ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৩
মেহজাবিন নাদিয়া
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখা মুঠোফোনটি বিকট শব্দে বেজে উঠল।গভীর ঘুমে মগ্ন আলভির কানে সেই কর্কশ শব্দ পৌঁছাতে খানিকটা সময় লাগল। ঘুমের ঘোরে চরম বিরক্ত হয়ে সে চোখ দুটো আধো-বোঁজা অবস্থাতেই খোলার চেষ্টা করল। হাতড়ে হাতড়ে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিল সে। স্ক্রিনে কে কল করেছে,সেসব কিছুর দিকে নজর না দিয়েই অবহেলার সাথে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল আলভি।
ঠিক তখনই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সারিমের গম্ভীর ও ব্যস্ত কণ্ঠস্বর-
_”আলভি! একদম সময় নষ্ট না করে ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নাও। এক্ষুনি ফেরি ঘাটে পৌঁছাতে হবে।”
সারিমের গলার স্বর শুনে আলভির সমস্ত ঘুম যেন এক ঝটকায় উবে গেল! বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল তার। মুহূর্তের মধ্যে চোখ দুটি বড় বড় করে বিছানার ওপর ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে উঠল সে। কিছুটা ভয়ে আর আচমকা চমকে গিয়ে নিজের বুকে দুই-তিনটে থুতু ছিটালো আলভি, যেন বুকের ভেতর অনবরত হতে থাকা অস্বাভাবিক ধরফরানিটা একটু হলেও কমে।
নিজের অস্থিরতা সামলে নিয়ে আধো-তোতলা স্বরে প্রশ্ন করে উঠল আলভি,
_”ন-না মানে… স্যার, এত রাতে ফেরি ঘাটে আবার কী কাজ? কিছু হয়েছে নাকি?”
সারিম ওপাশ থেকে সংক্ষিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল,
_”একটা মার্ডার কেস। বাকিটা ঘাটে পৌঁছালেই জানতে পারবে। আমি আর বাবা ইতিমধ্যেই বেরিয়ে পড়েছি,এখনো পৌঁছাইনি। তুমি দেরি না করে দ্রুত চলে এসো।”
মার্ডার কেস’ শুনতেই আলভির মুখের অবয়ব নিমেষেই বদলে গেল। চটজলদি জবাব দিল সে,
_”জি স্যার!আমি আসছি এক্ষুনি!”
কলটা কেটে যেতেই আর এক সেকেন্ডও আলসেমি করল না আলভি। বিছানা ছেড়ে এক লাফে নেমে সোজা ওয়াসরুমের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল ফ্রেশ হয়ে নেওয়ার জন্য।
ফেরি ঘাটের থমথমে বাতাসে এক ভয়াল নীরবতা ভাসছে।
গাড়ির চাকা পিচের রাস্তায় সজোরে ঘর্ষণ খেয়ে থেমে যেতেই আরিশান মৃধা আর সারিম নিচে নেমে এলো। গাড়ি থেকে নামা মাত্রই চারপাশ থেকে পুলিশের একটা বড় বেষ্টনী তাদেরকে ঘিরে ধরল। বর্তমান সরকারের দুজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী হিসেবে আরিশান মৃধা আর সারিমের সুরক্ষায় বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখতে চায় না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘাটের চারপাশে উৎসুক জনতার ভিড় আর ফ্ল্যাশলাইটের আলোকরশ্মি রাতের অন্ধকারকে আরও বিভ্রান্তিকর করে তুলেছে।
একটু দূরেই পুরো সিআইডি টিমকে সাথে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়ুশ। তার মুখের অবয়ব কঠিন এবং থমথমে। তার থেকে কিছুটা তফাতে নদীর পাড় ঘেঁষে পোস্টমর্টেমের প্রাথমিক প্রক্রিয়ার জন্য রাখা হয়েছে লাশটি। ফরেনসিক এক্সপার্ট ডক্টর স্যানেশ খুব সতর্কতার সাথে বডি পর্যবেক্ষণ করছেন। সারিম ভিড় ঠেলে সোজা আয়ুশের দিকে এগিয়ে এলো।
সারিমকে দেখে আয়ুশ চোখ তুলে তাকাল। আয়ুশের মুখের গম্ভীর ভাব দেখে সারিম ওর সামনে দাড়ালো। সে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিল-
_”হোয়াটস দ্য প্রবলেম, আয়ুশ? খুনের ব্যাপারে কিছু জানতে পারলি?”
আয়ুশ কয়েক সেকেন্ড একদম নিশ্চুপ রইল। সে ঠিক কী বলবে বা কীভাবে শুরু করবে, ভেবে পাচ্ছিল না। দূরে আরিশান মৃধা কয়েকজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারের সাথে গম্ভীর মুখে কথা বলছেন। আয়ুশ একবার সেদিকে তাকাল, তারপর চোখ ফিরিয়ে অত্যন্ত ধীর গলায় সারিমকে জিজ্ঞেস করল-
_”জেবা কোথায়?”
হুট করে এই রকম সিচুয়েশনে জেবার প্রসঙ্গ উঠতেই সারিম ভীষণ অবাক হলো। সে একটু ভ্রু কুঁচকে বলল-
_”এতো রাতে ও নিশ্চই পেত্মী সেজে তোর সঙ্গে দেখা করতে আসবে না।বাড়িতেই থাকবে!হুট করে ওর কথা কেন আসছে এখানে?”
আয়ুশ একটা দীর্ঘ ভারী নিশ্বাস ফেলে বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল-
_”আঙ্কেলকে বলিস ওকে যেন একটু সামলে রাখে। এই মুহূর্তে মেয়েটার ওনাকে বড্ড বেশি প্রয়োজন।”
সারিম আয়ুশের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না। কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল-
_”তুই ধাঁধা বলা বন্ধ করবি? আমি তোর কাছে এই খুনের বিষয়ে জানতে চাইছি, আর তুই এখানে জেবাকে নিয়ে পড়ে আছিস! ওকে সামলানোর জন্য ওর স্বামী তো আছেই, সে ঠিক সামলে নেবে। তুই আগে মূল কাজের প্রসঙ্গে আয়!”
আয়ুশ চোখ দুটো বন্ধ করে শান্ত গলায় বলল-
_”আমি কাজের ব্যাপারেই বলছি, সারিম।”
সারিম আরও অধৈর্য হয়ে উঠল-
_”মানে কি? পরিষ্কার করে খুলে বল আমাকে!”
