Home ইন্তেজার এ ওয়াসিল ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২১ (২)

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২১ (২)

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২১ (২)
নওরিন কবির তিশা

দিবাকরের তপ্ত রশ্মিতে উত্তপ্ত ধরণী। বেলা চড়ার সঙ্গে সঙ্গে তরতরিয়ে বেড়ে চলেছে তাপমাত্রার পারদ। এরই মধ্যেই হাসপাতাল ঘেরাও করেছে পুলিশী বাহিনী। বাইরের চত্বর তখন রণক্ষেত্রের ন্যায় উত্তাল। দেশের ছোটবড় সমস্ত সংবাদমাধ্যমের সংবাদকর্মীরের উপস্থিতিতে মুখরিত চারিধার। হাজার হলেও খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের উপর আকস্মিক আক্রমণে এলোমেলো হয়েছে সমস্ত রাজনৈতিক সমীকরণ।
অথচ বহির্পাশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে হাসপাতালের ভেতরে নিস্তব্ধতার রাজত্ব কায়েম হয়েছে। তিয়াশা কেবিনের বাইরের বিমূঢ় হয়ে বসে আছে। স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ ওপাশে কাচের আঁড়ালে। আদ্রিতা ফ্রেশ হতে সবে পার্শ্ববর্তী ওয়াশরুমে ঢুকেছে। আরাভের বন্ধু মহল এতক্ষণ যাবৎ এখানে থাকলেও তিয়াশা যাতে অস্বস্তিকর মুহূর্তে না পড়ে তাই ধীরে ধীরে প্রস্থান করেছে। সম্পূর্ণ ফাঁকা করিডোর।
নৈঃশব্দ্যেরা ঘাঁটি গেড়েছে তিয়াশার চারিপাশে। আকস্মিক তা বিদীর্ণ করে সেখানে উপস্থিত হলো ডিআইজি তাহের চৌধুরী। অসময়ে বাবার উপস্থিতি হয়তো একদমই আশা করেনি তিয়াশা। বড্ড বিস্মিত তিয়াশা ঝটপট উঠে দাঁড়ালো; বাবার দিকে চেয়ে অস্ফুট স্বরে শুধালো,

— বাবা? তুমি… তুমি এই সময়ে এখানে কী করছ?
তাহের চৌধুরীর দৃষ্টি প্রখর, স্থির। তিনি মেয়ের দিকে কয়েক কদম এগিয়ে এসে কণ্ঠে একরাশ কঠোরতা ও উদ্বেগের মিশেল দিয়ে বললেন,,
— তুই কিছু না বলে চলে এসেছিস কেন? তোর মা,কত টেনশনে আছে জানিস? সেসব বাদ দে, চল ফিরে চল নিচে গাড়ি অপেক্ষা করছে।
— না বাবা, আমি এখন কোথাও যেতে পারব না। আরাভ এখনো বিপদমুক্ত নয়। এই সময়ে ওকে ফেলে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব।
মেয়ে হতে এমন অনড় উত্তর হয়তো ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করেননি তাহের চৌধুরী। তিনি বিস্ময়ের চূড়ান্ত থাকলেও পেশাদারী গাম্ভীর্য বজায় রেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। মেয়ের কাধে হাত রেখে অত্যন্ত শীতল স্বরে বললেন,,

— তুই কি ভ্রমের ঘোরে আছিস, তিয়াশা? আরাভ খান তোর কে হয়? তুই আমার মেয়ে মা, ভালো মন্দের বাধ-বিচার করতে শেখ।
মুহূর্তের তরে চোখ বুঁজে নিজেকে ধাতস্থ করল তিয়াশা। জীবনে প্রথমবার বাবাকে মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করতে চলেছে ও। প্রলম্বিত শ্বাস টেন অকাট্য স্বরে ও বলল,,,
— তুমি ঠিকই বলেছ বাবা, আমি তোমার মেয়ে। বাট ইট ইজ ইকুয়ালি ট্রু দ্যাট নাও আই অ্যাম হিজ ওয়াইফ বোথ রিলিজিয়াসলি অ্যান্ড লিগ্যালি। তাই এই মুহূর্তে ওনার পাশে থাকা আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।সো,প্লিজ বাবা আমাকে আর কোন অপশন দিওনা। আমি তোমার কথা রাখতে পারব না স্যরি।
সেকেন্ডের মধ্যে কপালের পার্শ্ববর্তী শিরা গুলো দ্বিগুণ ফুলে উঠলো ক্রোধে; ক্ষুব্ধ গলায় তাহের চৌধুরী বললেন,,

