Home আমি তার সন্ধ্যামালতী আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৯

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৯

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৯
DRM Shohag

রিহানের সাথে দেখা হওয়ার পর পরই সৌম্য’র অরুণের সাথে দেখা হয়। অরুণ গাড়ি থেকে নেমে এসে সৌম্য’কে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সৌম্যকে টেনে গাড়িতে এনে বসায়। এরপর গাড়ি স্টার্ট দেয়। হাই স্পিডে গাড়ি চালিয়ে জেডির দেয়া এড্রেসে আসে। জেডির দেয়া ছোট্ট চিরকুটের নিচে এড্রেসসহ লেখা ছিল, ‘আমার লা’শ দেখতে আসিস অরুণ।’

সৌম্য অরুণকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছিল, অরুণ তাকে নিয়ে এভাবে কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু অরুণ একটা কথাও বলেনি। দু’একবার বলার চেষ্টা করেছিল। তবে ব্যর্থ হয়েছে। চোখজোড়া বারবার ঝাপসা হয়ে আসছিল। শুধু মনে হচ্ছিল জেডি কোনোভাবে বেঁচে যাক। জেডি যা করেছে তা সে জানে। কিন্তু তার পরিণাম মৃ’ত্যু কেন হবে? অন্যভাবে শা’স্তি দেয়া যাবে। সে তো কাউকে খু’ন করেনি। অরুণ এই ভাবনা নিয়েই আসছিল। যেন আকাশ জেডিকে ভুল না বুঝে মে’রে ফেলে। কিন্তু সে শেষ রক্ষা করতে পারেনি। অরুণ আর সৌম্য যখন দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ততক্ষণে জেডি মৃ’ত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। বি’ধ্ব’স্ত নিয়াজকে দেখে তারা যতটা না অবাক হয়েছে, তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি অবাক হয়েছে নিয়াজের আনা পেনড্রাইভে দেখানো জেডির প্রতিটি দৃশ্য। কয়েক সেকেন্ড পূর্বে আকাশের দেয়া সেই চিৎকারে বারবার জ্যাক শব্দটি প্রতিধ্বনি হয়। অরুণ বা হাতে দরজা ধরে এতক্ষণ নিজেকে সামলে রাখলেও এবার যেন পা ভে’ঙে আসার উপক্রম হলো। তবুও সে তার অচল সমান দু’পা সামনের দিকে টেনে আনলো।

সৌম্য অনুভূতিহীন চোখে চেয়ে আছে জেডির দিকে। গতকাল যখন জেডি রিহানের মৃ’ত্যুর ভার নিজের কাঁধে নিয়েছিল। তখন সৌম্য জেডিকে কত খা’রা’প কথা শুনিয়েছিল। জেডির মুখে ঘু’ষিও মে’রেছিল। অথচ সৌম্য’র মনে পড়ে না, সে তার অধীর ভাইয়ার সাথে কখনো চোখ পাকিয়ে কথা বলেছিল কি-না! ছেলেটার চোখদু’টো বড্ড ঝাপসা ঠেকল। কি আশ্চর্য! জেডি হয়ত একটা মানুষকেও খু’ন করেনি। কিন্তু বাকি কাজ গুলো? তাদের দেয়া প্রতিটি দুঃখ! সেসব তো অধীর-ই করেছে। তবুও সৌম্য’র কেন ক’ষ্ট হচ্ছে? তাদের ক’ষ্ট দেয়া মানুষটা আর নেই তার তো খুশি হওয়া উচিৎ। কারণ তাদের আর দুঃখ পিছু নিবে না। অথচ সৌম্য’র আজ এই মুহূর্তে এসে মনে হলো, তাদের অধীর ভাইয়া বেঁচে থেকে একটু-আধটু ক’ষ্ট দিত সেসব মেনে নিয়ে একটু ক’ষ্ট করেই নাহয় তারা জীবন চালাতো। তবুও মানুষটা বেঁচে থাকতো! সৌম্য’র ভাবনা অযৌক্তিক। সে জানে।