আয়ুশ এবার হাত তুলে কিছুটা দূরে সাদা কাপড়ে ঢাকা লাশটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল-
_”ওই লাশটা দেখ। শরীরটাকে আঠারোটা খণ্ডে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। খুনি অত্যন্ত নৃশংস হলেও তার হাত ছিল ভীষণ পাকা! খুনের ধরন দেখে মনে হচ্ছে এটা খুব প্রফেশনাল কোনো সার্জিক্যাল কাজ-যেমনটা একজন দক্ষ ডাক্তার করে থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ভিক্টিমের দুটো কিডনিই মিসিং! মনে হচ্ছে খুনি খুব নিখুঁতভাবে সেগুলো শরীর থেকে আলাদা বের করে নিয়ে গেছে।”
সারিম অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আয়ুশের কথাগুলো শুনল। আপাতদৃষ্টিতে বাইরে শান্ত থাকলেও, সারিমের মাথার ভেতর একের পর এক সমীকরণ মিলতে শুরু করেছে। এক অদৃশ্য ঝড়ের আভাস পাচ্ছিল সে।
আয়ুশ আবার বলতে শুরু করল-
_”ডিএনএ রিপোর্টটা হাতে এলেই খুনির মূল পরিচয়টা আরও স্পষ্ট হবে।”
সারিম জিজ্ঞেস করল-
_”কীভাবে?”
আয়ুশ বলল-
_”অনুপমার লাস্ট লোকেশন ট্র্যাক করে একটা সন্দেহজনক জায়গার সন্ধান পাওয়া গেছে। আমাদের ধারণা, খুনটা ওখানেই হয়েছে। সেখান থেকে কিছু ব্লাড স্যাম্পল আর একটা হাতঘড়ি উদ্ধার করা গেছে। ওই ঘড়ির মালিকের খোঁজ এখনও চলছে।”
সারিম চকিত চোখে তাকাল
_”তুই কী বলতে চাইছিস? এসবের পেছনে অনুপমা জড়িত?”
আয়ুশ ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দিল-
_”এখনই ১০০% সিওর বলতে পারছি না, তবে ওকে অবিশ্বাস করারও কোনো সুযোগ নেই।”
কথাটা বলেই আয়ুশ হঠাৎ থেমে গেল। তারপর বেশ কিছুটা সময় নীরব থেকে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করল-
_”আনতারা আন্টি আজ সারাদিন কোথায় ছিলেন, সারিম?”
মায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই সারিম স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মস্তিষ্কে এক লহমায় খেলে গেল দুপুরের ঘটনাটা-বাড়ি ফেরার পর দেখেছিল আনতারা মৃধা তখন বাড়িতে ছিলেন না, তিনি ফিরেছিলেন একদম সন্ধ্যায়! তবে কি… সারিমের শক্ত চোয়াল আরও শক্ত হয়ে উঠল। গলাটা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে।এই জীবনে তাকে আর কত কদর্য সত্যি মুখোমুখি হতে হবে? নিজের জন্মদাতা মা! যার আঁচলের নিচে নিরাপত্তা পাওয়ার কথা ছিল, সেই মা-ই আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক আর রহস্যের নাম! সারিম আর কিছু ভাবতে পারছিল না, তার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছিল।
সারিমের এমন বাকরুদ্ধ অবস্থা দেখে আয়ুশ বুঝে গেল সারিমের ভেতরের যুদ্ধটা। কিন্তু এই মুহূর্তে তারও হাত-পা বাঁধা। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল-
_”তুই লাশটা কার, সেটার আইডেন্টিটি জানতে চাইবি না?”
সারিম নিজের বিক্ষিপ্ত ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে শুকনো মুখে জিজ্ঞেস করল-
_”কার লাশ?কোনো পরিচয় পাওয়া গেছে?”
আয়ুশ নিচু কণ্ঠে জবাব দিল
_”ঐ যে টুকরো টুকরো করে রাখা লাশটা দেখতে পাচ্ছিস, ওটা জেবার বাবার! সোলেমান আঙ্কেলের…”
কথাটা যেন সারিমের মাথায় এক তীব্র বাজ হয়ে আছড়ে পড়ল! সে তীব্র বিস্ময়ে হাঁ করে বলল-
_”হোয়াট?! আর ইউ সিরিয়াস, আয়ুশ?!”
সারিম পুরো থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত-পা যেন নিমেষেই প্রাণহীন হয়ে পড়ছে। সে যা শুনল, তা কি সত্যিই শুনেছে? নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল তার। নিজেকে ভুল প্রমাণ করার এক মরিয়া চেষ্টা নিয়ে সে আবারও বলল-
_”হাউ ইজ দিস পসিবল?! এটা সত্যি হতে পারে না…”
আয়ুশ ব্যথিত মুখে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।সারিম এবার নির্মম সত্যটা মেনে নিতে বাধ্য হলো। তার মাথা পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সারিমের এই বিচলিত রূপ দেখে আয়ুশ একটু অবাক হয়ে বলল-
_”তুই এত রিয়্যাক্ট করছিস কেন, সারিম? পরিস্থিতি কঠিন জানি, কিন্তু-”
সারিম নিজের মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করার মতো করে অস্ফুটে বলে উঠল-
_”ওহ গড ড্যাম ইট! জেবা বাবার থেকে ডিভোর্স চায়… আর আমি কিনা….! শিট! শিট!”
আয়ুশ সারিমের কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করল-
_”রিল্যাক্স সারিম! পরিস্থিতি এখন আমাদের হাতের বাইরে চলে গেছে। পারিবারিক ঝামেলা পরে মেটানো যাবে। কিন্তু এখন সবচেয়ে আগে জেবাকে সামলাতে হবে।মেয়েটার জীবনে এত বড় একটা ঝড় নেমে এসেছে, এই মুহূর্তে আঙ্কেলকে ওর পাশে থাকা বড্ড বেশি দরকার।”
সারিম নিরুপায় হয়ে মাথা নেড়ে সায় দিল।দূর থেকে দেখা যাচ্ছে আরিশান মৃধাকে। ওনার মুখের অবয়বও এখন একদম শোচনীয়, চোখ দুটো লাল। এতক্ষণে ওনিও নিশ্চয়ই লাশের পরিচয় জেনে গেছেন।সারিম দূর থেকে বাবার সেই অসহায়, নিঃস্ব চেহারাটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ ভারী নিশ্বাস ফেলল। জীবনে প্রথমবার এই শক্ত সমর্থ লোকটার জন্য সারিমের বুকটা হাহাকার করে উঠল। আহারে তার বাবাটা! এমনিতেই তার সংসারটা জমে উঠার আগেই খসে যেতে চলেছে, তার ওপর এই নতুন শোকের কালছায়া। সুখ যেন আরিশান মৃধার ভাগ্যে লেখা নেই! একের পর এক ঝড়ঝাপ্টা লেগেই আছে।
আর সারিম খুব ভালো করেই জানে-এই সবকটি কালবোশেখী ঝড়ের পেছনের অদৃশ্য সূত্রধর আর কেউ নয়, তার নিজেরি জন্মদাত্রী মা!
