শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩১
আয়েশা শেখ
ঝিলমিল আর মেহরাজ দুজনকেই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। একপাশের কেবিনে মেহরাজ। পরিস্থিতি মারাত্মক তার। জরুরি বিভাগে নিয়ে আসার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকেরা জানান–তীব্র মানসিক আঘাতে তার ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।
তাকে সিসিইউতে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে, কিন্তু ইসিজি মেশিনের একঘেয়ে ‘বীপ’ শব্দ ছাড়া মেহরাজের শরীরে আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। ছোট বেলার বন্ধু তার! সেই ছোট্ট বেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছে। সেই বন্ধুর এমন খবর কীভাবে মেনে নেবে সে?
অন্যপাশের কেবিনে স্যালাইন দিয়ে বেডে অচেতন অবস্থায় শুইয়ে রাখা হয়েছে ঝিলমিলকে। ধস্তাধস্তি আর শাড়ির কুঁচিতে হোঁচট খেয়ে হাঁটু ও কনুইয়ে পাওয়া র”ক্তের দাগগুলো ব্যান্ডেজে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তবে তার চেতনার জগত তখনো অন্ধকারে ডুবে।
এই ম”র্মান্তিক বি”পর্যয়ের আঁচ আছড়ে পড়েছে শেহরিয়ার ভিলায়ও। বারিশের প্লেন ক্র্যাশ করার খবরটা পাওয়া মাত্রই চঞ্চল শেহরিয়ারও হার্ট অ্যাটাক করেন। তাঁর অবস্থাও ভালো না। ঝর্ণা বেগম বড় ছেলে ফরহাদকে নিয়ে এখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিভিল অ্যাভিয়েশন ও এয়ারলাইন্সের ভিআইপি লাউঞ্জে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়াদৌড়ি করছেন। ক্যানাডিয়ান এম্বাসি, এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ আর উদ্ধারকারী দলের কর্মকর্তাদের সাথে ঘন ঘন কথা বলছেন তারা। বিআর-৪০২ ফ্লাইটের অফিশিয়াল কন্টাক্ট ডেস্ক থেকে দু”র্ঘটনার সবশেষ আপডেট জানা, যাত্রীদের শনাক্তকরণ তালিকা নিশ্চিত করা এবং বারিশের ম”রদেহ অন্তত দেশে ফিরিয়ে আনার যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া মেটাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ওপাশ থেকে জানানো হয় আ”গুনে বিমান সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হওয়ায় ডিএনএ টেস্ট ছাড়া বডি শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
হাসপাতালের কেবিনের বাইরে বেঞ্চে বসে একমনে তসবি গুনে চলেছেন নূরজাহান চৌধুরী। নিজের বড় ছেলের এমন জেদ আর হঠৎ সিদ্ধান্তের কারণে দুটি পরিবার আজ এভাবে তছনছ হয়ে গেল। নিজেদের পারিবারিক ব্যবসা রক্ষা করার খাতিরেই আলতাফ চৌধুরীর এসব অন্যায়ে বাধা দিতে পারেননি তিনি। ব্যবসার মূল কাগজপত্রগুলো আলতাফ নিজের জিম্মায় রেখে একপ্রকার ব্ল্যাকমেইল করেছিল তাকে! একে তো ছেলের এমন স্বেচ্ছাচারিতা, তার ওপর নাতনির ওপরেও এক ধরনের গোপন রাগ তাকে নিশ্চুপ করে রেখেছিল। নূরজাহান নিজেও চেয়েছিলেন ঝিলমিল সম্পর্কের গুরুত্বটা অনুধাবন করতে শিখুক। কিন্তু ভাগ্য যে এভাবে উল্টোদিকে ঘুরে যাবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি!
তাঁর পাশেই বসে আছে দীঘি। আর মেহরাজের কেবিনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ইরান। ফাহিমের পরিবার পরিস্থিতি দেখে সরে পড়লেও ফাহিম এখনো হাসপাতালেই আছে। খবর পেয়ে চলে এসেছে রেহানও। নাজমা বেগম আর আলতাফ চৌধুরী ঝিলমিলের কেবিনের ভেতরে বসে আছেন। যতক্ষণ না জ্ঞান ফিরছে, এভাবেই প্রহর গুনতে হবে সকলের।
করিডোরের নিস্তব্ধতা চিরে পায়ের আওয়াজ ভেসে আসতেই দীঘি মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে তাহসিন হেঁটে আসছে। তাকে সামনে দেখে নূরজাহান চৌধুরী জিজ্ঞাসা করলেন,
— কতটুকু খোঁজ নিতে পেরেছ?
