ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪১
মেহজাবিন নাদিয়া
সারিম চিবুকে হাত দিয়ে বেশ আয়েশ করে সোফায় হেলান দিল। আরিশান মৃধা তখনো ছেলের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ওনার চোখের গম্ভীর আর তীক্ষ্ণ চাউনি দেখে সারিম পপকর্নের বাটিটা একপাশে সরিয়ে রাখল। তারপর ভ্রু কুঁচকে বাবার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
_”কী হলো? তুমি আমার দিকে এভাবে হা করে কেন তাকাচ্ছো? ফেস ওয়াশের অ্যাড দেখছো নাকি?”
আরিশান মৃধা ছেলের এমন রসিকতায় কিছু বললেন না। ওনার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু, মলিন হাসি ফুটে উঠল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত নরম গলায় বললেন,
_”তুমি খুব চেঞ্জ হয়ে গিয়েছো সারিম। আগের সারিম আর এখনের সারিমে আমি আকাশ-পাতাল তফাৎ খুঁজে পাই। মাঝেমধ্যে আমার নিজেরই বিশ্বাস হয় না যে তুমি আমার সেই গম্ভীর,বুঝদার ছেলেটা।”
সারিম আরিশান মৃধার কথাটা শুনেও একটুও সিরিয়াস হলো না। ওনার আবেগঘন কথাগুলোকে যেন ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল। টিভির স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই সে বাঁকা হেসে বলল,
_”সো ওয়াট? সবসময় একই রকম থাকতে হবে এমন কোনো কথা আছে নাকি? আমি তোমার মতো একদম বোরিং পারসন নই, বুঝলে? লাইফে একটু টুইস্ট থাকা দরকার। মনে যা চাইবে, সবসময় সেভাবে চলাকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত। নয়তো অকালে তোমার মতো বউ ভেগে যাওয়ার সম্ভাবনা নাইনটি নাইন পারসেন্ট আছে!”
ছেলের মুখে এমন খোঁচা মারা কথা শুনে আরিশান মৃধার মুখটা মুহূর্তের জন্য কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেল। ভেতরের একটা পুরনো ক্ষত যেন নতুন করে চনচনিয়ে উঠল। তিনি নিজের ভেতরের কষ্টটা চেপে মুখটা একটু কেমন করে হাসলেন। তারপর ধীরস্থিরভাবে বললেন,
_”আমি কখনো তোমার মতো ভাগ্য নিয়ে আসিনি, সারিম। সবার সবকিছু চাইলেই করাটা শোভা পায় না। জীবনের কিছু ক্ষেত্রে নিজের মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে, চারপাশের সবকিছুর সাথে ব্যালান্স রেখে চলা উচিত। মন তো সবসময় এমন কিছুতেই আটকে যায়, যেটা সহজে পাওয়া দুঃসাধ্য। আর তখনই আমরা নিয়তির কাছে হেরে গিয়ে নিজেদের বদলাতে বাধ্য হই।”
সারিম এবার টিভির রিমোট দিয়ে সাউন্ডটা একটু কমিয়ে দিল। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ওনার ভেতরের একাকিত্ব আর আফসোসটা খুব স্পষ্ট দেখতে পেল সারিম। তবে নিজের স্বভাবসুলভ চপলতা ঢাকতে আবার একটা পপকর্ন মুখে ফেলে বলল,
_”ব্যালান্স করতে করতেই তো নিজের লাইফটাকে একটা জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেললে। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে যারা চলে, তারা আসলে বাঁচেই না, শুধু টিকে থাকে। আমি টিকে থাকতে আসিনি, আমি রাজত্ব করতে এসেছি।”
আরিশান মৃধা ছেলের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর শ্বাস নিলেন।আর কিছুই বললেন না।সারিম বাবার নিশ্চুপতা ঠিকি লক্ষ করেছে। আরিশান মৃধার মুখের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে,লোকটা নিজের জীবন নিয়ে লড়তে লড়তে ক্লান্ত এখন। সারিম কিছু একটা ভাবলো ওনার দিকে তাকিয়ে।
এদিকে জেবা আর অরি দুজনে একসাথে খাটের ওপরে বসে আছে। চারপাশটা একদম নিঝুম। একটু আগে আনতারা মৃধার সেই কড়া ধমক খেয়ে দুজনেই ঝগড়া থামিয়ে নিশ্চুপ হয়ে রয়েছে। আনতারা মৃধা অনেক আগেই রাগ দেখিয়ে নিজের রুমে চলে গেছেন।জেবা আড়চোখে একবার অরির দিকে তাকাল। কিন্তু অরি ওর দিকে একবারও তাকাচ্ছে না, যেন ও ঘরেই নেই। অরির এই অবহেলা দেখে মনে মনে বেশ কান্না পেল জেবার। কিছুক্ষণ আগেই না হয় রাগের মাথায় অরির সাথে যাচ্ছেতাই ঝগড়া বাঁধিয়েছিল, কিন্তু এখন আবার নিজেই অরিকে ছাড়া থাকতে পারছে না! নারীদের মন আসলেই বিচিত্র-এক মুহূর্তেই হয়তো আকাশ-পাতাল এক করে ঝগড়া করবে, আবার পরক্ষণেই কথা না বলে থাকতে পারবে না।
জেবা সব লজ্জা আর দ্বিধা ভুলে নিজ থেকেই এগিয়ে গেল অরির দিকে। আলতো করে ওর কাঁধে হাত রাখল। অরি সব দেখল, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। আবার ঝাড়া মেরে হাতটা সরিয়েও দিল না। অরির এই নীরবতা দেখে জেবা কিছুটা অপরাধী কণ্ঠে বলে উঠল,
_”দোস্ত, সরি! মাফ করে দে আমায়। আর কোনোদিন তোর সাথে ঝগড়া লাগবো না। আমি না তোর বাদামনি বেষ্টি লাগি? আমার ওপর প্লিজ এভাবে রাগ করে থাকিস না, জানু!”
