Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩
মেহজাবিন নাদিয়া

ল্যাভেন্ডার রঙের হ্যারিয়ার গাড়িটা মাএই মৃধা নিবাসের পেছনের পকেট গেটের সামনে এসে থামল, তখন আকাশের মেঘগুলো আরও ঘনীভূত হয়ে মুষলধারে বৃষ্টি নামিয়ে দিয়েছে। গাড়ির উইন্ডশিল্ডের ওপর বৃষ্টির জল আছড়ে পড়ার শব্দটা এক অদ্ভুত চিল-চিৎকারের মতো শোনাচ্ছিল। অরি সিটবেল্টটা খুলে নিজের ডার্ক ব্লু রঙের লং শ্রাগটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল। ওর মনের ভেতর তখনো লেকের ধারের সেই দৃশ্যটা তীরের মতো বিঁধছিল। দেশের নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী, ওর সেই তথাকথিত স্বামী আবরার সারিম, মাঝরাতে একটা মেয়ের সাথে এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে লিপ্ত! ভাবতেই অরির পুরো শরীরে এক তীব্র ঘেন্না আর অবজ্ঞার হিল্লোল বয়ে যাচ্ছিল।জেবা হাই তুলতে তুলতে বলল।

“চল দোস্ত, সাবধানে নাম। কাল সকালে আবার কোচিং আছে,”
“তুইও সাবধানে বাড়ি যা বাদামনী। পৌঁছানোর পর একটা টেক্সট করিস,”
অরি গাড়ির দরজা খুলে হালকা মেটালিক স্লাইডার্স জোড়া পায়ে গলিয়ে দ্রুত পা ফেলে নিচে নামল।
জেবা গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাওয়ার জন্য ব্যাক গিয়ার দিতেই অরি পকেট গেটের চাবিটা বের করল। ঠিক তখনই পুরো করিডোরের নিয়ন লাইটগুলো একসঙ্গে জ্বলে উঠল। অরি আর জেবা দুজনেই মনে হলো একসাথে কোনো ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।

গেটের ঠিক ওপাশেই, ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং আরিশান মৃধা!ওনার পরনে এখনো সেই কালো স্যুট। তবে গলার বোতামটা কিছুটা আলগা। ওনার দীর্ঘ সুঠাম অবয়ব আর চোখের মনিতে থাকা সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এই মাঝরাতের অন্ধকারে এক ভয়াল ও গম্ভীর রূপ ধারণ করেছে। ওনার ডানহাতে থাকা দামি ঘড়িটার দিকে ওনি একবার তাকালেন, তারপর অত্যন্ত ধীর লয়ে চোখ জোড়া তুলে তাকালেন অরি আর জেবার দিকে। ওনার এই শান্ত অথচ থমথমে চাহনি দেখে জেবার মনে হলো গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলটা ওর হাত থেকে ফসকে যাবে। ভয়ে ওর কলিজা, আত্মা, লিভার যেন এক টানে বুকের ভেতর শুকিয়ে গেল। ও ভালো করেই জানে, এই বেডার একটা ইশারায় পুরো দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি থমকে যেতে পারে, আর সেখানে ওনারি ঘরের মেয়েকে নিয়ে বেচারি মাঝরাতে ফুচকা খেতে গেছে!
“গাড়ি পার্ক করো জেবা। আর দুজনেই ভেতরে এসো,”
আরিশান মৃধার কণ্ঠস্বর মোটেও চড়া ছিল না। কিন্তু সেই নিচু ও গম্ভীর কণ্ঠস্বরে এমন এক শান্ত তুফান লুকিয়ে ছিল, যা যেকোনো অপরাধীর রক্ত হিম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
ওনি আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে গটগট পায়ে ভেতরের বিশাল ড্রয়িংরুমের দিকে হেঁটে গেলেন। অরি মাথা নিচু করে রইল। ওর ফর্সা গাল দুটো এবার ভয়ে এবং অপরাধবোধে চুন হয়ে গেছে। জেবা কোনোমতে গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে লক করে কাঁপতে কাঁপতে অরির পাশে এসে দাঁড়াল।জেবা ফিসফিসিয়ে বলল।

“অরি রে, আজ আমাদের কপালে কেমিস্ট্রির অ্যাসিড টেস্ট নিশ্চিত! তোর বাপের এই শান্ত লুকটা আমার মোটেও ভালো ঠেকছে না,”
“চুপ কর বাদামনী! সব তোর ওই নাগা ফুচকার জন্য হয়েছে,”
অরি দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিয়ে ভেতরের দিকে পা বাড়াল। মৃধা নিবাসের রাজকীয় ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা তখন পুরোপুরি স্তব্ধ। আরিশান মৃধা সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। ওনার চশমাটা টেবিলের ওপর রাখা, আর ডান হাতের আঙুলগুলো সোফার হাতলে এক নির্দিষ্ট ছন্দে মৃদু শব্দ করছে। এই শব্দের প্রতিটি টোকা যেন জেবার বুকের স্পন্দনকে দ্বিগুণ করে দিচ্ছিল। জেবা হলো আরিশান মৃধার বন্ধু এবং ওনার দীর্ঘদিনের বিজনেস পার্টনার সোলেমান শেখের একমাত্র মেয়ে। সেই সূত্রে আরিশান মৃধা জেবাকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করেন, কিন্তু ওনার শাসনের জায়গাটা সবসময়ই আলাদা।
অরি আর জেবা সোফার সামনে এসে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। অরির পিঠ সমান লম্বা সিল্কি বাদামী চুলগুলো বৃষ্টির ছাঁটে কিছুটা ভিজে কপালে লেপ্টে আছে, যা রিডিং গ্লাসের আড়ালে ওর চোখ দুটোকে আরও বেশি অসহায় দেখাচ্ছিল।

“সময়টা কত বলো তো, অদ্রিজা?”
আরিশান মৃধা ওনার ঘড়ির দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলেন। ওনার গলার গাম্ভীর্য ড্রয়িংরুমের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল।
“বা… বাবা… রাত পৌনে একটা,” অরি কোনোমতে থুতু গিলে বলল।
“পৌনে একটা,”
আরিশান মৃধা পুনরাবৃত্তি করলেন। এবার ওনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল জেবার ওপর।
“মেয়ে হয়ে তুমি এতটুকু কাণ্ডজ্ঞানহীন কীভাবে হলে জেবা? তুমি জানো এই শহরের মাঝরাতের পরিস্থিতি কেমন? সিকিউরিটি প্রোটোকল ভেঙে তোমরা দুজন স্রেফ নিজেদের খেয়াল খুশিতে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছ?”
“আঙ্কেল… আসলে ওটা… অরির কোনো দোষ নেই। আমার ফুচকা খাওয়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তো, তাই…”
জেবা ভয়ে তোতলাতে লাগল।আরিশান মৃধার সামনে দাঁড়ালে ওর মুখ থেকে সকল কথা গায়েব হয়ে যায়।একঝাঁক ভয় এসে হানা দেয় সেখানে।

“ফুচকা?”
আরিশান মৃধার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল, যা পরক্ষণেই এক কঠোর গাম্ভীর্যে রূপ নিল।
“আজকে থেকে ঠিক দশ দিন পর তোমাদের এইচএসসি পরীক্ষা।জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটা। যেখানে চব্বিশ ঘণ্টা বইয়ের পাতায় মন দেওয়ার কথা, সেখানে তোমরা মাঝরাতে ফুচকা উৎসব করছ? অদ্রিজা, আমি কি তোমার পড়াশোনার পরিশেষে কোনো খামতি রেখেছি?”
“না বাবা,”
অরির চোখের কোণটা ভিজে উঠল। পাঁচ বছরে এই মানুষটা তাকে মায়ের মমতা আর বাবার শাসন দিয়ে আগলে রেখেছেন। ওনার এই ক্ষোভ অরিকে ভেতরে ভেতরে দগ্ধ করছিল।
“তাহলে এই অবহেলা কেন? মনে রাখবে, তোমার স্বপ্ন পূরণ করা তোমার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। এসব সস্তা বিনোদন তোমার জন্য নয়,”

আরিশান মৃধা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার কালো স্যুটের অবয়বটা দুই মেয়ের সামনে যেন এক বিশাল পাহাড়ের মতো দেখাল।ওনি কিছুক্ষণ ওদের দিকে তীব্র দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলেন, যেন ওনার ভেতরের সেই কড়া প্রশাসক পুরো পরিস্থিতিকে মেপে নিচ্ছেন। এরপর ওনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন,
“জেবা, আজকে রাতে তোমার আর নিজের বাসায় যাওয়ার দরকার নেই। বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে, আর রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না। সোলেমানকে আমি অলরেডি ইনফর্ম করেছি যে তুমি আজ মৃধা নিবাসেই আছ। অরির রুমে যাও, আর বাকি রাতটুকু নষ্ট না করে যদি পারো বই খোলো।নয়তো ঘুমোয়”
কথাটা শেষ করেই আরিশান মৃধা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালেন না। ওনি ওনার দীর্ঘ ও দৃঢ় পদক্ষেপে নিজের দোতলার বেড রুমের দিকে চলে গেলেন। ওনি চলে যেতেই জেবা একটা বিশাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল।জেবা নিজের বুক ডলতে ডলতে বলল।
“উফ খোদা! আমার মনে হচ্ছিল আমার হার্টবিট বুঝি একশো আশি পার করে গেছে! তোর বাপের এই শান্ত তুফান সহ্য করার চেয়ে পুলিশের লাঠিচার্জ খাওয়া অনেক সহজ রে অরি,”
অরি কোনো কথা বলল না। ওর রিডিং গ্লাসটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল।এরপর একরাশ অবজ্ঞা নিয়ে জেবাকে টেনে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল।

