আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৮
DRM Shohag
আকাশের দৃষ্টি এখনো সন্ধ্যার ঘুমন্ত মুখপানে। হালকা কে’টে যাওয়া গালটায় যতবার চোখ পড়ছে ততবার আকাশের হাসফাস লাগে। আকাশ চোখ বুজে ডানে-বামে মাথা নাড়ায়। এতো অশান্তি লাগছে কেন? আকাশ উত্তর খুঁজে পায়না। সকালে সন্ধ্যার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা একে একে চোখের সামনে ভাসল। সন্ধ্যার করা বে’য়া’দ’বি কাজগুলো তাকে রা’গিয়ে দেয়ার কথা। অথচ সেসব তার উপর বিশেষ প্রভাব ফেলল না৷ প্রভাব ফেলল সন্ধ্যাকে মা’রা তার থা’প্প’ড়। আকাশের রা’গ হয়। কেন এমন হয় তার সাথে? সে কত মে’য়ের জান নিয়ে নিয়েছে, অথচ আজও তার মনে সেসবের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা তো দূর, কিচ্ছু কাজ করেনা।
আর এই মেয়েকে একটা থা’প্প’ড় মে’রে তার অ’শান্তি শেষ হচ্ছে না। আকাশ চোখ মেলে তাকায়। চোখেমুখে রা’গ স্পষ্ট। দৃষ্টিতে সন্ধ্যা। ইচ্ছে করছে এই মেয়েকে এক্ষুনি মে’রে এই দুনিয়া থেকে আউট করে দিতে। তাহলে যদি সে একটু শান্তি পায়৷ আকাশ সত্যি সত্যিই এই কাজ করতে ডান হাতে ধরে রাখা হুইস্কির বোতল থেকে হাত সরিয়ে সন্ধ্যার গলায় রাখে। রে’গে গলা চেপে ধরতে নেয়, তখন-ই সন্ধ্যা নড়েচড়ে ওঠে। গলায় হাত দেয়ায় ঘুমের ঘোরে বিরক্তির রেশ প্রকাশ করে মেয়েটি। হেলে আকাশের দিকে চলে আসে। একদম আকাশের মুখের সামনে তার মুখ এসে ঠেকে। আকাশ থমথমে মুখে তাকায়। ঢোক গিলল ছেলেটা। গালের কা’টা দা’গ আগের চেয়েও বেশি স্পষ্ট লাগছে আকাশের চোখে। আকাশ জিভ দিয়ে তার শুকনো ঠোঁটজোড়া ভেজায়। সে যে সন্ধ্যার গলা চাপতে হাত তুলেছিল, তা ভুলে বসল। হাত সন্ধ্যার গলা থেকে সরিয়ে আনে সন্ধ্যার কা’টা গালে।
আবারো দৃষ্টি নমনীয় হয়। ঘিরে নেয় অসহায়ত্ব। বুড়ো আঙুল আলতো করে চালায়। অনুতপ্ত স্বরে বলে,
“স্যরি!”
আকাশের বলা কথাটা বেশ জোরে ছিল। যার ফলে কথাটা যেমন আসমানী নওয়ানের কানে আসে, তেমনি আকাশের নিজের বলা কথাটি নিজের কানে গিয়েই ধাক্কা খায়। আসমানী নওয়ান যেমন ছেলের কান্ডে অবাক হয়, তেমনি আকাশও নিজেও নিজের কথাতে অবাক হয়। সে সাথে সাথে সন্ধ্যার গাল থেকে হাত সরিয়ে নেয়। সে স্যরি বলেছে ভাবতেই নিজের উপর রা’গ হলো। সাথে সন্ধ্যার উপর। দৃষ্টি সন্ধ্যাতে রেখে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলে,
“নট স্যরি! বে’য়া’দ’ব মেয়ে! উফ! আমার শান্তি কে’ড়ে কিভাবে ঘুমাচ্ছে! তোমাকে মে’রেই ফেলব আমি। এভিকে চেনোনা তুমি!”
কথাটা বলার পর-ই সন্ধ্যা ঘুমের ঘোরে আরও হেলে আসে আকাশের দিকে। বিছানা থেকে পড়ে যেতে নিলে আকাশ দ্রুত সন্ধ্যাকে বা হাতে আগলে নেয় আর চেঁচিয়ে ওঠে,
“আরে আরে পড়ে যাচ্ছো কেন?”
কানের কাছে এতো জোরে চেঁচানোর শব্দ পেয়ে সন্ধ্যার ঘুমের রেশ কেটে যায়। ভীষণ বিরক্ত হয়। চোখমুখ কুঁচকে নেয়। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। তীব্র আলোয় ঠিক করে তাকাতে পারছেনা। তবুও ঘুমঘুম চোখে দেখার চেষ্টা করে। সর্বপ্রথম দু’টো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সন্ধ্যার ঘুমের রেশে ভরা ঝাপসা চোখে পড়ে। হঠাৎ ঘুম ভেঙেই এরকম একটি দৃশ্য দেখে সন্ধ্যা ভীষণ ভ’য় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে।
আকাশ সন্ধ্যার ঘুমঘুম মুখ দেখছিল ভীষণ মনোযোগ দিয়ে। কিন্তু সন্ধ্যার চেঁচানোয় তার কাজে বিঘ্ন ঘটে, সাথে ধ্যান ভাঙে। রা’গ’ল বেশ। কটমট দৃষ্টিতে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। কড়া ধমক দেয়,
“সাটআপ বে’য়া’দ’ব মেয়ে!”
