Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৩

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৩

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৩
আয়েশা শেখ

আজকেই প্রথম ক্লাসের প্রথম থেকেই উপস্থিত ছিল ঝিলমিল। আজকেও ইরানের পাশে লাস্ট বেঞ্চে বসেছে। কিন্তু ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকেই একটা অদ্ভুত জিনিস তার নজরে আসছিল। বারিশ ক্লাসে ঢোকার পর থেকেই অনবরত ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রায় দশ মিনিট কেটে গেল, অথচ সে ফোন থেকে চোখ সরাচ্ছে না। গভীর মনোযোগ দিয়ে ফোনে কী যেন একটা দেখছে আর ওর কপাল সামান্য কুঁচকে আছে। বারিশের এই অন্যমনস্কতা ঝিলমিলকে বেশ অবাক করল। সে কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে পাশে বসা বান্ধবীর দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,

— ‘কী করছেন উনি ফোনে?’
ইরান খাতা থেকে কলমটা তুলে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে মৃদু আওয়াজে জবাব দিল,
— ‘তুই আর আমি তো একসাথেই। আমি কীভাবে জানব বল? তবে উনি প্রতিদিনই এমন করেন। ক্লাসে এসে প্রথম কয়েক মিনিট ফোনে কী যেন চেক করেন, তারপর ফোন রেখে ক্লাস শুরু করেন।’
ইরানের কথা শেষ হতে না হতেই বারিশ ফোনটা লক করে টেবিলের ওপর রেখে দিল। গম্ভীর গলায় সবার রোল কল করতে শুরু করে। নাম ডাকার পর্ব শেষ হতেই বারিশ রেজিস্টার খাতাটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর আলতো করে চাপ দিয়ে বলল,
— ‘লাস্ট ক্লাসে যা পড়িয়েছিলাম, সেখান থেকে এখন কয়েকজনকে কিছু প্রশ্ন করব।’
কথাটা শোনামাত্রই ঝিলমিলের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। যেন আত্মা হাতে নিয়ে বসে রইল সে। টেবিলের নিচে হাত দুটো শক্ত করে মুঠো করে মনে মনে অনবরত দোয়া করছিল— সৃষ্টিকর্তা, আজ যেন ওর দিকে স্যারের নজর না পড়ে! এসব পড়া ধরার ঝামেলা থেকে আজ যেন কোনোমতে বেঁচে যায়! কিন্তু ঝিলমিলের মনের আকুতি বোধহয় ওপরওয়ালা পর্যন্ত পৌঁছাল না। ক্লাসের কয়েকজনকে সাধারণ কিছু প্রশ্ন করার পর, বারিশের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এসে থামল ঠিক ঝিলমিলের মুখের ওপর। শীতল আর আদেশসূচক কণ্ঠে সে বলল,

— ‘ঝিলমিল, স্ট্যান্ড আপ।’
বুক ধড়ফড়ানি সামলে নিয়ে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল ঝিলমিল। ​বারিশ সরাসরি ঝিলমিলের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল,
— ‘ক্যান ইউ এক্সপ্লেইন দ্য ডিফারেন্স বিটুইন আ পার্টিসিপল অ্যান্ড অ্যান ইনফিনিটিভ উইথ এক্সাম্পলস? অ্যান্ড হোয়াট ইজ আ ড্যাঙ্গলিং মডিফায়ার?’
—‘ সুবহানআল্লাহ!’ মনে মনে আওরাল ঝিলমিল। কারণ ও এটা জীবনেও পারবে না। কিছুটা পারলেও এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ গুলিয়ে গেছে। সাজিয়ে গুছিয়ে বলা তার পক্ষে সম্ভব না। মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা। ক্লাসের বাকি সবাই তখন গোল গোল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ কয়েক সেকেন্ড পার হওয়ার পর বারিশ খাতা কাটার লাল কলমটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
— ‘কী হলো, বলো?’
চুপ করে রইল ঝিলমিল। মাথা নিচু করে ইরানের দিকে ইশারা করল। ইরান মাথা নাড়িয়ে বোঝাল সেও পারবে না এটা।

— ‘আই অ্যাম ওয়েটিং, ঝিলমিল।’
ঝিলমিল জড়োসড়ো গলায় বলল,
— ‘মনে নেই।’
বারিশের চেহারায় কোনো অভিব্যক্তির পরিবর্তন হলো না।
— ‘দাঁড়িয়ে থাকো।’
—‘ আল্লাহ, ও আল্লাহ! তুমি মেয়ে জাতীরে পেট মোটা, ভোটকা, বুড়ো স্বামী দিও তাও এমন অত্যাচারী, সিদ্ধ করলা মার্কা স্বামী দিও না।’
ঠিক তখনই সামনের বেঞ্চ থেকে এক চশমাওয়ালি মেয়ে আনায়া হুট করে হাত তুলে অতি-উৎসাহী এবং নরম গলায় বলে উঠল,
— ‘স্যার, আমি পারি এটা। আমি বলব?’
বিরক্ত হলো ঝিলমিল। এটা আর নতুন কী! ক্লাসের এই মেয়েটা সব সময় স্যারের সামনে ন্যাকা ভাব ধরে! নিজেকে কীভাবে অতিরিক্ত ফোকাসে আনা যায় সেই চেষ্টা। যতসব!

