আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ১১+১২+১৩
ফারজানা মনি
মিম বন্যার লাগেজ আনার জন্য দরজার দিকে যেতে শক্তপুক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা খেলো। চোখ তুলে উপরে তাকিয়ে দেখলো সামনে লাগেজ সাথে আরিফ দাঁড়িয়ে আছে । তার অভিব্যক্তি শান্ত। মনে হচ্ছে আরিফ আগেই জানত মিমের সাথে ধাক্কা লাগবে। তাই সে চমকায়নি কিন্তু মিম আকষ্মিক ঘটনায় কিছুটা ভরকে গেছে। নিজেকে ঠিক করে বলল: আমাকে দিন।
আরিফ: কেন? আমার কি ভিতরে আসা বারণ?
মিম: না.. আসলে তেমন কিছু না ভিতরে আসুন।
আরিফ ভিতর আসতে আসতে বললো: ভাবী… আপনাকে ভাই খুব মিস করছে। বলেছে একটা কল দিতে, বন্যা কিছুটা লাজুক আসলো। সেটা দেখে মিমও ঠোট টিপে হাসছে। তৎক্ষণাৎ বন্যার মনে পরল ফোনটা তো মেঘের কাছে। বন্যা বলল: আপনার ভাইকে বলুন আমার কাছে ফোন নেই। সেটা মেঘের কাছে।
আরিফ বললে: ঠিক আছে আমি ভাইকে বলে দেবো। এখন যাচ্ছি। রুমটা সুন্দর… আমি কিন্তু আবার আসবো।
মিম কিছুটা রাগ নিয়ে কট করে তাকিয়ে আছে। আর বলছে রুমটা মনে হয় তার।
আরিফ যেতে যেতে আস্তে করে বলে উঠলো: রুমের মানুষটা তো আমার।
মেঘ : আবির ভাই… আপনি কেন বন্যার
ফোনটা আনতে বলেছেন?
আবির : তোকে এত কিছু বুঝতে হবে না…ফোনটা তোর কাছে রেখে দে।
মেঘ: আপনি এখন আর আমায় ভালোবাসেন না আমি যাই বলি সেটার সোজা উত্তর দেন না।
আবির ল্যাপটপে অফিসের কাজ করছিল।
সেটা রেখে মেঘের দিকে ফিরে তাকালো।
বলল: সামনে এসো, আমার কাছে এসো…
মেঘ ভদ্র মেয়ের মতো আবিরের এক কথায় বিছানায় উঠে আবিরের মুখোমুখি বসলো।
আবির:ম্যাম… আর কতবার, কতভাবে বললে আপনি বুঝবেন…
আপনাকে ছাড়া আমি নিঃস আপনাকে ছাড়া এই আবিরের কোনো অস্তিত্ব নেই এই পৃথিবীতে। আবির মেঘের মুখটাকে সামনে রেখে নেশাক্ত কণ্ঠে বললো : মেঘ…তুমি নিজেও জানো না যে তুমি এক ভয়ঙ্কর নেশা..আর যে নেশায় আমি আসক্ত। মেঘের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবালো। মেঘের চোখের কোন বেয়ে পানি পড়ছে।
আবির ভাই তাকে কত ভালোবাসে….মেঘ বুঝতে পেরেছে। আজ অজান্তে আবির ভাইকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে সে। হঠাৎ আবিরের পিঠ খামচে ধরে আবিরকে সমর্থন করলো। তার স্প্যারো সমর্থন বুঝতে পেরে কোমর পেঁচিয়ে ধরে আরেকটু সামনে আনলো। মুখ ডুবালো তার প্রিয়তমার ঘাড়ে , গলায় দুজন হারিয়ে গেল অন্য এক সুখ নদে।
সকালবেলা বাড়ির সবাই নানান কাজে ব্যস্ত। আজ বৌভাত… কিন্তু তানভীর চুপচাপ সোফার এক কোণে মুখ ভার করে আবিরের পাশে বসে আছে। আবিরের সাথে নীরব যুদ্ধ চলছে। তার যুদ্ধের টপিক” বন্যার ফোন কেন আবির নিয়ে রাখলো “।
কাল সারারাত তানভীর ছটফট করেছে বন্যাকে এক নজর দেখার জন্য। কিন্তু কিভাবে তা জানাবে?
