Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪২

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪২

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪২
মেহজাবিন নাদিয়া

গাড়ির পেছনের আয়নায় চোখ রাখতেই,অবিরামের কপালে দুপাশে ঘেমে ওঠা বিন্দু বিন্দু রক্তহিম করা জলকণাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো। অবিরাম বাঁ হাতটা স্টিয়ারিং হুইলে বরফের মতো জমে আছে, আর ডান হাতটা অনবরত আইয়ুশের নাম্বারে একের পর এক রিং করে যাচ্ছে।
কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই! শুধু একটা যান্ত্রিক কণ্ঠ বারবার বেজে চলেছে_”দ্য নাম্বার ইউ আর ডাইলিং ইজ কারেন্টলি আনঅ্যাভেইলঅ্যাবল…”
পাশেই প্যাসেঞ্জার সিটে রাখা কালো রঙের ডিএসএলআর ক্যামেরা।তার ভিতরে অবিরাম জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জলজ্যান্ত সত্য প্রমাণ চিপে বন্দি করেছে, সেটাই এখন তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঁকা চোখে একবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে সে শুকনো এক দলা একটা ঢোক গিলল। হাত দিয়ে ক্যামেরাটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল-এই প্রমাণটা যেন কোনোভাবেই ওই নরপশুগুলোর হাতে না পড়ে!
হঠাৎই এক বিকট কানফাটা শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ!

গাড়ির পেছনের চাকা লক্ষ্য করে পেছন থেকে অনবরত গুলি চালানো হচ্ছে। ঘর্ষণে পিচের রাস্তা থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বেরোচ্ছে। একটা গুলি গিয়ে সজোরে বিঁধল গাড়ির ডান পাশের পেছনের চাকায়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অবিরামের গাড়িটা কয়েকবার চক্কর কেটে মূল সড়ক থেকে ছিটকে গেল এক নির্জন, উঁচু পাহাড়ের সর্পিল খাঁজের দিকে।
অবিরাম আপ্রাণ চেষ্টা করল স্টিয়ারিংটা সোজা রাখার, পা দিয়ে ব্রেকটা পুরো চেপে ধরল। কিন্তু চাকা ফেটে যাওয়া গাড়িটা তখন এক অনিয়ন্ত্রিত মৃত্যুর বাহন হয়ে উঠেছে! পাহাড়ের প্রান্তসীমায় এসে মুহূর্তের জন্য সময়টা যেন থমকে গেল। নিচে গর্জে উঠছে শত ফুট গভীরের উত্তাল নদী, যার জলের হিংস্র ঢেউগুলো পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ছে।অবিরাম শুধু চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে উচ্চারণ করল এক অস্ফুট নাম। পর মুহূর্তেই-এক বিকট শব্দ, ধাতব মোচড় ভাঙনের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল পুরো উপত্যকায়! অবিরাম সহ আস্ত গাড়িটা পাহাড়ের সেই সুউচ্চ খাদ থেকে সোজা শূন্যে ভেসে গিয়ে আছড়ে পড়ল নিচে অপেক্ষারত সেই মৃত্যুপুরীর মতো উত্তাল নদীর বুকে! বিশাল এক জলরাশি শূন্যে লাফিয়ে উঠে মুহূর্তের মধ্যে গিলে ফেলল সবকিছু।

পাহাড়ের চুড়োয় এসে একটা তীব্র শব্দে থমকে দাঁড়াল সেই ঘাতক কালো গাড়িটা। দরজা খুলে ধীর পায়ে নেমে এলো বিশাল চওড়া কাঁধ আর বলিষ্ঠ গড়নের দুজন পুরুষ।
হাতে শক্ত করে ধরা রিভলভার দুটো কোমরে গুঁজে,খাদের একদম কিনারে এসে দাঁড়াল তারা। নিচে অন্ধকার ঘনাচ্ছে। উত্তাল নদীর ফেনা তুলে আছড়ে পড়া ঢেউগুলো ছাড়া আর কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ির সামান্যতম অংশটুকুও সেই প্রমত্তা নদীর অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল-যেন সেখানে একটু আগেও কোনো মানুষের অস্তিত্ব ছিল না!
তাদের মধ্যে লম্বা মতো লোকটা পকেট থেকে অত্যন্ত ফোন বের করে নির্দিষ্ট একটা নম্বরে ডায়াল করল। মাত্র এক বার রিং হতেই ওপাশ থেকে এক ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-