কিন্তু অধীর ভাইয়ার দুঃখ তো কম ছিল না। ওই যে ভিডিওতে কি অসহায়ভাবে নিয়াজকে বলছিল, অধীরের মনে কত দুঃখ! যে দুঃখ মেটানোর কোনো উপায় ছিল না।
অরুণ তার দুর্বল শরীরটা টেনে এনে জেডির পাশে ধীরে ধীরে বসে। নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে থাকা জেডির মুখপানে ঝাপসা চোখে চেয়ে থাকে অরুণ। দেখতে কি নিষ্পাপ লাগছে জেডিকে! আচ্ছা জেডি কি আসলেই নিষ্পাপ? নাহ্ সে নিষ্পাপ নয়, কিন্তু সে যেসব অ’প’রা’ধের বোঝা মাথায় নিয়েছে, শুধু সেগুলোর হিসাব করলে তো জেডি নিষ্পাপ-ই। কারণ সে এসবের কিচ্ছু করেনি। সে জেডিকে অনামিকার ধ’র্ষ’ক ভেবেছিল। কথাটা ভাবতেই অরুণের ভেতরটা ভীষণ তেঁতো হয়ে উঠল। জেডিকে বাইরে থেকে এক্সট্রোভার্ট মনে হলেও, সে আসলে ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট এক ছেলে ছিল। যে তার উপরটা ফেইক জিনিস দিয়ে ভরিয়ে তার ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো ঢেকে রাখতো। ঠিক যেমনটা জেডি অনামিকার প্রতি নিজের বড় ভাইয়ের অনুভূতি ঢেকে রেখেছিল। অরুণের চোখজোড়া ভিজে উঠল। জেডির ছোট্ট চিরকুটে লেখা অনেকগুলো শব্দের শেষ কয়েক লাইন চোখের সামনে ভেসে উঠল,

‘তুই তো সবসময় চাইতি, এভিজান যেন আমার থেকে দূরে থাকে। তোর সে ইচ্ছে পূরণ হয়েছে অরুণ। এভিজান শুধু আমার থেকে দূরেই নয়, আমাকে ভীষণ ঘৃ’ণা করে। ঘৃ’ণার পরিমাণ এতোটাই বেড়েছে যে, আর কিছুকক্ষণ পর আমাকে এই দুনিয়া থেকে বিদায় দিয়ে দিবে। এভিজান আমাকে মে’রে ফেলবে। তোর বন্ধুর ভাগ আমি আর নিব না। এবার তুই খুশি হবি তো অরুণ?’
অরুণের চোখ থেকে টুপ করে দু’ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। জেডির দিকে সামান্য ঝুঁকে অসহায় কণ্ঠে বলে,
“আমি তো খুশি হতে পারছি না জেডি। তুই এভাবে কেন চলে গেলি জেডি?
এটুকু বলে অরুণ আরেকটু ঝুঁকে বা হাতে জেডির মুখ নাড়িয়ে অসহায় কণ্ঠে বলে,

“এভাবে যাস না জেডি। আমি তোকে অনেক কিছু বলার আছে। প্লিজ যাস না। জ্যাক? এ্যাই জ্যাক? তোর মনে আছে জ্যাক? তোর এভিজান ছাড়া জ্যাক নাম অন্যকেউ উচ্চারণ করলে তুই ক্ষি’প্ত হয়ে তাকে মা’র’তি। আমাকেও তে কতবার মা’র’লি! আজ মা’র’বি না? আমি তোকে জ্যাক বলে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না তুই? এ্যাই জ্যাক?”
অরুণ কতশতবার ডাকলো এভির জন্য জেডির করা বরাদ্দকৃত নামে। যে নাম এভি ছাড়া অন্যকেউ নিলে জেডি রে’গে বোম হয়ে যেত। কিন্তু আজ আর সে রা’গ করল না। বিন্দুমাত্র রা’গ করল না। রা’গ করবে কি করে? রা’গ করার জন্য তার মাঝে তো প্রাণ-ই নেই। আর তাই তো জেডি আজ আর অরুণের উপর রা’গ’লো না।
বিধ্বস্ত আকাশ বসে থেকেই তার শরীরটা টেনে নিয়ে আসলো জেডির কাছে। র’ক্তা’ক্ত জেডিকে দু’র্বল হাতে নিজের সাথে জাপ্টে রেখে আকাশ বাচ্চাদের মতো করে কান্নামাখা গলায় বলতে লাগলো,