— ধর্ম আর আইনের দোহাই দিস না আমাকে! ওই আরাভ খান একজন অপরাধী। তার জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তুই কি সারাটা জীবন এমন এক অনিশ্চয়তার দোলায় দুলতে চাস? চল বলছি আমার সাথে!
— ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড, বাবা। আমি কখনো বলিনি আমি ওনার সাথে সারাটা জীবন কাটাতে চাই কিংবা ওনার প্রেমে অন্ধ হয়ে গিয়ে আমি ওনার পাশে থাকতে চাই।বাট, ওনার অসুস্থতায় ওনাকে ছেড়ে যেতে আমি পারবো না।
স্তব্ধ তাহের চৌধুরী নৈঃশব্দ্য বেছে নিলেন।পুনর্বার বাক্যালাপের প্রয়োজন বোধ করলেন না;গম্ভীর পদক্ষেপে করিডোর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। তিয়াশা বিমূঢ় নেত্রে চেয়ে রইল বাবার প্রস্থান পথের দিকে। সরাসরি এরূপ প্রত্যাখ্যান করতে ওই ইচ্ছুক ছিল না। তবে, যে মানুষটা হাজার অপরাধ করা সত্ত্বেও ওকে সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিয়েছে, আগলে রেখেছে। তাকে এমন বিপদের সময় ছেড়ে যাওয়াটা মানবতা বিরোধী বলে গণ্য হচ্ছে তিয়াশার কাছে।

ঔষধের প্রভাবে প্রগাঢ় সুপ্তি মগ্নতা আচ্ছন্ন করেছিল আরাভকে। তার দাপুটে বেপরোয়া তরুণ সত্তা গ্রাস করেছিল নিথরতা। অবশেষে ঘন্টা দুয়েক বাদে অবচেতনার সমাপ্তি ঘটিয়ে চোখ মেলে চাইলো সে। নিস্তব্ধ অপরাহ্ন তখন। সূর্যের তেজস্বী রশ্মি ম্রিয়মাণ। তাহের চৌধুরীর প্রস্থানের পর থেকেই, তিয়াশা আরাভের বেডের পাশে চেয়ার টেনে বসে ছিল। দীর্ঘক্ষণিক একটানা বসে থাকতে থাকতে কখন যে তন্দ্রাচ্ছন্নতা তাকে গ্রাস করেছে বলা দায়। তবে কেবিন জুড়ে একমাত্র সে-ই থাকার কারণে ঘুম ভেঙ্গে এই প্রথমে তার তন্দ্রাচ্ছন্ন মুখশ্রী দৃষ্টিগোচর হলো আরাভের।
প্রশান্তিময় হাসির রেখা খেলে গেল ওষ্টাধর প্রান্তে। কতদিন পর এই নিষ্পাপ মুখোশ্রীর দেখা মিলেছে এত কাছ থেকে। আরাভের বালিশের ঠিক নিম্ন প্রান্ত বরাবর মাথা রেখেছে তিয়াশা। ডান দিকে মুখ করে শোয়ার দরুন সুশ্রী মুখাবয়বের একাংশ দৃশ্যমান মাত্র। আর সেটিকেই পরম তৃষ্ণার্ত নেত্রে গ্রহণ করছে আরাভ। হঠাৎ এক কান্ড করে বসলো ও। অক্সিজেন মাস্কটা মুখ থেকে খুলে অবহেলিত জড় পদার্থের ন্যায় পাশে রাখলো।
মুখ কুঁচকে মাস্কটাকে ধিক্কার জানিয়ে বলল,,

