ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৬
মেহজাবিন নাদিয়া
আলভি দরজার হাতা ধরে এক ইঞ্চি পিছিয়ে গেল। ওর মুখের হা-টা এবার এতটাই বড় হলো যে, মনে হলো একটা আস্ত আপেল অনায়াসে ওর মুখের ভেতর ঢুকে যেতে পারে। বসের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মনে হলো, এই মানুষটা কি আদেও কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ, নাকি ওপর ওয়ালার তৈরি বিশেষ কোনো রোবট? যে নিজের হাত গুলিতে ঝাঁঝরা করে এসে হাসপাতালের বেডে বসে রসিয়ে রসিয়ে আপেল খাচ্ছে, আর এখন কিনা নিজের প্রতাপশালী বাপের আসার প্রতীক্ষায় দিন গুনছে!
”স্যার, আপনি তো মানুষ না, আপনি একখান জ্যান্ত দাবা খেলার কোট! নিজের জানের মায়া ছেড়ে এমন চাল চাললেন?আঙ্কেল যদি একবার বুঝে ফেলে এইটা আপনার নিজের সাজানো নাটক, তাহলে কিন্তু আমার কপালে জেলের ভাত নিশ্চিত!”
সারিম একটা বাঁকা হাসি দিল। সেই হাসিতে কোনো চপলতা ছিল না, ছিল এক মস্ত বড় শিকারির আত্মবিশ্বাস। সে শান্ত গলায় বলল,
“আলভি, তুমি রাজনীতি বোঝো না, আর আরিশান মৃধাকেও চেনো না। ওনার নিজের চেয়ারটার চেয়ে ওনার রক্তের অহংকার অনেক বেশি।এই নিউজের পাঁচ মিনিটের মাথায় ওনার পার্সোনাল হেলিকপ্টার ঢাকার রানওয়ে ছেড়েছে। এতক্ষণে হয়তো রাজশাহী বিমানঘাঁটিতে ল্যান্ডও করে গেছে। যাও, বাইরে গিয়ে ওনার এন্ট্রিটা দেখে এসো।”
আলভি আর কথা বাড়াল না। বসের এই দূরদর্শিতার সামনে ও নিজেকে স্রেফ একটা চুনোপুঁটি মনে করল। ও কেবিনের দরজা খুলে করিডোরে পা রাখতেই পুরো হাসপাতালের পরিবেশটা থমথমে অনুভব করল। করিডোরের দুই পাশে সারি সারি স্পেশাল ফোর্স, এনএসআই আর ডিবি পুলিশের পোশাকধারী অফিসাররা একদম কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সরা ভয়ে টু শব্দ পর্যন্ত করছে না।
ঠিক তখনই করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে ভারী বুটের এক চাবুকের মতো শব্দ শোনা গেল। আলভি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল, করিডোরের নিয়ন লাইটের আলো আধো-অন্ধকারে এক বিশাল ও সুঠাম অবয়ব অত্যন্ত দ্রুত ও দৃঢ় পায়ে এগিয়ে আসছে। পরনে ওনার সেই ধবধবে সাদা কটন শার্ট, যার হাতা দুটো খুব নিখুঁতভাবে কনুই পর্যন্ত গোটানো। ওনার চওড়া কাঁধ আর নিখুঁত ছাঁটা দাড়ির রুপোলি আভা হাসপাতালের করিডোরেও এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলেছে। ওনার পেছনে ওনার পার্সোনাল বডিগার্ড ফোর্সের প্রায় আট-দশজন অফিসার প্রায় দৌড়ে আসছে, ওনার গতি সামলাতে। ওনি আর কেউ নন, স্বয়ং আরিশান মৃধা!মুখের অবয়বটা তখন পাথরের চেয়েও শক্ত ছিল ওনার, চোখের মনিতে এক তীব্র, শান্ত তুফান জ্বলজ্বল করছে। নিজের একমাত্র ছেলের ওপর হামলা হয়েছে, এই খবর শোনার পর ওনার ভেতরের পিতা এবং প্রশাসক—দুটোই যেন এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।
আলভি ওনাকে দেখা মাত্রই করিডোরের দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে রইল, নিজের দুই ভাঁজ করে মাথা নিচু করে ফেলল।মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগল,
“ইয়া আল্লাহ্,সরাস্ট মন্ত্রী এসে গেছেন! এখন যদি ওনি জানতে পারেন ওনার ছেলের বাহুতে আমি নিজের হাতে গুলি করছি, তবে ওনি আমারে এই হাসপাতালের ছাদ থেইকা ডাইরেক্ট নিচে ফালায়া দিব!”
আরিশান মৃধা আলভির দিকে এক পলকও তাকালেন না। ওনার সেই তীব্র ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়ল ৪০৬ নম্বর ভিআইপি কেবিনের দরজার ওপর। ওনি এক ঝটকায় দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন।
ভেতরে সারিম তখনো অত্যন্ত আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে ছিল। দরজার শব্দ হতেই ও খুব দ্রুত ওর মোবাইলটা বালিশের নিচে গুঁজে দিল এবং মুখের সেই চতুর হাসিটা এক সেকেন্ডে মুছে ফেলে এক চরম অসুস্থ, ক্লান্ত ও ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া ভেক ধারণ করল।যেন এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ এবং ভুক্তভোগী ছেলে, যে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আজ প্রায় মরতে মরতে বেঁচে গেছে!
