আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৯
DRM Shohag
সন্ধ্যা এখনো বিস্মিত নয়নে চেয়ে আছে দরজায় দাঁড়ানো আকাশের দিকে। যার চোখের সোনালি মণি দু’টো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এইতো কিছুক্ষণ আগেই তার আর আসমানী নওয়ানের সাথে কথা বলে আকাশ উপরে চলে গেল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে আকাশ শাওয়ার নিয়ে নিচে নেমেছে। পরনে একটি পাতলা টি-শার্ট, প্যান্ট। মাথার চুলগুলো ভেজা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকেই চেয়ে আছে। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। তার মাথা এখনো ভনভন করে ঘুরছে। এটা যে আকাশ, তার সব হিসাব তো মিলেছে, তবে ফোনের ওপাশে কে? তাকে সোনা বউ বলে ডাকল যে। উত্তেজনায় সন্ধ্যার শরীর কাঁপছে। কানে ফোন ধরে রেখেছে।
দরজায় দাঁড়ানো আকাশ ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। মাকে না দেখে জিজ্ঞেস করে, “মা কোথায়?”
সন্ধ্যার কানে বোধয় গেল না আকাশের বলা কথাটা। তার মস্তিষ্ক অচল অচল লাগছে। সে কাকে বিশ্বাস করবে? ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে নাকি তার সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে? কে আকাশ? আজ কতগুলো দিন পর সেই ডাক শুনতে পেল। যে ডাক শোনার জন্য সন্ধ্যা কতগুলো দিন অপেক্ষা করেছে। কিন্তু তার অনুভূতি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
ততক্ষণে আকাশ ঘরের ভেতর এসে একদম সন্ধ্যার সামনে দাঁড়িয়েছে। তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে সন্ধ্যাকে পরোখ করছে। সন্ধ্যার মৃদু কম্পন তার চোখ এড়ায়নি। কপালে ভাঁজ পড়ে। থমথমে কণ্ঠে বলে, “কি প্রবলেম? মৃগী রোগীর মতো কাঁপছো কেন?”
সন্ধ্যার বুক ধুকধুক করছে। দৃষ্টি আকাশের দিকে। কাঁপা কণ্ঠে বলে,
“আপনি কে?”
সন্ধ্যার কথায় আকাশ ভ্রু কুঁচকে নেয়। এই আধপা’গ’ল টা আবার কি ভুলভাল বকছে। আকাশ ধমকে বলে,
“এই মাঝরাতে থা’প্প’ড় ছাড়া তোমার পেটের ভাত হজম হচ্ছেনা? আমার বাড়ি থেকে আমাকে চেনো না৷ বে’য়া’দ’ব মেয়ে!”
সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। এখনো কানে ফোন ধরে রেখেছে। সন্ধ্যা কি বলবে বুঝল না৷ ফোনের ওপাশে একই কণ্ঠের মানুষ এইমাত্র কথা বলল। সে কি করবে এখন? তার যে মাথা ঘুরছে। ওপাশ থেকে অনেক আগেই কল কেটে গিয়েছে। সন্ধ্যা কান থেকে ফোন নামায়। আকাশের চোখে চোখ রেখে ঢোক গিলে বলে,
“আপনার কি জমজ ভাই আছে?”
আকাশ বিরক্ত চোখে তাকায়৷ মেয়েটাকে তার মাঝে মাঝে পা’গ’ল মনে হলে একটু পর আবার ভালো-ও মনে হয়। কিন্তু এবার আসলেই পা’গ’ল মনে হচ্ছে৷ এই মাঝরাতে কোথা থেকে তার জমজ ভাইকে টেনে আনছে কে জানে! আকাশ কটমট চোখে চেয়ে বলে,
“আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে।”
সন্ধ্যা তার হাতের ফোন বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “ফোনের ওপাশে অবিকল আপনার মতো করে একজন কথা বলেছে আমার সাথে।”
আকাশ ডান হাত উঠিয়ে সন্ধ্যার গালে থা’প্প’ড় দেয়ার ভঙ্গি করে রে’গে বলে,
“আর একটা উল্টাপাল্টা কথা বললে কানের গোড়ায় লাগাবো।”
সন্ধ্যা ভ’য় পেয়ে মুখ ডানদিকে সামান্য হেলে নেয়৷ আকাশ খেয়াল করে হাত নামিয়ে নেয়৷ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে, “মা কোথায়?”
সন্ধ্যা জবাব দেয়, “জানিনা।”
আকাশ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“জানোনা মানে?”
সন্ধ্যা বিরক্তি নিয়ে বলে,
“জানিনা মানে জানিনা। এমনিতেও আপনি যে আম্মার ছেলে, এটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না৷ সত্যি করে বলুন আপনি কে?”
আকাশ ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করল৷ ইচ্ছে করছে এক ঘুষিতে এই মেয়ের নাক ফাটাতে। সন্ধ্যা আকাশকে রা’গ’তে দেখে ঢোক গিলল। ফোনের ওপাশে লোকটা যদি আকাশ হয়েও থাকে, তাহলে সে তার সামনে না এসে ফোনে বসে তাকে সেই আগের আকাশের মতো করে কেন ডাকবে? সে হিসাব মেলাতে পারলো না৷ কিন্তু তার সামনে দাঁড়ানো আকাশের হিসাব তো মিলেছে৷ আকাশের হেলিকপ্টার এক্সিডেন্ট হওয়া থেকে শুরু করে আসমানী নওয়ানের থেকে শোনা প্রতিটি কথার ভিত্তিতে এটাই তো সেই আকাশ। সন্ধ্যা নিজেকে শান্ত করে বলে,
“আমি সত্যি বলছি। ফোনের ওপাশে আপনার কণ্ঠের মতো করে কেউ কথা বলেছে৷ বিশ্বাস না হলে আপনি দেখুন।”
আকাশ সন্ধ্যার দিকে চেয়েই খপ করে ফোনটা নেয়। যদি এর কথা সত্যি না হয়, তবে এই মেয়েকে আজ সে থা’প’ড়েই পা’গ’ল থেকে সুস্থ বানাবে। ডায়াল কলের প্রথম নাম্বারে কল করে ফোন লাউডে দেয়। ওপাশ থেকে অরুণ বলে ওঠে, “হ্যালো সন্ধ্যা!”