ধমক খেয়ে সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ভালোভাবে তার মুখের সামনে বিদ্যমান মুখটি খেয়াল করলে দেখল এটা আকাশ। আকাশকে দেখে সন্ধ্যার ভ্রু কুঁচকে যায়। তার মনে হলো, সে স্বপ্ন দেখছে। আকাশ তার কাছাকাছি আসবে, এটা তো বাস্তবে সম্ভব নয়। চোখেমুখে এখনো ঘুমের রেশ মেয়েটার। সে ভালোভাবে চোখ মেলে এবার। বা হাতে চোখ কচলে তাকায়। নাহ্, এটা তো স্বপ্ন মনে হচ্ছে না। একদম সত্যি মনে হচ্ছে। আকাশ তার দিকে রে’গে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যা ঢোক গিলল। সে ঠিক বুঝতে পারছে না, সে আকাশের কাছে কিভাবে এলো! সে তো তার আম্মার সাথে তার আম্মার ঘরে বিছানায় ঘুমিয়েছিল। তাহলে?
এদিকে আসমানী নওয়ান নিরব চোখে চেয়ে আছে। সে আসলে আকাশের ভাবগতি বুঝতে চাইছেন। তার কেমন যেন অদ্ভুদ লাগছে। আকাশ সন্ধ্যার প্রতি থেকে থেকে ভীষণ নমনীয় হয়ে যায়, একদম আগের মতো৷ ব্যাপারটি তিনি কিছুক্ষণ আগে নিজ চোখে না দেখলে তো বুঝতেই পারতেন না।
সন্ধ্যা নড়াচড়া করতে গেলে বুঝল সে আকাশের হাতের উপর। মেয়েটি সত্যিই বুঝল না, সে আকাশের কাছে, তাও আবার একেবারে আকাশের কোলে এসে পড়েছে। সে আবারো আকাশের দিকে তাকায়। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কিছু বলতে চায়, তখন-ই আকাশ সন্ধ্যাকে ফেলার জন্য হাত আলগা করলে সন্ধ্যা বা হাতে আকাশের শার্টের কলার চেপে ধরে চেঁচিয়ে বলে,
“একদম ফেলবেন না আমাকে।”
আকাশ ঢিলে হাত শ’ক্ত করে নেয়। চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। সন্ধ্যার কথার ধরনে মনে হচ্ছে, মেয়েটি তাকে আদেশ করছে৷ আকাশের রা’গ বাড়ল। দাঁতে দাঁতে চেপে বলে,
“আমাকে হুকুম করছ তুমি? এভিকে? তোমার সাহস তো কম না!”
সন্ধ্যা শুকনো ঢোক গিলল। সে বুঝে গিয়েছে, এই আকাশের সাথে ভালোবেসে কথা বললে আকাশ তার কথা তো শুনবেই না উল্টে তাকে আরও পা’গ’ল উপাধি দিতে থাকবে। এমনিতেই গত ক’দিনে সে পড়ে যাওয়ার ফলে একটু প্রবলেম হয়েছিল। নিয়াজ ভাইয়া বারবার বলেছে, বাচ্চাকে সুস্থভাবে পৃথিবীতে আনতে চাইলে সাবধানে থাকতে। যদি বারবার এভাবে পড়ে গেলে তার বাচ্চার কিছু হয়ে যায়? কথাটা মনে আসতেই সন্ধ্যার বুক কাঁপে। তার বাচ্চার কিছু হলে সে কি করে বাঁচবে? সন্ধ্যা নিজেকে সামলায়। বলে,
“যা ইচ্ছা ভাবুন। আমাকে ভালোভাবে নামিয়ে দিন।”
সন্ধ্যার কণ্ঠে নমনীয়তার ছিটেফোঁটা নেই। আবার কথার ধরন দেখ। আকাশ রা’গে ফুসে ওঠে। সন্ধ্যাকে কোলে নিয়েই বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“নামাবো না। ছুড়ে ফেলব তোমাকে। একদম বাড়ির বাইরে গিয়ে পড়বে।”
সন্ধ্যা ভীত চোখে তাকায়। আকাশ সত্যি সত্যি তাকে ছুড়ে ফেললে তার বাচ্চার কি হবে? এ পর্যায়ে আসামানী নওয়ান এগিয়ে এসে বলে,
“আকাশ জান্নাতকে ভালোভাবে নামিয়ে দাও।”
মায়ের কথায় আকাশ আরও চটল। তার মা এই বাইরের ছেলে মেয়ের জন্য এতো দরদ কেন দেখায়, তার বুঝে আসেনা। মায়ের দিকে চেয়ে রে’গে বলে,
“বললাম তো নামাবো না।”
সন্ধ্যা ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দৃষ্টি আকাশের দিকে। কিছু একটা ভেবে সন্ধ্যা দু’হাতে আকাশের গলা সাপের ন্যায় পেঁচিয়ে ধরে। আকাশের ধ্যান তার মায়ের থেকে ঘুরে আসে সন্ধ্যার দিকে। বিরক্ত হলো সন্ধ্যার এহেন কান্ডে। রে’গে বলে,
“আরে আরে আমার গলা ছাড়ো বলছি।”
সন্ধ্যা ছাড়লো না। যদিও এভাবে ধরেছে, যেন আকাশ হাত ছেড়ে দিলেও সে পড়ে না যায়। কিন্তু এতোগুলো দিন পর আকাশকে এভাবে জড়িয়ে ধরার পর সন্ধ্যার কি ভীষণ শান্তি লাগলো। আগে আকাশ তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরত। আর আজ সে ধরেছে বলে, আকাশের কত রা’গ! সন্ধ্যার বুকে চিনচিন ব্য’থা হয়।
এদিকে আকাশ শ’ক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হৃৎস্পন্দনের গতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে। চোখ বুজল আকাশ। আবারও সেই অশান্তি। ছেলেটার মাথা ব্য’থা শুরু হয়। মেয়েটাকে শুধু ফেলে দেয়া নয়, একদম মে’রে ফেলতে ইচ্ছে করছে। অথচ মে’রে ফেলা তো দূর, ফেলে দেয়ার কথা ভাবলেই মনে হচ্ছে, একটা থা’প্প’ড় দিলে গাল কে’টে যায়। তাহলে ফেলে দিলে নিশ্চয়ই কোমর কা’ট’বে নয়তো ফা’ট’বে। এই ভাবনাটুকু আকাশকে বারবার বাঁধা দিচ্ছে। আকাশ ঢোক গিলল। এমনিই এই মেয়ের জন্য সে শান্তি পায়না। তার উপর মেয়েটা অদ্ভুদ সব বিহেভ করে। আকাশ চোখ বুজে রেখেই রূঢ় কণ্ঠে বলে,
“গলা ছাড়ো। আমাকে এভাবে ধরেছ কেন?”