— একটা মাত্র বউ আমার, এতদিন পর পেয়েছি কাছে! আর তুই কিনা মাঝখানে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার হয়ে ডিস্টার্ব করিস!
অতঃপর নিজের ফ্যাকাশের ঠোঁটজোড়া ধীরে ধীরে এগিয়ে তিয়াশার তন্দ্রাচ্ছন্ন মুখশ্রীতে আলতো করে চেপে ধরল। না তীব্রতা নেই সেই স্পর্শে্। শুধুই এক হিমশীতল ব্যাকুলতা। এমনিতেই নিদ্রার পাল্লা বরাবর বড্ড পাতলা তিয়াশার তার উপর আকস্মিক মুখে কারো হিমশীতল ওষ্ঠের স্পর্শ লাগতেই ও এক ঝটকায় পিছু হটে এল। ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসে ওর ডাগর চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল।
নিজের গালটা হাত দিয়ে আড়াল করে, কিছুটা অপ্রস্তুত আর কিছুটা রাগান্বিত স্বরে আ বলল,,
— হোয়াট ইজ দিস! কী করছেন এসব? ডাক্তার তো অক্সিজেন মাস্ক খুলে রাখতে বারণ করেছেন, আর আপনি কিনা…!
আরাভ ওর হাতটা নিজের মুঠোয় চেপে ধরল; ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে ‌ভাঙা গলায় বলল,,

— কী করছিলাম? চুমু খাচ্ছিলাম। বাট, এতটুকুতে হয়নি আমার,আরও খাবো। কাছে এসো তো!
তিয়াশা এক জোড়া অগ্নিশর্মা চাহনি আরাভের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে অত্যন্ত তপ্ত কণ্ঠে বলল,
— আপনার কি বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে?
মুহূর্তের তরে থামলো তিয়াশা।অতঃপর বিরক্তিসূচক এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে বলল,,
— অসভ্য কোথাকার!
নির্জীব পরে থাকা ওষ্ঠাধর প্রান্তে পুনরায় খেলে গেলো চওড়া হাসির রেখা। বেডে শুয়ে থাকা নিশ্চল দেহটা কিঞ্চিৎ নাড়িয়ে আধশোয়া হয়ে উঠে বসলো আরাভ। মুঠোতে থাকা তিয়াশার হাতটাতে নিজ হস্তবন্ধন জোড়ালো করে বলল,,
— খুব বেশি হলে, কি হবে? বড়জোর ম’রে যাবো! বাট, ইট’স ওকে সুইটহার্ট। এই ওসিলাতে হলেও তো তোমাকে একটা কাছে পেলাম। এটাই সার্থকতা!
তিয়াশার নেত্র কার্নিশ ভিজে উঠলো ‌স্তোকমাত্র। অগোচরে অতি সন্তর্পণে তা লুকিয়ে চটজলদি পদক্ষেপে প্রস্থান করলো সেখান থেকে।

– সকাল থেকে তো কিছু খাওনি। এটা নাও।
সাইদ হাতে থাকা নান রুটিটা এগিয়ে দিলো পাশে থাকা নারী কায়াটির দিকে। মোবাইলের নীলাভ স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ক্ষীণ বেগে সাইদের পানে চাইল আদ্রিতা।কুন্ঠিত স্বরে বলল,,
– প্রয়োজন নেই। আপ….
বাকি কথাটা শেষ করার আগেই,সাইদ দ্রুত গতিতে ওর হাতে রুটির অংশখানি গুঁজে দিয়ে বলল,,
– ফরমালিটির দরকার নেই। বিগত এক ঘন্টা যাবৎ তোমার পেটে চলা ইঁদুর-বিড়ালের রেসের কারণে পাশে বসে থাকাই দায় হয়েছে আমার জন্য। সেখানে এত দেমাগ আসে কোথা থেকে?
সাইদের অকাট্য উত্তরে থেমে গেল আদ্রিতার সমস্ত বাক্যঝুড়ি। অধরে দন্তের মৃদু কামড় বসিয়ে, শুকনো ঢোক গিললো। প্রকৃতপক্ষেই,বড্ড ক্ষুধা লেগেছিল তার। যার দরুন সত্যি উদরের অন্দরে বিচ্ছিরি শব্দের উৎপত্তি করছিল। তবে,তা কি শুনে ফেলল সাইদ? ছিঃ মান-সম্মানের আর বাকি রইল না কিছু! ওর এহেন ভাবনা-চিন্তার মধ্যেই কর্কশ শব্দে বেজে উঠল সাইদের মুঠোফোনটা। সাঈদ সেটিকে কানে গুঁজে তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করল সেখান থেকে। তবে যাওয়ার আগে আদ্রিতার দিকে ফিরে কর্তৃত্বকারী কন্ঠে বলল ,,

