আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি
শরীর খুব একটা ঠিক লাগছে না কারোরই। নাওফিলের গানের কারণে তবুও বিছানা ছাড়তে হলো সবাইকেই। যদিও ডেভিডসন আর জেরিন সবার আগে জেগে দুজন একসঙ্গে নাশতা প্রস্তুত করেছেন। নাশতা খেয়েই ডেভিডসনকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে ডিউটির জন্য। তবে দুপুরের মধ্যেই তিনি আবার ফিরবেন।
নাওফিলের মতো তাওসিফকেও গতরাত থাকতে হয়েছে বউ ছাড়া। ডেভিডসনের সঙ্গে থেকেছিল সে। আর কিরণকে থাকতে হয়েছিল মাভিশার সঙ্গে। দীধিতি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মাকে খুঁজতে খুঁজতে ডাইনিং-এ আসতেই নাওফিলকে দেখা গেল একা একাই খেতে শুরু করেছে সে। তাওসিফ, ইয়াসিফ, কাউকেই দেখা গেল না। ওরা একে অপরকে দেখল বটে, কিন্তু নাওফিলের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়ার ভঙ্গিমা দেখে দীধিতির ভ্রুদ্বয়ের মাঝে ভাঁজ পড়ল। তাকে দেখে অপরিচিতের মতো অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে নাওফিল। এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে চেয়ার টেনে বসে জিজ্ঞেস করল, ‘কখন উঠেছ? সবার কি ব্রেকফাস্ট শেষ?’
-‘আমার প্রায় শেষ, শুধু সেটাই জানি।’ বলে পানি এক চুমুকে শেষ করে উঠে পড়ল নাওফিল।
ওর অদ্ভুত আচরণে একটু অবাক হলেও হঠাৎ জেরিনকে বাসায় ঢুকতে দেখে দীধিতি আর পাত্তা দিলো না ওকে। হাতে সতেজ, সুন্দর কতগুলো অর্কিড ফুল তার৷ নিজের বাগান থেকে তুলে এনেছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ সে গতকাল থেকে যতই দেখছে মা’কে, ততই তার দেখার তৃষ্ণা বাড়ছে৷ ঢিলেঢালা একটা শার্ট আর পালাজো প্যান্ট মায়ের পরনে। মুখে অনাবিল হাসি। দীধিতির কাছে মা’কে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর নারী মনে হচ্ছে।
-‘ঘুম ভেঙে গেল এত জলদি?’ নাওফিলের কাছে আসতে আসতে প্রশ্ন রাখলেন জেরিন। মেয়েকেও ডাইনিংয়ে পেয়ে হাসিটা আরও উজ্জ্বল হলো তার।
-‘ঘুম ভাঙার ব্যবস্থা করেছি। তুমি কোথায় ছিল? লনে?’ নাওফিল জিজ্ঞেস করল।
-‘হ্যাঁ’, ফুলগুলো বাড়িয়ে দিলেন তিনি নাওফিলকে। ফুলের ঘ্রাণ নিয়ে সে আবার ফিরিয়ে দিলে জেরিন বললেন ওকে, ‘সকালে ওখানে বসে কিছুক্ষণ সময় না কাটালে ভালো লাগে না। তোমরা ব্রেকফাস্ট শেষে যেয়ো।’
-‘আমার শেষ৷ তোমার খুকি বসে আছে তোমার জন্য। নাশতা করোনি নিশ্চয়ই? একসঙ্গে খেয়ে নাও।’
হাসলেন জেরিন নাওফিলের তিরস্কারে। নাওফিলের হাত ধরে ওকে দীধিতির পাশে বসিয়ে দিলেন আবার। ফুলগুলো একটা ফুলদানি রেখে ফিরে এসে বসলেন ওদের সঙ্গে। নাওফিলকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কফি নিয়েছিলে?’
-‘না, পাইনি।’
দীধিতি মাকে দেখার পর থেকে কেমন যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে। সে শুধু দর্শকের মতো চেয়ে চুপচাপ দেখতেই থাকছে৷ জেরিন নাওফিলকে কফি দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ঘুম কি ভালো হয়েছে, মা?’