অরুণের কণ্ঠ পেয়ে সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। আকাশ কটমট চোখে চেয়ে আছে সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা আকাশের হাত থেকে ফোন একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে নাম্বার চেক করে। নাহ এটাই তো সেই নাম্বার। অরুণ এই নাম্বার কোথায় পেল? সন্ধ্যা বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“অরুণ ভাইয়া এই নাম্বার থেকে কিছুক্ষণ আগে একজন অবিকল আকাশের কণ্ঠে কথা বলেছে। কে সে অরুণ ভাইয়া?”
অরুণ থমথমে মুখে বলে,
“আমি স্যরি! আমার ফোন থেকে…..
বাকিটুকু বলার আগেই কেউ একজন অরুণের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে আবারও আকাশের কণ্ঠে ডাকে, “হেই, সোনা বউ….
সন্ধ্যা কেঁপে উঠল। আবারো আকাশের কণ্ঠে সেই ডান শুনতে পেয়ে তার মাথা আবারো ভনভন করতে থাকে। তাকায় তার সামনে দাঁড়ানো আকাশের দিকে। আকাশ স্বাভাবিক। তার মুখাবয়বে অবাক হওয়ার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। সন্ধ্যা কিছু বলার আগেই আকাশ সন্ধ্যার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে ফোন কানে নিয়ে হুংকার ছেড়ে বলে,
“জ্যাক, তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি।”
ওপাশে জেডি’র মুখ থমথমে হয়ে যায়। কপালে ভাঁজ পড়ে। এতো রাতে আকাশ, সন্ধ্যা একসাথে কেন বুঝল না। তাকায় অরুণের দিকে, যে তার দিকে খেয়ে ফেলা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। জেডি গলা ঝেড়ে নিজ ফর্মে ফিরে বলে,
“এভি তুই কোথায়?”
আকাশ রা’গে ফোঁসফোঁস করতে করতে বলে, “জা’হা’ন্না’মে।
জেডি বা হাতে কপালের ঘাম মুছল। আকাশ তার কণ্ঠ নকল করে কথা বলার ব্যাপারটা ভীষণ অপছন্দ করে। তাও আবার সেখানে যদি মেয়ে রিলেট থাকে। ভার্সিটিতে এ নিয়ে তুলকালাম বেঁধেছিল একবার। কিন্তু সে কি করে জানবে ওই মেয়ের পাশে আকাশ আছে। জেডি নিজেকে সামলে হেসে বলে,
“আমি বুঝেছি তুই দুনিয়ার কোনো এক অগ্নিকুন্ডের উপর বসে আছিস। তোর নিচে জ্বলছে। সেগুলোই উপর দিয়ে ধোঁয়া স্বরূপ বের হচ্ছে। আর তোর ধোঁয়ায় আমি ঘেমেনেমে একাকার হয়ে যাচ্ছি মাই জান।”
আকাশের রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আর একবার আমার কণ্ঠ নিয়ে ফা’জ’লা’মি করলে তোকে জ’বা’ই করে ফেলব।”
কথাটা বলেই আকাশ রে’গে সন্ধ্যার ফোন সর্বশক্তি দিয়ে আছাড় মা’রে।
সন্ধ্যা ভাবনায় মশগুল। ফোনের ওপাশে অরুণের পর যে কথা বলল, তাকে আকাশ জ্যাক বলে ডাকল। আর সেই লোকটাই আকাশের কণ্ঠ নকল করে তার সাথে এভাবে কথা বলছিল? আকাশের কথার ধরনে তো তাই মনে হলো। কিন্তু ওই লোকটা একদম হুবহু আকাশের কণ্ঠ কিভাবে নকল করল? আর তাকে সেই ‘সোনা বউ’ ডাক? ভাবনার মাঝেই আকাশকে তার ফোন আছাড় মা’র’তে দেখে সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। দ্রুত এগিয়ে যায় তার ফোনের দিকে। একদম গুঁড়ো গুড়ো হয়ে গিয়েছে। এই ফোন আর নেয়া যাবেনা।
সন্ধ্যা আকাশকে কিছু বলার আগেই দেখল আকাশ হনহন করে বেরিয়ে গেল এই রুম থেকে৷ সন্ধ্যা পিছু পিছু গিয়ে রে’গে বলে,
“আপনি আমার ফোন ভাঙলেন কেন?”
এমনিতেই আকাশ রে’গে বোম হয়ে আছে। এর মধ্যে সন্ধ্যার কথাটুকু হজম হলো না। উল্টো ঘুরে বড় বড় পায়ে এগিয়ে এসে সন্ধ্যার হাত পিছন থেকে মুচড়ে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“শুধু ফোন নয়, তোকেও ভাঙবো বে’য়া’দ’ব মেয়ে।”
হাতে ব্য’থা পেয়ে সন্ধ্যা মৃদু চেঁচিয়ে ওঠে। তাকায় আকাশের দিকে। সন্ধ্যার ব্য’থাতুর মুখ চোখে পড়লে আকাশ সাথে সাথে সন্ধ্যার হাত আলগা করে দেয়। শীতল দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। আকাশের হাত ঢিলে বুঝতে পেরে সন্ধ্যা দু’হাতে আকাশকে গায়ের জোরে ধাক্কা দেয়। আকাশ দু’পা পিছিয়ে যায়। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়।
সন্ধ্যা আকাশের দিকে আঙুল উঁচিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আর একবার গায়ের জোর দেখাতে আসলে আমার বুদ্ধির জোরে আপনাকে সত্যি সত্যি চটি পেটা করে ছাড়বো বলে রাখলাম। বে’য়া’দ’ব লোক কোথাকার!”