অরি সব শুনেও না শোনার ভান করে পাথরের মতো বসে রইল। এতে জেবা আরও বেশি ব্যথিত হলো। ওর চোখের কোণে জল চলে এলো। কোনোমতে কান্না চেপে ধরা গলায় বলল,
_”কথা বলবি না আমার সাথে? এত রাগ আমার ওপর? ঝগড়াতো আমরা দুজনেই সমান তালে করেছি। চল না, সব ভুলে যাই! বন্ধুদের মধ্যে তো কতই ঝগড়া হয়।”
জেবা এবার অরির কাঁধ ধরে একটু ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আকুতি করতে লাগল।অরি এবার আর পারল না। জেবার হাতটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে মুখ গোমড়া করে বলল,
_”আমার কোনো ফ্রেন্ড নেই।”
জেবা অবাক হয়ে বলল,
_”তাহলে আমি কী হই তোর?”
অরি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলল,
_”শাশুড়ি!”
জেবা বুঝল, মেয়েটার অভিমান এবার বেশ কড়া। এত সহজে একে গলানো সম্ভব নয়। তাই সে ঝটপট ইমোশনাল ড্রামা শুরু করে দিল। মুখটা কান্নোন্মুখ করে বলল,
_”সামান্য একটা ঝগড়ায় তুই আমাদের এত বছরের ফ্রেন্ডশিপটা এভাবে নষ্ট করে দিবি? আমি তো ভেবেছিলাম সত্যিকারের বন্ধুদের মধ্যে হাজারো ঝড় আসলেও তারা কখনো আলাদা হয় না। কিন্তু এখন যা বুঝলাম, আমরা আসলে কখনো তেমন বন্ধুই ছিলাম না। সব নাটক ছিল, সব নাটক!”
অরির জেবার এই নাটক ধরতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হলো না। সে খুব ভালো করেই জানে, এই মেয়ে ওকে মানানোর জন্য এখন হাজারটা আবেগের ফাঁদ সাজাবে। অরি ইচ্ছে করেই জেবার সাথে এমন ভাব ধরেছিল। এই মেয়ের ওপর ওর কখনো সত্যি সত্যি রাগ আসেও না, তবুও একটু ঢং করছিল। মনে মনে ভাবল, আজকে একে একটু শিক্ষা দিতে হবে, নয়তো নেক্সট টাইম ঝগড়া করতে দুবার ভাববে না।কিন্তু অরিকে এতক্ষণ ধরেও গলতে না দেখে এবার জেবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে এবার আর নাটক নয়, সত্যিই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওকে হঠাৎ এভাবে কাঁদতে দেখে অরি চমকে উঠল এবং চটজলদি ওর দিকে ফিরে বসল। এখন অরির নিজের মুখেই খারাপ লাগা ফুটে উঠল। ভাবল, একটু বেশিই নাটক করে ফেলেছে হয়তো মেয়েটার সাথে। এতবার বলার পরেও জেবাকে এভাবে ফিরিয়ে দেওয়াটা ঠিক হয়নি।
অরি পরম আদুরে জেবার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
_”একদম কাঁদবি না, বাদামনি! আমি তো জাস্ট মজা করছিলাম। তোর ওপর আবার রাগ করে থাকতে পারি নাকি আমি?”
জেবা আস্তে আস্তে দুহাতে চোখের জল মুছে অরির দিকে তাকাল। অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই জেবা ওর পিঠে ধাম করে একটা কিল বসাল। অরি ব্যথায়.
_”আউচ” শব্দ করে পিঠ চেপে ধরল। তবে অরিকে ব্যথায় কুঁকড়ে যেতে দেখে যেন জেবার মনে শান্তি হলো। সে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল,
_”এত ঢং কিসের তোর? আমার সাথে মজা করিস! ভালোবাসি বলে একদম ঘাড়ে চড়ে বসছিস!”
অরি জেবার দিকে কৃত্রিম রাগ নিয়ে তাকিয়ে বলল,
_”ডাফার একটা! মারলি আমাকে? যা করেছি একদম বেশ করেছি। তুই আমার সাথে ওভাবে ঝগড়া বাঁধালি কেন শুনি?”
জেবা পাল্টা প্রশ্ন করল,
_”তুই আমাকে মিথ্যা কেন বললি?”
অরি ভ্রু কুঁচকে বলল,
_”কী মিথ্যা?”
জেবা অভিমানী গলায় বলল,
_”ওই যে তোর রেজাল্ট নিয়ে। প্রথমে সত্যিটা বলে দিলে কি আমি এত মাইন্ড করতাম? এখন তোর এই রেজাল্টের জন্য তোর সো-কল্ড বাপ আমাকে কত কথা শুনাবে!”
অরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”তোকে জানালেই বা তুই কী করতে পারতি? সেই তো বাবা তোকে বকা দিতই। তাছাড়া, তোকে আমার রেজাল্টের ব্যাপারে বলল কে?”
জেবা শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল,
_”সারিম ভাইয়া।”
অরি সারিমের নাম শুনতেই মুহূর্তে চটে গেল। লোকটার এত বড় সাহস! এত পা ধরে রিকোয়েস্ট করার পর একটু রেজাল্ট বদলালো,কিন্তু সেটা পেটে চেপে রাখতে পারলো না? উল্টো এখানে এসে জেবার সাথে ওর ঝগড়া বাঁধিয়ে দিলেন! অরি আজ ভীষণ ক্ষেপে গেল সারিমের ওপর। মনে মনে ভাবল, লোকটাকে আজ একবার হাতের কাছে পেলেই, তারপর ওনাকে মজা বুঝাবে!
