ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪০
মেহজাবিন নাদিয়া
গাড়িটা মেইন রোড থেকে বেশ খানিকটা নিচের দিকে নেমে একটা নির্জন নদীর পাড়ে এসে সশব্দে থামল। জায়গাটা একদম নিঝুম, সুনসান। পাশেই বিশাল বড় একটা ময়লার স্তূপ পড়ে আছে, যেখান থেকে পচা দুর্গন্ধ ভেসে আসছে। চারপাশের পরিবেশটা এতটাই আড়ালে যে, বাইরে থেকে চেনার কোনো উপায় নেই এখানে কখনো কোনো মানুষ আসে কি না।গাড়ি থামতেই দেলোয়ার তাড়াহুড়ো নিয়ে নেমে পেছনের ডিকির দিকে ছুটে গেল। ওর পিছু পিছু গাড়ি থেকে নেমে এলো আনতারা মৃধা আর অনুপমা। দেলোয়ার ডিকির ভারী দরজাটা ওপরে তুলল, তখন ভেতরের দৃশ্যটা দেখে ওর চোখ-মুখ মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে গেল। সোলেমান শেখের নিথর, রক্তাক্ত দেহটা সেখানে পড়ে আছে।
পাশ থেকে আনতারা মৃধা আর অনুপমাও ডিকির ভেতর উঁকি দিল। তবে আনতারা মৃধা একদম চুপ থাকল,তার মুখে কোনো উদ্বেগের রেখা ফুটল না। একজন দক্ষ হার্ট সার্জন হিসেবে সে ভালো করেই জানত,সোলেমানকে যে জায়গায় আঘাত করা হয়েছিল,সেখান থেকে তার বেঁচে ফেরার কোনো সুযোগই ছিল না।এদিকে বাবার কালো হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে অনুপমার মনের ভেতর আনতারা মৃধার প্রতি একধরনের ক্ষোভ জমতে শুরু করল।
দেলোয়ার নিজের চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে থেকেই অস্থির গলায় প্রশ্ন করল,
_”লাশটা এখন কী করব? রোডের কাছাকাছি এলাকা, কেউ দেখে ফেলার আগে দ্রুত একটা উপায় বলো!”
পাশ থেকে আনতারা মৃধা অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,
_”এটাকে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দাও।”
অনুপমা চারপাশে তাকাতেই কাছাকাছি একটা পুরোনো ছালার বস্তা টাইপ কিছু দেখতে পেল। সে তড়িঘড়ি করে ওটা কুড়িয়ে এনে দেলোয়ারের দিকে বাড়িয়ে দিল। দেলোয়ার বস্তাটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
_”এইটুকু বস্তায় এর পুরো বডি ঢুকবে বলে মনে হচ্ছে না। এর একটা সাইজ করা দরকার আছে। অনুপমা, তুই একটু রাস্তার উঁচুতে গিয়ে তাকিয়ে দেখ কেউ এদিকে আসছে কি না।”
অনুপমা এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে মেইন রোডের কিছুটা উঁচুতে চলে গেল চারপাশে নজর রাখার জন্য। ওদিকে দেলোয়ার গাড়ির ভেতর থেকে একটা বড় রামদা বের করে আনল।কিছুক্ষণ পর… সব কাজ শেষ হয়ে গেলে, আনতারা মৃধা আর দেলোয়ার মিলে সেই ভারী বস্তাটা টেনে হিঁচড়ে নদীর পাড়ে নিয়ে গেল। তারপর দুজনে মিলে ওটা জোরে ছুড়ে দিল নদীর পানিতে। সোলেমান শেখের লাশের খণ্ডাংশ ভরা বস্তাটা নদীর তীব্র স্রোতে ভেসে চোখের আড়ালে চলে গেল।অনুপমা আবার পাহারা শেষ করে ওনাদের দিকে ফিরে এলো। এরপর তিনজন মিলে খুব দ্রুত আর সতর্কতার সাথে চারপাশের মাটিতে লেগে থাকা সমস্ত রক্তের চিহ্ন পানি দিয়ে ধুয়ে-মুছে একেবারে সাফ করে ফেলল। যেন একটু আগেও এখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না, কোনো পৈশাচিক অপরাধ ঘটেনি।