“জ্যাক, উঠে পড় জ্যাক। আমি ডাকছি তোকে। তুই শুনতে পাচ্ছিস না আমার কথা? প্লিজ উঠে পড়। একবার তোর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ করে দে আমায়। প্লিজ ফিরে আয়। আমি তোকে করুণা নয়, ভালোবাসি জ্যাক। ভীষণ ভালোবাসি। তুই জানিস, আমার ভাই নেই। তুই তো আমার ভাই ছিলি। এই ভাইটাকে এভাবে অসহায় করে দিয়ে চলে যেতে পারলি, জ্যাক? আমার হাতে মা’রা যাবি বলে কত মিথ্যে ফাঁদ পাতলি। আমি তোর মিথ্যে ফাঁদে পা দিয়ে তোকে অ’বিশ্বাস করেছি জ্যাক। আমাকে শা’স্তি দিয়ে যা। ক্ষমা করে যা। আমি এভাবে থাকতে পারবো না। আমার দম আটকে আসছে। আমি এই অ’প’রা’ধে’র বোঝা বইতে পারবো না জ্যাক।”
এককোণায় বসে থাকা সন্ধ্যা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলতে ব্যস্ত। কোলে সৃজন মায়ের দেখাদেখি কান্নারত। দরজায় কোণায় দাঁড়ানো সৌম্য একটু পর পর শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছতে ব্যস্ত। অরুণের দু’চোখ বেয়ে অনর্গল নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে।

আকাশ জেডির কোনো সাড়া না পেয়ে জেডিকে আবারো মেঝেতে শুইয়ে দিল। পা’গ’লের মতো খানিক ছটফট করল জেডির মুখে একটি কথা শোনার জন্য। র’ক্তমাখা দু’হাতে জেডির সারামুখ বুলায় আর বেঁধে আসা গলায় বলে,
“জ্যাক, একবার আমার সাথে কথা বল না! তোর অনেক সাহস বেড়েছে। তুই আমার ডাককে অগ্রাহ্য করছিস জ্যাক? তোর এভিজানের ডাক শুনেও এভাবে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস জ্যাক? আমার ভীষণ ক’ষ্ট হচ্ছে। আরে এ্যাই জ্যাক?”
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে আকাশের কথা পুরোপুরি জড়িয়ে আসে। চোখ দু’টো বুজে আসে। দেহের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যায় জেডির শ’ক্ত বাহুর উপর। অস্পষ্টস্বরে একবার উচ্চারণ করে,

“আমি বাঁচতে চাইনা জ্যাক।”
আকাশকে এভাবে পড়ে যেতে দেখে সকলে ভ’য় পেয়ে যায়। সবার আগে কান্নারত সন্ধ্যা এতক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকলেও এবার থাকলো না। সে নেতিয়ে পড়া সৃজনকে বুকের সাথে সাপ্টে ধরে একপ্রকার দৌড়ে আকাশের দিকে এগিয়ে আসে আর কান্নামাখা গলায় শব্দ করে ডাকে, “আকাশ?”

ছোটকালে অধীরের সাথে ছোট্ট ছোট্ট স্মৃতিগুলো, অধীরের ভালোবাসা, অধীরের গল্প সন্ধ্যার মনে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে সে জানেনা। কিন্তু তার আকাশ মৃ’ত্যুর সন্নিকটে বুঝতে পেরে তার হৃদয় ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সে এতক্ষণের মতো আর নিরব অশ্রু বি’স’র্জ’ন দিতে পারেনি। দুর্বল শরীরটা নিয়ে তার ভালোবাসার দিকে ছুটে আসছে। যে অধীর তাকে ভালোবেসে প্রাণ দিয়ে দিল, অথচ সন্ধ্যা তার দিকে পা বাড়ানোর সাহস পায়নি। কিন্তু আকাশ হয়তো এখনো মৃ’ত্যুর কোলে ঢোলে পড়েনি, তাতেই সন্ধ্যার মাঝে কত ব্যকুলতা! এটাই বুঝি ভালোবাসা?