এদিকে ধানমন্ডির সেই কাদা-মাখা পিচের রাস্তায় যখন সারিম নওমিকে রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় ফেলে চলে যাওয়ার পর। নওমি কোনোমতে কাদা থেকে নিজের জর্জেটের শাড়িটা টেনে তুলে উঠে দাঁড়াল। ওর দুই গাল তখন সারিমের সেই চাবুকের মতো বিশটা থাপ্পড়ের আঘাতে লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। ঠোঁটের কোণ ফেটে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, আর নাকটা দিয়ে ঝরছে তাজা লাল রক্ত।
বৃষ্টির মাঝেই ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে নিজের গাড়ির দিকে এগোচ্ছিল আর ব্যাঙের মতো অদ্ভুত এক গোঙানি শব্দ করছিল।
“সারিম! তুই আমাকে আজকে মারলি? আমার ওপর তুই হাত তুললি? আমিও দেখব তুই কতদিন ওই অহংকার নিয়ে বেঁচে থাকিস!” নওমি নিজের গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলে সজোরে থাপ্পড় মেরে চিৎকার করে উঠল।
সে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে বাবার আলিশান বাড়িতে ফিরে এলো। নওমির বাবা তৌফিক খান দেশের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী।সারিম, আহিল, সাদমান আর নওমি—ওরা চারজন সেই স্কুল লাইফ থেকেই একসাথে পড়াশোনা করেছে এবং এক গভীর ফ্রেন্ড সার্কেল গড়ে তুলেছে। কিন্তু নওমি যে সারিমের প্রতি এই চার বছর ধরে এক বিপজ্জনক এবং অসুস্থ মানসিকতা লালন করে আসছিল, তা কেউ কখনো আচঁ করতে পারেনি।
রুমে ঢুকেই নওমি আয়নায় নিজের বীভৎস মুখটা দেখল। ওর চোখের ভেতরের সেই ভালোবাসার উন্মাদনা এবার এক চূড়ান্ত জেদে পরিণত হলো। পরশু ওর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল দেশের আরেকজন বড় শিল্পপতির ছেলের সাথে। কিন্তু নওমি এই মুহূর্তে সেই বিয়ে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
সে ওর ড্রয়ার থেকে ফোনটা বের করল। রাত তখন প্রায় দেড়টা। ও বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে সরাসরি ওর হবু বর তালহাকে ফোন দিল। ওপাশ থেকে ঘুমজড়ানো গলায় তালহা যখন ফোনটা ধরল, নওমি কোনো ভণিতা না করে অত্যন্ত কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল,

“হ্যালো! শুনো তালহা, আমি এই বিয়েটা করছি না। তোমার মতো একটা আনস্মার্ট আর থার্ড ক্লাস ছেলের সাথে পুরো জীবন কাটানোর চেয়ে আমার মরে যাওয়া ভালো! তোমার বাপের ওই সস্তা টাকার দেমাগ আমার সামনে দেখিও না। আজ থেকে তোমার সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ। বিয়েবাড়ি বন্ধ করতে বলো!”
“কী বলছো নওমি? মাঝরাতে এসব কী ফালতু পাগলামি…” তালহা ওপাশ থেকে কিছু বলতে চাইল।
“শাট আপ! জাস্ট গো টু হেল!”
নওমি ফোনের ওপাশ থেকে তালহা আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে খট করে ফোনটা কেটে দিল।
সে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজের ফুলে ওঠা গালে হাত দিল। ব্যথায় ওর মুখটা কুঁকড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ওর মনে তখন একটাই চিন্তা—যেভাবেই হোক, সারিমকে ওর নিজের করে পেতেই হবে। এই চড়ের বদলা ও ভালোবাসার পূনর্মিলন দিয়েই সারিমের কাছ থেকে আদায় করে ছাড়বে।

বনানীর এক অভিজাত, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আন্ডারগ্রাউন্ড ক্লাবের কোণের একটা ভিআইপি লাউঞ্জে বসে আছে শিক্ষামন্ত্রী মৃধা আবরার সারিম।রাত তখন প্রায় পৌনে দুটো। লাউঞ্জের ভেতরের হালকা নীল ও বেগুনি আলোর আভা ওর সুঠাম চেহারার ওপর এক রহস্যময় ছায়া তৈরি করেছে। সারিমের সাদা শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো, আর টাইটা টেবিলের ওপর পড়ে আছে। ও অত্যন্ত বিরক্ত এবং ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে গ্লাসে কড়া ড্রিংক ঢালছিল। ওর ফর্সা ও ধারালো চোয়ালের শিরাগুলো এখনো রাগে কাঁপছিল। নওমির সেই নোংরা ও জঘন্য আচরণ ওর বত্রিশ বছরের নিস্তরঙ্গ ক্যারিয়ারে এক মস্ত বড় আঘাত।
ঠিক তখনই লাউঞ্জের ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল দুইজন—আহিল এবং সাদমান।
পেশায় আহিল ওর বাবার ব্যবসা সামলায়। আর সাদমান পেশায় দেশের অন্যতম নামকরা হাসপাতালের একজন তরুণ কার্ডিয়াক সার্জন, প্রচণ্ড শান্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত ছেলে। ওরা দুজনেই অত্যন্ত উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং সারিমের এই দীর্ঘস্থায়ী মেজাজ আর জেদকে খুব কাছ থেকে চেনে। সারিম মাঝরাতে ওদের এখানে ডেকে পাঠিয়েছে শুনেই ওরা বুঝতে পেরেছিল, কোনো একটা মারাত্মক ঝামেলা হয়েছে।
“কী রে সারিম? মিনিস্টার হওয়ার পর তো ভেবেছিলাম বেইলি রোডের সরকারি বাংলোতে আরাম করবি। মাঝরাতে এই ক্লাবে বসে দেবদাসের মতো ড্রিংক করার কারণ কী?” আহিল সোফায় এসে বসতে বসতে একটু হালকা চালে বলল।

সারিম কোনো উত্তর দিল না। সে এক চুমুকে গ্লাসের পুরো ড্রিংকটা শেষ করে অত্যন্ত কর্কশ গলায় বলল,
“নওমি পাগল হয়ে গেছে। শি ক্রসড হার লিমিট টুয়াইট।”
“নওমি? ও আবার কী করল? পরশু তো ওর বিয়ে,” সাদমান ভ্রু কুঁচকে সারিমের দিকে তাকাল।
সারিম আর কোনো কিছু গোপন রাখল না। ধানমন্ডির লেকের ধারে নওমি কীভাবে ওকে ডেকে এনে নিজের ভালোবাসার কথা বলেছে, বিয়ে ভাঙার নাটক করেছে এবং সবশেষে কীভাবে ওর গায়ে হাত দিয়ে জোর করে নোংরামি করার চেষ্টা করেছে—সবকিছু সে এক নাগাড়ে বলে গেল। তবে ও নওমিকে যে পর পর বিশটা কানফাটা থাপ্পড় মেরে রক্তাক্ত করে রাস্তায় ফেলে এসেছে, সেই অংশটা শুনে আহিল আর সাদমান দুজনেই সোফায় স্তব্ধ হয়ে গেল।

“হোয়াট?! তুই নওমিকে মেরেছিস? তাও আবার ওভাবে রাস্তায়?” আহিল প্রায় লাফিয়ে উঠল।
“সারিম, ও আমাদের স্কুল লাইফের ফ্রেন্ড। তুই একজন দেশের মন্ত্রী হয়ে একটা মেয়ের ওপর এভাবে হাত তুললি? কেউ যদি দেখে ফেলে মিডিয়াতে কী স্ক্যান্ডাল হবে তুই ভাবতেও পারছিস?”
“আই ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট দ্য মিডিয়া!”
সারিম টেবিলের ওপর সজোরে হাত চাপড়ে গর্জে উঠল। ওর এই আকস্মিক রাগে লাউঞ্জের বারটেন্ডারও দূর থেকে কেপে উঠল।
“কোনো মেয়ে যদি আমার আত্মসম্মানে আঘাত করে, আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস দেখায়, তাকে আমি ডাস্টবিনে ফেলে দিতেও দ্বিতীয়বার ভাবব না।
“শান্ত হ সারিম, শান্ত মাথায় পরিস্থিতি ঠান্ডা কর,” সাদমান অত্যন্ত শান্ত গলায় সারিমের কাঁধে হাত রাখল। একজন ডাক্তার হিসেবে ও মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝে।
“নওমির আচরণটা ডেফিনেটলি অন্যায় ছিল। ও এক ধরনের সাইকোলজিক্যালি অবসেসড হয়ে গেছে তোর ওপর। কিন্তু তুই যেভাবে রিয়েক্ট করেছিস, তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। পরশু ওর বিয়েটা শান্তিমতো হতে দেওয়া উচিত ছিল।”

“বিয়ে ও করবে না। ওর মতো নোংরা মেয়েকে কোনো ভদ্র পরিবারের ছেলে বিয়ে করতে পারে না,” সারিম একরাশ ঘৃণা নিয়ে বলল।
আহিল আর সাদমান দুজনেই সারিমের এই রূপ দেখে আর কথা বাড়াতে চাচ্ছিল না। ঠিক তখনই আহিল পরিবেশটা কিছুটা হালকা করার জন্য গ্লাসে বরফ কুচি দিতে দিতে বলল,
“আচ্ছা সারিম, নওমি তোকে বলল তোর লাইফে কোনো মেয়ে নেই।তুই তো আসলেই নারীদের থেকে সবসময় এক মাইল দূরত্ব বজায় রাখিস। তোর এই-বত্রিশ বছরের জীবনে কি সত্যিই কোনোদিন কোনো মেয়ের জন্য বুকের ভেতর স্পন্দন হয়নি? তুই কি সারাজীবন এই ক্ষমতা আর ক্যারিয়ার নিয়েই কাটিয়ে দিবি?”
সারিম আবার একটা সিগারেট ধরাল। লাইটারের নীলচে আলোয় ওর নিখুঁত ট্রিম করা দাড়ি আর ধারালো চোখের মনিতে এক গভীর, বিষাদময় অন্ধকার ফুটে উঠল। সে সিগারেটের ধোঁয়াটা ওপরের দিকে ছেড়ে আনমনেই একটু বিদ্রূপের হাসি হাসল।