_”কাজ শেষ?”
লোকটা খাদের নিচের অন্ধকার নদীর দিকে আরেকবার তাকিয়ে। ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল,
_”চ্যাপ্টার ক্লোজ, স্যার।ঐ সিআইডি অফিসার আর তার ওই ক্যামেরা এখন শত ফুট গভীর নদীর তলে। বেঁচে ফেরার কোনো চান্স এক পারসেন্টও নেই। হি ইজ গন।”
ওপাশের ব্যক্তিটি কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ রইল। তারপর তার এক চিলতে ক্রূর হাসির শব্দ স্পষ্ট শোনানো গেল স্পিকারে। খুব সন্তুষ্ট কণ্ঠে বলল,
_”গুড।বডি ভেসে উঠলেও যেন কেউ চিনতে না পারে, সে ব্যবস্থা নদী নিজেই করে নেবে। কাম ব্যাক।”
কলটা কেটে গেল। বলিষ্ঠ লোক দুটো শেষবারের মতো সেই অতল খাদের দিকে তাকাল। মুখে তাদের বিজয়ের এক পৈশাচিক হাসি। এরপর কোনো কথা না বাড়িয়ে তারা আবার নিজেদের গাড়িতে গিয়ে উঠে বসল। মুহূর্তের মধ্যে কালান্তক গাড়িটি স্টার্ট নিয়ে পাহাড়ি ধুলো উড়িয়ে মিলিয়ে গেল রাতের আঁধারে।
সারিম করিডোর দিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে উপর থেকে অরিকে দ্রুত নিচে আসতে দেখতে পেল সে। অরিকে দেখা মাত্রই সারিমের মুখের হাভভাব নিমেষেই বদলে গেল। চপল ভাবটা উবে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক রাজ্য ভীতি ছায়া।

অন্যদিকে অরি সারিমকে সামনে দেখেই নিজের মুখটা কঠোর ও শক্ত করে ফেলল। চোখ দুটো ছোট ছোট করে লোকটার দিকে তাকাল সে। একটু আগেই তো এই লোকটা গিয়ে জেবার সাথে ওর এত বড় একটা ঝগড়া বাঁধিয়ে দিয়ে এলো! সারিমের এই কাজের জন্য আজ অরিকে কতটা সম্মান হারাতে হলো!অরি আজ একে ছাড়বেনা বলে মনে মনে ঠিক করে আছে।
সারিম অরিকে নিজের দিকে গটগট করে এগিয়ে আসতে দেখে দ্রুত না দেখার ভান করল। তারপর পেছনে ফিরে যেখান থেকে এসেছিল, সেদিকেই হনহন করে হাঁটা দিল। সারিমকে এভাবে কেটে পড়তে দেখে অরি চুপ থাকতে পারল না। দ্রুত ওর পিছু নিয়ে একটু চড়া গলায় ডেকে উঠল,
_”সারিম! দাঁড়ান বলছি!”
সারিম পেছনে না তাকিয়েই নিজের হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। চলতে চলতেই বলল,
_”উঁহু, দাঁড়াব না! আমি খুব ভালো করেই জানি, দাঁড়ালেই তুমি আমাকে এখন ইচ্ছেমত মারবে।”
অরি এবার ভীষণ রেগে গিয়ে বলল,

_”এতই যদি ভয় পান, তবে ওইসব শয়তানি আর জাওরামিগুলো করতে যান কেন?”
সারিম যেতে যেতেই হালকা কাঁধ ঝাঁকিয়ে জবাব দিল,
_”তখন আমার বিবেক পকেটে আর আবেগ মাথায় ছিলো,এখন আমার বিবেক মাথায় আবেগ পগারপার। সো আমি আর এই ভুল জীবনেও করবো না।”
অরি বুঝল, এভাবে কড়া গলায় একে থামানো যাবে না। তাই সে এবার নিজের কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম আর মিষ্টি করে নিয়ে বলল,
_”আহা, এমন করছেন কেন? সমস্যা নেই, কাছে আসুন! আপনাকে কিচ্ছু বলব না, একদম বকবোও না… একটু আদর দেবো, আসুন!”