সব কাজ শেষ করে তারা তিনজন গাড়িটা ওখানেই রেখে কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার পথে মাটির ওপর একটি রক্তমাখা কালো বস্তু পড়ে থাকতে দেখা গেল, যা হয়তো তাড়াহুড়ো করার সময় অসাবধান তাবশত পড়ে গিয়েছিল। আনতারা মৃধা আর দেলোয়ার চারপাশটা ভালো করে দেখে নিয়ে সামনে থাকা একটা ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত ঘরের ভেতরে গিয়ে দাঁড়াল।প্রচুর ময়লা জমে আছে ঘরটাতে।ঘরের এক কোণে থাকা ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে দেলোয়ার একটা ভারী লোহার ম্যানহোল টেনে তুলল। আর তখনই মাটির নিচে নিচে চলে যাওয়া একটি গোপন সুড়ঙ্গের পথ উন্মোচিত হলো। কোনো কথা না বাড়িয়ে তিনজনই সেই অন্ধকারের ভেতরে নেমে গেল।
টানেলের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ-একটি অত্যাধুনিক, সুসজ্জিত বায়ো-মেডিক্যাল ল্যাবরেটরি। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই যে মাটির নিচে এমন একটি মডিউলার ওটি এবং হিউম্যান অর্গান প্রিজারভেশন সেন্টার থাকতে পারে। ল্যাবের একপাশে বিভিন্ন উচ্চ ক্ষমতার প্রিজারভেটিভ কেমিক্যাল, লাইফ-সেভিং মেডিসিন এবং অ্যাডভান্সড সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট থরে থরে সাজানো। তার পাশেই আরামদায়ক সোফা সেট এবং কিছুটা দূরে রয়েছে একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত সিক্রেট রুম।
দেলোয়ার অনুপমাকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে আনতারা মৃধাকে অনুসরণ করল। আনতারার হাতে একটা বিশেষ কাঠের বাক্স। সিক্রেট রুমে ঢুকে দেলোয়ার ভেতর থেকে দরজাটা লক করে দিল।রুমের ভেতরের তাপমাত্রা বেশ কম, অনেকটা কোল্ড স্টোরেজের মতো। চারপাশের তাকে রাখা স্বচ্ছ কাঁচের বক্সে মানব শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ‘হিউম্যান গ্রাফট’ অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে রাখা আছে। আনতারা মৃধার হাতের কাঠের বাক্সটির ভেতরে ছিল সদ্য বিচ্ছিন্ন করা সোলেমান শেখের দুটি হিউম্যান কিডনি।
আনতারা অত্যন্ত পেশাদার ভঙ্গিতে হাতে সার্জিক্যাল গ্লাভস এবং মুখে মাস্ক পরে নিল। দেলোয়ারও নিজেকে জীবাণুমুক্ত করে প্রটেকটিভ গিয়ার পরে নিলেও আনতারার খুব কাছাকাছি গেল না। মানব অঙ্গ প্রিজারভেশনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মাইক্রো-সার্জিক্যাল প্রসিডিউরের সময় সে সবসময়ই কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখে।আনতারা মৃধা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কিডনি দুটি বের করে একটি বিশেষ রাসায়নিক তরল পদার্থ ইনজেক্ট করল, যার নাম ‘অ্যাম্বার ফ্লুইড’।
অ্যাম্বার ফ্লুইডের
এটি একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও হাইপার-টক্সিক সিন্থেটিক বায়ো-কেমিক্যাল। এই তরলটির উদ্বায়ী গ্যাস বা ভেপার যদি কোনো জীবিত মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে তার সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমকে অকেজো করে দেয়। ফুসফুস থেকে রক্তে মেশার মাত্র এক সেকেন্ডের মধ্যে এটি শরীরের কোষগুলোকে গভীর কোমায় পাঠিয়ে দেয়, যার ফলে কার্ডিওরেসপিরেটরি অ্যারেস্ট হয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটে।তবে মানব অঙ্গ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই কেমিক্যালের কার্যকারিতা বিস্ময়কর। সাধারণত একটি আইসোলেটেড হিউম্যান কিডনি কোল্ড ইসকেমিক কন্ডিশনে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার বেশি সতেজ রাখা যায় না। কিন্তু এই অ্যাম্বার ফ্লুইডের সেলুলার মেটাবলিজম বা কোষীয় বিপাক ক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এটি অর্গানের কোষগুলোকে এক ধরনের কৃত্রিম ‘হাইপারনেশন’ বা গভীর ঘুমে পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে কোনো রকম কোষীয় ক্ষয় বা টিস্যু নেক্রোসিস ছাড়াই অঙ্গগুলোকে প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব! পরবর্তীতে যখন এর নির্দিষ্ট অ্যান্টিডোট বা কাউন্টার-সলিউশন পুশ করা হবে, তখন অঙ্গের কোষগুলো আবার সচল হয়ে উঠবে এবং গ্রাফটটি মানবদেহে প্রতিস্থাপনের জন্য সম্পূর্ণ প্রাণবন্ত হয়ে যাবে।