বন্যার ফোনটা তো আবির মেঘকে দিয়ে রেখেছে। আবির মিটি মিটি হাসছে। সব বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করে বসে আছে। হঠাৎ চোখ গেল সিঁড়িতে,, কলাপাতা রং এর একটা শাড়ি পড়ে বন্যা ওপর থেকে নামছে সাথে মেঘ আর মিম । হঠাৎ করেই বুকের মাঝে একটা প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গেল। তানভীরের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
বাড়িতে অনেক মেহমান। মালিহা খান, হালিমা খান, আকলিমা খান, সবাইকে আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত। মেঘও মাঝে মাঝে কিছু কাজ করেছে। হঠাৎই মনে হলো তার মাথাটা কিছুটা ঘুরছে। অবশ্য আজকাল মাঝে মাঝেই এমনটা হয়। মেঘ ডাইনিং টেবিলে বসে এক গ্লাস পানি নিতে চাইল। কিন্তু তখনই বিকট শব্দে কাঁচের গ্লাসটা নিচে পড়ে ভেঙ্গে গেল।
আকষ্মিক ঘটনায় কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেঘ ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল। মিম চিৎকার করে
বলল : মেঘ আপু….
আবির দৌড়ে এলো। বলল: মেঘ… এই মেঘ…
তোমার কী হয়েছে?
চোখ খোলো… মালিহা খান হালিমা খান পানি নিয়ে ছুটে আসলো। আবির সেই পানি মেঘের চোখে মুখে ছিটিয়ে দিল। তানভীর তখনই ডক্টরকে কল দিয়ে আসতে বলল। আবির মেঘকে কোলে তুলে তার রুমে নিয়ে শুইয়ে দিল। মেঘ শান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু আবির ছটফট করে পুরো রুমে পাইচারি করছে আর ভাবছে ডক্টর আসতে কেন লেট হচ্ছে? মেঘের কিছু হবে না তো??? ভাবতেই আবিরের হাত-পা শীতল হয়ে আসছে। আলি আহমেদ খান ও মোজাম্মেল খান তানভীর কে ধমকাচ্ছে। সে ডক্টরকে আবার কেন কল দিচ্ছে না? তখন মাহমুদা খাঁন, আকলিমা খাঁন মেঘের হাত পায়ে তেল মালিশ করছে। কোন সাড়াশব্দ নেই। তখনই আরিফ বাহির থেকে বলল: আবির ভাইয়া..
ডক্টর এসেছে ভিতরে নিয়ে আসব?
আবির: হুম আয়।
ডক্টর ভিতরে এসে সবার উদ্দেশ্যে বলল আপনারা প্লিজ রুম টাকে খালি করুন।
এত মানুষের ভিড় রোগীকে আরো অসুস্থ করে তুলবে!
প্রায় ১০মিনিটের মতো হয়ে গেছে। রুমের বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে। আবির টেনসনে ধপ করে বাইরের চেয়ারে বসে পরেছে।
হালিমা খান, মালিহা খান আহাজারি করছে,, মেয়েটার কি হলো।
সকালেই তো ভালো ছিল।
তানভীর আবিরকে সান্তনা দেওয়ার কোনো ভাষা খুজে পাচ্ছে না। ইকবাল খান আবিরের পাশে দাড়িয়ে, কাঁধে হাত রেখে বলল: চিন্তা করিস না.. কিছু হবে না…
তখনি সবার উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে ডক্টর বাইরে এসে বলল: মিস্টার খান… বাড়িতে নতুন মেহমান আসছে মিষ্টি মুখ করাবেন না? আলি আহমেদ খান নিশ্চুপ,,, খুশিতে তার যেন ভাষা হারিয়ে গেছে। সে খুশিতে মোজাম্মেল খানকে জড়িয়ে ধরল। কাপা কাপা কণ্ঠে বলল : ভাই.. তুই শুনতে পাচ্ছিস, আমাদের ঘরে নতুন মেহমান আসছে। আমার আবির বাবা হবে। আমার মেঘ মামুনির কোলে ছোট্ট দাদু খেলা করবে।তারপর আলি আহমেদ খান জোড়ে চেঁচিয়ে বলল: তোমরা জলদি মিষ্টির ব্যবস্থা করো।
আমি আজকে পুরো মহল্লাকে মিষ্টি মুখ করাবো। তারপর ডক্টর কে জড়িয়ে ধরে বলল: আজ মিষ্টি না খাইয়ে তোকে যেতে দিচ্ছি না। আবির অবাকের চরম পর্যায়ে। শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে সবার দিকে। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, তার ছোট্ট মেঘের কোলে তার ছোট্ট আহিয়া আসবে। তানভীর আবিরকে জড়িয়ে ধরলো,
কংগ্রাচুলেশন ভাইয়া….