সারিম অরির এই মিষ্টি কথা ভুলও কানে তুলল না। সে খুব ভালো করেই চেনে এই নারীকে! মিষ্টি কথার ফাঁদ পেতে কাছে ডেকে এনে এমন উত্তম-মাধ্যম দেবে যে হাড়গোড় সোজা হয়ে যাবে। আদর পাওয়া তো অনেক দূরের বিলাসিতা! এ যাত্রায় নিজের পিঠের চামড়া বাঁচানোটাই সবচেয়ে বড় কথা।তাই সারিম আর এক মুহূর্তও দেরি না করে পাশে থাকা আরিশান মৃধার ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
আরিশান মৃধা সবেমাত্র অরির রুম থেকে নিজের ঘরে ফিরেছেন। ওয়াসরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছছিলেন তিনি। ঠিক এমন সময় অসময়ে ছেলেকে হন্তদন্ত হয়ে নিজের রুমে ঢুকে পড়তে দেখে বেশ অবাক হলেন।
সারিম ভেতরে ঢুকে চট করে দরজাটা চেপে দিল। তারপর নিজেকে খুব স্বাভাবিক দেখানোর জন্য বাবার দিকে তাকিয়ে মুখের কোণে একটা জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলল।
আরিশান মৃধা গাম্ভীর্য বজায় রেখে খাটের কোণে বসতে বসতে প্রশ্ন করলেন,
_”হঠাৎ আজ তুমি আমার রুমে? কী মনে করে?”
সারিম মুহূর্তের জন্য ভেবে পেল না কী বলবে। এখন বাবাকে কীভাবে বোঝায় যে বউয়ের মারের ভয়ে সে এখানে এসে ঘাপটি মেরেছে? কোনো উসিলা না পেয়ে, একদম স্বাভাবিক গলায় বলে দিল,
_”এমনি! তোমাকে খুব মিস করছিলাম তো, তাই চলে এলাম।”

আরিশান মৃধা বিস্ময় নিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। এই ছেলে বলছে কি না সে ওনাকে মিস করছিল! ইহজন্মেও তিনি এই কথা বিশ্বাস করবেন না, যতক্ষণ না এর পেছনে কোনো মতলব বা সঠিক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।সারিম বাবার সংশয়ী চাহনি দেখে বুঝে গেল-বাপ তার কথায় আকাশ থেকে পড়েছে। আর পড়বেই না কেন? সারিম যেখানে ওনাকে পাত্তাই দেয় না, সেখানে হুট করে ‘মিস করার’ প্রশ্ন আসে কীভাবে!
আরিশান মৃধা তখনও অবাক চোখে সারিমের দিকে চেয়ে আছেন। সারিম সিচুয়েশন সামলাতে আশেপাশে তাকালো। তখনি তার নজর গেলো খাটের পাশে বেডসাইড টেবিলটার দিকে। সেখানে একটা পিংক কালারের টেডি বিয়ার রাখা ছিল। সে টেডিটা হাতে তুলে নিয়ে বাঁকা হাসলো। কথা ঘুরানোর জন্য বলল,
_”তোমার দেখছি ভালোই অবনতি হয়েছে! ছ্যাঃ, শেষমেশ মেয়েদের টেডি? তাও আবার পিংক কালার!”
আরিশান মৃধা এক ঝটকায় সারিমের হাত থেকে টেডিটা কেড়ে নিলেন।টেডিটা আসলে জেবার। মেয়েটা এই টেডি ছাড়া রাতে একদম ঘুমাতে পারে না, তাই ওটা এখানেই থাকে। নয়তো আরিশান মৃধার মতো মানুষ কি আর শখ করে নিজের রুমে পুতুল রাখেন নাকি! পিংক কালার দেখলে তো ওনার এমনিতেই মেজাজ খিঁচে যায়।কি বিছড়ি কালার দেখতে সেটা।
তবে ছেলের কাছ থেকে নিজের এই দুর্বলতা ঢাকতে তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,