এই বৈপ্লবিক ও বিপজ্জনক বায়ো-কেমিক্যালটির উদ্ভাবক হলেন ‘লুকা’ নামক মোনাস্কোগ একজন অত্যন্ত জিনিয়াস বিতর্কিত বিজ্ঞানী। মানব কল্যাণে নিজের গবেষণা ব্যবহার করতে গিয়ে আইনি ও নৈতিক জটিলতার কারণে যখন বৈজ্ঞানিক সমাজ তাকে বর্জন করে, তখন লুকা নিজের মেধা নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়। বর্তমানে সে আন্তর্জাতিক ব্ল্যাক মার্কেটের অন্যতম শীর্ষ ‘হিউম্যান অর্গান ডিলার’। বহু বছর আগে অবৈধ অর্গান পাচারের সূত্রে আনতারা মৃধার সাথে তার পরিচয় হয় এবং লুকার কাছ থেকেই আনতারা এই অ্যাম্বার ফ্লুইডের ফর্মুলা ও সলিউশন সংগ্রহ করেন। তখন থেকেই লুকার সাথে ওনাদের কোটি কোটি টাকার এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যেখানে লুকা তাদের কাছ থেকে চড়া দামে এই সংরক্ষিত ফ্রেশ অর্গানগুলো কিনে নিত।
রাসায়নিক পুশ করার নিখুঁত প্রক্রিয়া শেষ করে আনতারা মৃধা কিডনি দুটিকে একটি স্টেরিলাইজড কাঁচের বক্সে রাখল এবং পাশের নির্দিষ্ট র্যাকে প্রিজার্ভ করে দিল।
কাজ শেষ করে তারা দুজনে ওই গোপন কক্ষের একদম শেষ প্রান্তে থাকা একটি কর্নারের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে একটি বিশাল বায়োমেট্রিক ও ইলেকট্রনিক সিকিউরিটি লক সংবলিত ইস্পাতের দরজা দেখা যাচ্ছে। এই দরজার ওপারেই রয়েছে তাদের আসল ভল্ট, যেখানে প্রায় তিন হাজার মানব অঙ্গ অবৈধভাবে প্রিজার্ভ করে রাখা আছে।
দরজার ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি হার্ট-শেপের এনক্রিপ্টেড প্যানেল, যার ওপরে কিছু ডিজিটাল কোড বা ওয়ান-ওয়ে পাসওয়ার্ড স্ক্রিপ্ট করা। একমাত্র সোলেমান শেখের কাছে থাকা সেই বিশেষ মেটাল লকেটটি এই প্যানেলে স্পর্শ করালেই কেবল বায়ো-লকটি আনলক হবে এবং ভেতরের মূল কোল্ড-ভল্টটি খুলবে।
দেলোয়ার সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে বেশ চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
_”লুকার সাথে আমাদের যে ডিল হয়েছিল, তার ডেডলাইন কিন্তু ঘনিয়ে আসছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি আমরা সাড়ে তিন হাজার অর্গানের চালান ডেলিভারি করতে না পারি, তবে কিন্তু আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত।”
আনতারা মৃধা কথাটি শুনে স্তব্ধ হয়ে রইল, কোনো উত্তর দিল না। তবে তার চোখের মণি আর কপালের সূক্ষ্ম ঘাম বলে দিচ্ছিল, ভেতরে ভেতরে সে নিজেও এবার কতটা আতঙ্কিত। লুকার নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতা সম্পর্কে সে খুব ভালো করেই জানে। ডিল অনুযায়ী পণ্য না পেলে লুকা ওনাদের কাউকেই জীবিত রাখবে না।
মনে পড়ে আগের কথা,এত বিশাল পরিমাণ মানব