তাহসিন মাথা নিচু করে থমথমে গলায় জবাব দিল,
— খোঁজ নেওয়ার কিছু নেই… সেখানে বারিশ ছিলই।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নূরজাহান চৌধুরী।
— হায় আল্লাহ! ছেলেটার কপালে শেষমেশ এই ছিল!
দীঘি বলল,
— শান্ত হও মা। বডি তো শনাক্ত হয়নি… এত চিন্তার কিছু নেই।
তাহসিন সাথে সাথে নির্বিকার অথচ কঠোর গলায় তাচ্ছিল্য ছুড়ে দিল,
— বডি শনাক্ত হওয়ার অবস্থায় থাকলে তো শনাক্ত করবে!
কথাটা শুনে দীঘি বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। তাহসিনের যেকোনো ভালো কথাও ইদানীং তার কানে বি”ষের মতো লাগে।
তাহসিনও আর দীঘির দিকে না তাকিয়ে চোখ ফেরাল ইরানের দিকে। মেয়েটি এখনো মেহরাজের কেবিনের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইরান এখনো বাড়ি ফেরেনি দেখে তাহসিনের কপালে স্পষ্ট বিরক্তির রেখা ফুটে উঠল। সে যে মেয়েটিকে এখানে দেখে বিন্দুমাত্র খুশি হয়নি, তা তার চেহারায় স্পষ্ট।
এমন সময় রেহান বাইরে থেকে কিছু ভারী খাবার কিনে আনিয়ে দীঘির সামনে ধরে বলল,
— বেইবি, অনেকক্ষণ ধরে না খেয়ে আছো। এটা খেয়ে নাও তো।
— আমার ক্ষিদে নেই, তুমি খাও।
রেহান শুনল না। দীঘির একদম গা ঘেঁষে পাশে গিয়ে বসে খাবার খাওয়ার জন্য জোড়াজোড়ি শুরু করে। নূরজাহান চৌধুরী আসন ছেড়ে নিঃশব্দে উঠে অন্যদিকে চলে গেলেন। দীঘির পরনে লেডিস শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। শার্টের ওপরের বোতামগুলো প্রয়োজনের চেয়েও খানিকটা বেশি খোলা। সামান্য নড়চড় হলেই যেন অপ্রীতিকর দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠার উপক্রম।
তাহসিন নির্বাক চোখে দীঘি আর রেহানের এই ঘনিষ্ঠতা দেখছিল।
ইরান এসে বেঞ্চে বসতেই রেহান সৌজন্য দেখিয়ে এক পিস খাবার তার দিকে বাড়িয়ে দিল,
— নিন, আপনিও খান।
ইরান প্রথমে একটু দ্বিধা করলেও রেহানের জোড়াজোড়িতে হাত বাড়াল। কিন্তু খাবারে তার আঙুলের স্পর্শ লাগার আগেই তাহসিন গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
— আপনার এখন বাসায় ফেরা উচিত। অনেক রাত হয়েছে।
ইরান চমকে উঠে তাকাল তাহসিনের দিকে। চোখে বিরক্তি ফুটিয়ে বলল,
— প্রয়োজন হলে আমি নিজেই বাসায় ফিরব, আপনাকে বলতে হবে না।
— আমার মনে হয় এখনই প্রয়োজন।
— না, বাসায় এমন কোনো জরুরি কাজ নেই যে এখনই ফিরতে হবে।
— ‘সত্যিই নেই?’
তাহসিনের গলার স্বর আর দৃষ্টি দুটোই খুব গভীর।
ইরান কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল, কোনো কথা খুঁজে পেল না। তাহসিন আবারও শীতল কণ্ঠে বলল,
— চলুন, আমি পৌঁছে দিয়ে আসি।
— না! আমি এখান থেকে কোথাও যাব না। আমার ফ্রেন্ড অসুস্থ, আমি এখানেই থাকব।
— ‘ওর বাড়ি ফেরা নিয়ে তোমার এত মাথাব্যথা কেন, তাহসিন?’
চোখ বাঁকিয়ে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে বলল দীঘি।
— থাকতেই পারে।
— না, থাকতে পারে না! তুমি আমার মায়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট। তোমার কাজ অফিসের বিষয়গুলো সামলানো, কাউকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া নয়।
তাহসিন চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে রইল দীঘির দিকে। নিচু অথচ অটল গলায় বলল,
— প্রয়োজন যদি নিজের জন্য হয়, তবে আমায় সেটাও করতে হবে।
দীঘি ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
— মানে?
