আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৮
DRM Shohag
বিদায় এভিজা…..
নাহ, লাইনটুকু মনে মনে আওড়ানোর সময়টুকুও অধীর পেল না। কাঁপতে থাকা বা হাত উঠাচ্ছিল, আকাশকে একবার ছুঁয়ে দেখবে বলে। সেই সুযোগটুকুও আর হলো না। চোখদু’টো একেবারে ব’ন্ধ হয়ে গেল। আ’ত্মাহীন শরীরটা ডানদিকে হেলে পড়ে যেতে নেয়,
তখনই গেইট দিয়ে প্রবেশ করে সেই ব্যস্ত পায়ে সারা রাস্তা দৌড়ে আসা ছেলেটি। র’ক্তে মাখামাখি জেডিকে পড়ে যেতে দেখে ছেলেটি দৌড়ে জেডির দিকে আসতে আসতে শব্দ করে ডেকে ওঠে,
“জেডি????”
জেডি পড়ে যাওয়ার আগেই ছেলেটি দৌড়ে এসে জেডির ডান পাশে বসে, হেলে পড়া জেডি ঠাস করে তার কোলের উপর পড়ে। ডান হাত আকাশের কোলের উপর এসে পড়ে। আকাশ স্ত’ব্ধ হয়ে বসে আছে। দু’হাত অ’স্বাভাবিকভাবে কাঁ’প’ছে। কাঁ’প’ছে শরীর।
জেডির মাথা কোলে রাখা ছেলেটি জেডির ঘাড়ের কাছে ডান হাতের দু’আঙুল দিয়ে চেক করলে বুঝল, জেডির মাঝে আর প্রাণ নেই। চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইল নিথর হয়ে পড়ে থাকা জেডির মুখপানে। এরপর দৃষ্টি উঠিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“ওকে কেন মা’র’লে আকাশ? তুমি তোমার বন্ধুকে চিনতে পারলে না? তুমি জানতে না, জেডি মানুষটা খারাপ হলেও অন্তত এতোটা স্বা’র্থ’প’র নয়। যতটা ও নিজেকে এইকয়দিন দেখিয়েছে।”
কিছুক্ষণ আগে পরিচিত কণ্ঠ কানে আসলেও আকাশ, সন্ধ্যা জেডির দিকে মন দেয়ায় এদিকে মন দিতে পারেনি। কিন্তু এবার দু’জনেই ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে, বি’ধ্ব’স্ত নিয়াজকে দেখে একেবারে স্ত’ব্ধ হয়ে যায়। দু’জনের মুখে কোনো কথা নেই। যাকে এতোদিন মৃ’ত জেনে এসেছে, যার মৃ’ত লা’শ পর্যন্ত দেখেছে, যার জানাজা পরিয়ে মাটি পর্যন্ত দিয়েছে, তাকে হুট করে একেবারে জীবন্ত অবস্থায় দেখে ঠিক কেমন রিয়েকশন দিবে সন্ধ্যা আকাশ কেউই বুঝতে পারেনা। শুধু নির্বাক চোখে নিয়াজের দিকে চেয়ে রইল।
নিয়াজ ঢোক গিলে বলে,
“জেডি ভীষণ চতুর। ও যা কিছু করে, সেসব কেউ কল্পনাই করতে পারেনা। তুমি, আমি কেউ-ই না।”
এটুকু বলে নিয়াজ থামে। পকেট থেকে পেনড্রাইভ বের করে জেডির একজন গার্ডের দিকে বাড়িয়ে দিলে সে এগিয়ে এসে পেনড্রাইভটি নেয়। সে বোধয় বুঝেছে তাকে কি করতে হবে। না বোঝার কথা তো নয়। তাদের বস তাদের সব বুঝিয়ে দিয়েছিল। যে মানুষটা এখন মৃ’ত্যু’শ’য্যা’য় তাকে এখনো বস মেনে সব কাজ সুন্দরভাবে করছে। হয়তো ওই নি’ষ্ঠু’র মানুষের প্রতি কোথাও একটা টান রয়ে গেছে। কম সময় তো হয়নি, তারা জেডির হয়ে কাজ করছে।
লোকটি সামনে দেয়ালে একটি বড় পর্দায় পেনড্রাইভ লাগিয়ে প্রথম ভিডিও অন করে দেয়। পর্দায় ভেসে ওঠে আলোকিত একটি ঘর।
ঘরের মাঝ বরাবর একটি চেয়ারে শ’ক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা নিয়াজ। যার জ্ঞান নেই। দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে হয় অজ্ঞান নয়তো বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। জেডি নিয়াজকে ঘিরে চারিদিকে ঘুরছে আর একটু পর পর হাতঘড়িতে টাইম দেখছে। আবার নিয়াজকে দেখছে। এক পর্যায়ে অধৈর্য হয়ে টেবিলের উপর থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে নিয়াজের মুখে ছিটিয়ে দেয়। নিয়াজের চোখের পাতা নড়ে ওঠে। অনেকটা সময় নিয়ে সে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। জেডি নিয়াজকে চোখ মেলতে দেখে সে ডান পা দিয়ে একটি চেয়ার টেনে এনে নিয়াজের সম্মুখ বরাবর রাখে। চেয়ারের উল্টোদিক থেকে দু’পাশে পা দিয়ে বসে দু’হাত চেয়ারের উপর রেখে কৌতুকস্বরে বলে,
“মাই ডেয়ার ডক্টর নিয়াজ, ঘুম ভাঙলো তোমার? ডক্টর এতো উইক হয়ে পেসেন্ট বাঁচাও কিভাবে? হাউ ডক্টর হাউ?”
নিয়াজের কপালে ভাঁজ পড়ে। চারিদিকটা আলোকিত হলেও সে তখনো অন্ধকার দেখছিল। যা ধীরে ধীরে কে’টে যায়। দৃশ্যমান হয় হাস্যজ্জ্বল জেডি। নিয়াজ বুঝতে পারেনা সে এখানে কিভাবে। তার যতদূর মনে আছে, তাকে কে যেন পেটে অনেকগুলো চা’কু মে’রেছিল। তারপর সে পরে গেল। অনেক ক’ষ্ট করে আকাশের সাথে কিছু কথা বলছিল। তারপর যে হলো, আর তো মনে নেই।
জেডি নিয়াজের সামনে তার ডান হাত এগিয়ে নিয়ে দু’আঙুলের সাহায্যে একটি চুটকি বাজিয়ে বলে,
“ও হ্যালো ডক্টর!”
নিয়াজ তার ঝাপসা ঝাপসা লাল চোখজোড়া টেনে জেডির দিকে ফেলে। অস্ফুটস্বরে আওড়ায়, “জেডি?
একবার শ্বাস নিয়ে বলে,
আমি তো মনে হয় ম’রে গিয়েছিলাম।”
নিয়াজের কথা শুনে জেডি শব্দ করে হেসে দেয়। নিজেকে সামলে বলে,
“ম’রেই তো গেছো। এই যে তুমি আর আমি স্বর্গে বসে আছি। কি লাগবে তোমার? সিগারেট নাকি অ্যালকোহল?”
নিয়াজ বুঝল জেডি তার সাথে মজা করছে। সে একটু নড়েচড়ে বসতে চাইলো, কিন্তু পারলো না। শরীরে যেমন ব্য’থা পেল তেমনি নিজেকে বাঁধা মনে হয়ে কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়ল। জেডি দ্রুত চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে চেয়ারটি ঘুরিয়ে একদম নিয়াজের কাছাকাছি এসে বসে। ব্যস্ত হাতে নিয়াজের বডিতে ব্যান্ডেজের উপরটা চেক করে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
“নড়াচড়া কম কর। ব্লা’ড আসছে!”
নিয়াজ জেডির কথা না মেনে মোচড়ামুচড়ি করে। বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“আমাকে বেঁধে রেখেছ কেন?”
জেডি পাশের টেবিল থেকে একটু ব্যান্ডেজ নিয়ে সেখানটায় পেঁচিয়ে দেয়, যেখানটায় চাপ লেগে ব্যান্ডেজ লাল হয়ে গেছে। কাজটি করে জেডি নিয়াজের দিকে চেয়ে হেসে বলে, “কারণ তুমি ম’রে গেছ।”
নিয়াজ ভ্রু কুঁচকে বলে,
“মানে? কোথায় আমি ম’রে গেছি? আমি তো বেঁচে আছি।”
জেডি ডান হাত বাড়িয়ে বাচ্চাদের মতো করে নিয়াজের গাল টেনে হেসে বলে, “সেটা তো আমি আর তুমি জানি। বাকি সবাই জানে তুমি মৃ’ত! এতোক্ষণে বোধয় তোমার জানাজাটুকুও পড়া শেষ হয়ে গেছে। আর ক’ব’র দেওয়াও।”
নিয়াজ বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“মানে কি? কিসব পা’গ’লের প্রলাপ বকছ?”
জেডি পকেট থেকে ফোন বের করে একটি পিক দেখায়, যেখানে দেখা যাচ্ছে একটি খাঁটিয়ায় সে শুয়ে আছে। সে হতভম্ব কণ্ঠে বলে, “আরে ওটা কে? আমার মতো দেখতে কেন ও?”
জেডি ফোন পকেটে রেখে পা দিয়ে ঠেলে চেয়ারটি সামান্য পিছিয়ে নেয়। ডান পা বা পায়ের উপর রেখে, ডান পা নাড়াতে নাড়াতে হেসে বলে,
“আমার বাবার মাথায় মারাত্মক কূ’ট’নৈতিক বুদ্ধি ছিল। ওখান থেকেই একটু ধার টার নিয়ে জীবন চলে আমার। বুঝলে ডক্টর? মনে পড়ে সৌম্য আর আকাশের বাবার সেই ফেইক ভিডিও?”
নিয়াজের মাথায় আসলো, সৌম্য আর আকাশের বাবাকে নিয়ে তারা একটি ভিডিও দেখেছিল, যেখানে সৌম্য আকাশের বাবাকে মে’রে ফেলছে। অথচ ভিডিওটি ফেইক ছিল। নিয়াজ আন্দাজ করেছিল, লোকগুলোর মুখে মাস্ক পরা ছিল। তাহলে কি জেডি ফোনে যাকে দেখালো, তার মুখেও তার মাস্ক পরানো হয়েছে এমন কিছু? কিন্তু এসবের সাথে জেডির কানেকশন কি? নিয়াজ বুঝতে পারে না। সে প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায় জেডির দিকে। জেডি বাঁকা হেসে বলে,
“যা ভাবছো তাই। তবে আমার সাথে এসবের কানেকশন টা আমি ক্লিয়ার করছি, ওয়েট।
এটুকু বলে জেডি ভালোভাবে গলা ঝেড়ে নিয়ে বলে,
“কানেকশন টা হলো, সন্ধ্যা আমার প্রাণ।”
নিয়াজ আগের চেয়েও কয়েকশ গুণ বেশি বিস্ময় নিয়ে তাকালো জেডির দিকে। জেডির যে মনের মানুষ ছিল এটা জেডিকে একদিন হলেও যে চেনে সে-ও জেনে যেত। কারণ জেডি সবসময়ই এটা নিয়ে হা-হুতাশ করত। সেখান থেকে নিয়াজও অনেক কিছুই জেনেছে। জেডি নিজেই ঢোল পিটিয়ে বলত। নিয়াজের অবশ্য জেডির এই দিক খারাপ নয় বরং ভালোই লাগতো। তার মনে হতো, ছেলেটা উচ্ছৃঙ্খল হলেও খুব সুন্দর করে ভালোবাসতে জানে। আর আকাশের সাথে একটি দৃঢ় বন্ধন, এসব মিলিয়ে নিয়াজের কাছে আকাশ আর জেডিকে বেশ ভালোই লাগতো। নিয়াজের তেমন কোনো বন্ধু কখনোই ছিল না। আকাশ, জেডি, অরুণ এদের সাথেই টুকটাক কথা হত। আর নিয়াজের স্বভাব থেকে সে সবসময় যেটুকু পারতো সবাকেই হেল্প করত। আকাশ আর জেডির ফ্রেন্ডশিপ ভেঙে যাওয়ার পর নিয়াজ খুব দুঃখ পেয়েছিল। ওই যে, চোখের সামনে একটি সুন্দর সম্পর্ক ঠাস করে ভেঙে গেলে যেমন খারাপ লাগে আর কি! তবুও আকাশ আর জেডির মাঝে কিছু ছিল। যেখানে ওদের সম্পর্ক ভেঙে গেলেও কখনো এদের মাঝে শ’ত্রুর মতো সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে নিয়াজ কখনো এটা কল্পনাও করতে পারেনি। আর আজ এটা কি শুনলো? জেডির পছন্দের মেয়ে সন্ধ্যা? আর সন্ধ্যার জন্যই তার মানে জেডি এতোকিছু করেছে? একেএকে অনেক হিসাব নিমিষেই মিলে গেল। নিয়াজ থেমে থেমে আওড়ায়,
“তার মানে এসবের পিছনে…..
