Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৪

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৪

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি

কফি কালার শার্টের হাতার বোতামগুলো লাগিয়ে নিতে নিতে নাওফিল রাশভারী চেহারা ধরে গভীর, শীতল চোখে চেয়ে দেখছে তন্দ্রাচ্ছন্ন দীধিতিকে। রাত দুটোর পরের গল্পটা ওদের সত্যিই প্রচণ্ড রোমাঞ্চিত ছিল। যে গল্পটা শুরুর কৃতিত্ব তো ছিল দীধিতির। কিন্তু শেষ অবধি গল্পটা পরিপূর্ণ করতে হয়েছে নাওফিলকেই। আসঙ্গের পর মৃহূর্ত থেকেই ভেবে চলেছে সে দীধিতির ব্যাপারটা। তেইশ বছর সম্পন্ন হওয়া একটা মেয়ে এত নাজুক কী করে হতে পারে? মনের দিক থেকেও, আবার শরীরের দিক থেকেও! বিয়ের প্রথম রাতের হিসেব না হয় আলাদা। তাই বলে আজও পুরোপুরি নুইয়ে পড়বে? এ তো আচ্ছা জ্বালা হলো! নিজেই চাইল, তাই তো সেও সম্মত হলো চাওয়া পূরণে। দেওয়া নেওয়া শেষে তাহলে এমন মরার মতো পড়ে থাকার মানে কী? এই মুহূর্তেই যদি ঐশী চলে এসে দেখতে পায় বান্ধবী তার সেদিনের মতোই ভেঙেচুরে পড়েছে স্বামীর মহিমায়! কী রকমটা ভাববেই না ওকে! আহ্ লজ্জা! আর যেটা ভাববে সেটা নিঃসন্দেহে রুমানকে গিয়েও জানাবে মেয়েটা। তখন বাকি বন্ধুদেরও জানতে বাকি থাকবে না৷ হুটহাট ওকে নির্ঘাত এ কথা বলেই খেপাতে থাকবে প্রথম দিনের মতো, ‘ওরে ভাই, কী খেয়ে অশ্বক্ষমতা বানাইলি, ভাই?’

রাতভর দুজনে আর ঘুমায়নি ওরা৷ এমনিতেই বেজে গিয়েছিল রাত সাড়ে তিনটা৷ তারপর ঘুমিয়ে পড়লে পাছে ফজরের নামাজ মিস হয়ে যেত। তাই আজান দিলে দীধিতিকে নিয়েই পাক পবিত্র হয়ে একত্রে নামাজ আদায় করে নেয়৷ মসজিদে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও দীধিতির অবস্থা দেখে আর যেতে পারেনি নাওফিল।
নামাজ শেষেই আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে দীধিতি আধ ভেজা চুল নিয়েই চাদরের পরিবর্তে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়ে। শোয়ার পর অসহায় গলায় নাওফিলকে বলে, ‘এসি অফ করে ফ্যানটা স্লো মোশনে দিয়ে দাও না প্লিজ! আমার খুব শীত শীত করছে, শরীরও ব্যথা করছে। জ্বর টর আসবে বোধ হয়!’
ক্যাবলারামের চেহারা হয়ে যায় নাওফিলের তখন। শরীর ব্যথা, জ্বর আসা, এসব কী! ও কি খুব বেশিই উন্মত্ত হয়ে গিয়েছিল? যার জন্য শেষে কিনা অসুস্থই হয়ে পড়ল বউটা!
জায়নামাজ ভাঁজ করে এসিটা অফ করে দেয় সে দীধিতির কথা মতোই। ফ্যান ছেড়ে বউয়ের কাছে এসে বসে গালে হাতের উলটো পিঠ ছোঁয়ায়, তাপমাত্রা স্বাভাবিকই অবশ্য। জিজ্ঞেস করে, ‘পেইন কিলার খেতে হবে না কি?’