অঙ্গ ল্যাবে দীর্ঘ সময় সেফ রাখার জন্য তারা লুকার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মূল্যের অ্যাম্বার ফ্লুইড অ্যাডভান্স নিয়েছিল। তাদের চুক্তিটি ছিল এমন-সাড়ে তিন হাজার অর্গানের মোট মূল্যের অর্ধেক টাকা লুকা ওনাদের ক্যাশ দেবে, আর বাকি অর্ধেক টাকা কেমিক্যালের দাম হিসেবে কেটে রাখা হবে। এই ডিলটি সম্পূর্ণ করার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল মাত্র দুই বছর।
কিন্তু ঠিক তখনই জাহরিমা পল্টি খায় আর তাকে না চাইতেও মারতে হয়,এরপর সেই লকেটের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে আনতারা মৃধার নিজের দীর্ঘদিন কোমায় চলে যাওয়ার কারণে পুরো অপারেশনটি থমকে যায়। লুকা দীর্ঘ সাড়ে চৌদ্দ বছর ধরে চরম ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সম্প্রতি যখন সে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারল যে আনতারা মৃধা কোমা থেকে ফিরে এসেছে, তখন সে আবার ওনাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। লুকা একপ্রকার বাধ্য করেই ডিলটি রি-অ্যাক্টিভেট করে এবং সাড়ে তিন হাজার অর্গানের চূড়ান্ত ডেলিভারির জন্য মাত্র ৬ মাসের আলটিমেটাম দেয়।
লকেট ছাড়া ওই দরজার ভেতরের অর্গানগুলো বের করা অসম্ভব, আর সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য মৃত্যুর ফাঁদ যেন ধীরে ধীরে তাদের তিনজনকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে।
অনুপমার জামায় গোপনে বসানো জিপিএস ট্র্যাকারের সিগন্যাল অনুসরণ করে আয়ুশ অবশেষে সেই পরিত্যক্ত গুদাম ফ্যাক্টরির সামনে এসে পৌঁছাল। তার সাথে রয়েছে অবিরাম এবং আয়ুশের পুরো সিআইডি টিম।সবাই গাড়ি থেকে নেমে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পজিশন নিল। ভেতরের দিকে এগোবার সময় হুট করেই ফ্যাক্টরির সামনের কাঁচা রাস্তায় গাড়ির টায়ারের গভীর ঘর্ষণের দাগ দেখে আয়ুশের নজর আটকে গেল। সে অবিরামকে ইশারা করে বলল,
_”মনে হচ্ছে খুব বেশি সময় হয়নি, এখান থেকে কোনো গাড়ি দ্রুত গতিতে বেরিয়ে গেছে। এই দেখো, টায়ারের তাজা দাগ। এটা সোজা মেইন রোডের দিকে নির্দেশ করছে।”
অবিরাম সেদিকে তাকিয়ে একটু হতাশ গলায় বলল,
_”তাহলে এখানে এসে এখন আর কী লাভ হলো? আমার তো মনে হচ্ছে অপরাধীরা সমস্ত তথ্য-প্রমাণ লোপাট করে এখান থেকে লাপাত্তা হয়ে গেছে।”
আয়ুশের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
_”অপরাধী যতই চালাক হোক না কেন,কোথাও না কোথাও কোনো একটা সূত্র সে নিশ্চয়ই রেখে যায়। চলো ভেতরে যাই।”
অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে গুদামটার ভেতরে দিনের আলো পৌঁছাচ্ছিল না বললেই চলে। আয়ুশ নিজের ফ্ল্যাশলাইটটা অন করে চারপাশটা স্ক্যান করতে শুরু করল। বাকি সিআইডি অফিসাররাও তাদের হাতের সার্চলাইট জ্বালিয়ে চারপাশের প্রতিটি কোণ খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতে গুদামের একদম ভেতরের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই আয়ুশের বুট জুতোর নিচে কিছু একটা পড়ার মট করে শব্দ হলো। আয়ুশ থমকে দাঁড়িয়ে লাইটের আলোটা নিচের দিকে ফেলল। নিচু হয়ে জুতোর নিচ থেকে একটি ছোট চিপ তুলে নিতেই,সে চিনতে পারলো।এটা অনুপমাকে ট্র্যাক করার জন্য তাদেরই বসানো জিপিএস ট্র্যাকারটা!হয়তো তাড়াহুরার কারনে জামা থেকে খসে পড়েছে। আয়ুশ নিশ্চিত হলো,এখানে মারাত্মক কিছু একটা ঘটে গেছে।
ঠিক তখনি গুদামের অন্য প্রান্ত থেকে সিআইডি অফিসার ফায়াজের জরুরি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
_”স্যার! দ্রুত এদিকে আসুন, কিছু পাওয়া গেছে!”