“লাইফে মেয়ে থাকা বা না থাকার অধিকার তো আমার বাবা পাঁচ বছর আগেই আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন,” সারিম অত্যন্ত শীতল ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল।
“মানে? আঙ্কেল কী করেছেন?” সাদমান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে সারিম অত্যন্ত তিক্ত গলায় বলল,
“বিগত পাঁচ বছর ধরে আমি টেকনিক্যালি ম্যারিড। আই হ্যাভ আ ওয়াইফ।”
“কীইই?!”
আহিল আর সাদমান দুজনেই একসঙ্গে সোফা থেকে প্রায় পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। ওদের চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল।
“তুই বিবাহিত? পাঁচ বছর ধরে? আর আমরা তোর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়েও কিচ্ছু জানি না? আঙ্কেল তোর বিয়ে দিয়েছেন?মজা করছিস নিশ্চই”
“বিয়ে দেননি, জোর করে আমার ওপর একটা প্রহসন চাপিয়ে দিয়েছিলেন,”
সারিম দাঁতে দাঁত চেপে বলল।

এরপর সারিম পাঁচ বছর আগের সেই প্রত্যন্ত গ্রামের বিয়েবাড়ির ঘটনা, বাবার সেই রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল এবং ক্ষমতার শর্তের কথা সবকিছু খুলে বলল।সারিম এত বছর ধরে যে সত্যটা নিজের বুকের গভীরে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছিল, যে বিয়েটার কথা ও নিজের বন্ধুমহলেও কাউকে জানতেও দেয়নি।
“একটা তেরো বছরের অজপাড়াগাঁয়ের কচি পিচ্ছি মেয়ে। ওর রূপ নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খুব পছন্দ হয়েছিল, তাই নিজের একমাত্র ছেলের গলায় সেই উটকো ঝামেলাটা ঝুলিয়ে দিলেন। বিয়ের পিঁড়িতে বসে আমি একবারের জন্যও ওই মেয়ের মুখ দেখিনি। বিয়ে শেষ করেই আমি ওখান থেকে চলে আসি। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি মৃধা নিবাসে পা রাখিনি, আর বাবার সাথেও কোনো সম্পর্ক রাখিনি।”
আহিল আর সাদমান কিছুক্ষণ বোকার মতো সারিমের দিকে চেয়ে রইল। ওরা সারিম এর এই ব্যাকস্টোরি শুনে পুরোপুরি স্তব্ধ। তবে সাদমান কিছুক্ষণ হিসাব কষে সারিমের দিকে তাকাল।সাদমান ওর চশমাটা ঠিক করতে করতে বলল।

“শোন সারিম,” তুই বললি বিয়ের সময় মেয়েটার বয়স ছিল তেরো বছর। রাইট? আর আজ পাঁচ বছর কেটে গেছে। তার মানে সিরিয়াল অনুযায়ী মেয়েটা এখন তেরো থেকে আঠারো বছরের এক প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী। ও কিন্তু এখন আর সেই পিচ্ছি বাচ্চাটা নেই।”
“সো হোয়াট? আঠারো হোক আর আশি হোক, আই জাস্ট ডোন্ট কেয়ার,” সারিম অবজ্ঞার সুরে বলল।
“আরে তুই বুঝতে পারছিস না কেন?” আহিল এবার একটু বাঁকা হাসি দিয়ে সারিমকে খোঁচা দিতে শুরু করল।
“মেয়েটা এখন আঠারো বছরের এক যুবতী! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘরে থাকে, নিশ্চয়ই এতদিনে ওকেও আঙ্কেল কোনো মডার্ন সোসাইটিতে বড় করেছেন। তুই একবারও না দেখে ওকে ‘উটকো ঝামেলা’ ভাবছিস কেন? হয়তো ও এখন কোনো রূপসী পরী হয়ে বসে আছে তোর জন্য!”
সারিম কর্কশ গলায় ধমকে উঠল।

“রূপের দেমাগ আমার সামনে দেখাবি না আহিল,যে বিয়ের কোনো ভিত্তি আমার কাছে নেই,ঐ মেয়েকে আমি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক স্পট মনে করি, তার সাথে কোনো সম্পর্কের প্রশ্নই আসে না। আমি ওই মেয়ের মুখ দেখে নিজের সময় নষ্ট করতে চাই না।”
“তাহলে এই কাগজের বিয়েটা সারাজীবন টেনে নিয়ে বেড়াবি?” সাদমান জিজ্ঞেস করল।
“তুই এখন দেশের শিক্ষামন্ত্রী। সামনে তোর অনেক বড় রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। এই গোপন বিয়ের কথা যদি কখনো অপজিশন বা মিডিয়া জেনে যায়, তারা তোকে চাইল্ড ম্যারেজের দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। তার চেয়ে ভালো, যেহেতু মেয়েটা এখন আঠারো বছর পার করেছে এবং আইনত প্রাপ্তবয়স্ক, তুই চাইলেই ওর সাথে কোনো প্রকার দেখা না করে, সরাসরি তোর ল ইয়ারের মাধ্যমে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে এই ঝামেলা চুকিয়ে ফেলতে পারিস। আঙ্কেলের প্রতি তোর ক্ষোভ প্রকাশের এর চেয়ে বড় অস্ত্র আর কী হতে পারে?”
সাদমানের এই যুক্তিটা সারিমের মস্তিষ্কের কোষে কোষে গিয়ে আঘাত করল। সে সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে সজোরে চেপে নিভিয়ে দিল। ওর ধারালো চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। পাঁচ বছর ধরে ও এই বিয়ের সুতোটা ছিঁড়তে চাচ্ছিল, কিন্তু মেয়েটা নাবালিকা থাকায় আইনি কিছু জটিলতা ছিল। আজ সাদমানের কথায় ও বুঝতে পারল, এটাই সঠিক সময়। এই ডিভোর্স পেপারটাই হবে ওর বাবা আরিশান মৃধার অহংকারের মুখে সারিমের দেওয়া সবচেয়ে বড় অপমান। ও প্রমাণ করে দেবে, আরিশান মৃধার ক্ষমতার জোর সারিমের জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

“ইউ আর রাইট, সাদমান,”
সারিম অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল।সে তখনই ওর পকেট থেকে ফোনটা বের করল। রাত তখন আড়াইটা ছুঁইছুঁই। ও বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সরাসরি ওর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (পিএ) আলভিকে কল দিল।
ফোনের ওপাশ থেকে আলবি ঘুমজড়ানো গলায় বলল,
“হ্যাঁ, স্যার। কোনো জরুরি নির্দেশ?”
“আলভি, কাল সকাল নয়টার মধ্যে দেশের সবচেয়ে নামকরা ফ্যামিলি কোর্টের ল ইয়ারকে আমার অফিসে ডাকবে। অরিয়া ইবনাত অদ্রিজা—এই নামে একটা মিউচুয়াল ডিভোর্স পেপার রেডি করতে বলো। যত দ্রুত সম্ভব পেপার তৈরি করে মৃধা নিবাসের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবে। আই ওয়ান্ট দিস ডিভোর্স ডান উইদিন দিস উইক। কোনো খামতি যেন না থাকে,” সারিম অত্যন্ত কড়া ও চূড়ান্ত গলায় আদেশ দিল।
“জি… জি স্যার, আমি ব্যবস্থা করছি,” আলভি ওপাশ থেকে তটস্থ হয়ে বলল।
সারিম ফোনটা কেটে টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলল। ওর মনের ভেতরের সেই দীর্ঘ পাঁচ বছরের ক্ষোভ আর আগ্নেয়গিরিটা যেন এই এক আদেশে শান্ত হতে শুরু করল। সে গ্লাসের শেষ ড্রিংকটা মুখে তুলে মনে মনে হাসল।তবে ও জানত না, এই ডিভোর্স পেপারটাই ওর জীবনের destiny বা ভাগ্যকে কতটা নির্মম ও জটিল এক মোড়ে দাঁড় করাতে চলেছে। যে আঠারো বছরের অরিকে ও না দেখেই ডিভোর্স দিচ্ছে, সেই অরিই ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ইশকের ফানিয়ার হয়ে উঠতে চলেছে।

বাইরে বৃষ্টির বেগটা সকালের দিকে কিছুটা কমলেও দুপুরের পর থেকে আবারও আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বসন্তের শেষের এই বৃষ্টি যেন থামতেই চাইছে না। মৃধা নিবাসের দোতলার বিশাল স্টাডি রুমের ভেতরটা এখন পুরোপুরি থমথমে আর নিস্তব্ধ। ঘরের দেয়ালে থাকা ভিন্টেজ ঘড়িটার পেন্ডুলাম অনবরত ‘টিক টিক’ শব্দ করে জানান দিচ্ছে যে সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। আগামীকাল থেকে অরি আর জেবার এইচএসসি পরীক্ষা শুরু। প্রথম দিনই বাঙালির সবচেয়ে আতঙ্কের এবং একই সাথে সহজ সাবজেক্ট—বাংলা প্রথম পত্র।