-‘হয়েছে।’ মৃদৃস্বরে বলে একটু হাসল দীধিতি।
মেয়ের জন্য প্লেটে নাশতা সাজিয়ে নিতে আরম্ভ করলেন তিনি। এর মাঝেই বাকি চার সদস্য একে একে এসে হাজির হলো। ঘুম ঠিকমতো কারোরই হয়নি৷ তবে সেটা শুধু ইয়াসিফের চেহারাতেই প্রকাশ পাচ্ছে৷ মেজাজও একটু বেশিই খিটখিটে হয়ে আছে তার। জোর করে মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে শুভ সকাল জানাল জেরিনকে। টেবিলে খাবারের বহর দেখে তাওসিফ হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘আমার ক্ষুধা লেগেছে ভাতের। আন্টি কি ভাত রাঁধেননি?’
অমন বাচ্চাদের মতো করে বলতে দেখে জেরিন আর মাভিশা না হেসে পারল না। আর কিরণ বিরক্তির সঙ্গে বিব্রতবোধও করল, বরের ছেলেমানুষি আচরণে।
-‘এখন একটু কষ্ট করে খাও, বাবা৷ দুপুরে একদম বাঙালি সব আইটেম করা হবে, কথা দিচ্ছি।’
-‘ঠিক আছে’, বলে প্লেট টেনে নিলো তাওসিফ৷ ‘কী আর করা!’
সবাইকেই খাবার পরিবেশন করে দিয়ে জেরিন দীধিতির পাশে এসে বসতেই দীধিতি আকস্মিক আবদার গলায় বলল তাকে, ‘তোমাকে মা বলে ডাকব আমি?’
সাধারণ একটি কথা। কিন্তু কয়েক পলের জন্য সবার হাতের কাজই থেমে গেল সে কথায়। দীধিতি খুব নিচুস্বরে বলতে চেষ্টা করেছিল কথাটা৷ কিন্তু সবাই কেমন করে যেন শুনে ফেলল৷ তা দেখে প্রচণ্ড লজ্জা লাগলো তার৷ গালদুটোই লালিমাভাব দেখে জেরিন মেয়ের অবস্থা টের পেলেন৷ দাঁড়িয়ে পড়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন চকিতে। দীধিতিও সবার দৃষ্টি থেকে বাঁচতে মায়ের কোমর আঁকড়ে পেটের মাঝে মুখ লুকাল৷ তবে হাসল না কেউ-ই। নাওফিল কফির মগটা নিয়ে উঠে চলে এলো ড্রয়িংরুমে, ইয়াসিফ নাশতায় মনোযোগ দিলো। তাকে দেখে বাকি তিনজনও ব্যস্ত হলো খাবার প্লেট নিয়ে। জেরিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদুস্বরে বললেন, ‘মা বলেই ডাকো আমাকে। কিন্তু তোমার সব ডাকেই তো আমার আত্মা তৃপ্তি পাচ্ছে, সোনা। তুমি যা ডেকে শান্তি পাবে, তাই বলেই ডাকবে। ঠিক আছে?’
