Home আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ২৯+৩০+৩১

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ২৯+৩০+৩১

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ২৯+৩০+৩১
ফারজানা মনি

সময় চলছে তার নিজ গতিতে। দেখতে দেখতেই তানভীরের ছুটি ফুরিয়ে এলো। গতকাল রাতে তানভীর আর বন্যা বান্দরবান থেকে ফিরে এসেছে।
এখন সকাল আটটা বাজে। খান বাড়ির প্রতিটি সদস্য খাবার টেবিলের উপস্থিত। মালিহা খান , হালিমা খান ও আকলিমা খান সবাইকে খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছে। বন্যা ও সাথে টুকটাক সাহায্য করছে। মেঘও হাতে হাতে সাহায্য করতে চেয়েছিল। কিন্তু বন্যা ওকে জোর করে নাস্তার টেবিলে আবিরের পাশে বসিয়ে দিল । আজ থেকে তানভীরের অফিস খোলা। তাই তানভীর ও অফিসের জন্য একেবারে রেডি হয়েই নিচে নেমেছে। আলী আহমেদ খান, মোজাম্মেল খান ও ইকবাল খান টুকটাক ব্যবসার আলোচনা করছে আর খাচ্ছে।

আবির বারবার আর চোখে লক্ষ্য রাখছে মেঘ ঠিকমতো খাচ্ছে কিনা। যা মেঘের চোখের আড়াল হতে পারল না। মেঘ বুঝতে পেরে মনে না চাওয়া সত্ত্বেও পুরো খাবারটা শেষ করার চেষ্টা করছে। কারণ সে জানে এখন যদি সে পুরো খাবারটা শেষ না করে, তাহলে আবির রাগ করে নাস্তা না খেয়ে অফিসে চলে যাবে।
মিমের আজ কলেজ আছে। তাই সেও রেডি হয়ে নিচে নেমেছে। বন্যা সবাইকে খাবার দেওয়ার সময় খেয়াল করলো, মিম আর আদি চোখের ইশারায় ঝগড়া করছে।
বন্যা ওদের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে ঝগড়া বন্ধ করে খেয়ে নিতে বলল। এখানে সকল বয়োজৈষ্ঠরা আছে । বন্যার নিষেধাজ্ঞা শুনে দুজনেই শান্ত হয়ে খাওয়া শুরু করলো।
হঠাৎ ই ইকবাল খান আবিরের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো: আবির ড্রাইভার আজকে অসুস্থ তাই ছুটি নিয়েছে। তুই কি একটু মিম আদি কে তাদের স্কুল আর কলেজে পৌঁছে দিবি। আজ অফিসে একটু লেট করে গেলেও সমস্যা নেই। আমি সব সামলে নেব।
আবির: ইটস ওকে চাচ্চু… এত ফরমালিটি কেন করছ? আমি অফিসে যাওয়ার সময় ওদের নামিয়ে দিয়ে যাব।

ইকবাল খান: তাহলে আজ বাইক নিস না। গাড়ি নিয়ে অফিসে যাস।
আবির: ঠিক আছে চাচ্চু..
বলেই আবির বেছিংয়ে হাত ধুতে চলে গেল। আস্তে আস্তে তানভীর, আলী আহমেদ খান, মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান, আবির, মিম ও আদি সবাই চলে গেল।
বাড়িতে এখন শুধু মেঘ, বন্যা , মালিহা খান, হালিমা খান, আকলিমা খান ও দুইজন হেল্পিং হ্যান্ড। বন্যা আর মেঘ বান্দরবানের গল্প করায় ব্যস্ত।
বেলা যখন 11 টার কাটায়। বাড়িতে মেহমান এসেছে শুনেই মেঘ তড়িহড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। তা দেখে হালিমা খান চিৎকার করে বলে উঠলো “মেঘ আস্তে” .. মায়ের চিৎকার শুনে মেঘ থেমে গেল। আস্তে আস্তে নিচে নেমে আসলো । এসে দেখলো সোফায় মাহমুদা খান ও আরিফ বসে আছে।
হালিমা খান মেয়েকে ধমকের সুরে বলল: কিরে মেঘ… তোর জ্ঞান বুদ্ধি কবে হবে। তোকে কতবার বলি সিঁড়ি দিয়ে তাড়াহুড়া করে নামবী না। আস্তে ধীরে নামবি। তুই কোন কথাই শুনছিস না । এবার মনে হয় আবিরকে জানাতেই হবে।
মেঘ আবিরের কথা শুনে কিছুটা চুপসে গেল। কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল আম্মু … তুমিও আমায় আবির ভাইয়ের কথা বলে থ্রেট দিচ্ছ। মাহমুদা খান ভাতিজিকে কাছে টেনে সোফায় বসিয়ে আহাল্লাদী কন্ঠে বলল: ভাবি আমার ভাইজি কে একটুও বকবে না। তাহলে ভাইয়াকে বলে তোমাকে বাপের বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করব।

