আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯২
ইসরাত জাহান দ্যুতি
নিজেকে আর আয়মানকে পৃথিবীর কাছে মৃত প্রমাণের সব পরিকল্পনা শেষ জায়িনের৷ আগামীকালই স্যামুয়েলরা আসবে। তারপর ওদেরকে পৌঁছে দেবে ইতালি—এই আনন্দের সংবাদ জায়িন আলিয়াকে জানাল আর উৎফুল্লতা নিয়ে বলল‚ ‘জাদুর ট্রিটমেন্ট খুব জলদিই শুরু হবে‚ মাধু৷ আমি আজ বহুদিন বাদে নিশ্চিন্তে ঘুমাব।’
শেষ কথাটা আলিয়া মনে মনে পুনরাবৃত্তি করে জায়িনকে অভিনন্দন জানাল হাসিমুখে৷ মারিহাম তখন আলিয়ার ঘরে ঘুমাচ্ছিল৷ ঘুমন্ত মেয়েটাকেই কোলে তুলে বুকের মাঝে কতক্ষণ আদর করল জায়িন। তারপর ফিরে গেল নিজের ঘরে৷ যে ঘরে আয়মান অপেক্ষায় তার। ঘরের দরজাটা বন্ধ হওয়া মাত্রই আলিয়া ছুটে গিয়ে দাঁড়াল দরজার গায়ে কান পেতে৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর হাসি ফুটে উঠল আলিয়ার ঠোঁটে।
জায়িনকে দেখা মাত্রই ক্রুদ্ধস্বরে চেঁচামেচি শুরু করেছিল আয়মান জায়িনের ওপর। না‚ জায়িনকে অচেনা বা অপরিচিত ভেবে নয়৷ জায়িন ওর স্বামী‚ ওর সন্তানের বাবা‚ তা স্পষ্টই মনে ছিল আয়মানের৷ কিন্তু সেদিন ওর কণ্ঠে রাগ আর ক্ষিপ্ততা ছিল অন্যান্য দিনের তুলনায় ভীষণ আলাদা আর আচরণ ছিল প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক।
জায়িনের বহুপ্রেমী স্বভাবের সবটাই ভুলে গিয়েছিল আয়মান৷ তাছাড়া নাওফিলের জন্মের পর জায়িন তার হাইপারসেক্সুয়াল ডিজঅর্ডার থেকে সুস্থতা লাভের জন্য নিজ দায়িত্বেই চিকিৎসা নিয়ে যাচ্ছিল৷ তার ফলস্বরূপ এই মানসিক ব্যাধি থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসতে পেরেছিল সে৷ খুব বেশি প্রয়োজন অনুভব করলে আয়মানকেই জোরপূর্বক কাছে টানত। কিন্তু জায়িনের অনুপস্থিতিতে জায়িনের এই অতীত গল্পের কথা আলিয়া জানানো শুরু করেছিল আয়মানকে। এবং শেষমেশ নিজেকে ভিকটিম করে শরীরে বিভিন্ন আঁচড় কেটে আর কামড়ের দাগ বসিয়ে আলিয়া ওকে বলেছিল‚ প্রায় প্রতি রাতেই জায়িন তার কাছে আসে জোর করেই। আর এটুকুই যথেষ্ট ছিল আয়মানকে হিংস্র জানোয়ারে পরিণত করার জন্য।
সুস্থ থাকাকালীনই যে দ্বিতীয় কোনো নারীকে জায়িনের কাছাকাছি সহ্য করেনি! মানসিক অসুস্থ আয়মান সেদিন পশুর মতোই হাতে ছুরি নিয়ে হামলে পড়েছিল জায়িনের ওপর৷ ওর গায়ে হঠাৎ করে সেই আগের মতো শক্তি দেখে জায়িন হতবাক হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ ওই মাদক গ্রহণ করলেই আয়মানের গায়ে অমন দানবীয় শক্তি দেখত