তার কথার কোনো ব্যাখ্যা দিল না তাহসিন। কেবল অদ্ভুত দৃষ্টিতে ইরানের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই চাহনির অর্থ যেন ইরান ঠিকই বুঝতে পেরেছে। চুপচাপ বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দীঘির দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
— আপনাদের ড্রাইভারকে একটু বলুন না আমায় যেন ড্রপ করে আসে…
ইরান যে তাহসিনের সাথে যেতে চায় না তা স্পষ্ট বোঝা গেল। দীঘি আলসেমি ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— তুমি নিচে গিয়ে ড্রাইভারকে আমার কথা বলো, সে দিয়ে আসবে।
ইরান মাথা নেড়ে হাঁটা ধরে। যাওয়ার আগে একবার মেহরাজের কেবিনের কাচের ফাঁক দিয়ে ভেতরে চোখ বুলিয়ে গেল সে। এই দুর্বল হার্ট নিয়ে ছেলেটা আবার তার সাথে কারণে-অকারণে এত ঝগড়া করে!
রেহানের উপর বিরক্ত হয়ে দীঘি এবার উঠে ওয়াশরুমের দিকে গেল। বারিশের জন্য তারও খারাপ লাগছে। তারওপর নিজের ভাই আর ভাইজির এই অবস্থা।
দীঘি৷ উঠে চলে যাওয়ায় রেহান খাবার গুলে তাহসিনের দিকে দিল। বলল,
— আপনি খেতে পারেন।
— ‘তুমিই খাও, ওনাকে সাথে নিয়ে খাও।’
তাহসিন হাত উঠিয়ে ফাহিমকে দেখাল। যে এখন ঝিলমিলের জ্ঞান ফেরার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। রেহান সেটাই করল। উঠে গিয়ে ফাহিমকে খাবার খাওয়ার জন্য জোড়াজোড়ি করতে লাগল।
রেহান আর কথা না বাড়িয়ে খাবারের প্যাকেট হাতে তুলে নিয়ে ফাহিমের দিকে এগোল এবং তাকে খাওয়ার জন্য জেড়াজোড়ি শুরু করে দিল।
ওয়াশরুমে এসে দীঘি বেসিনের কলটা ছেড়ে দিয়ে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল মুখে-চোখে। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানিতে ভিজে উঠল ঘাড়, গলা এবং শার্টের ওপরের অংশটা। আয়নায় ভেসে ওঠা নিজের ভেজা মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। মগজের ভেতর কিছুতেই একটা হিসেব মিলছে না। তাহসিন কেন ইরানকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য অত ব্যস্ত হয়ে পড়ল? বিষয়টা কি খুব সাধারণ? দীঘির মন তো তা বলছে না। ঝিলমিল হলে হয়তো একে তাহসিনের অতিরিক্ত দায়িত্বশীলতা ভেবে উড়িয়ে দিত, কিন্তু দীঘি তো এত স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছে না। ওদের মধ্যে কি আগে থেকেই পরিচয় আছে? তা না হলে সম্পূর্ণ অচেনা একটা মেয়ের ওপর তাহসিনের এমন পরোক্ষ অধিকার খাটানো কীভাবে সম্ভব? আর তাহসিন সামান্য একটা কথা বলতেই কেন বাধ্য মেয়ের মতো চলে গেল মেয়েটা?
মাথা ঝিনঝিন করছে তার, ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার জন্য দরজা খুলল দীঘি। কিন্তু বের হওয়া তো দূরের কথা, মুহূর্তে কেউ একজন হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে দীঘিকে ভেতরের দিকে ঠেলে দিয়ে এক ঝটকায় দরজাটা আটকে দিল।
— তুমি এখানে?
সামান্য বিস্ময় দীঘির কন্ঠে। তাহসিন কোনো কথা বলল না। তার গভীর শীতল চোখ জোড়া দীঘির ভেজা মুখের ওপর থেকে নেমে এলো ভেজা উন্মুক্ত গলায়। সেখান থেকে দৃষ্টি আরও খানিকটা নিচে নেমে স্থির হলো শার্টের ফাঁকে অনাবৃত থাকা ত্বকের ওপর। তাহসিনের চাহনি কেমন কঠোর হয়ে উঠল। স্বচ্ছ হালকা নীল চোখের মনি দুটো যেন শান্ত সমুদ্রের নিচে থমথম করতে থাকা কোনো গোপন আগ্নেয়গিরি। বিদ্রুপ ফুটিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,
— শার্টের বাকি বোতামগুলোও খুলে ফেলুন ম্যাম, দেখতে আরও আকর্ষনীয় লাগবে।
তাহসিনের তির্যক মন্তব্যে গায়ে যেন আ”গুন ধরে গেল দীঘির। পাল্টা হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
— মুখ সামলে কথা বলো! আমার পোশাক আমি কীভাবে পরব সেটা নিয়ে জ্ঞান দেওয়ার তুমি কে? লিমিট ক্রস করবে না একদম!