“ইস্ট ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং ‘আকাশ ভিরাজ নওয়ান’ সাউথ ইস্ট ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং ‘জ্যাক ডাল্টন’ কে হ’ত্যা করার অ’প’রা’ধে ‘আকাশ ভিরাজ নওয়ান’ কে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।”
প্রতিটি নিউজ চ্যানেলে এই এক নিউজ। মাফিয়াদের ধরার জন্য পু’লি’শেরা অনেক প্রচেষ্টা চালায়। তবে প্রমাণের অভাবে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। আবার তারা প্রশাসনকে নিজের আয়ত্তে রাখায় আরও অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাদের প্রতিটি খু’ন খারাপি, অ’সৎ কাজ ক্ষমতার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু আজ আকাশের ক্ষেত্রে সবকিছু চাপা পড়ার সুযোগ আর হলো না। কারণ জেডি সাধারণ কেউ নয়। সে আকাশের মতো বড় মাপের একজন মাফিয়া। যার ফলে ব্যাপারটি সবার হাইলাইটে চলে এসেছে।

জেডির ডে’ড’ব’ডিসহ আকাশকে হসপিটাল আনা হয়েছে। ডক্টর জানিয়েছে আকাশ হার্ট-অ্যাটার্ক করেছে। অবস্থা খুবই খারাপ। এর আগেও আকাশের হার্ট ব্লক ছিল। অলরেডি রিং পরানো আছে। কিন্তু এবার সিচুয়েশন আগের চেয়েও অনেক খারাপ। আকাশকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। হসপিটালের চারিদিকে পু’লি’শ দ্বারা ঘেরাও করা। আসামী যাতে পা’লা’তে না পারে। আসামীর চিকিৎসা শেষ হলেই তাকে জে’লে নিতে হবে, উপরমহলের আদেশ।
সন্ধ্যা আইসিইউ রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ঝাপসা দৃষ্টিজোড়া রুমের ভেতরে বেডে শুয়ে থাকা কতগুলো যন্ত্র লাগানো আকাশের পানে। দু’হাত দরজায় ঠেকিয়ে রেখেছে। এই মুহূর্তে এসে সন্ধ্যার মনে হলো, তার আসলে ঠিক কার জন্য ক’ষ্ট পাওয়া উচিৎ? মৃ’ত অধীর ভাইয়ার হাতে?

যে কি-না তার স্বামীর হাতে খু’ন হয়েছে। আর সেখানে সন্ধ্যা আকাশের হেল্পিং হ্যান্ড এর মতো ছিল। না-কি আকাশের জন্য? সে এর হিসাব জানেনা। কিন্তু তার ক’লি’জা ছিঁড়ে যাচ্ছে আকাশকে এভাবে দেখে। তার আকাশ এই ঘর থেকে ফিরবে তো? না-কি আর ফিরবে না? আর ফিরলেও বা কি? তার আকাশকে তো পু’লি’শ ধরে নিয়ে ল’কা’পে পুড়ে রাখবে। সন্ধ্যা আর নিতে পারে না। মেয়েটা দরজার সাথে মাথা ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। দমবন্ধকর অনুভূতিতে শ্বাস নিতে বড্ড ক’ষ্ট হয়।

স্বল্প দূরে দাঁড়ানো সৌম্য’র কোলে সৃজন মাকে কাঁদতে দেখে নিজেও কেঁদে ফেলে। সৌম্য সৃজনকে বুকে চেপে রাখে। কিন্তু লাভ হয় না। বাচ্চা ছেলেটির মনে হচ্ছে, সে অচেনা এক জায়গায় এসে পড়েছে। যে পরিস্থিতির সাথে বিন্দুমাত্র পরিচিত নয়। বিশেষ করে, মাকে এভাবে কাঁদতে দেখা, সৃজনের ভাগ্যে কখনে হয়নি। আজ প্রথমবারের মতো মায়ের দেখা পাবার পর থেকে শুধু দেখছে তার মা কাঁদছে।