অরির এই রাগী ভাবনার মাঝেই ওর ফোনটা “টুং” করে শব্দ করে উঠল। সে পাশ থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল-আরাফের মেসেজ। আরাফ ওকে কোচিংয়ে না যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করেছে। কিন্তু অরির এই মুহূর্তে কোনো কিছু ভালো লাগছিল না, তাই সে কোনো উত্তর না দিয়ে আরাফের মেসেজটা উপেক্ষা করল।
জেবা অরির মুখের ভাব দেখে জিজ্ঞেস করল,
_”কী হয়েছে। কার মেসেজ ছিলো ওটা?”
অরি উদাসীন গলায় বলল,
_”আরাফ মেসেজ দিয়েছে। জিজ্ঞেস করছে কোচিংয়ে যাচ্ছি না কেন।”
_”ওহ তা তুই কিছু বললি না কেন ওকে?”
_”ভালো লাগছেনা এখন আমার!”
জেবা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে অরির দিকে তাকাল। তারপর একটু আমতা আমতা করে বলল,
_”একটা কথা বলব, অরি?”
_”হ্যাঁ, বল।”
জেবা বেশ কৌতূহল আর সংশয় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_”তুই তো পড়াশোনা নিয়ে বেশ ভালোই সিরিয়াস ছিলি। কখনো ভাবিনি তুই শেষমেশ এমন একটা পথ বেছে নিবি। আচ্ছা অরি, তোর জন্মদাতা বাবা তো সবসময় চাইতেন তুই বড় হয়ে একজন নামকরা ডাক্তার হস, চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের সেবা করিস। তাহলে হুট করে সব এমন হয়ে গেল কেন?”
জেবা-র মুখে নিজের বাবার কথা শুনতেই অরি খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। ঘরের ভেতরের বাতাসটা যেন ভারী হয়ে উঠল। এরপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
_”পৃথিবীতে যদি আমি কাউকে খুব বাজেভাবে ঠকিয়ে থাকি, তাহলে সেই দুটি জিনিস হলো-এক, আমার মৃত বাবা; আর দুই, আমি নিজে। আমি নিজেকেই সবচেয়ে বড় ঠকিয়েছি, জেবা। আমার বাবা সবসময় চাইতেন আমি একজন বড় ডাক্তার হই। আমিও ছোটবেলা থেকে সেই স্বপ্নটাকেই নিজের বুকে লালন করে বড় হচ্ছিলাম। চলতি পথে কত হোঁচট খেলাম, তবুও কখনো হাল ছাড়িনি। কিন্তু একসময় যখন আমি নিজের মুখোমুখি দাঁড়ালাম, তখন নিজের ভেতরের আসল সত্যটা দেখতে পেলাম। ভাবলাম, আমি কি আসলেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি?”
অরি একটু থামল, তারপর আবার বলতে শুরু করল,
_”কেন জানি, আরিশান বাবার কাছে আসার পর আমি নিজের ভেতরে অন্য এক রকমের জীবন উপলব্ধি করতে পারি। দশজনের সাথে মেশার পর একসময় বুঝতে পারলাম, আমি আসলে এই হিউম্যান ডাক্তারি প্রফেশনের জন্য তৈরিই নই। কারণ, এতকাল আমি শুধু আমার বাবার স্বপ্ন পূরণের একটা অদম্য জিদ নিজের ভেতরে পুষে রাখছিলাম, এটা আমার নিজের ইচ্ছে ছিল না। অথচ ছোটবেলা থেকেই আমি অ্যানিমেল খুব ভালোবাসতাম। আমার আসল ইচ্ছেটা ছিল একটু ভিন্ন। এই বাড়িতে আসার পর বাবা প্রথম আমাকে একটা পেট শপে ঘুরতে নিয়ে যান। সেখানে অবলা প্রাণীদের সাথে সময় কাটানোর পর কেন যেন আমার মনে হলো-এদের চিকিৎসা করাটাও তো মন্দ না! তাছাড়া, কোনো পেশাকেই যে ছোট করে দেখা উচিত নয়, তা আমার নিজের বাবাই আমাকে শিখিয়েছিলেন।”
অরি একটা মলিন হেসে বলল,
_”বাবার সাথে এত হাই-প্রোফাইল লাইফস্টাইলে থাকার পর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা আমার কাছে কেমন যেন বেঠিক ঠেকল। ভাবলাম, আমি তো জীবনে সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এমনিতেই পাচ্ছি, তাহলে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে এত লড়াই কেন করব? কিন্তু পরক্ষণেই যখন সারিমের কথা মনে পড়ত, তখন একটু অন্যভাবে ভাবতাম। এই ভাবনাটাই যেন আমাকে দিনরাত পড়তে বসাত। কিন্তু বিশ্বাস কর জেবা, পড়তে বসেও আমার মনটা শুধু ওই অ্যানিমেলদের নিয়েই পড়ে থাকত। বইয়ের ওই মোটা মোটা হিউম্যান পাতাগুলো আমাকে এক অদ্ভুত অস্বস্তি দিত।মাথায় ভিশন চাপ অনুভূত হতো।”
জেবার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অরি খুব বুঝদার মানুষের মতো বলল,
_”জানিস জেবা, একটা কথা কী? তোর মন যা চাইবে না, তা তুই কখনো জোর করে করতে যাবি না। নয়তো দেখবি, একসময় সেই জিনিসটাই তোর জীবনের সবচেয়ে বড় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া, আমার জীবনে এখন সবই আছে। আগে সারিমকে নিয়ে মনের ভেতর যেই ভয় বা অনিশ্চয়তাটুকু ছিল, উনি নিজেই সেটা কাটিয়ে দিয়েছেন। আমি এখন আর কোনো বড় ইঁদুর দৌড়ে নামতে চাই না। আমি ওনার সাথে সারাজীবন থাকতে চাই, আমাদের ছোট্ট একটা খুনসুটিময় সংসার নিয়ে।”
জেবা মন্ত্রমুগ্ধের মতো অরির কথাগুলো শুনতে লাগল। অরির প্রতিটা শব্দ যেন ওর মনের কোথাও গিয়ে আঘাত করল। কিন্তু কেন জানি, অরির এই সুন্দর আর গোছানো ভাগ্যটা দেখে আজ জেবার নিজের ভেতরে এক তীব্র আফসোস জন্ম নিল।
জেবা মনে মনে ভাবল, ‘ইশ! যদি আরিশান মৃধাও এভাবে তাকে ভালোবাসতেন, তাকে নিজের করে আগলে ভাবতো, তাহলে হয়তো জেবার জীবনটাও আজ অরির মতো এমন পূর্ণতায় ভরে উঠত। আজ আর নিজেকে এত অপূর্ণ আর একাকী বলে মনে হতো না!’