মাহমুদা খান মেঘকে খুব করে বুঝালো, এই সময় একটু বুঝে শুনে চলাফেরা করতে হয়। মেঘও সব বুঝেছে এমন ভাব করে বলল: ঠিক আছে,,,, ঠিক আছে,,,,
বলেই মাহমুদা খানের কাঁধে মাথা রাখলো। মাহমুদা খান মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বন্যা ও পাশে এসে বসে ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করছে।
মাহমুদা খানকে পাশে পেয়ে যেন বাড়ির মহিলারা সকলে আড্ডার আসর জমিয়ে বসেছে। সব মেয়েদের মাঝে আরিফ বসে বসে বোরিং ফিল করছিল। তাই সে উঠে ছাদের দিকে যাচ্ছে আর মনে মনে ভাবছে.. মিম কই তাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না তো। সিঁড়িতে দু কদম উঠেই হঠাৎ মালিহা খান কে আরিফ বলে উঠলো: বড় মামি আদি কি বাড়িতে নেই? মালিহা খান একটু হেসে জবাব দিল: না বাবা.. মিম আর আদি তাদের নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেছে।
আরিফ সবাইকে শান্তভাবে এক নজর দেখে ছাদে চলে গেল।
মাহমুদা খান মালিহা খানের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো: ভাবি..

আমি কিন্তু আজ অন্য এক কারণে এসেছি। মালিহা খান জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো। তখনই মাহমুদা খান বলল, ভাবি… আগামী শুক্রবার তোমাদের সবাইকে আমার বাড়িতে দাওয়াত। আর মেঘ ,বন্যা , মীমকে আমি আজকেই আমার সাথে নিয়ে যাব। প্লিজ তুমি কোন আপত্তি করো না।
মালিহা খান ,হালিমা খান ও আকলিমা খান মাহমুদা খানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো। মালিহা খান বলল, দেখো বোন…. তোমার ভাইজানেরা এখন বাড়িতে নেই। আমি একা তো কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না। আর রইল কথা মেঘ ,বন্যা , মিমের। আমার যতদূর মনে হয় আবির মেঘকে এই সময় কিছুতেই একা ছাড়বে না। বলেই মালিহা খান থামল।
মাহমুদা খান মুখে হাসি টেনে বলল: আবিরের সাথে আমি কথা বলে নেব, প্রয়োজনে আবির সেখান থেকেই কয়েকটা দিন অফিসে যাবে।
হঠাৎই মেঘের ফোনে কল বেজে উঠলো। সবার ধ্যানমগ্ন হয়ে দৃষ্টি গেল মেঘের ফোনের দিকে। দেখল আবির কল দিয়েছে।

মেঘ সবার মাঝখান থেকে উঠে গিয়ে সাইডে দাঁড়িয়ে ফোনটা রিসিভ করল।
মেঘ: হ্যালো
আবির: তোমায় কতবার বলবো.. ফোন ধরে আগে সালাম দিবে।
মেঘ: সরি.. আসসালামুয়ালাইকুম।
আবির: ওয়ালাইকুম আসসালাম। কি করছো?
মেঘ: বসে আছি সবাই একসাথে..
আবির: এই সময় সবাই একসাথে!!
মেঘ: হুম.. ফুপ্পি আর আরিফ এসেছে।
আবির: ফুপ্পি এসেছে?? কই আমাকে আগে কিছু জানালো না তো, যে আজকে আসবে আমাদের বাড়িতে। কোন সমস্যা? আমি কি আসবো?
মেঘ আবিরের চিন্তিত অবস্থা বুঝতে পেরে । আশ্বাস দিয়ে বলল: চিন্তা করবেন না। কোন সমস্যা নেই। ফুপ্পি আমাদের সবাইকে শুক্রবারের দাওয়াত করতে এসেছে। ফুপ্পি চায় আমি, বন্যা আর মিম আজকেই তার সাথে চলে যাই।