সন্ধ্যা চোখ বুজে নিয়েছিল। আকাশের কণ্ঠে চোখ মেলে। খারাপ লাগে আকাশকে ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবলে। সে আকাশের গলা ধরেছে পড়ে যাওয়ার ভ’য়ে। কিন্তু ছাড়ছে না কেন, তা বললে হয়ত আকাশ আবারও তাকে পা’গ’ল বলবে। সন্ধ্যা নিজেকে সামলে আকাশের মতো করেই রূঢ় কণ্ঠে উত্তর দেয়, “আমার ইচ্ছা।”
আকাশ সাথে সাথে চোখ মেলে৷ চোয়াল শ’ক্ত হয়। তার গলা ধরে রেখে, তাকে বলছে, তার ইচ্ছা? কি বে’য়া’দ’ব ভাবা যায়! আকাশ এবার সিদ্ধান্ত নিয়েই নিল এই মেয়েকে একদম বাড়ির বাইরে গিয়ে ছুড়ে ফেলে আসবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। আকাশ সন্ধ্যাকে নিয়ে বড় বড় পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সন্ধ্যা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বুঝল না আকাশ তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
আসমানী নওয়ান আকাশের পিছু পিছু আসে। বলে,
“আকাশ ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?”
আকাশ কিছু বলে না৷ সে তার মতো এগোচ্ছে। আর নেয়াই যাচ্ছেনা মেয়েটাকে। তার সাথে একের পর এক বে’য়া’দ’বি করছে।
আসমানী নওয়ান পায়ের গতি বাড়িয়ে আকাশের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। মাকে দেখে আকাশের পদযুগল থেমে যায়। বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“কি প্রবলেম মা?”
আসমানী নওয়ান জবাব দেয়,
“জান্নাতকে নামাও আকাশ। ওদিকে কোথায় যাচ্ছো?”
আকাশ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“ওকে বাড়ির বাইরে ছুড়ে ফেলে আসবো। সেকেন্ডে সেকেন্ডে ও আমার সাথে বে’য়া’দ’বি করে। সামনে থেকে সরো তুমি।”
আসমানী নওয়ান কি বলবেন বুঝলেন না৷ সন্ধ্যা আরও শ’ক্ত করে আকাশের গলা চেপে ধরে। বলে,
“আমাকে ফেললে, আপনার আম্মা কিন্তু আপনাকে ভাত দিবে না, আপনি শুকিয়ে শুটকি না হওয়া পর্যন্ত৷”
সন্ধ্যার বলা কথাটা শুনে আসমানী নওয়ান আর আকাশ দু’জন একে-অপরের দিকে অদ্ভুদভাবে তাকায়। যেন এইমাত্র তারা কোনো জোক্স শুনেছে, কিন্তু অদ্ভুদ ব্যাপার তাদের হাসি আসছে না। আসমানী নওয়ান মনে মনে কপাল চাপড়ায়। মেয়েটা যে কখন কি বলে নিজেই বোঝেনা৷
এদিকে সন্ধ্যা কথাটা বলে নিজেই বোকা বনে গিয়েছে। আসলে সে ভাবছিল আকাশকে আটকাতে। কিছু খুঁজে না পেয়ে হঠাৎ মনে যা এসেছে, তাই মুখ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছে।
আকাশ শ’ক্ত গলায় বলে,
“অলরেডি নিজে এক শুটকি হয়ে আছো। আবার আমাকে শুটকি বানাতে চাইছ? বে’য়া’দ’ব মেয়ে কোথাকার! আমার ওয়েট কত, জানো?”