জেবা অরিকে আর কিছু না বলে, এক বুক ভারী হতাশা নিয়ে খাট থেকে নেমে এলো। অরি তখনো নিজের ভাবনায় ডুবে আছে। জেবা ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে দরজাটা টেনে দিল। তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে সে দোতলার করিডোর দিয়ে নিজের রুমের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই গেস্ট রুমের কাছাকাছি এসে আচমকা ওর পা দুটো যেন মাটির সাথে লক হয়ে গেল।
সেখানে আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরের দৃশ্যটা দেখে জেবার চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে চড়কগাছে উঠল। ভেতরের আলো-আঁধারিতে দেখা যাচ্ছে-আরিশান মৃধা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে আনতারা মৃধার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন।বিষয়টা হলো আনতারা মৃধার চোখে কিছু একটা ঢুকেছে, আর আরিশান মৃধা পরম যত্নে ওনার চোখের ভেতর ফুঁ দিয়ে তা বের করার চেষ্টা করছেন। ওনার এক হাত আনতারা মৃধার বাহু খুব শক্ত করে চেপে ধরে আছে। ওদিকে আনতারা মৃধাও যেন সুযোগ বুঝে আরিশান মৃধাকে দুহাতে খুব শক্ত করে গলা জড়িয়ে ধরে ওনার বুকের সাথে মিশে আছেন।
দূর থেকে আধখোলা দরজার ওই সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে জেবার কাছে পুরো বিষয়টাকে অন্যরকম ঠেকল। ওনারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছেন-ভুলবশত এটাই ধরে নিল জেবা। সে একদৃষ্টে স্তব্ধ হয়ে সেই দিকে চেয়ে রইল। বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে ফালাফালা করে দিচ্ছে। চোখ ফেটে তীব্র কান্না আসার উপক্রম হলেও মেয়েটা দাঁতে দাঁত চেপে নিজের কান্নাটা ভেতরেই আটকে রাখল। ওর হাত-পাগুলো অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে শুরু করল, যেন শরীরের সমস্ত রক্ত এক নিমেষে হিম হয়ে গেছে। কন্ঠনালীর কাছে এসে এক দলা কান্না আটকে গেল, যার কারণে সে একটা দীর্ঘশ্বাস পর্যন্ত ফেলতে পারছিল না।শখের পুরুষকে বোধয় অন্য নারীর সঙ্গে দেখার বেদনা এটাকেই বলে, হোক না সেও তার বউ তবুও জেবা এটা মানতে পারলো না।ভেবেই নিলো আরিশান মৃধা তাকে নয় আনতারা মৃধাকেই এখনো ভালোবাসে, জেবাতো ওনার কাছে একটা দায়িত্ববোধ মাএ।
এই পৈশাচিক মানসিক যন্ত্রণা আর নিজের চোখে দেখার মতো ক্ষমতা জেবার আর অবশিষ্ট ছিল না। সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। তীব্র কষ্ট আর বুকভাঙ্গা অভিমান নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করল।
আজ আর জেবা আরিশান মৃধার রুমে গেল না। নিজের সমস্ত আত্মসম্মান ধুলোয় মিশে যাওয়ার পর ওই রুমে যাওয়ার আর কোনো অধিকার তার নেই। সে ডাইরেক্ট সারিমের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল।
ভিতরে সারিম অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে ফোনে কোনো একটা জরুরি কাজ করছিল। জেবা খুব কষ্টে নিজের কাঁপতে থাকা হাতটা বাড়িয়ে দরজায় হালকা টোকা দিল।
_”আসবো ভাইয়া।”
সারিম চোখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল জেবা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মেয়েটার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা কেমন যেন টালমাটাল, যেন যেকোনো সময় মেঝেতে লুটিয়ে পড়বে। সারিম হাতের ফোনটা পাশে রেখে কিছুটা ব্যস্ত হয়ে জেবাকে বলল,
_”ভিতরে আসো।”
জেবা কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল। সারিম জেবাকে সোফার দিকে ইশারা করে বলল,
_”ঐখানে বসো।”