সে। সেদিন বুঝতে তার দেরি হয়নি আলিয়াই মাদক দিয়েছিল আয়মানকে৷ ডাক্তারের পরামর্শেই জায়িন তা সংরক্ষণে রাখত। খুব বেশি অসুস্থ না হয়ে পড়লে সে কখনোই মাদক সেবন করতে দিতো না আয়মানকে৷ দিলেও তা কেবল স্বল্প পরিমাণেই৷ কিন্তু আয়মানের আচরণ আর ওর চেহারা দেখে জায়িন বুঝে গিয়েছিল‚ আলিয়া কোনো খারাপ উদ্দেশেই আয়মানকে অতিরিক্ত সেবন করিয়েছিল৷ সব বুঝেও কোনো ফায়দা হয়নি তখন। পালটা আঘাত ছাড়া ওকে ঠেকাতে গিয়ে সে বিভৎসভাবে ক্ষত বিক্ষত হয়েছিল। হাতে‚ বুকে‚ পিঠে‚ গালে ছোটো খাটো আঘাত লাগলেও বিপজ্জনক আঘাতটা পেয়েছিল জায়িন পেটে। বেশ গভীরভাবেই ছুরিটা ঢুকে গিয়েছিল।
যন্ত্রণায় যখন চিৎকার করেছিল জায়িন‚ তখনই থমকে গিয়েছিল আয়মান। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলিয়াও বুঝে গিয়েছিল জায়িন কুপোকাত। তার পরবর্তী পদক্ষেপে পা বাড়িয়েছিল তারপর।
ওদিকে আয়মান নিজের ভুলটা বোঝার পর জায়িনের কাছে ছুটে যাওয়ার বিপরীতে পাগলের মতো প্রলাপ বকতে বকতে ছুরি নিয়ে হঠাৎ দৌড়ে ঢুকে পড়েছিল বাথরুমে। দরজাটা আটকে দিতেই জায়িন টের পেয়েছিল‚ নিশ্চিত নিজেকে আঘাত করবে আয়মান। রক্ত পড়া থামাতে পেটে শক্ত করে আয়মানের ওড়না বেঁধে সে যখন ছুটে গিয়েছিল বাথরুমের সামনে‚ দরজায় আঘাত করতে করতে আয়মানকে আকুল স্বরে ডাকছিল৷ তখনই আচমকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ঘরের ইলেকট্রিসিটি। মারিহামকে নিয়ে আলিয়াও বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছিল সে সময়। এবং তার কিছুক্ষণের মাঝেই শর্ট সার্কিটের কারণে আলিয়ার ঘরে আগুন জ্বলে উঠেছিল৷ সেই আগুন খু্ব অনায়াসেই ছড়িয়ে পড়ছিল সারা ঘরে।
বাথরুমের দরজাটা ভাঙার মতো শক্তিটুকু পাচ্ছিল না জায়িন৷ কিন্তু আয়মানকে বাঁচানোর অদম্য ইচ্ছাটুকু তাকে উতলা করে দিয়েছিল৷ দরজা ভাঙতে যখন ব্যস্ত সে‚ তখন দরজার নিচের ফাঁক গলে পেট্রোল গড়িয়ে আসছিল। হঠাৎ করে ঘরে ধোঁয়া আসতে শুরু করলে জায়িন চমকেছিল খুব। কিন্তু ওই পরিস্থিতিতে একমাত্র আয়মানের চিন্তাতে অস্থির সে। তাই দেখতেই পায়নি সর্বনাশ বয়ে আসছিল ওদের জন্য৷ বহু শক্তি খরচার পর দরজাটা ভাঙতেই রক্তে মাখামাখি বাথরুমের ফ্লোরে দেখতে পেয়েছিল সে হাতে অনবরত ছুরির আঘাত নিতে থাকা আয়মানকে। কাঁদছিল আর বিড়বিড় করে প্রলাপ গাইছিল আয়মান৷ জায়িন ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠেছিল‚ ‘আল্লাহর কসম‚ জাদু‚ থামো। আমাকে বাঁচতে দাও প্লিজ!’