ইংল্যান্ডের একটি অন্ধকার ঘরের এক কোণায় ৩০ বছরের একটি ছেলে বসা। যার চোখ দু’টো টকটকে লাল। দু’হাত দু’হাঁটুর উপর রেখে সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে আছে। দৃষ্টিজোড়া বন্ধ। কানে বারবার বাজছে,
‘ইস্ট ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং ‘আকাশ ভিরাজ নওয়ান’ সাউথ ইস্ট ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং ‘জ্যাক ডাল্টন’ কে হ’ত্যা করেছে।’
ছেলেটির ভেতরটা অজানা এক কারণে ছটফটিয়ে উঠল। ব্য’থা’তু’র অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো, “ভাই?”
চোখের সামনে ভেসে উঠল ক’দিন আগে তার সাথে জেডির কিছু কথোপকথনের দৃশ্য,

জেডি তার ছোট সৎ ভাই অ্যালেক্স এর সম্মুখ বরাবর একটি চেয়ারে বসে আছে। ডান পা বা পায়ের উপর উঠিয়ে রেখেছে। চেয়ারে হেলান দিয়ে দু’হাত আড়াআড়িভাবে বুকে গুঁজে রেখেছে। ডান পা নাড়াতে নাড়াতে জেডি তার সৎ ভাইয়ের উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলে,
“তুমি আমার কাজটা করবে কি করবে না? ইয়েস অর নো?”
অ্যালেক্স জেডির সামনে পাতা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। এপাশ-ওপাশ হাঁটতে হাঁটতে বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বলে,
“আমার কাছে এসে তুমি এতো ফা’ল’তু নাটক কেন করছ? তুমি ম’রে যাবে, এখন এসব আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? আমাকে ডিস্টার্ব করবে না। আমার কাজ আছে।”

কথাগুলো বলতে বলতে অ্যালেক্স তার ঘরের কোণায় রাখা টেবিলের উপর থেকে একটি ফাইল নিয়ে ফাইলটি মেলে ধরে। অ্যালেক্সের অগ্রাহ্য জেডির মোটেও পছন্দ হয়না। সে রে’গে গিয়ে একটি ছোটোখাটো পানিভর্তি একুরিয়াম অ্যালেক্সের দিকে ছুঁড়ে মারে। পানিসহ একুরিয়ামটি গিয়ে লাগে অ্যালেক্সের বাম বাহুতে। হাত থেকে ফাইল পড়ে যায়, সাথে একুরিয়ামের ভেতরের পানি তার গায়ে এসে ছিঁটকে লাগে। অ্যালেক্স চেঁচিয়ে ওঠে,
“জেডি?”

ততক্ষণে জেডি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে৷ দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। জ্ব’ল’জ্ব’ল করা সাদা চোখের মণি দু’টো অ্যালেক্সের পানে রেখে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“নামে হলেও আমি তোমার বড় ভাই অ্যালেক্স। তাই আমাকে সম্মান দাও।”
জেডিকে রা’গ’তে দেখে অ্যালেক্স বহুক’ষ্টে নিজেকে একটু শান্ত করে। চোখেমুখে অজস্র বিরক্তি। বলে,
“আরেকবার ভালোভাবে বলো, কি করতে হবে?”
জেডি অ্যালেক্সের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে গম্ভীর গলায় বলে,
“আমি মা’রা যাওয়ার পর, যেকেনো মূল্যে এভিকে জে’ল থেকে ছাড়িয়ে নিতে হবে।”
অ্যালেক্স ভ্রু কুঁচকে বলে,

