Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩১

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩১

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩১
সাবিলা সাবি

অ্যাশফোর্ড রয়্যাল প্যালেসের বিশাল দরজাটা পেছনে ফেলে বেরিয়ে এলো দানিয়েল।
প্যালেসের সোনালি আলো ধীরে ধীরে পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছে। অথচ তার মুখে সেই প্যালেসের কোনো ছাপ নেই। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে তার বিয়ে নিয়ে আলোচনা চলছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না অন্ধকারের সম্রাট।
কালো কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সে। প্যালেসের বাইরে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল কালো গাড়ির সারি।
দানিয়েল গাড়ির সামনে এসে থামতেই একজন লোক দ্রুত এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিল।

“বস।”
দানিয়েল কোনো উত্তর না দিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। গাড়িটা চলতে শুরু করল।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর পাশে বসা তার বিশ্বস্ত সহযোগী ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “মেক্সিকোর ডিলটার ব্যাপারে সব প্রস্তুত।”
দানিয়েল ফাইলটার দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল —“কখন?”
“আজ রাতেই। ওরা অপেক্ষা করছে।”
ল্যাভেন্ডার চোখজোড়া ধীরে ধীরে ফাইলের ওপর নেমে এলো।
“কোনো সমস্যা?”
“একটা বিষয় আছে।”
দানিয়েলের দৃষ্টি এবার লোকটার দিকে ঘুরে তাকালো।
লোকটা সামান্য ইতস্তত করে বলল, “মেক্সিকোর পক্ষটা শেষ মুহূর্তে কিছু শর্ত পরিবর্তন করেছে।”
ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল আন্ডারওয়ার্ল্ডের ফ্যান্টম কিংয়ের।

“ওরা শর্ত পরিবর্তন করেছে?”
“জি।”
“তাহলে ওদের বলো, আমি শর্ত শুনতে যাচ্ছি না। ডিল করতে যাচ্ছি।”
লোকটা মাথা নাড়ল।
“বুঝেছি, বস।”
দানিয়েল আবার জানালার বাইরে তাকাল।
দুবাইয়ের রয়্যাল প্যালেস পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
তার সামনে এখন আর কোনো রাজকন্যা নেই। নেই বিয়ের প্রস্তাব, রাজপরিবারের রাজনৈতিক সমীকরণ কিংবা অতীতের স্মৃতিতে ডুবে থাকার সময়।
সামনে শুধুই কাজ। কারণ অন্ধকারের সাম্রাজ্য আবেগের জন্য থেমে থাকে না। তার একটা বিশাল ডিল মেক্সিকোতে অপেক্ষা করছে। আর সেই ডিলটা কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক চুক্তি নয়।

এই চুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য, কয়েকটি শক্তিশালী আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক এবং এমন কিছু মানুষ, যারা ভুলে গেছে—ফ্যান্টম কিং-এর সঙ্গে চুক্তি করলে তার নিয়মেই করতে হয়।
শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেছনে পড়ে গেল। দানিয়েল জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
তবু হঠাৎ আবার হিয়ার মুখটা মনে পড়ে গেল। দানিয়েল চোখটা বন্ধ করল। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপর আবার চোখ খুলতেই মুখটা আগের মতো কঠিন হয়ে গেল। আজ এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই।
মেক্সিকোতে তার একটা বড় ডিল অপেক্ষা করছে।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল ব্যক্তিগত এয়ারস্ট্রিপে।
সামনেই দাঁড়িয়ে আছে কালো রঙের ব্যক্তিগত জেট। পাশে তার কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগী অপেক্ষা করছে।
দানিয়েল গাড়ি থেকে নেমে জেটের দিকে এগিয়ে গেল।
একজন সহযোগী তার হাতে ফাইল বাড়িয়ে দিল।
“সব প্রস্তুত। মেক্সিকোর লোকেশন আর ডিলের সব ডিটেইলস ভেতরে আছে।”
দানিয়েল ফাইলটা হাতে নিয়ে একবার খুলে দেখল।

“ওরা সময়মতো থাকবে?”
“থাকার কথা।”
ফাইল বন্ধ করে সে বলল, “থাকার কথা না। থাকবে।”
সহযোগী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। দানিয়েল জেটের সিঁড়িতে পা রাখল। কয়েক মুহূর্ত পর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ইঞ্জিনের শব্দ ধীরে ধীরে তীব্র হলো। তারপর রানওয়ে ছেড়ে আকাশে উঠে গেল জেটটি। নিচে পড়ে রইল রয়্যাল প্যালেস, রাজপরিবার আর সেই সম্পর্কের প্রস্তাব—যেটাকে দানিয়েল কয়েক ঘন্টা আগেই নিজের জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
সামনে এখন শুধু মেক্সিকো।একটা বড় ডিল।
আর সেই ডিলের আড়ালে অপেক্ষা করে থাকা অন্ধকার হিসাব। দানিয়েল সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মুখের সমস্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি মুছে গেল। ফিরে এলো সেই পরিচিত শীতলতা। কারণ মেক্সিকোর মাটিতে নামার পর সে আর রাজপরিবারের ছেলে হয়ে থাকবে না। সে হবে—ফ্যান্টম কিং।

অবশেষে দুদিন কেটে গেছে।
সকালের আলো তখন ধীরে ধীরে হায়াস ম্যানশনের বিশাল জানালাগুলো পেরিয়ে ড্রয়িংরুমের মেঝেতে এসে পড়ছে। বাড়ির ভেতর স্বাভাবিক দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেলেও ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা ছিল বেশ শান্ত। সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল রুদ্রনীল। ব্যবসায়িক কিছু নথি একের পর এক যাচাই করতে করতে কখন যে সময় এগিয়ে গেছে, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই ছিল না।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো লিওন।
পরিপাটি পোশাকে আজও সেই পরিচিত কঠোরতা তার পুরো ব্যক্তিত্বজুড়ে। তবে আজ তার চেহারায় অন্যরকম একটা স্বাভাবিকতা ছিল। নিচে এসে রুদ্রনীলের বিপরীত পাশের সোফায় গিয়ে বসল সে।
একজন সার্ভেন্টকে ডেকে বলল, “এক কাপ চা দাও।”
“জি, স্যার।”
সার্ভেন্ট চলে যাওয়ার পর লিওন একবার নিজের হাতের দিকে তাকাল। কি একটা মনে করেই আজ সে ঘড়িটা পরেই নিচে নেমেছে।
হিয়ার দেওয়া সেই ঘড়িটা।

ডায়ালের মধ্যে বসানো নীলাভ পাথরটা সকালের আলোয় এমনভাবে ঝলমল করছিল যে দূর থেকেও যার দীপ্তি চোখে পড়র মতোই।কবজি সামান্য নড়তেই ডায়াল থেকে নীলাভ আলোর এক ঝলক প্রতিফলিত হলো। সেই ঝিলিকটাই রুদ্রনীলের চোখে গিয়ে আটকাল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চলতে থাকা কাজ থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা না বলে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে ল্যাপটপটা বন্ধ করে লিওনের দিকে তাকাল।
“লিওনার্দো।”
লিওন চোখ তুলে তাকাল।“হুম, ব্রো?”
রুদ্রনীলের দৃষ্টি আবার তার কবজির দিকে চলে গেল।
“এই ঘড়িটা কোথা থেকে পেলে?”
প্রশ্নটা শুনে লিওন নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “একজন ফ্রেন্ড বার্থডেতে
গিফট করেছে।”