কথাটা শুনে আবির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল: আম্মু কি বলেছে?
মেঘ বলল: বড়আম্মু বলেছে আপনি আমাকে এই সময় একা ছাড়বেন না।
আবির: ওহ আচ্ছা… ফুপ্পি কে বলো, বিকেলে বাড়ি ফিরতে । আমি তাড়াতাড়ি অফিস থেকে চলে আসব। আর আরিফকে বলবে দুপুরে মিমকে যেন তার কলেজ থেকে আনতে যায়। ড্রাইভার আঙ্কেল বিকেলে ও আসবে না । আর আমি যেহেতু একেবারে ফিরব ,তাই দুপুরে আর বের হতে পারছি না।
মেঘ: ঠিক আছে।
আবির একটু তাড়াহুড়ো করে বলল : শোনো…
মেঘ: হুম।
আবির: শরীর ঠিক আছে এখন?
মেঘ: হুম।
আবির: আচ্ছা ঠিক আছে। আমি রাখছি।
মেঘ: হুম।
মেঘ ফোনটা কেটে মাহমুদা খানের কাছে গিয়ে বসে বলল: ফুপ্পি… আবির ভাই বলেছে তোমাকে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরতে। উনি আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে আসবে।
মাহমুদা খান স্মিত হাসলো, বলল ঠিক আছে। বাঁদরটাকে বলিস যেন একটু তাড়াতাড়ি আসে।
এ পর্যায়ে বন্যা, মালিহা খান, হালিমা খান ও আকলিমা খানও হেসে দিল।

মেঘ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। আরিফ সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামছে। তাকে দেখেই মেঘের আবিরের বলা কথাটা মনে পড়ল। মেঘ বসা থেকে উঠে আরিফের দিকে তাকিয়ে বলল: আরিফ.. তুমি একটু কষ্ট করে মিমকে কলেজ থেকে আনতে যাবে? ড্রাইভার আঙ্কেল অসুস্থ। তোমার ভাইয়া একটু ব্যস্ত আছে, তাই দুপুরে যেতে পারবে না।
আরিফ ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে বলল, ঠিক আছে ভাবি.. আমি যাব।
আরিফ যে মনে মনে কতটা খুশি হয়েছে তা হয়তো মেঘের অজানাই রয়ে গেল। আরিফের মুখে ফুটে উঠলো এক রহস্য ময় হাসি।
ইতিমধ্যেই বাড়ির মেইডরা তাদের সবার সামনে চা নাস্তা দিয়ে গেছে। চা খেতে যেতে আড্ডাটা বেশ জমেছে। তাই মালিহা খান রান্নাঘরের সকল দায়িত্ব মেইডদের বুঝিয়ে দিয়ে বলল: শোনো, যে যা খাবে বলে দিয়েছি । সে অনুযায়ী রান্না করো। আর আবিরের আব্বুর রান্না আমি একটু পর এসে করবো।

দুপুর দুইটা বাজে। মিম কলেজের গেটের সামনে অপেক্ষা করছে। বাড়ির গাড়ি কোথাও সে দেখতে পাচ্ছে না। মনে মনে ভাবছে, ড্রাইভার আংকেল যদি নাও আসে তাহলে ভাইয়া তো অবশ্যই আসবে। আমি আর একটু অপেক্ষা করি। হঠাৎ একটা ইটের কনা এসে মিমের পিছনে কাঁধে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গেই পেছনে তাকিয়ে দেখল তেমন কেউ নেই। স্টুডেন্টরা যার যার মত বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। মিম আবারও সামনের দিকে তাকিয়ে বাড়ির গাড়ির অপেক্ষায় করছে।
কিন্তু একি! আবারো আরেকটা কনা এসে গায়ে লাগলো। এবার মিম একটা রাগী রাগী লুক নিয়ে পেছনে তাকালো। কিন্তু এবারও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
হঠাৎই বুঝতে পারল কেউ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পাশে তাকিয়েই সে বিষ্ময়ে হতভম্ব।
মিম কাপা কাপা কন্ঠে বলে উঠলো: আ.. আ.. আপনি?
আরিফ মুচকি হাসল বলল: হুম.. আমি। ভয় পেয়েছো?
মিম তোতলাতে তোতলাতে বলল: ভ.. ভ.. ভয়ের কি আছে। আপনি এখানে কি করছেন?
আরিফ আবারো হাসলো। বলল: কেন আমাকে দেখে খুশি হওনি?