পরীক্ষার আগের এই শেষ রাতটা যেকোনো স্টুডেন্টের জন্যই এক মস্ত বড় মানসিক যুদ্ধক্ষেত্র। বিশেষ করে অরির জন্য, কারণ তার মাথার ওপর রয়েছে আরিশান মৃধার আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। অরি নিজের পড়ার টেবিলটাতে একদম ডুবে আছে। টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাংলা প্রথম পত্রের মূল বই, গাইড, টেস্ট পেপার আর কবি পরিচিতির এক গাদা শিট। ‘চাষার দুক্ষু’, ‘বিলাসী’, ‘বায়ান্নর দিনগুলো’ থেকে শুরু করে ‘লালসালু’ উপন্যাসের মজিদের কূট চাল-সবকিছু ও মগজে ঢুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
অরির পরনে এখন একটা আরামদায়ক হালকা গোলাপি রঙের শার্ট আর কালো রঙের ঢিলেঢালা প্লাজো। চুলে একটা সাধারণ ক্লিপ দিয়ে খোঁপা করা, যেখান থেকে কিছু অবাধ্য চুল বারবার ওর ফর্সা কপালে এসে পড়ছে। নাকের ওপর চেপে বসা রিডিং গ্লাসটা ও বারবার আঙুল দিয়ে ওপরে ঠেলে দিচ্ছে। খাটুনি কাকে বলে, তা অরি গত এক মাস ধরে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। আরিশান মৃধা ওনার মেয়েকে সেরা রেজাল্ট করাতে চান, আর অরিও ওনার সেই আস্থার মর্যাদা রাখতে নিজের দিন-রাত এক করে দিয়েছে।
ঠিক রাত সাড়ে নয়টায় স্টাডি রুমের ভারী কাঠের দরজাটা আলতো শব্দে খুলে গেল। অরি বই থেকে চোখ না তুলেই ভাবল হয়তো বুয়া এসেছে। কিন্তু সুপরিচিত এবং লস্টচেরি পারফিউমের চেনা সুবাসটা নাকে আসতেই ও মাথা তুলে তাকাল।

দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন আরিশান মৃধা।
ওনার পরনে একটা ধবধবে সাদা শার্ট, যার হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত খুব নিখুঁতভাবে গোটানো। ওনার চওড়া ও সুঠাম অবয়বে এই সাধারণ সাদা শার্টটাই এক অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। ওনার নিখুঁত করে ছাঁটা দাড়িতে সামান্য রুপোলি আভা রাতের আলোয় চকচক করছে।দুই হাতে দুটি সিরামিকের মগ, যেখান থেকে ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফির তীব্র সুবাস পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
“বাবা! তুমি কেন কষ্ট করে আনলে? বুয়াকে বললেই তো হতো,” অরি তড়িঘড়ি করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল।
“বসো শান্ত হয়ে, উঠতে হবে না,” আরিশান মৃধা অত্যন্ত ধীর ও স্নেহমাখা পায়ে এগিয়ে এলেন। ওনার গম্ভীর কণ্ঠস্বরটা এখন এক অদ্ভুত পিতৃত্বের মমতায় নরম শোনাচ্ছে। ওনি একটা মগ অরির টেবিলের কোনায় সাবধানে রাখলেন।

“পরীক্ষার আগের রাতে ক্লান্তি আসাটা স্বাভাবিক। কফিটা খাও, মগজটা সতেজ থাকবে। আর কোনো টেনশন করবে না। আমার মেয়ে অনেক পরিশ্রম করেছে, রেজাল্ট ভালো হতে বাধ্য।”
“থ্যাংক ইউ, বাবা,”
অরি কফির মগটা হাতে নিয়ে আলতো করে হাসল। ওনার এই ছোট ছোট কেয়ারিং স্বভাবগুলো অরিকে সবসময়ই এক পরম নিরাপত্তা দেয়। এই মানুষটা বাইরে যতই কঠোর আর শক্তিশালী শাসক হোন না কেন, ঘরের ভেতর ওনার মেয়ের জন্য ওনি স্রেফ একজন সাধারণ, দায়িত্বশীল বাবা।
“জেবা কোথায়?
আরিশান মৃধা চারপাশটা একটু দেখে নিয়ে ওনার গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন।অরি হালকা হেসে উওর দিল।

“ও একটু ওয়াশরুমে গেছে, বাবা। ও তো সারাদিন ‘লালসালু’র মজিদকে গালি দিতে দিতেই পার করে দিল। বলছে মজিদের জন্য নাকি ওর বাংলা পরীক্ষা খারাপ হবে,”
আরিশান মৃধা নিজের কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন।
“হুম, জেবাকে একটু লাইনে আনা দরকার। সোলেমান আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে এই কয়েকটা দিন ওকে চোখে চোখে রাখতে। আমি একটু পর আসছি, তোমাদের বাংলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপক আর সৃজনশীল প্রশ্নের প্যাটার্ন আমি নিজেই দেখিয়ে দেব,”
ওনি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই অরি কফির মগে চুমুক দিল। কড়া কফির স্বাদটা ওর সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষেই দূর করে দিল।
মিনিট দশেকের মধ্যে আরিশান মৃধা একটা ডায়েরি আর কলম হাতে স্টাডি রুমে ফিরে এলেন। ততক্ষণে জেবাও ওয়াশরুম থেকে চলে এসেছে। জেবার পরনে একটা ঢিলেঢালা ওভারসাইজড নেভি ব্লু টিশার্ট আর রাফ জিন্স। ওনার সামনে আসতেই জেবা আবার সেই ভেজা বিড়ালের মতো মুখ করে ভদ্র সেজে দাঁড়িয়ে রইল।সেদিন রাতের সেই ‘শান্ত তুফানের’ঝাড়ি এখনো ভুলতে পারেনি বেচারি।

“বোসো তোমরা দুজনে,”
আরিশান মৃধা টেবিলের উল্টো পাশের একটা বড় কাঠের চেয়ার টেনে বসলেন। ওনার সামনে এখন দুই পরীক্ষার্থী। ওনি ওনার চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে নিয়ে ডায়েরিটা খুললেন।
“আজকে আমি তোমাদের বাংলা প্রথম পত্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের রিভিশন নেব। বিশেষ করে ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ আর ‘মহাজাগতিক কিউরেটর’ থেকে প্রতি বছর যে ধরনের সৃজনশীল আসে, সেগুলো কীভাবে লিখলে ফুল মার্কস পাওয়া যায়, তা মন দিয়ে বোঝো।”
আরিশান মৃধা পড়ানোর ব্যাপারে অত্যন্ত সিরিয়াস। ওনি যখন কথা বলেন, ওনার গলার টোন, ওনার হাতের জেসচার—সবকিছুতেই একটা কড়া শিক্ষকের ভাব চলে আসে। অরি লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাতা-কলম নিয়ে বাবার প্রতিটি নির্দেশ নোট করতে লাগল। ওর বাবা যেভাবে জটিল বিষয়গুলোকে সহজ করে বোঝাচ্ছেন, তাতে অরির পড়াটা আরও সহজ হয়ে যাচ্ছিল।কিন্তু বিপত্তি বাধল জেবাকে নিয়ে। জেবা প্রথম পাঁচ মিনিট খুব মনোযোগ দিলেও। এখন সে খাতার পাতায় অনবরত কলম দিয়ে হিজিবিজি কাটছি,
পড়াতে পড়াতে আরিশান মৃধা পুরোপুরি ডুবে গেলেন। ওনি একটা কঠিন উদ্দীপকের ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন,
“দেখো, এখানে কবি যে শোষণের বিরুদ্ধে নূরলদীনের ডাককে ফুটিয়ে তুলেছেন, তার সাথে সাম্যবাদী চেতনার একটা গভীর মিল আছে…”

অরি মন দিয়ে শুনছে, কিন্তু জেবার মন তখন সাম্যবাদ ছেড়ে সম্পূর্ণ অন্য ট্র্যাকে চলে গেছে। ওনার এত কাছের দূরত্বে বসে জেবা হঠাৎ করেই আরিশান মৃধাকে এক নতুন দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল। ওনার পরনের সেই সাদা শার্টের কলার, ওনার সুঠাম চওড়া কাঁধ আর ওনার সেই নিখুঁত ট্রিম করা দাড়ি।
জেবা হাতের কলমটা দাঁত দিয়ে কামড়াতে কামড়াতে ওনার দাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। ও মনে মনে গুনতে শুরু করল,

“এক, দুই, তিন, চার… বাব্বা! আঙ্কেলের দাড়ির শেপটা কিন্তু দারুণ! দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না হয়ে ওনি যদি নায়ক হতেন, তবে তো টলিউড-বলিউড কাপিয়ে দিতেন।”
দাড়ি গোনা শেষ করে জেবার নজর গেল আরিশান মৃধার মাথার চুলে। ওনার ঘন কালো চুলের মাঝে কিছু কিছু পাকা চুল রুপোলি সুতোর মতো জ্বলজ্বল করছে। জেবা একদম অবশ মস্তিস্কে, পরীক্ষার পড়া সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে, ওনার মাথার পাকা চুল গুনতে শুরু করল। ও ওনার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে আউড়াতে লাগল,
“পাঁচ… দশ… পনেরো… ওই যে পাশে একটা, সতেরো… বাম পাশে এক গুচ্ছ… উফ, আঙ্কেলের মাথায় ঠিক বামপাশে ১৩৪টা পাকা চুল আছে! কিন্তু এই পাকা চুলেও ওনাকে যা হ্যান্ডসাম লাগছে না!”
পড়াতে পড়াতে আরিশান মৃধার গলা কিছুটা শুকিয়ে এসেছিল। ওনি টেবিলের ওপর রাখা নিজের কফির মগটার দিকে না তাকিয়েই হাত বাড়ালেন। কিন্তু ওনার কফির মগের ঠিক পাশেই জেবা নিজের কফির মগটা রেখেছিল। আরিশান মৃধা ভুলবশত জেবার কফির মগটা তুলে নিলেন এবং বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে থেকেই এক চুমুক দিলেন।

জেবা এই দৃশ্যটা দেখেও কিছু বলল না। ও স্রেফ চোখ দুটো গোল গোল তাকিয়ে রইলো।আরিশান মৃধা তখন ‘লালসালু’ উপন্যাসের মূল ভাব বোঝাচ্ছেন। ওনি নিজের ডান হাতটা দিয়ে মাথার চুলগুলো পেছনের দিকে সরালেন এবং একটু ঝুঁকে পড়ে অরির খাতার ওপর একটা পয়েন্ট লিখে দিতে লাগলেন। ওনি যখন ঝুঁকে পড়লেন, ওনার মাথার তালুর ঠিক মাঝখানটা জেবার একদম চোখের সামনে চলে এলো।
জেবা কলম কামড়ানো বন্ধ করে ওনার মাথার ঠিক মাঝখানটায় তাকাল। লাইটের কড়া আলোয় ও দেখল, ওনার ধবধবে সাদা শার্টের ঠিক ওপরে, ওনার ঘন চুলের মাঝে কালো মতন গোল একটা জিনিস চকচক করছে।