_”তোমাকে কে দেখতে বলেছে এসব? আমাকে মিস করেছ, দেখা শেষ! এবার তুমি নিজের রুমে যেতে পারো।”
সারিম বাবার কথা শুনে তাকে রাগানোর জন্য বলল,
_”হ্যাঁ হ্যাঁ, আমাকে তো যেতে বলবেই! আমি কি আর জেবা নাকি যে খাতির করবে?”
আরিশান মৃধা ছেলের কথায় চরম বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন,
_”সব কথায় ওকে না টানলে হয় না তোমার?”
সারিম সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
_”কেন টানব না? ওকে ছাড়া তোমার জীবনে আর আছেই বা কী!”
আরিশান মৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
_”আমার পিছু না লেগে নিজের মায়ের কাছে যাও। সেখানে গিয়ে তোমার এসব ফালতু বকবকানি শুনাও!”
_”ওই দুষ্টু মহিলার সাথে কথা বলতে ভয় করে! কোনদিন না জানি আবার ফুঁ ফুন্তর মেরে আমার হার্ড খুলে রেখে দেয়!”
আরিশান মৃধা শক্ত মুখে বললেন,

_”তোমার মা নিশ্চয়ই তোমার সাথে এমন কিছু করবে না।”
সারিম এবার সোফা ছেড়ে খাটে এলো।বাবার একটু সামনে ঝুঁকে এসে চুপিচুপি বলল,
_”আমার কিন্তু মাঝে মাঝে ভীষণ সন্দেহ হয়! বলি, নিজের কিডনিগুলো একবার চেক করাচ্ছ না কেন? বলা তো যায় না, বাড়িতে আবার অঙ্গ-চোরাদের কোনো গ্যাং ঢুকে পড়ছে!”
আরিশান মৃধা ছেলের এমন অদ্ভুত আর আজগুবি কথায় মাথা নাড়িয়ে বললেন,
_”আয়ুশ কিছু বলেছে তোমায়? আমার একটা জরুরি কাজ থাকায় দুপুরে ওর সাথে দেখা করতে যেতে পারিনি।”
সারিম ফোঁড়ন কেটে বলল,
_”দিনরাত বউ নিয়ে মগ্ন থাকলে কাজে ফোকাস করার সময় পাবে কখন, বলো? সব কাজ তো এই আমি নামক অবলা প্রাণীটাকে দিয়ে করাচ্ছ! তা বলি, আমারও তো একটা বউ আছে, নাকি? তাকে একটু আদর করার সময়টুকুও তো আমি পাই না তোমার ঠেলায়!”
আরিশান মৃধা ছেলের কথায় উত্তর দেবেন নাকি মাথায় হাত দেবেন, বুঝে পেলেন না। এই ছেলে ওনার সাথে এমনভাবে কথা বলে যেন ওনার সমবয়সী কোনো দোস্ত-ইয়ার! আজব এক খাঁটি পিস! তিনি মনে মনে বিরক্ত হয়ে নিজের রাগ চেপে বললেন,

_”ঠিক আছে, সামনের মাসে তুমি আর অদ্রিজা কোনো একটা সুন্দর জায়গায় ট্রিপে ঘুরে এসো।”
সারিম ওনার কথা শুনে তড়িৎ গতিতে সোজা হয়ে বসে চোখ গোল গোল করে বলল,
_”এমনভাবে বলছ যেন তোমার কাছ থেকে আমাকে পারমিশন নিয়ে ঘুরতে যেতে হবে! আরে, আমার বউ আমি যখন খুশি, যেখানে খুশি নিয়ে যাব। এতে তোমার কোনো অনুমতি আমি নেব না! পরে আবার বউ ভাববে আমি ‘বাবা-ভক্ত’ ছেলে! আমি বরং ‘বউ-ভক্ত’ হয়েই শান্তিতে থাকতে চাই।”
_”আমার অদ্রিজা তোমার মতো এত অসভ্য আর বেয়াদব নয়!সে এসব চিন্তাধারা মনে পুষে”
সারিম সঙ্গে সঙ্গে মুখ বেঁকিয়ে বলল,
_”সারাদিন এত ‘আমার অদ্রিজা, আমার অদ্রিজা’ করো কেন বলতো? এমনভাবে বলো যেন তোমার নিজের মেয়ে, আর সম্পর্কের টানে আমার বোন লাগে! তুমি তো দেখছি মহা ডেঞ্জারাস লোক হে! একসাথে বাবা আর শ্বশুর-দুটো চরিত্রেই অভিনয় করতে চাইছ! কিন্তু আমি তা হতে দেব না। মামা হওয়ার কোনো শখ আমার কোনোকালেই ছিল না, বুঝেছ?”