‘মা’ শব্দটা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ হলেও, সারিমের কাছে এখন এই শব্দটা পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত কাঁটা হয়ে বিঁধছে। যে কাঁটা তার পুরো অস্তিত্বকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত করে চলেছে!
রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠছিল।অরির ঘরের বিছানায় পাশ ফিরে একা জেগে শুয়ে আছে জেবা। পাশে অরি একদম ঘুমে কাদা হয়ে পড়ে আছে। তবে জেবার দু চোখের পাতা এক করার বিন্দুমাত্র সাধ্য নেই। তার মাথার ভেতর একটানা ঝড় বয়ে চলেছে-যার প্রতিটি কেন্দ্রবিন্দুজুড়ে কেবল একজনই মানুষ, আরিশান মৃধা।
আনতারা মৃধার ঘরে যে দৃশ্যটা সে নিজের চোখে দেখে এসেছে, তা বারবার চোখের সামনে এক অলঙ্ঘনীয় অভিশাপের মতো ভেসে উঠছে। জেবা হাজার চেষ্টা করেও সেই দৃশ্যটা নিজের স্মৃতিপট থেকে মুছে ফেলতে পারছে না। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের ভেতরের এই অবাধ্য কষ্টটাকে প্রশমিত করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে সে ভাবল-‘এমন তো হওয়ারই কথা ছিল! আনতারা মৃধা আরিশান মৃধার প্রথম স্ত্রী, ওনার জীবনে তো সেই প্রথম স্থান অধিকার করে বসে আছে। লোকটা তো কেবল ছেলের চাপে আর পরিস্থিতির শিকার হয়ে জেবাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল।জেবা তো সব জেনে-বুঝেই এই আগুনের কুণ্ডলীতে লাফ দিয়েছিলো! তবে আজ কেন লোকটাকে অন্য কারো পাশে দেখলে তার বুকটা এভাবে ছিঁড়ে যাচ্ছে?’
হয়তো এটাই নারীর মন! ভালোবাসার মানুষকে কখনোই অন্য কারো সাথে ভাগ করে নিতে পারে না তারা। কিন্তু ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লায় মাপতে গেলে আনতারা মৃধাও তো সমান অধিকার রাখেন ওনার ওপর। বরং আনতারা মৃধার অধিকারটাই যেন অনেকটা বেশি! তিনি আরিশান মৃধার প্রথম ভালোবাসা, প্রথম স্ত্রী, আর ওনার একমাত্র সন্তানের মা। আর সে? সে তো মাত্র কয়েকদিনের এক উড়ে এসে জুড়ে বসা মেয়ে! কোথায় আনতারা মৃধার সাথে ওনার বহু বছরের সাজানো সংসার, আর কোথায় তার এক মাসও না হওয়া এই নামমাত্র বৈবাহিক জীবন!
লোকটা তো শুরুতেই তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল-সে জেবাকে কেবল একটা ‘দায়িত্ব’ মনে করে। তাকে ভালোবাসার কোনো প্রতিশ্রুতি তো তিনি কখনোই দেননি। তবুও জেবার এই বেহায়া মনটা যেন আরিশান মৃধা ছাড়া আর কিছুই বোঝে না! ভাবতেই জেবার চোখের কোণ বেয়ে নীরবে টপ টপ করে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল বালিশে। সেই জলটুকু হাত দিয়ে মুছে ফেলার মতো কোনো তাগিদ বা অনুভূতিও তার ভেতরে অবশিষ্ট রইল না।
সবদিক থেকে নিঃস্ব হয়ে গেলে হয়তো নারী মন এমনই অসহায় হয়ে পড়ে!
শৈশব থেকেই তো ভাগ্য তার সাথে নিষ্ঠুর খেলা খেলে আসছে। জন্মদাত্রী মাকে হারানো খুব ছোটবেলায়, আর বাবাকে কোনোদিন নিজের পাশে না পাওয়া। সবশেষে জীবনের এই তপ্ত মরুভূমিতে যাকে একটু আশ্রয়ের মতো কাছে পেয়েছিল-সেই আরিশান মৃধাও যেন আজ তার থেকে হাজার মাইল দূরে সরে যাচ্ছেন! এই বিশাল পৃথিবীতে জেবার যেন সবই আছে, অথচ তার নিজের বলতে আসলে কিছুই নেই।
নিজের তীব্র দীর্ঘশ্বাসটা চেপে ধরে জেবা পাশে শুয়ে থাকা অরির দিকে তাকাল। অরি একপাশে গাল ফুলিয়ে বেশ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। তার বাদামী রেশমি চুলগুলো মুখের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। মেয়েটার চোখে রাজ্যের ঘুম আর প্রশান্তি। একদম নির্বিকার চিত্তে ঘুমাচ্ছে সে-যেন তার জীবনে কোনো অপ্রাপ্তি বা হাহাকার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
আর থাকবেই বা কেন? যার জীবনে সারিমের মতো একজন ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখা স্বামী আছে, আর আরিশান মৃধার মতো পরম স্নেহশীল শ্বশুর আছেন, তার জীবনে তো দুঃখ পাওয়াটা কেবল একটা দুঃস্বপ্ন বৈ আর কিছুই নয়!
জেবা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে অরির কপালে আটকে থাকা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিল। আলতো ছোঁয়ায় অরি ঘুমের ঘোরে একটু নড়েচড়ে উঠল, তবে পরক্ষণেই আবার গভীর শান্তিতে তলিয়ে গেল।
ঘুমন্ত অরিকে দেখতে এই মুহূর্তে কতটা নিষ্পাপ আর পবিত্র লাগছে! জেবার মনের গহীনে একচিলতে আফসোস জেগে উঠল-‘ইস! আল্লাহ যদি অরির মতো তাকেও খানিকটা সীমিত দুঃখের পর এতটুকু সুখ দিত! সেও তো অন্তত একটু ভালোবাসা ডিজার্ভ করত, তাই না?’
সে তো জন্ম থেকেই শুধু আঘাত আর অবহেলা পেয়ে এলো। তবে তার এই আফসোসের মধ্যে বিন্দুমাত্র হিংসা ছিল না। অরি যে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহার! এই অরি না থাকলে জেবা হয়তো জীবনে ‘খুশি’ শব্দটার আসল অনুভূতিটাই কোনোদিন বুঝতে পারত না। জীবনে অরির মতো একজন খাঁটি বান্ধবী পাশে থাকলে আর কিইবা চাওয়ার থাকে!
