ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৯
মেহজাবিন নাদিয়া
আরিশান মৃধার মুখ থেকে ‘বাবার মতো’ আর ‘দায়িত্ববোধ’ শব্দ দুটো শোনা মাত্রই জেবার বুকের ভেতরটা যেন এক লহমায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। একটু আগেই শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অদ্ভুত, অবাধ্য শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল, তা যেন মুহূর্তের মধ্যে তীব্র এক অভিমানে রূপ নিল। সোনার চুরি, কানের দুল আর নাকের নোজপিনটা—যা কিছুক্ষণের জন্য তাকে এক পরম সুখের ঘোরে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল-এখন সেগুলোকে নিজের ওপর এক মস্ত বড় পরিহাস বলে মনে হতে লাগল।
জেবা আর নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। তবে এবার সে শব্দ করে কাঁদল না। নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরে, তীব্র অভিমানে মুখটা ঝট করে ফিরিয়ে গাড়ির অন্য পাশে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজেকে আরিশান মৃধার থেকে যতটা সম্ভব দূরে সরিয়ে,সিটের একদম কোণায় লেপ্টে বসল সে। হাতের সোনার চুরির দিকে তাকিয়ে ওর এখন ওগুলো খুলে দূর করে ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু আরিশান মৃধার ওই শেষ হুঁশিয়ারি-‘একটা মারও মাটিতে পড়বে না’-জেবাকছ আড়ষ্ট করে রেখেছে। রাগ, ক্ষোভ আর চরম হতাশায় তার দম আটকে আসতে চাইল।
আরিশান মৃধা আড়চোখে একবার জেবার সেই রাগে, অভিমানে থমথম করা লালচে মুখশ্রীর দিকে তাকালেন।উনি এক হাত দিয়ে নিজের কপালটা ম্যাসেজ করলেন। নিজের ওপরই ওনার এক ধরণের ক্লান্তি ভর করেছে। কেন উনি বারবার এই মেয়েটার সামনে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন? কেন ওনাকে বারবার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে অভিভাবক’ শব্দের ঢাল ব্যবহার করতে হচ্ছে? এক গভীর, অবদমিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিশান মৃধা আবার চোখ ফিরিয়ে বাইরের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকালেন। গাড়ির ভেতরের নীরবতা এবার আরও বেশি বিষাক্ত ঠেকতে লাগল।
ঠিক তখনই আরিশান মৃধার কোটের পকেটে থাকা ফোনটা উচ্চশব্দে কেঁপে উঠল। এই নিস্তব্ধতায় ফোনের রিংটোনটা যেন একটা চাবুকের মতো শোনাল।উনি পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। স্ক্রিনে ‘সারিম’ নামটা ভেসে উঠছে। নিজের গুনধর ছেলের ফোন দেখে ওনার ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে গেল। কোনো দ্বিধা না করে উনি কলটা রিসিভ করে কানের কাছে নিলেন,
_“হ্যাঁ সারিম, বলো।”
ওপাশ থেকে সারিম কী বলল, তা গাড়ির অন্য কেউ শুনতে পেল না। কিন্তু ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর আর বার্তার তীব্রতা এতটাই মারাত্মক ছিল যে, আরিশান মৃধার পুরো শরীর এক নিমেষে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। ওনার চোখের মণি দুটো স্থবির হয়ে পড়ল, অনমনীয় চোয়ালটা শক্ত হতে হতে যেন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো। ওনার চশমার পেছনের চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত, আকস্মিক শূন্যতা আর স্তব্ধতা নেমে এলো।
কয়েক সেকেন্ড ওনার মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না। ফোনের ওপাশে সারিম তখনও হয়তো কিছু বলে যাচ্ছিল, কিন্তু আরিশান মৃধা যেন এক গভীর শকের অতলে তলিয়ে গেছেন। কোনো রকমে কাঁপতি গলায় শুধু বললেন,
_“আমি… আমি আসছি।”
লাইনটা কেটে দিয়ে উনি ধীরহাতে ফোনটা পাশে রাখলেন। ওনার কপালে তখন সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু জমতে শুরু করেছে। উনি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর, তবে কিছুটা বিচলিত গলায় নির্দেশ দিলেন,
_“ড্রাইভার, গাড়ি ঘোরো। এক্ষুনি গ্রামের দিকে ঘোরাও! টেক দ্য হাইওয়ে রাইট নাও!”