— ‘পারোই যখন, আর বলে লাভ নেই। বসে থাকো।’ বারিশ চশমাওয়ালি মেয়ের দিকে না তাকিয়ে বলল।
স্যারের এই সোজাসাপ্টা উত্তরে আনায়ার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ছোট হয়ে গেল। তার এমন অবস্থা দেখে ইরান আর ওদের গ্রুপের পেছনে বসা কয়েকজন আর নিজেদের চেপে রাখতে পারল না। তারা মুখ চেপে ফিক করে হেসে দিল। ঝিলমিলও ওদের হাসি দেখে নিজের ঠোঁটের কোণের হাসিটা কোনোমতে চেপে রাখল।
বারিশ আরও কয়েকজনকে ভিন্ন ভিন্ন পড়া ধরল। সবাই মোটামোটি সঠিক উত্তর করতে পেরেছে। শুধু মাত্র রোদ্দুর ছেলেটা বাদে। সে ঝিলমিলদের গ্রুপেরই। যদিও তাকে সহজ প্রশ্নই করেছিল। ইরানকেও সহজ প্রশ্ন করেছিল। একদম পানির মতো। ঝিলমিলকে এটা ধরলে ফটাফট বলে দিত। কিন্তু তাকে এমন একটা ধরেছে যে পারলেও ক্লাসে বুঝিয়ে বলার মতো প্রতিভা ঝিলমিলের নেই।

—‘ তোমাকে আমি আরেকটা কোশ্চেন ধরব। পারলে বসিয়ে দেব।’
স্যারের কন্ঠ কানে আসতেই ভাবনা থেকে বের হয় ঝিলমিল।
—‘ জি স্যার বলুন।’
—‘Scarcely I had reached the college when the bell rang. এখানে গ্রামাটিক্যাল এররটা কোথায় এবং এই রুলটাকে কী বলা হয়?’
ঝিলমিল ঠোঁট নাড়িয়েও কিছু বলল না। উত্তর নিয়ে খুব কনফিউশনে পড়ে গেছে সে। Scarcely আর had-এর এই আগে-পরে আসার চক্করটা সম্পূর্ণ গোলমেলে ঠেকল। সে মাথা নিচু করে আবারও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
—‘ পারবে না?’
বারিশের কন্ঠ কানে আসতেই মাথা নিচু রেখেই দুপাশে মাথা নাড়ায় ঝিলমিল।
—‘স্যার, আমি বলি? নেগেটিভ অ্যাডভার্ব শুরুতে থাকলে ইনভারশন হয়, তাই সাবজেক্টের আগে অক্সিলিয়ারি ভার্ব বসবে। সঠিকটা হবে, Scarcely had I reached…’ আনায়া দাড়িয়ে সঠিক উত্তর বলে ফেলল।
বারিশ হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল। দাঁত চেপে বলল,

—‘ গুড, বসো।’
ঝিলমিলকে একে একে কয়েকটা প্রশ্ন করল বারিশ কিন্তু একটারও সঠিক উত্তর বলতে পারল না। পুরো ক্লাসই দাড়িয়েছিল। পরপর আরও কয়েকটা ক্লাস যাওয়ার পর টিফিনের ঘন্টা বাজতেই
ঝিলমিল, ইরান, মেধা, রোদ্দুর, শুভ সহ কয়েকজন মিলে একসঙ্গে ক্যান্টিনে গিয়ে বসে। কথার পিঠে কথা চলার মাঝেই মেধা হঠাৎ আইসক্রিমের চামচ হাতে রোদ্দুরের দিকে চোখ সরু করে তাকাল।
—‘আচ্ছা রোদ্দুর, ইংলিশ ক্লাসে স্যার আজ তোকে যে প্রশ্নটা ধরেছিল, ওটা তো সেদিন লাইব্রেরিতে বসে তুই নিজেই আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলি! অথচ আজ ক্লাসে পারলি না কেন রে?’
​রোদ্দুর থমকে গিয়ে একপলক ঝিলমিলের দিকে তাকাল। মেয়েটা আইসক্রিম খাওয়ার চরম ধ্যানে মগ্ন, ঠোঁটের চারপাশে সামান্য আইসক্রিম লেগে আছে। সেদিকে থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে রোদ্দুর খুব স্বাভাবিক গলায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল,

—‘এমনি রে। হঠাৎ মাথায় আসছিল না।’
​—‘হয়েছে, আর ঢং করতে হবে না! ঝিলমিল একা ক্লাসে দাঁড়িয়ে থাকবে, সেটা সহ্য হবে না বলেই তুই ইচ্ছে করে ভুল উত্তর দিয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলি। সত্যি না?’
​মুহূর্তের মধ্যে ঝিলমিল আর ইরানের আইসক্রিম খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ঝিলমিল চোখের পাতা ছোট ছোট করে সন্দেহভাজনের দৃষ্টিতে রোদ্দুরের দিকে চেয়ে বলল,
—‘তুই সত্যি এজন্য দাঁড়িয়ে ছিলি নাকি?’
​—‘ধুর! ও একদম ফালতু বকছে,’ রোদ্দুর থতমতো খেয়ে গেল। ‘তোর জন্য আমি সাধ করে স্যারের কাছে বাঁশ খেতে যাব নাকি?’
​কথাটা শেষ করেই রোদ্দুর টেবিলের তলা দিয়ে শুভকে কষে একটা চিমটি কাটল।
​ঝিলমিল আর কথা বাড়াল না, আবার আইসক্রিমে মনোযোগ দিল। রোদ্দুর প্রসঙ্গ বদলে ঝিলমিলকে উদ্দেশ্য করে শুধাল,
—‘ জারিফ ভাইয়া কি তোকে আর ডিস্টার্ব-টিস্টার্ব করেছিল?’
​আবারও আইসক্রিমের চামচ আটকে গেল ঝিলমিলের। সে আর ইরান চকিতে একে অপরের দিকে তাকাল। তার মানে, কলেজে ঝিলমিলের বিয়ের খবরটা বন্ধুদের কেউ এখনো টের পায়নি! ​ঝিলমিল নিজেকে সামলে নিয়ে হালকা গলায় বলল,