কথাটা বলে সন্ধ্যা দ্রুত ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা আটকে দেয়। আকাশ হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে। এতক্ষণ ঠিক কি হলো, এটুকু বুঝতেই তার অনেকটা সময় লেগে গেল। আবার তাকে পায়ের জুতো দিয়ে পেটাতে চাইল, তারপর তাকে আবার বে’য়া’দ’ব-ও বলল! ঠিক কি পরিমাণ সাহস দেখালো মেয়েটা! তাকে বিন্দুমাত্র ভ’য় পায়না। আকাশ দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বন্ধ দরজার দিকে তাকায়। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“একবার তোমাকে আ’ঘা’ত করা শিখে নিই। এরপর যদি তোমাকে টুকরো টুকরো না করেছি তাহলে আমার নাম…..
পিছন থেকে আসমানী নওয়ান বলে, “এভি নয়।”
মায়ের কণ্ঠে আকাশ পিছু ফিরে তাকায়। আসমানী নওয়ান আবারও বলেন, “জান্নাতকে কিছু করতে পারো আর না পারো, কিন্তু তোমার এভি নামটা কে’টে দিও। তোমার নামের এই ফর্মটা আমার পছন্দ নয়৷”
আকাশ বিরক্ত হলো মায়ের কথায়। রে’গে বলে, “তোমার ওই পাতানো মেয়েকে আমি ছাড়বো না।”
“আচ্ছা ধরে রেখ। আমিও এটাই চাই।”
মায়ের হেয়ালিপনায় আকাশ থতমত খেয়ে তাকায়। মাকেও আজকাল বড্ড বিরক্ত লাগছে। আসমানী নওয়ান বোধয় একটু হাসলেন। বলেন,
“ও আমার পাতানো মেয়ে নয়।”
আকাশ চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“তাহলে কি তোমার নিজের মেয়ে? হয়তো লুকিয়ে রেখেছিলে। এমন হলে তো ও সম্পর্কে আমার বোন হয়ে গেল। বোনকে আমার বউয়ের অপবাদ দাও কিভাবে মা? তোমার কি রুচির দু’র্ভি’ক্ষ চলছে?”
আসমানী নওয়ান রে’গে ধমকে ওঠেন, “আকাশ?”
আকাশ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। আসমানী নওয়ান চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। এরপর আকাশের দিকে চেয়ে বলে,
“তোমাকে এসব কে বলেছে আকাশ? ক্লিয়ার করবে প্লিজ?”
আকাশ রাগান্বিত স্বরে বলে,
“যে-ই বলুক। সে সত্যিটা-ই বলেছে। নিজ চোখে দেখছি সব। অথচ তুমি একের পর এক মিথ্যে বলছ। থেমে যাও মা। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না। নয়তো এর ফল ভালো হবেনা।”
কথাগুলো বলে আকাশ আর দাঁড়ালো না। আসমানী নওয়ান চিন্তিত মুখে চেয়ে দেখলেন কেবল আকাশকে। আকাশকে কেউ কিছু বললে, মুখের কথা সে বিশ্বাস করে নেয়ার মতো মানুষ নয়৷ তাহলে আকাশকে কি এমন করে অপর পক্ষের লোক আকাশকে বিশ্বাস করিয়েছে, তারা যা বলছে সব মিথ্যে?
অরুণ একটি ফাঁকা রাস্তার পাশে বসে আছে। তার সামনে জেডি দাঁড়ানো। যে এপাশ-ওপাশ হাঁটছে। অরুণ এখানে সন্ধ্যার পর থেকে বসে আছে। সে মেন্টালি ভীষণ ডিস্টার্ব ছিল, তাই একা একা ভাবছিল অনেককিছু৷ কিছুক্ষণ আগে এখানে জেডি আসে। জেডির স্বভাব যেমন, যেচে পড়ে কথা বলছিল অরুণের সাথে। অরুণ-ও টুকটাক কথা বলছিল। টপিক আকাশ ছিল।
অরুণের শ’ক্ত দৃষ্টি জেডির দিকে। একে সন্ধ্যার ব্যাপারে বলাই ভুল হয়েছে। আকাশ তো বিশ্বাস করে না, ভাবল জেডি হয়ত বিশ্বাস করবে। এজন্য আকাশের ব্যাপারে টুকটাক অনেক কথা বলেছে। হাইলাইট করেছে সন্ধ্যার ব্যাপারটা। আকাশ সন্ধ্যাকে সোনা বউ বলে ডাকত। অনেক ভালোবাসতো। এসব শুনে জেডি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। মানুষ জোক্স শুনেও এতো হাসেনা, জেডি আকাশকে নিয়ে বলা কথাগুলো শুনে যত হাসছিল। অরুণ চুপচাপ হজম করছিল জেডির অ’সহ্যরকম হাহা হিহি। এরপর হঠাৎ-ই সন্ধ্যার নাম্বার থেকে কল আসলে, জেডি ফোনের স্ক্রিনে সন্ধ্যা নাম দেখে, তার ফোন কেড়ে নেয়। অরুণের নিষেধ হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে জেডি কল রিসিভ করে সন্ধ্যার সাথে ফা’জ’লা’মো করল।
একে তো সন্ধ্যা আকাশের জন্য এতোগুলো দিন যাবৎ কত দুঃখ পেয়ে এসেছে। এরপর হঠাৎ আকাশের দেখা পেয়ে তার জীবনে সুখের বদলে আরও দুঃখ এসে হাজির হয়েছে, এক ভিন্নরূপী আকাশকে পেয়ে৷ আর সেই মেয়েটার সাথে এই জা’নো’য়া’র টা ফা’জ’লা’মি করল বসে বসে৷ অরুণের মনে হলো, এই জেডিকে যদি সত্যিই খু’ন করতে পারতো তবে শান্তি পেত।
জেডি অরুণের সামনে দাঁড়ায়। দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রেখে বলে,
“ওই মেয়েটা এভির বাড়ি থাকে? সিরিয়াসলি?”