-‘হবে না কি মানে কী? আমি তো ঘুম উঠেই খাবো। আজ তুমি খুব ওয়াইল্ড ছিলে। ইচ্ছা করে করেছ, না? বর্বর মানুষ একটা! যাও তো, ঘুমাতে দাও।’
অপ্রতিভ দেখায় সে সময় নাওফিলকে। দীধিতি গাল থেকে ওর হাতটা সরিয়ে ওপাশ ফিরে চোখ বুঁজে গেছে। চার ঘণ্টা ঘুমানোর আশায় বউয়ের থেকে সামান্য দূরত্ব রেখে শুতে হয় ওকে। ঘুমানোর আশায় চোখ বুজলেও দীধিতির অভিমানী অভিযোগগুলো মনে করে ভাবে, বাকি দিনগুলো তো এখনও পড়েই আছে সামনে। তখনও যদি এমন করেই প্রতিবার অভিযোগ জানায় ওকে দীধিতি, তাহলে তো সমস্যা। বউ না ঘর ছেড়ে পালায় তখন! ছিঃ ছিঃ কী লজ্জাকর ঘটনা হবে এমনটা হলে! লোকে কী বলবে নাওফিলকে? আবার দীধিতির দিকটা ভেবেও অপরাধবোধ হয় কিঞ্চিৎ। প্রথম রাতে যতখানি দীধিতির প্রতি যতখানি সাবধান আর যত্নশীল ছিল, আজ ততটা ছিলই না।

তারপর সকাল সাড়ে সাতটার অ্যালার্মে নাওফিলের ঘুম ভাঙলে সে অফিস যাওয়ার তাড়ায় অলসতা ছেড়ে উঠে পড়ে। ফ্রেশ হয়ে নিজেই ফ্রিজ থেকে গতকালের খাবার বের করে গরম করে দীধিতিকে ডাকতে আসে৷ দু’বার ডেকে সাড়া না পেলে গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিতেই টের পায়, দীধিতি ভোরবেলা সত্যিই বলেছিল। আসলেই গায়ে জ্বর চলে এসেছে বউটার। ব্যাপারটা দেখেই নাওফিলের মুখভঙ্গি আবারও বোকা বোকা হয়ে ওঠে। এটা কোনো কথা হলো? যাহ্, খুব বেশি ঝামেলা না হলে আর কখনও কাছেই ঘেঁষবে না সে দীধিতির! মনেমনে পণ করে দীধিতিকে ডেকে তোলে। জ্বরে পড়ে চার ঘণ্টার মাঝেই চেহারার ভাব বদলে গেছে তার। চোখ, মুখ লাল হয়ে করুণ অবস্থা৷
-‘নাশতা গরম করেছি। উঠে খেয়ে-দেয়ে জ্বর আর ব্যথার ওষুধ খেয়ে দাও।’
দীধিতি পুনরায় চোখ বুজে ফেলে অলস কণ্ঠে জানায়, ‘আমার ঘুম পুরো হয়নি এখনও৷ ঘুম থেকে জেগে খেয়ে নেব৷ তুমি খেয়ে নাও, যাও।’

-‘আমি অফিস যাব। তোমাকে খায়িয়ে দিয়ে যেতে চাইছি।’
-‘আহা কথা বাড়িয়ো না তো! অফিস যাও তুমি৷ আমি আমার মতো উঠে খেয়ে নেব বললাম তো।’
শরীরের অবস্থা চিন্তা করে জোর করতে পারল না নাওফিল এরপর আর। সারাজীবন প্রত্যাশা করে এলো সে, বিয়ে করলে নিজের মায়ের মতো কঠিন ধারার কোনো মেয়েকেই করবে৷ অথচ হলো কোনো সম্পূর্ণ উলটো। তাও আবার যে সে নরম-সরম নয়৷ একদম স্পঞ্জ কেকের মতো। এই মেয়ে কিনা আবার নিজের বাপ, শ্বশুরের মতো গোয়েন্দা হতে চায়? হুহ্!

বেরিয়ে যাওয়ার আগে নাওফিল কিছু কথা বলে যেতে চেয়েছিল দীধিতিকে। কিন্তু ঘুমিয়ে বউ ওর রীতিমতো নাক ডাকতে শুরু করেছে। তাই বাধ্য হয়ে সিনেমার নায়কদের মতোই চিরকুট লিখল — ‘আমি দুপুরের মধ্যেই ফিরব, ইন শা আল্লাহ। আমার না ফেরা অবধি বাসা থেকে বের হবে না। আর এর মাঝে বাসায় অ্যালাওড করতে পারবে নিজের তিন বান্ধবী আর আমার পাঁচ বন্ধুকে শুধু। এর বাইরে যে-ই আসুক দরজা খুলবে না৷ তোমার পরিবার থেকে আর আমার পরিবার থেকেও কেউ আসবে না আজ। নিশ্চিত হয়েই বলছি। কলিংবেল বাজলে অবশ্যই আগে ডোর-হোল দিয়ে দেখে নেবে। এবং সবশেষে সকালের নাশতা করে রেস্ট নেওয়া শেষে যদি ভালো লাগে দুপুরে নিজের হাতে কিছু একটা রেঁধো। বউয়ের হাতের রান্না তো খাওয়ার কপালই হলো না এখন পর্যন্ত। না পারলে সমস্যা নেই। কলে করে জানিয়ো। আপাতত দুপুরের খাবার বাইরে থেকে কিনে আনব৷ কিন্তু রাতে তোমাকেই রাঁধতে হবে। জ্বর-টর বলে মাফ পাবে না। আলসে বউ আমার! একদিনও শখ করে রান্নাবান্না করলে না।’