—‘না। ডিস্টার্ব করার সাহস পাবে কোথায়?’
​—‘সামনে যদি আবার কোনো ঝামেলা করে, সোজা আমাকে বলবি,’ রোদ্দুর বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল।
​—‘তোকে বললে তুই কী করবি?’
​—‘মেরে তক্তা বানিয়ে দেব!’
​রোদ্দুরের বীরত্বপূর্ণ সংলাপ শুনে ঝিলমিলসহ পুরো টেবিল হাসিতে ফেটে পড়ল।
​—‘ যার বাপ সেদিনও আমাদের সবার সামনে এসে বলছিল, ছেলে আমার রাতে এখনো ডিম লাইট জ্বালিয়ে ঘুমায়, একা শুতে পারে না… সে নাকি আবার সিনিয়রকে মারবে!’
​শুভর কথায় লাল হয়ে গেল রোদ্দুরের মুখ খানি।
—‘তুই মুখটা একটু বন্ধ করবি? ঝিলমিল, ও কিন্তু একদম বানিয়ে বানিয়ে বলছে! আমি মোটেও অতটা ভিতু নই!’
​—‘তুমি এতদিন কলেজে আসোনি কেন, জাহানারা?’

​হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসা পুরুষালী কণ্ঠে গ্রুপের সবাই চমকে পাশে তাকাল। হালকা আকাশী রঙের ফুলহাতা শার্ট পরা ফাহিম মীর দাঁড়িয়ে আছেন। কলেজের আইসিটি টিচার তিনি। স্যারকে দেখেই তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল ঝিলমিল। ভদ্রতার হাসি হেসে বলল,
—‘স্যার, একটু অসুস্থ ছিলাম।’
​ফাহিম স্যারের মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল,
—‘কী হয়েছিল? এখন শরীর ঠিক আছে তো?’
​—‘জি স্যার, এখন একদম ঠিক আছি।’
​—‘আচ্ছা। কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে আমাকে জানিও।’
​—‘অবশ্যই স্যার, জানাব।’
​ফাহিম মীর মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে সামনের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। ঝিলমিলও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বন্ধুদের আড্ডায় নিজের জায়গায় গিয়ে বসল। কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পরই যেন কিছু একটা মনে পড়ে গেল ফাহিম স্যারের। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে আবার ডাকলেন,

—‘ঝিলমিল, একটু শোনো।’
​ঝিলমিল চট করে উঠে ফাহিম স্যারের কাছে এগিয়ে গেল।
​—‘তুমি কি আইসিটি কোথাও প্রাইভেট পড়ছ?’কৌতূহলী চোখে শুধালেন ফাহিম।
​—‘না স্যার, পড়ছি না। তবে আমরা ফ্রেন্ডরা সবাই মিলেই কোথাও পড়ার কথা ভাবছি।’
​—‘তুমি চাইলে আমার কাছে পড়তে পারো।
​ঝিলমিল কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
—‘সত্যি স্যার? আপনিও ব্যাচ পড়ান নাকি?’
​—‘না, ব্যাচ পড়াই না। তবে তুমি পড়তে চাইলে আমি পড়াব।’
—‘আচ্ছা স্যার, আপনাকে জানাব।’
​—‘ঠিক আছে, সাবধানে থেকো। টেক কেয়ার।’
​স্যার চলে যেতেই ঝিলমিল আবার ফিরে এল টেবিলে। ​সে বসতে না বসতেই রোদ্দুর উৎসুক আর কিছুটা শক্ত গলায় শুধাল,
—‘কী বলল রে ফাহিম স্যার তোকে?’
​—‘বলল আইসিটি প্রাইভেট পড়তে চাইলে উনি নাকি আমাকে পড়াবেন,’ ঝিলমিল স্বাভাবিক গলায় বলল।
​—‘তুই কী বললি?’
​—‘বললাম জানাব।’
রোদ্দুরের চোখের কোণ দুটো কেমন যেন বদলে গেল। তাতে পরিষ্কার স্যারের প্রতি ক্ষোভ। স্যারের যাওয়ার পথের দিকে গম্ভীর মুখে চেয়ে রইল সে।

ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরছিল বারিশ আর ঝিলমিল। গাড়ি চলছিল আপন গতিতে। বারিশের এক হাত স্টিয়ারিংয়ে, অন্য হাত গিয়ারে স্থির। পাশেই বসা ঝিলমিল।
—‘তুমি কি কিছু বলবে?’ গাড়িতে ওঠার পর থেকেই ঝিলমিলকে ছটফট করতে দেখে বারিশ শুধাল।
ঝিলমিল একটু দ্বিধা নিয়ে তাকাল।
—‘বলতাম…’
—‘বলো।’
—‘আইসিটি প্রাইভেট পড়া দরকার ছিল। আজ স্যার এসে বললেন, তাঁর কাছে চাইলে পড়তে পারি।’
বারিশের চোখের দৃষ্টি রাস্তা থেকে সরলো না। একদম নির্বিকার গলায় শুধাল,
—‘কোন স্যার?’
—‘আমাদের যে আইসিটি ক্লাস নেন। ফাহিম স্যার।’
শব্দ দুটো শেষ হওয়ার আগেই বিকট শব্দে ব্রেক কষল গাড়িটা। পিচঢালা রাস্তায় চাকার ঘর্ষণে থমকে দাঁড়াল ধাতব শরীরটা। ঝাঁকুনিতে সামনে ঝুঁকে পড়ল ঝিলমিল। বারিশ ধীরেসুস্থে গাড়ি নিউট্রালে আনল। তারপর ঝিলমিলের দিকে ঘুরল।

—‘কার কাছে পড়বে?’
ঝিলমিল নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল,
—‘ফাহিম স্যার। কেন?’
—‘তুমি তাকে কী বলেছ?’
—‘বলেছি জানাব।’
—‘তাকে বলে দিও তুমি পড়বে না।’
বারিশের এই হঠাৎ একতরফা সিদ্ধান্তটা মেনে নিতে পারল না ঝিলমিল।
—‘কেন? উনি অনেক ভালো আইসিটি পড়ান। আমি পড়তে চাই।’
—‘আমি নিষেধ করেছি।’
—‘আমি পড়তে চাই।’
—‘আমি নিষেধ করেছি বললাম তো!’
—‘কিন্তু…’
ঝিলমিলকে যুক্তি দেখানোর সুযোগ দিল না বারিশ। এক নিমেষে তার হাত গিয়ে চেপে বসল ঝিলমিলের ইউনিফর্মের কলারের ওপর। হেঁচকা টানে ওকে নিজের বুকের নিকট টেনে নিয়ে এলো সে। গলার কাছে কাপড়ের টান লাগতেই নিঃশ্বাস আটকে গেল ঝিলমিলের। আতঙ্কে দু’হাতে চেপে ধরেছে স্বামীর শার্ট। বারিশের তপ্ত শ্বাস আছড়ে পড়ছে ওর মুখের ওপর। গলার স্বর অত্যন্ত নিচু, চাপা রেখে বলল,

​—‘আমি আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি! আই…হ্যাভ…ফোরবিডেন… ইউ, অ্যান্ড দ্যাটস দ্য এন্ড অফ ইট। আমার কথা অমান্য করার দুঃসাহস একদম দেখাবে না! আর এরপরও যদি কোনোদিন আমার সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করো, তবে এটা চিন্তা করার পেছনে তোমার মস্তিষ্কের যতগুলো নিউরন খরচ হয়েছিল, তার প্রতিটার জন্য তুমি আফসোস করবে!’
বারিশের মুখের তপ্ত বাতাস আছড়ে পড়ছে ঝিলমিলের থরথর করে কাঁপা গালে। হাত-পা একমুহূর্তে অবশ হয়ে এলো। আতঙ্কে তোলপাড় করছে বুকের ভেতরটা। এইলোক তো তাকে বিয়েই করতে চায়নি! দাদীমা যখন ফুপির পালিয়ে যাওয়ার খবর জানিয়ে ঝিলমিলকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর আকুতি করছিলেন, কত কী-ই না বলেছিল এই মানুষটা! অমত, বিরক্তি আর অনাগ্রহে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অথচ বিয়ের পর, কাজী সাহেবের সামনে কবুল শব্দটা উচ্চারণের পর থেকেই যেন এক অচেনা রূপ ধারণ করেছে সে! কীভাবে একটা মানুষ বিয়ের পর গিরগিটির মতো এভাবে রঙ বদলে ফেলে?

—‘ মাথায় ঢুকেছে?’ বারিশের বরফশীতল কণ্ঠের প্রশ্নে ঝিলমিলের ভাবনার সুতো ছিঁড়ল।
ঝিলমিলের গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ। ভয়ের মেঘ ঠেলে মিনমিন করে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করল সে,
—‘আমি… আমি আইসিটি কিছুই বুঝি না। টিউশন না নিলে এক্সামে কী লিখব?’
বারিশের দৃষ্টি ঝিলমিলের মধু রঙা চোখ দুটোতে। ভয় আর বিস্ময়ে মেয়েটার সেই হ্যাজেল মণি জোড়া বড় বড় করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বারিশের থমথমে চেহারার কঠিন ভাবটা যেন সামান্য নরম হলো, কিন্তু অধিপত্যের কোনো কমতি রইল না।
—‘ আমি পড়াব।’
ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল। সামান্য সাহস কুড়িয়ে আগের মতোই কাঁপাকাঁপা স্বরে বলে উঠল,
—‘আপনি… আপনি তো ইংরেজির শিক্ষক!’
​—‘আমি সব পারি। সব শেখাব তোমায়। স্বরবর্ণ থেকে শুরু করে… জীববিজ্ঞানের একদম শেষ অধ্যায় পর্যন্ত! প্রতিটা সাবজেক্টের ওপর প্রাইভেট টিউটোরিয়াল দেব। তবু অন্যের ওপর নির্ভর করা চলবে না। তোমার শিক্ষক একটাই– সেটা বারিশ!’
—‘ আমার গ্রুপে তো জীববিজ্ঞান নেই।’
বারিশ আর কিছু। ঝিলমিলকে আগের জায়গায় বসিয়ে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট করল। এদিকে ঝিলমিলের হৃদপিণ্ড বাইম মাছের মতো লাফাচ্ছে।