ড্রাইভার তৎক্ষণাৎ গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে হাইওয়ের দিকে গাড়ি ছোটাল।
জেবা এতক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলেও, আরিশান মৃধার গলার ওই আকস্মিক পরিবর্তন আর গাড়ি ঘোরানোর নির্দেশ শুনে চমকে ওনার দিকে ঘুরল। সে আরিশান মৃধার মুখের দিকে তাকিয়ে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মানুষটা একটু আগেও ওর ওপর চড়া গলায় হুকুম চালাচ্ছিলেন, সেই মানুষের চোখে-মুখে এখন এক অজানা ভীতি আর নিচ্ছিদ্র গম্ভীরতা।
জেবা এসবের আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছিল না। হঠাৎ কী এমন হলো যে বাড়ি না গিয়ে এই ভরদুপুরে গাড়ি গ্রামের বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? সারিমই বা ফোনে কী এমন বলল, যা আরিশান মৃধার মতো লৌহমানবকে এভাবে স্তব্ধ করে দিতে পারে? জেবা ওনাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও ওনার ওই ভয়ঙ্কর, থমথমে মুখমণ্ডল দেখে আর সাহস পেল না।
ঘণ্টাখানেকের রুদ্ধশ্বাস যাত্রার পর গাড়িটা পিচঢালা মূল রাস্তা ছেড়ে একটা মেঠো পথের দিকে মোড় নিল। দুপাশে সর্ষে খেত আর দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ গাছপালার সারি। তবে সেই প্রকৃতির মাঝে কোনো স্নিগ্ধতা নেই, যেন এক থমথমে হাহাকার চারপাশটাকে গ্রাস করে রেখেছে। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়িটা এসে থামল এক বিশাল, প্রাচীন ধাঁচের বাড়ির সামনে।
গাড়ি থেকে নেমে অরি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল সামনের দৃশ্যটার দিকে। ইট-পাথরের দেওয়ালে শ্যাওলার আস্তরণ, ভিক্টোরিয়ান আমলের বিশাল খিলান আর চারপাশের এক গম্ভীর প্রাচীনত্ব জানান দিচ্ছে-এই বাড়ি শুধু ইটের তৈরি কোনো কাঠামো নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত সাক্ষী। বাড়ির মূল ফটকের ওপর তামাটে রঙের একটা ভারী নেইম প্লেটে বড় বড় অক্ষরে খোদাই করে লেখা— ‘সুখ কুঞ্জ’।
অরি নিজের চশমাটা ঠিক করতে করতে ধীর পায়ে সারিমের পাশে এসে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো তখনো সেই বাড়িটার নেইম প্লেটের ওপর আটকে আছে। এই বিষণ্ণ পরিবেশেও নামটা কেমন যেন একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতার আমেজ ছড়াচ্ছে।অরি সারিমের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
_“‘সুখ কুঞ্জ’? বাড়ির নামটা অদ্ভুত!মনে হচ্ছে কেউ খুব ভালোবেসে নামটা দিয়েছে”
সারিমের শক্ত হয়ে থাকা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে নেইম প্লেটটার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম গলায় বলল,
_“আমার দাদির নাম ছিল ‘সুখ’। বাবা বলতেন, দাদি যেখানেই পা রাখতেন, সেখানেই নাকি এক অদ্ভুত সুখ আর আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত। ওনার হাসিতে, ওনার কথায় পুরো বাড়ি নাকি সারাক্ষণ মুখরিত থাকত। দাদা দাদিকে বড্ড ভালোবাসতেন। ওনার সেই ভালোবাসার মান রাখতেই, দাদির নামানুসারে এই বাড়ির নাম রাখা হয়েছিল ‘সুখ কুঞ্জ’। দাদার কাছে দাদিই ছিলেন ওনার জীবনের একমাত্র সুখের উৎস।”
অরি অবাক হয়ে সারিমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই পুরুষটার কণ্ঠে ওনার পূর্বপুরুষদের ভালোবাসার গল্প ফুটে উঠতে দেখে,কেন যেন অরির বুকের ভেতর একটা অন্যরকম দোলা দেয়। ও চোখ দুটো সামান্য বড় করে আবার জিজ্ঞেস করল,
_“তারা কি এখনো বেঁচে আছেন? মানে, আপনার দাদা-দাদি?”
সারিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটো কেমন যেন শোনাল,
“নাহ। আমি এই পৃথিবীতে আসার অনেক আগেই ওনারা দুজনেই ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন। আমি ওনাদের কখনো দেখিনি। তবে বাবার মুখে, ফুফুর মুখে ওনাদের ভালোবাসার আর এই সুখ কুঞ্জের সোনালী দিনগুলোর কথা এতবার শুনেছি যে, মনে হয় ওনারা আমার বড্ড চেনা।কিন্তু… ”
সারিম কথা শেষ করতে পারল না। ওর কণ্ঠস্বর মাঝপথেই বুজে এলো। ঠিক তখনই সুখ কুঞ্জের বিশাল লোহার ঝং ধরা গেইটে হুড়মুড় করে খুলে গেল। ভেতর থেকে সাদা শাড়ি পরা মধ্যবয়সী এক ভদ্রমহিলা প্রায় পাগলের মতো ছুটে এলেন বাইরের উঠোনে। ওনার চুলগুলো উষ্কখুষ্ক, চোখের কাজল লেপ্টে পুরো মুখে এক ভয়াবহ কালচে আভা তৈরি হয়েছে। ওনাকে দেখামাত্রই সারিম নিজের সমস্ত গাম্ভীর্য ভুলে
_“ছোট চাচি!” বলে দ্রুত করে ওনার দিকে এগিয়ে গেল।
মহিলা আর কেউ নন, সারিমের ছোট চাচি আনজুমান বেগম।আরিশান মৃধার ভাই সুফিয়ান মৃধার সহধর্মিণী। আনজুমান বেগম সারিমকে দেখামাত্রই ওনার কাঁপতে থাকা দুই হাত দিয়ে সারিমের চওড়া বুকটা খামচে ধরলেন। ওনার বুক চিরে এক তীব্র, গগনবিদারী আর্তনাদ বেরিয়ে এলো,
_“বাপ রে! ও সারিম! তোর ছোট আব্বা আর নাই রে বাপ! আমার মানিক চাঁদ আমাদের এই মাঝদরিয়ায় একা ফেলে রেখে চলে গেছে রে!আমি এখন কার মুখ দেখে বাঁচব? আমার সংসার যে এক নিমেষে ছারখার হয়ে গেল!”