“বুঝলাম না। তুমি মা’রা গেলে এভি কেনে জে’লে যাবে? তোমার মা’রা যাওয়ার সাথে তোমার বন্ধুর জে’লে যাওয়ার কানেকশনটা কোথায়?”
অ্যালেক্সের কথায় জেডি কিছু সময়ের জন্য একেবারে চুপ হয়ে যায়। এটুকু সময়ের মাঝেই ছেলেটার চোখদু’টো লাল হয়ে যায়। জেডি দু’বার শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“কারণ এভি হবে আমার খু’নি।”
জেডির কণ্ঠে কম্পন। অ্যালেক্স কিছু বলার জন্য মুখটা সামান্য ফাঁক করেছিল। জেডির কথা শুনে ছেলেটার মুখ থেকে না তো কোনো শব্দ বের হয়, আর না তো ফাঁক করা ঠোঁট দু’টো বন্ধ হয়। বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় জেডির দিকে। তার মনে হলো, কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে শক খেয়েছে। দ্রুত নিজেকে সামলে বিস্ময় কণ্ঠে বলে,

“তুমি কি আজ আমাকে জোক্স শোনাতে এখানে এসেছ? এমন হলে প্লিজ এখান থেকে যা……”
জেডির দৃষ্টি দেখে অ্যালেক্স তার কথার লাগাম টেনে নেয়৷ ঢোক গিলে বলে,
“না মানে….তোমার কথা ভিত্তিহীন লাগছে। তোমার বন্ধু এভি তোমাকে খু’ন করবে? ব্যাপারটা একটু বেশিই হাস্যকর হয়ে গেল না?”
জেডি মাথাটা দু’দিকে নাড়ালো বেশ কয়েকবার। ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলোও খানিক। জেডিকে হাসতে দেখে অ্যালেক্স বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“যদিও তোমার কথা আমার কাছে সত্যি মনে হচ্ছে না। তবে কথাগুলো যদি সত্যি হয়-ও, তবুও আমি তোমাদের দুই বন্ধুর মাঝে যেতে পারবো না।”

কথাটা শেষ হতে না হতেই জেডি ঝড়ের বেগে অ্যালেক্স এর কাছে এসে বা হাতে সর্বশক্তি দিয়ে অ্যালেক্সের গলা চেপে ধরে অ্যালেক্সকে দেয়ালে চেপে ধরে। বেচারা জেডির সৎ ভাই সামান্য উপরদিকে উঠে যায়। পা দু’টো ঝুলতে থাকে। চোখদু’টো বড় বড় হয়ে যায়। দু’হাতে জেডির হাত সরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু পারেনা৷
জেডি অ্যালেক্সের দিকে জ্ব’ল’ন্ত চোখে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আমি যখন বলেছি, এভিজানকে জে’ল থেকে ছাড়িয়ে নিতে হবে মানে ছাড়িয়ে নিতে হবে। কাজটির দায়িত্ব তোমাকে দিচ্ছি মানে এটা তোমাকেই করতে হবে। আমি আর কিছু শুনতে চাইনি। তাহলে তুমি এতো না না করছ কেন?”
অ্যালেক্স হাঁপানি রোগীর ন্যায় ফোঁসফোঁস করতে করতে বেঁধে আসা গলায় বলে,
“আর করবো না। আর করবো না। আমাকে ছেড়ে দাও।”

জেডি অ্যালেক্স এর অবস্থা খারাপ বুঝতে পেরে দ্রুত অ্যালেক্সকে ছেড়ে দেয়। জেডির হাত থেকে ছাড়া পেয়ে অ্যালেক্স সমানে হাঁপাতে থাকে। জেডি এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলে অ্যালেক্স ব্যস্ত হাতে গ্লাসটি নিয়ে একঢোকে এক গ্লাস পানি খেয়ে নেয়। সময় নিয়ে নিজেকে সামলে জেডির দিকে চেয়ে বলে,
“কি লাভ আমাকে ভ’য় দেখিয়ে? যেখানে তুমি আমার কিছুই করতে পারবে না!”
জেডি ভ্রু কুঁচকে বলে, “মানে?”