— কী করবেন লিমিট ক্রস করলে?
দীঘি তাহসিনের শার্ট দু’হাতে খামচে ধরল। তাহসিন বাঁকা হেসে বলল,
— আমি আপনাকে এভাবে ধরলে ছুটতে পারবেন তো? ভুলে যাবেন না, আপনি একজন মেয়ে আর আমি একজন পুরুষ। তারওপর আমরা এখন ওয়াশরুমে।
দীঘির চোখেও তাচ্ছিল্য ফুটে ওঠে।
— অবশ্য তোমার থেকে এগুলো আশা করাই যায়। জা”রজ সন্তানের জন্ম দিয়ে রেখেছ না?
তাহসিন কোনো উত্তর দিল না। পাথরের মতো কেবল চেয়ে রইল তার দিকে। দীঘিও কিছুক্ষণ সেভাবে থমকে থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য সরে আসতে চাইল। কিন্তু তাহসিন আচমকা বিদ্যুৎবেগে তার বাহু চেপে ধরে বেসিনের সঙ্গে আটকে দিল। তারপর দু’হাতে দীঘির শার্টের উন্মুক্ত বোতামগুলো একে একে বন্ধ করে দিতে লাগল।
হঠাৎ এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে কিছুক্ষণের জন্য জমে গেল তরুণী। শার্টের সুতোর ফাঁকে তাহসিনের আঙুলের ঠাণ্ডা ছোঁয়ায় শরীরে অদ্ভুত এক কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ল, হাতের আঙুলগুলো একেবারে অবশ লেগে উঠল তার।
বোতাম লাগানো শেষ হতেই দীঘি নিজেকে সামলে নিয়ে চড় মারার জন্য হাত উঠাল তাহসিনের গালে। কিন্তু হাতটি নিজের গাল স্পর্শ করার আগেই দীঘির কবজি চেপে ধরে থামিয়ে দেয় তাহসিন। পরক্ষণেই দুজনের মাঝখানের অবশিষ্ট দূরত্বটুকুও গুটিয়ে নেয় সে।
দীঘির কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে,
— সময় আর জায়গা বুঝে প্রতিবাদ করতে শিখুন, ম্যাম। এই চড়টা আরও অনেক আগেই মারা উচিত ছিল আপনার। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্যের অস্তিত্বে বিলীন হওয়ার আগে!
— বুঝিয়ে বলো!
দীঘির কন্ঠ কঠোর। তাহসিন তরণীর কানের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে মুখোমুখি হলো। কিছু না বলে বেড়িয়ে এলো ওয়াশরুন ছেড়ে। দীঘি বের হতেই পেছন না তাকিয়েই তাহসিন বলল,
— বোতামগুলো যেন এমনই থাকে।
— এখন কাঁদছো কেন? তুমিই তো চেয়েছিলে আমি যেন চলে যাই।
অন্ধকারে ঢাকা ধোঁয়াটে এক প্রান্তর। চারপাশে কিছুই স্পষ্ট নয়, কেবল কুয়াশার। তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পুরুষটি। কণ্ঠটা শুনেই চমকে উঠল ঝিলমিল। বুকটা কেঁপে উঠল তার। ঝাপসা কুয়াশা ঠেলে সামনে তাকাতেই দেখতে পেল সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে। বারিশ দাঁড়িয়ে আছে কয়েক হাত দূরে, সেই আগের মতোই নির্বিকার ও গম্ভীর।
ঝিলমিল ব্যাকুল হয়ে তার দিকে পা বাড়াতে চাইল, কিন্তু কোনো ভারী শৃঙ্খলে তার পা আটকে আছে। সে এগোতে পারল না। গলার ভেতর জমাট বাঁধা কষ্টগুলো ঠেলে আক্ষেপের সুর নিয়ে বলল,
— আমি কি আপনাকে ম’রে যেতে বলেছি? এদিকে আসুন…
বারিশ তার জায়গায় স্থির হয়ে রইল। চোখে মুখে সেই পরিচিত কঠোরতা।
— আসব না। তুমি আসো… তোমাকে আসতে হবে।
ঝিলমিল আবার প্রাণপণ চেষ্টা করল সামনে এগোনোর। কিন্তু পেছন থেকে তার বাবা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে তার বাহু।
— আব্বু, ছাড়ো আমাকে! উনার কাছে যেতে দাও…
আলতাফ চৌধুরীর কাছ থেকে কোনো উত্তর এলো না। তিনি শুধু নীরবে শক্ত হাতে চেপে ধরে রইলেন মেয়ের হাত। ঝিলমিল সামনে হাত বাড়িয়ে আবার ডাকল,
— আপনি এসে নিয়ে যান আমায়!