জেবা ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। সারিম এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পা থেকে মাথা অব্দি মেয়েটাকে খুব ভালো করে পরখ করে নিল। জেবাকে ভীষণ রকমের অস্বাভাবিক আর বিপর্যস্ত ঠেকল তার কাছে। মুখটা একদম ফ্যাকাসে, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সারিম আর কথা না বাড়িয়ে পাশের টেবিল থেকে জগের পানি গ্লাসে ঢেলে জেবার দিকে এগিয়ে দিল।জেবা ওর শুকনো, বিবর্ণ হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা ধরল এবং প্রায় এক নিঃশ্বাসে পুরো পানিটুকু পান করে নিল। পানি খাওয়ার সময় গ্লাসের গায়ে লেগে থাকা ওর হাত দুটো অনবরত কাঁপছিল, যা সারিমের চোখ এড়ালো না।
জেবা পানি শেষ করতেই সারিম ওর হাত থেকে খালি গ্লাসটা নিয়ে টেবিলে রাখল। তারপর জেবার ঠিক মুখোমুখি থাকা সিঙ্গেল সোফাটায় এসে বসল। অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
_”রিল্যাক্স। একটু শান্ত হও। লম্বা শ্বাস নাও।”
জেবা কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করে নিল। বুকের ভেতর উথাল-পাথাল করা ঝড়টাকে শান্ত করার জন্য জোরে জোরে দুটো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এরপর সে চোখ মেলল, এখন আগের চেয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু গলার কাছের সেই দলা পাকানো কষ্টটা এখনো রয়ে গেছে। জেবা আর কোনো ভূমিকা না করে, একদম বুজে আসা ভাঙা গলায় সারিমকে বলে উঠল,
_”আই ওয়ান্ট ডিভোর্স। আমি বাবার কাছে ফিরে যেতে চাই।”
জেবার এই আকস্মিক অভাবনীয় কথায় সারিম মনে মনে বেশ বিস্ময় বোধ করল। যে মেয়ে আরিশান মৃধাকে পাওয়ার জন্য পুরো দুনিয়ার সাথে লড়তে প্রস্তুত ছিল, সে আজ নিজে থেকে ডিভোর্স চাচ্ছে! তবে সারিম নিজের ভেতরের বিস্ময়টা বাইরে প্রকাশ পেতে দিল না। নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
_”বাবা কি কিছু করেছে তোমাকে? কোনো খারাপ ব্যবহার?”
জেবা বহুকষ্টে নিজের ভেতরের কান্নার বেগটা চাপল। চোখের পলক না ফেলে একদম ছোট করে উত্তর দিল,
_”না।”
সারিম ভ্রু কুঁচকে বলল,
_”তাহলে হঠাৎ করে এই ডিভোর্স চাওয়ার কারণটা কী, আমি কি তা জানতে পারি?”
জেবা এবার একদম নির্বিকার ও শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
_”আমার পছন্দের বদল এসেছে।”
সারিম এবার সত্যিই অবাক হলো। সে কখনো ভাবেনি এত বড় একটা সত্যি বা এমন একটা হালকা কথা জেবার মুখ থেকে এভাবে শুনবে। জেবা সারিমের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
_”আমি আপনার বাবার সাথে আর থাকতে চাচ্ছি না। সত্যি বলতে, উনিও আমার সাথে থাকতে চাচ্ছেন না। তাছাড়া, আমার ওনার ওপর থেকে মন উঠে গেছে। আমি এখন অন্য একজনকে ভালোবাসি।”
সারিম এবার সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে গেল। কী বলবে, তা যেন ভেবেই পেল না। কিছুক্ষণ আগেও তো এই মেয়েটা অরির রুমে একদম ঠিকঠাক ছিল,আবার অরির সাথে সমান তালে ঝগড়া করছিল। তাহলে হঠাৎ করে মাঝখানের এই অল্প সময়ে কী এমন ঘটল যে সে ডাইরেক্ট সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার কথা তুলছে? সারিম একটু জেবাকে বাজিয়ে দেখার জন্য এবং ওর মনের আসল ভাবটা বোঝার জন্য জিজ্ঞেস করল,
_”ভেবেচিন্তে বলছ তো? মুখে ডিভোর্স বলাটা যত সহজ, বাস্তবে এই প্রসেসের মধ্য দিয়ে যাওয়া কিন্তু ততটাই জটিল। তাছাড়া একবার ডিভোর্স হয়ে গেলে কিন্তু সবকিছু চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। পরে আফসোস করবে না তো?”
জেবার মুখে কোনো অনুশোচনা বা দ্বিধার চিহ্ন দেখা গেল না। নিজেকে যতটা সম্ভব শক্ত ও পাথর বানিয়ে সে নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল,
_”না, আফসোসের কোনো প্রশ্নই আসে না। আমি নিজের সম্পূর্ণ ইচ্ছায় ওনাকে চিরতরে ছাড়তে প্রস্তুত।”
সারিম কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ করেই বলে উঠল,
_”তোমার কি আমার মা-কে নিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে?”