জায়িনের কথাটা আয়মানের মস্তিষ্কে সাড়া না জাগালেও তার রক্ত দেখে হঠাৎ ও উপলব্ধি করেছিল জায়িনকে বাঁচাতে হবে। ওকে দ্রুত জাপটে ধরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছিল ঠিকই৷ কিন্তু দেরি করে ফেলেছিল অনেক৷ ঘরে এত ধোঁয়া আর পায়ের নিচে তেলের অস্তিত্ব অনুভব করতেই জায়িনের ষষ্ঠেন্দ্রীয় জানান দিতে দেরি করেনি‚ আলিয়া মৃত্যু ফাঁদ পেতেছে ওদের জন্য৷ মারিহামকে কী করেছে সে? মারিহাম বেঁচে আছে তো? নিজের ক্ষত‚ আয়মানের ক্ষত ভুলে গিয়ে জায়িন কাতরাতে কাতরাতে দরজা খোলার চেষ্টা করেছিল৷ কিন্তু দরজা বন্ধ৷ ধোঁয়ায় শ্বাস আটকে আসার উপক্রম দুজনের। দরজায় থাবা দিতে দিতে চিৎকার করে জায়িন ডাকছিল আলিয়াকে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে রাজত্ব করা কোনো রাজা নয়৷ কিংবা চতুর কোনো গোয়েন্দা অফিসার নয়৷ সেদিন সন্তানের অসহায় বাবা হয়ে জায়িন চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মিনতি স্বরে আলিয়াকে ডেকে বলেছিল‚ ‘মাধু‚ আমার মারিহামকে কিছু কোরো না। আমার মারিহাম আগুনের আঁচ সহ্য করতে পারবে না। দরজাটা খোলো‚ মাধু৷ আমার মারিহামের জন্য দয়া করো একবার। আমি সব কিছু দিয়ে দেবো তোমায়৷ মাধু‚ দরজাটা খোলো। আমার মেয়েকে মেরো না…!’
বাসাটা ছিল একতলা। জায়িন আর আয়মানের ঘরের বড়ো জানালাটা থেকে বাইরের পথটা চোখে পড়ে৷ ঘুমন্ত মারিহামকে জায়িনের গাড়িতে রেখে আলিয়া সেই জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল৷ অন্ধকার ঘরে কী হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছিল না৷ কিন্তু জায়িনের কান্না গলার কাতর ধ্বনি সে শুনতে পাচ্ছিল৷ সেই কাতর ধ্বনি নির্বিকার দাঁড়িয়ে শুনতে শুনতেই হঠাৎ চোখের সামনেই আগুনের ফুলকি দেখতে পেয়েছিল ঘরের মাঝে৷ এক নিমেষে সারা ঘরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল আগুন। আয়মানকেই প্রথমে দেখেছিল আলিয়া। চিৎকার‚ কান্নাকাটি আর দাপাদাপি করতে করতে মাথা আর মুখ বারবার হাত দিয়ে ঢাকতে চাইছিল সে আগুন থেকে। আস্তে আস্তে ওর সারা শরীরকে গ্রাস করে নিচ্ছিল আগুন। চোখদুটো কয়েক মুহূর্তের জন্য তখন বুজে ফেলেছিল আলিয়া। অনুভব করতে চাইছিল বোনের জন্য একটুখানি কষ্ট৷ যদি কষ্ট অনুভব হত তবে সে বাঁচানোর চেষ্টা করত। কিন্তু বুকের কোথাও কষ্টের অনুভূতি খুঁজে পায়নি সেদিন বোনের জন্য। তাই পুনরায় চোখ মেলে নির্লিপ্তভাবে দেখে যাচ্ছিল বোনের মৃত্যু যন্ত্রণা। তারপর
আবিষ্কার করেছিল জায়িনকে৷ আয়মানকে কমফোর্টারে পেঁচিয়ে ধরার চেষ্টা করছিল সে। তার চেহারাতেও মরণ কষ্ট দেখতে পাচ্ছিল আলিয়া৷ কিন্তু সেই কষ্ট তার অন্তরে কোনো প্রভাব ফেলেনি৷ কেবল নিজের অপমান আর অত্যাচারের প্রতিশোধ ছিল সেদিন তার মাঝে।