বারিশ এক পা-ও নড়ল না। ঠাণ্ডা গলায় বলল,
— তুমি তো আমায় চাও না।
— চাই…
কথাটা বলতে গিয়ে ঝিলমিলের কণ্ঠ বুজে এলো কান্নায়।
— উহু, চাও না।
বারিশের এই শান্ত প্রত্যাখ্যান সহ্য হলো না ঝিলমিলের। সে বুক চিরে যেন চিৎকার করে বলতে চাইল,
— বললাম তো চাই!
এবার সামান্য থমকাল বারিশ। তারপর ধীরে ধীরে তার দু’বাহু দু’দিকে ছড়িয়ে দিল।
— তাহলে আসো…
ঝিলমিল এবার বাবার হাতের সমস্ত শক্তিকে তুচ্ছ করে এক ঝটকায় বাঁধন ছিঁড়ে দৌড় দিল। উন্মাদিনী মতো সামনের দিকে ছুটে গেল লোকটাকে জড়িয়ে ধরার জন্য। কিন্তু ছোঁয়ার আগের মুহূর্তে বিকট শব্দে কেঁপে উঠল চতর্দিক!
মুহূর্তের মধ্যে র”ক্তে ভেসে গেল বারিশের বুক। সাদা শার্টটা লালে লাল হয়ে উঠল। ঝিলমিলের পা যেন শূন্যে জমে গেল, থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। শিউরে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখল—কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবার হাতে ধরা একটা ধোঁয়া ওঠা বন্দুক!
ঝিলমিল আর্তনাদ করে উঠে আবারও বারিশের দিকে হাত বাড়াল, কিন্তু স্পর্শ করার আগেই লোকটার শরীরটা ধীরে ধীরে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যেতে লাগল বাতাসে। শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া সেই কায়ার পিছু নিতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ঝিলমিলও ধপ করে আছড়ে পড়ল এক অতল গহ্বরে।
চোখ দুটো ঝট করে মেলে ধরল ঝিলমিল। বুকের ভেতরটা এত জোরে ধুকপুক করছে যে মনে হচ্ছে পাজর ভেঙে হৃদপিণ্ডটা বাইরে বেরিয়ে আসবে। কপালে আর চুলে জমে আছে ঠাণ্ডা ঘাম। শরীরটা তীব্র ব্যথায় অবশ হয়ে আছে।
চারপাশে তাকাল সে। সাদা দেয়াল আর স্যালাইনের চেনা গন্ধ জানান দিচ্ছে এটা একটা হাসপাতাল। মেঝেতে ধুলোমাখা অবস্থায় পড়ে আছে সে, আর তার ঠিক পাশেই উঁচু ট্রলি বেডটা। মেঝের পাশেই একটি চেয়ারে মাথা নিচু করে ঝিমাচ্ছেন আলতাফ চৌধুরী। তবে কি… ওটা স্রেফ একটা মরীচিকা ছিল? স্বপ্নের এক ভয়াবহ ছায়া? লোকটা তবে আসল না? সেই কঠোর, রাগী মানুষটা কি তবে সত্যি সত্যিই তাকে এই বিশাল পৃথিবীর মাঝে তাকে একা ফেলে না-ফেরার দেশে চলে গেছে?