অরুণ কটমট চোখে চেয়ে বলে,
“নাহ, তোর মাথার উপর থাকে। আয়নার সামনে গিয়ে দেখ, সন্ধ্যা তোর মাথার উপর বসে বসে কাঁদছে আর তোর চুলগুলো রুমাল ভেবে ওতে নাক মুছছে।”
জেডি রে’গে তাকায়। কিছু একটা ভেবে হাসল। এরপর ঘুরে গিয়ে পিছন থেকে দু’দিকে পা দিয়ে অরুণের মাথার উপর বসে। যেন কোনো টুলের উপর বসেছে। অরুণ চেঁচিয়ে ওঠে। জেডি সামান্য ঝুঁকে অরুণের জ্যাকেটের কলার দু’হাতে চেপে ধরে অরুণের মুখ সোজা তার মুখ এনে বাঁকা হেসে বলে,
“দু’মিনিট অপেক্ষা কর ডেয়ার। তোকে আমি মারাত্মক সুগন্ধি উপহার দিতে যাচ্ছি। এটা যে সে সুগন্ধি নয়, এই সুগন্ধি আমার পেট থেকে একেবারে পায়ুপথ দিয়ে বের হবে।”
অরুণ নড়াচড়া করলেও সুবিধা করতে পারেনা। রা’গে ফোঁসফোঁস করছে। ডান হাত তুলে জেডির দু’পায়ের মাঝে হাত দিলে জেডি দ্রুত সরে যায় অরুণের মাথার উপর থেকে। অরুণ দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। জেডির দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
“একটুর জন্য মাপতে পারলাম না। তবে কোয়ালিটি ভালোই মনে হলো।”
জেডি কটমট চোখে তাকায়। এগিয়ে এসে বলে,
“তোর যা আমারও তাই। না-কি তুই হারবাল খেয়ে ভাব নিচ্ছিস?”
শেষ কথাটা জেডি বাঁকা হেসে ভ্রু নাঁচিয়ে বলে। অরুণ থতমত খেয়ে তাকায়। রে’গে বলে,
“আমাকে তোর অসুস্থ লাগে?”
জেডি ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে,
“একদম না। তবে….
কথাটা বলে হুট করে ডান হাত অরুণের দিকে নিলে অরুণ দ্রুত তার দু’হাতে গোপন জায়গা চেপে ধরে। জেডি হাসে। বলে,
মনে হচ্ছে, তোর চাপাচাপির অভ্যেস ভালোই। ভালো ভালো চালিয়ে যা। তোকে ভাইরাল করার দায়িত্ব আমার।”
কথাটা বলে বা হাত উঠিয়ে তার ফোন অরুণের দিকে ধরে। অরুণ দেখল সে এখন যেখাবে দাঁড়িয়ে আছে, সেই পিক জেডি তুলেছে। অ’সহ্যকর অনুভূতি নিয়ে সে জেডির দিকে তাকালো।
জেডি ফোন পকেটে রেখে উল্টোদিকে যেতে যেতে শব্দ করে হাসে।
অরুণ রে’গে বলে, “ওই পিক যদি কিছু করেছিস, তোর খবর আছে জেডি।”
জেডি ঘাড় বাঁকিয়ে অরুণের দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে বলে,
“খবর তো তোর হবে ডেয়ার। সূচনা কিন্তু অনামিকা।”
অরুণ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। কিহ! এই পিক ওই ছেমড়ির কাছে গেলে তার গলায় দড়ি দিয়ে ম’রা ছাড়া আর উপায় থাকবেনা। অরুণ দৌড় দেয় জেডির দিকে। জেডিও দৌড়ালো। হাসছে সে। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় জেডির মুখ মলিন হয়। স্মৃতির পাতার কিছু দৃশ্য ভেসে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, ক’বছর আগে সেই ভার্সিটি লাইফে ফিরে গিয়েছে। যেখানে সে আর অরুণ সারাদিন একজন আরেকজনের পিছে লাগত, আর আকাশ তাদের দু’জনের বিচার করত। একদম হেডমাস্টারের মতো। সেসব দিন হারিয়ে গেছে সেই কবেই। জেডি অন্ধকার আকাশপানে তাকায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শব্দ করে বলে,
“বেঈমানী কিন্তু বন্ধুরাই করে, তাইনা অরুণ?”
জেডির কণ্ঠে বড্ড আক্ষেপ মেশানো।
পিছনে দৌড়ে আসা অরুণের কানে আসে জেডির কথা। মুখে ফুটে ওঠে মলিনতার ছাপ। পায়ের গতি কমে আসে। তবে থামে না। তার মনে হলো, জেডিকে কি স্যরি বলা উচিৎ? আবার আরেক মন তীব্র প্রতিবাদ করে বলে উঠল, ‘কখনোই না।’
নিস্তব্ধ রাত। সময় তখন প্রায় ২ টা। শীতের রাত। চারিদিকে কুয়াশায় ভরপুর। কয়েক সে.মি. এর দূরত্বে কি আছে, তা দেখা মুশকিল। সৌম্য ইরাকে নিয়ে ফাঁকা রাস্তায় হাঁটছে। মিটিমিটি ঠান্ডা বাতাস প্রিতিনিয়ত ছুঁয়ে দেয় দু’জনকে। ইরা সৌম্য’র সাথে লেপ্টে হাঁটছে৷ ভীষণ শীত করছে। থেকে থেকে কেঁপে উঠছে৷ সৌম্য দাঁড়ায়। সাথে ইরা-ও দাঁড়ায়। তাকায় সৌম্য’র দিকে। সৌম্য’র দৃষ্টি ইরাতে। মেয়েটার চোখমুখ লাল হয়ে গিয়েছে ঠান্ডায়। সৌম্য’র ভীষণ খারাপ লাগলো। সে একা হলে শীতের কাপড় ছাড়াও বাইরে রাত কাটিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু সাথে তার বউ আছে, এখন সে কি করবে? এতো রাত হওয়ায় ঠিকঠাক কোনো ব্যবস্থাও করতে পারছেনা। একবার ভাবল, ইরাকে নিয়ে ওই বাড়ি থেকে এতো রাতে বেরোনো উচিৎ হয়নি৷ কিন্তু আবার আরেক মন বলে, এ কি করে সম্ভব? যেখানে রিহানের মা বলতে গেলে তাদের ঘাড় ধরে বের করে দেয়নি, সেখানে সে কি করে থাকতো? সৌম্যকে চুপ দেখে ইরা সৌম্য’কে ঝাঁকিয়ে ডাকে, “সৌম্য?”
সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জ্যাকেটের চেইন খুলল। ইরার কিছু বলার আগেই সৌম্য ইরাকে টেনে তার জ্যাকেটের ভেতর ঢুকিয়ে নেয় ইরার শুকনো শরীরটা। ইরা মাথা উঁচু করে তাকায়৷ বলে,
“কি করছ?”
সৌম্য ইরার দিকে চেয়ে জ্যাকেটের চেইন লাগালো। মেয়েটা রোগা পাতলা হওয়ায় সুন্দরমতো এঁটে গিয়েছে সৌম্য’র জ্যাকেটের ভেতর। এটা দেখে সৌম্য একটু হাসল। ডান হাতের দু’আঙুলের সাহায্যে ইরার নাক টেনে বলে, “দেখতে বাচ্চা লাগে।”
ইরা মুখ ফুলিয়ে বলে,
“আমি মেয়ে না? মেয়েরা দেখতে ছোটোখাটো-ই হয়।”
সৌম্য আরেকটু হেসে বলে,
“সেটাই তো বললাম। তোমাকে এভাবেই ভালো লাগে আমার।”
ইরার মুখে হাসি ফুটল। তাদের থেকে কয়েক হাত দূরত্বে ল্যাম্পপোস্ট, যার আবছা আলো এদিকটায় এসেছে। সৌম্য দু’হাতে ইরাকে জড়িয়ে নেয়। সামান্য ঝুঁকে ইরার বাম গালের সাথে তার ডান গাল ঠেকিয়ে দেখল, ইরার গাল বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। সৌম্য মাথা সোজা করে ইরার দিকে তাকায়। ইরাও তাকায়। সৌম্য অসহায় কণ্ঠে বলে, “স্যরি!”
ইরা ভ্রু কুঁচকে বলে, “কেন?”
সৌম্য কিছু বলল না। ইরার কপালে চুমু আঁকে। এরপর গালে চুমু আঁকে। দু’গালে চুমু আঁকে। ধীরে ধীরে সারামুখে ছোট ছোট চুমু আঁকে। ইরা চোখ বুজে নেয়। একসময় সৌম্য ইরার কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
“শীত কমেছে ইরাবতী?
ইরা জ্যাকেটের ভেতর দিয়েই সৌম্যকে শ’ক্ত করে ধরে রেখেছে। সৌম্য’র কথা দ্বারা কি বুঝল কে জানে, ইরা হেসে ফেলল। চোখ বুজে রেখেই বলে,
“না তো।”
সৌম্য হাসল। জ্যাকেটের উপর দিয়েই দু’হাতে ইরাকে আরেকটু শ’ক্ত করে চেপে ধরে নিজের সাথে। সময় ব্যয় না করে চোখের পলকে ইরার ঠোঁটজোড়ায় নিজের আধিপত্য চালায়। ইরা বোধয় অপেক্ষায় ছিল। চোখেমুখে খুশির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ল মেয়েটার।
কনকনে শীত। আন্ধার রাত। মাথার উপর কুয়াশা। রাস্তার এক পাশে দু’যুগল নিশ্চিতে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা বিনিময়ে ব্যস্ত। ছেলেটির কত প্রচেষ্টা তার ভালোবাসাকে শীতের ঠান্ডা থেকে বাঁচিয়ে নেয়ার!
প্রায় মিনিট পাঁচ পর একজন আধবয়স্ক লোক রাস্তার পাশে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। হাতে টর্চ। যা সামনের দিকে তাক করে ধরলে মনে হলো কোনো ছেলে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটি গলা উঁচিয়ে বলে,
“কে ওখানে?”
কথাটা সৌম্য’র কানে না আসলেও সজাগ ইরার কানে এসেছে। ইরা সরে আসতে চাইলে পারলো না। জ্যাকেটের ভেতর দিয়ে বা হাত উঠিয়ে সৌম্য’র গালে হাত রেখে সৌম্য’কে ঠেলে সরিয়ে দেয়। সৌম্য’র কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ে। তাকায় ইরার দিকে। ইরা ঢোক গিলে বলে, “মানুষ।”
সৌম্য আশেপাশে তাকায়। ডানদিকে ফিরলে মুখের সামনে টর্চ এর আলো এসে পড়লে সৌম্য চোখ বুজে নেয়। লোকটি বোধয় বুঝল। সে টর্চের আলো সরিয়ে নেয়।
ইরা বলে, “জ্যাকেটের চেইন খুলে দাও।”
সৌম্য তাকালো ইরার দিকে। কিছু বলল না। আর না তো জ্যাকেটের চেইন খুলল। উল্টে বা হাতে জ্যাকেটের চেইন আরও উপরদিকে উঠিয়ে নেয়। ইরা সৌম্য’র বুক সমান, তার মাথা পর্যন্ত ঢেকে যাচ্ছে। ইরা দ্রুত বলে,
“কি করছ?”
সৌম্য উত্তর দেয়,
“চুপ থাকো। আমি কথা বলছি।”
ততক্ষণে লোকটি সৌম্য’র কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। সৌম্য ডানদিকে ফিরে নিজে থেকে লোকটিকে সালাম দেয়। লোকটি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কারো সাথে কথা বললে দিক ফেরাতে হয়, ছেলেটা কি জানেনা? লোকটি সালাম এর উত্তর নেয়। সৌম্য’র থেকে কিছুটা পিছিয়ে সে। তার উপর অন্ধকার, শীতের কুয়াশা,, সব মিলিয়ে সে এখনো ভাবছে সৌম্য এখানে একাই। সৌম্য লোকটিকে জিজ্ঞেস করে,
“এখানে আশেপাশে কি এরকম কোনো জায়গা বা হোস্টেল হবে, শুধু আজ রাত থাকার জন্য?”
লোকটি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায় সৌম্য’র দিকে। রাত-বিরেতে এমন এক ছেলে একরাত থাকার জন্য হোটেল খুঁজছে, ব্যাপারটি সে স্বাভাবিক চোখে দেখল না৷ তবে উত্তর করল,
“আছে। সামনে ২০ মিনিট হাঁটলেই পাওয়া যাবে। সারারাত সার্ভিস দেয়৷ কিন্তু তুমি……
সৌম্য মাঝখান থেকে থেকে বলে,
“আমার ওয়াইফকে নিয়ে থাকব। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
কথাটা বলতে বলতে সৌম্য তার জ্যাকেটের চেইন খুলে ইরাকে বের করে ভেতর থেকে৷ এরপর সে জ্যাকেটের চেইন লাগিয়ে নেয়।
লোকটি চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। এবার তো আরও সন্দেহ হচ্ছে। এরা ভালো মানুষ তো?