আগুনের লেলিহান শিখা জায়িনকেও নিস্তার দেয়নি। কমফোর্টারের মাঝে আয়মানের সঙ্গে নিজেকে আগলে নিতে চাইলেও মুহূর্তের মাঝে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল তা। আগুনের ভয়াবহতা এতটাই হয়েছিল যে‚ আলিয়া দুজনকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারল না আর। কারণ‚ একে অপরের বাহুতে মিশে থাকা অবস্থাতেই পুড়ছিল জায়িন আর আয়মান৷ তাই আলিয়ার কাছে মনে হলো একটা অবয়বই তড়পাচ্ছিল আগুনের মাঝে।
‘আল্লাহ‚ আমাদের বাঁচাও! আমার মেয়েকে বাঁচাও‚ আল্লাহ!’ জায়িনের এই আর্তনাদ ধ্বনি আর আয়মানের কাতর চিৎকার যতক্ষণ হতে থাকল‚ ঠিক ততক্ষণই দাঁড়িয়েছিল আলিয়া৷ যখন আর কোনো আওয়াজ পায়নি না ওদের‚ নিশ্চিত হয়েছিল ইহকাল তবে ত্যাগ করেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডে আখ্যায়িত ‘Mystic killer whale duo’
তারপর আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায়নি আলিয়া। পালিয়ে যায় মারিহামকে নিয়ে৷ নির্জন ওই অঞ্চলে মানুষের আনাগোনা নেহাৎই কম। কেবল যে ব্যক্তির থেকে জায়গাটুকু কিনেছিল জায়িন‚ মাঝেমধ্যে সে এসে খোঁজ নিতো ওদের৷ তাও ছ’মাসে একবার কি দুবার। যদি পরদিনই স্যামুয়েলদের আগমন না ঘটত‚ তবে মাসের পর মাস হয়ত ওই পোড়া বাড়িতে ছাই হয়ে যাওয়া দুটো লাশ একাকীই পড়ে থাকত।
বন্ধু চারজন বোবার মতো হয়ে গিয়েছিল ওই লাশদুটো দেখে৷ কে জায়িন আর কে আয়মান? কোথায় মারিহাম আর আলিয়া? আদৌ ওরা বেঁচে আছে? কী করে ঘটল এই দুর্ঘটনা? না-কি কোনো শত্রু ওদের সন্ধান পেয়ে মেরে গেল? কী করবে প্রিয় বন্ধুর লাশ নিয়ে? স্তব্ধীভূত দেখিয়েছিল চারজনকেই। ছাই হয়ে লাশদুটো মিশে ছিল একজন আরেকজনের গায়ে। শনাক্ত করার কোনো উপায় ছিল না ওদের৷ ছাইয়ের মাঝে জায়িনের হাতের ঘড়ি আর আয়মানের আঙুলের আংটি দেখেই কেবল চিনতে পেরেছিল লাশ দুটো কাদের হতে পারে। কোথাও আলিয়া আর মারিহামের অস্তিত্ব না পেয়ে অবিলম্বেই বুঝে গিয়েছিল‚ বন্ধুর খুনী কে।
‘সারা পৃথিবীর কাছে নিজেদের মৃত বানাতে চেয়েছিলি‚ ভাই। কিন্তু তা যে সত্য করে দিলি। আর তোদের পালিয়ে বেড়াতে হবে না‚ ছদ্মবেশে বাঁচতে হবে না‚ তোদের আর কোনো শত্রু পিছু পড়বে না।’ মাটি খুঁড়ে দুজনের দেহাবশেষ কবরে নামানোর পর জায়িনের উদ্দেশে স্যামুয়েল কথাগুলো বলে উঠেছিল স্তিমিত কণ্ঠে।
আলিয়া ঠান্ডা মাথাতেই এই পরিকল্পনা গুছিয়েছিল দীর্ঘ তিন মাস যাবৎ। মারিহামকে নিয়ে কীভাবে‚ কোথায় লুকাবে সবটাই ভাবা ছিল তার। লন্ডন ঢুকে প্রথমেই নিজের চেহারা বদলানোর কাজে লেগে পড়েছিল সে। স্যামুয়েলরা তাকে খোঁজার চেষ্টা করেছিল শুরুতে। কিন্তু খুব বেশিদিন নিজেদের কাজের বাইরে আর সময় ব্যয় করেনি তারা৷ বন্ধুর মৃত্যুর শোক সয়ে এসেছিল কিনা! যদি চেষ্টাটা করত তবে নিশ্চয়ই খুঁজে পেত আলিয়াকে৷