জেবা পরম যন্তে নত হয়ে অরির কপালে একটা ছোট্ট ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল।
অনেক তো হলো কান্নাকাটি, এবার আর নয়! সামনে যা আছে, তা না হয় জেবা নিজের ভাগ্যলিপির ওপরই ছেড়ে দিল। আর ভাববে না সে কিছু। অরিকে এক হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে জেবা চোখ দুটো বুজল।
ঘুমের ঘোরে অরি কারো উষ্ণ উপস্থিতি আর জড়িয়ে ধরা টের পেয়ে নিজেও এক পশলা মিষ্টি আবেশে জেবাকে আঁকড়ে ধরল।
সকাল ১০টা বেজে ৮ মিনিট।
শেখ ভিলার বিশাল চত্বরে এখন এক গা ছমছমে ভারী নিস্তব্ধতা আর স্বজন হারানোর আকুল কান্না ঝুলছে। নিচতলার প্রশস্ত বসার ঘরে নেমে এসেছে ঘন কালো শোকের ছায়া। ফরেনসিক টেস্টের সব ঝামেলা মিটিয়ে অবশেষে সোলেমান শেখের খণ্ড-বিখণ্ড দেহটি একটা কফিনে মুড়ে বাড়িতে আনা হয়েছে।
চারপাশে চেনা-পরিচিত শুভাকাঙ্ক্ষী আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়স্বজনের ভিড়। সবার মুখেই বিষাদের চাপ। এক পাশে ভাইয়ের কফিনের ওপর মাথা রেখে অনবরত আছাড় খেয়ে কেঁদে চলেছেন আনজুমান শেখ। তার কান্না যেন দেয়ালগুলোতেও কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে তাকে কোনোমতে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে আরা। এই বয়সে এসে ভাইয়ের এই নৃশংস পরিণতি দেখা ওই ভদ্রমহিলার পক্ষে সহ্য করা সত্যি অসম্ভব! ভাই ছাড়া আর যে তার এই জগতে আপন বলতে কেউ ছিল না। হাজার চেষ্টা করেও ওনাকে সেই মৃতদেহের পাশ থেকে সরিয়ে আনা যাচ্ছে না।
আর এসব দৃশ্য দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গভীর নজরদারিতে পর্যবেক্ষণ করছেন আনতারা মৃধা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিশান মৃধার বাহু স্পর্শ করে থাকলেও ওনার দৃষ্টি একদম বরফের মতো ঠাণ্ডা। এত মানুষের আহাজারি আর হাহাকার ওনার কাছে স্রেফ এক চরম বিরক্তির খোরাক ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না! ওনার তীক্ষ্ণ ও হিংস্র চোখ দুটো শুধু একজনকে আড়াল থেকে মেপে চলেছে।
সকালেই সোলেমান শেখের এই নৃশংস মৃত্যুর খবর পাওয়ামাত্রই আনতারা মৃধা নিজে উদ্যোগী হয়ে জেবা আর অরিকে নিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। আরিশান মৃধার কিছু আইনি জটিলতা সামলাতে গিয়ে রাতে বাড়ি ফেরা হয়নি; সারিমকে সাথে নিয়ে ভোররাতে ওনি সরাসরি এই স্পটেই পৌঁছান।
হট্টগোলের এক কোণে যেন আস্ত একটা লাশ হয়ে পড়ে আছে জেবা। অরির শক্ত কাঁধে মাথা রেখে নিথর হয়ে বসে আছে সে। মেয়েটার দুটো চোখ অসম্ভব রক্তবর্ণ ধারণ করেছে; কান্নারা শুকিয়ে এখন সেখানে যেন এক মরুভূমির খাঁ খাঁ শূন্যতা। বাবার এই ভয়াবহ ও পৈশাচিক মৃত্যু কিছুতেই মাথায় ঢোকাতে পারছে না জেবা। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছে-এসবের জন্য সে নিজেই দায়ী!
যদি সে আরিশান মৃধাকে বিয়ে করার বাহানায় বাবার মনে এত বড় আঘাত না দিত, নিজের ভালোবাসার মানুষকে পেতে গিয়ে যদি সেদিন লোকটার জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে না যেত—তবে হয়তো তার বাবা আজ জীবিত থাকত! সেদিন বাবা কত আশা আর করুণা নিয়ে তাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছিল! অথচ সে কী করল? আরিশান মৃধার ভালোবাসায় জরিয়ে নিজের জন্মদাতা বাবাকে একবারের জন্য খোজো নিলো না!
আর আজ? আজ সেই পুরুষ দিব্যি নিজের প্রথম স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে তাকে প্রটেক্ট করছে, ছায়ার মতো আগলে রাখছে। অথচ তার আরেকজন বউ যে পাশে কুকুর-বেড়ালের মতো শোকের সাগরে পড়ে ধুঁকছে-সেদিকে লোকটার বিন্দুমাত্র কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই!
অরি পরম যন্তে জেবার মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। মেয়েটা এতক্ষণ পাগলের মতো কাঁদছিল, কিন্তু এখন হঠাৎ এত চুপ মেরে যাওয়াটা একদম ভালো লক্ষণ নয়। আর কিছুক্ষণ পরেই জানাজার জন্য সোলেমান শেখের দেহ বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর সোপর্দ করা হবে মাটির অতল গহ্বরে।
এভাবেই কি তবে জেবার জীবন থেকে ‘বাবা’ নামক অধ্যায়টির চিরতরে ইতি ঘটতে চলেছে?আগে মা হারিয়েছিল, আজ বাবাও চলে গেল। সবাই যেন একে একে তাকে একা ফেলে ওই দূরে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে! এই বিশাল পৃথিবীতে জেবাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসার মতো আর কি সত্যি কেউ বেঁচে রইল না? জেবার চোখের কোণ বেয়ে দু-ফোটা নোনা জল নিরবে গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু তা মোছার কোনো অনুভূতি তার মধ্যে জাগল না। অরি নিজেই নিজের হাত দিয়ে খুব আলতো করে জেবার চোখের জলটুকু মুছে দিল।
কিন্তু জেবার সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। তার চোখ স্থির হয়ে আছে ফুফু আনজুমান শেখের দিকে-যিনি মা-সম ভালোবাসায় তাকে বড় করেছিলো। আর আজ সেই মাকেই জেবা প্রতিদান হিসেবে ভাইয়ের মৃতদেহ উপহার দিলো।সবকিছুর উর্ধ্বে জেবা নিজেকে এর জন্য দায়ী ভাবছে। চাইলেও সে কাঁদতে পারছে না এখন। শরীরের সমস্ত শক্তি, চিল চিৎকার করে কাঁদার ক্ষমতা-সব যেন কাল রাতেই নিভে ছাই হয়ে গেছে!রাত থেকে কাঁদতে কাঁদতে সে এখন ভীষণ হাঁপিয়ে উঠেছে।
একটু পরেই সোলেমান শেখের কাঠের খাটিয়াটি তোলা হলো। আরিশান মৃধা, সারিম, জেবার ফুফা এবং পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলভি মিলে চার কোণ কাঁধে চেপে ধরলেন। এরপর ধীরপায়ে চত্বরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন তারা।
কিন্তু আনজুমান শেখ যেন হঠাৎ উন্মাদ হয়ে উঠলেন! ভাইকে নিয়ে যেতে দেখে তিনি পাগলের মতো ছুটে এসে স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন-
_”আমার ভাইকে তোমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? ও আমাদের ছেড়ে একা থাকতে পারে না! ওকে নিও না… প্লিজ ওকে কোথাও নিয়ে যেও না!”