আনজুমান বেগমের এই আহাজারিতে পুরো সুখ কুঞ্জের আকাশ-বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। ওনার কান্নার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ওনার পা দুটো আর শরীরের ভার সইতে পারছিল না। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়তে চাইলেন। সারিম অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ওনার কোমর ধরে আগলে নিল। ছোট চাচিকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল,
_“চাচি, নিজেকে সামলান। এভাবে ভেঙে পড়বেন না, প্লিজ। আমি এসেছি তো। নিজেকে শক্ত করুন চাচি…”
কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই তখন সেই সদ্য বিধবা নারীর কানে পৌঁছাচ্ছিল না। তিনি ধপাস করে উঠোনের ধুলোবালির মধ্যেই গড়িয়ে পড়ে বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলেন।
অরি স্তব্ধ হয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। গাড়ি করে যখন সারিম ওকে থানা থেকে নিয়ে আসছিল, তখন পথিমধ্যে সারিমের ফুফু রুবাব মৃধা ফোন করে এই ভয়াবহ খবরটা দিয়েছিলেন। সারিমের ছোট চাচা, সুফিয়ান মৃধা, যিনি আজ সকালেই হুট করে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক করে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। খবরটা পাওয়ার সাথে সাথেই সারিম এক মুহূর্ত দেরি না করে গাড়ির চাকা উল্টো পথে ঘুরিয়ে হাইওয়ের দিকে ছুটে এসেছিল। আর আসার পথেই ও আরিশান মৃধাকে ফোন করে এই দুঃসংবাদটি জানিয়ে দিয়েছিল।
মৃধা পরিবারের বংশলতিকাটা বেশ বনেদি আর ছোট। আরিশান মৃধারা দুই ভাই আর এক বোন। সবার বড় আরিশান মৃধা, মেজো বোন রুবাব মৃধা, আর সবার ছোট ছিলেন সুফিয়ান মৃধা—যিনি আজকে ওনাদের সবাইকে কাঁদিয়ে চিরতরে ইন্তেকাল করেছেন।
ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে ধীর পায়ে হেঁটে এলেন এক মাঝবয়সী নারী। ওনার পরনে দামী শাড়ি, চোখে মুখে একভিজাত্যের ছাপ থাকলেও বর্তমানে সেখানে শোকের ছায়া স্পষ্ট। তিনি আর কেউ নন, সারিমের ফুফু রুবাব মৃধা। সারিমকে দেখামাত্রই তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে সারিমকে জড়িয়ে ধরলেন।বললেন,
_“আমার ভাইটা চলে গেল রে সারিম! আমাদের সুফিয়ান আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেল!” রুবাব মৃধা সারিমের কাঁধে মুখ রেখে কাঁদতে লাগলেন।
সারিম ওনাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে ওনার পিঠ চাপড়ে দিতে লাগল।তখনি কাঁদতে কাঁদতেই রুবাব মৃধার চোখ আচমকা গিয়ে থমকে গেল সারিমের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির ওপর।
অরি তখনো সেখানে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। দুপুরের কড়া রোদ ওর ভুবনমোহিনী রূপের ওপর পড়ে যেন এক স্বর্গীয় আভা তৈরি করেছে। টানা টানা দুটো চোখ, মায়াবী ফর্সা মুখাবয়ব আর ছিপছিপে গড়ন—যে কেউ এক পলক দেখলে চোখ ফেরাতে পারবে না। রুবাব মৃধার কান্না এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওনার চোখ দুটো কুঁচকে গেল। সারিমের পাশে এমন এক অপরূপা কন্যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওনার বিস্ময়ের সীমা রইল না।
কিন্তু ওনার সেই বিস্ময় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিরক্তিতে রূপ নিল, যখন ওনার দৃষ্টি গেল অরির পরনের পোশাকের দিকে। ক্যাজুয়াল শার্ট,জিন্স। এই রক্ষণশীল, প্রাচীন মৃধা পরিবারের উঠোনে এমন একটা শোকের পরিবেশে একটা মেয়ে এভাবে জিন্স-শার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে, এটা ওনার গ্ৰামিন মনস্তত্ত্বে প্রচণ্ড বড় একটা ধাক্কা দিল।
রুবাব মৃধা নাক সিঁটকে অত্যন্ত অবজ্ঞার দৃষ্টিতে অরির দিকে তাকালেন। মনে মনে ভাবলেন, ‘শুধু রূপ থাকলেই কি আর সারে? মেয়েটার কোনো আদব-কায়দা নেই? একটা জানাজা আর দাফনের বাড়িতে কেউ এভাবে সঙ সেজে আসে?’