“ফ্রেন্ড?”
“হ্যাঁ।”
রুদ্রনীল এবার আরেকটু মনোযোগ দিয়ে ঘড়িটা দেখতে লাগল। তার চোখের দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে বিস্ময়ের সঙ্গে অন্য এক অনুভূতি এসে মিশল।
“কেমন ফ্রেন্ড? যে তোমাকে এমন একটা ঘড়ি গিফট করলো?”
লিওন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো । “কেন? ঘড়িটা এমন কী?”
রুদ্রনীল এবার সরাসরি বলল, “কারণ এর ডায়ালে ব্লু স্টার ডায়মন্ড ব্যবহার করা হয়েছে।”
কথাটা শুনে লিওন কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইল।
তারপর নিজের কবজির দিকে তাকিয়ে আবার রুদ্রনীলের দিকে তাকিয়ে বললো “ব্লু স্টার ডায়মন্ড?”
“হ্যাঁ।” রুদ্রনীল ছোট করে জবাব দিলো।
“আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, ব্রো।”
রুদ্রনীল মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, “আমার জুয়েলারি বিজনেস আছে, লিওন। এই জিনিসটা চিনতে আমার ভুল হওয়ার কথা না।”

সে একটু ঝুঁকে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা সাধারণ কোনো নীল পাথর না। ব্লু স্টার ডায়মন্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল নীল হীরাগুলোর মধ্যে একটা। এরকম একটা ডায়মন্ড সাধারণ কারও হাতে থাকার কথা না।”
লিওন কিছু বলল না। রুদ্রনীলের কণ্ঠ এবার আরও নিচু হয়ে এলো।
“আর তুমি জানো, এর সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিছু নামও জড়িয়ে আছে। এমন একটা ডায়মন্ড কারও হাতে থাকলে সেটা কেবল দামের ব্যাপার থাকে না, এর পেছনে থাকে একটা ইতিহাস।”
লিওনের মুখে এবার সামান্য অস্বস্তি ফুটে উঠল।
সে নিজের কবজির দিকে তাকিয়ে বলল, “হয়তো এটা কপি।”
“কপি?”
“হ্যাঁ। হয়তো দেখতে একই রকম।”
রুদ্রনীল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল “হতে পারে।”
কথাটা বললেও তার চোখে বিশ্বাসের কোনো ছাপ ছিল না। লিওন উঠে দাঁড়াল তারপর বললো
“যাই হোক, আমাকে একটু যেতে হবে।”

রুদ্রনীল আর কিছু বলল না। লিওন ধীর পায়ে ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে গেল। দরজার আড়ালে তার অবয়বটা মিলিয়ে যাওয়ার পরও রুদ্রনীলের দৃষ্টি কিছুক্ষণ সেদিকেই স্থির রইল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামল সেই জায়গায়, যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগেও লিওন বসে ছিল। মনের ভেতর অন্যরকম একটা হিসাব শুরু হয়ে গেছে।
ব্লু স্টার ডায়মন্ড। লিওনের হাতে। আর এই ডায়মন্ডের সঙ্গে যে নামটা সে সবচেয়ে ভালোভাবে জানে—ভাইপার।
রুদ্রনীলের ভ্রু ধীরে ধীরে কুঁচকে এলো। বিষয়টা এত সহজ নয়। এই ডায়মন্ড চিনতে তার ভুল হওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। নিজের ব্যবসার কারণে পৃথিবীর দুর্লভ হীরাগুলোর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পরিচয়। আর ব্লু স্টার ডায়মন্ড এমন কোনো পাথর নয়, যেটাকে ভুল করে অন্য কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে ফেলবে।
কিন্তু আসল প্রশ্নটা ডায়মন্ডটা কী, সেটা নয়।
আসল প্রশ্ন—এটা লিওনের হাতে এলো কীভাবে?

রুদ্রনীল ধীরে ধীরে সোফায় হেলান দিল। তার মনে পড়ে গেল সেই ডিলের কথা। ব্লু স্টার ডায়মন্ডটা ভাইপারের কাছ থেকে নেওয়ার কথা ছিল তার। আয়মান আর আসাদ খানের সঙ্গে সেই ডিলের কথাও পাকা হয়েছিল। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ডায়মন্ডটা তার হাতেই আসার কথা।
কিন্তু সেটা তো হয়নি। তাহলে ডায়মন্ডটা এখন লিওনের হাতে কীভাবে গেল?
রুদ্রনীলের চোখের দৃষ্টি আরও গভীর হয়ে উঠল।
লিওন একজন সিআইডি অফিসার। আর এই ডায়মন্ডের মালিক একজন আন্ডারওয়ার্ল্ড ক্রিমিনাল।
এই দুই পৃথিবীর মানুষের মধ্যে এমন কী সম্পর্ক থাকতে পারে, যার কারণে পৃথিবীর অন্যতম দুর্লভ একটি ডায়মন্ড একজন সিআইডি অফিসারের হাতে এসে পৌঁছায়?
প্রশ্নটা যতবার মনে আসছে, ততবারই হিসাবটা আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে। আর একটা বিষয় তাকে আরও বেশি ভাবিয়ে তুলল।
ভাইপারের পরিচয়।

এই মুহূর্তে রুদ্রনীল শুধু জানে, ভাইপারকে সবাই নূজহাত হিয়া বলছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার পরিচয় ভয়ংকর, কিন্তু তার আসল পরিচয় সম্পর্কে সে এখনো নিশ্চিত নয়।
হিয়া যে ভাইপার—এই ধারণাটা তার মাথায় বহুবার এসেছে। কিন্তু ধারণা আর সত্যি এক জিনিস নয়।
কাউকে সন্দেহ করা যায়, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। রুদ্রনীল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার চোখে এবার বিস্ময়ের বদলে ফুটে উঠল সতর্কতা।
“আগে জানতে হবে…”
নিজের কাছেই কথাটা ফিসফিস করে বলল সে।
“লিওনের হাতে ডায়মন্ডটা এলো কীভাবে।”
কয়েক মুহূর্ত থেমে আবার তার মনে হলো—
যদি সত্যিই এই ডায়মন্ড ভাইপারের কাছ থেকে এসে থাকে, তাহলে লিওনের সঙ্গে সেই অপরাধীর কী সম্পর্ক?
আর যদি হিয়াই ভাইপার হয়—তাহলে হিয়ার দেওয়া উপহার লিওনের হাতে কেন?
প্রশ্নের পর প্রশ্ন। কোনোটারই উত্তর এখনো তার কাছে নেই। তাই হিয়াকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে তাকে যাচাই করতেই হবে।

সে সত্যিই হিয়া কি না। আর যদি হয়—তাহলে লিওনের সঙ্গে তার সম্পর্কটা ঠিক কী?
রুদ্রনীল জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে সকালের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, অথচ তার মনে অদৃশ্য একটা ছায়া ঘন হয়ে আসছে।
আজ প্রথমবার লিওনের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—
এই মানুষটা হয়তো এমন একটা জটিলতার মধ্যে ঢুকে গেছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা তার জন্য সহজ হবে না।
রুদ্রনীলের দৃষ্টি ধীরে ধীরে দরজার দিকে স্থির হলো।
রুদ্রনীল গভীর শ্বাস নিল।
না।
এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নয়।আগে সত্যিটা জানতে হবে।
তারপরই পরবর্তী পদক্ষেপ। রুদ্রনীল কিছুক্ষণ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে রইল ব্লু স্টার ডায়মন্ডের রহস্যটা তাকে শান্ত হতে দিচ্ছে না। অবশেষে পকেট থেকে ফোনটা বের করল সে। পরিচিত একটি নম্বরে কল দিল। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে একজন পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো “হ্যালো, স্যার?”
কলটা রিসিভ হতেই রুদ্রনীল কোনো ভূমিকা না করে বলল, “বাংলাদেশে আছিস?”