সাদা কাগজের চিরকুটটা দীধিতির শিথানে রেখেই বেরিয়ে পড়ে ও।
বেলা দশটার সময় ফোনের বারবার ভাইব্রেশনের ফলে ঘুম ভাঙে দীধিতির৷ খোলা বেলকনি থেকে রোদের তির্যক রশ্মি ছুটে আসছে ঘরে। প্রচণ্ড তাপ আজ রোদের৷ এসি বন্ধ আর ফ্যান ধীর গতিতে চলছে বলে গরম লাগছে বেশ। তবে জ্বরটা নামেনি এখনও। গা’টাও ব্যথা কমেনি। ঘুম ভাঙতেই ক্ষুধার তীব্রতাও টের পেল সে। তাই আর পড়ে থাকল না বিছানায়। হাত-মুখ ধুয়েই নিচে নেমে আসলো। ডাইনিং-এ এসে দেখল খাবার সাজানো টেবিলে। নাওফিল একা একা নাশতা করে অফিস গেছে ভেবে একটু মন খারাপ হলো। নিজেকেও বকল দু’একটা ভদ্র গালি দিয়ে৷ খাওয়া শেষে ওষুধ নিয়ে ভাবল ঐশীর কাছ থেকে একটু ঘুরে আসবে। তারপর ফিরে এসে কিছু রান্নাবান্না করবে আজ। গত ক’দিন কেমন যেন ওই বাংলোতে থাকতে কোনো কিছু করতেই ভালো লাগত না। নাওফিল মুখ ভার চলত ওর সামনে। এটা দেখেই সব আনন্দ, উত্তেজনা ফিকে হয়ে যেত। আজ সব ঠিক, তাই মনটাও ফুরফুরে।
ঘরে ফিরে গুছিয়ে নিতে নিতে হঠাৎ মনে পড়ল কেউ একজন কল করছিল ওকে বারবার। অচেনা নাম্বার বলে রিসিভ করতে ইচ্ছা হয়নি তখন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটা ভুল হয়ে গেছে। জাইমা বা শ্বশুর বাড়ির অন্য কেউও তো হতে পারে। ধুর, কী যে করে না ও!
বালিশের পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে অচেনা নাম্বারে কল করল। কিন্তু রিসিভ হলো না। খেয়াল করল একটা মেসেজও এসেছে নাম্বারটা থেকে, ‘Didhiti, please pick up the phone.’

দীধিতি কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে আরও ক’বার কল করল সেই নাম্বারে৷ ওর মন বলছে ওটা ওর মাম্মামই হবে। জাইমা যদিও কল করলে সব সময় প্রাইভেট নাম্বার লেখা ওঠে। কিন্তু দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন তিনি বিয়ের আগে। দীধিতি ধারণা করছে, জাইমা নিশ্চিত দেশে এসেছেন।
অনবরত তাকে কল করার মাঝেই পাখির কিচির-মিচির আওয়াজ বেজে উঠল। কলিংবেল বাজছে। দীধিতি দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখল বেলা এগারোটার কাছাকাছি। অচেনা সেই নাম্বারে কল করতে করতেই ও নিচে নেমে আসলো দরজা খুলতে। কিন্তু দরজার ডোর-হোল থেকে দেখার কথা খেয়ালই হলো না ওর ফোনের ওপাশের ব্যক্তি কল না তোলার দুশ্চিন্তায়। নাওফিলের রেখে যাওয়া চিরকুটটাও দেখেনি সে৷ ঘুমের মাঝে দীধিতি নড়াচড়া করার সময় ওটা কম্বলের ভেতর চলে গেছে বলে চোখে পড়েনি ওর।
দরজার ওপাশের ব্যক্তিটা খুব বিরক্তিকর আচরণ করছে। বিরতিহীন কলিংবেল চেপে যাচ্ছে বলে দীধিতি রেগে উঠল, ‘আরে খুলছি তো! এত অধৈর্য কেন?’ বলেই দরজাটা খুলে দিলো।
সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিতে একজন মধ্যবয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে। মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক, চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা আর মাথায় সাদা টুপি। ওকে সালাম জানিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘নাওফিল বাসায় আছে কি, মামনি?’

