আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘স্মরণকে কবে জানাবি? ওকে তো দ্রুত জানানো উচিত৷ ওর জীবনের লক্ষ্যই তো এটা। যার জন্য শেখ বাড়ির পুত্রবধূ হওয়া ওর।’
এমন কথায় নাওফিলের গভীর ভাবনার সুতো কাটল। তাওসিফের চোখে চোখ রাখতেই বুঝল, দীধিতির প্রতি তার এখনও অসন্তোষ মনোভাব মুছেনি। অপ্রকাশিত সত্য হলো, মুছে যায়নি নাওফিলের অন্তর থেকেও। দীধিতি ওকে ভালোবাসে, এখানে মিথ্যা নেই ঠিক৷ কিন্তু এ কথাও সত্য, দীধিতির জীবনের অজানা সত্য উদ্ঘাটনের জন্য যে কোনো পন্থায় সে অবলম্বন করতে পারে৷ প্রয়োজনে নাওফিলের অবাধ্যও দীধিতি হতে পারে।
কিন্তু সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? নিজের অস্তিত্বের সঠিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া অপরাধ নয় বটে। কিন্তু তাই বলে স্বামীর পরোয়াও করবে না দীধিতি, এমনটা হলে তা মেনে নেওয়া অসম্ভবই হবে নাওফিলের জন্য।
-‘জানাব নিশ্চয়ই। ওর জানার অধিকার আছে। কিন্তু আমি সেই সময়টাকেই অনুভব করছি, মিহাদ। যেদিন নিজের বাবা-মায়ের পরিচয় জেনে যতখানি আনন্দিত হবে ও, ততটাই কি বিধ্বস্ত হবে না যখন জানবে পৃথিবীতে ওর আগমনটা বৈধভাবে ছিল না। মনির দুঃসহ জীবনের গল্প ওকে শক্ত রাখতে পারবে না৷ সেই সাথে তখনই জন্মদাতার প্রতি ঘৃণার উদ্রেক হবে। এতগুলো কষ্টের ধাক্কা সামলানো সহজ হবে না ওর জন্য। আর এই মুহূর্তে তো বলাই যাবে না। সুস্থ হোক, আরও কিছু সময় যাক, তারপর জানাব৷’
-‘তাছাড়া আমার মনে হয় স্যামুয়েলেরই ঔরসজাত ও, সেটারও সঠিক প্রমাণ তোর হাতে রাখতে হবে। আর এটাও জানতে হবে, কেন ওই লোক এখনও জেরিন আন্টিকে নজরবন্দি রেখেছে এবং কেন সে আর বাংলাদেশে এসে স্মরণের খোঁজ করেনি।’
-‘হুঁ, এজন্যই এখনই কিছু জানাব না স্মরণকে। আমাকে অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে এর মাঝেই। আমার অনুমান বলে, স্মরণকে বাংলাদেশে এসে আর না খোঁজার পেছনে আমার আব্বুর ভূমিকা আছে। হয়ত আব্বুর বাধাতেই স্যামুয়েল আর দেশে পা রাখেনি।’
তাওসিফ কিছুটা দ্বিধাজড়িত গলায় বলল, ‘তাই যদি হয় তাহলে এখন তো ছোটো কাকু নিখোঁজ। এখন কেন সেই বাধা স্যামুয়েল মানবে?’