“জি, স্যার।”
“হিয়ার কবরটার কথা বলছিলাম মনে আছে?”
“জি।”
“ওই কবরটা খুঁড়তে হবে ইমিডিয়েট।”
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।
“স্যার… আপনি নিশ্চিত?”
রুদ্রনীলের কণ্ঠ একটুও বদলাল না।
“আমি যা বলেছি, সেটাই কর।”
কিছুক্ষণ থেমে সে আবার বলল, “দেহাবশেষ থেকে হাড় আর দাঁতের নমুনা সংগ্রহ করবি। সাবধানে। নমুনাগুলো নষ্ট করা যাবে না। সরাসরি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাবি।”
“জি, স্যার।”
“আর কাউকে কিছু জানাবি না।”
“বুঝেছি।”
“কাজ শেষ হলে আমাকে জানাবি।”
“জি, স্যার।”

কল কেটে গেল। রুদ্রনীল ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল। কিছুক্ষণ আগেও তার সামনে ছিল শুধু একটা সন্দেহ। এখন সেই সন্দেহই তাকে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই।
হিয়া।
আর ভাইপার।
সাত বছর আগে যে মেয়েটাকে মৃত বলে পৃথিবীর সামনে রেখে দেওয়া হয়েছিল, সেই হিয়াই কি আজ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর নাম—ভাইপার?
রুদ্রনীল এখনো জানে না। জানতেই তো এই পরীক্ষা।
হিয়ার কবর থেকে পাওয়া দেহাবশেষের DNA সে পরীক্ষা করাবে। আর ভাইপারের DNA নমুনা সে নিজেই সংগ্রহ করবে।

তারপর—দুটো নমুনা একসঙ্গে যাবে ফরেনসিক পরীক্ষায়।
একটা মিল। শুধু একটা DNA match-ই তার সমস্ত সন্দেহের উত্তর দিয়ে দেবে।
হিয়া আর ভাইপার যদি একই মানুষ হয়, তাহলে এতদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর সামনে প্রথমবারের মতো একটা নির্ভরযোগ্য উত্তর দাঁড়াবে।
আর যদি না হয়? তাহলে রুদ্রনীলকে স্বীকার করতে হবে, তার হিসাবের কোথাও বড় ভুল ছিল।
কিন্তু একটা বিষয় সে নিশ্চিতভাবে জানে—এই ব্যাপারে সে অনুমানের ওপর ভরসা করবে না।
কারও কথায় নয়। কোনো পুরোনো তথ্যের ওপরও নয়।
সে প্রমাণ চাইছে। সম্পূর্ণ, নির্ভুল প্রমাণ।
রুদ্রনীল চোখ সরু করে দূরের দিকে তাকাল।
“দেখি, হিয়া…”
কণ্ঠটা প্রায় ফিসফিসে। “তুমি সত্যিই মৃত ছিলে, নাকি এত বছর ধরে সবাইকে মৃত ভেবে বাঁচিয়ে রেখেছিলে তোমার আসল পরিচয়?”

তারপরই নিজের কথাটা নিজেই থামিয়ে দিল সে।
না। প্রশ্নের উত্তর সে মুখে শুনতে চায় না।
সে উত্তর দেখতে চায় রিপোর্টে। বাংলাদেশের মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা দেহাবশেষ আর তার হাতে আসতে চলা ভাইপারের DNA—দুটো যখন মুখোমুখি হবে, তখন সত্যিটা আর লুকিয়ে থাকার সুযোগ পাবে না।
এদিকে গভীর রাত হয়ে গেছে।
শহর যখন ধীরে ধীরে ঘুমের গভীরে ডুবে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সেই পুরোনো বাড়িটার চারপাশে নেমে এসেছে এক অস্বাভাবিক নীরবতা।
সাত বছর আগে যে বাড়িটা এক ভয়ংকর ঘটনার পর মানুষের স্মৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল, কয়েকদিন ধরে লিওনের তদন্তের কারণে সেটাই আবার তার নজরের কেন্দ্রে।
হিয়ার আসল পরিচয় সামনে আসার পর পুরোনো কেসটা আর পুরোনো থাকেনি।
ইশতিয়াক খান।

একজন সিআইডি অফিসার হয়েও আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যার গোপন যোগাযোগ ছিল। তার ভাই আসাদ খান এবং তার ছেলে আয়মান খানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অন্ধকার অধ্যায়গুলো একে একে সামনে আসছিল। আর সেই সূত্র ধরেই সাত বছর ধরে বন্ধ থাকা কেসটা নতুন করে খুলেছে লিওন।
কয়েকদিন আগেই বাড়িটির আশপাশে গোপনে সিসিটিভি বসানো হয়েছিল।
কিন্তু লিওন তখনও জানত না— সেই ক্যামেরাগুলো এত দ্রুত তাকে এমন একটি দৃশ্য দেখাবে, যা তার নিজের পরিবারের একজন মানুষকে তার সন্দেহের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করাবে।

সিসিটিভির স্ক্রিনে রাতের অন্ধকারের মধ্যে কয়েকজন মানুষকে দেখা গেল। তারা নিঃশব্দে বাড়িটির ভেতরে ঢুকল। তারপর সোজা এগিয়ে গেল চারটি কবরের দিকে। কিছুক্ষণ পরই মাটিতে কোদালের আঘাত পড়তে শুরু করল।
একটার পর একটা। নীরব রাতের বুক চিরে সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়তে লাগল। হেডকোয়ার্টারের সিকিউরিটি মনিটরে যুক্ত থাকা সেই ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ তখন লিওনের সামনে খোলা।
নিজের কক্ষেই লিওন স্ক্রিনের সামনে বসে স্থির হয়ে গেল। সে জানত, ওই চারটি কবর কার। আর তাদের মধ্যে একটি নাম তার কাছে এখন আর কেবল একটি মৃত মানুষের নাম নয়।
হিয়া।
লিওনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল। ফুটেজ থামিয়ে সে লোকগুলোর মুখ, গাড়ির নম্বর, তাদের প্রবেশের সময়—সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল।
তদন্ত শুরু হলো। একটা সূত্র থেকে আরেকটা সূত্র।
একটা নাম থেকে আরেকটা নাম। শেষ পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার অনুসন্ধানে যে তথ্যটা সামনে এলো, সেটাই লিওনের চোখের দৃষ্টি বদলে দিল। লোকগুলো নিজেদের উদ্যোগে সেখানে যায়নি। একটি এজেন্সির মাধ্যমে তাদের পাঠানো হয়েছিল।
আর সেই এজেন্সির সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক লেনদেন রয়েছে—রুদ্রনীলের কোম্পানির।
লিওন কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইল।
রুদ্রনীল।