‘ইট ট্রমাটাইজড মি ফর আ লং টাইম… ফর আ লং টাইম’‚ ফুঁপিয়ে উঠলো মারিহাম। দুহাতের মাঝে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল‚ ‘আলিয়া মেহজাবিন আমার গোটা জীবনের সকল বিশ্বাস‚ আমার জানা সকল সত্যকে ধ্বংস করে দিলো ওই ডায়ারিটা রেখে গিয়ে। আমি ঠিক কতটা ঘেন্না করলে তার আত্মাটা ছটফট করবে কষ্টে? কেউ জানলে বলো৷ আমি ততটাই ঘেন্না করতে চাই তাকে।’
জড়ীভূতের মতো দেখাচ্ছে ইয়াসিফ আর দীধিতিকে৷ অবিশ্বাসের ছাপ এখনো ইয়াসিফের চোখে। জায়িন মাহতাবকে কোনো নারী এমন অসহায় করে মারতে পারে কি আদৌ? বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে খুব ইয়াসিফের। বিমূঢ়তা নিয়েই সে ধীরে ধীরে তাকাল মাভিশার দিকে। ‘ও কী বলছে? এসব কী বলছে ও‚ মাভিশা?’ আঙুল তুলে মারিহামকে দেখিয়ে স্তব্ধ অভিব্যক্তিতেই জানতে চাইলো সে।
মাভিশা দ্বিতীয়বারের মতো এই নির্মম ঘটনা শুনছে৷ তবুও প্রথমবারের মতোই অনুভব করতে পারছে সে মারিহামের কষ্ট। ইয়াসিফের প্রশ্নে চোখের পানি মুছে বলল‚ ‘এই ডায়ারির সন্ধান পেয়েছিল আঙ্কল এডওয়ার্ড। ওখানেই আঙ্কল জায়িনের ফ্রেন্ড চারজনের হদিসও লেখা ছিল। এসবের সত্যতা যাচাই করতে আমরা ছুটে গিয়েছিলাম স্মরণের বাবার কাছে৷ এরপর যখন তিনি আঙ্কল জায়িন আর আয়মান আন্টের কবরের স্থান আর ওই বাড়ির স্থান চেনালেন‚ মারিহাম কেমন যেন হয়ে গেল তা দেখেই৷ ওকে কোনোভাবেই নিতে পারলাম না ইস্তাম্বুল থেকে। নাওফিল ভাই বা তুমি‚ কারও সামনে গিয়ে দাঁড়াবার মতো মনোবল আর সাহস ও পায়নি৷ কিন্তু এই যন্ত্রণা একা বয়ে বেড়াতেও আর পারছিল না৷ নাওফিল ভাইয়ের সঙ্গেও অন্যায় হচ্ছিল এসব তাকে না জানতে দিয়ে৷ এই উপলব্ধি হতে ওর দেরি হলেও হওয়া মাত্রই আমার কাছে সাহায্য কামনা করেছে।’
ঠোঁট চেপে দীধিতি কান্না সামলাতে চেষ্টা করল। কিন্তু মারিহামের আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই৷ চেয়ার থেকে উঠে গিয়েছে সে মাভিশার কথার মাঝেই৷ টেরেসের কোনায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে অঝোরে। কান্নার দমকে ওর গা কেঁপে কেঁপে উঠছে‚ তা দেখতে থাকল ইয়াসিফ। বুক ভারী হয়ে এসেছে তার৷ দীধিতি আর মারিহামের মতোই ভেঙেচুরে কান্না ঠেলে আসছে।
দীধিতির হঠাৎ মনে পড়ল নাওফিলের কথা৷ এতক্ষণে নিশ্চয়ই তার ডায়ারি পড়া শেষ? কিন্তু বেরিয়ে আসছে না কেন? নিজেকে সামলাতে পারছে তো? তড়িঘড়ি করে দীধিতি চলে গেল টেরেস থেকে৷ ইয়াসিফ খেয়াল করল না তা৷ সে মারিহামের থেকে মনোযোগ সরাতে ব্যর্থ৷ ওর আর্তনাদ তাকে ঘায়েল করছে কেন যেন! ওর এমন করুণ কান্নার দৃশ্য না-কি জায়িন আর আয়মানের এই করুণ পরিণতির জন্য এই চারটা বছর যে অসহনীয় মনঃকষ্ট নিয়ে সে একা কাটিয়েছে তার জন্য? কে জানে! মাভিশাকে ফেলেই আকস্মিক দাঁড়িয়ে পড়ল সে৷ এগিয়ে যেতে থাকল মারিহামের দিকে।
‘এই শুনছ?’ দরজায় একবার নক করে ডাকল দীধিতি‚ ‘নাওফিল‚ শুনছ?’