মৃধা পরিবারের সাথে আরিশান মৃধার সম্পর্ক বহু বছর আগেই চুকেবুকে গেছে। সেই যে তরুণ বয়সে আরিশান মৃধা ওনাদের অমতে, পরিবারের বিরুদ্ধে আনতারা মৃধার হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তারপর থেকে এই পরিবারের কেউ আরিশান মৃধার মুখ দর্শন করেনি। ওনাকে ত্যাজ্য করা হয়েছিল। তবে সারিমের সাথে ওনাদের রক্তের টান আর টুকটাক যোগাযোগ সবসময়ই ছিল। সারিম ওনাদের কাছে নিজের ছেলের মতোই আদরের।
রুবাব মৃধা অরির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার সারিমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওনার প্রয়াত ভাইয়ের নামে হায়-হুতাশ করতে লাগলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সুখ কুঞ্জের গেইটের সামনে এক বিকট শব্দে ব্রেক কষে থামল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধার সেই কালো মার্সিডিজ গাড়িটি। গাড়ি থামার সাথে সাথেই পেছনের দরজা খুলে ধীর পায়ে নেমে এলেন আরিশান মৃধা।ওনার মুখটা ফ্যাকাশে, চোখ দুটো লালচে।
বুকের ভেতরটা তপ্ত বালুচরের মতো শুকিয়ে আসছিল আরিশান মৃধার। যতবারই এই ‘সুখ কুঞ্জ’-এর সীমানায় তিনি পা রেখেছেন, ততবারই নিয়তি তার সামনে কোনো না কোনো লাশের মিছিল দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আজ থেকে বহু বছর আগে, যেদিন তিনি বাবা জয়নাল মৃধার মৃত্যুর খবর পেয়ে এই উঠোনে এসেছিলেন, সেদিনও বাতাস এমন ভারী ছিল। কিন্তু সেদিন তার আপন চাচা ইকবাল মৃধা আর এই সমাজ তাকে গেটের বাইরে কুকুর-বিড়ালের মতো তাড়িয়ে দিয়েছিল। বাবার মরা মুখটাও দেখতে দেওয়া হয়নি শুধু একটাই অপরাধে—তিনি পরিবারের অমতে, বংশের তোয়াক্কা না করে ভালোবেসে আনতারাকে বিয়ে করেছিলেন। আজ চাচা ইকবাল বেঁচে নেই, তাকে বাধা দেওয়ার মতো ক্ষমতা এই বাড়ির আর কারও নেই। আজ তিনি দেশের প্রতাপশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু কী এক অদ্ভুত নিয়তি! আজ যখন তিনি বিনা বাধায় এই বাড়ির অন্দরে পা রাখলেন, তখন অভ্যর্থনা জানাতে কোনো জ্যান্ত মানুষ এগিয়ে আসেনি, এসেছে তার ছোট ভাই সুফিয়ান মৃধার নিথর দেহ।
রুবাব মৃধা আরিশান মৃধার বুকে মাথা কুটে কাঁদতে লাগলেন।
_“তুমি এত বছর পর আসলা ভাই? কিন্তু এসে কী দেখলা? আমাদের সুফিয়ান আর নাই! ও তোমার ওপর কত রাগ করে ছিল ভাই, মরার আগেও তোমার নামটা একবার মুখ দিয়ে বলে গেছে!”
আরিশান মৃধা ওনার বোনের পিঠে কাঁপতে থাকা হাতটা রাখলেন।চেয়েও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারলেন না তিনি।কোনো কথা বললেন না। ওনার কণ্ঠরোধ হয়ে এসেছে।এতো বছর পর ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা হলো, তাও আবার ওনার লাশ দাফন করার জন্য-এর চেয়ে বড় শাস্তি একজন বড় ভাইয়ের জন্য আর কী হতে পারে?
তখনি গাড়ি থেকে একটু পরেই নেমে এলো জেবা। এখানে এসে চারপাশের এই কান্নাকাটি, চিৎকার আর হায়-হুতাশ দেখে ওর মাথার ওপর দিয়ে সবকিছু চলে গেল। ও এসবের আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছিল না।
জেবা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে অরির পাশে দাঁড়াল। ও অরির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে চোখ দুটো গোল গোল করে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_“দোস্ত… কী হচ্ছে এসব? এরা এভাবে ঠিক ওই স্টার জলসা আর জি বাংলার সিরিয়ালের মতো ডায়ালগ দিয়ে দিয়ে ধুপধাপ আছাড় খেয়ে কাঁদছে কেন রে? ঘটনা কী? ওই গম্ভীর বুড়ো খড়খড়ে মিনিস্টারকে ওভাবে জড়িয়ে ধরে ওই ভদ্রমহিলা কেন ভাঙা রেকর্ডের মতো চেঁচাচ্ছে?”
অরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেবার দিকে তাকাল। ওর নিজের মনটাও তখন বেশ ভারাক্রান্ত।সে জেবার কানের কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
_“দোস্ত, সিরিয়াল না, এটা বাস্তব। সারিমের ছোট চাচা, মানে তোর দেবর।আজকে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।”
অরির মুখ থেকে এই কথা শোনামাত্রই জেবার মুখটা হা হয়ে গেল। ও এক পলক আরিশান মৃধার দিকে তাকাল, যিনি ওনার বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। জেবার বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অদ্ভুত অপরাধবোধ আর সমবেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। ও মনে মনে ভাবল,
_‘ইস! লোকটার ভাই মারা গেছে, আর আমি এতক্ষণ ওনার ওপর রাগ বসেছিলাম!’
উঠোনে তখনো কান্নার রোল বয়ে যাচ্ছে। আনজুমান বেগমকে ধরে বাড়ির অন্য মহিলারা ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ওনার আর্তনাদ যেন থামবার নয়। রুবাব মৃধা এতক্ষণ আরিশান মৃধার বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। বহু বছরের দূরত্ব আর অভিমান এক নিমেষে ভাইয়ের এই চরম বিপদের দিনে মুছে গেলেও, ওনার ভেতরের তীক্ষ্ণ সামাজিক ও পারিবারিক দৃষ্টিশক্তি কিন্তু পুরোপুরি লোপ পায়নি।
কান্না কিছুটা সামলে নিয়ে, চোখ মুছতে মুছতে রুবাব মৃধার দৃষ্টি আবার গিয়ে পড়ল অরি আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জেবার ওপর।বিশেষ করে জেবাকে দেখে ওনার চোখ দুটো আরো সরু হয়ে গেল। আরিশান মৃধার সঙ্গে আসতে দেখে।
রুবাব মৃধা আরিশান মৃধার বুক থেকে সরে দাঁড়ালেন। ওনার এক মুহূর্তের জন্য তীব্র কৌতূহল ভর করল। তিনি সারিম আর আরিশান মৃধার দিকে পর্যায়ক্রমে তাকিয়ে, অরি ও জেবাকে ইশারায় দেখিয়ে বেশ চড়া এবং কিছুটা কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
_“এই মেয়েগুলো করা!আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হয়না?”
