ছোটো। আমি মাফ করলেও তোর মতো বড়ো করে মাফ করতে পারলাম না, ছোটো করে করলাম।’
-‘নে, ড্রামার এন্ডিং টান এখন। আমাদের পার্টির খানাপিনা সব বাসি হয়ে যাচ্ছে। খাবো কখন?’ পিৎজার বাক্সটা খুলতে খুলতে বলল শিহাব।
রুমানকে উদ্দেশ্য করে বলল তখন নাওফিল, ‘চাকরি যাওয়ায় ভালো খাবার দাবার খেতে পারে না এই অসহায় ছেলেটা। সবার ভাগ থেকে এক ভাগ খাবার একে দিয়ে দে। অসহায়, দরিদ্রকে সাহায্য করার জন্য সওয়াব পাবি মেলা৷’
রুমানের মুখটা আরও মলিন হয়ে গেল এসব কথায়। নাওফিল তবুও থামল না, ‘দ্যাখ টাকা পয়সা চাস না আমার কাছে। চার বছর পর ইলেকশন করব। এখনই জনগণকে ইমপ্রেস করার কাজে লেগে পড়তে হবে আমাকে। প্রচুর টাকা দরকার আমার। তোর খালু তো আর দেবে না৷ আমাকেই কামায় করে জোগাড় করতে হবে। তাই ভুলেও আমার কাছে হাত পাতিস না।’
রুমান এগিয়ে এসে বসল তাওসিফের কাছে, আহত গলায় বলল, ‘বড়ো ভাই, ও আমাকে এখনও মাফ করেনি বলে এরকম করে বলছে। আমি কি ওর পা ধরে মাফ চাইব?’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ২৬
-‘তাও পাবি না। শিওর থাক।’ বলেই নাওফিল হাতের লাগেজটা নিয়ে ঘরে চলে গেল। তবে যেতে যেতে বলে গেল, ‘আমার ন্যারো মাইন্ডেড ফ্রেন্ড চাই না। তোকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি হসপিটালের বিছানায় শুয়েই। তুই এখন যেতে পারিস আমার বাসা ছেড়ে।’