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। ভাবল, আকাশ তাকে শুটকি বলছে কেন! যদিও সবাই বলে সে অনেক শুকিয়েছে। কিন্তু আকাশ কথাটা বলায় বোধয় একটু ভালো লাগলো এই ভেবে, আকাশ তার দিকে একটু হলেও মন দিয়েছে।
আসমানী নওয়ান দুই ছেলেমেয়ের ভিত্তীহীন কথায় হতাশ হলেন। এসব সাইডে রেখে আকাশের উদ্দেশ্যে বলে,
“আকাশ ওকে নামিয়ে দাও।”
আকাশ রে’গে বলে,
“নামাবো না ওকে।”
আসমানী নওয়ান রা’গ’তে গিয়েও রা’গলো না। আকাশের সাথে এখন রা’গ দেখিয়ে লাভ নেই বুঝল। সে আকাশকে বিব্রত করতে কথাটা ঘুরিয়ে বলে,
“তাহলে কি সারারাত জান্নাতকে কোলে নিয়ে রাখতে চাইছ?”
আকাশ থতমত খেয়ে তাকায় মায়ের দিকে। বিরক্ত হয়ে বলে,
“আমি কেন একে সারারাত কোলে নিয়ে থাকতে যাবো? স্ট্রেঞ্জ!
“তুমি নিজেই ভেবে দেখ, কখন থেকে জান্নাতকে কোলে নিয়ে আছো।”
আকাশ থমথমে মুখে তাকায়। সন্ধ্যা আকাশের গলা জড়ানো দু’হাত ঢিলে করে। মাথাটা সামান্য পিছিয়ে এনে তাকায় আকাশের দিকে। আকাশের যদি সব মনে পড়ত, তবে আজকের দিনগুলো অন্যরকম হতো। আকাশ তার আর তার ভাইয়ার সাথে এমন অ’মানবিক আচরণ করার কথা ভাবতেও পারতো না। কিন্তু এখন সব এলেমেলো।
আকাশ দৃষ্টি ফিরিয়ে সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে বলে,
“বললাম তো ওকে ছুড়ে ফেলব।”
সন্ধ্যা অসহায় চোখে তাকায়। আকাশের দৃষ্টি সন্ধ্যার অসহায়ত্বে ঘেরা দৃষ্টির সাথে মিলিত হয়। ক’সেকেন্ডের মাথায় আবারও সন্ধ্যার কা’টা গালে দৃষ্টি পড়লে আকাশ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। মনে হচ্ছে তার কোনো প্রবলেম হয়েছে। মেয়েটাকে আ’ঘা’ত করার জন্য আগে তাকে প্রিপারেশন নিতে হবে। নয়তো তার দ্বারা কিছুতেই এই কাজটা হচ্ছেনা। উল্টে এক আ’ঘা’ত দিয়ে তার শুধু অশান্তি লাগছে। এই অশান্তি থেকে বাঁচতে তার এখান থেকে এক্ষুনি যাওয়া উচিৎ বলে মনে হলো। অতঃপর আকাশ আস্তে করে সন্ধ্যাকে নামিয়ে দেয়।
আকাশের কান্ডে সন্ধ্যা অবাক হলো। অবাক হলো আসমানী নওয়ান-ও। আকাশ সত্যিই সন্ধ্যাকলে নামিয়ে দিল? তাও আবার এতো ভালোভাবে?
আকাশ আর এখানে দাঁড়ায় না। উল্টো ঘুরে এক পা এগোতে গিয়েও কি যেন ভেবে আবারও এদিকে ফিরে তাকায় সন্ধ্যার দিকে। শ’ক্ত করে বলে,
“মুড নেই, তাই বেঁচে গেলে। পরেরবার বাঁচবে না। কনফার্ম।”
কথাটা বলে আকাশ জায়গাটি প্রস্থান করার জন্য দ্রুত পা চালায়। দু’তিন সিঁড়ি গ্যাপ দিয়ে দিয়ে উপরে উঠে যায়। যেন পালিয়ে গেল।
সন্ধ্যা চেয়ে রইল আকাশের দিকে। আকাশের বলা, ‘পরেরবার বাঁচবে না’ কথাটা মাথায় ঘুরছে। এই মানুষটা তার ভালোবাসা। আচ্ছা সে কি এই মানুষটার ভালোবাসা নয়? তাকে কি একটুও মনে নেই? সন্ধ্যার মুখখানা মলিন হয়।
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যার কাঁধ ধরে নিজের দিকে ফেরায়। থুতনিতে হাত রেখে মৃদু হাসে। ভদ্রমহিলার হাসিতে সন্ধ্যা অবাক হয়। আসমানী নওয়ান বোঝানোর স্বরে বলেন,
“তুই আমার আকাশের ভালোবাসা জান্নাত। একটা কথা মনে রাখবি, ভালোবাসা কখনো ম’রে না। আমার আকাশের ভালোবাসা-ও ম’রেনি। ও অস্বীকার করলেও ওর মাঝে তোর প্রতি ভালোবাসা সুপ্ত অবস্থায় জীবিত আছে। যার প্রমাণ আমি আজ পেলাম। তুই শুধু ধৈর্য রাখিস মা।”
সন্ধ্যার চোখজোড়া ঝাপসা হয়। সত্যিই আকাশ এখনো তাকে ভালোবাসে? তবে কবে আবারো ডাকবে, সোনা বউ বলে? ডাকবে তো? একদিন আকাশ নিজেই তাকে জড়িয়ে ধরবে তো? তাকে আর তার ভাইয়াকে আবারো ভালোবাসবে?