আয়ুশ এবং অবিরামসহ বাকি অফিসাররা দ্রুত ফায়াজের দেখানো জায়গাটায় গিয়ে জড়ো হলো। সেখানে আলো ফেলতেই সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি কাঠের চেয়ার উল্টে পড়ে আছে, যার সাথে মোটা দড়ি জড়ানো। আর তার চারপাশের মেঝেতে, দেয়ালে ছিটকে লেগে আছে প্রচুর পরিমাণ তাজা রক্তের দাগ।আয়ুশ চেয়ারটার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে জায়গাটা খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। হঠাৎ করেই চেয়ারের পায়ার নিচে চকচক করে ওঠা একটা সোনালী ব্যান্ডের হাতঘড়ি তার নজরে এলো। সে ফরেনসিক গ্লাভস পরা হাত দিয়ে সাবধানে ঘড়িটি তুলে নিল।এরপর সেদিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেতে লাগলো।দেখে বুঝা যাচ্ছে অত্যন্ত নামিদামি লাক্সারি ব্র্যান্ডের ঘড়ি এটি, যা সাধারণ মানুষের কিনা সাধ্যের বাইরে।
আয়ুশ ঘড়িটি অবিরামের দিকে এগিয়ে দিয়ে পেশাদার গলায় নির্দেশ দিল,
_”এই ওয়াচটা ক্রাইম সিন এভিডেন্স হিসেবে সিজ করো। এটার সিরিয়াল নাম্বার ট্র্যাক করে খোঁজ চালাও-এটি কার নামে রেজিস্টার্ড এবং কোন শোরুম থেকে কেনা হয়েছে। আই ওয়ান্ট দ্য ডিটেইলস নাও।”
অবিরাম মাথা নেড়ে এভিডেন্স প্যাকেটে ঘড়িটি ঢুকিয়ে সিল করে দিল। আয়ুশ এবার অন্য অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল,
_”মেঝে আর দড়ি থেকে ব্লাডের সোয়াব স্যাম্পল কালেক্ট করো। দ্রুত এটা ডক্টর স্যানেলের ল্যাবে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য পাঠিয়ে দাও। ভিক্টিমের পরিচয় কনফার্ম হওয়া দরকার।”
তদন্ত শেষ করে আয়ুশ সোজা হয়ে দাঁড়াল। অবিরাম পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল,
_”স্যার, রক্তের প্যাটার্ন দেখে তো মনে হচ্ছে এখানে কাউকে বন্দি করে টর্চার করা হয়েছিল?”
আয়ুশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুরো ঘরের রক্তের দাগগুলো দূর থেকে অ্যানালাইসিস করে গম্ভীর গলায় বলল,
_”শুধু টর্চার নয়। রক্তের এই বিপুল পরিমাণ আর আর্টারিয়াল স্পার্টের দাগ বলছে-ইটস আ মার্ডার! এখানে কাউকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে।”
অবিরাম চারপাশ দেখে অবাক হয়ে বলল,
_”খুন হলে লাশ কোথায়? পুরো গুদাম তো ফাঁকা!”
আয়ুশ পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে ধরিয়ে বলল,
_”সেটাই এখন আমাদের বের করতে হবে। এই স্পটে বডি পাওয়া যাবে না। ক্রিমিনালরা প্রমাণ নষ্ট করার জন্য ভিক্টিমের ডেড বডি কোনো সেফ জোনে সরিয়ে ফেলেছে।”
_”তাহলে বডি কোথায় নিতে পারে বলে আপনার ধারণা, স্যার?” অবিরাম জানতে চাইল।
আয়ুশ সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বলল,
_”এভিডেন্স ভ্যানিশ করার জন্য এই রুটের ক্রিমিনালরা সাধারণত নদী বা জলাশয়কে বেছে নেয়। আমাদের ফরেনসিক স্নাইপার ডগ K9 ইউনিট ডাকো, ওরাই রক্তের গন্ধ শুঁকে বডি ডিসপোজালের রুটটা বের করবে। আর এখনই লোকাল পুলিশকে অ্যালার্ট করো, শহরের এই বেল্টের যতগুলো নদী আর খাল আছে, সব জায়গায় যেন কোস্টাল ফোর্স আর ডুবুরি নামানো হয়।”
অবিরাম সম্মতি জানিয়ে দ্রুত ওয়ারলেসে হেডকোয়ার্টারে যোগাযোগ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অবিরাম চলে যাওয়ার পর আয়ুশ একা দাঁড়িয়ে পাইপলাইনের মতো করে সিগারেটের শেষ টানটা দিল। পুরো কেসটা ক্রমেই আরও জটিল রূপ নিচ্ছে। ঠিক তখনই তার প্যান্টের পকেটে থাকা ফোনটা সশব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই দেখল-রিয়ার নাম্বার থেকে কল আসছে।
আয়ুশের মুখের অবয়ব মুহূর্তের মধ্যে কঠোর হয়ে গেল। এই মুহূর্তে কোনো ব্যক্তিগত আবেগ বা ওসব ফালতু নাটকের জন্য তার সময় নেই। সে কলের সবুজ বাটনটা তো চাপলই না, বরং এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে রিয়ার নাম্বারটা ডিরেক্ট ফোনবুকের ‘ব্লক লিস্ট’-এ পাঠিয়ে দিল। ফোনটা আবার পকেটে রেখে সে নতুন উদ্যমে ক্রাইম সিনের দিকে মনোযোগ দিল।
আরিশান মৃধা বাড়ি ফিরতেই শুনতে পেলেন ওপরের ঘর থেকে ভীষণ চিল্লাপাল্লা আর হট্টগোলের আওয়াজ আসছে। অরি আর জেবা দুজনে মিলে চেঁচামেচি করছে। ড্রয়িংরুমে গিয়ে ওনার চোখ আটকালো সারিমের দিকে। সারিম বেশ আয়েশ করে সোফায় বসে টিভিতে রিনা খানের ‘দজ্জাল শাশুড়ি’ সিনেমা দেখছে আর মনোযোগ দিয়ে পপকর্ন খাচ্ছে।ছেলের সঙ্গে আরিশান মৃধার কথা বলার মতো মোড না থাকলেও ওপরে কী হচ্ছে তা জানার জন্য তিনি নিজেকে সামলাতে পারলেন না।এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেই বসলেন,
_”কী হয়েছে ওদের দুজনের মধ্যে? এভাবে ঝগড়ার আওয়াজ আসছে কেন?”