একটু জড়তা নিয়ে সালাম জানিয়ে উত্তর দিলো দীধিতি, ‘জি না আঙ্কেল, ও তো অফিসে।’
-‘ওহ। আমি নতুন ভাড়াটিয়া। এসেছি বাসা ভাড়ার চুক্তিপত্র নিয়ে একটু কথা বলতে। তুমি তো ওর ওয়াইফ, তাই না?’
-‘হ্যাঁ।’
-‘অসু্বিধা না থাকলে তোমার সঙ্গেই কথা বলে যাই৷ নাওফিল ফিরলে তুমি ওকে জানিয়ে দিয়ো না হয়।’
কেমন যেন পরিচিত লাগছে দীধিতির লোকটাকে। তবে ধরতে পারছে না ঠিক। মোটা কণ্ঠটাও মেকি লাগছে৷ কিন্তু তাও চেনা চেনা৷ ইতস্ততভাবে লোকটার মুখপানে চেয়ে থেকে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো তাকে। ভেতরে আসতে বলে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল সে। অমনি লোকটা তড়িঘড়ি করে চলে এলো ভেতরে। তা দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল দীধিতির। দরজা আটকে ড্রয়িং কর্নারে চলে এলো তাকে নিয়ে। সোফায় ওরা মুখোমুখি বসলে লোকটা ঘরের চারপাশে নজর ঘোরাতে ঘোরাতে প্রশংসা প্রকাশে বলে উঠল, ‘বাসার ইন্টেরিয়র ডিজাইন তো দেখছি ভালোই করেছে তোমার স্বামী! চোখ বুজে টাকা ঢেলে গেছে, তাই না? অনেক সাধনার বউ জিতেছে বলে কথা!’

বিস্ময়ে কিংকতর্ব্যবিমূঢ় দীধিতি৷ অস্ফুটে ‘আপনি দীপ্ত?’ শুধিয়ে বিস্ফুরিত চোখে তাকিয়ে থাকল সামনের মানুষটির দিকে।
ঘরের এলাহি সাজসজ্জা দেখতে দেখতে বেখেয়ালেই দীপ্ত নিজের কণ্ঠে বলে ফেলেছে কথাগুলো। দীধিতির চমকিত গলায় নিজের নাম শুনে চকিতে তাকায় ওর দিকে। একটু ঘাবড়ে গেলেও পরমুহূর্তেই মনে পড়ে নাওফিল নেই। সারা বাসায় দীধিতি একা৷ এ সুযোগেই তো আসা তার! কিছু না করেও সে ভিলেন এখন দীধিতির কাছে। অথচ এই মেয়েটাকেই জয় করতে চেয়েছিল বলে কত কষ্টই না দিয়েছিল তাকে নাওফিল জানোয়ারটা! তারপরও ভেবেছিল দীধিতি সব জানার পর ভাববে, ওর জন্যই তার ওই পরিণতি হয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব দিলে অপরাধবোধ আর অনুতপ্তবোধ থেকে নিশ্চিত রাজিও হয়ে যাবে৷ আর নাওফিলকে ক্রিমিনাল ভেবে করবে অসম্ভব ঘৃণা। সত্যি সত্যি তা-ই হলো। কিন্তু তার বদলে থাকল নাওফিল, আর নাওফিলের বদলে সে। দীধিতি কী করে পারল ওই সাইকোপ্যাথ নাওফিলকে বিয়ে করতে? সেই সাথে ওর সাথে করল সমস্ত জায়গা থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তিন তিনটা মাস যে কষ্টটা সহ্য করেছে সে ওই এক ঘরে বন্দি থেকে! তার প্রতিশোধ কি না নিয়েই ছেড়ে দিতে পারে সে? নাওফিল ক্ষমতাবান ঘরের ছেলে হলে সেও সমান সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন ঘরের ছেলে। কম কীসে? বরং সে মনে করে নাওফিলের থেকেও তার যোগ্যতা বেশি সকল দিক থেকে। তবুও কেন দীধিতি তাকে প্রত্যাখ্যান করে নাওফিলকে গ্রহণ করল? তিন মাসের যন্ত্রণা প্রথমে হারেহারে টের পাওয়াবে আজ সে দীধিতিকে। তারপরের শিকার করবে নাওফিলকে।
মুখের মাস্ক, চোখের চশমা আর মাথার টুপি ফেলে দিয়ে মুচকি হেসে দীধিতিকে বলল, ‘মেকআপটার পিছে খরচ পড়েছে অনেক, বুঝলে? তুমি যদি আমাকে চিনে যেতে প্রথমেই, তাহলে মেকআপ আর্টিস্টের দুঃখ ছিল নসিবে।’