অ্যালেক্স শব্দ করে হেসে ফেললো। জেডিকে কিছুটা বিভ্রান্ত দেখা গেল। এক পর্যায়ে সে অ্যালেক্সের দিকে বেশ কিছুক্ষণ একধ্যানে চেয়ে রইল। নিজের উপর বিদ্রূপ হেসে অ্যালেক্সের উদ্দেশ্যে বলে,
“আমার দু’র্ব’ল’তা নিয়ে মজা লুটছ অ্যালেক্স?”
অ্যালেক্স হাসতে হাসতেই জেডির দিকে তাকিয়ে ইশারায় সম্মতি দেয়। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় নিজেকে সামলে বলে,

“তোমার জন্য আমার ভীষণ দুঃখ হয় জানো জে…স্যরি ভাই। তুমি সবার কথাই অনেক ভাবো বাট তোমার কথা ভাবার কেউ-ই নেই। আর এখন, এমন এক দিন আসতে যাচ্ছে যে তোমার প্রিয় বন্ধুই না-কি তোমাকে খু’ন করবে! আর তুমি তার জন্যই আবার আমার কাছে হেল্প চাইতে এসেছ। আফসোস!”
জেডি’র মুখটা মলিন হয়ে গেল। দৃষ্টি এলোমেলো করে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,
“এভিজানও আমাকে নিয়ে ভাবে। আমি তো ওকে আমায় মা’র’তে বাধ্য করছি। ওর কোনো দোষ থাকবে না।”
অ্যালেক্স ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কিছু বললে?”

জেডি নিজেকে সামলে নেয়। গলা ঝেড়ে অ্যালেক্সের উদ্দেশ্যে বলে,
“এভিজানকে জে’ল থেকে ছাড়িয়ে নিলে সাউথ ইস্ট ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং এর জায়গা তোমার হবে। অর্থাৎ আমি আমার এই পদ তোমার নিকট হস্তান্তর করে দিব।”
অ্যালেক্সের চোখমুখ চকচক করে ওঠে। জেডি তার পুরো ক্ষমতা তাকে দিয়ে দিবে? ভাবতেই ভীষণ ভালে লাগা কাজ করল। তবে সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না জেডির কথাগুলো। অতঃপর কৌতুক স্বরে বলে,
“ম’রা’র ক’ব’র থেকে তুমি তোমার ক্ষমতা আমাকে দিয়ে দিবে?”
জেডি রে’গে তাকায়। রূঢ় কণ্ঠে বলে,

“সেটা সময় বলবে। এভিজানকে জে’লে নিয়ে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ও যেন ওর বাড়ি পৌঁছে যায়। কাজটি করলে, সাউথ ইস্ট ইংল্যান্ডের মাফিয়া কিং তুমি অর্থাৎ ‘অ্যালেক্স ডাল্টন’ হবে। আর যদি কাজটি না কর, তবে সেটার ফলাফলও তুমি সময়মতো পেয়ে যাবে।”
কথাগুলো বলে জেডি বড় বড় পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে অ্যালেক্স বলে,
“তুমি এই কাজের জন্য আমাকে কেন টানছ?”
জেডি বিরক্তি কণ্ঠে বলে,
“কারণ তুমি একজন অভিজ্ঞ উকিল। মানুষকে জে’ল থেকে ছাড়িয়ে আনাই তোমার পেশা। মানুষের বা’ল ছিঁড়তে উকালতি করে বেড়ানো তো তোমার পেশা নয়, রাইট?”
জেডির কথা শুনে অ্যালেক্স চোখমুখ কুঁচকে নিল। জেডি কিছু একটা ভেবে থেমে যায়। উল্টো ঘুরে অ্যালেক্সের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে ডাকে,