সেখানে তখনো গ্রামের বেশ কিছু মানুষ জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। রুবাব মৃধার এমন তীক্ষ্ণ প্রশ্নে।সারিম কোনো রকম ভাবাভাবি না করেই, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় সবার সামনে বলে দিল,
_“ফুফু, এতো অস্থির হওয়ার কিছু নাই। সোজা হিসেবে বুঝে নাও—একটা আমার বউ, আর ওই পাশেরটা বাবার বউ।”
সারিমের এই অকপটে বলা বিস্ফোরক মন্তব্যে পুরো উঠোন যেন এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল! কান্নার শব্দগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেল। আনজুমান বেগমের আহাজারি পর্যন্ত এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। উপস্থিত গ্রামের মানুষগুলো একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।
রুবাব মৃধা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি স্তম্ভিত হয়ে প্রথমে সারিমের দিকে, এবং তারপর ওনার বড় ভাই আরিশান মৃধার দিকে প্রশ্নবোধক ও তীব্র বিস্ময় ভরা চোখে তাকালেন। ওনার চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
এদিকে আরিশান মৃধার অবস্থা তখন শোচনীয়। নিজের ছেলের এই কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণে ওনার ইচ্ছে করছে মাটির সাথে মিশে যেতে। ওনার ভেতরের রাগ তখন চড়চড় করে মাথায় উঠছিল।মনে হচ্ছিল, যদি পারতেন তবে এই মুহূর্তেই ছেলেটাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলতেন!
‘কী দরকার ছিল এই শোকের বাড়িতে, সবার সামনে এভাবে বোমাটা ফাটানোর? সারিম কি পরিস্থিতিটা একটুও বুঝতে পারে না? ও কি জানে না যে এই কথাগুলো পরে, একটু আড়ালে বা ঘরোয়াভাবে সবাইকে বলা যেত?’ আরিশান মৃধা দাঁতে দাঁত চেপে সারিমের দিকে তাকালেন, ওনার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল।
কিন্তু সারিম তো সারিমই। সে বাবার এই রক্তচক্ষুকে বিন্দুমাত্র পরোয়া করল না। উল্টো বাবার দিকে তাকিয়ে, বেশ রসিয়ে এবং একটু ফোরন কাটার ভঙ্গিতে আবার বলে উঠল,
_“কী ড্যাডি? চুপ করে আছ কেন? মুখ ফুটে বলছ না কেন ফুফুকে? ওই যে নীল জামা পরা মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে, ওইটাই তো তোমার নতুন বউ! তোমার ঘরের নতুন লক্ষ্মী!”
সারিমের এই দ্বিতীয় ধাক্কায় রুবাব মৃধার মাথা ঘোরার উপক্রম হলো। তিনি নিজের বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্যে একেবারে বোবা হয়ে গেলেন। ওনার দৃষ্টি এবার খুব সূক্ষ্মভাবে গিয়ে পড়ল জেবার ওপর। জেবা তখনো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ও বুঝতে পারছে না যে ওর দিকে সবাই এভাবে ডাইনি দেখার মতো করে কেন তাকাচ্ছে।
রুবাব মৃধা মনে মনে জেবার বয়স আন্দাজ করার চেষ্টা করলেন।মেয়েটা দেখতে হুবহু ওনার মেয়ে ফুলের বয়সী! সর্বোচ্চ আঠারো থেকে -বিশ বছর বয়সের মধ্যে হবে। আর ওনার বড় ভাইয়ের বয়স!ভাবতেই রুবাব মৃধার মনের ভেতর এক তীব্র ঘৃণাও মিশ্রিত বিরক্তি দানা বেঁধে উঠল। তিনি মনে মনে ভাবলেন,টাকার গরম আর পাওয়ারের দাপট থাকলে পুরুষ মানুষ বুড়ো বয়সেও কতটা নিচে নামতে পারে!তা তার এই বড় ভাইকে না দেখলে ওনি বুঝতেন না, যিনি সমাজের এত বড় একজন ব্যক্তি, শেষমেশ নিজের হাটুর বয়সী একটা কচি মেয়েকে বিয়ে করেছেন নিজের লালসা মেটাতে? ছিঃ! এই লোকটার কি কোনো লজ্জা-শরম নেই? ছোট ভাইয়ের লাশ ঘরে পড়ে আছে, আর উনি এসেছেন ওনার কচি বউকে সাথে নিয়ে শো-অফ করতে!’
রুবাব মৃধার ফর্সা মুখটা রাগে রি রি করে উঠল। তিনি নিজের ভেতরের ক্ষোভ চেপে রাখতে পারলেন না। জেবাকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে বলে উঠলেন,
_“এই মেয়ে, তোমার কি একটুও আক্কেল জ্ঞান নেই? কেমন বংশের মেয়ে তুমি যে এই বাবার বয়সী লোককে বিয়ে করে বসে আছো…”
_“রুবাব!”
আরিশান মৃধার বজ্রকণ্ঠের গর্জনে রুবাব মৃধার কথা মাঝপথেই আটকে গেল। এতক্ষণ আরিশান মৃধা চুপ করে ছেলের ওপর রাগ সামলানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু নিজের স্ত্রীকে এভাবে সবার সামনে অপমানিত হতে দেখে ওনার ভেতরের আত্মসম্মান গিয়ে থেকল। যতোই তিনি জেবার সঙ্গে বিয়েটা না মানুক, কিন্তু জেবা ওনার দ্বায়িত্ব সেটা ভুলে গেলে চলবেনা।ওনার মুখমণ্ডল শক্ত হয়ে গেল। তিনি বোনের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর এবং আদেশসূচক গলায় বলে উঠলেন,
_“নিজের মুখ সামলে কথা বলো, রুবাব। যাকে তুমি ‘এই মেয়ে’ বলে ডাকছ, সম্পর্কে সে তোমার বড়। বয়সে ছোট হলেও সে এখন এই মৃধা পরিবারের বড় বউ। সুতরাং, তাকে ‘ভাবি’ বলে ডাকো!”