-‘সেটাই। অনেক কিছু জানার আছে। যার জন্য এবার অস্ট্রেলিয়া গিয়ে এই লোকটার সঙ্গে দেখাও করতে হবে বোধ হয়। মনিকে এতটা কাল পরাধীনের মতো বাঁচতে হচ্ছে তার জন্য৷ কেন তাকে ভালোভাবে বাঁচতে দিচ্ছে না সে, সেটা জানতে হলেও তার কাছে যেতে হবে আমার।’
রাত সাড়ে বারোটা অবধি মাভিশা অনড় বসেছিল ইয়াসিফের পাশে। চেয়ারে বসেই এক সময় ঘুমের কোলে ঢোলে পড়ে সে। বারান্দাতে বসে সে সময় তখন ফ্লোরেন্স সারাটা সময় অপরাধবোধে দগ্ধ হচ্ছিল৷ চোখ বুজলেই ইয়াসিফের চেতনাশূন্য মুখটা ওর চোখে ভাসে কেবল। কেমন অবস্থাতে আছে ছেলেটা, তা দেখার জন্যও বারবার ঘরের দরজায় উঁকিও দেয়। একটা সময় পর আবারও ঘরে যেতেই মাভিশাকে বারবার ঢুলে পড়তে দেখে। তখন তাকে বারান্দাতে রাখা ডিভানে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে সে। তারপর থেকে এখন রাত দুটো অবধি ফ্লোরেন্স বসে আছে ইয়াসিফের পাশে। স্যালাইনটা শেষ হতেই সেটা খুলে দিয়ে ইয়াসিফের গায়ের তাপমাত্রা চেক করে৷ জ্বরটা ছেড়েছে দেখে স্বস্তি পেল খুব৷ ঘাম ছুটছে এখন। নিস্তেজ ছেলেটার ফর্সা রোমশ বুকে বিন্দু বিন্দু ঘামের অস্তিত্ব পেয়ে টেবিলে রাখা তোয়ালেটা হাতে তুলে ফ্লোরেন্স তার গলা, বুক মুছে দিলো। বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল তখন ইয়াসিফ। মাভিশাও ঘুমিয়ে। শুধু ঘুম আসে না ফ্লোরেন্সের। নিখোঁজ মানুষটার জন্য অনেক রাতই সে নির্ঘুম কাটায় এখন।
হঠাৎ প্যান্টের পকেট থেকে পেনড্রাইভটা বের করে ল্যাপটপে সংযুক্ত করে নিলে ফ্লোরেন্স। একটা ভিডিয়ো চালু করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল প্রৌঢ়া এক মানুষের মুখ। মুখের ভাঁজ পড়া চামড়ায় চমৎকার এক হাসি টানলেন তিনি ফ্লোরেন্সের উদ্দেশ্যে।
-‘আমার সোনা, মমকে মিস করছ? এসে আমাকে না পেয়ে রেগেও আছ খুব, তাই না? আ’ম স্যরি সোনা। আমি তোমার চোখে পানি সহ্য করতে পারি না। তাই জানানোর সাহস হয়নি আমার কেয়ারলেসের জন্যই কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজে অ্যাটাকড্ হয়েছি। আমার হতাশগ্রস্ত জীবনে তুমি খুব বিরক্ত আমি জানি। আমি কেন সুখী রমণী না, কেন তোমার প্রিয় এডওয়ার্ডকে ভালো রাখতে পারিনি, এসবের উত্তর আমি বাংলাদেশ থেকে এসে জানাব তোমাকে। তবে যে প্রশ্নটার উত্তর না পেয়ে তুমি অভিমান করে বাসা ছেড়েছিলে, সে প্রশ্নের উত্তর তোমাকে এখনই জানাই। আমি সত্যিই তোমার মম নই। সারোগেট মমও নই। কিন্তু তুমি আমার খুব আপন মানুষের সন্তান। তাই আমারও সন্তান। তোমার ব্লাড লাইন বাংলাদেশেই। তোমার বড়ো একটি ভাইও আছে, সোনা। আমি ইচ্ছা করেই যার কথা তোমাকে জানাইনি এতটা দিন। কিন্তু আজ-কাল আমি মৃত্যুর ঘ্রাণ পাই। মৃত্যুর ঘ্রাণ যে আমার খুব পরিচিত ঘ্রাণ৷ তাই টের পাচ্ছি মৃত্যুদূত আমার আশেপাশেই ঘুরছে৷ এজন্যই শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তোমার নিজের মানুষগুলোর কাছে তোমার অস্তিত্বের জানান দিতে এসেছি। তোমাকে একা ফেলে মরতে পারব না, আমার বাচ্চা।