সৌম্য ইরার দিকে তাকালে দেখল ইরার চোখে ঘুম উপচে পড়ছে। ক্লান্তিতে মেয়েটা যে নুইয়ে পড়ছে সৌম্য বোধয় খুব করে অনুভব করল। গতকাল থেকে ঘুম নেই ঠিক করে। ইরাকে কোলে তুলে নিল সৌম্য। ইরা থতমত খেয়ে যায় সৌম্য’র কান্ডে। দ্রুত লোকটির দিকে তাকায়, ভদ্রলোকের দৃষ্টি দেখে বোধয় কিছু বুঝল মেয়েটা। সৌম্য লোকটিকে পাস করতে করতে আবারো বলে,
“আপনাকে আবারো ধন্যবাদ।”
লোকটি চুপচাপ শুধু দেখে গেল। মনে মনে বড্ড বিরক্ত হলো। আজকালকার ছেলেমেয়েদের কত রঙ্গ দেখতে হবে কে জানে! অতঃপর সে এগিয়ে যায় বাড়ির দিকে।
সৌম্য পাঁচ মিনিটের মতো হাঁটার পর ইরা সৌম্য’র দিকে তাকিয়ে বলে,
“লোকটা আমাদের অবিশ্বাস করেছে সৌম্য।”
সৌম্য’র ছোট্ট উত্তর, “করতে দাও।”
“তোমার খারাপ লাগছেনা?”
“না তো।”
“কেন?”
“যেখানে আমার ইরাপাখি আমাকে বিশ্বাস করে। সেখানে বাইরের মানুষদের অবিশ্বাসে কি আসে যায়?”
এরপর ইরার দিকে তাকিয়ে বলে,
“ঘুমাও। তাহলে দ্রুত সকাল হবে।”
ইরা ঘুমঘুম চোখে চেয়ে হেসে বলে,
“সারারাত এভাবে নিয়ে থাকবে? তাহলে এক্ষুনি ঘুমাচ্ছি।”
সৌম্য বোধয় আবারো একটু হাসল। বলে, “ইরাবতীর হাতের মালিশ আমার বডির প্রিয় খাবার।”
এবার ইরা কিছুটা শব্দ করে হাসল। শুনশান রাস্তায় ইরার এটুকু হাসির সে কি আওয়াজ! সৌম্য বুক ভরে শ্বাস নেয়ার মতো করে ইরার হাসির শব্দ শুনলো।
ইরা চেয়ে থাকে সৌম্য’র দিকে। কত বদলে গিয়েছে সৌম্য। আগে সে সৌম্য’র হাত ধরলেও সৌম্য তার থেকে হাত ছাড়িয়ে নিত। আর এখন সেই সৌম্য আশেপাশের সব অবহেলে ফেলে রেখে শুধু তার দিকে ফোকাস করে।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সন্ধ্যা নামাজ পড়ে এপাশ-ওপাশ পায়চারি করছে। গতকাল রাতেও ঠিক করে ঘুমাতে পারেনি সে। সন্ধ্যা আসমানী নওয়ানের রুম থেকে বেরিয়ে আশেপাশে তাকায়। রান্নাঘর থেকে রান্নার আওয়াজ আসছে মৃদু। বুঝল আসমানী নওয়ান রান্নাঘরে রান্নায় ব্যস্ত।
সন্ধ্যা অরুণের ঘরের দিকে যায়৷ আকাশ হারিয়ে যাওয়ার পর অরুণ আর অলিভিয়া বাংলাদেশ থেকে যায়নি। দু’জনেই তাদের বাসায় থেকে গিয়েছে। অলিভিয়া তার পরিচিত ফ্রেন্ডদের সাথে কই যেন ঘুরতে গিয়েছে। তবে অরুণ আছে। যদিও গতরাতে ঘুমানোর আগে অরুণকে বাসায় দেখেনি। অরুণ মাঝেমাঝেই এমন রাত করে ফেরে। কাজ থাকে হয়তো। তাই কেউ বাঁকা চোখে তাকায় না। সন্ধ্যা অরুণের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দেয়। ডিম লাইটের আলোয় চোখে পড়ল অরুণ ঘুমে বিভোর। সন্ধ্যা একবার ভাবল ঘুরে যাবে৷ কিন্তু সে শান্তি পাচ্ছে না। গতকালকের ব্যাপারে ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত সে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেনা৷ যে নাম্বার থেকে তার ফোনে আকাশের দেয়া ভিডিও আসলো, সেই নাম্বার অরুণের কাছে কি করে এলো? ভিডিওটি কি তবে তাকে অরুণ দিয়েছে? সন্ধ্যা এখানে এসে আটকে যাচ্ছে। অরুণের সাথে কথা বলে তবেই ক্লিয়ার হওয়া যাবে। সন্ধ্যা আর পেছালো না। অরুণের থেকে সব শুনে অরুণকে আবার ঘুমাতে দিবে নাহয়। অতঃপর ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে সন্ধ্যা। এগিয়ে গিয়ে ঘরের লাইট জ্বালায়। লাইটের আলো মুখের উপর পড়ায় অরুণ চোখমুখ কোঁচকায় সামান্য। একটু নড়েচড়ে উঠে আবারো স্বাভাবিক হয়।
সন্ধ্যা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অরুণের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ডাকে, “অরুণ ভাইয়া? অরুণ ভাইয়া?”