ঝিলমিল উঠে দাঁড়াল। তার মা কেবিনের অন্য একটা বেডে শুয়ে আছে। বাবা মা দুজনেই ঘুমে। পড়নে এখনো কালকের শাড়িটা। এই অবস্থাতেই পা টিপে টিপে বের হলো কেবিন থেকে। কোরিডোরে ফাহিম আর রেহান দুজনেই ঝিমাচ্ছে। এছাড়া আর কেউ নেই। ঝিলমিল এভাবেই হসপিটাল থেকে বের হয়ে গেল। মধ্যরাত হওয়ায় কারও নজরে আসল না সে। বাহিরে ঝুমবৃষ্টি।
এভাবে মধ্যরাতে বৃষ্টির মধ্যে একা বের হওয়া বোকামি ছাড়া আর কিচ্ছু নয়, তবু কেন যেন মনে হলো ওই হসপিটালে বসে থাকা তার পক্ষে আর এক মুহূর্তও সম্ভব না। দৌড়ে হসপিটালের এরিয়া পার হয়ে এলো সে। কিন্তু যেদিকে এসেছে, সেই পথটা পুরোই নির্জন, খাঁ-খাঁ করছে চারপাশ। ওর গন্তব্য এয়ারপোর্টে, যেটা এখান থেকে অনেকখানি দূরে। অন্ধের মতো দৌড়াতে লাগল মেয়েটা। কীসের টানে দৌড়াচ্ছে কে জানে! ব্যাকুল মন তাকে কেবল সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় দম ফুরিয়ে আসে, পা দুটো ভারী হয়ে আর চলতে চাইল না। সহসা ক্লান্তি সহ্য করতে না পেরে নির্জন ভেজা রাস্তায় ধপ করে আছড়ে পড়ল ঝিলমিল।
নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। পরক্ষণেই উঠে দাঁড়াল। হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে, কাঁপতে থাকা শরীরটা নিয়ে সে আবারও দৌড়াতে শুরু করল।
কয়েক পা এগোতেই ভারসাম্য হারিয়ে আবারও রাস্তায় আছড়ে পড়ল সে। আর উঠতে পারল না। রাস্তায় হাঁটু মুড়ে বসে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
— অন্তত তার কাছে পৌঁছাতে দাও আল্লাহ! আমি তাকে একটাবার দেখতে চাই! একটাবার! তার নিথর শরীরটা একবার হলেও স্পর্শ করতে চাই।
ঝিলমিল আবারও উঠে দাঁড়াতে চাইল কিন্তু সম্ভব হলো না। এবার জোরেই কেঁদে উঠল,
— জীবন থেকে অস্তিত্ব মুছে ফেলার কথা বলে পৃথিবী থেকে কেন নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেললেন? আমি এখন কীভাবে থাকব? কাকে ধরে বাঁচব? এত জেদ…এত জেদ কেন আপনার? একটা বার শেষ দেখা দেখার সুযোগটুকুও কেন কেড়ে নিলেন আমার থেকে?
কথাগুলো বলতে বলতে সে আকাশের দিকে তাকাল। চোখ বেয়ে নেমে এলো অবিরাম অশ্রুধারা যা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
— ফিরিয়ে দিন তাকে, আল্লাহ… আমার সবকিছু নিয়ে নিন, তবু তাকে ফিরিয়ে দিন। শুধু একবার… একবার তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন।
হঠাৎ নির্জন নীরবতায় দূর থেকে বুটের আওয়াজ ভেসে আসছে। কেউ যেন প্রচণ্ড গতিতে দৌড়ে আসছে সামনে থেকে। ঝিলমিল চোখ তুলল না, আগের মতোই হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। বুটের শব্দটা থেমে গেল। চারপাশ আবার একদম নিস্তব্ধ। কেবল ঝিলমিলের কান্না এবং বৃষ্টির আওয়াজ আর বিলাপের শব্দ বাতাসে ভাসছে।
— জাহান!
সামনে থেকে ভেসে এলো খুব গম্ভীর একটা কণ্ঠ। মুহূর্তের মধ্যে ঝিলমিলের কান্না থেমে গেল। কণ্ঠটা তার বড় চেনা, ভীষণ চেনা! হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে সে মুখ তুলে তাকাল। ঝাপসা দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। ঠিক একটু আগের স্বপ্নে দেখা মানুষটা—পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, শার্টের ওপরের বোতাম খোলা আর চুলে এলোমেলো ভাব।
ঝিলমিল সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মাথা নেড়ে নিজেকে বোঝাতে চাইল, এটাও নিশ্চয়ই তার মনের কোনো বিভ্রম।
— সিয়েনা…
আবারও সেই একই কণ্ঠস্বর। ঝিলমিল দুই হাতে কান চেপে ধরল। বিড়বিড় করে বলল,
— না… আপনি আমার বিভ্রম। আপনি সত্যি হতে পারেন না।
— আমি এসেছি।
— আমি কাছে গেলেই মিলিয়ে যাবেন আপনি!