আমার প্রিয় মারিহাম, তুমি আমার কাছে শুধু আমানত নও… তুমি আমার একমাত্র বোনের অংশ। তোমাকে যত্নে বড়ো করে তোলার জন্যই নিজেকে বারবার পালটেছি, টিকিয়ে রেখেছি নিজেকে। নয়ত আমার মুখটাই যথেষ্ট ছিল তোমার জীবনটাও ধ্বংস হওয়ার জন্য। কিন্তু আমি খুব শীঘ্রই ফিরে আসব, সোনা৷ তোমার ভাইকে সঙ্গে করেই ফিরব। তারপর তোমাকে সব বলব। ততদিনে এডওয়ার্ডের কাছেই থেকো। আমি ওর জন্য সঠিক ছিলাম না। আমার প্রকৃত চেহারা দেখলে ও আর আমাকে ভালোবাসতে পারবে না। মৃত্যুর আগে সত্যটা ওকেও জানিয়ে যাব। ওকে শুধু বোলো, এলিন পরিচয়ে ধোঁকা দিয়েছি ওকে আমি৷ আ’ম আলিয়া। যুগের পর যুগ যাকে ওর মতো পুলিশ অফিসার তালাশ করে বেরিয়েছে। আমাকে নিয়ে চিন্তা নিয়ো না, মা। বাংলাদেশী ফোন নাম্বারটা তোমাকে পাঠিয়ে দেবো মেসেজ করে।’
ভিডিয়োটা এরপরই সমাপ্ত। যতবার এটা দেখে ফ্লোরেন্স, ততবারই বেসামাল কান্নায় ভেঙে পড়ে সে৷ আলিয়া হোক বা এলিনা, মা বলে ডাকতে শিখেছে এই মানুষটিকে দেখেই। ওর জীবনে যে আপন মানুষগুলোর অপ্রাপ্তি, তা সম্পর্কে ওর কোনোই আগ্রহ নেই৷ শুধু খুঁজে পেতে চায় এই মা’কে। অত্যধিক বিষণ্নতায় সারাক্ষণ ডুবে থাকতেন আলিয়া মদ্যপানে। আজ তার লিভারটাও তাই ধ্বংসের পথে। লিভার ক্যান্সারের এই ভয়াবহ সত্যটা ওকে জানানোর সাহস পায়নি আলিয়া৷ কিন্তু তার একমাত্র প্রেমিক পুরুষ এডওয়ার্ডের কাছ থেকে সত্যটা জেনেই সকল অভিমান ভুলে যেদিন ফ্লোরেন্স ছুটে এসেছিল বাড়ি, সেদিন আলিয়ার ঘরে এই পেনড্রাইভ আর একটা চিরকুট ছাড়া মা’কে খুঁজে পায়নি সে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল৷ বাংলাদেশে আলিয়ার আগমনের প্রায় দেড় মাস পর সে ফিরেছিল বাসায়৷ তারপর বহু চেষ্টা করেও মায়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি সে৷
তাই শেষমেশ ছুটে আসতে হয় ওকে এখানে৷ এই অচেনা দেশে কোথায় কীভাবে খুঁজবে মা’কে, তার জন্য বোনের মতো বন্ধু মাভিশা চলে আসে ওকে সাহায্য করতে আর সঙ্গ দিতে। পরবর্তী দেড় মাস ধরে মাভিশার সহযোগিতাতেই খোঁজাখুঁজির একটা পর্যায়ে আলিয়ার ফোনটা ট্রেস করতে পারে ওরা গাজীপুর শেখ বাড়ির কাছাকাছিই৷ সেখানে চলাচল করা প্রায় সকল মানুষকে আলিয়ার ছবি দেখিয়ে অবশেষে জানতে পারে শেখ বাড়ির গেটের বাইরে এই বৃদ্ধাকে এক দুপুরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে৷ দুপুরের পর ওই রাস্তাতে তাকে আর দেখা যায়নি৷ এবং আলিয়ার দামী ফোনটা মিলেছিল ওই বাড়ির গেটের সিকিউরিটির কাছেই৷ এরপর তাকে এক রাতে তুলে এনে অনেক মারধোর করার পর সে মুখ খুলেছিল, ‘ইয়াসিফ স্যারের গাড়িতে ওই মহিলারে যাইতে দেখছিলাম। আর তার ফোন তহন গাড়ির জানলা দিয়া ফিক্কা মাইরা আমারে গাড়ির ড্রাইভার কইছিল ফোনডা ভাইঙ্গা ফেলাইতে। আমি ভাঙ্গি নাই৷ খালি তার সিম খুইলা আমার সিম ভরছি। এছাড়া আর কিচ্ছু জানি না আমি, সত্যি কইতাছি।’