জেবার মগজে তখন পরীক্ষার কোনো পড়া নেই, বাংলার কোনো উদ্দীপক নেই। ওনার মাথায় ওই কালো গোল জিনিসটা দেখে জেবার ব্যাকগ্রাউন্ডের চিরচেনা বাঙালি মেয়েলি স্বভাবটা জেগে উঠল। ওর মনে হলো, মাথায় ওটা ওত বড় সাইজের একটা জ্যান্ত উকুন বসে আছে?! এত বড় ভিআইপি মানুষের মাথায় উকুন? এটা তো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি! এই উকুন যদি ওনার মাথায় কামড়ায়, তবে তো ওনার মেজাজ খারাপ হবে, আর ওনার মেজাজ খারাপ হলে পুরো দেশের বারোটা বাজবে! না, দেশের নাগরিক হিসেবে এই উকুনটা ধ্বংস করা জেবার পরম দায়িত্ব!”
জেবা তখন সম্পূর্ণ সম্মোহিতের মতো হয়ে গেছে। ও ভুলে গেছে ও কার সামনে বসে আছে, ভুলে গেছে যে ওনার একটা ধমকে ওর কলিজা শুকিয়ে যায়। ও স্রেফ ওনার মাথার সেই ‘উকুন’টাকে ধরার জন্য নিজের আসন থেকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ল।

আরিশান মৃধা তখনো মন দিয়ে লিখছেন,
“অদ্রিজা, এই পয়েন্টটা কালকে ইনক্লুড করবে…”
ঠিক তখনই জেবা আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে, নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে সটান আরিশান মৃধার মাথার চুলগুলো খপ করে ধরে ফেলল! ও ওনার চুলের মুঠিটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে, অন্য হাতের দুই নখ দিয়ে সেই কালো জিনিসটাকে নিশানা করল। ও ভাবল, এটাকে নখের চাপে এখনই ‘কট’ করে ফুটিয়ে মারবে।জেবা ওনার চুলের মাঝখানের সেই কালো অংশটাতে নিজের দুই নখ দিয়ে সজোরে একটা তীব্র চিমটি কাটল!
“ওরে বাবারে! উকুন পাইছি!” জেবা জয়ের উল্লাসে চিৎকার করে উঠতে চাইল।
কিন্তু চিমটিটা কাটার সাথে সাথেই জেবা বুঝতে পারল জিনিসটা মোটেও নরম বা জ্যান্ত কোনো পোকা নয়। ওটা ওনার চামড়ার সাথে শক্তভাবে লেগে থাকা একটা জিনিস। আর ও যেভাবে সজোরে নখ দিয়ে চিমটি কেটে টেনে ধরেছে, তাতে আরিশান মৃধার মাথার চামড়া প্রায় উঠে আসার দশা হলো।
“আহহহ!”

স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধা ব্যথার চোটে এক তীব্র চিৎকার দিয়ে উঠলেন। ওনার মতো একজন গম্ভীর আর শক্তিশালী মানুষ জীবনে কখনো এমন অতর্কিত আক্রমণের শিকার হননি। ওনি ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে ঝটকা মেরে জেবার হাত থেকে নিজের মাথাটা মুক্ত করে নিলেন।
পুরো স্টাডি রুমে যেন এক মুহূর্তের জন্য থান্ডারস্টর্ম বয়ে গেল। অরি খাতা থেকে চোখ তুলে যা দেখল, তাতে ওর হাতের দামি জেল পেনটা মেঝেতে পড়ে গেল। ও হাঁ করে, চোখ দুটো চড়কগাছ করে জেবার দিকে তাকিয়ে রইল।
জেবা তখনো নিজের দুই নখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও দেখল ওনার চুলে কোনো উকুন নেই, বরং ওনার মাথার তালুর ঠিক মাঝখানে একটা বেশ বড়সড়, কুচকুচে কালো রঙের ‘তিল’ শোভা পাচ্ছে! জেবা আসলে ওনার সেই জন্মগত কালো তিলটাকেই এতক্ষণ জ্যান্ত উকুন ভেবে সজোরে চিমটি কেটে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করছিল!

“জেবা!!!”
আরিশান মৃধা নিজের মাথার তালুতে হাত দিয়ে ব্যথায় ফিসফিসিয়ে উঠলেন। ওনার ফর্সা কপালটা মুহূর্তের মধ্যে রাগে আর ব্যথায় লাল হয়ে উঠেছে। ওনার চোখের মনিতে যে তীব্র রাগ আর বিস্ময় ফুটে উঠল, তা দেখে মনে হচ্ছিল ওনি এখনই পুরো ঘরের ওপর কারফিউ জারি করে দেবেন।
জেবা ততক্ষণে বুঝতে পেরেছে ও কী ভয়াবহ ঐতিহাসিক ভুলটা করে ফেলেছে। ওনার সেই অগ্নিদৃষ্টির সামনে পড়তেই জেবার হাতের নখ দুটো কাঁপতে লাগল। ওর ভেতরের সেই ‘উকুন শিকারি’র বীরত্ব এক সেকেন্ডে কর্পূরের মতো উবে গেল। ও দুই হাত জোড় করে চেয়ার থেকে তিন ফুট পিছিয়ে গেল।
“আ… আঙ্কেল! আই অ্যাম সো সো সরি! আমি… আমি সত্যি ওটাকে উকুন ভেবেছিলাম! ওত বড় কালো তিল যে ওখানটাতে লুকিয়ে থাকতে পারে, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি! প্লিজ আঙ্কেল, আমাকে এনকাউন্টার করবেন না!”

জেবা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে একনাগাড়ে বলতে লাগল। ওর মুখের রঙ তখন পুরোপুরি সাদা হয়ে গেছে।
অরি এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকলেও এবার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। দৃশ্যটা এতটাই হাস্যকর আর অবাস্তব ছিল যে অরি নিজের মুখে হাত চেপে সোফায় প্রায় লুটিয়ে পড়ল। ও হাসতে হাসতে কাঁপছিল, কিন্তু বাবার রাগী চেহারার দিকে তাকিয়ে ওর হাসির শব্দটা বাইরে বের হতে দিচ্ছিল না।
আরিশান মৃধা নিজের মাথাটা ডলতে ডলতে অত্যন্ত তীব্র ও গম্ভীর দৃষ্টিতে জেবার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওনার সাদা শার্টের কলারটা রাগে কিছুটা কাঁপছিল। ওনি ওনার দীর্ঘ জীবনে অনেক বড় বড় অপরাধী, সন্ত্রাসী আর রাজনৈতিক চক্রান্তের মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু পড়ানোর টেবিলে বসে নিজের বন্ধুর মেয়ের হাতে এভাবে ‘উকুন’ সন্দেহে চিমটি খাবেন, এটা ওনার কল্পনারও অতীত ছিল।
জেবার মনে হলো ও এখনই মাটিতে মিশে যাবে।

“আমি এখানে পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সাজেশন দিচ্ছি, আর তুমি আমার মাথায় উকুন খুঁজছ? তোমার মনযোগ কোথায় জেবা? এই তোমার পড়াশোনার সিরিয়াসনেস?”
“ভুল হয়ে গেছে আঙ্কেল! আর কোনোদিন আপনার চুলের দিকে তাকাব না, সত্যি বলছি!” জেবা কান ধরে ওঠবোস করার মতো ভঙ্গিতে বলল।
আরিশান মৃধা ওনার ডায়েরিটা সশব্দে বন্ধ করলেন। ওনার মাথার ব্যথাটা তখনো কমেনি। ওনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং ওনার সেই জাঁকজমকপূর্ণ ও গম্ভীর অবয়ব নিয়ে জেবার সামনে এসে দাঁড়ালেন। জেবা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল, ভাবল আজ হয়তো ওকে আজরাইল এর যেতেই হবে।
কিন্তু আরিশান মৃধা ওনার ব্যক্তিত্বের কারণে নিজেকে পুরোপুরি কন্ট্রোল করলেন। ওনি জেবাকে আর কিছু না বলে অরির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“অদ্রিজা, তোমার এই ফ্রেন্ডকে নিয়ে আমি আর এক মুহূর্তও বসতে পারছি না। ওর পরীক্ষার চেয়ে আমার মাথার নিরাপত্তা বেশি জরুরি। তোমরা নিজেরা বাকি অংশটুকু রিভিশন করো। আর জেবা, কালকের পরীক্ষায় যদি তোমার খাতার চেয়ে মাথার বুদ্ধি বেশি চলে, তবে সোলেমানকে বলে আমি তোমাকে সোজা গ্রামে পাঠিয়ে দেব চাষাবাদ করার জন্য।”

ওনি আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালেন না। নিজের সাদা শার্টের হাতাটা ঠিক করতে করতে অত্যন্ত দ্রুত ও গম্ভীর পায়ে স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওনি চলে যেতেই জেবা মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল এবং নিজের বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল।
“ওরে বাবারে অরি দোস্ত! আজ আমি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি রে! তোর বাপের ওই তিলটা যে এত বিপজ্জনক হতে পারে, তা আমি আগে জানলে ওদিকে চোখই দিতাম না!” জেবা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
অরি ততক্ষণে টেবিলের ওপর মাথা রেখে পাগলের মতো হাসছে। ও হাসতে হাসতে বলল,
“তোকে আমি শুধু শুধুই বাদামনী বলি নাকি! তুই আসলেই একটা আস্ত পাগল! বাবার মাথায় তুই উকুন ধরতে গেলি? তাও আবার ওনার ওই প্রিয় তিলটাতে? ভাগ্যিস বাবা তোকে স্রেফ বকে ছেড়ে দিয়েছেন, অন্য কেউ হলে আজ নির্ঘাত লকআপে থাকত!”
অরির কথা শুনে জেবা নিজেও এবার ফিক হেসে উঠল।দুই বান্ধবী এরপর আরও কিছুক্ষণ সেই হাস্যকর কাহিনী নিয়ে হাসাহাসি করল। তবে আরিশান মৃধার সেই কড়া ধমকের পর জেবা এবার সত্যিই সোজা হয়ে বসল। ও বুঝতে পারল, কালকের বাংলা পরীক্ষায় যদি ও ভালো না করতে পারে, তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই শান্ত তুফানের আসল রূপ ও
কে দেখতে হবে, আর ওকে গ্ৰামে দেখা যাবে সত্যিই সত্যিই চাষাবাদ করতে পাঠিয়ে দিবে।
দুজনে এবার মন দিয়ে বইয়ের পাতায় ডুবে গেল, আগামীকালকের সকালটা ওদের জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে।