বলতে বলতেই তিনি স্বামীর হাত ধরে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লেন। স্ত্রীর এই পাগলামি দেখে অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলেন জেবার ফুফা। আরা দ্রুত ছুটে এসে পেছন থেকে মাকে জাপটে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল-
_”মা! যেতে দাও ওনাদের… প্লিজ পাগলামি কোরো না! মামাকে এখন দাফন করতে হবে…”
মেয়ের এই রূঢ় সত্যি কথাটা শুনে আনজুমান শেখের উন্মাদের মতো আচরণ যেন শতগুণ বেড়ে গেল! মাটি থেকে উঠে নিজের মেয়েকেই সরিয়ে দিতে চাইলেন-
_”ছাড় আমাকে আরা! যেতে দে আমার ভাইয়ের কাছে! আমার ভাইকে আমি এভাবে ওই মাটির নিচে পুতে ফেলতে দেব না!”
আরা কোনোমতে শক্ত করে নিজের মাকে আটকে ধরল, আর একটুও প্রশ্রয় দিল না।
এসব কিছু অরির কোলে মাথা রেখে, দূর থেকে নিঃশব্দে দেখছিল জেবা। তার বুক ছিঁড়ে তীব্র কান্না দলা পাকিয়ে গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে, কিন্তু এক ফোঁটা শব্দ হয়ে বাইরে বেরোচ্ছে না!সোলেমান শেখের খণ্ড-বিখণ্ড টুকরো আনা লাশটা, একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে দেখা অসম্ভব-সেখানে জেবা তো ওনার নিজের মেয়ে!সে কিভাবে এই নৃশংসতা দেখে সহ্য করবে।
অরি জেবার ভেতরের এই অবরুদ্ধ অস্থিরতা ভীষণভাবে অনুভব করতে পারছিল। একদিন সেও তো তার বাবাকে এভাবেই হঠাৎ হারিয়ে এক রাতে একা হয়ে গিয়েছিল! মা তো তার জন্মের পরপরই আকাশের তারা হয়ে গিয়েছিল, আর বাবাও না ফেরার দেশে পাড়ি জমালো। সেদিন তো অরি তার বাবার শেষ বারের মতো মুখটাও দেখতে পায়নি! আর জেবা? জেবা পেল—কিন্তু কী মর্মান্তিক ও নৃশংস এক স্মৃতির সাক্ষী হয়ে!
দু-হাতে জেবাকে পরম আদরে আঁকড়ে ধরে অরি নিচু স্বরে বয়ে বলল-
_”জেবা… ঠিক আছিস দোস্ত? নিজেকে একটু সামলা প্লিজ! আমরা আছি তো তোর পাশে… সব সময় থাকব! আঙ্কেলের এই অবস্থা যে নরপশুরা করেছে, খুব শিগগিরই বাবা আর সারিম ওদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি দেবে!”
জেবা অরিকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। অরির উষ্ণ কাঁধে মুখ গুঁজে মাথাটা চেপে রাখল, কিন্তু মুখে একটা শব্দও করল না। তার গলায় যেন একটা বিশাল পাথর আটকে গেছে। অরি বুঝতে পেরে জেবার কানের পেছনের ও গলার অংশটায় আলতো ম্যাসাজ করে দিতে লাগল, যাতে মেয়েটা কিছুটা আরাম পায়। কিন্তু এ কি এমন দুঃখ যে এই সামান্য স্পর্শে মিলিয়ে যাবে? কখনোই না!
জানাজার জন্য সোলেমান শেখের দেহ প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভেতরের ঘরে আনজুমান বেগমকে অন্য মহিলারা ঘিরে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। ঘরে প্রায় শতাধিক মহিলা-যাদের কেউ দূর সম্পর্কের আত্মীয়া, আবার কেউ বা ব্যবসায়ী মহলের চেনা-পরিচিত জন।
আরা এক কোণে চুপচাপ বসেছিল। তবে তার চঞ্চল নজর বারবার গিয়ে ঠেকছিল ঘরের এক কোণে হেলান দিয়ে সোফায় বসে থাকা আয়ুশের ওপর!
তদন্তের কাজে ঘাটে কিছুটা দেরি হয়ে যাওয়ায় আয়ুশের এখানে পৌঁছাতে দেরি হয়। এসে শুনল জানাজা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, তাই সে আর জানাজায় না গিয়ে ভেতরের দিকে এসে একটা সোফায় বসেছিল। তার সাথে তার মা রিনা কায়দারও এসেছেন। সোলেমান শেখের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী লেনদেন ছিল, সেই সূত্রে সম্পর্ক বেশ মধুর।
এখানে এসে আয়ুশ খেয়াল করল-একটা কমবয়সী মেয়ে তার দিকে কেমন যেন অদ্ভুত এক তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে আছে! বিষয়টা আয়ুশের কাছে ভীষণ অস্বস্তিকর ও বিরক্তির ঠেকলো। এই মেয়ের হাবভাব তার ধরতে সক্ষম সে!