তার নিজের বোনের স্বামী।
যে মানুষটাকে এতদিন সে নিজের পরিবারের একজন হিসেবেই দেখেছে।
কয়েকদিন আগে আসাদ খানের গ্যাং নিয়ে তদন্ত করতে গিয়েও এই নামটা একবার সামনে এসেছিল। তখন বিষয়টাকে কেবল কাকতালীয় ভেবেছিল লিওন। রুদ্রনীলকে নিয়ে আলাদা করে সন্দেহ করার কোনো কারণ সে দেখেনি।
কিন্তু আজকের রাতটা অন্যরকম। আজ একই নাম আবার ফিরে এসেছে। আর এবার তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হিয়ার কবর। লিওন ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।তার চোখে তখন তদন্তকারীর সেই পরিচিত কঠোরতা। সে কাউকে কিছু জানাল না।
শুধু অপেক্ষা করতে লাগল।
অবশেষে লিওন ফোনটা হাতে তুলে রুদ্রনীলের নম্বরে কল করল। কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে রুদ্রনীলের কণ্ঠ ভেসে এলো,

“হ্যাঁ, লিওনার্দো?”
“ব্রো, বাইরে আসবেন?”
“এত রাতে?”
লিওনের কণ্ঠ শান্তই রইল। “আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর রুদ্রনীল বলল,
“ঠিক আছে। আসছি।”
কল কেটে গেল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে রুদ্রনীল বাইরে এসে দাঁড়াল।
লিওনও বাসা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। আর রুদ্রনীলকে দেখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটার সঙ্গে কতবার হাসি-ঠাট্টা করেছে সে। কতবার নিজের পরিবারের মানুষ ভেবে পাশে দাঁড়িয়েছে। অথচ আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রনীলকে হঠাৎ করেই যেন একজন অচেনা মানুষ মনে হলো।
রুদ্রনীল ভ্রু কুঁচকে বলল, “কী হয়েছে?”
লিওন কোনো উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।
“কয়েক ঘণ্টা আগে বাংলাদেশে একটা ঘটনা ঘটেছে।”
রুদ্রনীলের চোখে সামান্য পরিবর্তন এলো।
লিওন সেটা লক্ষ্য করল।

“একটা পুরোনো কবর খোঁড়া হয়েছে। আর সেই কাজটা করার জন্য যে এজেন্সিকে ব্যবহার করা হয়েছে…”
লিওন এবার থামল। তার দৃষ্টি সরাসরি রুদ্রনীলের চোখে গিয়ে স্থির হলো।
“সেই এজেন্সির সঙ্গে আপনার কোম্পানির নাম জড়িয়ে আছে।”
রুদ্রনীল কিছু বলল না। লিওনের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হলো। কারণ সে এখনো রুদ্রনীলকে দোষী ভাবতে চাইছে না। কিন্তু একজন সিআইডি অফিসার হিসেবে সে জানে—কাউকে আপন মানুষ বলে সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না।
প্রমাণের সামনে সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই।
লিওনের কণ্ঠ এবার আরও নিচু হয়ে এলো। “আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করব, ব্রো।”
রুদ্রনীল স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। লিওন ধীরে ধীরে বলল, “আজ রাতে হিয়ার কবর কে খুঁড়িয়েছে?”
লিওনের প্রশ্নটা শেষ হতেই রুদ্রনীলের মুখের সমস্ত স্বাভাবিকতা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে নিঃশব্দে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“লিওনার্দো…”

কণ্ঠটা অস্বাভাবিক শান্ত। কিন্তু সেই শান্তির নিচে জমে আছে তীব্র রাগ।
“তুমি এবার লিমিট ক্রস করে যাচ্ছ।”
লিওন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রুদ্রনীল এবার আর নিজেকে সামলাল না।
“কয়েকদিন ধরে একটা কেসের নাম করে বারবার আমাকে প্রশ্ন করছ। কখনো আসাদ খানের গ্যাংয়ের সঙ্গে আমার কোম্পানির নাম জড়াচ্ছ, আবার কখনো এমন একটা কবর খোঁড়ার ঘটনায় আমাকে দাঁড় করিয়ে জবাব চাইছ!”
তার চোখে ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে উঠল। “আমি তোমাকে এতদিন কিছু বলিনি। কারণ তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। তোমার পেশাকে সম্মান করি বলেই তোমার প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি।”
একটু থেমে রুদ্রনীল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল লিওনের দিকে।
“কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুমি যখন ইচ্ছা আমাকে সন্দেহ করবে, আর আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকব।”
লিওনের মুখ কঠিন হয়ে রইল। রুদ্রনীল এবার আরও নিচু গলায় বলল, “তুমি সিআইডি অফিসার হতে পারো, লিওনার্দো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমার প্রতিটা কেসের জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর রুদ্রনীল এমন একটা কথা বলল, যাতে লিওনের চোখের দৃষ্টি সামান্য বদলে গেল।

“আর একটা কথা মনে রেখো…”
“আমি তোমার বোনের স্বামী।”
“তোমার পরিবার আমাকে বিশ্বাস করে। তুমিও একসময় করতে।”
কণ্ঠে এবার অভিমান মিশে গেল।
“কিন্তু তুমি বারবার আমাকে এমনভাবে প্রশ্ন করছ, যেন আমি কোনো অপরাধী।”
রুদ্রনীল এক পা পিছিয়ে গেল।
“আমি তোমার বোনকে সবটা জানাবো।”
লিওনের চোখ এবার স্থির হয়ে গেল তার মুখে।
রুদ্রনীল বলল, “হ্যাঁ। এবার সময় হয়েছে।”
“তোমার বোনকে আমি নিজেই বলব, তার স্বামীকে তার নিজের ভাই কীভাবে বারবার সন্দেহ করছে।”
তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “আর না। এই লন্ডনের বাড়িতে আর আমার থাকা হচ্ছে না।”
কণ্ঠটা এবারও অনেকটাই শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতর জমে থাকা অপমান আরও স্পষ্ট হলো।
“আমি কারও চোখে অপরাধী হয়ে থাকতে চাই না। আর প্রতিদিন তোমার প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করারও কোনো ইচ্ছে আমার নেই।”

লিওন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। রুদ্রনীল তাকে আর কোনো সুযোগ দিল না।
“আমার কোম্পানির কোনো লেনদেনের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক নেই। তুমি যেটা খুঁজছ, সেটা আমার কাছে নেই।”
একটু থেমে শেষবারের মতো লিওনের দিকে তাকাল।
“তুমি আমাকে যতটা সম্মান দাও, আমি তোমাকে তার চেয়েও বেশি স্নেহ করি। ছোট ভাইয়ের মতো।”
“সেই সম্পর্কটা বজায় রাখো।”
কথাটা বলেই রুদ্রনীল ঘুরে দাঁড়াল। আর একবারও পেছনে তাকাল না। ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরের দিকে চলে গেল সে। লিওন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
চোখের সামনে থেকে রুদ্রনীলের অবয়বটা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেলেও তার শেষ কথাগুলো যেন কানে আটকে রইল।

“আমি তোমার বোনের স্বামী।”
“ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করি।”
কিন্তু একজন তদন্তকারীর চোখ তখনও অন্য কিছু খুঁজছিল। রুদ্রনীলের রাগ সত্যি হতে পারে।
তার অভিমানও সত্যি হতে পারে। কিন্তু তবুও—একটা প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
হিয়ার কবরটা কে খুঁড়িয়েছিল?