সারিম আরিশান মৃধাকে দেখেও যেন না দেখার ভান করে পড়ে রইল, কোনো উত্তর দিল না। ছেলের এমন আচরণে আরিশান মৃধা এবার বেশ বিরক্ত হলেন। বাবার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপ থাকাটা যে বেয়াদবি, এই ছেলে দিন দিন সেটাই প্রমাণ করছে। তিনি গলা কিছুটা চড়িয়ে বললেন,
_”সারিম, আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করছি! উত্তর কেন দিচ্ছ না? দিন দিন বড্ড বেয়াদব হচ্ছো, বাবাকে সম্মান করাও ভুলে গেছো!”
সারিম এবার মুখ ঘুরিয়ে আরিশান মৃধার দিকে তাকাল। বেশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
_”কে আমার বাবা? আমার তো কোনো বাবা নেই। আমার বাবা তো সেই কবেই আমাকে ত্যাজ্য করে দিয়েছে।”
আরিশান মৃধা অবাক হয়ে বললেন,
_”কী যা তা বলছ এসব?”
সারিম পপকর্ন চিবোতে চিবোতে বলল,
_”আমি কোনো যা তা বলছি না। আমার সাথে কথা বলতে এসেছো কেন? যাও, নিজের নতুন ‘ডাউনলোড’-এর কাছে যাও, যাকে ঘরে আনার জন্য ইদানীং তুমি মরিয়া হয়ে উঠেছ।”
ছেলের মুখে এমন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শুনে আরিশান মৃধার মনে কিছুটা সন্দেহ জাগল। ছেলে ঠিক কোন দিকে ইশারা করছে তা বুঝতে পেরেও তিনি গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
_”কী বলতে চাচ্ছো, পরিষ্কার করে বলো।”
সারিম এবার আচমকা আরিশান মৃধার হাত ধরে ওনাকে টেনে নিজের পাশের সোফায় বসিয়ে দিল। এরপর ওনার মুখে একটা পপকর্ন গুঁজে দিয়ে বলল,
_”আমি কী বলছি, তা তুমি আমার চেয়ে ভালো বোঝো। যাই হোক, আমার কিন্তু একটা বেডি সিস্টার চাই কুস্তাকুস্তি করার জন্য।বেডা হলে পরে আমি একমাএ ছেলে থেকে দুই মাএ হয়ে যাবো, শেয়ারিং পছন্দ না আবার আমার।”
ছেলের মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে আরিশান মৃধা কী বলবেন, তা ভেবে ভাষা হারিয়ে ফেললেন। ঠিক তখনই সারিম হঠাৎ বাবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। ওনার হাতটা টেনে নিজের মাথায় রাখল এবং আবদারের সুরে বলল,
_”ছোটবেলার মতো একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। ওপরের দিকে বেশি ফোকাস দিও না, ওখানে আপাতত চুলোচুলি চলছে।”
ছেলের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া আবদারে আরিশান মৃধার মনটা কিছুটা নরম হলেও ওপরের ঝগড়ার কথা শুনে ওনার চোখেমুখে উদ্বেগ ফুটে উঠল। তিনি সারিমের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতেই জিজ্ঞেস করলেন,
_”কী হয়েছে ওদের মধ্যে? এভাবে ঝগড়া কেন লেগেছে?”