জেবা শুনল, তবে কোনো বাড়তি প্রতিক্রিয়া দেখাল না। একদম নির্লিপ্তভাবে বলল,
_”না, আপনার মাকে নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা নেই। আসলে আমি নিজেই এখন নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছি। ওনার আর আমার বয়সের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ, যা কোনোদিনই খাপ খাওয়ার মতো নয়। তাছাড়া আমার সামনে এখনো বাকি জীবনটা পড়ে আছে। ওনার মতো একজন মাঝবয়সী মানুষকে নিয়ে কয়েকটা দিনের সাময়িক মোহের বশে আমি আমার পুরো জীবনটা এভাবে নষ্ট করতে পারি না। সবদিক বিবেচনা করেই এটা আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।”
সারিম এবার পুরো ব্যাপারটা নিজের মতো করে বুঝল। জেবা যখন নিজে থেকেই আরিশান মৃধাকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছে, তখন তাকে আর আটকানোর বা মানানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করল না সে। মনে মনে ভাবল, হয়তো আরিশান মৃধার জীবনের এই অশান্তিটা দূর হওয়ার জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো সমাধান।সারিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”ঠিক আছে। তবে আইনিভাবে সব কাজ সম্পন্ন হয়ে ডিভোর্স কার্যকর হতে অন্তত তিন মাস সময় লাগতে পারে। এই তিনমাস তুমি চাইলে এই বাড়িতেই থাকতে পারো। কারণ তোমার বাবা বর্তমানে দেশে নেই, উনি ব্যবসার কাজে বাইরে গেছেন।”
জেবা মাথা নেড়ে বলল,
_”তার কোনো সমস্যা নেই। আমি এ বাড়িতে আর একটা মুহূর্তও থাকব না। আমি কাল সকালেই ফুফুর বাড়িতে চলে যাব।”
সারিম কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_”এত কিছু ঘটে যাওয়ার পর, তোমার কি মনে হয় তারা তোমাকে এত সহজে ক্ষমা করবে?”
জেবা এবার জানালার বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মলিন হেসে বলল,
_”ফুফু আমার মায়ের মতোই। ছোটবেলা থেকে ওনার বুকেই আমি মানুষ হয়েছি। আশা করি, আমার এই ভুলের কথা শুনে উনি আমাকে এইটুকু অন্তত ক্ষমা করে দেবেন। তাছাড়া মানুষ তো ভুল থেকেই শিক্ষা নিয়ে নতুন জীবন গড়ে তোলে। আমিও না হয় তাই করলাম।”
সারিম এবার সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে হঠাৎ করেই এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
_”যে ছেলেটার কথা বললে. সে কি সাদমান?”
জেবা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর কি যেন ভেবে শক্ত গলায় বলল,
_”হ্যাঁ।”
জেবার মুখের কঠোর অভিব্যক্তি দেখে সারিম আর কোনো কথা বাড়াল না। সে বুঝতে পারল, এই মেয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।জেবা সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।বলল,
_”আসি ভাইয়া। আশা করি বোন ভেবে কাজটা দ্রুত করার চেষ্টা করবেন।”
বলেই তারপর অত্যন্ত ধীর ও ক্লান্ত পায়ে সারিমের রুম ছেড়ে বাইরের বেরিয়ে গেল জেবা।জেবা ঘর থেকে বের হয়ে যেতেই সারিম সোফায় বসে নিজের দুহাতে মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল। তীব্র মানসিক স্ট্রেস আর ক্লান্তি যেন তাকে চারপাশ থেকে গ্রাস করছে। এত এত চিন্তা আর মাথায় নেওয়া যাচ্ছে না। সে এই পরিবারের ভাঙন রুখতে, চারপাশের পরিস্থিতি ঠিক করতে যা যা পদক্ষেপ নিচ্ছে-সবকিছু যেন ক্রমশ আরও বেশি ভঙ্গুর ও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো কিছুই যেন আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই।সারিম টেবিলের উপর থেকে ফোনটা তুলে নিলো। এরপর কারো নাম্বারে ডায়াল করলো। ওপাশ থেকে একটা গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসলো। সারিম লোকটা উদ্দেশ্যে বলল।
_”একটা ডিভোর্স ফাইল করতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব কাজটা যেন রেডি থাকে।”
ওপাশের লোকটা কি বলল তা শোনা গেলো না। সারিম লাইন কেটে দিলো। এরপর চুপচাপ সোফায় হেলান দিয়ে বসে,কপালে দুহাত ঠেকিয়ে চোখ দুটো বুজে নিলো।
রাতের স্নিগ্ধ বাতাস মেখে অরি তখন ব্যালকনিতে একাকী বসে ছিল। মনটা বেশ হালকা লাগছিল, তাই আপনমনেই গুনগুন করে একটা চেনা সুর গাচ্ছিলো সে। ঠিক তখনই পেছন থেকে একজোড়া চেনা হাত এসে আলতো করে ওর কাঁধের ওপর বসলো। অরির সেই স্পর্শটা চিনতে এক মুহূর্তও সময় লাগল না। কার হাত, তা ভালো করেই জানা আছে ওর। সে চট করে ঘুরে তাকিয়ে এক চিলতে মিষ্টি হাসি উপহার দিল। আরিশান মৃধা পরম স্নেহে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
অরি ওনাকে বসার জন্য পাশের খালি সোফাটা দেখিয়ে দিয়ে বলল,
_”বাবা, বসো।”
আরিশান মৃধা মেয়ের কথামতো সোফাটায় এসে বসলেন। অরি এবার সোফা ছেড়ে নিচে গিয়ে ওনার পায়ের কাছে মেঝেতে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ল। তারপর আবদারের সুরে বলে উঠল,
_”বাবা, একটু মাথায় বিলি কেটে দাও না!”
আরিশান মৃধা কোনো আপত্তি না করে মেয়ের মাথায় হাত রেখে ধীরলয়ে বিলি কেটে দিতে লাগলেন। এই কাজটা তিনি গত পাঁচ বছর যাবত নিয়মিত করে আসছেন।বাবার হাতের এই বিলি কাটার স্পর্শটা অরির ভীষণ ভালো লাগে, সব ক্লান্তি যেন এক নিমেষে দূর হয়ে যায়। তবে বিলি কাটতে কাটতেই আরিশান মৃধার মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি থমথমে গলায় বললেন,
_”তোমার নামে আজ যা শুনলাম অদ্রিজা, সেটা মোটেও আমার জন্য বিশ্বাস করা সহজ ছিল না।”
অরি মুহূর্তে বুঝল বাবা ঠিক কোন বিষয়ের দিকে ইশারা করছেন। অবশ্যই ওনার কানে অরির এই বানোয়াট রেজাল্টের খবরটা পৌঁছে গেছে। বাবার মুখে এই কথা শুনে অরি এবার ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল। অপরাধবোধে ওর মাথাটা নিজে থেকেই নিচু হয়ে এলো।
আরিশান মৃধা মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় প্রশ্ন করলেন,
_”আমি কি কখনো তোমার ওপর কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দিয়েছি, অদ্রিজা?”