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে নিয়ে তার ঘরে যায়। সন্ধ্যা চুপচাপ যায় তার আম্মার সাথে। সিঁড়ির দিকে একবার তাকায়। আকাশকে দেখতে পায় যদি! আকাশ ততক্ষণে তার ঘরে চলে গিয়েছে। তাই আর দেখা মিলল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।
ঘড়ির কাটা তখন ১:৩০ এর ঘরে। সৌম্য ডান কাত হয়ে শুয়ে আছে। ডান হাত মেলে রাখা, যেখানটায় ইরা মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। বালিশ নেই এমন নয়। ইরার অভ্যাস এটা। সে বিছানায় একটার বেশি বালিশ রাখেনা ইচ্ছে করে। রাখলেও তাদের থেকে কয়েক হাত দূরে রাখে। প্রথমদিন সৌম্য ইরার এই কান্ডে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে ইরা উত্তরে বলেছিল,
‘আমাকে তোর বুকে মাথা রাখতে দিবি সৌম্য? কখনো কখনো তোর হাতের উপর-ও নাহয় মাথা রাখব। সারারাতে যদি তোর বুক, হাত যদি ব্য’থা হয়ে যায়, আমি পরেরদিন মালিশ করে দিয়ে সব ব্য’থা সারিয়ে দিব।”
সেদিনের বলা কথাটা ভেবে সৌম্য একটু হাসল। তাকায় ঘুমন্ত ইরার পানে। বা হাত ইরার গালে রেখে মৃদুস্বরে বলে, “আমার ইরবাতী।”
এরপর সৌম্য বা হাতে ইরাকে তার দিকে একটু টেনে নিয়ে কম্বল দিয়ে দু’জনকে আরেকটু ঢেকে নয়। ইরার কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করে। মিনিট দু’য়েক এর মাথায় মনে হলো, পাশের ঘরে কেউ চেঁচামেচি করছে। কিছু সময় পেরোলে সৌম্য’র মনে হলো, চেঁচামেচি একজন নয়, বরং দু’জন করছে। সৌম্য’র কপালে ভাঁজ পড়ে। এতো রাতে কারা এভাবে গলা উঁচু করে কথা বলছে বুঝল না। প্রায় পাঁচ মিনিটের মাথায় জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলার শব্দ হয়। সাথে মেয়ে কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলা স্পষ্ট কণ্ঠের কিছু কথা ভেসে আসে সৌম্য’র কানে,
“এখনো এতো দরদ কেন ওই দুই ভাইবোনদের জন্য তোর? ওই মেয়ের পেটে নাকি বাচ্চা? তবুও ওকে চাস? ল’জ্জাশরম সব বিকিয়ে দিয়েছিস তাইনা? আর ওই ছেলের প্রতিই বা এতো দরদ ক্যান? ওকে বাড়ি উঠতে দিলি বলেই তো ওই মেয়ে এই বাড়ি পা রাখলো। যত অশান্তি হয়েছে আমার। বাইরের মানুষ ঘরে এসে ঘাপটি মে’রে থাকবে। আর সেসব শাস্তি পোহানো লাগবে আমার।”
সৌম্য ততক্ষণে চোখ মেলে তাকিয়েছে। রিহানের মায়ের গলা চিনতে এবার একটুও অসুবিধা হয়নি তার। সৌম্য ঢোক গিলল।
এবার রিহানের কণ্ঠ ভেসে আসে,
“সৌম্য এখানে একবারে থাকতে আসেনি মা। প্লিজ ওকে নিয়ে কিছু বলো না৷ ও আমার বন্ধু। বিপদে পড়ে এখানে এসেছে। আমি এটুকু করতে না পারলে আমি কেমন বন্ধু হলাম বলো তো?”
“লাগবেনা এরকম বন্ধু। ওর জন্য আজ তোর জীবনের কোনো ঠিকঠাকানা নেই।”
“দয়া করে চুপ কর। ওরা ঘুমিয়েছে। তুমি কি চাইছ এই মাঝরাতে ওদের বের করে দিই?”
রিহান মা রে’গে বলে,
“পারলে তাই দে। আমায় একটু শান্তি দে। ওদের দেখলেই আমার গা জ্ব’লে যায়। সেখানে ওদের মেহমানদের মতো আপ্যায়ণ করতে হচ্ছে আমার৷ আর যদি এই ছেলের সাথে সম্পর্ক রেখেছিস তো, আমার সাথে তোর সম্পর্ক থাকবে না, এই বলে দিলাম আমি।”
এরপর আর শোনা গেল না। দু’জনেই নিরব হয়ে গিয়েছে।
এদিকে রিহান আর তার মায়ের কথোপকথন শুনে সৌম্য’র বুক ভার হয়ে আসে। গায়ে জড়ানো কম্বল সরিয়ে ইরাকে ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে বসে সে। সামান্য নড়াচড়ায় ইরার ঘুম ভেঙে যায়। সৌম্য’কে উঠে বসতে দেখে ইরা-ও ধীরে ধীরে উঠে বসে। সৌম্য’র বাহুতে হাত রেখে ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলে,
“কি হয়েছে সৌম্য?”
সৌম্য তাকায় ইরার পানে। জোরপূর্বক একটু হাসল৷ ছোট করে বলে,
“কিছু না। ওদিকে ঘোরো।”
ইরা প্রশ্নাত্মক চোখে তাকালে সৌম্য আবারও তাড়া দিলে ইরা কোনো প্রশ্ন না করে উল্টো ঘুরে বসে। সৌম্য দু’হাত ইরার কোমর সমান এলোমেলো চুলগুলো একসাথে করে একটি খোঁপা বেঁধে দেয়। ইরা ভ্রু কুঁচকে তাকায়৷ জিজ্ঞেস করে,
“সকাল হয়ে গিয়েছে কি?”