পরের দিন।
মেক্সিকোর ব্যস্ত শহরের এক প্রান্তে, কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা একটি বিলাসবহুল ভবনের ভেতরে বসেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গোপন বৈঠক।
বিশাল কনফারেন্স টেবিলের চারপাশে বসে আছে মেক্সিকোর প্রভাবশালী কয়েকজন আন্ডারওয়ার্ল্ড বিজনেসম্যান। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, অস্ত্রের রুট, আন্তর্জাতিক চালান—সবকিছু নিয়েই চলছে আলোচনা।
আর টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছে দানিয়েল।
কালো স্যুটে আবৃত তার রাজকীয় ব্যক্তিত্ব, ঠান্ডা চোখ আর নির্বিকার মুখভঙ্গিই যেন পুরো কক্ষের ওপর আলাদা একটা চাপ তৈরি করে রেখেছে।
সে খুব কম কথা বলছে। অন্যরা কথা বলছে, আর সে শুধু শুনছে। ঠিক তখনই একজন ব্যবসায়ী টেবিলের ওপর থাকা কয়েকটি নথি সামনে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“এই রুটটা নিয়ে আমাদের একটা পুরোনো সমস্যা আছে।”

অন্যজন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কী সমস্যা?”
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “মেইলস্ট্রোম।”
নামটা উচ্চারিত হতেই টেবিলের চারপাশে একটা নীরবতা নেমে এলো। দানিয়েলের আঙুলের নড়াচড়াও থেমে গেল। কিন্তু মুখে কোনো পরিবর্তন এল না।
একজন বয়স্ক ব্যবসায়ী ধীর গলায় বলল, “মেইলস্ট্রোমের নাম এখনো কেউ ভুলে যায়নি।”
অন্যজন মৃদু হেসে বলল, “ভুলবে কীভাবে? একসময় মেক্সিকোর রাস্তা তার নামেই কাঁপত।”
“সে শুধু মাফিয়া ছিল না,” আরেকজন বলল, “সে ছিল মেক্সিকোর মাফিয়া কিং।”
কেউ একজন নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। “তার একটা ফোন কলেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেত। একটা নির্দেশে মানুষ গায়েব হয়ে যেত। পুলিশ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ—অনেকেই তার নাম শুনলেই পথ ছেড়ে দিত।”
কথাগুলো দানিয়েল নীরবে শুনে গেল। তার চোখে কোনো কৌতূহল নেই। কোনো বিস্ময়ও নেই। শুধু গভীর একটা স্থিরতা বিরাজমান।

একজন তরুণ ব্যবসায়ী হঠাৎ হেসে বলল, “কিন্তু এত ক্ষমতার মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ধ্বংস করল।”
“একজন নারীর জন্য,” পাশ থেকে আরেকজন বলল।
“নারী না,” বয়স্ক লোকটা ধীরে মাথা নেড়ে জানালো।
“একটা সাধারণ বাংলাদেশি মেয়ে।”
কথাটা শুনে দানিয়েলের চোখের পাতা সামান্য নড়ে উঠল। লোকটা বলতে থাকল, “মেইলস্ট্রোম সেই মেয়েটার প্রেমে এমনভাবে পাগল হয়ে গিয়েছিল যে নিজের সাম্রাজ্য, নিজের ক্ষমতা—সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল।”
“শুনেছি, মেয়েটাকে পেতে গিয়ে নিজের অনেক শত্রু তৈরি করেছিল এমনকি মেক্সিকোর গডফাদার নাইট রেভেন যে কিনা মাফিয়া কিং মেইলস্ট্রোমেরই ভাই ছিলো সেও তার শত্রু ছিলো।”
“শুধু শত্রু?” অন্যজন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“সে নিজের হাতেই নিজের সাম্রাজ্যের ভিত নষ্ট করেছিল।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর বয়স্ক ব্যবসায়ীটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “শেষটা ছিল আরও নির্মম। নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দিয়েছিল মেইলস্ট্রোম।”

টেবিলের চারপাশে আবার নীরবতা নেমে এলো।
কেউ একজন ধীরে বলল, “মেক্সিকোর সবচেয়ে ভয়ংকর মাফিয়া কিং…”
আরেকজন কথাটা শেষ করল, “একজন সাধারণ মেয়ের প্রেমে পড়ে নিজের হাতেই শেষ হয়ে গেল।”
দানিয়েল এতক্ষণে ধীরে ধীরে চোখ তুলল।
সামনের কাঁচের টেবিলে তার প্রতিচ্ছবি পড়েছে।
ঠান্ডা মুখাবয়ব। স্থির চোখজোড়া। অন্ধকারের সম্রাটের সেই পরিচিত নির্বিকার চেহারা।
কেউ বুঝতেই পারল না—মেইলস্ট্রোমের গল্পটা তার কাছে কেবল মেক্সিকোর কোনো পুরোনো কিংবদন্তি নয়।
সে চুপ করে রইল। শুধু টেবিলের ওপর রাখা আঙুলগুলো একবার শক্ত হয়ে উঠল।
পরক্ষণেই আবার স্বাভাবিক খুব ক্ষীণ গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো অন্ধকারের সম্রাট— “ডিলের কথায় ফিরে আসি।”
দানিয়েলের কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই। শুধু সেই বরফশীতল কর্তৃত্ব। কেউ আর মেইলস্ট্রোমের প্রসঙ্গ তুলল না। কিন্তু দানিয়েলের মনে সেই একটা কথাই থেকে গেল—একজন সাধারণ বাংলাদেশি মেয়ের প্রেমে পড়ে ধ্বংস হয়েছিল মেক্সিকোর মাফিয়া কিং মেইলস্ট্রোম।