অরি মাথা দুদিকে নেড়ে নিচু স্বরে বলল,
_”না, বাবা।”
আরিশান মৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
_”তাহলে এমন একটা কাজ কেন করলে? তোমার মনে কী চলছে, সেটা আমাকে একবার বললেই তো পারতে! আমি কি তোমাকে সাপোর্ট করতাম না? মানুষের স্বপ্ন যাই হোক না কেন, সেটা পূরণ করার জন্য একটা সৎ লক্ষ্য থাকা উচিত। কিন্তু তুমি প্রথম থেকেই পুরো বিষয়টাকে নিয়ে কেমন হেয়ালি করলে! এটা কি তুমি ঠিক করলে, বলো?”
অরি এবার অপরাধী মুখ করে আরিশান মৃধার দিকে তাকাল। চোখের রিডিং গ্লাসটা আঙুল দিয়ে একটু ঠিক করে নিয়ে সে দুহাত দিয়ে নিজের কান ধরল। তারপর মুখটা একদম বাচ্চার মতো ইনোসেন্ট বানিয়ে বলল,
_”সরি, বাবা! এবারের মতো ক্ষমা করা যায় না? আমি প্রমিজ করছি, লাইফে কখনো তোমার কাছে আর কিচ্ছু লুকাবো না।”
আরিশান মৃধা নিজের চিরচেনা গম্ভীর আড়ালের মাঝে লুকিয়ে থাকা ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু হাসি ফোটালেন। অরি বাবার মুখের সেই সূক্ষ্ম হাসির রেখা দেখেই বুঝে গেল-বাবার রাগ কিছুটা হলেও কমেছে। তবে আরিশান মৃধা নিজেকে সামলে নিয়ে আবার আগের মতো কঠোর রূপ ধারণ করে বললেন,
_”আমি তোমাকে নিজের মেয়ের থেকে কোনো অংশে একটুও কম ভাবিনি কখনো। কিন্তু তোমার এইভাবে অন্যের সাহায্যে বা নকল করে পাস করার ব্যাপারটা আমার মোটেও ভালো লাগেনি, অদ্রিজা। একবার ভেবে দেখেছ, তোমার মতো আরও কত শত স্টুডেন্ট আছে, যারা দিনরাত কষ্ট করে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় পাস করে? আর তুমি কোনো রকম পরিশ্রম ছাড়াই সেই ক্রেডিট নিজের নামে নিয়ে নিলে! এটা কিন্তু খুব বড় অন্যায়। নেক্সট টাইম যদি এমন কোনো ভুল করতে দেখি, তবে আমি সত্যিই ভুলে যাব যে তুমি আমার মেয়ে!”
অরি চটপট আবার মাথা দুদিকে নাড়াল। অর্থাৎ, সে ইশারায় পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল-এই ধরনের ভুল সে জীবনে দ্বিতীয়বার আর কখনোই করবে না।
এরপর আরিশান মৃধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। বাবার সামনে অরিও আর কোনো কথা না বলে শান্ত হয়ে বসে রইল। দুজনেই তাকিয়ে রইল বারান্দা থেকে ভেসে আসা খোলা আসমানের দিকে। রাতের আকাশটা আজ বেশ পরিষ্কার। আরিশান মৃধা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওনার চোখটা হঠাৎ আটকে গেল রূপালী মস্ত বড় চাঁদটার দিকে। আজ আকাশের তারা গুলো ওনাকে বিন্দু মাত্র আকৃষ্ট করতে পারল না। চাঁদের সেই স্নিগ্ধ আলোর মাঝে একদৃষ্টে তাকাতেই আরিশান মৃধার চোখের সামনে কেমন যেন আচমকা জেবার নিষ্পাপ মুখটা ভেসে উঠল। তিনি নিজের অবচেতন মনেই আনমনে ফিসফিস করে বলে উঠলেন,
_”লুনা…”
কথাটা খুব নিচু স্বরে হলেও অরির কান এড়ালো না। সে তড়িতঘড়ি করে বাবার দিকে চোখ ঘুরাল। বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
_”লুনা কে, বাবা?”
আরিশান মৃধা মেয়ের প্রশ্নে হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। চাঁদ দেখায় তিনি এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন যে ওনার নিজের অজান্তেই মুখ থেকে শব্দটা বেরিয়ে এসেছে, তা তিনি নিজেও টের পাননি। তবে নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে তিনি আমতা আমতা করে বললেন,
_”না, কিছু না। আসলে চাঁদের ল্যাটিন প্রতিশব্দ হলো ‘লুনা’। আমি জাস্ট ওই শব্দটাই মনে মনে প্র্যাকটিস করছিলাম।”
অরি বাবার এই অদ্ভুত জবাবে আর কোনো পাল্টা প্রশ্ন করল না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”ওহ!”
আরিশান মৃধা হাফ ছেড়ে বাচলেন। এরপর একটু চুপ থেকে হঠাৎ করে অরির দিকে তাকালেন। ওনার মনে জমে থাকা একটা কৌতূহল থেকে আচমকা প্রশ্ন করে বসলেন,
_”সারিম স্বামী হিসেবে কেমন, অদ্রিজা?”