রুবাব মৃধা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। ওনার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। তিনি ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বললেন,
_“কী বললে তুমি, ভাই? আমি একে ভাবি বলে ডাকব? এই আমার মেয়ের বয়সী একটা ছুকরিকে আমি ভাবি বলে সম্মান দেব? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? কোন সাহসে তুমি এই কথা আমাকে উচ্চারণ করতে বললে?”
আরিশান মৃধাও দমবার পাত্র নন। তিনি ওনার বোনের স্বভাব খুব ভালো করেই জানেন। এই পরিবারের সবাই মুখে যত সংস্কৃতির কথাই বলুক না কেন, ভেতরে ভেতরে সবাই নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যই ব্যস্ত থাকে। তিনি এক পা এগিয়ে এসে বললেন,
_“আমি যা বলেছি, ভেবেচিন্তেই বলেছি। সম্পর্কটা বয়সের ফ্রেমে বাঁধা থাকে না, রুবাব। সে আমার বিবাহিত স্ত্রী, আইনত এবং ধর্মত।আমাকে বড় ভাই হিসেবে যদি মেনে থাকো,তবে তাকেও সেই সম্মানটুকু দিয়েই কথা বলতে হবে। এখানে অনধিকার চর্চা করার চেষ্টা করো না।”
_“অনধিকার চর্চা?”
রুবাব মৃধা রেগে বলে উঠলেন,
_“এইরকম একটা কচি মেয়েকে করতে তোমার বিবেকে একটুও বাধল না? সমাজ আমাদের মুখে থুতু দেবে,ভাই!”
_”সমাজ কি বললো না বললো, সেসব এর তোয়াক্কা আরিশান মৃধা কখনোই করে না।”
আরিশান মৃধার কথা শুনে রুবাব বেগম আরো রেগে উঠেন। দুই ভাই আর বোনের মধ্যে রীতিমতো তুমুল তর্কাতর্কি শুরু হয়ে গেল। উঠোনের কান্নার পরিবেশটা এক মুহূর্তে এক কদর্য পারিবারিক কলহে রূপ নিল। উপস্থিত গ্রামবাসীরা কান খাড়া করে সেই ঝগড়া উপভোগ করতে লাগল।
সারিম এই সব ঝগড়াঝাঁটি দেখে চরম বিরক্ত হলো। ওর এই সব ফালতু পারিবারিক ড্রামা দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। সে পাশ কাটিয়ে অলক্ষ্যে অরির নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরল। অরি চমকে উঠে সারিমের দিকে তাকাল, কিন্তু সারিম ওকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না।সে অরিকে টেনে নিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করল।সুখ কুঞ্জের মূল সদর দরজার খিলানটা পার হতে যাবে, ঠিক তখনই ওদের নজরে পড়লো এক তরুণী।
মেয়েটি আর কেউ নয়, রুবাব মৃধার একমাত্র মেয়ে—ফুল।
ফুল সেখানে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। ও এতক্ষণ উঠোনের সব কথাই শুনেছে। কিন্তু কান যা শুনেছে, ওর মন তা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।মেয়েটার চোখ দুটো তখন ছলছল করছে, গণ্ডদেশ বেয়ে দু-ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়।
ফুলের পুরো কিশোরী ও তরুণী বয়সটার একমাত্র কল্পনা জুড়ে সমস্ত স্বপ্নের আকাশে যে মানুষটার একচ্ছত্র বসত ছিল—সে আর কেউ নয়,ফুলের সারিম ভাই। ফুল মনে মনে সারিমকে নিজের স্বামী হিসেবেই ভেবে এসেছে এতদিন। ভেবেছিল একদিন সারিম ভাই ওকে এই সুখ কুঞ্জ থেকে ধুমধাম করে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। কিন্তু আজ সেই সব রঙিন স্বপ্ন, সেই সব তিল তিল করে গড়ে তোলা কল্পনা এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গুঁড়িয়ে গেল।
ফুল সারিমের হাতের দিকে তাকাল। সারিম অত্যন্ত শক্ত করে অরির হাতটা ধরে রেখেছে।এটা দেখে ফুলের বুকটা যেন এক তীব্র যন্ত্রণায় ফেটে যেতে চাইল।
অরি ফুলের এই অবস্থা দেখে একটু অদ্ভুতভাবে ওর দিকে তাকাল। সে ফুলকে চেনে না, ওর এই কান্নার কারণও অরির কাছে স্পষ্ট নয়। তবে একটা মেয়ের চোখে অন্য একটা পুরুষের জন্য এমন তীব্র আকুলতা আর ভাঙনের রূপ দেখে অরির মনটা কেমন যেন করে উঠল। সে সারিমের হাতের বাঁধনটা একটু আলগা করার চেষ্টা করল, কিন্তু সারিম অরির হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরল।
ফুলের চোখের জল বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো নেমে এলো। সারিম ওকে কোনো পাত্তাই দিল না। সে ফুলকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে অরির হাত ধরে টেনে নিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