অরুণ ঘুমে বিভোর। সন্ধ্যা অসহায় চোখে তাকায়। আবারও ডাকল বেশ কয়েকবার। অরুণের কোনো সাড়া নেই। সন্ধ্যা কি করবে বুঝতে পারছে না। চলে যাওয়ার কথা ভাবলেও মন সায় দেয় না। অরুণ তো দুপুরের আগে উঠবে বলে মনে হয় না৷ তার প্রশ্নের উত্তর তো এখনই লাগবে। সন্ধ্যা কিছু একটা ভেবে সামান্য ঝুঁকে অরুণের ঘাড়ের কাছে এক আঙুল দিয়ে খুচিয়ে ডাকতে লাগে অরুণকে। যদিও ব্যাপারটা তার কাছে ভীষণ বিব্রত লাগলো, কিন্তু আবার অতোটাও লাগলো না। সৌম্য’র পাশের জায়গায় সে অরুণকে অনেক আগেই বসিয়েছিল। গত ক’মাসে সেই বিশ্বস্তের জায়গাটা আরেকটু দৃঢ় হয়েছে। সন্ধ্যা শব্দ করে বলতে থাকে,
“অরুণ ভাইয়া আপনার সাথে আমার ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। অরুণ ভাইয়া?”
হঠাৎ-ই অরুণ ঘুমের ঘোরে ডান হাতে খপ করে সন্ধ্যা হাত মুঠো করে ধরে। সন্ধ্যা চোখ বড় বড় করে তাকায়। হাত সরাতে চাইলেও পারেনা। অরুণ শ’ক্ত করে ধরেছে। সন্ধ্যা এবার চেঁচিয়ে ডাকে, “অরুণ ভাইয়া????”
অরুণ ঘুমের ঘোরে হাসতে হাসতেই হা করে সন্ধ্যার হাত খেয়ে ফেলার ভঙ্গি করে। সন্ধ্যা এবার গলার জোর আরও বাড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠে।
তখনই আকাশ অরুণের রুম পাস করে যাচ্ছিল। সে মূলত জগিং করতে বেরিয়েছিল, বেলা গড়িয়েছে, তাই বাগান থেকে ফিরে ঘরে যাচ্ছিল। পরনে হাতা কাটা সাদা গেঞ্জি, সাদা ট্রাউজার।
অরুণের ঘরে চেঁচানোর শব্দ পেয়ে আকাশের পা থেমে যায়। ডানদিকে ঘাড় ফেরায়। চোখে পড়ে অরুণ সন্ধ্যার হাত টেনে ধরেছে। আর সন্ধ্যা চেঁচাচ্ছে। আকাশ বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। সন্ধ্যার হাত অরুণ টেনে ধরেছে ব্যাপারটি তার মোটেও পছন্দ হলো না। মুহূর্তেই শান্ত মুখটায় রা’গ হানা দেয়। দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। পেশিবহুল দু’হাত ফুলে ওঠে, সাথে কপালের রগ। ঘরের ভেতর যেতে গিয়েও থেমে গেল অরুণকে উঠতে দেখে।
এতো জোরে চেঁচানোয় অরুণের ঘুম ভাঙে পুরোপুরি। সে ধড়ফড় করে উঠে বসে ঘুমঘুম চোখে সামনে তাকায়। সন্ধ্যাকে চেঁচাতে দেখে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে,
“আরে সন্ধ্যা এই সাতসকালে তুমি এভাবে চেঁচাচ্ছ কেন?”
সন্ধ্যা হাত মোচড়ায় আর বলে,
“আমার হাত ছাড়ুন।”
অরুণ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। চোখ নামিয়ে হাতের দিকে তাকালে দেখল সে সন্ধ্যার হাত টেনে ধরে আছে। অরুণ কারেন্ট শক খাওয়ার মতো লাফিয়ে ওঠে। সন্ধ্যার হাত ছেড়ে বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“তোমার হাত আমার হাতের মধ্যে কি করে?”
সন্ধ্যা হাত ছাড়া পেয়ে স্বস্তি পায়। জানে পানি এসেছে বোধয়। ঘনঘন শ্বাস ফেলে। যেমন ভ’য় পেয়েছে, তেমনি এতো জোরে চেঁচিয়ে হাঁপিয়ে গিয়েছে।
অরুণ অনুতপ্ত স্বরে বলে,
“স্যরি সন্ধ্যা! আসলে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম, আমার সামনে খুবই সুস্বাদু একটা ললিপপ। বাচ্চাকালে ফ্রেন্ড এর থেকে যেভাবে ছিনিয়ে খেতাম, আজ স্বপ্নেও সেভাবেই একজনের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে খেতে চাইছিলাম। কিন্তু এটা যে তোমার হাত সেটা বিন্দুমাত্র বুঝতে পারিনি।”
সন্ধ্যা বিস্মিত হয়। একবার অরুণের দিকে তাকায় তো একবার তার হাতের দিকে তাকায়। তার হাত কোনদিক থেকে ললিপপ লাগে সেটাই ভাবছে।
দরজায় দাঁড়ানো আকাশের দৃষ্টি অরুণের দিকে। মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে অরুণকে কাঁচা চিবিয়ে খাচ্ছে। ডান হাতের পাশের দেয়ালের সাথে লাগানো একটি টেবিলের উপর ফুলদানি পেয়ে সেটা হাতে তুলে নেয়। এক সেকেন্ড-ও সময় ব্যয় না করে ফুলদানিটি অরুণের বুক বরাবর ছুড়ে মা’রে। এরপর আকাশ আর এখানে দাঁড়ায় না৷ পথ ঘুরিয়ে বাইরের দিকে পা চালায়। তার মাথায় কি চলছে কে জানে!
এদিকে হঠাৎ কোথা থেকে এক ফুলদানি এসে অরুণের বুকে লাগলো অরুণ, সন্ধ্যা কেউই বুঝল না। অরুণ বিছানার উপর চিৎপটাং হয়ে পড়ে গিয়েছে। বেচারা ডান হাতে বুক ডলছে আর কোকাচ্ছে। সন্ধ্যার মায়া লাগলো৷ সে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকেই খুঁজে পেল না। বুঝল না এই ফুলদানি কোথায় থেকে অরুণের বুকে এসে পড়ল। মেয়েটা অরুণের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ভাইয়া আপনি ঠিক আছেন?”
অরুণ ধীরে ধীরে উঠে বসল। বুক মালিশ করতে করতে অসহায় কণ্ঠে বলে, “এমনিতেই এই অনামিকা ছেমড়ির জন্য হৃদয় ভেতর থেকে খান খান হয়ে আছে, এখন আবার কে উপর থেকে হৃদয় ভাঙার জন্য উঠেপড়ে লাগলো রে! ইশ!”