সন্ধ্যা অনেকটাই গাঢ় হয়ে এসেছে।
সিআইডি হেডকোয়ার্টারের ব্যস্ততাও ধীরে ধীরে কমে এসেছে। সারাদিনের তদন্ত, রিপোর্ট আর একের পর এক জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে লিওনের আজকের কাজ শেষ হয়েছে।
বাংলাদেশে হিয়ার কবর খুঁড়ে কারা কী নিয়ে গেছে, সেই তদন্তে ইন্টারপোলের সংশ্লিষ্ট টিমকেও ইতিমধ্যে কাজে লাগানো হয়েছে। এখন তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট পাওয়ার অপেক্ষা।
লিওন আর হেডকোয়ার্টারে থাকার প্রয়োজন দেখল না। বাড়ি ফিরবে সে। লিফটের সামনে এসে বোতাম চাপতেই দরজা খুলে গেল। লিওন ভেতরে ঢুকে একা দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত পর ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
লিফট নিচের দিকে নামতে শুরু করল।
চারপাশের নীরবতাটা সারাদিনের ক্লান্তির ওপর আরও একটা স্তর চাপিয়ে দিল। লিওন চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। অথচ বিশ্রাম নিতে চাইলেও মনটা আজ অদ্ভুতভাবে স্থির হচ্ছে না।
গত তিনদিন ধরে তার সাথে হিয়ার কোনো দেখা নেই।
কখনো কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সামনে এসে দাঁড়ানো সেই দুর্ধষ ক্রিমিনালের আজ কোনো হদিস নেই। অথচ যতবার হঠাৎ করে দেখা দিয়েছে, ততবারই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটিয়ে গেছে। কখনো এমন কোনো কথা বলেছে, কখনো এমন কোনো সারপ্রাইজ দিয়েছে—যেগুলো চাইলেও সহজে ভুলে যাওয়া যায় না।
লিওন ধীরে ধীরে চোখ খুলল।

“ধুর…”
নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
সে এসব ভাবতে চায় না।
কাজের বাইরে ব্যক্তিগত কোনো বিষয় মাথায় ঢুকিয়ে রাখার অভ্যাস তার নেই। বিশেষ করে এমন একজনকে নিয়ে, যার উপস্থিতিই তার স্বাভাবিক জীবনটাকে অস্বাভাবিক করে দিতে শুরু করেছে।
লিফটের সংখ্যা বদলাতে থাকল। লিওনের হাত অজান্তেই চলে গেল প্যান্টের পকেটে।
সেখানেই রয়েছে সেই ঘড়িটা। কয়েক দিন আগে পর্যন্ত ঘড়িটাকে সে নিছক একটা দামি উপহার বলেই ভেবেছিল। কিন্তু রুদ্রনীলের সেই কথাটা শোনার পর থেকে বিষয়টা নিয়ে নিজে খোঁজ নেওয়ার পর তার ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে।
এটা সত্যিই ব্লু স্টার ডায়মন্ড দিয়ে তৈরি। অত্যন্ত বিরল একটি হীরা। যার মূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এমন হীরা সবার কাছে থাকে না। আর একজন সিআইডি অফিসারের কবজিতে এত মূল্যবান একটা ঘড়ি দেখলে অযথা প্রশ্ন উঠতে কতক্ষণ?

সেই কারণেই হেডকোয়ার্টারে ঢোকার আগেই ঘড়িটা খুলে পকেটে রেখে দিয়েছে লিওন। কেউ দেখুক, সেটা সে চায় না। তবে শুধু সিআইডিতে প্রশ্ন উঠবে বলেই নয়।
এত দামি একটা জিনিস নিজের কাছে রাখার ইচ্ছাটাও তার নেই। সুযোগ পেলেই ফিরিয়ে দেবে।
সরাসরি। যার কাছ থেকে পেয়েছে, তার কাছেই।
লিওন পকেটের ওপর হাত রেখেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের মনেই ভাবল,
“ফিরিয়ে দেব।” কথাটা খুব সহজ।

কিন্তু কেন যেন সিদ্ধান্তটা মনে করার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি হলো। লিওন বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। লিফটের দরজা খুলে গেল। সে বেরিয়ে যাওয়ার আগে এক মুহূর্ত পকেটের ভেতরের ঘড়িটার দিকে তাকানোর মতো করে নিচে চোখ নামাল।
তারপর নিজেকেই কঠিন গলায় বলল, “যা আমার নয়, সেটা আমার কাছে রাখব না।”
কথাটা বলেই লিফট থেকে বেরিয়ে গেল সে। কিন্তু নিজের অজান্তেই তার মনে আবার ফিরে এলো সেই পরিচিত মুখ। আর লিওন বুঝতে পারল—ঘড়িটা পকেট থেকে বের করে দেওয়া যতটা সহজ হবে, সেই স্মৃতিটাকে মন থেকে বের করে দেওয়া হয়তো ততটা সহজ হবে না।
হেডকোয়ার্টারের পার্কিং লটের সামনে এসে নিজের গাড়িটার কাছে থামল লিওন। আজ সে অন্য কোনো গাড়ি নেয়নি। বার্থডেতে বাবার দেওয়া কালো গাড়িটাই বেছে নিয়েছিল। সন্ধ্যার ম্লান আলোয় গাড়িটা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল, চকচকে কালো শরীরে শহরের আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছিল।
দরজা খুলে ভেতরে উঠে বসল লিওন। সারাদিনের ব্যস্ততাশরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধিতে ক্লান্তির ভার রেখে গেছে। মাথার ভেতর এখনো ঘুরছে তদন্তের ফাইল, জিজ্ঞাসাবাদের শব্দ, একের পর এক অসমাপ্ত প্রশ্ন। কিন্তু সবকিছুর মাঝেও একটা মুখ বারবার তার চিন্তার পর্দায় এসে পড়ছে।
তিন দিন।

তিন দিন হয়ে গেল দেখা নেই। অদ্ভুতভাবে এই অনুপস্থিতিটাই আজ তার মনে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিয়েছে। লিওন নিজের ওপরই বিরক্ত হলো।
কেন সে বারবার ওই সাইকো ক্রিমিনালটার কথা ভাবছে? কোনো উত্তর পেল না।
পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে কিছুক্ষণ হাতের তালুর ওপর ধরে রাখল সে। নীলাভ ডায়ালটা অন্ধকারাচ্ছন্ন গাড়ির ভেতরেও নিজের আলোর রেখা ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
কী মনে করে ঘড়িটা কবজিতে না তুলে ড্যাশবোর্ডের ওপর রেখে দিল লিওন। তারপর ইঞ্জিন স্টার্ট করে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে এলো হেডকোয়ার্টার থেকে।
শহরের আলো একে একে পেছনে সরে যেতে লাগল। রাস্তা ফাঁকা হচ্ছে, সন্ধ্যার ব্যস্ততা ধীরে ধীরে রাতের নিস্তব্ধতায় গলে যাচ্ছে।

কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ লিওনের দৃষ্টি আবার ড্যাশবোর্ডের ওপর রাখা ঘড়িটার দিকে চলে গেল।
কেন যেন বুকের ভেতর কোনো একটা টান অনুভব হলো। কয়েক ঘন্টা ধরে ঘড়িটা নিয়ে সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে—এটা শুধু একটা দামি উপহার, এর বেশি কিছু নয়।
তবু হিয়ার কথা মনে পড়লেই কেন যেন সেই ঘড়িটার কথাও মনে পড়ে। লিওন নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গাড়িটা রাস্তার পাশে সামান্য ধীর করে এক হাত বাড়িয়ে ঘড়িটা তুলে নিল। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে এবার আর ড্যাশবোর্ডে রাখল না। ধীরে ধীরে নিজের কবজিতে পরে নিল।
ঘড়ির স্ট্র্যাপটা ঠিক করে স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই তার ঠোঁটের কোণে অজান্তে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
“সাইকো ক্রিমিনাল…”
নিজের অজান্তেই শব্দটা বেরিয়ে এলো। তারপর আবার গাড়ির গতি বাড়ল। সে জানত না, কয়েক মিনিট পর এই ঘড়িটাই তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে, টাউন হাউসের রাতটা কেমন যেন থমকে ছিল। তিনদিন হয়ে গেছে।
তিনদিন ধরে লিওনের কোনো খবর নেয়নি হিয়া।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ওই দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসার সামনে না থাকলেও তার উপস্থিতিটা এই ক্রিমিনাল নারীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকে। কাজের ফাঁকে, নিঃশব্দ কক্ষে, কিংবা হঠাৎ কোনো অকারণ মুহূর্তে—দুর্ধর্ষ অপরাধীর মনটা বারবার সেই কঠোর সিআইডি অফিসারের কাছেই ফিরে যাচ্ছে।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। হিয়া চুপচাপ বসে ছিল। কিছুক্ষণ পর নিজের অজান্তেই কবজির ঘড়িটার কথা মনে পড়ল।