সৌম্য উত্তর দেয়, “না। দেড়টা বাজে।”
ইরা অবাক হলো৷ খোঁপা করে দেয়ায় মেয়েটা অবাক হলো না। এই কাজ সৌম্য-ই তাকে সবসময় করে দেয়৷ কিন্তু এই মাঝরাতে তো করে দেয় না। উল্টে শোয়ার আগে সৌম্য নিজেই খোঁপা খুলে দেয়, যেন তার ঘুমাতে সমস্যা না হয়৷ তাহলে? ভাবনার মাঝেই সৌম্য বিছানা থেকে নেমে ঘরের লাইট জ্বালায়। এগিয়ে এসে ইরার হাত ধরলে ইরা চুপচাপ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। সৌম্য ইরাকে নিয়ে ওয়াশরুমে যায়। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে ট্যাপ ছেড়ে ডান হাত বাড়িয়ে দেয় ট্যাপের নিচে। ইরার উদ্দেশ্যে বলে,
“মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ কর।”
ইরা অবাক হলো। এবারেও মেয়েটা কিছুই বলল না। সামান্য ঝুঁকে চোখ বুজলে সৌম্য ইরার মুখে কয়েকবার পানি ছিটিয়ে দেয়৷ একই সাথে নিজের মুখেও কয়েকবার পানি ছিটিয়ে ট্যাপ অফ করে দেয়। এরপর ইরার হাত ধরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। ইরার পরনের শাড়ির আঁচল টেনে সৌম্য তার মুখ মুছে নেয়৷
এরপর এগিয়ে গিয়ে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা টি-শার্ট পরে তার উপর জ্যাকেট পড়ে নেয়। ইরার চাদর এনে ইরার মাথাসহ গা ভালোভাবে ঢেকে দেয়। ইরা এতক্ষণ অবাক হয়ে শুধু দেখছিল সৌম্য’র কান্ড। হয়ত কিছুটা আন্দাজ করেছে। যদিও সে ঘুমিয়ে ছিল, তবে চেঁচামেচি’র আওয়াজে ঘুম হালকা হয়েছিল। সৌম্য’র আচরণে কথাগুলো না শুনলেও বুঝে ফেলেছে অনেককিছুই। মৃদুস্বরে বলে,
“এতো রাতে আমরা কোথায় যাবো সৌম্য? এখন তো শীতের রাত। কাল সকালে গেলে হয়না?”
সৌম্য তাকায় ইরার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ইরার মুখের দিকে। হঠাৎ-ই ইরাকে শ’ক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে। ইরা দু’হাত তুলে সৌম্য’র পিঠে রাখে। সৌম্য লম্বা করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঢোক গিলে বলে,
“আমার আজকের দিনগুলো ভালো নয় ইরাবতী। আমার তোমার সঙ্গ চাই। আমি তোমাকে কতটুকু ভালো রাখতে পারবো জানিনা। তবে আমার সবটা দিয়ে দিব। শুধু আমার আত্মসম্মান কুড়াতে আমাকে কখনো বাঁধা দিওনা।”
ইরা আর কথা খুঁজে পেল না। অনুতপ্ত স্বরে বলে, “স্যরি সৌম্য!”
সৌম্য ইরাকে ছেড়ে ইরার কপালে একটা চুমু আঁকে। টেবিলের উপর থেকে ফোন আর মানি ব্যাগ নিয়ে
ইরার ডান হাত তার বা হাতের মুঠোয় নিয়ে বাইরের দিকে যেতে যেতে বলে, “এসো।”
ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আশেপাশে তাকালে সোফার এক কোণায় রিহানকে বসে থাকতে দেখে সৌম্য সেদিকে এগিয়ে যায়। ডাকে, “রিহান?”
রিহান মাথা তুলে তাকায়। সৌম্য আর ইরাকে এভাবে দেখে দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। অবাক হয়ে বলে,
“কোথাও যাচ্ছিস সৌম্য?”
সৌম্য জবাব দেয়,
“হ্যাঁ। একটা কাজ আছে। যাচ্ছি তাহলে।”
রিহানের অবাক স্বর, “এতো রাতে কি কাজ?”
সৌম্য একটু হাসল। কিছু বলল না। ইরার হাত ধরে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। রিহান ঢোক গিলল। খুব বুঝল সৌম্য তার মায়ের বলা কথাগুলো শুনে নিয়েছে। ভীষণ অসহায় লাগলো নিজেকে। সৌম্য যে আর কিছুতেই এখানে থাকবেনা সে জানে। রিহান মলিন গলায় বলে,
“মায়ের কথায় কিছু মনে করিস না সৌম্য।”
সৌম্য দাঁড়ালো। ইরা তাকায় সৌম্য’র দিকে। এবার আরও পরিষ্কার হলো, রিহানের মা কিছু একটা বলাতেই সৌম্য’র এমন আচরণ।
সৌম্য ইরার হাত ছেড়ে রিহানের সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে,
“তোর ছন্নছাড়া জীবনের জন্য কোথাও না কোথাও আমি-ই দায়ী রিহান। পারলে আমায় ক্ষমা করিস। আমি আর তোর সাথে যেগাযোগ করব না। তুই-ও করিস না। ভালো থাকিস।”
রিহানের অসহায় কণ্ঠ, “সৌম্য?”