সারিম খুব স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল,
_”তোমার বউ পরীক্ষায় আমার বউয়ের চেয়ে নম্বর কম পেয়েছে, সেজন্য ক্ষেপেছে।”
আরিশান মৃধা চমকে উঠে বললেন,
_”এখানে ঝগড়ার কী আছে? যার যতটুকু মেধা আর পরিশ্রম, সে তো সেইটুকুই পাবে। অদ্রিজা ভালো পড়েছে, তাই ভালো রেজাল্ট করেছে।”
সারিম বাঁকা হেসে বলল,
_”হ্যাঁ, ওটা তো তোমার মেয়ে একশতে একশ করেছে! এ-মাইনাস পেয়ে জামাইয়ের পাওয়ারে এ-প্লাস পাওয়া কি মুখের কথা? বহুত পরিশ্রম করে রাত জেগে বেডি আমাকে মানিয়েছে।”
আরিশান মৃধা চরম আকাশ থেকে পড়লেন। ওনার অরি এ-মাইনাস পেয়েছে? এটা যেন ওনার বিশ্বাসই হতে চাচ্ছে না। তাছাড়া সারিম এই ধরনের বিষয় নিয়ে ওনার সাথে রসিকতা করবে না, এটাও তিনি জানেন। কিন্তু অরির মতো ভালো পড়ুয়া মেয়ে কীভাবে এমন রেজাল্ট করল, তা ওনার মাথায় খেলল না। পরক্ষণেই ওনার মনে হলো-পরীক্ষার সময় সারিম এই বাড়িতে এসেছিল, নিশ্চয়ই এই ছেলের যন্ত্রণায় ওনার মেয়ে পরীক্ষা খারাপ করেছে।তিনি সারিমকে দোষারোপ করে বললেন,
_”অদ্রিজা তোমার জন্যই রেজাল্ট খারাপ করেছে! নয়তো আমার মেয়ে এমন নয় যে ও এত বাজে রেজাল্ট করবে। নিশ্চয়ই ও আমার ভয়ে তোমার কাছে সাহায্য চেয়েছে, আর বিনিময়ে তুমিও ওর থেকে কিছু সুবিধা নিয়েছ।”
সারিম বাবার কোল থেকে ঝট করে উঠে বসল। নিজের ছেলের চেয়ে ছেলের বউয়ের প্রতি এই অগাধ অন্ধ বিশ্বাস সারিমের একদম হজম হলো না। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
_”নিজের ওই ভণ্ড মেয়েকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা বন্ধ করো। তুমি জানো তোমার মেয়ে আগে কী করত? অন্যের খাতা দেখে লিখত, তাও আবার ঘুষ দিয়ে! পরীক্ষার প্রশ্ন বিভিন্ন চোর-চুন্নি ওয়েবসাইট থেকে কিনে পরীক্ষা দিত ও। তার ওপর সে হিউম্যান ডাক্তার নয়, অ্যানিম্যাল ডাক্তার হতে চায়! আর কত গা ঢাকবে মেয়ের? ভাগ্যিস এই দেশ আমার মতো একটা দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষামন্ত্রী পেয়েছে, নয়তো দেখা যেত তোমার মেয়ের মতো আরও কত নকলবাজ এভাবে পরীক্ষা পাস করে বের হয়ে যাচ্ছে। ফার্মের মুরগিগুলো তো পড়াশোনা ঠিকমতো করেই না,কিন্তু নকল করার সময় এদের কিছু বলে দিতে হয় না।”
সারিম কথাগুলো একনাগাড়ে বলে থামল। আরিশান মৃধা ছেলের কথায় প্রথমে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেও, পরক্ষণেই ‘ফার্মের মুরগি’ বলাতে তিনি ধরে নিলেন সারিম অরিকে অপমান করছে। তিনি রেগে গিয়ে বললেন,
_”মুখ সামলে কথা বলো সারিম! আমার অদ্রিজাকে ফার্মের মুরগি বললে আমি ভুলে যাবো যে তুমি আমার ছেলে। কী হয়েছে লিখেছে তো? নকল করার জন্যও একটা হিডেন ট্যালেন্ট আর অনেক বুদ্ধির প্রয়োজন হয়, যা তোমার মধ্যে কোনো কালেই ছিল না! এই থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায়, আসল ফার্মের মুরগি অদ্রিজা নয়, তুমি নিজে!”