দীধিতি দাঁড়িয়ে পড়েই কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার না নাওফিলের এই অ্যাপার্টমেন্টের সামনেও আসাও বারণ? সিকিউরিটি ঢুকলে দিলো আপনাকে?’
-‘ঢোকার মতো ব্যবস্থা করে নিয়ে ঢুকেছি গো৷ আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আর এক্স গফ বিয়ে করল আমাকে দাওয়াত ছাড়াই! আমার কি কষ্ট লাগেনি বলো? থাকতে না পেরে বিনা দাওয়াতে তাই নিজেই চলে এলাম দেখতে তোমাকে৷ সম্পর্কে তাহলে এখন তুমি আমার ভাবি, আমি তোমার দে—বর। তাই তো?’
দীধিতির ভয় হতে শুরু করল এখন। দীপ্ত এমন ছদ্মবেশে কেন এসেছে? দেবর কথাটাকে অমন ব্যঙ্গ করা বলার অর্থ নাওফিলের পাশে বউ হিসেবে ওকে মোটেও সহ্য করতে পারছে না দীপ্ত৷ নাওফিলও তো খুব কড়া গলায় আদেশ দিয়েছিল, যেন কোনোভাবেই দীপ্তর সঙ্গে যোগাযোগ না করে সে। এ জীবনে আর দীপ্তর সঙ্গে কখনই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হওয়ার সুযোগ নেই। সম্পর্ক বদলে এখন যেটা হয়েছে তা হলো শত্রু এবং প্রতিদ্বন্দী৷ তুষার, শিহাব, ওদের মুখেই শুনেছিল দীপ্তর বাবা আগামী নির্বাচনে এমপি প্রার্থী হিসেবে ভোটে দাঁড়াবে৷ এবং নাওফিলের প্রতিদ্বন্দী হিসেবেই। মাহতাব শেখ আসন ছেড়ে দেবেন নিজের ছেলের জন্য৷ জাকির শেখ সে আসন পাওয়ার জন্য নির্বাচন করবেন। আর তার বদলে নাওফিল করবে এমপি নির্বাচন। এটাই আগামী নির্বাচনের পরিকল্পনা শেখ পরিবারের।

কিন্তু এই মুহূর্তে বিপদ কীভাবে সামলাবে দীধিতি? দীপ্ত যে কোনো কু পরামর্শ নিয়েই এই রূপে প্রবেশ করেছে, তা বুঝতে অসুবিধা হলো না ওর। এই বিপদ থেকে বাঁচতে হলে উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োজন এখন। কিন্তু কিছুই মাথায় আসছে না ওর৷ হাত-পা থরথর করে কাঁপছে আসন্ন বিপদের আশঙ্কা করে। তা দেখে দীপ্ত মিটিমিটি হাসে ওর দিকে চেয়ে। আর সে হাসি দেখে দীধিতি আর দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত পায়ে সিঁড়িতে উঠে পড়ল। উদ্দেশ্য ঘরে গিয়ে দরজা আটকে ফোন করবে আগে রুমান বা ঐশীকে। হাতের নাগালে এখন ওরাই আছে।
কিন্তু যা ভাবা হয়, তা যে করা সম্ভব হয় না সব সময়ই।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৩ (২)

দীপ্তও ওর পিছু ছুটে ধরে ফেলল ওর ওড়নাটা। আর এক টানে সেটা পুরোটাই নিজের কব্জায় নিয়ে নিলো। আঁতকে উঠে দীধিতি এক পল থমকে গিয়েও দাঁড়িয়ে থাকার ভুল করল না। প্রাণপণ দৌঁড়ানোর চেষ্টা করল ঘরে যাওয়ার জন্য৷ দুর্ভাগ্য, এবারও ধরা পড়ল দীপ্তর হাতে। দৌঁড়ে এসে দীপ্ত পেছন থেকে জাপটে ধরল একদম শক্ত করে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here