মাঝ থেকে জেডি একটি জোরে তালি দিয়ে বলে ওঠে,
“কারেক্ট আছো তুমি। এসবের পিছনে আমিই ছিলাম। কিন্তু তুমি আমার খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছ। এভিকে তুমি স্মৃতি ফেরার মেডিসিন দিয়েছিলে কেন ডক্টর নিয়াজ?”
নিয়াজ কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সে বিশ্বাস করতে পারছে না জেডি আকাশের সাথে এমনটা করেছে। বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“আকাশ না তোমার বন্ধু! তুমি ওর সাথে এমনটা কিভাবে করতে পারো? তুমি কি মি’থ্যে বলছ জেডি?”
নিয়াজের কথা শুনে জেডি কিছু সময়ের জন্য একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল। মলিন গলায় জিজ্ঞেস করে,
“বিশ্বাস করতে পারছ না কেন?”
নিয়াজ উত্তরে বলে,
“কারণ প্রকৃত বন্ধুরা কখনো এমন করতে পারে না।”
মুহূর্তেই জেডির দৃষ্টিজুড়ে অসহায়ত্ব ঘিরে ধরে। কেমন যেন হাসফাস কণ্ঠে বলে,
“আমি তো সত্যিই এসব করেছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি এভিকে বন্ধু ভাবি। মানে ওকে একটুও পর ভাবিনা আমি, জানো? কিন্তু ও আমাকে শুধু বে’ঈ’মা’ন ভেবে অনেক মা’র’লো।”
বলতে বলতে ব্যস্ত দু’হাতে শার্টের বোতামগুলো খুলে শার্ট ছুঁড়ে ফেলল শরীর থেকে। পাতলা কাপড়ের আড়ালে এতোক্ষণ ঢেকে থাকা ক্ষ’ত-বি’ক্ষ’ত শরীরটা দৃশ্যমান হয়। জেডি বাচ্চাদের মতো করে হাত দিয়ে তার পুরো শরীর দোখায় আর বলে,
“দেখ কত মা’র খেয়েছি আমি। এগুলো সব এভির মা’র জানো? এর আগে ও কখনো এভাবে মা’রেনি আমাকে। আদর-ই বেশি করেছে। ওই যে বড় ভাইয়েরা ছোট ভাইকে যেভাবে আদর করে, রা’গ হলে একটু-আধটু শাসন করে, অভিমান হলে দু’চারটে থা’প্প’ড় মা’রে। যেসবে আদর ভালোবাসা মিশে থাকে। এভি আমাকে এসবই করত। কিন্তু আজ এভাবে মা’র’লো। শরীরে খুব অল্প-ই ব্য’থা পেয়েছি আমি। কিন্তু মনে ভীষণ ব্য’থা পেয়েছি। কারণ এভি’র চোখে আমার জন্য অসীম ঘৃ’ণা ছিল। আর আমাকে ভালোবাসার জন্য ছিল আফসোস।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে জেডির চোখের কোণ ভিজে ওঠে। জেডির পুরো ক্ষ’ত বডি দেখে নিয়াজের শরীর শিউরে ওঠে। তাজা র’ক্ত কিছু এখনো রয়ে গেছে, আবার কিছু শুকানোর পথে। দেখতে ভ’য়া’ন’ক লাগছে। নিয়াজ অসহায় চোখে তাকালো জেডির দিকে। আকাশ জেডিকে মে’রে’ছে? তাও এভাবে? যদি এসবের পিছনে সত্যিই জেডি থেকে থাকে, সত্যিই জেডি আকাশের এ’ক্সি’ডে’ন্ট করিয়ে থাকে, যদি ইরার মুখে এ’সি’ড ছুঁড়ে মেয়েটাকে মে’রে ফেলতে চায়, সৌম্য’র জীবন থেকে একটার পর একটা সুখ কে’ড়ে নেয়, সন্ধ্যা আর আকাশের জীবনটা এভাবে ব’র’বা’দ করে দিতে চায়, তবে জেডির শা’স্তি কি খুব বেশি হয়ে গেছে? নিয়াজের মন বলে উঠল, কখনো না। যদি জেডি সত্যিই এতোকিছু করে থাকে, তবে জেডির শা’স্তি তো শুরুই হয়নি। কিন্তু এসব কিভাবে সম্ভব? নিয়াজের একটুও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না।
জেডি আর এভি এই দু’টো নাম ঢাকা ভার্সিটিতে সবচেয়ে বেশি জ্বলজ্বল করত শুধুমাত্র ওদের বন্ধুত্বের দৃঢ়তার কারণে। ওরা একে অপরের জন্য কি না করেছে! এসব ঘটনা বলে শেষ করা যাবে না।
জেডি কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল ছিল বলে, সিনিয়র হয়েও জেডিকে কেউ কিছু বললে জেডির বন্ধু এভি জুনিয়র হয়ে সবার সামনে তাদের কিছু বলতে না পারলেও রাতের অন্ধকারে আড়াল থেকে ওদের মে’রে হসপিটালে পাঠিয়ে দিত। মাঝে মাঝে রাতে জেডিকে না পেলে আকাশ কোথায় না কোথায় খুঁজত। তখন আকাশ নিয়াজকে নিজের শ’ত্রু ভাবতো। তবুও বন্ধুর খোঁজে শ’ত্রুর নিকট ছুটে আসতো আকাশ। সব ভুলে যেত তখন। কি যে বি’ধ্ব’স্ত দেখাতো আকাশকে। একদিন নিয়াজ মজা করে বলেছিল,
‘তোমার রিয়েকশন দেখে মনে হচ্ছে পাঁচ বছরের বাচ্চা হা’রি’য়ে গেছে।’
আকাশ রে’গে তার কলার ধরে বলেছিল,
‘ও এখনো ঠিকঠাক ড্রাইভ করতে পারেনা বুঝেছ? যা হোক, তুমি কি করে আমার ফিলিংস বুঝবে? তোমার তো বন্ধু-ই নেই।’
নিয়াজ হেসে বলেছিল,
‘ভাগ্যিস আমার বন্ধু নেই। নয়তো তোমার মতো আধপা’গ’ল হয়ে ঘুরে বেড়াতে হতো। একটা মেয়ের জন্য তোমার রিয়েকশন এমন হলেও মানা যেত। তাছাড়া জেডি যথেষ্ট বড় বুঝলে? যদি আহামারি কিছু হয়-ও, সর্বোচ্চ হাত-পা-ই ভা’ঙ’বে। চাপ নিও না।’
আকাশ রা’গা’ন্বিত স্বরে বলেছিল,
‘তুমি চাইছো ওর হাত-পা ভা’ঙু’ক? ওর কিছু হলে আগে তোমার মুখ ভেঙে দিব। বে’য়া’দ’ব কোথাকার।’
বেচারা নিয়াজ মুখ চেপে ধরে রেখেছিল। সে আকাশের সাথে বেশি কথা আগাতো না। নয়তো আকাশের হাত উঠে যেত। সে খবর তার কাছে ছিল।
আর জেডি? সে তো তার বন্ধু এভির জন্য কলিজা হাতে নিয়ে বসে থাকতো। যেন কখন তার এভিজানের জন্য কলিজা লাগবে, আর সে কে’টে দিয়ে দিবে।
অরুণ,, জেডি আর এভির এতো সখ্যতা সহ্য করতে পারতো না। আসলে বন্ধুত্বের খাতায় অরুণ আকাশের জীবনে আগে ছিল। এরপর হঠাৎ একদিন জেডি আসে। আর তারপর ধীরে ধীরে জেডি আর এভির মাঝে অনেক গাঢ় বন্ধুত্ব তৈরী হয়। সেই থেকেই জেডি অরুণের পছন্দের ছিল না। এমন নয় অরুণ জেডিকে ভালোবাসতো না। তবে জেডিকে টুকটাক ক’ষ্ট দেয়া, হয়রানি করা এসব সে হিং’সা থেকেই করত। নিয়াজের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। নিয়াজ তখন মেডিকেলে স্টুডেন্ট। সে মেডিকেলেই ছিল। কোথা থেকে জেডি দৌড়াতে দৌড়াতে মেডিকেলে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
“নিয়াজ, এভিজানের নাকি দু’টো কি’ড’নি-ই ড্যা’মে’জ হয়ে গেছে? আমাকে তোমার একটা পরিচিত ডক্টরের কাছে নিয়ে চলো। আর তাকে বলো আমি এভিজানকে আমার দু’টো কি’ড’নি দিয়ে দিতে চাই। আর অপারেশনটাও যেন দ্রুত করা হয়।”
নিয়াজের কপালে ভাঁজ পড়ে। সেদিন আকাশ হসপিটালে এসেছিল। কিন্তু অন্য একটি কাজে। আকাশ তো অসুস্থ-ই নয়, তবে জেডি এসব কি বলছে? নিয়াজ জেডিকে জিজ্ঞেস করে, এই কথা তাকে কে বলেছে। জেডি উত্তরে বলে, অরুণ বলেছে। অরুণের নাম শুনতেই নিয়াজ বুঝে যায় অরুণ জেডিকে হয়রানি করতে এমন করেছে। তবে নিয়াজ জেডির সাথে একটু মজা করতে বলে,
“আকাশের আসলেই দু’টো কি’ড’নি ড্যা’মে’জ হয়ে গেছে। আমি শুনেছি। কিন্তু তোমার দু’টো কি’ড’নি আকাশকে দিয়ে দিলে তুমি তো বাঁচবে না।”
জেডি নিয়াজকে টেনে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে হেসে বলে,
“আরে বাঁচবো বাঁচবো। দু-চার মাস বাঁচবো। সে কয়মাস এভিজানের সাথে আরেকটু বেশি বেশি আড্ডা দিব। ২৪ ঘণ্টাই একসাথে থাকবো। তারপর ঠুস করে ম’রে গেলে খেল খতম।”
নিয়াজ অবাক হয়ে বলে,
“তোমার জীবনের মায়া নেই?”
জেডির সহজ উত্তর,
“আছে তো। তবে এভিজানের জীবনের চেয়ে একটু কম।”
“তোমার যে একটা পছন্দের মেয়ে আছে শুনেছিলাম। ওকে খুঁজে বের করে বিয়ে করবে না?”
এ পর্যায়ে জেডি কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দেয়, “আমার প্রাণকে আমি আল্লাহ্’র কাছে এতোবেশি চেয়েছি যে, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই এতোদিনে ওকে আমার নামে লিখে দিয়েছে। আর ওকে আমার নামে লেখা হয়েছে মানে, অন্যকেউ আর ওকে পাবে না। আমি এখন ম’রে গেলেও ওপারে গিয়ে ঠিকই আমার প্রাণকে পেয়ে যাবো। আমাদের মিলনের সময়টা হয়ত আরও দীর্ঘ হবে। তবে আমার এভিজানের জন্য এটুকু সেক্রিফাইস আমি করতেই পারি। এটা কোনো ব্যাপার নয়।”
সেদিন নিয়াজ অবাক হয়ে কেবল জেডিকে দেখেছিল। অন্তর থেকে একটি কথা আপনা-আপনি বেরিয়েছিল, “তোমার বন্ধুত্বে কখনো কারো নজর না লাগুক।”
সেই পুরোনো দিনের কথা ভেবে নিয়াজের দ’ম’ব’ন্ধ লাগলো। তার চোখে দেখা সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক ছিল এভি, জেডি নামে দু’জন বন্ধুর জুটি। প্রথমবার যখন জেডি, এভি আলাদা হয় তখনও নিয়াজের বিশ্বাস ছিল, ওদের মাঝে ঠিকই একদিন সব ঝামেলা মিটে যাবে। কিন্তু আজ এসব কি দেখছে? যেই জেডি তার এভিজানের জন্য নিজের ক’লি’জা কে’টে দিতে পারতো সেই জেডি এভিকে এতো ক’ষ্ট দিয়েছে? এতোটা? আর যেই এভি তার বন্ধু জেডির গায়ে আঁচ লাগতে দিত না, কেউ সামান্য কটু কথা বললে পি’টি’য়ে আসতো, সেই এভি তার প্রিয় বন্ধুকে কু’কু’রের মতো মে’রে’ছে? এ কি হাল হয়েছে তার দেখা সবচেয়ে সুন্দর বন্ধুত্বের সেই জুটি’র!