ডেভিডসন ছিলেন একজন ক্যাথলিক। বিবাহিত জীবন খুব বেশি সুখকর ছিল না তার৷ দুই মেয়ে, এক ছেলের বাবা তিনি। স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কটা ঝুলে থাকার মতো হলেও তিন সন্তানের সঙ্গে খুব মজবুত একটা বাঁধন ছিল তার, যখন ছেলে-মেয়েরা ছোটো ছিল। কিন্তু তারা বড়ো হতে হতে প্রত্যেকের মাঝে স্বাধীনচেতা মনোভাবট এমনভাবে প্রকট হলো যে, খারাপ সঙ্গ বা ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে মেয়েদুটোর অবাধ মেলামেশা তিনি বন্ধ করতে পারলেন না৷ উলটে শাসন করতে গিয়েই সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেল৷ তারপরই স্ত্রীও ঝুলে থাকা বৈবাহিক সম্পর্কটাকে পুরোপুরি কেটে দিলো আইনিভাবে। এভাবেই দিনগুলো যেতে যেতে একটা সময় আবিষ্কার করলেন, এই পৃথিবীতে পুরোদস্তুর একা মানুষ তিনি। সন্তানেরাও দূরে সরে গেছে, কালেভদ্রে বাপের সঙ্গে দেখা করতেও আসে না তারা। জীবনের গত ছ’টি বছর অসংখ্য নারী আর অ্যালকোহলের সঙ্গেই কেটেছে তার৷ ভাগ্যের চক্রে একদিন জেরিনের সঙ্গে পরিচয় হলো, জেরিনের চেম্বারে৷ মানসিক শান্তির জন্য নিজেকে পরিবর্তন করতে সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তারপর থেকেই বন্ধুত্ব তাদের৷ একে অপরের প্রতি তারা মনের টান অনুভব করলে তা দুজনকে দুজন জানানোর তাগিত অনুভব করল যখন, তখন নাওফিল কিছুদিনের জন্য এসেছিল এখানে৷ সে সময়ই জেরিন ওকে জানান ডেভিডসনের ব্যাপারে৷ ডেভিডসনের সঙ্গে আলাপ করে তাকে পছন্দ হয় নাওফিলের। নির্দ্বিধায় জেরিনকে এগোতে বলে সে৷ তবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা দুজন দুজনকে আরও ভালোভাবে বোঝার এবং জানার জন্য বন্ধুত্বের সম্পর্কটাতেই আপাতত আবদ্ধ থাকে।
সন্ধ্যা ছ’টা।
ড্রয়িংরুমেই প্রত্যেকে বসে আছে৷ কোনো আড্ডা চলছে না। পরিবেশটা একটু গম্ভীর। ডেভিডসনের ব্যাপারে দীধিতি মোটামুটি সবটাই জেনেছে নাওফিলের থেকে৷ তাতে পজিটিভই দেখা গেছে তাকে। সেজন্য ডেভিডসন ফেরার পর থেকে তার সঙ্গে বেশ স্বাভাবিক আচরণই করেছে দীধিতি। এখন তাদের মাঝে আলোচনার বিষয়বস্তু স্যামুয়েল টেলর। তার বিষয়টি নিয়ে কথা শুরু হতেই ড্রয়িংরুমের পরিবেশ গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
-‘তুমি বলছ স্যামুয়েলের মুখোমুখি হওয়া উচিত স্মরণের?’ গমগমে সুরে জিজ্ঞেস করলেন জেরিন নাওফিলের কাছে।
-‘যেটা কাল হলেও হতে হবে৷ সেটা আগে হলে বোধহয় সমস্যা নেই, মনি।’
-‘সমস্যা নেই?’ ভীষণ বিস্মিত হলেন জেরিন। রাগটাও বাড়তে থাকল ধীরে ধীরে। ‘তাহলে আমি কেন আমার সন্তানকে বিসর্জন দিয়েছিলাম, নাওফিল? আমার মেয়ে বাংলাদেশে আছে তা জানা সত্ত্বেও কেন আমি যাইনি তাকে খুঁজতে?’
আপাতত কোনো জবাব দিলো না নাওফিল৷ জেরিনকে কথা শেষ করার সুযোগটা দিলো সে। দীধিতি মায়ের গা ঘেঁষে বসে আছে চুপচাপ। মা আর স্বামীর কথাবার্তা শেষ হলে তারপর সে নিজের মতামত জানাবে।
-‘ওই কুখ্যাত মাফিয়ার ছায়াও যেন আমার মেয়ের জীবনে না পড়ে, আমার মেয়ে যেন স্বাভাবিক জীবন পায়, সেজন্যই তো ওকে রেজার হাতে তুলে দিয়েছিলাম।’ ক্ষোভের সঙ্গে বললেন জেরিন।
তার চেয়েও যে ব্যাপারটা সত্য তা হলো– স্যামুয়েলের চোখে দীধিতির জন্য যে নিখাদ পিতৃস্নেহ দেখেছিলেন জেরিন, তা দেখেই প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয়েছিল তার মনে। ভয়াবহ পরিকল্পনাটা তাই হাসপাতালের বিছানাতে শুয়েই করে ফেলেছিলেন। যে পরিকল্পনা সফলের জন্য তিনি নিজেও ত্যাগ স্বীকার করলেন। কিন্তু বাজি ধরলেন রেজার জীবনটা৷ স্যামুয়েল যেন দীধিতিকে ছুঁতে অবধি না পারে, সেজন্য রেজার ভালোবাসাকে ব্যবহার করেছিলেন তিনি স্বার্থপরের মতো। স্রেফ প্রতিশোধের নেশায়৷ এই গোপন সত্যটি তিনি কোনোদিন কারও কাছে প্রকাশ না করলেও নাওফিল তা ঠিকই বুঝে গেছে আরও বহু আগেই৷ মুখ ফুটে এ কথাগুলো বলল না সে। শান্ত সুরেই জানাল জেরিনকে, ‘মনি, আমি কেন চাইছি স্মরণ স্যামুয়েল টেলরের মুখোমুখি হোক, তা তুমি বুঝতে পারোনি। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, আজ না হোক কাল এই বাড়ির নিরাপত্তার দেওয়াল ভেঙে স্যামুয়েল টেলর প্রবেশ করবেই। স্মরণের আগমন এবং পরিচয় গোপন থাকবে না তার কাছে।’
-‘কেন গোপন থাকবে না?’ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন জেরিন। ‘কে জানাবে তাকে? আমি না তুমি?’