লিওন ঘড়িটা পরেছে তো? নাকি রাগ করে কোথাও ফেলে দিয়েছে?
উত্তরটা সে জানে না। এই না-জানাটাই তাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল।
অবশেষে টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপটা নিজের দিকে টেনে নিল অন্ধকার সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী।
ঘড়িটার ভেতরে বসানো গোপন সিস্টেমটা সাধারণ কোনো ট্র্যাকার নয়। ঘড়িটা যখন লিওনের হাতে থাকবে এবং তার শরীরের রক্তের সঙ্গে ঘড়ির বিশেষ সংযোগ তৈরি হবে, তখনই সেই সিস্টেমটি সক্রিয় হবে। সেই সংযোগের মাধ্যমেই তার অবস্থান শনাক্ত করা যাবে, পাশাপাশি ঘড়ির আশপাশের শব্দও শোনা সম্ভব।
সিআইডি অফিসারের মতো সতর্ক একজন মানুষকে এড়িয়ে সাধারণ কোনো মাইক্রোফোন বা দৃশ্যমান ট্র্যাকার বসানো অসম্ভব। তাই এই ব্যবস্থাটাই ছিল তার একমাত্র ভরসা।
তবে হিয়ার মনে তখনও সন্দেহ ছিল।
হয়তো লিওন ঘড়িটা পরেইনি। হয়তো কোথাও রেখে দিয়েছে। তবুও সে সিস্টেমটা চালু করল।
স্ক্রিনে প্রথমে কিছুই দেখা গেল না।
শুধুই নীরবতা কয়েক সেকেন্ড।

তারপর হঠাৎ— ক্ষীণ একটা শব্দ হলো।
শব্দটা গাড়ির ইঞ্জিনের। হিয়ার চোখ মুহূর্তেই স্ক্রিনে আটকে গেল।
সিগন্যাল এসেছে। ঘড়িটা লিওনের শরীরের রক্তের সংযোগেই আছে। তারমানে ঘড়িটা এখন লিওনের হাতেই। অজান্তেই হিয়ার ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু পরের কয়েক মিনিটেই সেই হাসি মিলিয়ে গেল।
গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে রাস্তার কোলাহল ভেসে আসছিল। হিয়া নিশ্চুপ হয়ে শুনছিল।
হঠাৎ শব্দটা বদলে গেল। একটা অস্বাভাবিক ঘর্ষণের শব্দ পাওয়া গেলো ।
তারপরই লিওনের কণ্ঠ ভেসে এলো—“ও শিট! গাড়ির আবার কী হলো?”
হিয়া সোজা হয়ে বসল একটু। কঠোর কণ্ঠের আড়ালে এবার স্পষ্ট অস্বস্তি।
“সকালেও তো ঠিকঠাক ছিল…”

তারপর কয়েক মুহূর্ত শুধু ইঞ্জিনের শব্দ।
হিয়া নিঃশ্বাস আটকে শুনতে লাগল। আবার ব্রেক চাপার শব্দ হলো।
একবার। তারপর আরেকবার।
কিন্তু গাড়ির গতি কমল না। লিওনের কণ্ঠ এবার বদলে গেল।
“নো… নো ওয়ে!”
আর পরের কথাটাই হিয়ার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল।
“গাড়ি ব্রেক ফেল করেছে!”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। মুহূর্তের মধ্যে চোখের সব কোমলতা হারিয়ে গেল। যে নারী কয়েক সেকেন্ড আগেও নিঃশব্দে বসে ছিল, তার জায়গায় ফিরে এলো অন্ধকার জগতের সেই নির্মম সম্রাজ্ঞী।
ওদিকে কঠোর সিআইডি অফিসার পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে। স্টিয়ারিং ঘোরানোর শব্দ, টায়ারের ঘর্ষণ—সব মিলিয়ে গাড়ির ভেতরটা তখন মৃত্যুর সঙ্গে এক অসম লড়াইয়ের মতো।
লিওন আর দেরি না করে সিআইডি কন্ট্রোল রুমে জরুরি যোগাযোগ করল।
“ইমার্জেন্সি। আমার গাড়ির ব্রেক ফেল করেছে।”
কন্ট্রোল রুম থেকে দ্রুত তার অবস্থান জানতে চাওয়া হলো।

“লোকেশন শেয়ার করছি।”
কয়েক সেকেন্ড পর লিওনের লোকেশন তাদের সিস্টেমে চলে গেল। ওপাশ থেকে নির্দেশ এলো, গাড়িটাকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রেখে সোজা চালিয়ে যেতে। একই সঙ্গে তার দিকে রেসকিউ টিম পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল।
কিন্তু সেই নির্দেশ শোনার আগেই হিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। সে আর অপেক্ষা করবে না। ল্যাপটপটা বন্ধ করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
“ইভানা!”
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ইভানা ছুটে এলো।
“কী হয়েছে মিস্ট্রেস?”
হিয়া থামল না।
“গ্যারেজ খোলো।”
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“লিওনের কাছে।”

কণ্ঠটা এতটাই ঠান্ডা ছিল যে ইভানা আর কোনো প্রশ্ন করল না। গ্যারেজের দরজা খুলে গেল।
সারি সারি গাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর দিকে একবারও তাকাল না হিয়া। তার চোখ গিয়ে থামল সবচেয়ে দ্রুতগতির স্পোর্টস কারটির ওপর।
সাধারণ গাড়ি দিয়ে লিওনের গাড়ির গতি ধরা সম্ভব নয়। সময় এখানে তার সবচেয়ে বড় শত্রু। হিয়া দরজা খুলে ভেতরে উঠে বসল।
সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন গর্জে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ট্র্যাকিং সিস্টেমটি গাড়ির সঙ্গে সংযুক্ত করলো সে।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল লিওনের অবস্থান। একটা চলমান বিন্দু দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। হিয়া কয়েক সেকেন্ড সেই বিন্দুর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর চোখ শক্ত হয়ে গেল তার।