মেয়েটা হয়তো জানেও না যে, আয়ুশের কাছে নারী মানে টিস্যু পেপারের মতো ব্যবহার্য একটা বস্তু-যা স্রেফ নিজের প্রয়োজনে ক্ষণিকের জন্য কাছে রাখা যায়, কিন্তু পারমানেন্টলি জীবনে ঠাঁই দেওয়ার বস্তু নয়! বিয়ের মতো বাঁধনে বাঁধার চিন্তা তার প্রফেশনের সাথেই যায় না। এই তো সেদিন-রিয়া নামের মেয়েটার সাথে দীর্ঘ এক মাসের সম্পর্ক ছিন্ন করল সে। সম্পর্কে জড়ানোর আগেই আয়ুশ স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয় যে সে কোনো প্রেম-ভালোবাসা বা বিয়ের মতো আবেগে নেই। তবুও এই মেয়েরা কিছুদিন পর নিজের রূপ বদলে বৈবাহিক সম্পর্ক টেনে আনে! তাই কাল বিকেলে রিয়াকে এক হাত ভালোমতো শুনিয়ে নিজের জীবন থেকে একটা নোংরা কীটের মতো চিরতরে সরিয়ে দিয়েছে সে।
আয়ুশের ক্ষুরধার চোখ দুটি হঠাৎ আনতারা মৃধার ওপর গিয়ে স্থির হলো। এখানে এসে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার। তার একটাই কারণ-সারিম আর আরিশান মৃধাকে কেসের কিছু গোপন ও জরুরি আপডেট দেওয়া। তা না হলে এই মরা বাড়িতে এসে ফ্যান্টাসি দেখার বিন্দুমাত্র আগ্রহ তার নেই!আনজুমান বেগমকে শান্ত করার ভান করে তার পাশে বসে ছিলেন আনতারা মৃধা। কিন্তু ওনার নজর বারবার আয়ুশের ওপর গিয়ে পড়ছিল। যখন থেকে জানতে পেরেছেন যে এই ছেলেটি একজন উচ্চপদের সিআইডি অফিসার এবং সোলেমান শেখের মার্ডার কেসটি তার আন্ডারেই চলছে-তখন থেকেই ওনার শকুনি চোখ দুটি আয়ুশকে পরিমাপ করতে ব্যস্ত! আয়ুশ সেটা আঁচ করতে পেরেও ধূর্ততার সাথে তা এড়িয়ে গেল।
এদিকে চারপাশের এত কান্নাকাটি আর ভারী হট্টগোলে জেবাকে মানসিকভাবে খুব অসুস্থ বোধ করাচ্ছে,অরি বিষয়টা বুঝতে পেরে তাকে কোনোমতে ধরে ওপরের একটা নির্জন ঘরে নিয়ে এসেছে।বেডসাইড টেবিল থেকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি ঢেলে অরি জেবার মুখের সামনে ধরল। জেবা কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ এক নিঃশ্বাসে পানিটুকু খেয়ে নিল। তারপর তার ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিল। অরি এসির রিমোট নিয়ে ঘরের টেম্পারেচার কিছুটা বাড়িয়ে দিল যাতে জেবার ঠাণ্ডা না লাগে। জেবা চোখ বুজে নিশ্চুপ শুয়ে রইল। অরি ভাবল এই মুহূর্তে ওকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না। সে নিচে নামার জন্য পা বাড়াল।
অরি সিঁড়ি বেয়ে নিচতলার দিকে নামছিল। ঠিক তখনই ওপরের দিকে উঠে আসা এক মধ্যবয়সী মহিলার সাথে অরির সামান্য ধাক্কা লেগে গেল! ভারসাম্য হারিয়ে অরি পড়ে যেতে নিয়েও সিঁড়ির রেলিং ধরে নিজেকে সামলে নিল।
মহিলাটি ছিলেন রিনা কায়দার। নিজের অসাবধানতায় একটু অপরাধবোধ নিয়ে তিনি বলে উঠলেন-
_”ইশ! ঠিক আছো মেয়ে?”
অরি মাথা নাড়িয়ে ঘুরে তাকালো। অরি তাকাতেই রিনা কায়দারের চোখ দুটো যেন অরির চেহারায় আটকে গেল!এত অপরূপ রূপসী ও নিষ্পাপ চেহারার মেয়ে তিনি তার জীবনে খুব কম দেখেছেন! যেন আকাশ থেকে খসে পড়া কোনো এক রাজকুমারী! মনে মনে রিনা কায়দার নিজের একগুঁয়ে ছেলে আয়ুশের জন্য ঠিক এমন একটি মেয়েই বহুদিন ধরে মনে মনে খুঁজছিলেন!
অরি ওনাকে এভাবে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
রিনা কায়দার অরির সেই অপ্রস্তুত ভাব বুঝতে পেরে পরম স্নেহে হেসে উঠলেন-
_”ওমা বোকা মেয়ে! তোমাকে জিজ্ঞেস করছি কোনো ব্যথা পেয়েছ কি না?”
অরি মিষ্টি একটা হাসি ফুটিয়ে বলল-
_”না না আন্টি! আসলে ভুলটা আমারই ছিল, দেখে শুনে হাঁটা উচিত ছিল। আমি একদম ঠিক আছি, ব্যথা পাইনি!”
মেয়েটির কণ্ঠস্বর ও নম্র ব্যবহারে রিনা কায়দার মন থেকে হেসে উঠলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে সোফায় বসা আয়ুশ নিজের মায়ের হাসির শব্দ পেয়ে চোখ তুলে সিঁড়ির দিকে তাকাল।
আর সাথে সাথে-
আয়ুশের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সেখানেই স্থির হয়ে গেল! সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অরির মুখশ্রীর ওপর গিয়ে তার দৃষ্টি যেন জমে বরফ হয়ে গেল!বুকের ভেতরের নিঃশ্বাসটা আটকে গেল আয়ুশের। এ যেন কোনো পার্থিব সৌন্দর্য নয়! চোখের সামনে কোনো এক সাক্ষাৎ চাঁদকে দেখছে না তো সে? জীবনে প্রথমবার আয়ুশ কায়দার অনুভব করল-কোনো নারীর একচিলতে রূপ তাকে ভেতর থেকে একদম শক্তভাবে নাড়িয়ে দিয়ে গেল!
অরির দিক থেকে চোখ ফেরানো যেন এই মুহূর্তে আয়ুশের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে!
খোলা বাতাসে অরির বাদামী রেশমি চুলগুলো আলতো দুলছে, পরণে সাধারণ একখানা টু-পিস, চুলগুলোর মাঝে একটা সুন্দর রাউন্ড ব্যান্ড পরা, আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই নির্মল হাসি!
আয়ুশ কি তবে এই প্রথম কোনো মেয়েকে দেখে সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে?
মুহূর্তের মধ্যে নিজের ভেতরের এই বৈপ্লবিক অনুভূতি টের পেয়ে আয়ুশ নিজেই নিজেকে কঠোরভাবে শাসাল-
_’ছিঃ আয়ুশ কায়দার! স্রেফ রূপের মোহে পড়ে তুই তোর এতদিন ধরে তৈরি করা দেয়াল ভাঙতে পারিস না!’
কিন্তু তার অবাধ্য মনটা যেন আজ আর কোনো যুক্তির তোয়াক্কাই করছে না। আয়ুশের গভীর তীক্ষ্ণ চোখ দুটো তখনও অরির ওপর থেকে সরে আসতে রীতিমতো অস্বীকার করছিল!