-‘তার ক্ষমতা।’ গম্ভীর মুখে উত্তর দিলো নাওফিল।
-‘কীসের ক্ষমতা? তুমি আমাকে ডিএনএ রিপোর্ট না দেখালে আমি কি জানতাম স্মরণের কথা? তাহলে স্যামুয়েল জানবে কীভাবে?’
পুরো বিষয়টি খুব ঘোলাটে করে ফেলছেন জেরিন। রাগের চোটে স্বাভাবিক ব্যাপারগুলোই তিনি বুঝতে পারছেন না৷ তাওসিফ বা ইয়াসিফ এ নিয়ে মুখ খোলার আগে ডেভিডসন বললেন জেরিনকে, ‘ও ঠিক বলছে, জেরিন। স্যামুয়েল স্মরণের কথা জানবেই। কোনো ডিএনএ রিপোর্টের প্রয়োজন পড়বে না তার। তুমি হয়ত ভুলে গেছে তার ক্ষমতার ব্যাপারে। ভুলে গেছ, তুমি আজও তার নজরবন্দি৷ আমি যতই তোমার টাইট সিকিউরিটির ব্যবস্থা করি, স্মরণকে চিনতে পারা মাত্র এই সিকিউরিটি ভেঙে এই ঘরে পৌঁছনো তার জন্য মামুলি ঘটনা।’
-‘কিন্তু সে কীভাবে জানবে? আমাকে বোঝাও!’ রাগের সঙ্গে অধৈর্যভাবও প্রকাশ পেলো জেরিনের কণ্ঠে।
-‘খুবই সিম্পল৷’ কাঁধ ঝাঁকালেন ডেভিডসন। ‘তুমি ঠান্ডা মাথায় ভাবলেই তা ধরে ফেলতে। ঠিক আছে, বোঝানোর দায়িত্বটা আমিই নিচ্ছি। স্যামুয়েল টেলর তোমারই মতো বছরের পর বছর স্মরণকে পাবার অপেক্ষায় আছে, জেরিন। এটা বিশ্বাস করো?’