আর জেডি যে বলেছিল, সে আল্লাহ্’র কাছে তার প্রাণকে এতো বেশি চেয়েছে যে, মেয়েটিকে না-কি আল্লাহ্ জেডির নামেই লিখেছে। কিন্তু কই? আল্লাহ্ তো মেয়েটিকে জেডির নামে লেখেনি। লিখেছে জেডির সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন বন্ধু এভির নামে। আল্লাহ্ কেন এমনটা করল? প্রশ্নটা নিয়াজের মনে আসতেই কেমন যেন ছটফট লাগলো।
এদিকে নিয়াজকে এতক্ষণ ধ্যান করতে দেখে জেডি নিয়াজের মুখের সামনে একটি চুটকি বাজায়। নিয়াজ ঝাঁকি দিয়ে উঠে জেডির দিকেতাকায় । জেডি মৃদু হেসে বলে,
“কি ভাবছো? আল্লাহ্ আমার প্রাণকে আমার নামে না লিখে আমার বন্ধুর নামে কেন লিখল, এটা?
নিয়াজ ঢোক গিলল। জেডি আবারো বলে,
তোমার মনে আছে নিয়াজ? একদিন আমি তোমাকে অতি বিশ্বাসের সাথে বলেছিলাম যে, আল্লাহ্ আমার প্রাণকে আমার নামে লিখে দিয়েছে। কারণ আমি আল্লাহ্’র কাছে ওকে অনেক চেয়েছি। অথচ আমার ধারণা ঠিক কতটা ভুল ছিল একবার ভাবো! আল্লাহ আমার প্রাণকে আমার নামে লিখলো তো না-ই। উল্টে আমাকে বড়সড় সারপ্রাইজ দিতে তাকে আমার-ই প্রিয় বন্ধুর নামে লিখে রেখেছিল। আসলে আল্লাহ্ আমাকে এরকম সারপ্রাইজ দিতে বরাবরই খুব ভালোবাসে।
বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে মাকে দেখেনি। কারণ মা, আমার জন্মের সময়ই মা’রা যায়। একটু বড় হওয়ার পর, অন্যদের মা দেখে আমারও একটা মায়ের লো’ভ হত। ইচ্ছেটা বাবাকে জানানোর আগেই বাবা আমার জন্য একটা নতুন মা এনেছিল। নতুন মা পেয়ে আমি ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার আমিও সবার মতো মায়ের আদর খাবো। কিন্তু আল্লাহ্ আমাকে সেদিন-ও বড়সড় একটা সারপ্রাইজ দিয়ে দিল। সেই নতুন মা আসার পরেরদিন-ই আমাকে এতো মা’র মা’র’লো যে আমাকে হসপিটালে ভর্তি হতে হলো। এরপর আল্লাহ্ আমাকে আরও বড় সারপ্রাইজ দিয়েছিল। সেটা হলো, আমার বাবার বদলে যাওয়া। আমার প্রতি বাবার সব ভালোবাসা ফানুসের মতো অজানায় হারিয়ে যাওয়া। আর তারপর তো জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ আমার প্রাণকে নিজের প্রিয় বন্ধুর বউ প্লাস বাচ্চা মা রূপে দেখা। আসলে আমার জীবনটাই এমন,, সারপ্রাইজের ওপর চলে আর কি! পার্থক্য শুধু, মানুষের সারপ্রাইজ হয় সুখময় আর আমার সারপ্রাইজগুলো হয় দুঃখময়।”
কথাগুলো বলতে বলতে কখন যে জেডির চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে, সে বুঝলোই না। নিয়াজ মলিন মুখে জেডির দিকে চেয়ে রইল। সে জেডির ব্যাপারে টুকটাক জানে, তাই এসব শুনে অবাক না হলেও, জেডির কথায় নিয়াজ খুব দুঃখ পেল জেডির জন্য। ছেলেটার কণ্ঠে কত অসহায়ত্ব, কত বেদনা মিশে!
জেডি এদিক-ওদিক তাকিয়ে ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া স্বাভাবিক করে নেয়। মুহূর্তেই মুখাবয়ব থেকে সকল দুঃখের ছাপ আড়ালে চেপে রাখে। সবসময়ের মতো হাস্যজ্জ্বল মুখে প্রশ্ন করে,
“তোমাকে কে বাঁচিয়েছে, জানো?”
নিয়াজ হঠাৎ জেডির মুড চেঞ্জ দেখে অবাক হলো না। জেডি যে এমনই, এ কথা তারা সবাই জানে। সে ছোট্ট করে বলে, “তুমি।”
জেডি আবারো হেসে বলে,
“এবার বলো, তোমাকে কে মে’রে’ছে?”
নিয়াজ চুপ থাকলো। তাকে একটি হুডি পরা লোক ছু’রি মে’রেছিল। যার চোখের মণি ছিল সাদা। একদম আকাশের বলা বর্ণনার মতো। অর্থাৎ আকাশের সেই গোপন শ’ত্রু। নিয়াজের মস্তিষ্ক সজাগ হয়। সেই গোপন শ’ত্রু তো আর কেউ নয়, স্বয়ং জেডি। নিয়াজ সাথে সাথে জেডির সাদা চোখের মণির দিকে তাকায়। সে আগে থেকেই জানত, জেডির চোখের মণি সাদা, কিন্তু এখন এটা দেখে কেন যেন ভীষণ অবাক লাগলো। ঢোক গিলে বলে,
“তার মানে তুমি আমাকে…….
জেডি নিয়াজকে কথা শেষ করতে দেয় না। বলে,
“হুম হুম, আমিই তোমাকে ছু’রি মে’রে’ছিলাম মাই ডিয়ার ডক্টর নিয়াজ!”
নিয়াজ স্তব্ধ চোখে তাকায়। জেডি তাকে মা’র’তে চেয়েছিল? মা’র’তে না চাইলে তো তার পেটে ওভাবে ছু’রি চালাতো না। তাহলে তাকে কে বাঁচালো? আর জেডি কি তাকে মা’রা’র জন্য আবারও এখানে বেঁধে রেখেছে? নিয়াজ ঢোক গিলল। জেডি বোধয় নিয়াজের মনের ভাব বুঝল। সে বাঁকা হেসে বলে,
“আমি তোমার পেটে ছু’রি মে’রে’ছি। আমিই তোমাকে বাঁচিয়েছি। আমি না চাইলে তোমাকে বাঁচানোর দুঃসাহস কারো ছিল না।”
নিয়াজ অবাক হয় জেডির কথায়। জেডির কথার মানে বুঝতে পারে না সে। জিজ্ঞেস করে, “আমাকে মে’রে ফেলতে গিয়েও কেন বাঁচালে?”
জেডি চেয়ারে হেলান দিয়ে দু’হাত উপরদিকে উঠিয়ে ঘাড়ের কাছে রেখে বা পায়ের উপর রাখা ডান পা নাড়াতে নাড়াতে হেসে বলে, “মা’র’তে যায়নি তো। গেইম খেলতে গিয়েছি।
একটু থেমে জেডি সোজা হয়ে বসে। নিয়াজের মুখ বরাবর মুখ রেখে মলিন গলায় বলে,
আমি আমার আপন মানুষদের প্রাণ কে’ড়ে নিইনা। বরং তাদের প্রাণ ফিরিয়ে দিই। এটাই আমার নীতি।”
নিয়াজ অবাক হয়ে দেখে জেডিকে। বলে, “আমি তোমার আপন?”
জেডি শব্দ করে হেসে ওঠে। দু’সেকেন্ডের মাথায় জেডির মুখ থেকে হাসি একেবারে মিলিয়ে যায়। মলিন গলায় বলে,
“আমার নিজের বলতে কেউ নেই, বুঝলে নিয়াজ? যারা আমার জন্য দু’মিনিট ভাবে। আমি তাদের জন্য দু’শো বছর ভাবতে চাই। শুধু হায়াতের অভাবে হয়ে ওঠেনা।”
কথাটা বলে জেডি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। কয়েকপা এগিয়ে গিয়ে উল্টোদিকে ফিরে দাঁড়ায়। নিয়াজ মাথা উঁচু করে তাকায় জেডির দিকে। জেডি একই গলায় বলে,
“তুমি কেন এভির স্মৃতি ফিরিয়ে দিলে নিয়াজ? ওর স্মৃতি না ফিরলে ও আর আমার প্রাণকে মনে করতে পারতো না। ওকে আমি আরেকটি মেয়ের সঙ্গে জুড়ে দিতাম। একটা সময় এভি সেই মেয়ের সাথে খুব সুখী হত। আমিও আমার প্রাণকে ফিরে পেতাম। আমার আর এভিজানের বন্ধুত্ব-ও ঠিক হয়ে যেত। তোমার জন্য সব এলোমেলো হয়ে গেল।”
জেডির প্রথম কথাগুলো অতি নমনীয় শোনালেও শেষ লাইনটায় তীব্র ক্রো’ধ ঝরে পড়ে। সাথে উল্টো ঘুরে একটি চেয়ার বা হাতে তুলে নিয়াজকে মা’রা’র জন্য উঁচুতে উঠায়৷ সামান্য এগিয়ে নিয়েই জেডির হাত থেমে যায়। তার কি হলো কে জানে, মুহূর্তেই কিছুক্ষণ আগের জমা ক্রো’ধ সব কেমন নিভে গেল। নিয়াজের স্থির চোখে চোখ রেখে বলে,
“তুমি আমাকে ভ’য় পাচ্ছো না কেন নিয়াজ?”
নিয়াজ মৃদুস্বরে বলে,
“সত্যি বলতে জানিনা। তবে আমি তোমার আপন-দের তালিকায় কিভাবে যুক্ত হলাম। সেটা ভাবছি।”
নিয়াজের কথায় জেডি আরেকটু শান্ত হয়। ধীরে ধীরে হাতের চেয়ারটি মেঝেতে রাখে। এরপর চেয়ারে বসে দু’পা দু’দিকে ছড়িয়ে রাখে। দৃষ্টি নিয়াজের দিকে রেখে মলিন হেসে বলে,
“যাদের জীবনে আপন মানুষদের অভাব বেশি থাকে, তারা খুব সহজেই যে কাউকে নিজের আপন ভেবে নেয়। আমি তো তাদেরই একজন। তাছাড়া তুমি ভালো মানুষ। তোমার মতো মানুষেরা সবার মনে খুব সহজেই জায়গা করে নিতে পারে৷ আর আমার মতো মানুষেরা অতি ঘৃ’ণা’র পাত্র হয়ে মানুষের মন থেকে বিতারিত হয়ে যায়।”
নিয়াজ কি বলবে বুঝল না। তার অদ্ভুদ এক অনুভূতি হচ্ছে। সে এটা মেনেই নিতে পারছে না, যে মেয়েটার জন্য জেডি অদ্ভুদ অদ্ভুদ পা’গ’লা’মি করত, সেই মেয়েটি অন্যকেউ নয়, আকাশের বউ সন্ধ্যা। আকাশের মেয়েদের ব্যাপারে তেমন ইন্টারেস্ট না থাকলেও জেডির অনুভূতিকে সে সবসময় অনেক উপরে উঠিয়ে রাখতো। যে একসময় জেডির পছন্দের মেয়েকে খুঁজত জেডির সাথে বিয়ে দিবে বলে, আজ সেই মেয়েটি আকাশের নিজেরই বউ হয়ে বসে আছে। কিন্তু জেডি যা করেছে সেসব-ই বা কতটুকু যুক্তিগত?
জেডি অসহায় কণ্ঠে বলে,
“যখন জানলাম এভিজানের স্মৃতি ফিরেছে, তখন থেকে নিজেকে কু’পি’য়ে মে’রে ফেলতে ইচ্ছে করছে। তুমি তো জানো, আমি আমার প্রাণকে কত ভালোবাসি! আমি ওকে ছাড়া কীভাবে থাকি বল তো? তুমি এভিজানের স্মৃতি কেন ফিরিয়ে দিলে নিয়াজ?”