কোনো সাড়া শব্দ এলো না ভেতর থেকে৷ দীধিতির বুকটা কাঁপছে খুব৷ শ্বশুর-শাশুড়ির চূড়ান্ত পরিণতি মৃত্যু হতে পারে এমনটা আন্দাজ করেছিল সে মারিহামের চেহারার ভাব ভঙ্গিমা দেখেই৷ এমনকি নাওফিলও বুঝতে পেরেছিল খারাপ কিছুই অপেক্ষা করছে। তবুও সে নিজেকে স্থির রেখেছিল মারিহামের চিন্তা করে৷ কিন্তু এতটা বেদনাবহ হতে পারে তাদের মৃত্যু তা কি ওরা কেউ ধারণা করেছিল? দীধিতি তো করেনি। নিশ্চয়ই নাওফিলও করেনি!
দরজার ওদিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে দরজায় দ্রুত কান পাতল দীধিতি। আবছাভাবে শুনতে পেলো পুরুষ কণ্ঠের গুনগুন। কিন্তু কেমন অস্বাভাবিক শোনাচ্ছে তা৷ নাওফিলের কণ্ঠের মতো লাগছে না। না-কি সে চিনতে পারছে না তার কণ্ঠ? মনস্থির করে আরেকবার কান পাততেই শুনতে পেল সে‚ ‘এসব ভুল… ভুলভাল কথা এসব… সব বাজে কথা লেখা! আলিয়া মেহজাবিন গেইম খেলেছ! তুমি আজেবাজে কথা লিখে রেখেছ!’ হ্যাঁ‚ এ কথাগুলো নাওফিলেরই তো৷ এমন অসংলগ্ন কথাবার্তা অস্বাভাবিক শোনাচ্ছে কারণ‚ নাওফিল কাঁদছে! বুকে মোচড় দিলো দীধিতির৷ দরজায় বড়ো বড়ো থাবা দিতে শুরু করল‚ ‘নাওফিল? এই নাওফিল‚ দরজাটা খোলো। নাওফিল…!’ চিৎকার করে ডাকাডাকি আরম্ভ করল সে।
টেরেস থেকে ওর কান্না সুরের চিৎকার সবাই শুনতে পেতেই ছুটে এলো ঘরে৷ দরজায় ক্রমাগত দীধিতিকে করাঘাত করতে দেখে ভয় পেলো মারিহাম। ‘কী হয়েছে ভাইয়ার?’ আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করেই দরজায় থাবা দিতে শুরু করল সেও‚ ‘ভাইয়া? ভাইয়া শুনছ তুমি?’
‘ও কেমন এলোমেলো কথা বলছে‚ ভাইয়া। আমি ওর কান্নার আভাস পেয়েছি। ওকে দরজাটা খুলতে বলুন‚ ভাইয়া।’ দীধিতি কাঁদতে কাঁদতে ইয়াসিফকে বলল।
ইয়াসিফ এগিয়ে এলো‚ ডাকল জাদ বলে বলে কতবার। কিন্তু ভেতর থেকে সেই আগের মতোই গুনগুন কান্না আর কথার আওয়াজ পেলো শুধু৷ মারিহাম নিজের ঘরে ছুটে গিয়ে চাবি নিয়ে এসে দরজা বাইরে থেকে খুলল৷ খুলেই দেখল‚ ডায়ারির পৃষ্ঠাগুলো নাওফিল ছিঁড়ে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে তার মাঝে বসে আছে। বুকে জড়িয়ে ধরে আছে জায়িন আর আয়মানের ছবির ফাইলটা। এবার তার কাতর স্বরের কান্না সবাই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে… দেখতে পাচ্ছে নাওফিল আহাজারি করে কাঁদছে আর বলছে‚ ‘এত কষ্ট… এত কঠিন যন্ত্রণা দিয়ে কেন মারলে… ও মাবুদ! আমি কোথায় দাঁড়িয়ে তাদের কবর দেখব? কোথায় দাঁড়িয়ে জিয়ারত করব কবর? আমি এখন কোথায় পাবো আমার আব্বুকে‚ আমার আম্মুকে? কত সহজ মরণ দাও তুমি‚ ইয়া মাবুদ! আমার আব্বু‚ আম্মুর মরণ কেন এত কঠিন দিলে? তাদের শরীর দুটোর এক অংশও গ্রহণ করল না তোমার মাটি! কেমন মৃত্যু দিলে তুমি?’