“অ্যালেক্স?”
অ্যালেক্স চোখ তুলে তাকায় জেডির দিকে। জেডি বিদ্রূপ স্বরে বলে,
“জানি তোমার কাছে আমার দু’আনারও মূল্য নেই। তবুও বলছি, তুমি আমার শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করে দিও অ্যালেক্স। এভিজানকে প্রটেক্ট কর। আর…..ভালো থেকো।”
কথাগুলো বলে জেডি আর দাঁড়ালো না। উল্টো ঘুরে দ্রুত পায়ে ঘরটি প্রস্থান করতে চাইলো। অ্যালেক্স কেমন করে যেন তাকালো জেডির দিকে। জেডির শেষ কথাগুলো ভীষণ নরম শোনালো না? অ্যালেক্স এতক্ষণ মজার ছল ভাবলেও হঠাৎ জেডির উল্টো রূপ দেখে অ্যালেক্স বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। থেমে থেমে বলে,
“তুমি কি সত্যিই মা’রা যাবে ভাই?”
ততক্ষণে জেডি অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়েছে। অ্যালেক্সের কথা শুনতে পেয়ে সামান্য হাসলো। তবে আর পিছু ফিরলো না।

পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করে অ্যালেক্স আগের চেয়েও ছটফটিয়ে উঠল। সে জেডির সাথে তার প্রয়োজন ছাড়া কখনোই কথা বলত না। তবে জেডি তার খোঁজ-খবর প্রায়ই নিত। জেডি সেসব বুঝতে না দিলেও অ্যালেক্স বুঝতে পারতো। কিন্তু তার জেডির প্রতি কখনোই কোনো ফিলিংস কাজ করেনি। অথচ তাদের বাবা একটাই। সে এটাও জানতো, জেডি তার বাবাকে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে মে’রে’ছিল। কারণ ঘটনাটি তার চোখের সামনেই ঘটেছিল। জেডিকে সেদিন কাঁদতেও দেখেছিল। ভীষণ অসহায় দেখাচ্ছিল জেডিকে। কিন্তু তার মন কেন যেন গলেনি। ছোট থেকে মায়ের কথা শুনে শুনে জেডিকে নিজের শ’ত্রু ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। কিন্তু আজ হঠাৎ এমন কেন লাগছে? ক’দিন আগে জেডির বলা ‘ভালো থেকো’ শব্দটি বারবার তার কানে বাজছে। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, জেডি সত্যিই মা’রা গেছে। তার মানে জেডি সেদিন সব সত্যিই বলেছিল? তাকে ভালো থাকতে বলে গিয়েছিল, কারণ জেডি তো আর তাকে ভালো রাখতে পারবে না। কারণ সে মৃ’ত। জেডি আড়াল থেকে আর তার ভালো থাকার ব্যবস্থা করবে না? নামে শ’ত্রু হলেও কাজের বড় ভাই ছিল জেডি। সে আর নেই। এখন থেকে অ্যালেক্সকেই নিজের সব খেয়াল রাখতে হবে? কথাগুলো ভেবে অ্যালেক্স হাসফাস করে উঠল। দু’হাতে মাথার চুল টেনে অসহায় কণ্ঠে আওড়ায়,

“ভাই স্যরি!
একবার শ্বাস নিয়ে আবারো বলে,
“আমি তোমাকে আমার শ’ত্রু ভাবলেও কখনো তোমাকে মে’রে ফেলতে চাইনি। কিন্তু তোমার প্রিয় বন্ধু তোমাকে মে’রে ফেলেছে। আমি ওকে ছাড়বো না। আমি তোমাকে দেয়া কথা রাখতে পারবো না ভাই। আমার ক্ষমতা চাইনা। কিন্তু আমি আমার ভাইয়ের খু’নিকে শুধু জে’ল নয়, ফাঁসির ব্যবস্থা করে ছাড়বো।”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৮

তখনই জেডির বলা কথাটি অ্যালেক্সের কানে বেজে উঠল, ‘তুমি আমার শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করে দিও অ্যালেক্স। এভিজানকে প্রটেক্ট কর।’
অ্যালেক্স বেঁধে আসা গলায় আওড়ায়,
“তুমি এমন কেন ভাই? যে তোমাকে মে’রে ফেললো। তুমি তাকে প্রটেক্ট করার জন্যই এতো ব্যবস্থা করে গেলে?”

আমি তার সন্ধ্যামালতী পর্ব ২৯ (২)