সারিম বাবার এমন লজিক শুনে স্তব্ধ হয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। এই লোক বলে কী! নকল করার জন্য নাকি আবার যোগ্যতা লাগে? আর তাকে নাকি ফার্মের মুরগি বলছে! নিজের বাবাকে যেন আজ নতুন করে চিনল সারিম।সে পাল্টা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওপর থেকে জেবার তারস্বরে চিল্লানোর আওয়াজ ভেসে এলো। সে অরিকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করছে-
_”আমার পাওয়ার সম্পর্কে তোর কোনো ধারণা আছে? দেশের সব আইন আমার স্বামীর কথায় চলে! তোর এই টুকলি দিয়ে পাস করা পরীক্ষা আমি মানব না। আমি এত কষ্ট করে পড়লাম আর এ-প্লাস একা তুই পেলি? এটা হতেই পারে না! আমারও এ-প্লাস লাগবে।”
ওপাশ থেকে অরিও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়, সে চেঁচিয়ে বলল,
_”এ-প্লাস তোকে মারাচ্ছি আমি! গিয়ে তোর জামাইয়ের আইন নিয়ে বসে থাক। আমার জামাই শিক্ষামন্ত্রী, তাই এ-প্লাস পাওয়ার যোগ্যতা আমি রাখি, তুই না! পারলে বাবাকে গিয়ে বল কিছু করতে পারে কি না তোর মতো একটা আবাল বউয়ের জন্য!”
জেবা রেগে গিয়ে বলল,
_”শাশুড়ি হই তোর, মুখ সামলে কথা বল! ভুলে যাস না সম্পর্কের দিক থেকে সারিম ভাই আমার কী লাগে। আমার একটা কথায় উনি আমাকে এ-প্লাস পাইয়ে দেবেন। নয়তো ওনাকে আমি আমার জামাইয়ের ক্ষমতা দিয়ে আইনের আওতায় ঢুকিয়ে দেবো!”
অরি উপহাসের সুরে বলল,
_”হ্যাঁ হ্যাঁ, যা! তোকে খুব এ-প্লাস দেবে উনি! উনি মন্ত্রী হলেও আমি মন্ত্রীর বউ। আমার এক ইশারায় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা উল্টে যেতে পারে, বুঝলি? সো, মুখ সামলে কথা বল। এডুকেশন ছাড়া ওইসব আইন-ফাইনের কোনো দাম নেই।”
ঠিক তখনই সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন আনতারা মৃধা। ওনাকে দেখে সারিম আর আরিশান মৃধা দুজনেই ওনার দিকে তাকালেন। এত রাতে ওনাকে বাড়ি ফিরতে দেখে দুজনেই কিছুটা অবাক হলেন। আনতারা মৃধা ওনাদের চোখের সন্দিহান দৃষ্টি বুঝতে পেরে কোনো কথা না বাড়িয়ে দ্রুত ওপরের দিকে চলে গেলেন।ওপরে এসে তিনি দেখতে পেলেন জেবা আর অরি পুরো দমে যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছে। চারদিকে বইখাতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। জেবার এক কথা-তারও এ-প্লাস চাই, কারণ সে অরির চেয়ে বেশি মেধাবী আর অরির এই ড্রিগ্ৰি সম্পূর্ণ ভুয়া। অরিও জেবাকে এ-প্লাস দেওয়ার বিষয়ে ঘোর আপত্তি জানাচ্ছে। দুজনের এই চরম চেঁচামেচিতে আনতারা মৃধা আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। তিনি দুজনের দিকে তাকিয়ে খুব জোরে চিৎকার করে বলে উঠলেন,
_”এই মেয়েরা! তোমরা দুজন চুপ করবে? আর একটা কথা বললে দুটোকে ধরে আছাড় মারব আমি!”
ওপরের এই অদ্ভুত চিল্লাপাল্লা শুনে সারিম মাথায় হায়-হুতাশ করে বাবার উদ্দেশ্যে বলল,
_”এত কষ্ট করে দিনরাত এক করে নির্বাচনটা জয় করলাম আমি! আর এখন আমার পাওয়ার হাউজ দেখাচ্ছে আমার বউ ! কী আজব দুনিয়া,আজব এদের রাজনীতি!”
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৯
আরিশান মৃধা পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের দিকে একটু সন্দেহী চোখে তাকালেন। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
_”জেবার কাছে অরির তোমার মাধ্যমে এ-প্লাস পাওয়ার খবরটা কীভাবে পৌঁছাল? আমার তো মনে হয় না অরি নিজে যেচে এই কথা ওকে বলবে।”
সারিম কোনো উত্তর না দিয়ে আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা ও রহস্যময় হাসি দিল। আরিশান মৃধার যা বোঝার তিনি বুঝে গেলেন।মনে মনে মেনে নিলেন-যে তিনি আসলেই একটা আস্ত ‘জাউরা’ জন্ম দিয়েছেন, যে নিজের বউয়ের সঙ্গে সৎ মায়ের মধ্যেই লাগিয়ে দিয়ে নিজে আয়েশ করে মুভি দেখে পপকর্ন খাচ্ছে!