ইয়াসিফ এক ছুটে গিয়র নাওফিলকে জাপটে ধরল‚ ‘কী করছিস‚ জাদ? থাম‚ ভাই। এমন করে কাঁদতে হয় না। আমার ভাই‚ আমার সোনা ভাই‚ থাম!’ চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল তারও৷ এতক্ষণ এই কান্না গলায় আটকে থাকলেও নাওফিলের আহাজারি দেখে আর সইতে পারল না সে। তাকে থামতে বললেও সে নিজেই তাকে জড়িয়ে ধরেই কাঁদতে থাকল।
নাওফিল ছবির ফাইলটা বুকে আঁকড়ে ধরে হেলে পড়ল ইয়াসিফের বুকে৷ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ করল বাচ্চাদের মতো‚ ‘আগুনে পুড়িয়ে মারল‚ ভাই৷ আমার পাগল মায়ের ওপর প্রতিশোধ নিলো তাকে আগুনে ছেড়ে দিয়ে৷ একটু শান্তির মৃত্যু কি ছিল না তাদের তকদিরে? দাপাদাপি করেছে‚ ছটফট করেছে ওই আগুনে৷ কেউ আসেনি… কেউ শোনেনি তাদের মরণ আর্তনাদ। সারা রাত পুড়েছে অসহায় মানুষদুটো। ছাই হয়ে গেছে নিশ্চয়ই শরীর! আমি কী করব এখন? কীভাবে খুঁজব তাদের কবর? নিহাদ রে‚ আমাকে খুঁজে দে কবর দুইটা। আমি যাব আব্বু‚ আম্মুর কাছে…’
‘ওকে… ওকে থামতে বলুন৷ কাঁদতে নিষেধ করুন ওকে ভাই। আমার সহ্য হচ্ছে না’‚ দীধিতি ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না কান্নার চোটে৷ এমন ভঙ্গুর‚ অসহায় নাওফিলকে ও আগে কোনোদিন দেখেনি৷ এভাবে আজ অবধি কাঁদতে দেখেনি তাকে৷ তার এই কান্না‚ এই হাত-পা ছড়িয়ে ইয়াসিফের বুকে পড়ে আহাজারির দৃশ্য দেখে ওর মনে হচ্ছে‚ ওর চিরচেনা নাওফিল কোথায় যেন চলে গেছে ওকে ছেড়ে৷ আর কোনোদিন তাকে ফিরে পাবে না ও৷ চোখের সামনে যাকে দেখছে সে যেন ওর কেউ নয়… ওর সেই চেনা আপন মানুষটা নয়। হঠাৎ কেন এই ভয়‚ এই অদ্ভুত শঙ্কা ওর হচ্ছে তা ও বুঝতে পারছে না।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯১
কিন্তু খুব ভয় হচ্ছে ওর৷ এই ভয়ই ওকে গ্রাস করে নিতে থাকল৷ চোখের সামনে সব দুলে উঠল সহসা‚ আঁধার দেখতে শুরু করল৷ নিজের শরীরের ভারসাম্য হারাচ্ছে বুঝতে পেরে দ্রুত দরজাটা শক্ত করে ধরার চেষ্টা করল। তবু পারল না নিজেকে সামলাতে৷ পেছনেই মাভিশা দাঁড়িয়ে ছিল৷ আর মারিহাম ঘরের মুখে বসে পড়ে আকুল সুরে কাঁদছে। দীধিতি পড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তেই ‘স্মরণ‚ কী হলো?’ বলে চেঁচিয়ে উঠল মাভিশা।