বাবার এমন সোজাসুজি প্রশ্নে অরি একটু চমকে উঠল। পরক্ষণেই সারিমের সেই চেনা মুখ আর ওর পাগলামিগুলোর কথা মনে পড়তেই অরির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে গভীর ভালোবাসার হাসি ফুটে উঠল। সে খুব শান্ত আর নরম গলায় বলে উঠল,
_”একটু বেশিই কেয়ারিং!ওনার প্রায়োরিটি লিস্টে সবার আগে আমিই থাকি। মানুষটা একটু লাগামহীন, জেদি..তবে মনের দিক থেকে খুব ভালো।আমার সব কথা মান্য করে খুব, আমার যেকোনো আবদার পূরণ করতে সবসময় প্রস্তুত থাকে। চারপাশের পরিস্থিতি যতই জটিল হোক না কেন,সে তার আঁচ আমার গায়ে লাগতে দেয় না, সবসময় আমাকে আগলে রাখে। সমাজ কী ভাবল, না ভাবল-সেসব ওনি বিন্দুমাত্র কেয়ার করে না; তার কাছে শুধু আমার ভালো থাকাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। কখনো নিজের রাগগুলো আমার সামনে প্রকাশ করে না। আর ভুলেও যদি আমাকে একটু রাগ দেখিয়ে ফেলে, সাথে সাথে সরি বলে সব মিটিয়ে নেয়। আমার অভিমান ভাঙাতে ওনি সর্বদা প্রস্তুত থাকে, কখনো একটুও বিরক্ত হয় না। সবশেষে শুধু এটুকুই বলব-সে আমাকে বুক ভরে ভালোবাসে। তবে মুখে তা কখনো স্বীকার করে না, সবসময় ‘অভ্যাস’ বলে চালিয়ে দেয়!”
আরিশান মৃধা যেন অরির প্রতিটা কথা মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শুনতে লাগলেন। ওনার অহংকারী, একগুঁয়ে ছেলেটা যে একজন স্বামী হিসেবে এতটা পারফেক্ট হতে পেরেছে, সেটা ওনার কাছে যেমন প্রশংসনীয় ঠেকল, তেমনি বেশ অকল্পনীয়ও বটে। ওনার অরি যে সারিমের সংসারে খুব সুখে আছে, এটা বুঝতে পেরে ওনার পিতৃমন এক অপার্থিব শান্তিতে ভরে গেল। তবে নিজের স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্যের কারণে তিনি তা মুখে প্রকাশ করলেন না।মেয়ের সুখের কথা শুনতে শুনতে আরিশান মৃধার অবচেতন মনে হুট করে একটা অন্য প্রশ্ন মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি মনে মনে ভাবলেন-‘আচ্ছা, অরি যেভাবে সারিমের কাছ থেকে ভালোবাসা আর কেয়ার পায়, জেবাও কি ওনার থেকে ঠিক এইরকম কিছুই এক্সপেক্ট করে?’
ওনার নিজের ভেতরের বিবেক যেন ওনাকে আজ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল। উনি তো কোনোদিনই সেই মেয়েটার তেমনভাবে খেয়াল রাখেননি। উল্টো নিজের অতীতের জের ধরে সবসময় তাকে খুব কষ্ট দিয়েছে। এতে নিশ্চয়ই মেয়েটা মনে মনে খুব কষ্ট পায়! ওনার প্রতি জেবার মনে নিশ্চয়ই ভীষণ অভিমান জমে আছে। অথচ ওনিতো কোনোদিন সেই কষ্টটা বোঝার চেষ্টা করেননি, কিংবা ওর অভিমান ভাঙানোর সামান্যতম চেষ্টাও করেননি!
আরিশান মৃধা এই কয়দিনে একটা জিনিস খুব ভালোভাবেই বুঝেছেন-জেবা সত্যিই ওনাকে ভালোবাসে, এক নিঃস্বার্থ ও পবিত্র ভালোবাসা যাকে বলে। সেই মেয়েটার পবিত্র ভালোবাসাকে এখন আর তিনি সাময়িক ‘মোহ’ বলে ছোট করতে চান না। ওনার মনের এক কোণ থেকে কে যেন ফিসফিস করে বলে উঠল-এবার কি ওনার উচিত নয় সব অতীত ভুলে জেবার সাথে একটা সুন্দর, স্বাভাবিক সংসার গড়ে তোলা?
কিন্তু ঠিক পরক্ষণেই ওনার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। ওনার যে বড্ড ভয় করে! যদি জেবাও একসময় ওনাকে এভাবে একা ফেলে চলে যায়? ঠিক যেভাবে বহু বছর আগে আনতারা মৃধা ওনাকে মাঝনদীতে ফেলে চলে গিয়েছিলেন! আরিশান মৃধা আর ভাবতে পারলেন না। নিজের মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিজেই নিজেকে মনে মনে কড়া শাসনে বাঁধলেন-না, জেবা আর যাই হোক, আনতারার মতো মেয়ে মোটেও নয়। ও ওনাকে কখনো ছেড়ে যাবে না।
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪০
শহরের বুক চিরে ছুটে চলেছে অবিরামের প্রাইভেট কারটি। তার পিছু ধাওয়া করছে একটা কালো রঙের গাড়ি। অবিরাম বারবার ঘামছে আর অনবরতো আয়ুশের নাম্বারে ডায়াল করে যাচ্ছে। তবে আয়ুশ ফোন তোলছেনা কোনোভাবেই। তার পাশেই একটা কালো ক্যামেরা রাখা।যা সে খুব শক্ত করে হাত দিয়ে ধরে আছে।গাড়িটা বারবার এদিক ওদিক ছুটে চলছে অনবরত চাকাতে গুলিকরার ঘর্ষনে।