-‘কখনই না।’ জেদি গলায় বললেন জেরিন। ডেভিডসন হতাশায় মাথা দুলালেন। বললেন, ‘বিশ্বাস করা উচিত ছিল তোমার৷ এতগুলো বছর লোকটা অপরিসীম ধৈর্যের সঙ্গে তোমাকে নজরবন্দি করে রাখছে। কেন? নিশ্চয়ই তোমাকে ভালোবেসে নয়? তাহলে আমি তোমার জীবনে আসতে পারতাম না। তুমি স্বাধীনভাবেই বিদেশে যাতায়াত করতে পারছ। তাতেও লোকটার বাধা নেই। কিন্তু নজরের বাইরে রাখছে না তোমাকে৷ তুমি স্মরণের কাছে যাবে বা স্মরণ একদিন তোমার কাছে ফিরবে। এই অপেক্ষাতে আছেন তিনি। সে মানুষ হিসেবে খারাপ হলেও আমি বাজি ধরে বলতে পারি, বাবা হিসেবে খুবই ভালো লোকটা। নয়ত আটাশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া মেয়ের জন্য বছরের পর বছর এমন অপেক্ষায় থাকত না।’
-‘তাছাড়া সে চাইলে বাংলাদেশে আবারও গিয়ে রেজা হককে খুঁজে বের করতে পারত।’ ইয়াসিফ বলল কথাগুলো, ‘তার জীবনে হানা দিতে পারত। কিন্তু সে এখানে তার আরও একটি ভালো গুণের পরিচয় দিয়েছে৷ তা হলো আমার ছোটো চাচার বন্ধুত্বের দাবি সে ফেলে দেয়নি। অর্থাৎ জায়িন চাচা স্যামুয়েলকে থামতে বলেছিলেন। সে সত্যিই থেমেছিল। অমন ক্ষমতাধর মাফিয়া চাইলে বাংলাদেশের মতো ছোটো একটি দেশ থেকে রেজা হককে খুঁজে বের করতে কি পারত না? স্মরণের প্রতি ভালোবাসা তার নিখাদ ছিল বলেই বাস্তবতাটা সে বুঝতে পেরেছিল৷ সেই সময়ে শুধু আমার চাচার জীবনই ঝুঁকি সম্মুখীন হয়নি৷ তারা জায়িন মাহতাবের কাছের বন্ধু হিসেবে রেড মার্ক তাদের নামের পাশেও পড়েছিল। তাই দৌড়াদৌড়ি, লুকোচুরি তাদেরকেও করতে হচ্ছিল। ওই মুহূর্তে স্মরণকে সে চাইলেও নিজের কাছে সব সময় রাখতে পারত না। এজন্যই সব পরিস্থিতি বিবেচনা করে রেজা হককে নিষ্কৃতি দিয়েছিল সে। তাই বলে স্মরণের আশা সে ছেড়ে দেয়নি। তার প্রমাণ আন্টিকে তার নজরবন্দি রাখা।’
-‘তাহলে পরে কেন আর স্মরণকে খুঁজতে যায়নি সে?’ নিমেষেই প্রশ্ন রাখলেন জেরিন।
-‘এর জবাব তো সেই ভালো দিতে পারবে৷’ জেরিনকে বললেন ডেভিডসন। ‘কিন্তু তুমি অবিশ্বাস করতে পারো না যে, সে আজও অপেক্ষায় আছে স্মরণের৷ এই বাসায় নতুন একজন মানুষ আসছে যাচ্ছে, তা কি স্যামুয়েল টেলরের সেট করে রাখা টিকটিকিগুলো জানাবে না তাকে? স্মরণের ছবি কি পৌঁছবে না তার কাছে? তোমার চেয়েও বহু দূরদর্শী দৃষ্টি তার, বিচক্ষণ আর ধীমান। স্মরণকে দেখে ওর ব্যাপারে সমস্ত তথ্য বের করে ফেলা কোনো ব্যাপারই না তার জন্য। আর যদি মুখ দেখেই নিজের ছাপ ধরে ফেলতে পারে, তাহলে তো আর কথায় নেই।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮২
নিজের সিদ্ধান্ত থেকে নড়চড় হচ্ছেন না জেরিন। তিনি কিছুতেই চান না স্যামুয়েল জানুক দীধিতির আগমনের কথা। তাই দীধিতিই মুখ খুলল এবার। মাকে বলল, ‘আমি শুনেছি তিনি বর্তমান আরও দুজন ছেলে-মেয়ের বাবা। তাই আমি যে তার একমাত্র সন্তান, ব্যাপারটা তা নয়। তিনি তোমার থেকে কেড়ে নেবেন বা তোমার কাছে ফিরতে দেবেন না, এমন কোনো আশঙ্কাও নেই। কারণ, আমি তো সেই দুধের শিশ নই এখন। আমি অ্যাডাল্ট, মা। তার মুখোমুখি আমার হতেই হবে একদিন৷ সেটা আমি নিজে থেকেই হতে চাই৷’
-‘কেন? তুমি তাকে ভালোবাসো, স্মরণ?’ চকিতেই প্রশ্নটা করে বসলেন জেরিন।
থমকাতে বাধ্য হলো দীধিতি। প্রশ্নটা কি খুব কঠিন? তাহলে চট করে উত্তর দিতে কেন পারছে না সে?