“যেকোনো মূল্য আমাকে সেখানে পৌছাতেই হবে।”
পা অ্যাক্সিলারেটরে চাপতেই স্পোর্টস কারটা গ্যারেজ ছেড়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।
রাতের রাস্তা মুহূর্তের মধ্যে পিছনে ছুটতে শুরু করল। শহরের আলো একটার পর একটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। স্পিডোমিটারের কাঁটা দ্রুত ওপরে উঠছে, অথচ হিয়ার চোখ একবারের জন্যও রাস্তা থেকে সরছে না।
সামনে শুধু একটা লক্ষ্য।
তার লিওন।
তার একমাত্র প্রাণ তার বাজপাখির জীবন এখন বিপন্ন। আর তাকে বাঁচানোর জন্য এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো আইন, কোনো নিয়ম, কোনো বাধাই অন্ধকারের সম্রাজ্ঞীকে থামাতে পারবে না।
অন্যদিকে সিআইডির রেসকিউ টিমও ছুটে চলেছে নির্দিষ্ট লোকেশনের দিকে।
কিন্তু তারা জানে না—তাদের আগেই একজন পৌঁছানোর জন্য মৃ/ত্যুর গতিতে ছুটে আসছে।
একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী। যে নিজের জীবনে অসংখ্য বিপদকে উপেক্ষা করেছে। কিন্তু আজ তার কাছে বিপদটা নিজের নয়।

আজ বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছে—তার একমাত্র ভালোবাসা।
লোকেশন অনুযায়ী অনেকটা পথ পেরিয়ে অবশেষে দূরে লিওনের গাড়িটা চোখে পড়ল হিয়ার।
অন্ধকার রাস্তার বুক চিরে ছুটে চলা কালো গাড়িটার পাশে ধীরে ধীরে এসে সমান্তরালে উঠল আরেকটি গাড়ি। চালকের আসনে বসে থাকা অন্ধকারের সম্রাজ্ঞী এক মুহূর্তের জন্য কাঁচের ওপার থেকে তাকাল।
লিওন।
কঠোর সিআইডি অফিসারের দুই হাত শক্ত হয়ে স্টিয়ারিং আঁকড়ে আছে। মুখে চাপা উত্তেজনা, চোখে একাগ্রতা। সে তখনও কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু পাশের গাড়িটায় কে আছে, সেটা তার দেখার কোনো উপায় নেই। কালো স্পোর্টস গাড়ির কাঁচের আড়ালে থাকা মুখটা তার চোখে পৌঁছাল না।
অন্যদিকে, অন্ধকারের সম্রাজ্ঞী এক মুহূর্তও চোখ সরাল না। তার সামনে এখন শুধু একটি লক্ষ্য—লিওনের গাড়িকে থামানো।

সে আরও গতি বাড়াল। দুই গাড়ির মাঝের দূরত্ব দ্রুত বাড়তে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে লিওনের গাড়িকে পেছনে ফেলে অনেকটা সামনে চলে গেল।
প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে হঠাৎ গাড়িটা রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে থামিয়ে দিল।
ইঞ্জিন গর্জন করতে করতে স্থির হয়ে গেল।
সামনে তখন শুধুই অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যুর মতো স্থির একটি গাড়ি।
লিওন তখনও কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে কথা বলছে।
“আমি গাড়িটাকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখছি, কিন্তু—”
কথাটা শেষ করার আগেই তার চোখ সামনে আটকে গেল। দূরে একটা গাড়ি থেমে আছে আড়াআড়িভাবে।
রাস্তার মাঝখানে একবারে স্থির হয়ে আছে সেই স্পোর্টস কারটি।
লিওনের চোখ মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
“ও শিট সামনে কার গাড়ি থামিয়ে রেখেছে রাস্তার মাঝে!”
সে ব্রেক চাপল।
একবার।
তারপর সমস্ত শক্তি দিয়ে আবারও। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। গাড়ির গতি কমল না।

“ও শিট ব্রেক কাজই করছে না!”
কন্ট্রোল রুম থেকে তার নাম ধরে চিৎকার ভেসে এলো।
“অফিসার লিওন ডানদিকে নিন গাড়ি!”
লিওন স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু গাড়ি তখন তার নিয়ন্ত্রণের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
সামনের গাড়িটা মুহূর্তে আরও বড় হয়ে উঠল।
আর তারপর—প্রচণ্ড এক বিকট শব্দে রাতের নীরবতা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
দুই গাড়ির সংঘর্ষে চারপাশ ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল।
লিওনের গাড়ি ছিটকে গিয়ে কয়েক গজ দূরে থেমে গেল। ধাক্কার তীব্রতায় তার মাথা স্টিয়ারিংয়ে আছড়ে পড়ল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ দুটো বিস্ফারিত হলো। তারপর সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো তার চোখের সামনে।
অন্যদিকে সংঘর্ষের ধাক্কায় স্পোর্টস কারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেল। কয়েকবার রাস্তার ওপর গড়িয়ে গিয়ে ধাতব শরীরটা দুমড়ে-মুচড়ে থেমে রইল।
চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল কাঁচের টুকরো। ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে গেল পোড়া ধাতুর গন্ধ।
কয়েক সেকেন্ড—কেউ নড়ল না।

তারপর উল্টে থাকা গাড়িটির ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে একটি হাত বাইরে ঝুলে পড়ল।
র*ক্তে ভেজা হাত।
নিঃশব্দ হয়ে গেলো চারিপাশ
নিস্তেজ হয়ে গেলো পুরো এলাকা।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—দূরের আকাশে একটা কালো ছায়া দেখা গেল।
ডানা মেলে রাতের বুক চিরে নিচে নামতে লাগল সে।
আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভাঙা গাড়িটার পাশে এসে নেমে পড়ল শ্যাডো। অন্ধকারের সম্রাজ্ঞীর সেই বিশ্বস্ত ঈগল।

তার তীক্ষ্ণ চোখ স্থির হয়ে গেল রাস্তার ওপর পড়ে থাকা সেই র/ক্তাক্ত হাতের দিকে।
রাতের বাতাসে তখনও দুর্ঘটনার ধোঁয়া ভাসছে।
একদিকে অচেতন কঠোর সিআইডি অফিসার।
অন্যদিকে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতর তার জন্য জীবন বাজি রাখা এক দুর্ধর্ষ অপরাধী।
আর মাঝখানে পড়ে আছে এমন এক রাত—যে রাতের পর তাদের দুজনের গল্প আর আগের মতো থাকবে না।
অন্যদিকে, দুর্ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছুটা দূরে অন্ধকারে ঢাকা একটি নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল এক অজ্ঞাত আগন্তুক।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
দূরের রাস্তার আলোও এই অন্ধকারে এসে ম্লান হয়ে গেছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না, শুধু হাতে ধরা ফোনের ক্ষীণ আলোয় আঙুলের ছায়া পড়ছে।
কয়েক মুহূর্ত পর সে ফোনটা কানে তুলল। “কাজ কী হয়েছে?”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো, “জি, বস। কাজ হয়ে গেছে।”
আগন্তুক কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩০

“সোজা ওপরে চলে যাবে তো?”
“জি, বস।”
কলটা কেটে গেল। অন্ধকারে আবার নেমে এলো নীরবতা। আগন্তুক ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন ফুটে উঠলো শীতলতা।
খুব নিচু স্বরে সে বলল, “পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে।”
তারপর অন্ধকারের ভেতরেই মিলিয়ে গেল সেই অজ্ঞাত অবয়ব। কিন্তু তার কথাটা যেন রাতের নিস্তব্ধতায় থেকে গেল—“পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে।”

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here