সোলেমান শেখের কবরস্থ করার পর্ব থেকে শুরু করে শেষকৃত্যের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা অবশেষে সম্পন্ন হলো।কাজ শেষে আলভি আর সারিম বিশেষ একটি জরুরি কাজের অজুহাতে আরিশান মৃধার সাথে শেখ ভিলায় ফিরতে অস্বীকৃতি জানাল। সারিম বাবার দিকে তাকিয়ে বলল-
_”বাবা আমার আর আলভির একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।তুমি একা চলে যাও!গিয়ে নিজের বউকে সামলাও,বেচারি এতক্ষণে নিশ্চয়ই কেঁদে-কেটে শেষ! আর হ্যাঁ, আমার বউকে কিছুক্ষণের জন্য তোমার হেফাজতে রেখে গেলাম, একটু দেখেশুনে রেখো।”
ছেলের কথায় আরিশান মৃধা নীরব রইলেন। এই চরম শোকের আবহেও ছেলের এই চপল ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন এলো না দেখে তিনি মনে মনে বেশ বিরক্ত হলেও কিছু বললেন না। সোলেমান শেখের এমন আকস্মিক নৃশংস মৃত্যুতে ওনার মনটা ভেতর থেকে ভীষণ ভারী হয়ে ছিল-আজ দীর্ঘদিনের বন্ধুকে হারালেন তিনি।এদিকে সারিম শেষমেশ বাবাকে একপ্রকার শাসিয়েই আলভিকে নিয়ে অন্য কাজে বেরিয়ে গেল সারিম।
আরিশান মৃধা বাকিদের সাথে শেখ ভিলায় ফিরে এলেন। বসার ঘরে ঢুকতেই দেখতে পেলেন আয়ুশ সোফায় গম্ভীর হয়ে বসে আছে। ওনাকে দেখেই আয়ুশ বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। আরিশান মৃধা ওনার চোখের ইশারায় তাকে ওপরে আসার ইঙ্গিত দিলেন।
আয়ুশ সে ইঙ্গিত বুঝে নিয়ে আরিশান মৃধাকে আগে যেতে দিল, তারপর কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে নিজেও ওপরে উঠে গেল। বসার ঘরে বসে এসব কিছুই সুসূক্ষ্ম নজরদারিতে পর্যবেক্ষণ করছিলেন আনতারা মৃধা। ওনার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো তাদের গতিপথ অনুসরণ করল। কিন্তু এই মুহূর্তে ওনার পক্ষে উঠে তাদের পিছু নেওয়া সম্ভব নয়, কারণ উপস্থিত এত আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে ওনার হঠাৎ ফিরে আসা নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। একে এটা তো তাকে সেটা-বানিয়ে বানিয়ে হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে ওনাকে!
বাড়ির একেবারে নির্জন ফাঁকা ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন আরিশান মৃধা। পাশে এসে দাঁড়াল আয়ুশ। আরিশান মৃধা গম্ভীর মুখে পেছনে ফিরে প্রশ্ন করলেন-
_”কেসের ব্যাপারে নতুন কোনো আপডেট আছে, আয়ুশ?”
আয়ুশ ছাদের এক কোণে রাখা সোফা সেটের দিকে ইঙ্গিত করে বলল-
_”আঙ্কেল, আগে বসুন।”
আরিশান মৃধা বসলেন, আয়ুশও ওনার মুখোমুখি বসল। এবার আয়ুশ বলতে শুরু করল-
_”সারিমের থেকে তো নিশ্চয়ই প্রাথমিক বিষয়গুলো শুনেছেন?”
আরিশান মৃধা মাথা নেড়ে বললেন-
_”হ্যাঁ, নতুন কিছু পেলে বলো।”
আয়ুশ বলল-
_”ডিএনএ রিপোর্ট পুরোপুরি ম্যাচ করে গেছে। আর স্পট থেকে উদ্ধার হওয়া ওই হাতঘড়িটা-সেটির খোঁজ পেয়েছি আমরা।”
আরিশান মৃধা উৎসুক চোখে তাকালেন-
_”কী তথ্য পেলে?”
_”ঘড়িটি আনতারা আন্টি কিনেছিলেন। আমরা ওনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডিটেইলস চেক করে দেখেছি, এই ঘড়ির পেমেন্ট ওনার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকেই করা হয়েছে।”
কথাটা শুনে আরিশান মৃধার মুখ আরও থমথমে হয়ে উঠল। আয়ুশ আবার জিজ্ঞেস করল-
_”সারিমকে কি বিষয়টা জানাব?”
আরিশান মৃধা হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন-
_”একদম না! সারিমকে এখন এসবের কিছুই জানাবে না। ও এসব শুনলে মাথা গরম করে উল্টোপাল্টা কিছু ঘটিয়ে বসবে। আমি চাই না আমাদের এতদিনের শ্রম ভেস্তে যাক।”
আয়ুশ কিছুক্ষণ ভেবে বলল-
_”তবে আরেকটা স্ট্রং অপশনও কিন্তু আমাদের হাতে আছে আঙ্কেল। আপনার বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঠিক দু-দিন আগে আনতারা আন্টির সাথেই সোলেমান আঙ্কেলকে গাড়িতে উঠতে দেখা যায়। আর সেখান থেকেই তিনি মিসিং হন, যার শেষ পরিণতি এই মার্ডার! সার্বিক তথ্যপ্রমাণ তো সরাসরি ওনার দিকেই আঙুল তুলছে…”
বলতে বলতেই আরিশান মৃধা তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কড়া গলায় বললেন-
_”পর্যাপ্ত ও নিরেট প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা আইনত ও নৈতিকভাবে ঠিক নয়, আয়ুশ!”
আয়ুশ একটু অবাক হয়ে বলল-
_”কিন্তু এখানে যা এভিডেন্স আছে, তা কি তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য যথেষ্ট নয়?”
আরিশান মৃধা অটল ভঙ্গিতে বললেন-
_”আরও স্ট্রং প্রুফ জোগাড় করো আগে। এমনও তো হতে পারে যে সে নির্দোষ এবং তাকে ফাঁসানো হচ্ছে!”
আয়ুশ আর কথা বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আইনি মারপ্যাঁচ ও নীতি ওনার চেয়ে ভালো কেউ বুঝবে না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনে ঘুরে হাঁটা ধরতেই হঠাৎ তার পা দুটো থমকে গেল!সামনে দাঁড়িয়ে আছে জেবা!
মেয়েটির চোখে জলের ধারা, আর পুরো মুখে এক হিংস্র অগ্নিরূপ! রাগে ও ক্ষোভে তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। আয়ুশ পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেও চুপচাপ সেখান থেকে কেটে পড়ল-যার বউ তাকেই সামলাতে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে।
আরিশান মৃধা আয়ুশ চলে গেছে ভেবে পেছনে ঘুরতেই জেবার সেই ক্রুদ্ধ চাহনির মুখোমুখি হলেন। জেবাকে এই মুহূর্তে এখানে ওনি আশা করেনি।ওনার পুরো মাথা যেন নিমেষেই হ্যাং হয়ে গেল! কয়েকবার ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেন। মেয়েটার রূঢ় চাহনি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এতক্ষণ তাদের ভেতরের প্রতিটি কথা সে অক্ষরে অক্ষরে শুনে ফেলেছে!
এখন কি তবে জেবা ওনাকে ভুল বুঝবে? ভাবতেই আরিশান মৃধার বুকের ভেতরটা অজানা এক তীব্র আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি জেবাকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে দ্রুত সামনে এগোতেই-জেবা ওনার আগে সামনে এসে দাড়ায়! রুদ্ধ কণ্ঠে আছড়ে পড়ল তার তীব্র অভিযোগ-
_”আমি সব শুনেছি! আপনি মেনে নিন প্লিজ… আপনার স্ত্রী-ই আমার বাবাকে মেরেছে! আমি নিজ চোখে দেখেছি তাকে আমার বাবার সাথে গাড়িতে করে যেতে! আপনি প্লিজ ওই খুনি মহিলাকে মেরে ফেলুন! সে আমার বাবাকে নৃশংসভাবে খুন করেছে!”