– ওটা খাওয়ার দরকার নেই। ডাস্টবিনে ফেলে দাও, আমি দুই মিনিট আসছি।
আদ্রিতা বোকা দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল। সাঈদের কথার মারপ্যাঁচে ওর বুদ্ধি যেন কিছুটা লোপ পেয়েছে। এই লোকটা নিজেই এত যত্ন করে নান রুটি এনে দিল, আবার পরক্ষণেই অত্যন্ত গম্ভীর মুখে তা বারণ করে চলে গেল! মানুষের মনের গতিপ্রকৃতি বোঝা বড় দায়।
খানিক বাদে করিডোরে কারো পায়ের শব্দ শোনা গেল। আদ্রিতা মুখ তুলে দেখল, সাঈদ ফিরে আসছে। তবে এবার তার হাত দুটো আর খালি নেই; একটা সুদৃশ্য খাবারের প্যাকেট ঝুলছে ডান হাতে। আদ্রিতাকে অবাক হতে দেখে সাইদ প্যাকেটটা সামনের টেবিলের ওপর রাখল। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

— আসলে এখানের আশপাশের ক্যান্টিনের খাবারগুলো একদম ভালো না, প্রচণ্ড আনহাইজেনিক। তার ওপর রুটিগুলো বড্ড শক্ত, তোমার খাওয়ার উপযোগী নয় একদমই। সেই কারণে বাইরে থেকে ভালো খাবার অর্ডার করেছিলাম। আসতে একটু দেরি হলো।
আদ্রিতা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সাঈদ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। মুখে সেই চেনা গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলল,
— এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নাও। আর একটাও ফরমালিটির কথা শুনতে চাই না।
কথাটা শেষ করেই সাঈদ আদ্রিতার উত্তরের অপেক্ষা না করে, খাবারগুলো প্যাকেট থেকে বের করে পরিপাটি করে সাজিয়ে দিল। অতঃপর ধীর পায়ে আবার করিডোরের অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেল।
আদ্রিতা মুগ্ধ ও বিস্মিত নেত্রে সাঈদের প্রস্থান পথের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা বাইরে থেকে যতটা কঠোর, ভেতরটা বোধহয় ততটাই কোমল। কত সূক্ষ্ম বিষয়েও লোকটার তীক্ষ্ণ নজর! মনের অন্দরে এক অজানা ভালো লাগার রেশটুকু জড়িয়ে ধরে আদ্রিতা খাবারের দিকে হাত বাড়াল।

উৎসুক জনতা আর সংবাদ কর্মীদের ভিড় ঠেলে প্রশস্ত পথের ব্যবস্থা করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের গাড়ি বের হওয়ার জন্য। নিরাপত্তারক্ষীদের কড়া বেষ্টনীতে আরাভকে হুইল চেয়ারে করে বের করে আনা হচ্ছে, তিয়াশার অবস্থান ও বাঁ পাশে। স্থির নেত্র আকস্মিক নিবদ্ধ হলো গাড়ির ঠিক সামনেই ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিত্বের ওপর।
মধ্য বয়সী এক রমণী। পরনে নীলচে ধূসর সুতি শাড়ি, খোঁপাটা আজ এলোমেলো হলেও চোখে বরাবরের ন্যায় মোটা ফ্রেমের চশমাটা এঁটে আছেন। জয়নব ম্যাম! বহুদিন পর, এক অজানা পরিবেশে তাঁকে দেখে তিয়াশার হৃদস্পন্দন খানিকটা দুলল। তবে,সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই জয়নব এগিয়ে এসে আরাভের হুইল চেয়ারের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
আরাভের চোখেমুখে মুহূর্তের তরে এক হতবম্ভতা প্রকট হলো। পরক্ষণেই সেথা গ্রাস করল তীব্র অস্বস্তি। অস্থির বদনে কম্পিত কন্ঠে সে কিছু বলার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে জয়নব ম্যাম প্রায় ক্রন্দনে ভাঙ্গা স্বরে বললেন,,