নিয়াজের মনে হলো তার গলায় কিছু বেঁধেছে। জেডিকে এতো অসহায়ভাবে কখনো তার দেখার সৌভাগ্য হয়নি। সে ঢোক গিলে থেমে থেমে বলে,
“আকাশ অনেক ক’ষ্ট পেত সন্ধ্যাকে মনে করতে না পেরে।”
পর পর জেডিও হাসফাস কণ্ঠে বলে ওঠে, “আমিও ক’ষ্ট পেয়েছিলাম। সবসময় ক’ষ্ট পাই। এখনও পাচ্ছি। কিন্তু আমার কথা কেউ ভাবেনা। একটা পোকাও ভাবেনা আমার কথা।
কথাটা বলতে গিয়ে জেডির হাসি পেল। সে স্বভাবসুলভ শব্দ করে কিছুটা হেসেও ফেললো। অতঃপর বলে,
কেউ আর আমার কথা ভাবেনা। তাই নিজের জন্য নিজেকেই একটু-আধটু ভাবতে হচ্ছে। আসলে আমি একটুও বুঝতে পারিনি এভিজান ওর স্মৃতি হারিয়েও আমার প্রাণের জন্য এতো ক’ষ্ট পেত। ও কখনো আমাকে বুঝতে দেয়নি। উপর থেকে ওকে একদমই স্বাভাবিক লাগতো। একটা সময় আমি সিওর ভেবেছিলাম, ও আমার প্রাণকে ভুলে গিয়েছে। এখন আমি ওর জীবন অন্যভাবে সাজিয়ে দিয়ে আমি আর আমার প্রাণের জীবন নতুনভাবে সাজাবো।”
নিয়াজ বিদ্রূপ কণ্ঠে বলে,
“ভালোবাসা হয় হৃদয় দিয়ে। আর স্মৃতি চলে যায় মস্তিষ্ক থেকে। দু’টো সম্পূর্ণ আলাদা। সামান্য স্মৃতি ন’ষ্ট হওয়ার কারণে কেউ কখনো তার ভালোবাসাকে ভুলতে পারেনা। আকাশের যদি কখনো স্মৃতি না-ও ফিরতো, তবুও ও আবারো অপরিচিত সন্ধ্যার কাছেই ফিরে আসতো।”
জেডি মলিন মুখে চেয়ে রইল নিয়াজের দিকে। উপর থেকে কি শান্ত হয়ে বসে আছে! অথচ ভেতরটা একেবারে ছিঁড়ে যাচ্ছে। ভাঙা গলায় বলে,
“তোমার বলা কথাগুলো আমি দেরিতে হলেও বুঝেছি নিয়াজ। ভালোবাসা অদ্ভুদ এক অমৃত। যার ক্ষমতা অসীম। ভালোবাসা একজন মানুষের মৃ’ত মনকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখে। আবার এই ভালোবাসা-ই কাউকে বি’ভ’ৎ’সভাবে ধ্বং’স করে দিতে পারে। এই যেমন আমার সন্ধ্যাপ্রাণের ভালোবাসা পেয়ে এভিজান আবারো নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে। আর আমি অধীর হব ধ্বং’স।”
কথাগুলো বলে জেডি ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে চোখের কোণে লেগে থাকা এক ফোঁটা নোনাজল ছিটকে ফেলে। নিয়াজ জেডির কথার অর্থ বুঝল না। জেডি শেষ কথাটা দ্বারা কি বোঝালো? জেডি খুব দ্রুত নিজেকে সামলালো। নিয়াজের দিকে আগের ন্যায় হাস্যজ্জ্বল মুখে বলে,
“তুমি যখন এভির অপারেশনের জন্য সব বন্দোবস্ত করলে, তখনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম তোমরা আমি পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারলেও অনেককিছু জেনেছ। শেষ কয়েকদিন এভির কথার ধরনে বুঝে গিয়েছিলাম, ওর স্মৃতি ফিরেছে। এভির স্মৃতি ফিরেছে বোঝার পর নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছিল। সন্ধ্যাপ্রাণকে না পাওয়ার হার তো আমি তখনই মেনে নিয়েছিলাম, যখন জেনেছি এভিজানের স্মৃতি ফিরেছে। কিন্তু এভিজানের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছিলাম। ভাবছিলাম আমাকে ম’রে যেতে হবে। আড়াল থেকেই নিজে নিজে ম’রে যাবো? ব্যাপারটা আমার পছন্দ হলো না। কারণ আমি না থাকলে এভিজান সামান্য চেষ্টা করলেই বুঝে যাবে এতোদিন এসবের পিছনে আমি ছিলাম। আর তখন আমি ম’রে গেলে এভিজান আর সন্ধ্যাপ্রাণ আমাকে শুধু ঘৃ’ণা-ই করবে। আমি ওদের এতো ঘৃ’ণা নিয়ে ম’রতে চাইনি। ম’র’তে তো আমাকে হবেই। তবে এমনভাবে ম’রি যেন এভিজান আর সন্ধ্যাপ্রাণ আমাকে ভালো না বাসলেও, আমার মৃ’ত্যুর পর ওরা যেন আমার প্রতি সামান্য করুণা করে। আর তাই নতুন করে প্লান সাজালাম।
কথাগুলো বলে জেডি একটু থামলো। নিয়াজের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বলে,
“ভাবছো, এসব তোমায় কেন বলছি? আসলে এই মুহূর্তে আমার লাইফে কেউ নেই জানো? আমার ব্য’থা শোনার কেউ-ই নেই। উল্টে চারিদিকে শুধু আমাকে ব্য’থা দেয়ার মানুষ আর ঘৃ’ণা করার মানুষ দিয়ে ভরা। জানি তুমিও আমাকে ঘৃ’ণা করছ, তবুও আমার কয়েকটা কথা শুনবে? আমাকে আরও কয়েকটা বেলা বাঁচতে হবে। আমার ব্য’থা তোমাকে বলে এই কয়েকটা বেলা সামান্য স্বস্তি চাইছি।”
নিয়াজের বুকে চিনচিন করে উঠল। তার জেডির জন্য এতো দুঃখ লাগছে কেন? ছেলেটা এতো আবেগ মিশিয়ে কথা বলছে। এই ছেলেকে জীবনে সামান্য মন খারাপ করতে দেখেনি সে। আর আজ মনে হচ্ছে যেন সে কোনো ভিখারি। ভালোবাসা পাবার ভিখারি। নিয়াজ ঢোক গিলে বলে,
“শুনব।”
জেডি মাথাটা দু’দিকে নাড়াতে নাড়াতে হেসে বলে, “ওহ্ থ্যাক্স নিয়াজ! ইউ আর গ্রেট।
অতঃপর জেডি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
তুমি যখন এভিজানকে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে গিয়েছিলে, তখন আমি ওখানে গিয়ে তোমার পেটে ছু’রি চালাই। আসলে এই অপারেশনে রিক্স ছিল, এজন্য তোমার উপর একটু রা’গ হয়েছিল। তুমি চাইলে ওর অপারেশন বাংলাদেশে না করিয়ে বাইরে গিয়ে করিয়ে আনিয়ে পারতে। তবে সেজন্য তোমাকে আ’ঘা’ত করিনি। তোমাকে বি’ভ’ৎ’সভাবে আ’ঘা’ত করা আমার প্লানের অংশ ছিল। আমি চেয়েছিলাম আমি তোমার মতো ভালো মানুষের খু’নি হতে। যে সবসময় এভিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এমন একজন মানুষের খু’নি আমি। এটা এভি জানতে পারলে আমায় বাঁচিয়ে রাখবে না।
এটুকু বলে জেডি হাসলো। আবারো বলে,
আমি তোমার পেটে একটা বা দু’টো ছু’রি বসাতে পারতাম। বাট এভির কাছে তোমার মৃ’ত্যু নিশ্চিত করতে আমাকে অ’মানবিক হতে হয়েছে। আর তারপর আমি আমার ঠিক করে রাখা এক ডক্টরকে পাঠিয়ে তোমাকে মৃ’ত ঘোষণা করালাম। এরপর তোমাকে সেখান থেকে সরিয়ে সবার আড়ালে আমার লোক দিয়ে ট্রিটমেন্ট করার ব্যবস্থা করালাম। আর তোমার জায়গায় ম’র্গ থেকে একটি লা’শ এনে তাকে তোমার চোহারার মাস্ক পরিয়ে সবার কাছে তুমি হিসেবে চালিয়ে দিলাম।”
কথাগুলো শুনে নিয়াজ স্তব্ধ হয়ে যায়। জেডি নিয়াজের দিকে চেয়ে ডান হাতে তার চুলের ভাঁজে হাত চালায় আর ডান চোখ টিপ দিয়ে হেসে বলে,
“কেমন লাগলো স্টোরিটা? এসব করতে অনেক খাটুনি গিয়েছে আমার বুঝলে? এভিকে বিশ্বাস করাতে গিয়ে তোমার প্রতি অতিরিক্ত অ’মানবিক হয়ে তোমাকে বোধয় একটু বেশিই ক’ষ্ট দিয়ে ফেলেছি। বাট এর বিনিময়ে আমি তোমার জন্য একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ রেখেছি। চিন্তা কর না, তোমার সারপ্রাইজ আমার জীবনের সারপ্রাইজ এর মতো দুঃখময় হবে না। ওয়েট দেখাচ্ছি তোমাকে।”
কথাটা বলে জেডি চেয়ার থেকে উঠে ঘরের কোণার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি কাগজ বের করে এনে কাগজটি নিয়াজের সামনে ধরে। নিয়াজ কাগজটির দিকে তাকালে তার দৃষ্টিতে বিস্ময় ভর করে। তাকায় জেডির পানে। জেডি হেসে বলে,
“তোমার আর শিমুর রেজিস্ট্রি পেপার। তুমি আর শিমু লিগ্যালি হাসবেন্ড-ওয়াইফ। কাজটা করতে আমি বেশ প্যারা খেয়েছি। তোমার আর শিমুর সাইন ম্যানেজ করতে বেশি প্রবলেম হয়েছিল। বাট সাকসেস হয়েছি। এখান থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ধর্মীয়ভাবে শিমুকে বিয়ে করে নিও।”
নিয়াজ বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে আছে জেডির দিকে। কথা বলার ভাষা নেই তার। সে খুশি হবে নাকি দুঃখ পাবে বুঝতে পারছে না। জেডি হাতের কাগজটি পাশের টেবিলের উপর রেখে নিয়াজের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বলে,
“আমি জানি, তুমি শিমুকে কতটা ভালোবাসলো। বাট শিমু মেয়েটা বায়ানকে ভালোবাসে। ওদিকে বায়ান শিমুকে নয় তার মৃ’ত গার্লফ্রেন্ডকে ভালোবাসে। বায়ানের কথা বাদ দিলাম। কারণ ও শিমুকে কখনোই বিয়ে করবে না। ওকে দেখে আমি এটুকু বুঝেছি। আর শিমু মেয়েটা পা’গ’লা’মি বেশি করে। প্রবলেম নেই। তোমাদের বিয়ে যেহেতু হয়েছে, একটু সময় লাগলেও, দেখবে শিমু তোমাকে মেনে নিবে। তবে তোমাকে ভীষণ ধৈর্যশীল হতে হবে। ভালোবাসা নিজের করে পাবার জন্য অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। তোমার জন্য শুভকামনা!”
কথাটা বলে জেডি নিয়াজের বাঁধা হাতের ডান হাতের সঙ্গে হাত মেলালো। চোখেমুখে চকচকে হাসি। নিয়াজের চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। শিমু তার হবে, এটা সে গতকালকেও কল্পনা করতে পারেনি। আজ সেই অসম্ভব কাজটি জেডি কিভাবে সম্ভব করে তাকে সারপ্রাইজ দিয়ে দিল! সে ঢোক গিলে বলে,
“আমার জন্য এসব কেন করলে?”
জেডি তাকালো নিয়াজের দিকে। মৃদু হেসে বলে, “কারণ আমি জানি ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার দুঃখ কতখানি! আমার আপনজনদের লিস্টে যারা আছে, আমি তাদের সেই দুঃখের সাগর থেকে উদ্ধার করে তবেই এই দুনিয়া ছাড়বো বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।”
নিয়াজ ধরা গলায় বলে,
“আকাশের কাছে কেন আমার মিথ্যে খু’নি হয়েছ?”