মিম: না মানে তেমন কিছু না।
আরিফ: তাহলে কেমন কিছু?
মিম বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল: কোন কিছুই না… আপনি আপনার কাজে যান। আমি এখন বাড়িতে যাব।
আরিফ: ওহ.. তাই বুঝি?
মিম : হুম তাই।
আরিফ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেখা টেনে বলল: ঠিক আছে যাও তাহলে…
মিম সেখান থেকে একটু সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে আবার দাঁড়ালো । মূলত সে আবির বা তানভীরের অপেক্ষা করছে।
হঠাৎ আরিফ পিছন থেকে বলে উঠলো, কি হলো বাড়িতে যাবে না?
মিম রাগে কটমট করতে করতে বলল : সেটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না আপনি যেখানে যাওয়ার সেখানে যান।

আরিফ এবার হ্রাসবারি কন্ঠে বলে উঠলো, কিন্তু তোমার আর আমার গন্তব্য যে এক।
মিম কিছু বুঝতে না পেরে আরিফের মুখের পানে তাকিয়ে আছে। কি বলছে এসব পাগলটা। আস্ত একটা সাইকো। আল্লাহ এত বড় একটা কাজিন হঠাৎ করে অবতরণ করছো। আমার উপর একটা ভালো কাজিন ও তো ফালাইতে পারতা।
হঠাৎ মীমের ভাবনায় বিচ্ছেদ ঘটিয়ে আরিফ বলল: ভাবনা চিন্তা রেখে এবার বাইকে ওঠেন।
মিম তাকিয়ে দেখল, আরিফ আবিরের বাইকটিতে বসে আছে।
মিম বলে উঠলো: আপনি আবির ভাইয়ের বাইক কেন এনেছেন?
আরিফের শান্ত জবাব, তোমাকে বাড়ি নিতে।
মিম: আপনাকে কে বলেছে আমাকে নিতে আসতে।
আরিফ: তোমার আবির ভাইয়া।
মিম: আমি আপনার সাথে যাব না।
আরিফ: তাহলে রাস্তায় ই পড়ে থাকো। আমি যাচ্ছি।

হঠাৎ আরিফের ফোনটা বেজে উঠলো। আকলিমা খান ফোনের ওইপাশ থেকে আরিফ কে জিজ্ঞাসা করছে মীমকে পেয়েছে কিনা।
আরিফ বিচারের সুরে বলল: ছোট মামী… তোমার মেয়ে আমার সাথে বাড়ি ফিরবে না। সে দাঁড়িয়ে আছে।
আকলিমা খান: বাবা.. এটা ওর কাছে দাও তো।
আরিফ ফোনটা মিমের দিকে এগিয়ে দিয়ে ফিশফিশিয়ে বলল, শাশুড়ি আম্মা কথা বলবে। মিম রাগী একটা লুক দিয়ে আরিফের হাত থেকে ছো মেরে ফোনটা নিয়ে নিল।
মিম: হ্যালো আম্মু..

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ২৬+২৭+২৮

আকলিমা খান: কিরে.. তোর সমস্যা কি? আরিফের সাথে বাড়ি কেন ফিরছিস না।
মিম আমতা আমতা করে বলল: না.. মানে.. আম্মু..
আকলিমা খান মীমের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলল, চুপচাপ আরিফের সাথে বাড়ি ফিরে আয়। আমি রাখছি।
মিম রাগী রাগী দৃষ্টিতে আরিফের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বাইকের পিছনে গিয়ে বসলো।

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৩২+৩৩+৩৪