রাতের অবিশ্রান্ত বর্ষণের পর চারিদিকের গাছপালাগুলো ধুয়ে-মুছে একদম চকচকে সবুজ হয়ে আছে। ভোরের হিমেল হাওয়ায় তখনো বৃষ্টির আর্দ্রতা লেগে ছিল। ঠিক সকাল সাড়ে সাতটায় সেই সুপরিচিত মৃধা নিবাসের বিশাল রাজকীয় লোহার গেটের সামনে এসে থামল একটি কুচকুচে কালো রঙের প্রাডো গাড়ি। গাড়ির বডিতে লেগে থাকা কাদার ছিটেফোঁটাগুলোই বলে দিচ্ছিল, এটি এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে।
হ্যাঁ, স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী মৃধা আবরার সারিম মাত্রই রাজশাহী থেকে ঢাকা ফিরেছে। আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হল পরিদর্শন করার এক কঠোর রুটিন রয়েছে ওর। সারা রাত গাড়িতে আসার কারণে ওর দুচোখে সামান্য ক্লান্তির আভা থাকলেও, ওর সেই চিরচেনা গম্ভীর ও ধারালো ব্যক্তিত্বে বিন্দুমাত্র কমতি ছিল না। পরনে সাদা কটন শার্ট আর কালো ট্রাউজার্স। ওর নিখুঁত ট্রিম করা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে ও জানালার বাইরে তাকাল। পাঁচ বছর পর ও এই বাড়ির সীমানায় পা রেখেছে, যে বাড়িকে ও নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক স্পট মনে করে।

গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে ছিল আলভি। আলভি সেদিন সারিমের নির্দেশ পাওয়ামাত্রই ঢাকার সবচেয়ে তুখোড় ফ্যামিলি কোর্টের ল ইয়ারকে দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডিভোর্স পেপার রেডি করিয়েছে। ফাইলের কাজ শেষ হতেই ও সারা রাত জার্নি করে পেপারগুলো সরাসরি এখানে নিয়ে এসেছে, যাতে সারিম পরীক্ষার হল পরিদর্শনে যাওয়ার আগেই এই উটকো ঝামেলা থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে পারে।আলভি পেছনের সিটে বসা সারিমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল।
“স্যার, ডিভোর্স পেপার একদম রেডি। ল ইয়ারের ড্রাফট করা সব পেপার এই খামে আছে,”
“গুড,” সারিম একটা ঠান্ডা গলায় বলল।
“তুমি ভেতরে যাও, আলভি। বাড়ির ভেতরে গিয়ে ঐ ‘অরিয়া ইবনাত’ নামের মেয়েটার সাইন আগে নিয়ে এসো। ও সাইন করলেই আমি সাইন করে দিব। তারপর এই প্রহসনের বিয়েটার অফিশিয়াল চ্যাপ্টার ক্লোজ। আমি বাইরেই অপেক্ষা করছি।”
“জি স্যার, আমি এখনই যাচ্ছি,” আলভি খামটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।

সারা রাত জেগে বাংলার কবি পরিচিতি, মজিদের কূট চাল আর নূরলদীনের কবিতা গিলতে গিলতে জেবা আর অরির চোখ দুটো মাএই একটু লেগে এসেছে। অরি টেবিলের ওপর মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে, আর জেবা খাটের এক কোণে বই বুকে নিয়ে সটান ঘুমে মগ্ন। ঘড়িতে তখন পৌনে আটটা। ঠিক দশটায় ওদের পরীক্ষা, অথচ ঘুমের ঘোরে ওরা দুনিয়া ভুলে আছে।
অন্য দিকে, এই সাতসকালেই আরিশান মৃধা ওনার প্রতিদিনের নিয়ম অনুযায়ী জগিং এ গেছেন। এই বয়সেও ওনি নিজের শরীর আর ফিটনেস নিয়ে প্রচণ্ড সচেতন। প্রতিদিন নিয়ম করে ব্যায়াম, জগিং আর ডায়েট মেইনটেইন করার কারণে ওনাকে এখনো সুঠাম, ইয়াং ও হ্যান্ডসাম পুরুষের মতো দেখায়। ওনার এই সুঠাম অবয়বের কারণেই মানুষ ওনার ব্যক্তিত্বের ভক্ত। ওনি বাড়িতে না থাকায় পুরো বাড়িটা তখন এক নিঝুম শান্ত চাদরে ঢাকা ছিল।
পুরো নিস্তব্ধ বাড়িটা হঠাৎ কাঁপিয়ে ডোরবেলটা অনবরত বেজে উঠল-‘টিং টং, টিং টং’।
সকালের এই সময়ে সাধারণত বাড়ির কাজের লোক বা সিকিউরিটি গার্ডরা ভেতরে আসে না, তাই কলিং বেলের একটানা কর্কশ শব্দে অরির কাঁচা ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। ও চোখ কচলাতে কচলাতে সোজা হয়ে বসল। নাকের ওপর থেকে রিডিং গ্লাসটা টেবিলের ওপর পড়ে গেল। ও ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় পৌনে আটটা বাজে।

“উফ, এত সকালে আবার কে এলো? বাবা তো চাবি নিয়েই বের হয়,”
অরি মনে মনে বিরক্ত হলো। ও জেবাকে ডাকার চেষ্টা করল, কিন্তু জেবা তখন গভীর ঘুমে মগ্ন, যেন ওকে কামানের গোলা মারলেও ও উঠবে না।
অরি বাধ্য হয়ে নিজের পরনের গোলাপি শার্ট আর কালো প্লাজোটা একটু ঠিকঠাক করে নিয়ে ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। ওর চুলগুলো তখনো খোঁপায় বাঁধা, তবে কিছু অবাধ্য বাদামী সিল্কি চুল ওর ফর্সা কপালে আর ঘাড়ে লেপ্টে আছে। ঘুম থেকে মাত্র ওঠায় ওর দুধ-সাদা গাল দুটোতে এক অদ্ভুত গোলাপি আভা ফুটে উঠেছে, আর চোখের পাতায় তখনো এক মায়াবী অলসতা লেগে আছে। আঠারো বছরের এক অপ্সরী যেন মর্তে নেমে এসেছে।

অরি ড্রয়িংরুম পার হয়ে মেইন দরজাটা আলতো করে খুলে দিল।
দরজা খুলতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আলভি যেন এক মুহূর্তের জন্য পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। ওর হাতের ডিভোর্স পেপারের খামটা প্রায় ফসকে যাওয়ার দশা হলো। ও নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক মডেল, সেলিব্রিটি আর উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে দেখেছে, কিন্তু সকালের এই নরম আলোয়, কোনো মেকআপ ছাড়া, সাধারণ পোশাকে এত তীব্র সুন্দর আর মায়াবী কোনো ফর্সা মেয়েকে ও নিজের জীবনে কখনো দেখেনি। মেয়েটার ওই বাদামী চুল আর হরিণীর মতো টানা টানা চোখের চাউনি আলভির পুরো মগজটাই যেন এক সেকেন্ডে হ্যাং করে দিল।

“জি? কাকে চান?”
অরি ওর মিষ্টি ও কোমল গলায় জিজ্ঞেস করল। দেখল সামনে এক অপরিচিত ছেলে কোট-টাই পরে বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
“অ্যাঁ… ওহ, সরি! আসলে… আমি মিনিস্টার আবরার সারিম স্যারের পিএ, আলভি,”
আলভি কোনোমতে নিজের তোতলামি সামলে ঢোক গিলল।
“এখানে কি ‘অরিয়া ইবনাত অদ্রিজা’ নামের কেউ থাকেন? ওনার একটা অত্যন্ত জরুরি অফিশিয়াল পেপারে সাইন লাগবে।”
“হ্যাঁ, আমিই অরিয়া ইবনাত অদ্রিজা,” অরি খুব স্বাভাবিক গলায় বলল।
“আপ… আপনি?!”