সৌম্য বহুক’ষ্টে শ্বাস ফেলে দু’বার৷ মায়ের মুখটা ভীষণ মনে পড়ল। সৌম্য নিজেকে সামলায়। ডান হাত রিহানের কাঁধে রেখে বলে,
“মায়েদের মনে ক’ষ্ট দিতে নেই রিহান। মায়ের মতো করে কেউ ভালোবাসেনা বুঝলি। তুই পারলে বিয়ে করে নে এবার। অন্তত আন্টির জন্য। আর আমার সালাম দিবি আন্টিকে। যাচ্ছি।”
কথাটা বলে সৌম্য আর দাঁড়ালো না। এগিয়ে এসে ইরার হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। চোখদুটো লাল হয়ে আছে। তার জীবনে সুখের সময়টা খুব সীমিত ছিল। আর দুঃখের সময় ছিল অসীম। মানুষ বলে, দুঃখের দিনে পাশে থাকা মানুষগুলোকে কখনো ভোলা যায়না। রিহান তার একমাত্র বন্ধু, যে তার দুঃখের দিনে কোথা থেকে যেন পাশে এসে দাঁড়াতো। সৌম্য কখনো খোঁজ না দিলেও নিজেই খুঁজে নিত। সৌম্য নিষেধ করত না। কিন্তু আজ থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করল নিজেই নিজের কাছে। রিহানের হেল্প না নেয়ার নিষেধাজ্ঞা।
সবাই সবার পাশে চিরদিন থাকার সুযোগ পায়না। এটাই তো জীবন!
কথাগুলো ভেবে সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
রিহান ঝাপসা চোখে চেয়ে সৌম্য’র প্রস্থন দেখল। কেন যেন তার বাচ্চাদের মতো করে কাঁদতে ইচ্ছে করল। সৌম্য হয়ত আর কখনোই তার দিকে ফিরেও তাকাবেনা। নাহ, রা’গ করেছে বলে নয়। সৌম্য’র আত্মসম্মানে লেগেছে। রিহান খুব ভালো করে চেনে সৌম্যকে। তার মায়ের জন্য সৌম্য আর কখনোই তার দিকে ফিরবেনা। রিহান এগিয়ে এসে সোফায় বসে দু’হাতে মুখ ঢেকে নিল। কেন যেন বড্ড ক্লান্ত লাগছে আজ।
আসমানী নওয়ান সন্ধ্যাকে শুইয়ে দিয়ে বেলকনিতে গেলে চোখে পড়ে, তার বাড়ি সোজা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে জেডি। দীর্ঘ ক’বছর পর দেখলেও চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না। ভদ্রমহিলার চোখেমুখে রা’গ ফুটে ওঠে। তার ছেলের এই হালের জন্য কোথাও না কোথাও তো এই ছেলেও দায়ী। তিনি আর এখানে দাঁড়ালেন না। হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে আসমানী নওয়ান। একদম জেডির পিছনে দাঁড়িয়ে শ’ক্ত গলায় বলে,
“এখানে কেন এসেছ?”
পরিচিত কণ্ঠ পেয়ে জেডি বাঁকা হাসে। কিন্তু তাকালো না। বা হাত প্যান্টের পকেটে। ডান হাতে সিগারেট ধরে রেখেছে। নিশ্চিন্ত মনে সিগারেট ফুঁকতে ব্যস্ত সে। আসমানী নওয়ান জেডির গা ছাড়া ভাবে রে’গে ডাকে,
“জেডি?”
জেডি এবারেও তাকালো না। ওদিক ফিরেই বলে,
“ওয়েট ওয়েট আন্টি। এতো হাইপার কেন? একটু সবুর তো করুন। এতো ভালোবাসলে তো মুশকিল!”
জেডির হেয়ালি স্বরে আসমানী নওয়ানের রা’গ তড়তড় করে বেড়ে যায়। রাগান্বিত স্বরে বলে,
“খু’ন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে তোমাকে। জা’নো’য়া’র ছেলে কোথাকার।”
সাথে সাথে জেডি এদিক ফিরে তাকায়। ডান হাত উঁচিয়ে বলে,
“এ্যাই এভির মা এ্যাই! আপনাকে কি আমার বাঁচিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে না-কি! হ্যাঁ?”
আসমানী নওয়ান শ’ক্ত চোখে চেয়ে বলে, “আকাশকে তুমি এসব ভুলভাল বুঝিয়েছ, তাইনা?”
জেডি হাতের সিগারেট ছুড়ে ফেলে অবাক হওয়ান ভান করে বলে, “রিয়েলি? ওয়াও! আর কি কি করেছি, লিস্ট গুলো যদি বলতেন!”
আসমানী নওয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তার কেন জেডিকে সন্দেহ হয়না। সে জেডিকে আকাশের মতোই চেনে। একসময় ছেলের মতোই থেকেছে তার সাথে। সৌম্য আর সন্ধ্যার সাথে জেডির ইহজন্মে কোনো কানেকশন থাকার কথা নয়। তাহলে কে এর পিছনে?
আসমানী নওয়ানকে চুপ দেখে জেডি বাঁকা হেসে বলে,
“আমাকে আর এভিকে আলাদা করার জন্য যে গেইম আপনি খেলেছিলেন, এ কথা যদি এভি একবার জানতে
পারে, তখন আপনার কি হবে মিসেস আসমানী নওয়ান?”