সন্ধ্যা কি বলবে বুঝল না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। অরুণকে শান্ত হতে দেখে সে বলে,
“ভাইয়া?”
অরুণ তাকায় সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যা এবার বলে,
“গতকাল আমি একটা নাম্বারে কল দেয়ার পর একজন যে আকাশের কণ্ঠ নকল করে কথা বলল, ওই নাম্বার কার ভাইয়া?”
অরুণ খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেয়,
“নাম্বারটা তো আমারি। গতকাল নতুন সিম কিনেছি। আর আকাশের কণ্ঠ নকল করে জেডি তোমার সাথে ফান করেছিল সন্ধ্যা। আমি ওর হয়ে স্যরি!”
সন্ধ্যার ভ্রু কুঁচকে যায়। নাম্বারটা অরুণ ভাইয়ার? তাহলে কি ওই ভিভিও অরুণ ভাইয়া পাঠিয়েছিল? সন্ধ্যা বলে,
“ভাইয়া ওই নাম্বার থেকে আকাশ আর সৌম্য ভাইয়ার বাড়ি ভাঙাসহ তাদের কথার সব ভিডিও আমার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয়েছিল গতকাল। ভিডিওটি কি আপনি পাঠিয়েছিলেন?”
সন্ধ্যার কণ্ঠে বিস্ময়। অরুণ যেন আকাশ থেকে পড়ল। উত্তর দেয়,
“আমি কেন তোমাকে ভিডিও পাঠাবো! তাছাড়া আমার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার তো এই নাম্বারে নয়। আমার আগের নাম্বারে। তুমি চাইলে চেক করতে পারো।”
কথাটা বলে অরুণ তার ফোন সন্ধ্যার দিকে বাড়িয়ে দিলে সন্ধ্যা সত্যিই হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটি চেক করল, আসলেই অরুণের আগের নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপ। তাহলে এই ভিডিও তাকে কে পাঠালো?
অরুণ নিজেও ভীষণ অবাক হলো। সন্ধ্যাকে এই ভিডিও যে পাঠিয়েছে, সে নিশ্চয়ই আকাশকে সন্ধ্যার চোখে খারাপ বানাতে চায়, এজন্যই ভিডিওটি পাঠিয়েছে। এটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু কে? অরুণ চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
“সিমটা আমি আমার এক পরিচিত ছোট ভাইয়ের থেকে নিয়েছিলাম সন্ধ্যা। ও নাকি মাত্রই কিনেছিল। কিন্তু ওর প্রয়োজন নেই তাই আমাকে দিতে চাইল। আমি না করিনি। আমার একটা জিপি সিম কেনা লাগতো। অনেকদিন হলো কিনব কিনব করে সময় হচ্ছিল না। তাই এই সিমটাই নিয়ে নিলাম। আমি ছেলেটার সাথে কথা বলব। দেখি কোনো ক্লু পাই কি-না!”
অরুণ কথাগুলো বলতে বলতে দরজায় চোখ পড়লে ভ্রু কুঁচকে যায়। আকাশের চোখমুখ থেকে রা’গ উপচে পড়ছে মনে হলো। ডান হাতে মোটা একটি কাঠ। অরুণ ভালো করে খেয়াল করলে দেখল, এটা গাছের ভাঙা ডাল। অরুণ আবারো আকাশের মুখের দিকে তাকায়। আকাশ তার দিকেই তেড়ে আসছে মনে হলো৷ অরুণ কারণ না বুঝলেও ভালোই বুঝল এই আকাশ তার দিকেই আসছে। সে দ্রুত বসা থেকে দাঁড়িয়ে বিছানার এপাশ থেকে ওপাশে নামতে যায়, তার আগেই আকাশ বা হাতে অরুণের থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট টেনে ধরে। প্যান্ট নিচের দিকে নেমে আসে অনেকটা। অরুণ চোখ বড় বড় করে তাকায়। দ্রুত দু’হাত প্যান্ট টেনে ধরে চেঁচিয়ে বলে,
“ইয়া আল্লাহ! আমার ই’জ্জ’ত গেল! ছাড় ছাড়।”
আকাশ রাগান্বিত স্বরে বলে,
“মেয়েবা’জী করছিলি এখানে?”
অরুণ অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আরে আমি কেন মেয়েবাজী করব! আমি এসব ছেড়ে দিয়েছি তো! বা’ল সব ভুলে আমার উপর ঝা’ল মেটাতে আসে।”
সন্ধ্যা হতভম্ব হয়ে যায়। কি হলো কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে কিছুই বুঝল না। কিন্তু অরুণের অবস্থার কথা ভেবে বেচারির চোখ বন্ধ হয়ে আসে। মনে হচ্ছে অরুণের ই’জ্জ’তের কিছু একটা হবে। তার এখানে থাকা একদমই ঠিক হবে কি-না! সন্ধ্যা দ্রুত জায়গাটি প্রস্থান করার জন্য এক পা এগোতেই আকাশ ডান হাতে সন্ধ্যার চুল টেনে সন্ধ্যাকে তার সামনে এনে সন্ধ্যার পিঠ তার বুকে ঠেকায়। ডান হাতে রাখা গাছের ডালের অংশটি সন্ধ্যার গলায় চেপে ধরে রাগান্বিত স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৮
“কি হচ্ছিল এখানে? একটা মিথ্যে বলবি তো, একদম জ’বাই করে ফেলব।”
আকাশের কান্ডে সন্ধ্যা বিস্মিত হয়। মেয়েটা ঢোক গিলছে বারবার। গলায় ব্য’থা পাচ্ছে। তবে সেদিকে পাত্তা দিল না। আকাশ এমন কেন করছে, সেটাই বোঝার চেষ্টায় আছে সে।
ওদিকে অরুণের অবস্থাও নাজেহাল। আকাশ এখনো বা হাতে অরুণের প্যান্ট টেনে ধরে আছে। অরুণ তার প্যান্টে রাখা দু’হাত একবার আলগা করলেই বেচারার প্যান্ট খুলে গিরায় এসে ঠেকবে।