– বাবাই!
কত যুগ পর? এক যুগের বেশি হয়ে গিয়েছে! প্রায় ১৫ বছর হয়তো, এতদিন পর বহুল কাঙ্খিত ডাকটা শুনে হৃদয় মুচড়ে উঠলো আরভের। কণ্ঠস্বর কল্পনাতীত কম্পিত, অগোচরে কাঁপছে বেশিবহুল হাতটা। প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়েছে মুহুর্তেই! অযাচিত এমন রোগের কারণ খুঁজে পায় না আরাভ। বিদঘুটে বর্ণ ধারণ করে মুখের রেখা। তীব্র অস্বস্তিতে কেবল উচ্চারণ করে,,
– আপনি এখানে কি করছেন?
জয়নাব বেগম প্রত্যুত্তর করতে যাবেন ঠিক তার আগ মুহূর্তে কারো সঙ্গে ফোন আলাপে ব্যস্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার খান আরাভের ঠিক পিছনে স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। মুখভঙ্গিতে মনোভাব বোঝা গেলো না।গলা খাঁকারি দিয়ে শীতল স্বরে তিনি বললেন,,
— এত বছর পর? যে মানুষটা নিজের সন্তানকে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি, সে আজ কোন মুখ নিয়ে এখানে এসেছে, ম্যাডাম?
জয়নব বেগম বরাবরই শক্ত ধাঁচের রমণী। হ্যাঁ গতকাল মাঝরাতে ছেলের এহেন বিপদের কথা শুনে বড্ড ভেঙে পড়েছেন। তবে আত্মমর্যাদার গাম্ভীর্য লেশমাত্র ক্ষয় হয়নি। আনোয়ার খানের জবাবে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ধীর স্থির কণ্ঠে বললেন,

— তুমি খুব ভালো করেই জানো আনোয়ার, কেন আমি দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছি। আমার নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তোমার এই দম্ভের প্রাসাদে আমি মাথা নত করতে পারতাম না।
আরাভ এবার মুখ ফেরাল। তার চোখের চাহনিতে কোনো আবেগ নেই, আছে কেবল গভীর ঘৃণা আর শুষ্কতা। সে বাঁকা হাস্যে ধারালো কণ্ঠে বলল,,
— বাহ! নীতি-নৈতিকতা? খুব সুন্দর শব্দ। কিন্তু ম্যাডাম, আপনি তো নীতি-নৈতিকতা রক্ষা করতে গিয়ে অবলীলায় ছেলেকে বিসর্জন দিলছেন। এখন এই নাটকটা কার জন্য? আমি যখন একা ধুঁকছিলাম, গুমরে গুমড়ে শেষ হচ্ছিলাম। তখন কোথায় ছিল আপনার নীতি-নৈতিকতা? শুধু শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীর প্রতি নীতি নৈতিকতা কিংবা নাগরিক হিসেবে দেশের প্রতি নৈতিকতা দেখালেই, এনাফ? মা হিসেবে সন্তানের উপর যে দায়িত্ব আছে, সেটা কি আপনার নীতি-নৈতিকতা বহির্ভূত?
জয়নবের চোখের কোণে এক বিন্দু জল চিকচিক করে উঠল। তিনি আরাভের কাঁধে হাত রাখতে গিয়েও থমকে গেলেন। কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললেন,,