ভেতরে ঢোকা মাত্রই এক বিশাল ড্রয়িং রুম। চারপাশের পরিবেশটা দেখে সারিমের কপাল কুঁচকে গেল। ঘরের ভেতরে কম করে হলেও শতখানেক মানুষ বসে আছে। পুরো ড্রয়িং রুমটা যেন একটা শোকের বাজার। সেখানে একেকজন মহিলা একেক ভঙ্গিতে সুর মিলিয়ে, বুক চাপড়ে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে কাঁদছে।
সারিম ভালো করেই জানে, এদের মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে গ্রামের এমন সব মহিলা—যারা হয়তো সুফিয়ান মৃধাকে বছরে একবারও দেখেনি, কিংবা ওনার সাথে ওনাদের দূরতম কোনো আত্মীয়তাও নেই। কিন্তু এখন তারা একজন আরেকজনের কান্না দেখে, কে কার চেয়ে বেশি জোরে গাইতে পারে, সেই প্রতিযোগিতায় নেমে সুর মিলিয়ে কাঁদার তালে তাল যোগ দিচ্ছে। কেউ একজন একটু থামলেই পাশের জন ওনাকে উসকে দিচ্ছে, আর অমনি আবার দ্বিগুণ বেগে কান্নার কোরাস শুরু হচ্ছে।
একেকজনের কান্নার এই কৃত্রিম রূপ দেখে সারিমের মেজাজ চড়চড় করে বাড়তে লাগল। ওর চরম বিরক্ত লাগছিল। এই মেকি কান্না আর ভণ্ডামি ওর সহ্য হয় না। সে অরির হাত ধরে টানতে টানতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের ঘরের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। ভাবল ওপরের ঘরগুলো হয়তো একটু শান্ত হবে।কিন্তু ওপরের তলায় গিয়ে ও দেখল—সেখানেও একই অবস্থা! প্রতিটি ঘরেই জটলা পাকিয়ে মহিলারা বসে বসে কান্নার মহড়া দিচ্ছে। পুরো সুখ কুঞ্জটা যেন একটা নরকে পরিণত হয়েছে। শেষমেশ চরম বিরক্ত হয়ে সারিম একটা মাঝারি আকারের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ভেতরে ঢুকে সে দেখল, সেখানেও কয়েকজন মহিলা বসে বুক চাপড়াচ্ছে। আর তার ঠিক মাঝখানে, এক কোণায় বসে আছে এক সাত-আট বছরের ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে। মেয়েটা ওর মায়ের দেখাদেখি,চোখ কচলে জোর করে সুফিয়ান মৃধার শোক পালনে কাঁদার চেষ্টা করছে! হয়তো বুঝতেই পারছে না যে কেন কাঁদছে, কিন্তু সামাজিক নিয়ম রক্ষার্থে ওকেও কাঁদতে হচ্ছে।
সারিমের ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল।সে হনহন করে ঘরের ভেতরে ঢুকে সোজা ওই বাচ্চা মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কোনো কিছু না ভেবেই, ও মেয়েটার হাত ধরে একটা হেঁচকা টান মেরে ওখান থেকে উঠিয়ে দিল।
_“ঐ মেয়ে, ওঠ এখান থেকে! যা বাইরে গিয়ে খেলগা!”
বাচ্চা মেয়েটা আর ওর মা সারিমের এই উগ্র রূপ দেখে কুঁকড়ে গেল একটু।মেয়েটার মা দ্রুত মেয়েকে নিয়ে ঘর থেকে প্রায় পালিয়ে বাঁচল। সারিম এরপর অরির দিকে তাকিয়ে ওর কাঁধ ধরে টেনে এনে ঠিক সেই খালি জায়গাটাতে বসিয়ে দিল।
_“তুমি এখানে বসো,চন্দ্রিমা,” সারিম একটু নরম গলায় বলল।
অরি ধীরপায়ে সেখানে বসল। কিন্তু সেখানে বসে থাকা গ্রামের অন্য প্রায় সব মহিলার দৃষ্টি এবার পুরোপুরি নিবদ্ধ হলো অরির ওপর। কান্নার মাঝেই ওনারা চোখ তুলে অরিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। কেউ কেউ অরির সেই অপরূপ, ভুবনমোহিনী রূপ দেখে ভেতরে ভেতরে মুগ্ধ হচ্ছিল আবার কেউ কেউ অরির ড্রেসআপ দেখে নাক সিঁটকাচ্ছিল, নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলছিল,
_‘মড়া বাড়িতে এমন বেহায়া পোশাক পইরা আইছে, শহরের মাইয়াদের কোনো ছিরি-ছাঁদ নাই!’
সারিম ওসব ফিসফিসানি কানেই তুলল না।সে অরির ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল। অরিকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। এতক্ষণ ধরে এত ঝামেলার মধ্য দিয়ে আসার পর ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে নিশ্চই। সারিম ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে এক কাজের লোককে ডেকে বলল,
_“এই! জলদি এক বোতল ঠান্ডা পানি নিয়ে আয় ওপরের ঘরে। এক মিনিটের মধ্যে যেন পাই!”