শেহরিয়ার বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামাল বারিশ। ​গাড়ি থেকে নেমেই চৌধুরী বাড়ির গেটের সামনে নিজের বাবাকে দেখতে পেল ঝিলমিল। আলতাফ সাহেব নিশ্চয়ই কোনো কাজে এদিকে এসেছিলেন। এতদিন পর বাবাকে দেখে ঝিলমিল একটু এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু তার আগেই শক্ত আর নিষ্ঠুর আঙুল থাবা বসাল তার কবজিতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অজগরের মতো পেঁচিয়ে বারিশ তাকে প্রায় টেনে-হিঁচড়ে গেটের ভেতর নিয়ে যেতে লাগল।
পেছন থেকে ঝিলমিলের আকুল কণ্ঠ ভেসে এল,
—‘আরে, ছাড়ুন! আব্বুর সাথে অন্তত দুটো কথা বলতে দিন!’
কিন্তু যুবক সে কথায় কান দেওয়ার প্রয়োজনই বোধ করল না।
​ওদিকে নিজের চোখের সামনে জামাইয়ের এমন অপমানজনক ব্যবহারে আলতাফ সাহেবের ফর্সা মুখটা মুহূর্তে কালো হয়ে উঠল।
ক্ষোভ সামলাতে না পেরে তিনি চিৎকার করে উঠলেন,
—‘অসভ্য! অভদ্র, এক নম্বরের বেয়াদব একটা! তোর কপালেও যেন এমন মেয়ের জামাই জোটে!’
শব্দগুলো বারিশ আর ঝিলমিল দুজনের কানেই স্পষ্ট পৌঁছাল। ঝিলমিল কিছুটা অসন্তুষ্ট গলায় ফিসফিস করে বলল,

—‘আব্বু কিন্তু অভিশাপ দিচ্ছেন! বেশ হবে তখন… আপনার নিজের মেয়ের জামাই যখন আপনার সাথে এমন ব্যবহার করবে, তখন টের পাবেন!’
বারিশ এবারেও কোনো জবাব দিল না। থমথমে মুখে বাসার ভেতর ঢুকে সোজা বেডরুমে চলে গেল। সুইচ অন করে এসি ছেড়ে বিনাবাক্যে চলে যায় শাওয়ার নিতে ওয়াশরুমে। ​ঝিলমিলও আর দেরি না করে কলেজের ইউনিফর্মটা বদলে একটা ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর প্যান্ট পরে নিল। এখন শুধু বারিশ ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার অপেক্ষা, সে বের হলেই সে নিজে ফ্রেশ হতে ঢুকবে।
​ঘরে একা দাঁড়িয়ে থাকতেই সকালের ঘটনাগুলো একের পর এক মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল তার। সকালে জোর করে তাকে দিয়ে রান্না করানো, ক্লাসে একেরপর এক প্রশ্ন ধরে দাড় করিয়ে রাখা, গাড়ির ভেতরের সেই আচরণ, সবশেষে নিজের বাবার সাথে এই জঘন্য ব্যবহার!

​আসলেই লোকটা একটা চরম বেয়াদব! নইলে গুরুজনদের সাথে কেউ এমন করে? ঝিলমিল ভালো মেয়ে বলেই একে সহ্য করে যাচ্ছে! নাহলে এর কপালে মেয়ে তো দূরের কথা জ্বীনও জুটত না! ​ভাবতে ভাবতেই রাগে গজগজ করতে করতে সে ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার খুব ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে কাঠের দরজাটা ভেঙে ভেতরে ঢুকে লোকটার নাক বরাবর শক্ত একটা ঘুষি বসিয়ে দিতে! ​যে ভাবনা, সেই কাজ! ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে বাতাসে তুলে ফেলল সে। দরজাকেই বারিশের মুখ কল্পনা করে পূর্ণ শক্তিতে মারল এক ঘুষি! ​কিন্তু এমন কিছু হলো যা ঝিলমিল খারাপ স্বপ্নেও ভাবেনি। লক খুলে ওয়াশরুমের দরজাটা আচমকা ফাঁক হয়ে গেল! আর ঝিলমিলের সেই সজোর, নিশানাভেদী ঘুষিটা গিয়ে সোজা বিঁধল সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসা বারিশের ঠিক নাক বরাবর!
​—‘উফ!’