আরিশান মৃধার এবার সত্যিই তীব্র মাথা ধরে গেল। এই ননস্টপ বকবকানি ছেলের সাথে কথা বলে জেতার কোনো পথ নেই। তিনি আর কোনো উত্তর না দিয়ে একবারে চুপ মেরে গেলেন।
ঠিক তখনই মচমচ শব্দে রুমের দরজাটা খুলে গেল।
দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল অরি এবং জেবা। জেবার চোখ-মুখ এখন বেশ থমথমে আর স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। ওকে দেখে আরিশান মৃধা ভাবলেন, যাক! এবার হয়তো তিনি এই বাচাল ছেলের হাত থেকে মুক্তি পাবেন।
কিন্তু এবার ওনাকে অবাক করার পালা ছিল জেবার। জেবা ঘরে ঢুকেই কোনো কথা না বলে সোজা গিয়ে আরিশান মৃধার হাত থেকে সেই পিংক টেডিটা এক টানে কেড়ে নিল।
পরিস্থিতি থমথমে হতে দেখে সারিম মাঝখান থেকে বানরের মতো চটাং করে ফোঁড়ন কেটে বলে উঠল,

_”জেবা, শোনো! আজ তুমি বরং অরির রুমে গিয়ে অরির সাথেই ঘুমিয়ে পড়ো।আমি আজ বাবা সঙ্গে এই থাকবো।
অরি চোখ দুটো বড় বড় করে সারিমের দিকে তাকিয়ে রইল। ও ভেতরে ভেতরে একদম রাগে রিঅ্যাক্ট করার সুযোগ খোঁজার আগেই জেবা কোনো কথা বাড়াল না। আরিশান মৃধার দিকে একপলক না তাকিয়েই অরির হাত ধরে টেনে রুম থেকে বের হয়ে আসলো।
অরির তখন ইচ্ছে করছে সারিমকে কাঁচা চিবিয়ে খায়! কতটা বদমাইশ আর বেয়াদব লোক হলে বউয়ের মাইরের ভয়ে সোজাসুজি বাবার রুমে ঘাপটি মারে! আজ রাতে বেঁচে গেল লোকটা, কিন্তু কাল সকালে একে কীভাবে সোজা করতে হয় তা অরির খুব ভালো করেই জানা আছে। আজকের রাতটার জন্য কোনোমতে নিজের রাগের ওপর ব্রেক কষল সে।

ওদিকে অরি আর জেবা রুম থেকে বের হতেই সারিম দরজার ফাঁক দিয়ে সাবধানে উঁকি দিল। অরি সত্যি সত্যি চলে গেছে নিশ্চিত হয়ে সে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল এবং ‘ঠাস’ করে দরজার সিটকিনিটা তুলে দিল।
তারপর শিস বাজাতে বাজাতে ধীরপায়ে বিছানার দিকে অগ্রসর হলো।
বিছানায় বসে থাকা আরিশান মৃধা ততক্ষণে চরম বিরক্তিতে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছেন। এই বেয়াদব ছেলেটা এখন ওনার শান্তির জীবনে একদম পাক্কা ভিলেন হয়ে এন্ট্রি নিচ্ছে! ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখে ওনার মাথার রগ দগদগ করছে।সারিম অবশ্য বাবার সেই চটে যাওয়া গম্ভীর মুখটাকে এক পয়সারও পাত্তা দিল না। সোজা গিয়ে ধপ করে বেডের ওপর লাফিয়ে পড়ল। আর পর মুহূর্তেই দুহাতে আরিশান মৃধাকে একদম শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
ছেলের এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত কান্ডে আরিশান মৃধা এবার সত্যি সত্যি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। তিনি সারিমকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করতে করতে বেশ কড়া স্বরে বললেন,