তার থেকেই শেখ বাড়ির সকল সদস্য সম্পর্কে জেনে নেয় ওরা৷ বহু ছক কষে, নানা উপায়ে পরিকল্পনা করে তারপর মাভিশা ছুটে যায় রাঙামাটি। ইয়াসিফের বাড়ি সে আশ্রয় পেতেই এরপর ফ্লোরেন্সের আগমন হয় সেখানে।
মারিহাম– এই নামটা কখনই পছন্দ ছিল না ওর৷ ফ্লোরেন্স নামটা আঙ্কল এডওয়ার্ডের দেওয়া৷ কিন্তু আলিয়া যখনই খুব আদর স্বরে ডাকতেন ওকে, তখন এ নামেই ডাকতেন। ওই সময়গুলোতে সে বিরক্ত হলেও এখন আর হয় না। এখন এই ডাকটাকেই সে খুব বেশি ভালোবাসে। দু’হাতের মাঝে মুখটা ঢেকে বিড়বিড় করে প্রলাপ করে চলল, ‘আমি তোমার মুখে আবার কবে মারিহাম শুনব, মম? কবে তোমায় দেখা পাবো? ভাইকে চাই না আমি, কাউকেই চাই না। তুমি ফিরে এসো। আমি জানতে চাই না কাউকেই৷ আর কখনই তোমাকে জিজ্ঞেস করব না। শুধু ফিরে এসে আমাকে মারিহাম বলে ডাকো। তুমি ছাড়া কেউ নেই এ নামে ডাকার।’ অসংখ্যবার শেষের বুলি আওড়ে গেল ফ্লোরেন্স।
-‘এই মারিহাম, এবার থামো প্লিজ।’ আচমকা ঘুমমাখা, কোমল স্বরে অনুরোধ রাখল ইয়াসিফ।
চমকে গিয়ে ফ্লোরেন্স মুখ তুলে তাকাতেই কোল থেকে ল্যাপটপটা পড়ে গেল ওর। নির্জন রাতের শব্দশূন্য ঘরে আওয়াজটা বেশি হওয়ায় বিরক্ত হলো ইয়াসিফ। ‘অসুস্থ মানুষকে সেবা দেওয়ার ম্যানারিজম তোমার জানা নেই, মারিহাম। সেবা করতে এসে এভাবে রোগীর ঘুমের ডিস্টার্ব করে কেউ?’
ভারী শ্বাস ফেলে ফ্লোরেন্স নিচে থেকে ল্যাপটপটা তুলে নিলো। ‘স্যরি বয়। প্লিজ য়্যু স্লিপ৷ আ’ম নট মেকিং নয়েজ এনিমোর।’
-‘আমার মাথা ধরেছে খুব ঘুমটা ভেঙে যাওয়াতে৷ সো য়্যু শুড প্রেস মাই হেড আউট অফ গিল্ট।’
কেন যেন ফ্লোরেন্স কোনো আপত্তি করল না৷ চেয়ার ছেড়ে ইয়াসিফের শিথানে বসে তার ঢেউ খেলানো ঘন চুলে হাত ডুবিয়ে দিলো। আর ঠিক তখনই ওর খেয়াল হলো, ইয়াসিফ ওকে মারিহাম বলে ডাকছে বারবার। ত্বরিতগতিতে উঠে পড়ল আবার। ইয়াসিফের ওপর কিছুটা ঝুঁকে পড়ে শক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি সবটা শুনেছ?’
ইয়াসিফ নির্বিকার চাহনিতে কতক্ষণ ফ্লোরেন্সের চোখে চেয়ে থেকে অপ্রত্যাশিত জবাব দিলো, ‘তোমার মমকে খুঁজে পেতে আমি সর্বোচ্চ হেল্প করব, মারিহাম। তুমি খুব প্রেশিয়াস৷ শুধু তোমার মমের কাছেই নয়। গোটা শেখ পরিবারের কাছেই।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৭
ব্যথায় জর্জরিত এতটা ভঙ্গুর দেহে থেকেও কি ইয়াসিফ মিথ্যা বলতে পারে? সেটাই ভাবল ফ্লোরেন্স৷ বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে তাকে৷ কিন্তু তবুও সন্দেহের জায়গাতে ইয়াসিফই তো অপরাধী।
-‘আমাকে প্লিজ সব খুলে বলো৷ আর আমাকে বিশ্বাস করো। তোমার মমকে যদি কেউ খুঁজে দিতে পারে, সেটা কেবল আমিই। আমাকে বিশ্বাস করলেই তুমি সব কিছু জানতে পারবে।’
-‘সবটা কী জানতে পারব?’ মৃদুস্বরে শুধাল ফ্লোরেন্স।
-‘তোমাকে যেটা জানাতেই তোমার মম দেশে এসেছিলেন।’