আরিশান মৃধা এই মুহূর্তে কী বলবেন ভেবে পেলেন না। তবে মেয়েটাকে শান্ত করা জরুরি ভেবে তিনি নরম গলায় বললেন-
_”দেখো জেবা, শান্ত হও! সঠিক ও পোক্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কাউকে অপরাধী বলতে পারি না। আর আনতারা যদি সত্যিই দোষী হয়, তবে সে অবশ্যই শাস্তি পাবে-আমি তোমাকে নিশ্চিত করছি! নিজেকে সামলাও প্লিজ…”
কিন্তু জেবা কোনো যুক্তি মানতে নারাজ! বাবার বিচার চাওয়ার উন্মাদনা তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সে আরিশান মৃধাকে আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠে বলল-
_”আপনি বিশ্বাস করুন, ওই মহিলাই আমার বাবাকে খুন করেছে! আপনার স্ত্রী আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে আমার বাবাকে কেড়ে নিয়েছে, আমি সব বুঝি! প্লিজ ওকে মেরে ফেলুন আপনি! আপনি না খুব ভালো মানুষ? তবে ওনাকে শাস্তি দিচ্ছেন না কেন?!”
বলতে বলতে ধপ করে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল জেবা।
আরিশান মৃধা নিজেও সাথে সাথে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসলেন। মেয়েটিকে শান্ত করার জন্য তিনি নিজের দু-হাতের আঁজলায় জেবার অশ্রুসিক্ত মুখটা তুলে ধরে বোঝানোর সুরে বললেন-
_”লিসেন টু মি জেবা! আমাদের হাতে এখনো কোনো শক্ত এভিডেন্স নেই যা দিয়ে তাকে আইনিভাবে দোষী প্রমাণ করা যায়। সঠিক প্রমাণ পেলেই আইন তাকে কঠোর সাজা দেবে, আমরা নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারি না! খুন করার এই ভয়াবহ চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো আর নিজেকে সামলাও…”
কথা শেষ হতে না হতেই জেবা ঝটকায় ওনার হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে সরাসরি আরিশান মৃধার শার্টের কলার চেপে ধরল! তার চোখে এখন ভয়ঙ্কর বিষোদগার! সে চিৎকার করে বলে উঠল-
_”আপনি এসব ইচ্ছে করে করছেন, তাই না?! আইনের বাহানা দিয়ে নিজের স্ত্রীকে বাঁচাতে চাইছেন! তাকে খুব ভালোবাসেন, তাই না? নাহলে তাকে শাস্তি দিতে এত গাত্রদাহ হচ্ছে কেন আপনার?! দেখতে পাচ্ছেন না সে আমার বাবাকে টুকরো টুকরো করে কেটে মেরেছে?!”
আরিশান মৃধা এবার ধৈর্যের চরম সীমায় পৌঁছে গেলেন। তিনি জেবার হাত দুটো কলার থেকে শক্ত হাতে ছাড়িয়ে নিয়ে গর্জনে উঠলেন-
_”স্টপ ইট জেবা! ইউ আর ক্রসিং ইউর লিমিট! আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি বলে এই নয় যে তুমি প্রমাণ ছাড়া যাকে-তাকে খুনি বানিয়ে দেবে!”
জেবা আরিশান মৃধার এই কথায় উপহাসের কটু হাসি হাসল। বিষাক্ত গলায় বলল-
_”কতটা বেহায়া আর নির্লজ্জ পুরুষ আপনি! ভালোবাসা মানুষকে কতটা অন্ধ বানাতে পারে, তা আপনাকে না দেখলে জানতাম না! নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে বারবার নিজের অপরাধী বউকে বাঁচাতে চাইছেন, তাই তো? আপনি একটা কাপুরুষ! আপনার কোনো সেলফ-রেসপেক্ট নেই!একজন মহিলা বার বার আপনাকে ধোঁকা দেয়। আর আপনি তা জেনেও তাকে কিছু বলেন না। উল্টো তাকে আশ্রয় দেন নিজের কাছে। এ আপনি কেমন পুরুষ তাহলে।আই জাস্ট হেট ইউ! অনেক সহ্য করেছি আপনাকে… এবার আমি এই নরক থেকে মুক্তি চাই! আমার তালা….”
কথাটা শেষ করার আগেই
‘ঠাস! ঠাস!’দুটো কড়া থাপ্পড় আছড়ে পড়ল জেবার নরম গালে!আঘাতের তীব্রতায় জেবার ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। চোখের সামনে ধোঁয়াটে অন্ধকার নেমে এলো তার, মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরে উঠল। আরিশান মৃধা হাতের তালু মুঠো করে রাগে ফুঁসছেন।
কিন্তু পর মুহূর্তেই-পুরো ‘আরিশান মৃধা’ নামক ক্ষমতাধর অস্তিত্বকে স্তম্ভিত করে দিয়ে
‘ঠাস!’এক বিকট শব্দে একটা সজোড় থাপ্পড় এসে পড়ল স্বয়ং আরিশান মৃধার গালে!
থাপ্পড়টি আর কেউ নয়-স্বয়ং জেবা মেরেছে!
আরিশান মৃধা গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে যান।এমন প্রতিক্রিয়া তিনি ইহজন্মেও এই মেয়েটার কাছ থেকে আশা করেননি! ততক্ষনে জেবা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
জেবার সমগ্র সত্তাজুড়ে আজ আরিশান মৃধার জন্য কেবল তীব্র ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না। লোকটার ওপর এতদিন ধরে রাখা সমস্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান এই এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
জেবা আর ওনার দিকে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করল না। তবে যাওয়ার আগে আরিশান মৃধার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে হিমশীতল গলায় বলে গেল-
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪২
_”আপনি একটা ভীরু কাপুরুষ! আজ থেকে আমি আপনাকে শুধু ঘৃণাই করব। খুব শিগগিরই আপনার কাছে ডিভোর্স পেপার পৌঁছে যাবে… আমি এই বিষাক্ত সম্পর্কের ইতি টানতে চাই!”
কথাটা বলেই জেবা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হনহন করে ছাদ থেকে নেমে গেল।
আরিশান মৃধা তখনও গালে হাত দিয়ে ছাদের শক্ত মেঝেতে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। ওনার চোখের কোণ থেকে আচমকা এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল পিচের মেঝের ওপর। অবিশ্বাস্য হলেও-এটাই নিষ্ঠুর সত্য!