_”কী হচ্ছেটা কী সারিম? ড্রামা বন্ধ করো! আমি তোমার বউ নই যে এভাবে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকবে। যাও গিয়ে নিজের বউকে নিয়ে এসব করো! আমাকে ছাড়ো বলছি!”
সারিম একটুও তোয়াক্কা করল না, বরং ওনাকে আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে বলল,
_”আহা ড্যাডি! অত ছটফট করছ কেন বলতো?একটু শান্তিতে থাকো বাবা ছেলেই তো! আজ আমার জায়গায় যদি জেবা তোমার পাশে থাকত, তবে কি তাকেও এভাবে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারতে?”
আরিশান মৃধা মুখে খুব বলতে ইচ্ছে করলো।তুমি আর জেবা এক না। তবে সেটা মুখে না এসে মনেই রয়ে গেলো। এই জাউরা ছেলের সামনে ওনাকে হিসেব কষে কথা বলতে হয়। নয়তো দেখা যাবে ভুল করে ভুল কিছু মুখ থেকে বেরিয়ে গেলে, এই ছেলে সেটা নিয়ে ওনার পিছু লাগবে। সেজন্য আর কথা বাড়ালো না চুপ থাকাকে শ্রেয় মনে করলো।সারিম সেভাবে কিছুক্ষন থাকার পর বাবাকে আর জ্বালালো না,ছেড়ে দিলো। এরপর পকেট থেকে নিজের ফোন বের করে তা ক্রোল করতে লাগলো। আরিশান মৃধা যেন হাফ ছেড়ে বাচেন এই ছেলের থেকে।

অফিসার প্রদীপের মাধ্যমে লোকাল থানা থেকে একটা খবর এলো। পদ্মা নদীর পাড় থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় একটা লাশের ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে, যা নিয়ে মধ্যরাতেই তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে পুরো শহরে।সাংবাদিক রিপোর্টারগুলো ইতিমধ্যে ভিড় করেছে ফেরি ঘাটের দিকে। চারপাশে কোলাহলরত অবস্থা।কেউ ভয়ে সেই লাশের ব্যাগ দেখতে যাচ্ছে না।সিআইডি টিমকে খবর দেওয়া হয়েছে তারা দ্রুত পৌছাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে আরিশান মৃধা নিজের রুমে ল্যাপটপে কিছু জরুরি কাজ করছিলেন। ঠিক তখনই ওনার ফোনে কমান্ডেন্ট ইরফাদের কল ভেসে উঠল। তিনি দেয়াল ঘড়ির দিকে একপলক তাকালেন-রাত তখন ঠিক বারোটা বাজছে। এত রাতে ইরফাদন কেন কল করল? নিশ্চয়ই কোনো জরুরি খবর হবে!
ওদিকে পাশে সারিম তখনও আরামে ফোন চালিয়ে যাচ্ছে। তার কাছে ফোন চালানো মানেই হলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘ক্যান্ডি ক্র্যাশ’ গেম খেলা; দিনদুনিয়ার কোনো খবর রাখার তো প্রশ্নই আসে না, সে যেন সবকিছু বহু আগেই ভুলে বসে আছে!যে সে কে? কি তার পরিচয়!
আরিশান মৃধা কলটা রিসিভ করে কানে তুললেন। অপর পাশ থেকে ঠিক কী বলা হলো তা শোনা গেল না, তবে খবরটা শুনে ওনার মুখের ভাব মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি সংক্ষেপে,

_”আমি আসছি” বলে ফোনটা কেটে দিলেন।
তারপর পাশ ঘুরে সারিমের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
_”সারিম, ঝটপট রেডি হয়ে নাও। এক্ষুনি আমাদের ফেরি ঘাটে যেতে হবে।”
সারিম বাবার কথা ঠিক বুঝতে পারল না। গেম থেকে চোখ না সরিয়েই হালকা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
_”এত রাতে ফেরি ঘাটে তোমার আবার কী কাজ? নাকি মাঝরাতে নৌকায় বসে গায়ে হাওয়া লাগানোর প্ল্যান করছ?”
আরিশান মৃধা চরম বিরক্ত হয়ে কড়া গলায় বললেন,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪১

_”এটা কোনো ফাজলামো বা মজা করার বিষয় নয়, সারিম! একটা মার্ডার কেস।”
বাবার মুখে ‘মার্ডার কেস’ শব্দটা শুনতেই সারিম এবার ঝটপট শোয়া থেকে উঠে সোজা হয়ে বসল। ফোনের স্ক্রিনটা অফ করে দিয়ে তার চেনা চপল মুখের অবয়বে মুহূর্তে ভেসে উঠল এক গভীর সিরিয়াস ভাব।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here