অবশেষে তুমি আমায় মামা বানিয়েই দিলে।
কিন্তু ছোট্ট পরি আমায় কী বলে ডাকবে…
মামা নাকি চাচ্চু??
আবির হাসলো, হঠাৎ মেঘের কথা মনে হতেই আবির ভেতরে গেল। মেঘ একপাশ হয়ে শুয়ে আছে। কাপা কাপা হাতে মেঘের মাথায় স্পর্শ করে বলল: মেঘ তুই কী আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস.. আমি বাবা হতে চলেছি… আমার আহিয়া আসছে!
মেঘ ঘুমাচ্ছে। তার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। তাই আবির আর সেখানে না বসে বাহিরে চলে গেলো। ইতিমধ্যে মেহমানরা চলে গেছে। বন্যার বাড়ির লোক মাত্রই গেলো। তানভীর তাঁদের এগিয়ে দিতে গিয়েছে।খান বাড়ির প্রতিটা লোক আজ খুশি। মেঘ তাঁদের অনেক আদরের মেয়ে। এক সময়ের দৌড়ে, ছুটে বেড়ানো মেয়েটাও আজ মা হবে, ভাবতেই খুশিতে মনটা ভরে যায়।
আবির রাকিবকে ফোন দিয়ে তার ছেলে ও রিয়ার খোঁজ খবর নিলো। অবশেষে মেঘের অসুস্থতার কথাও জানালো। রাকিব তো মহা খুশি, রাকিবের হাত থেকে জান্নাত ফোন টা কেরে নিয়ে বললো: ভাইয়া.. আমরা কিন্তু আবারো একটা ট্রিট পাওনা রইলাম। আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না যে, আমরা ঠিক কতটা খুশি হয়েছি। মেঘ কোথায়? ওর সাথে একটু কথা বলা যাবে??
আবির : আসলে ওর শরীর টা অনেক দুর্বল।
তাই ডক্টর ওকে অল্প ডোজ এর স্লিপিং পিন দিয়েছে। গত 2 ঘন্টা যাবৎ মেডাম ঘুমোচ্ছে।
জান্নাত : ও আচ্ছা..
আমি তো এখন হাসপাতাল এ আছি আগামীকাল রিয়া ভাবীকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর দেখা করতে যাব।
আবির : ঠিক আছে তুমি সময় করে এসো।
এখন রাখছি।
সন্ধ্যা ৭টা বাজে। মেঘ আস্তে আস্তে চোখ খুললো। শরীর টা অনেক দুর্বল মনে হচ্ছে।
ভাবছে হঠাৎ করে এমন মাথা ঘুরছে কেন।
আমার কি কোন বড় রোগ হল। বন্যার ডাকে মেঘের ভাবনার সমাপ্তি ঘটলো।
বন্যা: ননদিনি এখন কেমন আছিস?
মেঘ: বেবি তুই… ভালো আছি। শুধু শরীর টা একটু দুর্বল। ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
বন্যা:তুই কতদিন হলো অসুস্থ?মেঘ: বেশি না ১০-১৫ দিন হলো শরীর টা বেশ দুর্বল। মাথা টা বেশ ঘুরায়।
বন্যা : আবির ভাইয়া কে জানিয়েছিলি?