আলভি যেন আকাশ থেকে পড়ল। ওর চোখ দুটো কপালে উঠে গেল। ও মনে মনে ভাবল, বস এই পাঁচ বছর ধরে এই অসম্ভব রূপসী পরীটাকে নিজের বউ হিসেবে আড়ালে রেখে দিয়েছে? আর আজ ওনাকে না দেখেই স্রেফ একটা ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিচ্ছে? বসের কি মাথা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে? এই মেয়েকে তো এক পলক দেখলেই যে কেউ নিজের পুরো জীবন লিখে দিতে রাজি হয়ে যাবে! আলভি তো মনে মনে এতটুকুই ভেবে নিল যে, আজ সারিমের সাথে এই মেয়ের ডিভোর্সটা হয়ে যাওয়ার,পরে ও নিজেই নিজের পরিবারকে দিয়ে অরির জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে! এত সুন্দর মেয়েকে হাতছাড়া করা কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না।

“কী পেপার? একটু দেখাবেন?” অরির কথায় আলবির ঘোর কাটল।
“ওহ হ্যাঁ, এই যে স্যার পাঠিয়েছেন… এটা আসলে একটা… মিউচুয়াল ডিভোর্স পেপার,” আলভি খুব ইতস্তত করে খামটা বাড়িয়ে দিল।
‘ডিভোর্স পেপার’ শব্দটা শুনতেই অরির সুন্দর ভ্রু দুটো এক সুক্ষ্ম রেখায় কুঁচকে গেল। ওর মনে পড়ে গেল পাঁচ বছর আগের সেই অহংকারী পুরুষটার কথা, যে বিয়ের দিন ওকে ফেলে চলে গিয়েছিল। আর আজ ও আঠারো বছরে পা দিতেই ওনার দেমাগ দেখাতে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছে! অরি মনে মনে এক তীব্র অবজ্ঞা অনুভব করল। ও বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে বলল,
“আপনি একটু দাঁড়ান। আমি বাবার সাথে কথা বলে আসছি।”
অরি ড্রয়িংরুমে এসে ফোন থেকে সরাসরি আরিশান মৃধার পার্সোনাল নাম্বারে কল দিল। ওপাশ থেকে জগিং এর মাঝেই আরিশান মৃধা ফোনটা ধরলেন। ওনার গম্ভীর গলা শোনা গেল,
“বলো অদ্রিজা, কোনো সমস্যা? পরীক্ষার তো আর বেশি সময় নেই।আমি কিছুক্ষন পরেই চলে আসছি”
“বাবা, ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট এসেছে। একটা ডিভোর্স পেপার নিয়ে এসেছে, আমার সাইন চাচ্ছে,” অরি খুব শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।

ফোনের ওপাশ থেকে আরিশান মৃধা এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলেন। ওনার দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল। ওনি ওনার ছেলের এই চরম বেপরোয়া ভাব আর জেদকে ভালো করেই চেনেন। ওনি জানতেন সারিম কোনোদিন এই বিয়েটা মানবে না, আর এখন মেয়েটা আঠারো হতেই ও নিজের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। আরিশান মৃধা ওনার গম্ভীর গলায় বললেন,
“ও যা চাইছে, তা-ই করে দাও অদ্রিজা। যে সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তাকে জোর করে টেনে রাখার কোনো মানে হয় না। তুমি সাইন করে দাও। তোমার এখন পরীক্ষা, ওসব ফালতু চিন্তা মাথায় এনো না।”
“ঠিক আছে, বাবা,” অরি ফোনটা রেখে দিল।
ওর মনে কোনো দুঃখ বা কষ্ট হলো না, বরং এক অদ্ভুত স্বস্তি আর মুক্তির আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল। ও আলভির হাত থেকে কলম আর পেপারগুলো নিল। ফাইলের যেখানে যেখানে সাইন করার জায়গা, সেখানে অত্যন্ত নিখুঁত ও সুন্দর হাতের অক্ষরে ও লিখে দিল অরিয়া ইবনাত অদ্রিজা ।
ওর ভাবতেই এখন অসম্ভব খুশি লাগছে যে ও এখন আইনত সম্পূর্ণ সিঙ্গেল! ওই অহংকারী, বদমেজাজি শিক্ষামন্ত্রীর নামের কোনো ট্যাগ আর ওর নামের পাশে থাকবে না। ও মুক্ত, স্বাধীন এক আঠারো বছরের তরুণী, যার সামনে এক বিশাল আকাশ পড়ে আছে।

“এই নিন আপনার পেপার। ,” অরি খামটা আলভির হাতে ফিরিয়ে দিয়ে এক চিলতে বিজয়ের হাসি হাসল।
আলভি খামটা হাতে নিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও মনে মনে সারিমের অন্ধ বিবেকের জন্য করুণা অনুভব করতে করতে গেটের দিকে পা বাড়াল। ও ভাবল,
“বস আজ জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করে ফেললেন।”
আলভি খামটা চেপে ধরে দ্রুত পায়ে হেটে মৃধা নিবাসের মেইন গেট পার হয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কালো প্রাডো গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। সারিম তখনো পেছনের সিটে বসে ড্যাশবোর্ডের ফাইলে চোখ বোলাচ্ছিল। আলভি গাড়ির কাছে এসে পেছনের দরজাটা আলতো করে খুলে মুখ বাড়াল।
“স্যার, কাজ হয়ে গেছে। ম্যাডাম… আই মিন, ওনি কোনো অবজেকশন ছাড়াই পেপারে সাইন করে দিয়েছেন। এই যে পেপার…” আলভি খামটা সারিমের দিকে বাড়িয়ে দিতে চাইল।
ঠিক তখনই ঘটল এক অবিশ্বাস্য ও চরম অঘটন!
রাতের বৃষ্টির কারণে এলাকার এক ঝাঁক নেড়ি কুকুর ক্ষুধার তাড়নায় ডাস্টবিনের পাশে ঘুরঘুর করছিল। আলভি যখন গাড়ির দরজা খুলে অসাবধানতাবশত খামটা বাড়িয়ে ধরেছিল, ঠিক তখনই একটা বিশাল সাইজের ধেড়ে নেড়ি কুকুর হঠাৎ করেই এক লাফে আলভির হাতের ওপর চড়াও হলো। কুকুরটা হয়তো ভেবেছিল এই সাদা খামের ভেতরে কোনো দামী মাংসের টুকরো বা খাবার আছে!

“আরে! হাট্ট! হাট্ট!” আলভি ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু কুকুরটা এতটাই ক্ষুধার্ত আর ডেসপ্যারেট ছিল যে ও আলভির হাত থেকে কামড় দিয়ে সাদা কাগজের খামটা এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিল! খামটা মাটিতে পড়তেই পেছনের আরও তিন-চারটা নেড়ি কুকুর একসাথে ঘেউ ঘেউ করে সেই খামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা খামটাকে খাবারের টুকরো ভেবে নিজেদের মাঝে কাড়াকাড়ি শুরু করল এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সারিমের সেই অতি মূল্যবান, এতোদিন ধরে তৈরি করা ডিভোর্স পেপারগুলোকে কামড়ে, ছিঁড়ে, কাঁদায় লেপ্টে একদম কুটি কুটি করে চিবিয়ে খেতে লাগল!
“স্যার!কুত্তাগুলো ডিভোর্স পেপার খায়া ফেলতাছে!” আলভি মাথায় হাত দিয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল।
গাড়ির ভেতরে বসে থাকা সারিমের চোখ দুটো রাগে মুহূর্তের মধ্যে ছোট হয়ে এলো। ওর কপাল আর চোয়ালের শিরাগুলো রাগে কাঁপতে লাগল। ও অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। ও নিজের চোখে দেখল, ওর জীবনের সবচেয়ে বড় মুক্তির কাগজটা এখন চারটা নেড়ি কুকুরের পেটে চলে যাচ্ছে!
“আলভি! হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস?!” সারিম নিজের গম্ভীর ও কর্কশ গলায় গর্জে উঠল। ওনার এই গর্জনে রাস্তার মানুষজনও থমকে গেল।

“তুমি একটা সাধারণ কাগজের খাম সামলাতে পারো না? আই উইল ফায়ার ইউ!”
“স্যার, স্যার! প্লিজ মাফ করে দেন! আমি তো বুঝিনি কুত্তাগুলো কাগজ খাবে!”
আলভি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের কান ধরল। ঠিক তখনই আলভির মাথায় এক চতুর বুদ্ধি খেলে গেল। ও নিজের তোতলামি সামলে সারিমের কাছে এগিয়ে এলো।
“স্যার! একটা বুদ্ধি আছে। আমাদের তো আবার নতুন করে পেপার বানাতে অনেক সময় লাগবে, আর আপনার তো আবার পরীক্ষার হল ভিজিট আছে দশটায়। আমাদের মুসলিম ধর্মে তো সরাসরি মুখ দিয়ে তিনবার ‘তালাক’ বললেও বিয়ে ভেঙে যায়! আপনি জাস্ট ভেতরে গিয়ে ওই মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ফুটে তিনবার বইলা দেন, ব্যস! ঝামেলা খতম! কাগজের আর দরকারই নাই!”
সারিম এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওর বদমেজাজি আর প্রাক্টিক্যাল মগজটা ভাবল, আলভি ভুল বলেনি। নতুন করে ল ইয়ার ডাকা, পেপার বানানো—অনেক সময়ের ব্যাপার। ও আজই এই চ্যাপ্টার ক্লোজ করতে চায়। ও নিজের সাদা শার্টের হাতা দুটো আর একবার কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল। ওর চোখ জোড়া তখন রাগে জ্বলছে। পাঁচ বছর পর ও নিজের সেই নিষিদ্ধ ভিটেয় পা রাখতে চলেছে, স্রেফ তিনটে শব্দ উচ্চারণ করার জন্য।

সারিম অত্যন্ত দৃঢ় ও গম্ভীর পদক্ষেপে মৃধা নিবাসের সেই বিশাল সীমানা প্রাচীর পার হয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। ওর প্রতিটি কদম যেন এই বাড়ির মাটিকে কাঁপিয়ে তুলছিল। ও সোজা গিয়ে মেইন দরজার সামনে দাঁড়াল এবং কোনো ভদ্রতার তোয়াক্কা না করে অনবরত ডোরবেলটা চাপতে লাগল—’টিং টং, টিং টং, টিং টং’।
ভেতরে অরি মাত্রই ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে একটা বই উল্টাচ্ছিল। আবার একটানা কলিং বেলের শব্দ শুনে ওর মেজাজটা চরম বিগড়ে গেল।
“কোনো কমন সেন্স নেই নাকি?এভাবে দরজায় অনবরত কলিং বেল কে চাপছে।
অরি অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে গটগট পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ও ভাবল আজ ভালোমতো দুকথা শুনিয়ে দেবে দরজার অপারের ব্যাক্তিকে।
অরি ঝটকা মেরে দরজাটা খুলে দিল।