জেডি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মলিন মুখে বলে, “জীবনের এ পর্যায়ে এসে খুব করে উপলব্ধি করলাম, পানির অভাবে একজন তৃষ্ণার্ত ব্য’ক্তিকে বাঁচাতে এক ফোঁটা পানির যতটা প্রয়োজন হয়, এর চেয়ে অধিক বেশি প্রয়োজন আমার মৃ’ত্যু। সাথে স্বল্প সময়ের জন্য প্রয়োজন, আমার জা’নো’য়া’র সত্তা আমার প্রিয়মানুষদের সামনে তুলে ধরা।”
নিয়াজের হঠাৎ বুকটা ভীষণ ফাঁকা লাগলো। চোখের কোণ দু’টো ভিজে উঠেছে। সে কিছু বলতে চাইলো। তার আগে জেডি আবারো হেসে বলে,
“শুধু তোমার মিথ্যে খু’নি হয়নি তো। মিসেস আসমানী নওয়ানের-ও মিথ্যে খু’নি হয়েছি।”
নিয়াজ ঢোক গিলল। সে এখনো জানে, আকাশের মা ব্যবসায়িক কাজে দেশের বাইরে গেছেন। কিন্তু জেডির কথা শুনে মনে হলো, জেডি আসমানী নওয়ানকেও তার মতো কোথাও আটকে রেখে সবাইকে মিথ্যে বলছে৷ নিয়াজ তার ভাবনা অনুযায়ী প্রশ্ন করে,
“আকাশের মাকেও আটকে রেখেছ?”
জেডি ঝাপসা চোখে তাকায় নিয়াজের দিকে। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে কাউকে মনে হলো খুঁজল। ব্যর্থ হয়ে শুকনো ঢোক গিলল দু’বার। কিছু বলতে চাইছে কিন্তু গলা বেঁধে আসছে। সময় নিয়ে জেডি নিজেকে সামলে ভাঙা গলায় বলে,
“গত কয়েকদিন আগে মিসেস আসমানী নওয়ান জেনে গিয়েছিল এসবের পিছনে আমি আছি। উনার সাথে আমার অনেক কথার কা’টা’কা’টি হয়। এক পর্যায়ে তিনি তার বাড়ি চলে যায়। আমি বুঝতে পারছিলাম না কি করব। এরপর আমি সন্ধ্যার আগে আগে তার বাড়ি গিয়ে মিসেস আসমানী নওয়ানকে উঠিয়ে আনি। আর সবাইকে জানাই সে ব্যবসায়িক কাজে দেশের বাইরে যাচ্ছেন। উদ্দেশ্য ছিল উনাকে আটকে রাখা। সত্যি বলতে আমি তখনো জানতাম না, আমি উনাকে কতদিন আটকে রাখবো। কিন্তু এটা জানতাম আমি উনাকে ততটা ক’ষ্ট দেব না, যতটা উনি ভেবেছিলেন। কারণ আমি উনার অ’পছন্দের তালিকার একজন হলেও উনি আমার খুব পছন্দের একজন ছিলেন।”
জেডির গলা বেঁধে আসে। নিয়াজ ঢোক গিলে বলে, “উনি কোথায় জেডি?”
জেডি সামান্য ঝুঁকে দু’হাত তার দু’হাঁটুর উপর রেখে চোখ বুজে নেয়। ডান চোখের কোণ ঘেঁষে একফোঁটা জল গড়ায়। সে থেমে থেমে বলে,
“উনি আর নেই। সেদিন-ই মা’রা গিয়েছেন।”
কথাটি শুনতেই নিয়াজ স্তব্ধ হয়ে যায়। আকাশের মা আর বেঁচে নেই, কথাটা তার ঠিক হজম হয় না। অদ্ভুদ এক ব্য’থা লাগে। মানুষটা তাকে খুব ভালোবাসতো। আকাশের বাবা মা’রা যাওয়ার পর থেকে আকাশের মায়ের সাথে তার খুব সুন্দর একটি মা ছেলের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আজ সেই মানুষটি আর নেই? নিয়াজ মেনে নিতে পারেনা। চোখের কোণ আরও খানিক ভিজে ওঠে৷ থেমে থেমে জিজ্ঞেস করে,
“উনাকে কে মে’রে’ছে?”
জেডি ডান হাতে চোখ ডলে নিয়াজের দিকে চেয়ে হেসে বলে,
“তোমার কি মনে হয়?”
নিয়াজ জেডির দিকে চেয়ে রইল। উত্তরে বলে, “জানি তুমি মা’রোনি।”
জেডি শব্দ করে হেসে ওঠে। বলে,
“কমন পড়েছে তোমার। ভেরি গুড স্টুডেন্ট। বোঝা যাচ্ছে, তুমি মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করেছ।”
কথাটা বলতে বলতে জেডির মুখ মলিন হয়। নিয়াজ কিছুই বলল না। সে জেডির দিকে চেয়ে আছে। জেডির চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনের দৃশ্য।
আসমানী নওয়ান হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চলন্ত গাড়ির পিছন সিটে ছটফট করছে। থেকে থেকে জেডির উদ্দেশ্যে ভীষণ রূঢ় বাণী ছুড়েছে,
“বে’য়া’দ’ব ছেলে। তোর কখনো ভালো হবে না। আমার আকাশ আর সন্ধ্যার জীবন ধ্বং’স করে তুই কখনো পার পাবি না। আল্লাহ্’র গ’জ’ব পড়বে তোর উপর। শ’য়’তা’ন ছেলে ছেড়ে দে আমায়।”
জেডি ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি চালাতে ব্যস্ত। আসমানী নওয়ানের কথা তার কানে যাচ্ছে কি-না! সে একেবারে নির্লিপ্ত। বেশ অনেকটা সময় গাড়ি চালিয়ে একটি বিলাসবহুল বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামায়। গাড়ি থেকে বেরিয়ে ব্যাক সিটের দরজা খুলে দিলে দু’জন মহিলা গার্ড গাড়ির ভেতর থেকে আসমানী নওয়ানকে বের করে দাঁড় করায়। জেডি নিচু হয়ে আসমানী নওয়ানের পায়ের বাঁধন খুলে দিলে আসমানী নওয়ান বা পায়ে জেডিকে লা’থি মা’রতে নেয়। জেডি দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে ডান হাত মাটিতে ঠেকিয়ে মাথা তুলে তাকায় আসমানী নওয়ানের দিকে। বিরক্ত হয়। কিছুটা রে’গে’ছেও। একটুর জন্য তার মুখে লা’থি লাগেনি। তবে সে খুব বেশি রিয়েক্ট করল না। বরং ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বলে,
“মিসেস আসমানী নওয়ান, আপনি মিছেমিছি এতো রা’গ করছেন। একবার তাকিয়ে দেখুন তো, আপনার জন্য আমি কত সুন্দর বাড়ির ব্যবস্থা করেছি। ভেতরে গেলে আরও অনেক রাজকীয় ব্যবস্থা দেখতে পাবেন৷”
আসমানী নওয়ানের দু’পাশে দু’জন দাঁড়িয়ে তাকে শ’ক্ত করে ধরে রেখেছে। ভদ্রমহিলা রা’গে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
“তোর রাজকীয় বাড়ি তুই থাক জা’নো’য়া’র ছেলে। তোর আসল চেহারা তো আমি সবাইকে দেখিয়েই ছাড়বো। আল্লাহ্ তোর বিচার করবে।”
জেডি ডান হাতের এক আঙুল কানে ঢুকিয়ে ঘোরায় আর ফোনে কি যেন করে। মেয়ে দু’জনকে আদেশ করে, আসমানী নওয়ানকে ভেতরে নিয়ে যেতে। জেডির আদেশে তারা আসমানী নওয়ানকে জোর করেই টানতে টানতে বাড়ির ভেতরদিকে নিয়ে যেতে থাকে। আসমানী নওয়ান দু’টো জোয়ান মেয়ের সাথে পারেনা। তার কান্না পায়। সে তার সন্ধ্যা মায়ের সাথে দু’টো কথা বলতে পারলো না। কি করবে এখন? ভাবনার মাঝেই হঠাৎ আসমানী নওয়ানের একদম বুকে এসে একটি গু’লি লাগে। ভদ্রমহিলা চমকে ওঠেন। চোখ দু’টো বড় বড় হয়ে যায়। এদিকে পাশের মেয়ে দু’টো ভ’য় পেয়ে যায়। তারা ঠিক করে বুঝতেই পারছে না কে গু’লি ছুঁড়লো, আর কোথা থেকে গু’লি আসলো। তবে গু’লিটি যে আসমানী নওয়ানকে লেগেছে এটা তারা বুঝতে পেরেছে৷
এদিকে আসমানী নওয়ান দাঁড়িয়ে থাকার শ’ক্তি হারায়। পুরো শরীর ছেড়ে দিলে মেয়েদু’টো সহ আসমানী মাটিতে পড়ে যায়। ভদ্রমহিলা একদম শুয়ে পড়েছে। আর মেয়ে দু’টো বসে পড়েছে।
এদিকে জেডি গু’লির শব্দ পেয়ে আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল এখানে এখন তার আদেশ ব্যতীত কে গু’লি চালালো। হঠাৎ আসমানী নওয়ানকে পড়ে যেতে দেখে জেডি বিস্মিত হয়। মস্তিষ্ক ধরতে পারে গু’লিটি আসমানী নওয়ানকে লেগেছে এজন্যই তার এই অবস্থা। জেডি একদৌড়ে আসমানী নওয়ানের কাছে চলে আসে। ততক্ষণে আসমানী নওয়ানের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জেডি আসমানী নওয়ানের পাশে বসে ভদ্রমহিলার হাত তার দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে কিছু বলতে চায় তার আগেই আসমানী নওয়ান ভাঙা গলায় বলে,
“তোর কোনোদিন ভালো হবে না৷ আমাকে মে’রে একদম ঠিক করলি না। আমি ম’র’লেও আমার জান্নাত তোকে শা’স্তি দিবে। তোর কোনো ক্ষমা নেই। আল্লাহ্ কোনোদিন তোকে ক্ষমা করবে না। ক্ষমা করবো না তোকে। শ’য়’তা’ন তুই।”
কথাগুলো জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলতে বলতেই একেবারে নিস্তেজ হয়ে যায় আসমানী নওয়ান। জেডি হাসফাস কণ্ঠে বলে,
“আরে কি বলছেন আপনি? আমি আপনাকে কেন মা’র’বো? মিসেস আসমানী নওয়ান? উঠুন?”
জেডির গলা ধরে আসে। সে তার দু’হাতে আসমানী নওয়ানের দু’হাত মালিশ করে আর বলে,
“আমি আপনার উপর গু’লি চালাইনি। আমি সত্যি বলছি। বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে আমার মায়ের মতো মনে করি। আপনি তো এভির মা। আমি এভির মাকে কেন আ’ঘা’ত করব বলুন? মিসেস আসমানী নওয়ান? আরে শুনুন না আমার কথা?”
বলতে বলতে জেডি আসমানী নওয়ানের দু’গালে থা’প্প’ড় দেয়। কিন্তু ভদ্রমহিলার কোনো সাড়া নেই। জেডি আসমানী নওয়ানকে ব্যস্ত হাতে কোলে তুলে নিয়ে বড় বড় পায়ে গাড়ির দিকে যায় আর বলে,
“গাড়ির দরজা খুলে দে। ফাস্ট।”
জেডির কথায় একজন দৌড়ে এসে গাড়ির ব্যাক সিটের দরজা খুলে দেয়৷ জেডি আসমানী নওয়ানকে গাড়ির ভেতর শুইয়ে দিতে নিলে জেডির পার্সোনাল ডক্টর এগিয়ে এসে আসমানী নওয়ানের হাত চেক করে বলে, “উনি তো মা’রা গিয়েছে জেডি।”
ডক্টরের কথায় জেডির গতি থেমে যায়। স্তব্ধ চোখে তাকায় ভদ্রলোকটির দিকে। ডক্টরের বলা কথাটা জেডির মস্তিষ্কে সূঁচের ন্যায় ফুটলো। অস্ফুটস্বরে আওড়ায়,
“মা’রা গেছে?”