আসমানী নওয়ানের মুখে ভ’য়ের ছাপ ফুটে ওঠে। জেডি হাসে। শব্দ করে হাসে৷ আসমানী নওয়ানকে ভ’য় পাইয়ে দিয়ে সে যেন ভীষণ আনন্দিত।
আসমানী নওয়ান নিজেকে সামলায়। শ’ক্ত গলায় বলে,
“আকাশ কিচ্ছু জানবে না। কিচ্ছু না। এতো বছরে যখন প্রুফ দিতে পারোনি। আজ-ও তুমি পারবে না জেডি। নেভার।”
জেডি’র হাসির মাত্রা দীর্ঘ হয়। শব্দরা
ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ধীরে ধীরে জেডি’র হাসি হালকা হয়। ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলে,
“এভি কি জানবে, আর কি জানবে না, সব তো সময় বলবে এভির মা ওরফে মাই সুইটহার্ট আন্টি। দেখতে রহো ক্যা হোতা হ্যায়।”
আসমানী নওয়ান ঢোক গিলল। একটা থেকে বের হতে না হতেই আরেকটা হাজির। জেডি’র কথা শুনে মনে হচ্ছে, ও কিছু জট পাকাচ্ছে। আকাশ যদি কিছু জানে, তাহলে তার কি হবে? জেডি আসমানী নওয়ানের এক্সপ্রেশনে গা দুলিয়ে হাসে। কয়েক পা পিছিয়ে যায়। হাসতে হাসতেই বলে,
“লাভ ইউ লাভ ইউ মাই সুইটহার্ট আন্টি। আপনি ঠিক এভাবেই ভ’য় পাবেন। এমন আপনাকে দেখতে ঝাক্কাস লাগে, অ্যান্ড মেরা দিল বহুত খুশ হো জাতা হ্যায়।”
আসমানী নওয়ান শ’ক্ত চোখে চেয়ে দেখে জেডিকে। জেডির হাসি মনে হচ্ছে তার গায়ে আ’গু’ন ধরিয়ে দিচ্ছে।
সন্ধ্যা অনেকক্ষণ থেকে এপাশ-ওপাশ করছে। তার চোখে ঘুম নেই। আসমানী নওয়ান কোথায় গিয়েছে কে জানে! সন্ধ্যা এ নিয়ে মাথায় ঘামায়না। আকাশ চলে যাবার পর আসমানী নওয়ান নিজেই অফিস সামলান। কখন কোথায় কোন কাজে চলে যায়, সন্ধ্যা জানেনা। তবে অফিসের কাজেই হুটহাট চলে যায়। প্রথম দু’মাস তিনি নিজেও ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। এরপর নিজেকে শ’ক্ত করে কাজে মন দিয়েছে। সন্ধ্যার অবাক লাগে তার আম্মাকে দেখলে। আসমানী নওয়ান নিজেকে যেমন দেখায় তেমন নয়৷ আগে তো একদম গ্রাম্য ভাষায় কথা বলত, আর এখন….সন্ধ্যা মেলাতেই পারেনা। সে বুঝেছে তার আম্মা ক্ষেত্রবিশেষে নিজেকে একেকরূপে উপস্থাপন করে। এর সবগুণ তার মাঝে আছে। সবকিছুর মাঝে তার আম্মা তার খেয়াল রাখতে ভুলে যায় না। ভীষণ ভালোবাসে তাকে। মায়ের মতো। খালা তো তার। খালারা হয়তো মায়ের মতো করেই ভালোবাসে। ভাগ্যিস সে খালার দেখা পেয়েছিল। এজন্য মায়ের ভালোবাসার গন্ধ পেয়েছে সে।
অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে সন্ধ্যা উঠে বসে। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে একটু হাঁটাহাঁটি করে। মনে পড়ল সেই ভিডিওতে দেখা দৃশ্য। আকাশ সৌম্য’র সামনে দলিল ধরেছিল। সন্ধ্যার মাথা কাজ করেনা, তার ভাইয়া ওখানে সাইন না করলে ওখানে সাইন কিভাবে গেল? আর আকাশ-ই বা কেন এমন করছে? সবচেয়ে বড় কথা, সন্ধ্যার মাথায় আসলো, তাকে ভিডিওটি কে পাঠিয়েছে। সন্ধ্যা নিজের ভাবনায় নিজেই বিস্মিত হলো। এসব তো মাথায় আসেনি তার। সন্ধ্যা দ্রুত তার ফোন নিয়ে নাম্বারটি বের করল, যে নাম্বার থেকে তাকে ভিডিও পাঠানো হয়েছে। সন্ধ্যা কি মনে করে নাম্বারে কল করে। অবাক করা কান্ড কলটি সাথে সাথেই রিসিভ হয়। সন্ধ্যা কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে আকাশের কণ্ঠ ভেসে আসে সন্ধ্যা প্রিয় দু’টি শব্দ, “সোনা বউ?”
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ৭
সন্ধ্যা স্তব্ধ হয়ে যায়। পুরো শরীর শিরশির করে ওঠে। কলের ওপাশ থেকে আবারো একই কণ্ঠে ভেসে আসে,
“অনেক বেশি মনে পড়ছিল সোনা বউ?”
সন্ধ্যা ঢোক গিলল। হঠাৎ-ই দরজার দিকে চোখ পড়লে দেখল আকাশ দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে গম্ভীর মুখে চেয়ে আছে সন্ধ্যার দিকে। সন্ধ্যার মাথা ঘুরে ওঠে। বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আকাশ এখানে থাকলে ফোনের ওপাশে কে? না-কি ফোনের ওপাশেই আকাশ। আর তার সামনে দাঁড়ানো লোকটা আকাশ নয়। সন্ধ্যার মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে। কি হচ্ছে তার সাথে?