ওপাশ থেকে আবারও ভারী বুটের শব্দ হলো। এগিয়ে আসছে লোকটা। কিন্তু খুব কাছাকাছি আসার আগেই তাকে ধাওয়া করার মতো গিয়ে শক্ত করে ঝাপটে ধরে ফেলল ঝিলমিল। শক্ত বুকে মুখ গুঁজে হাওমাও করে কেঁদে উঠল।
— আপনি… আপনি…
কোনো শব্দ তার মুখ থেকে বের হচ্ছে না।
— আমার কিচ্ছু হয়নি।
নরম গলায় বলল বারিশ। ঝিলমিলের যেন বিশ্বাস হচ্ছে না, সে আরও শক্ত করে খামচে ধরল বারিশের পিঠ। কান্নার ধাক্কায় এখনো ওর গলা দিয়ে স্পষ্ট কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। বারিশ দু’ হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল ঝিলমিলের কোমর। বুকের ভেতর মুখ রেখেই অস্পষ্ট স্বরে বলল ঝিলমিল,
— ছেড়ে দিলেই আপনি আবার হারিয়ে যাবেন!
— আমি সত্যিই এসেছি। আমি ওই প্লেনে ছিলাম না, সিয়েনা।
তবু ঝিলমিল তাকে ছাড়ল না। তার কাছে সবকিছু এখনো একটু আগে দেখা সেই দুঃস্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছে। বারিশ এবার ঝিলমিলকে নিজের বুক থেকে সামান্য আলগা করল। দুই হাতের তালুতে কিশোরীর ভিজে যাওয়া মুখটা আগলে ধরে কপালে ও গালে পরম আদরে চুমু খেল।
— দেখো, আমি তোমায় স্পর্শ করছি। আমার সত্যি কিচ্ছু হয়নি!
ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। কাঁপাকাঁপা হাত বাড়িয়ে মানুষটার গাল স্পর্শ করল। সত্যি তো! রক্ত-মাংসের বাস্তব মানুষ একটা। আবারও কান্না ভেঙে পড়ল।
— তাহলে আপনি আমার সাথে ইচ্ছে করে এমন করলেন?
— না! আমার ওই প্লেনেই থাকার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটা কারণে আমি উঠতে পারিনি।
বারিশ যে চট্টগ্রামে বন্ধুদের সাথে বারবিকিউ পার্টি বাদ দিয়ে কীভাবে ছুটে এসেছে, তা চেপে গেল। তাহসিন কল করে জানিয়েছিল প্লেন ক্র্যাশের খবর শুনে ঝিলমিলের অবস্থা খারাপ, সে হাসপাতালে ভর্তি। খবরটা শুনেই চট্টগ্রাম থেকে ঝড়ের গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে চলে এসেছে। কিন্তু হাসপাতালের কাছাকাছি এসে গাড়িটা হঠাৎ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এতখানি পথ সে দৌড়ে আসতে থাকে। আর মাঝরাস্তায় এসেই পেয়ে যায় তার এই বোকা রাণীকে। যে কি না নির্জন রাস্তায় বসে অঝোরে কাঁদছিল।
ঝিলমিল বারিশের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে ক্ষোভ আর স্বস্তির মিশ্রণে কেঁদে উঠে বলল,
— তাহলে এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? কেন আসেননি আগে? কেন এভাবে আমাকে পোড়ালেন? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি আর নেই! চিরতরে চলে গেছেন আমাকে এই পুরো পৃথিবীতে একা ফেলে!
আকাশ বেয়ে তখনো ঝুমবৃষ্টি ঝরছে। ভিজে একাকার দুজন। বারিশ ঝিলমিলকে একটু সরিয়ে ওর আপাদমস্তক পরখ করল। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলো আর বৃষ্টির জলের ধারায় স্পষ্ট ভেসে উঠছে মেয়েটার গায়ের চোটগুলো। হাত ও পায়ে সাদা ব্যান্ডেজ পেঁচানো। কান্নায় চোখ-মুখ ফুলে একাকার! কী হালটাই না করে ফেলেছে নিজের!