লোকটি মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। জেডি ঘাড় ফিরিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে থাকা আসমানী নওয়ানের দিকে তাকায়। চোখের কোণ দু’টো ভিজে উঠেছে। ছেলেটার শরীর ভেঙে আসছে। এই তো কিছুক্ষণ আগে তাকে কত কটু কথা বলছিল মানুষটা। সে হঠাৎ একেবারে মা’রা গেল? এবার সে এভিকে কি জবাব দিবে? সে এভির মাকে এখানে এনেছে বলেই তো মানুষটা মা’রা গেল। জেডি আসমানী নওয়ানকে নিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ি ঘেঁষে বসে পড়ে। আসমানী নওয়ানকে রেখে দেয় মাটিতে। সে তো আসমানী নওয়ানকে এভাবে তুলে এনে রেখে দিলেও, সে তার এই বাড়িতে ভদ্রমহিলাকে খুব যত্নে রাখবে বলেই এনেছিল। কত ব্যবস্থা করে রেখেছে৷ এই যে ডক্টর। জেডির পার্সোনাল ডক্টর। জেডি উনাকে আসমানী নওয়ানের জন্যই এই বাড়িতে এনেছে। যেন ভদ্রমহিলার কোনো প্রবলেম হলে সাথে সাথে তার সমাধান হয়। আরও কতকিছুর ব্যবস্থা করেছে জেডি। কিন্তু সব কেমন নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। জেডি হঠাৎ-ই বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠল। মাথাটা আসমানী নওয়ানের কপালে ঠেকিয়ে ভাঙা গলায় বলতে লাগলো,
“মিসেস আসমানী নওয়ান? এভাবে চলে যাবেন না। আপনি তো জানেন, আমার মা নেই। বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে আমার মা মনে করি। আপনি আমাকে অ’পছন্দ করেন বলে আমাকে আর এভিকে আলাদা করেছিলেন, কিন্তু আমি আপনার ব্যাপারে এভিকে কিছুই বলিনি জানেন? আপনি দুঃখ পাবেন বলে। বিশ্বাস করুন, আমি আপনার বুকে গু’লি চালাইনি। আপনি আমাকে এভাবে অ’ভি’শা’প দিয়ে যাবেন না। আমার মায়ের মতো মানুষের থেকে এমন অ’ভি’শা’প বহন করতে পারবো না আমি। আমি আর আপনাদের সামনে মু’খো’শ পড়ে থাকবো না। আমি নিজের অ’প’রা’ধ স্বীকার করে নিব। আপনি প্লিজ উঠে পড়ুন।
আমি এভিকে কি জবাব দিব বলুন তো? আপনি কখনো আমার বাড়ি আসেননি। এই প্রথম আসছিলেন বলে আমি আপনার যত্ন নিতে অনেক ব্যবস্থা করেছি। একবার দেখুন। আপনার চোখে আমার জন্য একবিন্দু ভালোবাসা দেখার ভীষণ ইচ্ছে ছিল আমার। আর আপনি আমায় অ’ভি’শা’প দিয়ে চলে গেলেন? একবার শুনুন না, আমি আপনাকে মা’রি’নি। আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি, জানেন?”
আসমানী নওয়ান সেদিন আর উঠলেন না। শুনলেন না জেডির কোনো কথা। দেখলেন না জেডির এই রূপ। তিনি সবসময় জেডিকে নিজের শ’ত্রু ভেবে এসেছেন। না ভাবারও তো কারণ নেই। জেডির কাজকর্মে কেউ তার ভালোবাসা খুঁজে পায় না৷
এরপর জেডি গভীর রাতে আসমানী নওয়ানকে নিয়ে আকাশদের বাড়িতে আসে। অন্ধকার রাত্রে বাগানের এক কোণায় সময় নিয়ে একা একাই মাটি খুঁড়ে আসমানী নওয়ানকে ক’ব’র দেয়। জেডি কতশত অশ্রুকণা যে বিসর্জন দিয়েছিল সে রাতে। সব কাজ শেষে ক’ব’রের পাশে বসে আবারো বাচ্চাদের মতো কেঁদে বলেছিল,
“আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। হয়ত আমার সাথে আপনার সাক্ষাৎ খুব দ্রুতই হবে। তবে আমি কখনোই চাইনি আপনি এভিজানদের ছেড়ে এতোদূরে চলে যান। আমি চেয়েছিলাম, আপনি এভিজানদের সাথে খুব ভালো থাকুন। আমি সব ব্যবস্থা করে দিতাম। কিন্তু তা আর হলো না। আপনি চিন্তা করবেন না, আপনার খু’নিকে শা’স্তি না দিয়ে আমি ম’র’বো না।
আর ওপারে গিয়ে আমি সবার আগে আপনাকে জানবো, আমি আপনাকে মা’রি’নি। আপনি প্লিজ আমাকে বিশ্বাস করবেন। আর আমাকে দেয়া অ’ভি’শা’পটুকু তুলে নিবেন।”
জেডির মুখে সব শুনে নিয়াজ একেবারে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। দু’চোখ ফেটে বেশ কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়েছে।
জেডি’র চোখ দু’টো টকটকে লাল। ভাঙা গলায় বলে,
“মাফিয়াদের শ’ত্রু থাকা স্বাভাবিক। আমার আর এভিজানেরও শ’ত্রু আছে। কিন্তু সেসব যে মিসেস আসমানী নওয়ান আর অনামিকার উপর গিয়ে পড়বে তা কখনো কল্পনাও করিনি।”
নিয়াজ নিশ্চুপ। ইতোমধ্যে জেডির মুখে সে অনামিকার ব্যাপারেও জেনেছে। তাই আর নতুন করে প্রশ্ন করল না।
জেডি চেয়ারে শরীর ছেড়ে দিয়ে চোখ বুজে থেমে থেমে বলে,
“মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার পর সন্তানদের অনুভূতি কেমন হয়, সে অনুভূতি অনুভব করার সৌভাগ্য আমার কখনো হয়নি। আসলে আমার মা ছিল না তো! তাই আর কি!
তবে এটা জানতাম, মায়ের ভালোবাসা কেমন হয়! কারণ আমার সৎ মা আমার সৎ ভাইকে ভীষণ ভালোবাসতো। এভির মা-ও এভিকে খুব ভালোবাসতো। আমি শুধু মায়েদের ভালোবাসা চেয়ে চেয়ে দেখতাম। সৎ মায়ের হাতে মা’র খাওয়ার পর তার থেকে ভালোবাসা পাওয়ার আশা কখনো করিনি। কিন্তু এভির মা আমাকে কখনো মা’রেনি। তাই মনে হত, এই বুঝি উনি আমাকে মায়ের মতো জড়িয়ে নিল! এই ভাবনা মনে পুষতে পুষতে বয়স ৩০ পেরিয়ে গেল। অথচ সেই দিন আর আসলো না। উল্টে তিনি আমাকে অ’পছন্দ করতে শুরু করল। আর তারপর এমন একটি দিন চলে আসলো যে, তিনি আমাকে নিজের খু’নি ভেবে বুক ভরে অ’ভি’শা’প দিয়ে এই দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিল।”
কথাগুলে বলে জেডি আবারো সোজা হয়ে বসে। দু’হাতে চোখজোড়া ডলে হেসে বলে,
“নতুন করে আর কিছু চাওয়ার নেই, পাওয়ারও নেই। পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নেয়ার আগে শুধু একটি চাওয়া। যার জন্য আমি আমার এই মূল্যহীন জীবনের শেষ র’ক্তবিন্দু পর্যন্ত আমি চেষ্টা করে যাবো, যেন আমার মৃ’ত্যু এভিজান আর সন্ধ্যাপ্রাণের হাতেই হয়। এর জন্য আমাকে যতটা নিচে নামতে হয়, আমি অধীর ততটা নিচে নামবো। যতটা নি’কৃ’ষ্ট হতে হয়, ততটাই নি’কৃ’ষ্ট হব। বিনিময়ে আমার সন্ধ্যাপ্রাণ আর এভিজানের হাতে অমৃত নামক মৃ’ত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে চাই।”
এ পর্যায়ে জেডির কথাগুলো খুব শ’ক্ত শোনালো। নিয়াজ কেঁপে উঠল। ঢোক গিলে বলে, “কেন এমন চাইছ তুমি?”
জেডি মলিন গলায় বলে,
“কারণ আমি এভিজান, সন্ধ্যাপ্রাণদের ভালোবাসার তালিকা থেকে কে’টে গিয়েছি। ওদের হাতে মৃ’ত্যু গ্রহণ করে আবারো ওদের ভালোবাসার তালিকায় যুক্ত হতে না পারলেও, করুণার তালিকায় আমি নি’কৃ’ষ্ট মানব রূপী অধীর স্থান পেতে চাই। এজন্যই এতো আয়োজন। নিজের স্বা’র্থের জন্য, এই শেষবারের মতো ওদের বি’র’ক্ত করছি।”
নিয়াজ অবাক হয়ে বলে,
“এমন করলে আকাশ পরবর্তীতে ভীষণ ক’ষ্ট পাবে জেডি।”
জেডি তার লালিত চোখজোড়া নিয়াজের পানে রেখে বিষাদ সুরে বলে,
“আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে আমি যে রাস্তা দিয়ে হাঁটবো, আমার সব প্রিয় মানুষগুলো সেই রাস্তায় থুতু ছুঁড়ে ফেলবে। আর আমি যদি এভাবে ম’রে যাই। তবে ওরা আমার ক’ব’রের পাড়ে না আসলেও পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় করুণার দৃষ্টিতে হলেও আমার ক’ব’রের দিকে একবার তাকাবে। ওটুকুই আমার জন্য অনেক।
তাছাড়া আমি এমন না করলে তো আমার ম’র’ণ হবে না। এভিজানকে ক’ষ্ট দেয়ার জন্য ও আমাকে ঘৃ’ণা করে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। কিন্তু আমি ওর মা, তোমার মতো ভালো মানুষের মিথ্যে মৃ’ত্যুর ভার, অনামিকাকে ঘিরে মিথ্যা অ’প’বা’দ মাথার উপর নিলে, ও ঠিকই আমাকে মে’রে ফেলবে।
একটু থেমে জেডি আবারো বলে,
মা সমতুল্য আসমানী নওয়ানের মৃ’ত্যতে রাতের পর রাত বুক ফাঁ’টা আ’র্ত’নাদ করেছি, তার খু’নের মিথ্যা ভার নিজের মাথায় নিয়েছি। যাকে এই বুকে ছোট্ট বোনের জায়গা দিয়েছি, তার ধ’র্ষ’ক আর মৃ’ত্যুর মি’থ্যে অ’প’বা’দ নিজের ঘাড়ে নিয়েছি। যে ছোট্ট বাচ্চার পা ধরে ক্ষমা চেয়েছি, তার মিথ্যে হ’ত্যা’কারী হতে চাইছি, সামান্য ক’ষ্টও দিতে চাইছি। বিনিময়ে উপহার স্বরূপ শুধু চাই আমার জান আর প্রাণের হাতে মৃ’ত্যু। আর সেই মৃ’ত্যুর বিনিময়ে আমার প্রিয় মানুষগুলোর করুণা।”
নিয়াজ হাসফাস কণ্ঠে বলে,
“নাহ্। এমনটা করবে না তুমি। আকাশ অপরাধবোধে বাঁচতে পারবে না।”
জেডি হেসে বলে,
“পারবে৷ ও আমার সন্ধ্যাপ্রাণকে নিয়ে ভালো থাকতে শিখে গিয়েছে। সন্ধ্যাপ্রাণ ওর পাশে থাকলে, ওকে দুঃখ ছুঁতে পারবে না। আমি বিহীন তো কারো কিছুই যায় আসে না। উল্টো সকলে আমার বিদায়ের অপেক্ষায়।”
নিয়াজ ছটফট কণ্ঠে বলে,
“তুমি এমনটা কর না জেডি। আকাশ অধৈর্য হয়ে তোমাকে একবার মে’রে দিলে, পরবর্তীতে সব সত্যি জানতে পারলে ওর ঠিক কতটা ক’ষ্ট হবে, একবার ভাবো জেডি?”
জেডি ঝাপসা চোখজোড়া ডলে বলে,
“ক’ষ্ট তো আমারও হয়। ভীষণ ক’ষ্ট হয়। কিন্তু আমার কথা ভাবার কেউ নেই জানো? তাই নিজের দুঃখ ঘুচাতে নিজেকেই এতো খাটুনি করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক’ষ্ট হয়েছে, বোনের ধ’র্ষ’কে’র ট্যাগ নিজের গায়ে মাখাতে। যাকে বলে, একদম দ’ম’ব’ন্ধ’ক’র অনুভূতি। আসমানী নওয়ানকেও বিশ্বাস করাতে পারিনি, উনাকে আমি মা’রি’নি। উনি আমাকে ভুল বুঝে, শেষ সময়ে এসেও আমাকে অভিশাপ দিয়েছেন। সারাজীবন যার একফোঁটা ভালোবাসা পাওয়ার জন্য চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে থেকেছি। তার ভালোবাসা তো কখনো পাই-ই নি। উল্টে তার বুক চিরে বেরিয়ে আসা অ’ভি’শা’প পেয়েছি। ওদিকে সন্ধ্যাপ্রাণ আর এভিজানকে তো সেই কবেই হারিয়ে ফেলেছি। কত হ’ত’ভাগা আমি! সত্যি বলতে আমার জীবনে মৃ’ত্যু ছাড়া আর চাওয়ার কিছুই নেই। আর আমার মৃ’ত্যুটা যেন আমার প্রিয় মানুষ দু’টোর হৃদয়ে সামান্য হলেও ছুঁতে পারে, আমাকে সামান্য হলেও মনে করে। এজন্যই এতো আয়োজন করছি।”
নিয়াজ আবারো ছটফটে কণ্ঠে বলে, “আকাশ ভীষণ ক’ষ্ট পাবে। প্লিজ জেডি এমনটা করনা। কেন আকাশকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছ?”