— আমি পরিস্থিতির শিকার ছিলাম, আরাভ। মা হয়ে সন্তানকে বিসর্জন দেওয়া কি খুব সহজ?
আরাভ হুইল চেয়ারটা এক ঝটকায় পেছনে সরিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে বলল,,
— আপনার মত মহিলার জন্য সব সহজ,ম্যাডাম। এখন কেন এসেছেন? আপনার শূন্যতা বহু আগেই পূর্ণ হয়েছে। ইভেন আপনার জন্য কোনো শূন্যতাই ছিল না আমার লাইফে। প্লিজ,চলে যান। চলে যান আমার সামনে থেকে।
শেষ কথাটা চিৎকার করে বলল আরাভ। বহুদিন পর ওকে এমন হিংস্র রূপে আবিষ্কার করছে তিয়াশা। বেপরোয়া-ছন্নছাড়া, সেই পূর্বের ন্যায়! তবে,আরাভের এ রূপে তাকে ঘৃণা করার চেয়ে তার প্রতি মায়ারা দ্বিগুণ হলো তিয়াশার। মাতৃ শূন্যতা ঠিক কতটা ভয়াবহ সেটা হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে উপলব্ধি করতে পারে তিয়াশা। অবশ্য সেটা আরাভের বদৌলতেই। কেননা আরাভ ঠিক কতটা তীব্রভাবে মায়ের শূন্যতা ভোগ করতো সেটা সে চাক্ষুষ দেখেছে।
তবে জয়নব বেগমের প্রবল আত্মসম্মানে ভাটা পড়েছে আজ। তিনি অন্তিম মুহূর্ত অবধি চেষ্টা চালালেন ছেলেকে বোঝানোর। তবে, ১৫ বছরের যন্ত্রণা ১৫ মিনিটে ব্যবধানে মুছে যাওয়া। সেকি এতটাই সহজ? অবশেষে জয়নব বেগমের সমস্ত আকুলতাকে একপ্রকার পা দিয়ে পিষে।উপেক্ষা করে, সেখান থেকে প্রস্থান সমগ্র খান সদস্য। একাকী মায়ের বেদনার্ত নিঃশ্বাসে ভারী হলো বৈশাখী বাতাস।

– আই হ্যাভ নাথিং টু ডু,রুদ্র। পরিস্থিতি এবার অনুকূলে নেই। তিয়াশা নিজের ইচ্ছাতে গিয়েছে। কি করব?
তাহের চৌধুরী সরাসরি রুদ্রদ্বীপের বাড়িতে এসেছে। মায়ের অসুস্থতার কারণে সাময়িক ছুটিতে ছিল রুদ্র। যার দরুন সরাসরি ওর বাড়িতেই আসতে বাধ্য হয়েছে তাহের চৌধুরী। এদিকে ওনার এমন কথায় বড্ড বিরক্ত রুপকথা বেগম। আকার-দর্শনে স্পষ্ট দৃশ্যমান তা। তিনি চায়ের কাপ এনে সম্মুখের টেবিলে রাখলেন। অতঃপর কোনোরূপ দোনামনা ছাড়াই স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন,,
-কিছু মনে করবেন না ভাই। কিন্তু ওদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে আর ওরা একে অপরকে মেনেও নিতে চাইছে। তারপরও এমনটা, ইসলামেও নাজায়েজ।
স্পষ্ট বিরক্তি কণ্ঠে। তাহের চৌধুরী বুঝলেন। চতুর মস্তিষ্ক এড়ালো না কিছুই। রুদ্র মায়ের দিকে ইশারা করেও ফলাফল শূন্য। রূপকথা বেগম আজ মনের সবটা উগড়ে দিয়ে বললেন,,

– দেখুন ভাই সাহেব, এটা যেমন পাপ তেমনি বেআইনি। আইনের লোক হয়ে আপনারা কিভাবে এমনটা চিন্তাভাবনা করেন? যেখানে আপনার মেয়েই চায় এমন একটা ছেলেকে। সবচেয়ে বড় কথা আমার ছেলের জন্য আমি অন্য মে….!
তাহের চৌধুরী এক মুহুর্ত বসলেন না। তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়ালেন। রূপকথা বেগমের ইঙ্গিতপূর্ণ কথার জবাবে বললেন,,

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২১

– শুধুমাত্র আইনি কার্যকলাপের জন্য আপনাদের বাসায় এসেছি ভাবি। নাথিং এলস। তাই অন্য কিছু না ভাবলেই খুশি হব। আর আমার মেয়ের জন্য হাজারটা সুপাত্রের বন্দোবস্ত করাই আছে।
আর কোন কথা নয়। নাতো থামলেন না তো ফিরে তাকালেন। গটগট পা ফেলে প্রস্থান করলেন দাম্ভিক তাহের চৌধুরী

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২১ (৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here