ঘটনার আকস্মিকতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো দু-পা পিছিয়ে এলো ঝিলমিল। ভয়ে বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল তার। অপরাধীর মতো দুটো হাত ওপরে তুলে দু’পাশে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল,
—‘আ-আমি দিইনি! না মানে… আপনাকে মারতে চাইনি আমি!’
কথাটা শেষ করতে পারল না ঝিলমিল। বারিশের মুখের দিকে তাকিয়েই তার গলার আওয়াজ পুরোপুরি আটকে গেল।
​বারিশ একচুলও নড়ল না। না সে চিৎকার করল, আর না রাগে ফেটে পড়ল। ডান হাতটা নাকে ছুঁয়ে এক দৃষ্টিতে অবাক আর শীতল চোখে তাকিয়ে রইল ঝিলমিলের দিকে। ​স্বামীর এমন দৃষ্টিতে মেয়েটার শরীরের রক্ত যেন জমে বরফ হয়ে গেল।
—‘আ-আমাকে মারবেন না প্লিজ! সব… সব দোষ আপনার নাকের! মানে, আপনি কেন ওই সময় বের হতে গেলেন!’
​বারিশ নাক থেকে হাত সরিয়ে দেখল, তার আঙুলের ডগায় গাঢ় লাল এক ফোঁটা র’ক্ত লেগে আছে। বাঁ হাতে ধরা তোয়ালেটা দিয়ে সে আলতো করে র’ক্তটুকু মুছে সেটা ছুড়ে ফেলল সোফার ওপর। তারপর ধীরপায়ে এক পা দু পা করে এগোতে শুরু করল ঝিলমিলের দিকে। ​ভয়ে শিউরে উঠে পিছিয়ে যেতে লাগল ঝিলমিল। পেছাতে পেছাতে পিঠ গিয়ে ঠেকল বেডরুমের শক্ত দেওয়ালে।

​—‘প-প্লাস্টার লাগবে? নাকি আইস প্যাক এনে দেব? ব-বিশ্বাস করুন, আমি তো শুধু বাতাসকে… মানে ওয়াশরুমের দরজাকে ডেমো দেখাচ্ছিলাম!’ ভীতি লুকাতে না পেরে অসংলগ্নভাবে যা মুখে এলো, তাই বলে ফেলল সে।
​বারিশ থামল গিয়ে একদম ঝিলমিলের ইঞ্চিখানেক দূরত্বে। তারপর দুই হাত ঝিলমিলের মাথার দুই পাশে দেওয়ালে রেখে পুরোপুরি নিজের ছায়ার নিচে বন্দি করে ফেলল কিশরীকে। মাথাটা সামান্য নিচু করে, ঝিলমিলের চোখের গভীরতায় দৃষ্টি ফেলে ফিসফিস করে বলে উঠল,
—‘দরজাকে ডেমো দেখাচ্ছিলে, তাই না?’
​—‘হ্যাঁ…’
​ঝিলমিল এখন ঠিক কোথায় তাকাবে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। লোকটার চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর বিন্দুমাত্র সাহস তার নেই। আবার বারিশের আপাদমস্তক উদোম শরীর দেখে লজ্জায় তার কান লাল হয়ে আসছে। নিচের দিকে তাকাতেও আবার অন্য মুসিবত! কোমরে জড়ানো তোয়ালেটা বেশ ঢিলেঢালাভাবে বাঁধা আছে। একটু নড়চড় হলেই যদি খুলে যায়! ছিঃ! লজ্জায় আর আতঙ্কে ঝিলমিল শক্ত করে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।

​বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল। বারিশের গরম নিশ্বাসের ছোঁয়া এখনো পাচ্ছে সে; স্পষ্ট বুঝতে পারছে লোকটা নড়েনি, এখনো ঠিক আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। ​হালকা ঠোঁট ভিজিয়ে অবশেষে চোখ মেলল ঝিলমিল। তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা একটু ওপরে তুলতেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল তার। ​মানুষটার নাকের পাশ দিয়ে তখনো সরু ধারায় রক্ত গড়াচ্ছে! ঠোঁট দুটো আপনাআপনি ফাঁক হয়ে গেল তার। কিছু না ভেবেই সে নিজের ডান হাতটা ওপরে তুলে স্বামীর নাকের সেই র’ক্তের দাগ ছুঁয়ে ফেলল,
—‘রক্ত বের হয়ে গেছে তো! দেখি…’
​ভুল শোধরানোর আকুলতায় সে নিজের হাত দিয়ে বারিশের নাক থেকে র’ক্ত মুছে দিতে লাগল। কিন্তু এভাবে মুছে লাভ নেই; র’ক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না। আতঙ্ক আর অপরাধবোধে ঝিলমিলের হাত তখন কাঁপছে। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বারিশকে টেনে পাশের বিছানায় বসিয়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইডের বক্সটা টেনে নিয়ে এল। খুব সাবধানে একটা কটন বাডসে ভায়োডিন নিয়ে বারিশের নাকের ক্ষতে লাগিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলে উঠল,
—‘নিশ্বাস কি ঠিকমতো নিতে পারছেন? থাক, আর কষ্ট পাবেন না… একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। সরি… আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি।’ ঝিলমিলের সত্যিই খুব খারাপ লাগছে। সে তো তখন এমনি এমনি ভাবছিল। সত্যি সত্যি নাক ফাটাতে একদমই চায়নি।
​ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগানো শেষ করে তাড়াতাড়ি ফার্স্ট এইডের বক্সটা গুছিয়ে রাখতে গেল সে। ​তখুনি গম্ভীর গলায় থমথমে স্বরে ভেসে এল বারিশের নির্দেশ,