জেডি উত্তরে বলে,
“কারণ আমি এভিজান আর সন্ধ্যাপ্রাণের ভালোবাসা চাই।”
নিয়াজ বলে,
“তুমি ওদের সাথে অনেক অ’ন্যায় করেছ। হয়তো ওদের ভালোবাসা কখনো পাবে না।”
জেডির মুখখানা মলিন হয়। সে নিজেকে সামলে বলে,
“জানি৷ তবে করুণা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ওতেই আমার চলবে।”
নিয়াজ অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আকাশদের হাতে ম’র’তে তুমি আর কত ছ’ল’চা’তুরী করবে?”
জেডির সহজ উত্তর,
“যতক্ষণ এই দেহে প্রাণ আছে। ছ’ল’চা’তু’রী তো এখনো অনেক বাকি আছে। সৃজনকে নিয়ে খেলা শুরু করলেই হয়ত আমি মুক্তি পেয়ে যাবো।”
নিয়াজ মোচড়ামুচড়ি করে আর বলে, “প্লিজ জেডি, আমাকে ছেড়ে দাও।”
জেডি হেসে বলে,
“এখন তো তোমাকে ছাড়া যাবে না ডিয়ার। আমার কাজে ব্যা’ঘা’ত ঘটাবে তুমি। তাই এখন ছাড় পাবে না। বাট, নো টেনশন, সময়মতো ঠিক মুক্তি পেয়ে যাবে।”
এই বলে জেডি নিয়াজের দিকে তাকিয়ে ডান চোখ টিপ দেয়। হেসে বলে,
“বাই বাই মাই ডিয়ার নিয়াজ। খুব শীঘ্রই এই সুন্দর পৃথিবীতে তুমি মুক্ত পাখির ন্যায় উড়তে পারবে। আর আমি পাবো মুক্তি। দোয়া রাখো। আমি যত দ্রুত মুক্তি পাবো, তুমি তত দ্রুত মুক্ত হবে।”
কথাটা বলে জেডি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। মেঝেতে অবহেলে পড়ে থাকা শার্টটি তুলে গায়ে জড়িয়ে নিল। এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছল। ক’ষ্টগুলো উড়িয়ে দিতে চাইলো, কিন্তু আর পারছে না। সব ক’ষ্ট চোখ আর বুক দখল করে নিচ্ছে মনে হচ্ছে। কি অসহনীয় ব্য’থা বুকে! কত যে দুঃখের অশ্রু এই দু’চোখে!
পিছন থেকে নিয়াজ ছটফট করে। চেঁচিয়ে ডাকে জেডিকে। জেডি যা করতে যাচ্ছে, তা ভুল। এ কথা সে জেডিকে কি করে বোঝাবে? এর পরিণতি কি হবে? নিয়াজের দমবন্ধ লাগে। সর্বশক্তি দিয়ে জেডিকে ডাকলো৷ কিন্তু জেডি পিছু ফিরল না। এলেমেলো পায়ে বেরিয়ে গেল এখান থেকে। আর ঘরের এক কোণায় পড়ে রইল ছটফট করা নিয়াজ।
~ দ্বিতীয় ভিডিও,,
জেডি আর সৃজন একটি ঘরের ডিভানের উপর সামনাসামনি বসে আছে। সৃজন ডান হাতের বুড়ো আঙুল মুখে ঢুকিয়ে রেখে জেডিকে দেখছে। লোকটাকে তার খুব চেনা চেনা লাগছে৷ ঘুম থেকে উঠে সকাল সকাল মাকে না দেখে তার মন খারাপ। জায়গাটিও অপরিচিত।
জেডি সৃজনের গুলুমুলু গাল দু’টো টেনে হেসে জিজ্ঞেস করে,
“কেমন আছো তুমি?”
সৃজন বোকা বোকা চোখে চেয়ে হঠাৎ-ই শব্দ করে বলে ওঠে,
“তুমি জেলি?”
ডাকটা জেডির পছন্দ হয়না। সে আস্ত এক মানুষ। অথচ এই বাচ্চার সাথে যতবার দেখা হয়েছে, তাকে শুধু খাবার বানিয়ে দিয়েছে। জেডি কিছু একটা ভেবে সৃজনকে কোলে নিয়ে ডিভান থেকে উঠে ঘরের কোণায় রাখা বড়সড় একটি ফ্রিজ খুলে দেয়। ফ্রিজ ভর্তি জেলি দেখে সৃজনের চোখ চকচক করে ওঠে। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
“এত্তো জেলি এত্তো জেলি! কি মুজা!”
জেডি হাসলো। ফ্রিজ বন্ধ করে সৃজনকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
“ওগুলো সব তোমাকে দিব।”
সৃজন বলে, “সুত্তি দিবা?”
জেডি মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। সৃজনের চোখেমুখে উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে।
জেডি সৃজনকে ডিভানের উপর বসালো। এরপর সে মেঝেতে হাঁটুগেড়ে বসে সৃজনের দিকে মলিন মুখে তাকালো। সৃজন চোখ দু’টো বড় বড় করে জেডির দিকে চেয়ে আছে। এদিকে সৃজনের দৃষ্টি দেখে জেডি বিব্রতবোধ করে। দু’হাতে সৃজনের দু’পা ধরে বলে,
“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে বাবা?”
অবুঝ সৃজন বুঝতে পারেনা। সে প্রশ্ন করে, “কমা কি?”
জেডি চেয়ে রইল সৃজনের দিকে। সে এমন এক বাচ্চাকে মা’র’তে চাইতো, যে বাচ্চাটি ক্ষমা শব্দটির মানেও জানেনা। সেই বাচ্চাটি আর কেউ নয়, তার এভিজানের র’ক্ত। জেডির মনে পড়ে ভার্সিটি থাকাকালীন আকাশকে বলা একদিনের কথা,
“এভিজান শোন, তোর মেয়ে বাচ্চা হলে ওকে আমার ছেলের বউ বানাবো। আর ছেলে বাচ্চা হলে ওকে আমার মেয়ের জামাই বানাবো। তারপর আমার ছেলের বউ অথবা মেয়ের জামাইকে শ্বশুর হয়ে এতো ভালোবাসবো যে, এই পৃথিবীর মানুষ তাক লেগে যাবে। এই পৃথিবীতে আমি হব বেস্ট শ্বশুর। একেবারে রেকর্ড ভাঙবো। ভালো শ্বশুরের এওয়ার্ড নিব। এসব সম্ভব হওয়ার কারণ আমার মেয়ের জামাই নয়তো ছেলের বউ আমার এভিজানের র’ক্ত হবে।”
একসময় জেডি তার প্রিয় বন্ধু এভিজানের বাচ্চাদের ভালোবাসার স্বপ্ন দেখতো। আর আজ, সেই জেডি তার প্রিয় বন্ধু এভিজানের বাচ্চাকে দিনের পর দিন মা’র’তে চেয়েছে।
কথাগুলো ভেবে জেডির দমবন্ধ লাগলো। চোখদু’টো টলমল করে উঠল। সে দ্রুত সৃজনের থেকে চোখ সরিয়ে আশেপাশে তাকালো। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় জেডি মাথা নিচু করে সৃজনের দু’পায়ে দু’টো চুমু খেয়ে সৃজনের পায়ের সাথে কপাল ঠেকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে আওড়ায়,
“আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও বাবা। এভিজানের সাথে সাথে তোমার সামনে দাঁড়াতেও আমার ভীষণ ল’জ্জা লাগে। এককালে আমার ভাষ্যমতে, আমিও তোমার এক বাবা। কিন্তু আমি তোমার বাবা হয়ে অসংখ্যবার তোমার জীবন কে’ড়ে নিতে চেয়েছি। ভালো হচ্ছে, তুমি বড় হওয়ার আগেই আমি এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি। তুমি আমাকে কখনো মনে রেখ না।”
কথাগুলো বলতে বলতে জেডির দু’চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু সৃজনের দু’পায়ের উপর পড়ল। সৃজন অবুঝ নয়নে মাথা নিচু করে রাখা জেডির দিকে চেয়ে রইল। পা ভেজা মনে হওয়ায় ছোট্ট পা দু’টো নাড়ালো। জেডি ছেড়ে দিল সৃজনের পা। মাথা তুলে তাকালো সৃজনের দিকে। সৃজন জেডির ভেজা লাল চোখ দেখে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কাদচ কেনু?”
জেডি দু’হাতে চোখ ডলে মৃদু হেসে বলে, “কারণ আমি খুব খারাপ। কেউ আমাকে ভালোবাসে না। সবাই শুধু ঘৃ’ণা করে।”
কথাটা বলে জেডি সৃজনকে নিয়ে ওয়াশরুমে যায়। এরপর সৃজনের মুখ ধুইয়ে দিয়ে আবারো ঘরে এসে একটি বাটিতে রেঁধে রাখা গরম গরম সুজি সৃজনকে খাওয়ায়। সকাল থেকে না খাওয়ায় সৃজনেরও খুব ক্ষুধা পেয়েছে, তাই সে বিনাবাক্যে খেতে শুরু করে। জেডি সৃজনকে সুজি খাওয়ানো শেষ করে সৃজনের মুখ ধুইয়ে দিয়ে সৃজনকে পানি খাওয়ায়। এরপর ফ্রিজ থেকে একটি জেলির কৌটা এনে চামুচ দিয়ে সৃজনের মুখে একটু একটু করে জেলি খাওয়ায়। জেলি পেয়ে সৃজনের খুশি দেখে কে! সে হাত তালি দেয় আর জেলি খায়। হঠাৎ-ই কিছু একটা মনে করে বলে,
“কাওয়াল জেলি ভালো। তুমি জেলিও এত্তো বালো। বুচ্চো জেলি?”