মেয়েটার এই বিধ্বস্ত রূপ দেখে বারিশের নিজের ওপর রাগ হচ্ছে। এই ছোট্ট মেয়েটাকে এভাবে পোড়ানোর কোনো দরকার ছিল না তার। ঝিলমিল বারিশের বুকের শার্টের অংশ চেপে ধরে বলল,
— এই জন্যই… এই জন্যই আমি কাউকে ভালোবাসতে চাই না! ভালোবাসলেই মানুষ আমাকে ছেড়ে চলে যায়। ঠিক যেমনটা আপনি আমাকে ফেলে চলে গিয়েছেন! ভালোবাসলেই মানুষ হারিয়ে যায়।
কথাগুলো বলতে বলতে ঝিলমিলের গলা ধরে এলো। নিজের অজান্তেই, প্রথমবারের মতো সে স্বীকার করে ফেলল—সে বারিশকে ভালোবাসে।
বারিশ ঝিলমিলের থেকে নিজেকে আলগা করে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। গায়ের সাদা শার্টটা ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। পেশিবহুল ভাঁজগুলো স্পষ্ট তার। এলোমেলো চুলে বৃষ্টির জল জমে ছোট ছোট কণা তৈরি করেছে, যা গাল বেয়ে সোজা নেমে আসছে তার তীক্ষ্ণ থুতনি বেয়ে। বৃষ্টির তোড়ে তার চোখের পাতা কিছুটা বোজা। তবু ঝিলমিলের চোখের দিকে অপলক গভীর দৃষ্টি রেখে পরম গেয়ে উঠল বারিশ…
”Tumhe Main Bhul Jaaunga
Yeh Baatein Dil Mein Na Laana,
Kabhi Main Yaad Aaun Toh
Chale Aana, Chale Aana…”
ঝিলমিলের দেখা স্বপ্নের মতোই হাত দু’বাহু ছড়িয়ে দিল দু’দিকে। ঝিলমিল দৌড়ে গিয়ে আবারও আছড়ে পড়ল তার স্বামীর বুকে। বারিশও তার সর্বশক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরল স্ত্রীকে। বাহুর শক্ত বাঁধনে এই তন্বী কিশোরীকে যেন সে নিজের বুকের ভেতর সমাহিত করে নেবে একদম।
বৃষ্টির বেগ যেন আরও বেড়ে গেল। চারপাশের নিশুতি নির্জনতা, ঝুমবৃষ্টির ঝরঝর শব্দ আর ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো–সবকিছু মিলিয়ে সময়টা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে কেবল তাদের দুজনের জন্য। বারিশ ঝিলমিলের ভেজা চুলগুলো আলতো হাতে পেছনে সরিয়ে দিল। তারপর ঝিলমিলের থুতনিটা এক হাতে একটু উঁচিয়ে ধরে। ঝিলমিল বোবা দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। বৃষ্টির জল বারিশের কপালের ওপর জমা চুল বেয়ে সোজা এসে পড়ছে ঝিলমিলের ভিজে যাওয়া ঠোঁটে। সেখানে মাতাল চোখে তাকায় যুবক।
এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে ঝুঁকে এসে সোজা নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল কিশোরীর ভেজা, নরম, কাঁপা ঠোঁটে। শিহরণে চোখ বুজে ফেলে ঝিলমিল। বরফশীতল বৃষ্টির মাঝে স্বামীর ঠোঁটের ওম যেন আগ্নেয়গিরির মতো এসে আছড়ে পড়ল তার ওপর। বারিশ পরম তৃষ্ণায়, গভীর আবেগে আগলে নিল সেই নরম ঠোঁট জোড়া। ধীরে ধীরে সিক্ত ওষ্ঠের মিলন বদলে গেল এক গভীর, তৃষ্ণার্ত আসক্তিতে। বৃষ্টির জল আর মিষ্টি আস্তর লেগে থাকা সেই পিচ্ছিল ঠোঁট দুটোকে তৃষ্ণায় চুষে নিতে লাগল বারিশ। যেন পুরো দুনিয়া একদিকে, আর তাদের এই একটিমাত্র মুহূর্ত অন্যদিকে।
ঝিলমিলের দুই হাত নিজের অজান্তেই উঠে এলো বারিশের ভিজে যাওয়া ঘাড়ের ওপর। চুম্বনের মাতাল করা আসক্তি একটুও আলগা না করেই, বারিশের বাঁ হাতটা নিঃশব্দে নেমে এলো ঝিলমিলের ভিজে থাকা মেদহীন, সরু উদরে। শাড়ির অন্তরালে তলপেটে বারিশের দীর্ঘ আঙুলগুলোর স্পর্শ ঝিলমিলের পুরো শরীরে এক নিমেষে অনুরাগের উষ্ণ বিদ্যুৎ তরঙ্গ ছড়িয়ে দেয়।
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৩২
ঝুমবৃষ্টির মাঝে, শহরের এক নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে তারা দুজনে যেন হারিয়ে গেল সম্পূর্ণ এক অন্য জগতে। কিন্তু সেই মায়াময় মুহূর্তের ব্যাঘাত ঘটাল তাহসিন। গাড়ির ভেতর থেকে গলা উঁচু করে সে বলে উঠল,
— বাকিটা বাসায় গিয়ে সেরে নিয়েন, বারিশ। না হলে রোমান্সের বদলে দুজনেরই সর্দি-কাশি নিয়ে হাসপাতালে যেতে হবে!