কাজের লোকটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এক মিনিটের মধ্যেই এক বোতল পানি আর একটা গ্লাস নিয়ে হাজির হলো। সারিম গ্লাসটা সরিয়ে রেখে নিজেই পানির বোতলের ছিপিটা খুলল। এরপর সে সবার সামনে, নিচে এক হাঁটু গেড়ে বসে, অত্যন্ত যত্নের সাথে বোতলটা অরির ঠোঁটের কাছে ধরল।
_“নাও, পানিটা খাও।গলাটা শুকিয়ে গেছে তোমার,” সারিম খুব নরম, প্রায় আদুরে গলায় বলল।
অরি একটু ইতস্তত করছিল চারপাশে এত মানুষের চোখের সামনে এভাবে পানি খেতে, কিন্তু সারিমের চোখের দিকে তাকিয়ে সে আর না করতে পারল না। সে ধীর ধীরে বোতলে চুমুক দিয়ে পানি খেতে লাগল। ওর গাল বেয়ে দু-ফোটা পানি ফর্সা গলায় গড়িয়ে পড়ল। তা দেখে সারিম নিজের জিভের সাহায্যে ঠোঁট টা কিছুটা ভিজিয়ে নিয়ে একটা ঢোগ গিলল।
আশেপাশে বসে থাকা গ্রামের মহিলাগুলো এসব দেখে নিজেদের মধ্যে কনুই দিয়ে ঠেলাঠেলি শুরু করে দিল।একেকজন চোখ বড় বড় করে ফিসফিস করতে লাগল,
_“ও মা! দেখ দেখ, আরিশান মৃধার পোলারে দেখ! মড়া বাড়িতে বউরে কেমন লুতুপুতু কইরা পানি খাওয়াইতাছে! শহরে পোলাডি এক্কেবারে স্বভাব নষ্ট হইয়া গেছে। মা-বাপের সামনে একটুও শরম নাই!”
ঠিক তখনি সেই ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন রুবাব মৃধা। ওনার পেছনে গুটিগুটি পায়ে মুখটা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে জেবা। উঠোনের সেই তুমুল ঝগড়ার পর আরিশান মৃধার ধমক খেয়ে রুবাব মৃধার মুখটা এখন আলকাতরার মতো কালো হয়ে আছে। তিনি বড় ভাইয়ের আদেশ অমান্য করতে পারেননি, তাই অগত্যা জেবাকে ভেতরের দিকে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
রুবাব মৃধা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে একবার অরির দিকে তাকালেন, তারপর জেবাকে কোনোমতে ঘরের এক কোণায় দাঁড় করিয়ে রেখে, আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাড়িয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেলেন। ওনার চলে যাওয়ার ভঙ্গিটাই বলে দিচ্ছিল যে তিনি এই দুই মেয়েকে কতটা ঘৃণা করছেন।
জেবা ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করতে লাগল। ওর এইসব কান্নার রোল আর অচেনা পরিবেশ দেখে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মহিলারা যেন এতক্ষণ সারিমের ভয়ে একটু চুপ ছিল,এখন রুবাব মৃধাকে বাইরে যেতে দেখে ওনারা ভাবল ওনাদের ডিউটি আবার শুরু করা উচিত। ওনারা আবার এমনভাবে সুর ধরে কাঁদতে লাগল যেন ওনাদের নিজের আপন কেউ মারা গেছে। একেকজনের গলার আওয়াজ ঘরের ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।চেনা, পরিচিত, অপরিচিত সব সীমানা পেরিয়ে প্রয়াত সুফিয়ান মৃধার জন্য এক মেকি কান্নার রোল তুলল।
অরির এসবে সত্যি খুব খারাপ লাগছিল। ওর মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। নিজস্ব এক ধরনের শালীনতা মানসিক সুস্থতা আছে, যা এই ধরনের ভণ্ডামি সহ্য করতে পারে না। সে যদিও মুখে কিছু বলছিল না এবং সারিমকে ওর এই অস্বস্তি বুঝতে দিতে চাচ্ছিল না,কিন্তু সারিম ওর চোখের ভাষা ঠিকি খুব ভালো করেই বোঝে ফেলে।
সারিম সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল।ওর দু চোখ লাল হয়ে উঠল।এরপর রুমে থাকা মহিলাগুলোর উদ্দেশ্য গগনবিদারী রাম ধমক দিল-
_“স্টপ ইট!!! একদম চুপ!!!”
সারিমের এই আকস্মিক ও ভয়াবহ চিৎকারে পুরো ঘরের মহিলারা যেন এক মুহূর্তে চুপ হয়ে গেল। অনেকের মুখের হাঁ হাঁ অবস্থাতেই আটকে রইল, কেউ কেউ বুক চাপড়ানো হাতটা শূন্যেই ধরে রাখল। এক সেকেন্ডে সবকিছু পিনপতন নীরবতায় রূপ নিল। সবাই ভয়ার্ত চোখে, রাগী পুরুষটার দিকে তাকিয়ে রইল।
সারিম ওর দুই হাত কোমরে রেখে, রক্তচক্ষু চারপাশের মহিলাদের ওপর বুলিয়ে অত্যন্ত চড়া ও কড়া গলায় বলল,
“কান্না একদম অফ রাখবি! তোদের এই ফালতু গীত গাওয়া আর বালের ভন্ড কান্নার জন্য আমার বউয়ের এখানে ডিস্ট্রাব হচ্ছে!”
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১৮
মহিলারা ভয়ে একে অপরের গায়ে লেপ্টে গেল। সারিম সেখানেও থামল না। সে ওনার ডান হাতের আঙুলটা দরজার দিকে তাক করে, অত্যন্ত হিংস্র গলায় এক চরম হুমকি দিল-
“আমি শেষবারের মতো বলে দিচ্ছি, যদি আর একটাও কান্নার আওয়াজ বা সুর আমার কানে আসে, তবে আমি নিচে গিয়ে আস্ত একটা ঝাড়ু নিয়ে আসব। আর তোদের এই একেকটাকে পিটিয়ে এই সুখ কুঞ্জের বাইরে বের করব!যার যার বেশি কাঁদার শখ জাগছে, সে সোজা বাইরে যা, মেঠো পথে গিয়ে গড়াগড়ি খা। এই ঘরের ভেতর যদি আর একটা টু শব্দ পাই, তবে কারোর পিঠের চামড়া আস্ত থাকবে না! গেট আউট ফ্রম হেয়ার, অর জাস্ট কিপ ইয়োর মাউথ শাট!!!”