“আপনার সমস্যা কী…” ওর মুখের কথা অর্ধেকটা পথেই আটকে গেল।
দরজার ওপাশে এবার দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী, সুঠাম ও অত্যন্ত আকর্ষণীয় পুরুষ। সাদা শার্টের ওপর ওর চওড়া কাঁধ, নিখুঁত করে ছাঁটা দাড়ি আর ওর চোখের ভেতরের সেই চিরচেনা গম্ভীর লুক। অরি এক সেকেন্ডের মধ্যে চিনে ফেলল—ওনি আর কেউ নন, ওনি মৃধা আবরার সারিম।
সারিম দরজার দিকে তাকিয়ে নিজের মুখটা হা করল। ও ভেবেছিল দরজা খুলতেই ওই তেরো বছরের সেই নোংরা, দেহাতি মেয়েটাকে ও দেখবে, আর ও দেখামাত্রই নিজের কর্কশ গলায় বলবে—তালাক, তালাক…
কিন্তু প্রথম শব্দটা ওর মুখ থেকে বের হওয়ার আগেই, সারিমের পুরো পৃথিবীটা যেন এক নিমেষেই থমকে গেল! ওর মুখের ‘তালা’ শব্দটা ওর কণ্ঠনালীতেই আটকে গেল। ওর দুই চোখ চড়কগাছ হয়ে গেল, আর বুকের ভেতরের হৃৎস্পন্দনটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে আবার হাজার গুণ গতিতে ছুটতে শুরু করল।

সারিম নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওর সামনে কি আদেও কোনো রক্ত-মাংসের সাধারণ মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, নাকি কোনো স্বর্গীয় অপ্সরী ভুল করে এই মর্তের মাটিতে নেমে এসেছে? সকালের সেই কাঁচা সোনা রোদ এসে পড়েছে অরির সেই ধবধবে ফর্সা, দুগ্ধশুভ্র ত্বকের ওপর। ওর সেই গভীর বাদামী সিল্কি চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে, আর ঘুম-ঘুম চোখ দুটোর মাঝে এক অদ্ভুত নিষ্পাপতা জড়িয়ে আছে। গোলাপি সুতির শার্টে ওকে এতটাই তীব্র সুন্দর আর পবিত্র দেখাচ্ছিল যে, সারিমের বত্রিশ বছরের সেই কঠিন, পাষাণ আর নারী-বিদ্বেষী মনটা এক সেকেন্ডের মধ্যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
সারিম এক গভীর মোহের ঘোরে চলে গেল। ও স্রেফ হাঁ করে, পলকহীন দৃষ্টিতে অরির দিকে তাকিয়ে রইল। ওর মনের ভেতর তখন একটা তীব্র ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
এই মেয়েটা অরিয়া? এই মেয়েটাই সেই তেরো বছরের পিচ্ছি বাচ্চা, যাকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক স্পট ভেবেছিলো?

“ওহ গড! ও তো কোনো ব্ল্যাক স্পট নয়, ও তো আস্ত একটা চাঁদের টুকরো!ও আমার চন্দ্রিমা ”বিরবির করে কথাগুলো বলে উঠলো সারিম।
সারিমের মতো একজন গম্ভীর ও অহংকারী মানুষ,যে আজ একটা আঠারো বছরের মেয়ের সামনে এসে পুরোপুরি বোবা আর অবশ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তা পুরো অবিশ্বাস্য ।
অরি নিজের সুন্দর ভ্রু দুটো চরম বিরক্তি ভাব নিয়ে কুঁচকে তাকাল।সারিম ওর দিকে কেমন এক অদ্ভুত, হাভাতের মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন ওকে গিলে খাবে। অরির মনে পড়ে গেল ঐদিন রাতের সেই লেকের ধারের দৃশ্যটা। এই লোকটা রাতে প্রেমিকা সামলায় আর সকালে এখানে এসে ওর দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকার মানে কি অরি কিছুই বুঝছেনা! অরির মনে এক তীব্র ঘৃণা আর অবজ্ঞা জেগে উঠল। ও নিজের গলার স্বরকে যতটা সম্ভব শান্ত করে বলল,

“আপনার ডিভোর্স পেপারে তো আমি অলরেডি সাইন করে দিয়েছি। আর কোনো প্রয়োজন আছে কি? নাকি বাবার সাথে দেখা করতে এসেছেন? বাবা বাড়িতে নেই,ওনি জগিং এ গেছেন।”
অরির এই মিষ্টি অথচ তীরের মতো কথাগুলো শুনে সারিমের কোনো হেলদোল হলো না। ও অরির ওই গোলাপি ঠোঁট দুটোর নড়াচড়া দেখছিল আর নিজের মনের ভেতরে এক অদ্ভুত কাঁপন অনুভব করছিল। ওর গম্ভীর স্বভাবের আড়ালে থাকা পুরুষটা আজ প্রথমবার কোনো মেয়ের সৌন্দর্যের সামনে পুরোপুরি কুপোকাত হয়ে গেছে।ও নিজের অজান্তেই, অত্যন্ত ধীর ও মৃদু গলায় বলল, “সরি…”
“অ্যাঁ? কী বললেন?”

অরি আকাশ থেকে পড়ল। ও কিছুই বুঝতে পারল না এই অহংকারী লোকটা হঠাৎ ওকে কেন সরি বলল। বিয়ের দিন ফেলে যাওয়ার জন্য, নাকি এত সকালে বিরক্ত করার জন্য?
সারিম কোনো উত্তর দিতে পারল না। ও নিজের গম্ভীর ব্যক্তিত্ব ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ওর ফর্সা গাল দুটোতে তখন হালকা লালচে আভা ফুটে উঠেছিল। হ্যাঁ, স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী আবরার সারিম একটা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই ‘ব্লাশ’ করছিল! ওর মন তখন পুরোপুরি অরির প্রেমের সাগরে ডুব দিয়েছে। ও যে এখানে ডিভোর্স দিতে এসেছিল, ‘তালাক’ শব্দটা উচ্চারণ করতে এসেছিল—সবকিছু ওর মগজ থেকে এক নিমেষেই ডিলিট হয়ে গেছে। ও এখন মনে মনে ভাবছে,
“ডিভোর্স? আমি এই পরীটাকে ডিভোর্স দেব? আমার মাথা খারাপ হলেও আমি তা করব না! ও শুধু আমার, ও অন্য কারোর হতে পারে না!”

অরি ওনার এই অদ্ভুত আচরণ দেখে চরম বিরক্ত হলো। ও ভাবল এই লোকটা নির্ঘাত একটা পাগল।
“আপনার যদি আর কোনো কাজ না থাকে, তবে আমি দরজাটা বন্ধ করছি। আমার পড়া বাকি আছে,”কথাটা বলেই অরি এক ঝটকায় সারিম এর মুখের ওপর ধপ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
দরজাটা মুখের ওপর বন্ধ হয়ে যেতেই সারিমের ঘোরটা কাটল। ও দরজার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত, তৃপ্তির হাসি হাসল। ওর ভেতরের সেই গম্ভীর মন্ত্রী ক্যারেক্টারটা এখনো বাইরে স্পষ্ট, কিন্তু ভেতরের মনটা তখন খুশিতে নাচছিল। ও ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার সেই বড় ও দৃঢ় পদক্ষেপে গেটের দিকে হেঁটে গেল।
গেটের কাছে আলভি তখনো ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে ছিল।তখনি সে সারিম কে আসতে দেখল। ও দেখল বসের মুখটা গম্ভীর হলেও ওনার চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত আলোর ছটা।

“স্যার… সাইন… আই মিন মুখ দিয়ে তালাক বলা হইছে?” আলভি তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করল।
সারিম আলবির দিকে এক তীব্র ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। ওর গলার স্বর আবার সেই গম্ভীর ও কড়া হয়ে উঠল। সে সোজা গিয়ে রাস্তার সেই চারটে নেড়ি কুকুরের দিকে তাকাল, যারা তখনো ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো মুখে নিয়ে বসে আছে। সারিম এই কুকুরগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক পরম কৃতজ্ঞতা অনুভব করল। আজ যদি এই কুকুরগুলো ওই ডিভোর্স পেপারটা না ছিঁড়ত, তবে তো ওর লাইফের সবচেয়ে বড় অমূল্য রতনটা হাত থেকে চিরতরে হারিয়ে যেত! এই কুকুরগুলো আজ ওর জীবনের সবচেয়ে বড় উপকার করেছে।”
সারিম আলভির দিকে ফিরে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় অর্ডার করল,

“আলভি! এই মুহূর্তে এই চারটা কুকুরকে গাড়িতে তোলো।”
“অ্যাঁ?! স্যার, কুত্তাগুলারে গাড়িতে তুলব?!” আলভি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।
“হ্যাঁ, তুলবে। এবং গুলশানের সবচেয়ে দামী এবং ফাইভ স্টার রেস্তোরাঁ যেটা আছে, ওটার পুরোটা বুক করো। এই চারটা কুকুরকে সেখানে নিয়ে টেবিলে বসাবে, আর ওই রেস্তোরাঁর সবচেয়ে দামী এবং বেস্ট কোয়ালিটির ‘বিফ স্টেক’ ওদের পেট পুরে খাওয়াবে। ওদের সেবায় যেন কোনো খামতি না থাকে। দিস ইজ মাই অফিশিয়াল অর্ডার!” সারিম গাড়িতে বসতে বসতে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল।
আলবি রাস্তার মাঝখানে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। ও ভাবল,

“বসের মাথা আজ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে! মানুষ মরে গেলেও ফাইভ স্টার রেস্তোরাঁ বুক করে না, আর বস আজ রাস্তার নেড়ি কুত্তাদের স্টেক খাওয়ানোর জন্য পুরো রেস্তোরাঁ বুক করতে বলছেন!” কিন্তু বসের কড়া অর্ডারের সামনে কথা বলার সাহস ওর নেই।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২

বাধ্য হয়ে আলভি মুখ চুন করে, চারটা নেড়ি কুকুরকে ‘তু তু’ করে ডেকে কোনোমতে দামী প্রাডো গাড়ির পেছনের ডিকিতে তুলল এবং নিজেই ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। ওরা এখন গুলশানের সবচেয়ে বিলাসবহুল রেস্তোরাঁর দিকে রওনা দিলো,কুকুর গুলোর সকালের ব্রেকফাস্ট করানোর জন্য,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here