—‘এসব করে লাভ নেই। গিয়ে আমার কাপড়গুলো ধুয়ে, শাওয়ার নিয়ে দ্রুত রান্না করতে যাও।’
ঝিলমিলের খারাপ লাগাটা উবে গেল মুহূর্তে। মুখটা কালো করে বলল,
—‘এখন রান্না করলে রাত হয়ে যাবে। ক্ষিদে পেয়েছে। বাসায় যা রান্না হয়েছে সেগুলোই খেয়ে নিন।’
​বারিশ আড়চোখে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক এক করে মেপে বলল,
—‘আমি এক কথা বারবার বলি না, ঝিলমিল। তুমি এমনিতেই আমার মাথা গরম করে দিয়েছ। আমার ইচ্ছে করছে তোমার নাকটা ফাটিয়ে দিতে!’
ঝিলমিলের এতক্ষণ যেটুকু অপরাধবোধ হচ্ছিল, তার সবটা মুহূর্তে পানি হয়ে গেল! ভেতরের ক্ষোভ আর রাগটা চড়চড় করে মাথার ওপর চড়ে গেল তার। ইচ্ছে করছে আগের মতো আরেকটা সজোর ঘুষি বসিয়ে দিতে লোকটার সেই লাল হয়ে থাকা নাকের ওপর!
​বারিশ বেশ হুকুমের সুরেই আবার বলে উঠল

—‘কী হলো, যাও! ক্ষিদে পেয়েছে আমার।’
​—‘আমি… আমি কাপড় ধুতে পারি না!’
​—‘এসব নিয়ে কথা আগেই বলা হয়ে গেছে,’ বারিশ অত্যন্ত নির্বিকার।
​—‘যেটা পারি না, সেটা কীভাবে করব আমি?’ এবার সত্যি সত্যিই অসহায় শোনালো ঝিলমিলের স্বর।
—‘অকাজ তো ঠিকই পারো! কথা কম বলে দ্রুত কাজ করো।’
​রাগে-ক্ষোভে ভেতরে ভেতরে ফুসতে ফুসতে ঝিলমিল বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। ইচ্ছে করে সজোরে একটা আছাড় মেরে ওয়াশরুমের দরজাটা লাগিয়ে দিল সে। ​বারিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার ভেজা চুলগুলো এলোমেলোভাবে কপালে ছড়িয়ে আছে। দু’হাত দিয়ে চুলগুলো দু’ভাগে ভাগ করে দু’পাশে সরিয়ে দিল সে। নাকটা এখনো বেশ বাজেভাবে লাল হয়ে আছে। অসভ্য মেয়েটা! আরেকটু হলে আজ নাকের হাড়টাই ভেঙে গুড়ো করে দিত!
​সোফা থেকে একটা স্লিভলেস টি-শার্ট টেনে নিয়ে গায়ে চড়ালো সে, আর তোয়ালেটা ছেড়ে পরে নিল একটা ট্রাউজার। হঠাৎ ওয়াশরুমের ভেতর থেকে ভেসে এল ঝিলমিলের আকাশ-বাতাস কাঁপানো তীব্র চিৎকার! ​তড়িৎ বেগে দরজার কাছে ছুটে গেল বারিশ। দরজায় সজোরে থাপ্পড় মেরে উদ্বেগ নিয়ে বলল

—‘কী হয়েছে? চি’ৎকার করছ কেন?’
​ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ নেই। বারিশ আবার দরজায় ভারী টোকা দিল,
—‘ঝিলমিল! দরজা খোলো!’
​এবারও কোনো জবাব না পেয়ে বারিশ দরজায় শোল্ডার চার্জ করতে যাবে, ঠিক তখনই খট করে খুলে গেল দরজাটা। ​ভেতরের দৃশ্য দেখে বারিশের হাঁ হয়ে যাওয়ার জোগাড়!
​ঝিলমিল ভেতরে দাড়িয়ে আছে। তার বাঁ হাতের একদম দুটো আঙুলের ডগা দিয়ে ঝুলিয়ে ধরে আছে বারিশের Calvin Klein ব্র্যান্ডের আন্ডারপ্যান্ট! ​মেয়েটা সেটার দিকে তাকিয়ে থেকেই ধরা গলায় বলল,
—‘এসব করার জন্য বিয়ে করেছিলাম আমি? আপনার এসব ধোয়ার জন্য?’
​বারিশ এক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে ঝিলমিলের কায়দা আর তার হাতের ঝুলন্ত পোশাকটির দিকে তাকাল। সে ভেবেছিল ভেতরে বুঝি কোনো বড়সড় অঘটন ঘটে গেছে! সে ধীরেসুস্থে হাত বাড়িয়ে ওয়াশরুমের দরজাটা আবার বাইরে থেকে ঠাস করে লক করে দিল!
ঠাস করে মুখের ওপর ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ঝিলমিল কয়েক সেকেন্ড পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।