মেঘ: নাহ.. জানানো হয় নি
বন্যা: ওহ
হঠাৎ আবির রুমে এসে বন্যাকে দেখে বললো : তোমরা গল্প করো আমি পরে আসছি।
বন্যা উঠে দাঁড়িয়ে বললো :না ভাইয়া.. আমাদের কথা বলা শেষ, আমি চলে যাচ্ছি। আপনি প্লিজ ভিতরে আসুন। বলেই বন্যা মিমের রুমের দিকে ছুটলো।
আবির কিছুটা রাগের লুক নিয়ে মেঘ এর দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ: ভয়ে ভয়ে বললো আমার তো কিছু হয় নি। আমি সুস্থ আছি। কাজের চাপ এ মাথা টা একটু ঘুরে গিয়েছিলো।
আবির কিছুটা শক্ত কণ্ঠে বললো : এইদিকে আয়… মেঘ কাপা কাপা পায়ে বিছানা থেকে নেমে আবিরের সামনে দাঁড়ালো। মেঘ ভয়ে মনে মনে আউড়াচ্ছে, আল্লাহ.. আজ আমি শেষ… বিয়ের পর প্রথম থাপ্পড় টা মনেহয় আজকেই খাবো। আল্লাহ গো…. বাঁচাও…..
হঠাৎ আবির মেঘ কে কোলে তুলে নিলো। তা দেখে মেঘ তো আশ্চর্যের চরম পর্যায়। এটা কি হলো??
আবির মেঘকে ঘুরাচ্ছে আর বলছে, মেঘ তুই জানিস না আজ আমি কতটা খুশি। মনে হচ্ছে আকাশ এর চাঁদ বাড়িতে নেমে এসেছে। তুই নিজেও জানিস না তুই আমাকে কি দিয়েছিস।
মেঘ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো তারপর
বললো : আমাকে প্লিজ নামান, আমি পরে যাবো। আমার মাথাটা আরো বেশি ঘুরছে। কিন্তু আবির যেন আজ খুশিতে পাগল প্রায়।
মেঘ বললো: পাগলামি না করে প্লিজ বলবেন কি হয়েছে?
আবির: আহিয়ার আম্মু অবশেষে আমাদের আহিয়া আসছে।মেঘ এ কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে যেন বিস্বাস করতে পারছে না তারপর আবার বললো: কি বললেন? আর একবার বলুন না প্লিজ, আবির মেঘ এর কানে ফিশফিস করে বললো আমাদের আহিয়া আসার সময় হয়ে গেছে। নিজের যত্ন নিয়ো প্লিজ।মেঘের চোখ টলমল করছে নোনা জলে। এটা কোনো কষ্টের কান্না নয়। কোনো বিষাদ ভরা কান্না নয়। এটা হলো সুখের কান্না। মা হওয়ার আনন্দের কান্না। মেঘ কাঁদতে কাঁদতে আবিরকে জড়িয়ে ধরলো। আবিরের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে: সত্যি আমাদের আহিয়া আসছে? আমি মা হবো? আবির মাথা নেড়ে সেই চিরচেনা সুরে বললো: হুম স্পেরো,
মেঘ আবিরকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রাখলো। ভালোবাসার পূর্ণতার মাঝে যতটুকু অপূর্ণতা ছিল তাও আজ পূর্ন হলো । জীবন থেকে আর কিছু চাওয়ার নেই।
আবির মেঘকে রেস্ট করার জন্য সুয়িয়ে দিতে চাইলো কিন্তু মেঘ বললো: আপনি কি ভুলে গেছেন আজ ভাইয়া আর বেবির বাসর রাত??
আবির : নাহ ভুলিনি, আমাকে এখন কি করতে হবে মেডাম…
মেঘ: আপনাকে কিছু করতে হবে না। আমি এখন সুস্থ আছি। আমি সব করে নিবো।
আবির মেঘের দিকে শান্ত হুমকি ছুড়ে বললো : বিছানা থেকে যদি এক পাও নামেন, তাহলে আপনার পা ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দিবো..
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮+৯+১০
মাইন্ড ইট.
মেঘ ঠোঁট ফুলিয়ে বসে আছে। আবির মেঘের ফোলা ঠোঁটে চুমু একে দিয়ে বললো: এক শর্তে যেতে পারবি। আমি সব সাজাবো, তুই শুধু পাশে বসে থাকবি।
মেঘ ভেংচি কেটে বললো ঠিক আছে.. ঠিক আছে!