সৃজনের কথা শুনে জেডি হঠাৎ-ই শব্দ করে হেসে দেয়। সৃজনকে তার বা পায়ের উপর বসিয়ে সৃজনের মাথায় ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে বলে,
“কিছুক্ষণ পর তোমায় অনেক ক’ষ্ট দিব। তবে এটাই শেষ। এরপর আর তোমাদের কাউকেই বিরক্ত করব না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা। আর অবশ্যই আমাকে ভুলে যেও।”
~ ৩য় ভিডিও,,
“বিশ্বাস কর, আমি তোদের সবাইকে ভীষণ ভালোবাসি এভিজান। আমি ম’রে যাওয়ার পর, তুই নিজেকে কখনো কাঠগড়ায় দাঁড় করাস না। আমায় তোদের ভালোবাসতে হবে না। আমি জানি, আমি এসবের যোগ্য নই। আসলে আমার ভাগ্যের সাথে পূর্ণতা, ভালোবাসা এসব ঠিক যায় না। সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ এটা। দু’দিন পর হলেও, আমি সে নির্দেশ মেনে নিয়েছি। শুধু শেষ একটি ইচ্ছে, মৃ’ত আমি’র প্রতি তোরা খুব সামান্য দয়া করিস, একটুখানি করুণা করিস। এটুকু করলেই হবে। আর কিছু লাগবে না আমার।
মেঝেতে হাঁটুগেড়ে বসা বি’ধ্ব’স্ত জেডি কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ভিজিয়ে ফেলে। কড়ুণ কণ্ঠে বলে,
এভিজান? আমাকে তোর মতো করে কেউ কখনো ভালোবাসেনি। তুই আমাকে কখনো ভুলে যাস না যেন, কেমন? জানি তোকে অনেক ক’ষ্ট দিয়েছি। তোর বাচ্চাকে বহুবার মা’রতে চেয়েছি। কিন্তু একটা সত্য কথা বলি, প্লিজ অ’বিশ্বাস করিস না। তোর বাচ্চা সৃজনের প্রতি আমার অ’দৃশ্য একটা টান ছিল। সবসময় তুই বাঁচিয়ে নিতি বলে সৃজন বেঁচে যেত, এমন নয়। মাঝে মাঝে আমি নিজের কাছে হে’রে গিয়ে সৃজনকে মু’ক্ত পাখির ন্যায় ছেড়ে দিতাম। কারণ ও তোর র’ক্ত ছিল। যতবার আমি আমার প্রিয় বন্ধু এভিজানের র’ক্তে নিজের হাত ভেজাতে গিয়েছি, ততবার আমার বুক কেঁপে উঠতো। ভাগ্যিস তুই সৃজনকে আমার হাত থেকে বাঁচিয়ে নিতি, ভাগ্যিস সৃজনকে হাতের কাছে পেয়েও আমি বহুবার পিছিয়ে এসেছি। নয়তো আজ আমার হাতে ওর মৃ’ত্যু হলে আমি হয়তো নিজেও নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারতাম না। ও বড় হয়ে গেলেও কখনো আমার কথা ওকে বলিস না যেন। নয়তো সৃজন ওর ঘৃ’ণার লিস্টে সর্বপ্রথম আমাকেই রাখবে।
একটু থেমে মলিন হেসে বলে,
অথচ আমি আমার এভিজানের বাচ্চার সাথে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা আদান-প্রদান করতে চেয়েছিলাম।”
জেডি থামে। দু’পায়ের উপর ভর দিয়ে বসে আছে সে। মাথা নিচু। কথাগুলো বলতে বলতে শতশত অশ্রুকণা গড়িয়ে দু’পায়ের হাঁটু বরাবর এসে পড়েছে। জেডি দু’হাতে চোখ ডলে নিজেকে সামলায়। মৃদু হেসে বলে,
“তোর মনে আছে এভিজান, ভার্সিটি থাকতে একদিন তোকে বলেছিলাম, আমি তোর জন্য আমার এই মূল্যবান জীবন দিয়ে দিতে পারবো। সেদিন তুই আমার কথা বিশ্বাস করিস নি। আজ দেখ, আমি সত্যিই তোর জন্য জীবন দিয়ে দিচ্ছি। আমার ১৬ বছরের ভালোবাসা আমার সন্ধ্যাপ্রাণকেও তোকে দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু তুই তোর ৫ বছরের ভালোবাসা সন্ধ্যামালতীকে আমাকে দিয়ে দিতে পারিসনি। আমার জন্য তোকে জীবন-ও দিতে হয়নি। তুই ভালোবাসার খেলায় জিতে গেলেও বন্ধুত্বের খেলায় কিন্তু আমি জিতে যাচ্ছি এভিজান।”
কথাগুলো বলে জেডি শব্দ করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বলে,
“যাস্ট ফান করলাম এভিজান।
এটুকু বলে সে মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলে,
তোর আর সন্ধ্যাপ্রাণের একটি সুখের সংসার প্রাপ্য এভি। আমি বেঁচে থাকলে এটা অ’সম্ভব প্রায়। আর তাই তোদের এক টুকরো সুখ উপহার দিতে আমি এই সুন্দর সবুজ শ্যামলে ভরা, হাজারো স্বপ্নে ঘেরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছি। তোদের খুব সুন্দর একটা সংসার হোক, যার অপেক্ষায় তোরা প্রতিটি প্রহর গুণতি। এবার তোদের একটি সুখের সংসার হবে। কারণ আমি নামক কা’লো ছায়া এই দুনিয়ার বুকে আর থাকছি না। তোরা খুব ভালো থাকিস। শুধু আমার প্রতি ঘৃ’ণার পরিমাণটুকু কমিয়ে রাখিস। হঠাৎ কোনো একদিন আমায় একটুখানি মনে করিস। আর কিচ্ছু চাই না আমার।”
কথাগুলো বলতে বলতে জেডি’র হঠাৎ কেমন যেন হাসফাস লাগলো। তীব্র ছটফটানিতে সে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে। অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়,
“আমার প্রাণকে কেউ ছুঁয়ে দিলে আমার খুব ক’ষ্ট হয় এভিজান। তুই ছুঁলেও ভীষণ ক’ষ্ট হয়। আমি তো তোর থেকে তোর সন্ধ্যামালতীকে কে’ড়ে নিচ্ছি না। এবার তুই আমার সন্ধ্যাপ্রাণের থেকে সামান্য দূরত্ব রাখবি এভিজান?”
কথাটা বলতে বলতে জেডি আবারও শব্দ করে হেসে ওঠে। দু’চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। বেঁধে আসা গলায় বলে,
“কত বোকা বোকা কথা বলি আমি! মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় আর কি! ‘তোদের করুণা পাওয়া’, আমার ওই একটা ইচ্ছে পূরণ হলেই চলবে এভিজান।”
বলতে বলতে জেডি উপুর হয়ে হাঁটুর সাথে মাথা ঠেকায়। দু’হাতের মাঝে মুখ ঠেকিয়ে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। বিড়বিড় করে,
“না পেলাম মায়ের কোল, না পেলাম বাবার আদর, না পেলাম প্রিয় বন্ধু এভিজানের বন্ধুত্ব, না পেলাম প্রিয় নারী সন্ধ্যাপ্রাণের ভালোবাসা। পাওয়ার মধ্যে পেয়েছি, প্রিয় বন্ধু এভিজান আর প্রিয় ভালোবাসা সন্ধ্যাপ্রাণের বুকভরা ঘৃ’ণা। ব্য’র্থ আমি। ধ্বং’স আমি। সব জায়গায় অ’যোগ্য।”
ভিডিওর মাঝখানে এসে আকাশ হঠাৎ-ই নিজের জায়গা থেকে উঠে সামনে বড় পর্দা অর্থাৎ টিভি বরাবর টি-টেবিলের উপরে বিদ্যমান মোটা কাচ ছুঁড়ে মা’রে। বন্ধ হয়ে যায় সামনে জ্বলজ্বল করা এতক্ষণের ভিডিও। নিয়াজের মাথা নিচু। চোখমুখ অসম্ভব লাল হয়ে আছে। নির্জীব দৃষ্টি তার হাঁটুর উপর থাকা জেডির দিকে।
সন্ধ্যা সৃজনকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে। দৃষ্টি জেডির নিথর দেহটার দিকে।
আকাশের শরীর অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। দু’চোখ বেয়ে এক্ষুনি র’ক্ত ঝরবে বলে মনে হচ্ছে। জেডির বলা কথাগুলো বাবার কানে বাজছে। মনে পড়ে জেডির বলা, তাদের ভার্সিটি লাইফের এক রঙিন দিনের কথোপকথন,
“এভিজান আমি তোর জন্য কি কি করলে তুই সবচেয়ে বেশি খুশি হবি?”
একটু পর পর এক প্রশ্ন শুনে আকাশ একপর্যায়ে চরম বিরক্ত হয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“নিজের মূল্যবান জীবনটা দি’য়ে দি’স। তাহলেই আমি খুব খুশি হব। বাঁ’চা’ল কোথাকার!”
জেডি শব্দ করে হেসে বলে,
“হায় হায়! তাই বলে জীবনটাই চেয়ে বসলি? কি নি’র্দ’য় রে তুই!”
আকাশ হেয়ালি করে বলে,
“আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি নি’র্দ’য়-ই।”
জেডি দু’হাতে আকাশের গাল টেনে বলে, “সে তুই যা ইচ্ছা হ। আমি কিন্তু তোর জন্য আমার এই মূল্যবান জীবনটাও দি’য়ে দি’তে পা’রবো।”
আকাশ এবার ঠাস করে জেডির গালে একটা থা’প্প’ড় দিয়ে বলে,
“আর একবার যদি কোনো ফা’ল’তু মুভি দেখে আমার কাছে এসে সেসব ফা’ল’তু ডায়লগ ঝেড়েছিস, তবে তোর খবর আছে।”
জেডি গালে হাত দিয়ে ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে, “আরে সত্যি বলছি, আমি কোনো মুভি থেকে ডায়লগ ঝাড়ি নি।”
আকাশ পাত্তা দিল না জেডির কথা। এগোলো সামনের দিকে। জেডি আবারো চেঁচিয়ে বলে,
“তুই আমার সত্যি কথাগুলো এভাবে অ’বিশ্বাস করিস বলে, দেখবি আল্লাহ্ একদিন এমন ব্যবস্থা করবে, যেদিন সত্যিই আমি তোর জন্য ম’রে যাবো। সেদিন বিশ্বাস করবি তো এভিজান?”
এবার আকাশ রে’গেমেগে উল্টোঘুরে জেডির দিকে দৌড়ে আসে মা’রার জন্য। রাগান্বিত স্বরে বলে,
“দাঁড়া তোকে ম’রা’চ্ছি আমি বে’য়া’দ’ব।”
জেডি আকাশের মনোভাব বুঝতে পারে। বেচারা আবারো আকাশের হাতের শ’ক্ত মা’র খাওয়ার ভ’য়ে উল্টো ঘুরে দৌড় লাগায়। শব্দ করে হেসে ফেলে আকাশের রিয়েকশনে। আসলে সে বারবার ম’রার কথা বলছিল, এজন্যই এভি রে’গে’ছে সে বুঝতে পেরেছে। বেশ ভালো লাগলো। ইশ! তার বন্ধুটা মারাত্মক খাঁটি। কথাটা ভেবে হাস্যজ্বল জেডির চোখের কোণ কখন ভিজে উঠল সে নিজেও বুঝল না।
পুটনো কথা ভেবে আকাশ ছটফট করে উঠল। এবার যেন সত্যি সত্যিই কানে বেজে উঠল জেডির কণ্ঠ,
‘এভিজান এবার বিশ্বাস করেছিস তো, আমি তোর জন্য জীবন দিতে পারি কি-না!’
ছটফটে আকাশ চারিদিকে তাকালো। হাস্যজ্জ্বল জেডিকে দেখতে পেয়ে আকাশের মস্তিষ্ক এলোমেলো হলো। চারিদিক থেকে ভেসে আসছে জেডির হাস্যজ্জ্বল মুখে বলা হাজারো কথা। ছটফটে আকাশ দাঁড়িয়ে থাকায় শ’ক্তি হারায়। ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। দু’হাতে মাথা চেপে ধরে। হঠাৎ-ই সব জেডি কেমন মিলিয়ে যায়।
বি’ধ্ব’স্ত আকাশের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে, জেডির নিথর দেহ’র দিকে। যাকে সে কিছুক্ষণ আগে নিজ হাতে এই দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়েছে। ওই তো র’ক্তে মাখামাখি হয়ে আছে জেডির পুরো শরীর। জেডি তার জন্য সত্যি সত্যিই জীবন দিয়েছে। আর সে জেডির প্রাণ কে’ড়ে নিয়েছে। যেটা আকাশ মানতে পারলো না। কাঁপতে থাকা দু’হাতে মাথার চুল টেনে ধরে হঠাৎ-ই সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে ডেকে ওঠে,
“জ্যাক????????????”
আকাশের চিৎকারে জায়গাটি যেন কেঁপে উঠল। ছোট্ট সৃজন ভ’য়ে কেঁদে উঠল। সন্ধ্যার ফোঁপানোর মাত্রা বাড়লো। নিয়াজের দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরলো। কিন্তু উঠলো না কেবল জেডি। একটুও নড়লো না। যেই আকাশ একবার জেডির দিকে তাকালে জেডি ছুটে তার এভিজানের কাছে চলে আসতো। সে আজ আর কোনো সাড়া দিল না, যে সবার ভীষণ অ’পছন্দের, ঘৃ’ণিত একজন ব্যক্তি। কি করে সাড়া দিবে? সে তো ঘুমিয়ে গেছে। যে ঘুম কি’য়া’ম’তের আগে আর কখনো ভাঙবে না। সেই ঘুম ঘুমায় জেডি। কি সুন্দর করে ঘুমায় ছেলেটা, তাইনা!
আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৭
আকাশের জ্যাক, সন্ধ্যাকে ভালোবেসে প্রাণ প্রাণ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা অধীর চিরতরে ঘুমিয়েছে সবার জীবনে আবারো নতুন করে শান্তি ফিরিয়ে দিতে। এই দুনিয়া ছেড়েছে এক বুক শূণ্যতা নিয়ে। তার এভিজান, সন্ধ্যাপ্রাণের একটুখানি করুণা পাবার আশা নিয়ে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে। তাকে কি কেউ খুব সামান্য করুণা করবে? না-কি তার অবস্থান সবার ঘৃ’ণার তালিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