​—‘অসভ্য! হিংস্র! পাষাণ একটা!’
​ঘৃণায় হাতে ধরে রাখা Calvin Klein-র সেই জিনিসটা সাথে সাথে লন্ড্রি বাকেটের ভেতর ছুড়ে ফেলে দিল সে। রাগে সারা শরীর রি রি করছে তার। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল। চেহারাটা একদম লাল হয়ে আছে। এই লোকটা তাকে দিয়ে কেন এসব করাচ্ছে?
​ওয়াশরুমের বেসিনের পাশে রাখা ডিটারজেন্ট আর ফ্যাব্রিক সফটনারের বোতলগুলোর দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত ভাবল ঝিলমিল। সে তো জীবনে নিজের জামাকাপড়ও কোনোদিন নিজে কাঁচেনি, আর আজ তাকে এই জ’ল্লাদের কাপড় ধুতে হচ্ছে!
​শুরু হলো ঝিলমিলের ওয়াশরুম অভিযানের প্রথম অধ্যায়। চুল গুলো একপাশে নিয়ে, বালতিতে পানি ছেড়ে বারিশের প্যান্ট, শার্ট, টি-শার্ট আর বাকি কাপড়গুলো চুবিয়ে দিল। এখানে আজকের পড়া পোশাক আর কিছু আগেরই জমা ছিল। ডিটারজেন্টের কৌটোটা ধরে কোনো মাপজোখ ছাড়াই একগাদা পাউডার ঢেলে দিল বালতির পানিতে। মুহূর্তের মধ্যে ফেনার পাহাড় তৈরি হয়ে গেল!

​—‘নাক ভেঙে দেওয়া উচিত হয়নি, একবারে মাথাটাই ফাটিয়ে দেওয়া উচিত ছিল!’ ফেনার মধ্যে কাপড় চুবিয়ে চুবিয়ে আছাড় মারতে মারতে বিড়বিড় করতে লাগল ঝিলমিল।
​বারিশের এক-একটা প্যান্ট-শার্ট ডলে ডলে সাবান মাখছে আর মনে মনে সেগুলোকে বারিশের ওপরের রাগ ভেবেই সমস্ত শক্তি দিয়ে আছাড় মারছে। ​পানি আর ডিটারজেন্টে পুরো ওয়াশরুমের টাইলস একদম পিচ্ছিল হয়ে গেছে। ভারী জিন্সের প্যান্টটা নিঙড়াতে গিয়ে পা পিছলে একচোট পড়তে গিয়েও কোনোমতে বেসিন ধরে নিজেকে সামলাল ঝিলমিল। পড়লে নিশ্চিত এই বয়সে কোমর যাবে তার। ​পায়ের পাতায় ফেনা লেগে বিশ্রী অবস্থা। ভেজা আর ভারী প্যান্টটা প্যাঁচ দিয়ে পানি ঝরাতে গিয়ে ঝিলমিলের হাতের আঙুলগুলো ব্যথায় নীল হওয়ার জোগাড়! একটা প্যান্ট আর শার্ট নিঙড়াতেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে বাকিগুলো ধুবে কীভাবে?
​হাত দুটো ঘষে লাল হয়ে গেছে। কপালে জমে উঠেছে ছোট্ট ছোট্ট ঘামের বিন্দু। শেষমেশ কোনোমতে ধোয়া কাপড়গুলো এক এক করে তোয়ালে রাখার হ্যাঙ্গারে আর শাওয়ারের স্ট্যান্ডের ওপর ঝুলিয়ে দিল। পুরো ওয়াশরুম এখন ফেনার বন্যায় ভাসছে, আর বারিশের ভিজে চপচপ করা প্যান্ট-শার্ট থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে নিচে।
​দরজার লক খুলে একহাতে কোমর ধরে ধুঁকতে ধুঁকতে বাইরে বেরিয়ে এলো ঝিলমিল। চুলগুলো জট পেকে কপালে লেপ্টে আছে, জামার সামনের অংশও ভেজা। ​সামনে সোফায় ল্যাপটপ কোলে বসে থাকা বারিশের দিকে খুনে চোখে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করে বলল,

—‘ হয়েছে। শেষ ধোয়া।’
​ঝিলমিলের কথা শুনে সোফায় বসে থাকা বারিশ ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে তাকাল। ঝিলমিলের ভিজে যাওয়া জামা, উস্কোখুস্কো চুল আর রাগে ফুঁসতে থাকা চেহারার দিকে এক নজর তাকিয়ে ধীরপায়ে উঠে ওয়াশরুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। ​ভেতরের ফেনার বন্যা আর শাওয়ারের স্ট্যান্ড থেকে টপটপ করে পানি ঝরার করুণ দৃশ্য দেখে বারিশের কপাল কুঁচকে এলো। ​সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
—‘বাথরুমে কি বাতাস বয়? নাকি ওখানে মাঝরাতে রোদ উঠবে?’
​ঝিলমিল এক মুহূর্ত হা করে তাকিয়ে রইল।
​—‘মানে?’
​​—‘মানে হলো, বন্ধ বাথরুমে এভাবে জগাখিচুড়ি করে ঝুলিয়ে রাখলে কাপড় শুকানো তো দূরের কথা, কাল সকালে এগুলো থেকে পচা ড্রেনের গন্ধ বের হবে। এতটুকু সাধারণ জ্ঞানও কি তোমার মাথায় নেই?’
—‘ কী করব এগুলো এখন?’
—‘ ছাদে গিয়ে মেলে দিয়ে আসবে।’
—‘ আপনি মেলো দিয়ে আসুন। এখন তো আবার রান্না করতে হবে।’
—‘ পারব না।’

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১২

ঝিলমিল থম মেরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল স্বামীর দিকে। জানত বলে লাভ হবে না। সে নিজেই কাপড় গুলো নিয়ে বের হয়ে গেল রুম থেকে। এদিকে কাপড়ের পানিতে পুরো ফ্লোর ভেসে গেছে। ফিরে আসুক এগুলোও বারিশ ওকে দিয়েই মোছাবে।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here