আরিশান মৃধা কেবিনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। ওনার সেই বিশাল অবয়বটা বেডের সামনে এসে দাঁড়াতেই পুরো ঘরের বাতাস যেন আরও কিছুটা ভারী হয়ে গেল। ওনি ছেলের সেই ব্যান্ডেজ করা ডান হাতটার দিকে তাকালেন, যেখানে এখনো হালকা লাল রক্তের দাগ লেগে আছে। ওনার ফর্সা কপালটা মুহূর্তের মধ্যে রাগে আর উদ্বেগে লাল হয়ে উঠল। কিন্তু ওনি নিজের ভেতরের সেই পিতৃত্বের দুর্বলতাকে বাইরে প্রকাশ পেতে দিলেন না। ওনার গলার স্বর বরাবরের মতোই গম্ভীর ও গম্ভীর শোনাল।
”কেমন আছো?” আরিশান মৃধা জিজ্ঞেস করলেন। ওনার চোখ জোড়া তখন সারিমের মুখের প্রতিটি রেখাকে মেপে নিচ্ছিল।
সারিম একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বাম হাত দিয়ে ওর কপালটা চেপে ধরল। অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
“বেঁচে আছি, এটাই অনেক। তোমার দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যা, তাতে মাঝরাতে নিজের শোবার ঘরেও মানুষ নিরাপদ নয়। আজ যদি আমার গার্ডরা সময়মতো ফায়ার না করত, তবে হয়তো নিজের একমাত্র ছেলের লাশ ঢাকা যেত।”
আরিশান মৃধা সোফার সামনে থেকে একটা কাঠের চেয়ার টেনে সারিমের বেডের একদম মুখোমুখি বসলেন। ওনার ডান হাতের আঙুলগুলো চেয়ারের হাতলে এক নির্দিষ্ট ছন্দে মৃদু শব্দ করতছে যা ওনি বেশি চিন্তিত থাকলে করে থাকেন। ওনি ওনার চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে নিয়ে অত্যন্ত শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,
“রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার আর আইজিপি অলরেডি স্পট ভিজিট করেছে। পুরো এলাকা কর্ডন করা। সতেরো রাউন্ড ফাঁকা গুলির খোসা পাওয়া গেছে তোমার ড্রয়িংরুমে। কিন্তু একটা জিনিস আমার মাথায় ঢুকছে না, সারিম।”
”কী?” সারিম চোখ আড় করে তাকাল।মনে মনে একটু সজাগ হলো। ও খুব ভালো করেই জানে,বাবার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়।
”সন্ত্রাসীরা তোমার ঘরে ঢুকল, এত ভাঙচুর করল, অথচ তোমার সিকিউরিটি প্রোটোকলের একজন গার্ডের গায়েও একটা আঁচড় লাগল না। শুধু তোমার ডান বাহুর একটা নির্দিষ্ট মাংসপেশি ঘেঁষে গুলিটা বেরিয়ে গেল। নিশানাটা বড্ড বেশি নিখুঁত ছিল না?”
আরিশান মৃধা ওনার গভীর চোখ দুটো দিয়ে সারিমের চোখের মনিতে তাকালেন, যেন ওনার ভেতরের সেই কড়া প্রশাসক ছেলের মনের ভেতরের চক্রান্তটাকে একদম উপড়ে নিয়ে আসতে চাচ্ছেন।সারিম মনে মনে একটু ভড়কে গেলেও বাইরে ওর মুখের চামড়া বিন্দুমাত্র নড়ল না।মনে মনে হাসল—ওর মনোভাব যে কতটা জাওড়া, তা ওর এই বাপ সামান্যতমও আজ আঁচ করতে পারবে না।সারিম নিজের দুর্বল ভেকটা আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত তিক্ত গলায় বলল,
“তুমি কি এখন আমার ক্ষতের ওপরেও তোমার গোয়েন্দা রিপোর্ট তৈরি করবে, বাবা? আমি এখানে যন্ত্রণায় মরছি, আর তুমি ওটাকে ‘নিখুঁত নিশানা’ বলে বিদ্রূপ করছো?তোমার ক্ষমতার বেড়াজাল কি তোমার ভেতরের বাবাকে পুরোপুরি মেরে ফেলেছে?”
ছেলের এই তীরের মতো কথা শুনে আরিশান মৃধা এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলেন। ওনার চওড়া বুকটা এক গভীর দীর্ঘশ্বাসে ওঠানামা করল। ওনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার সাদা শার্টের কলারটা ওনার ভেতরের চাপা ক্ষোভে কিছুটা কাঁপছিল। ওনি উইন্ডোর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে বাইরের রাতের অন্ধকারের দিকে তাকালেন। অত্যন্ত ধীর লয়ে বললেন,
“তোমার এই ক্ষোভ আজ নতুন নয়, সারিম। পাঁচ বছর ধরে তুমি এই ক্ষোভ নিজের বুকে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছ। কিন্তু মনে রাখবে, আরিশান মৃধা তার ছেলের সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করে না।রাজশাহী শহর তোমার জন্য আর নিরাপদ নয়। তুমি কাল সকালের মধ্যেই আমার সাথে ঢাকা ফিরছ। মৃধা নিবাসেই তোমার বাকি ট্রিটমেন্ট হবে।”
বাবার কথা শুনে সারিম মনে মনে এক চিলতে বিজয়ের উল্লাসে নেচে উঠল! ওর মনের ভেতরের সেই রোমিও তখন খুশিতে ডিগবাজি খাচ্ছিল।মনে মনে ভাবছিল,
“ঢাকা! মৃধা নিবাস! তার মানে আমি রোজ রোজ আমার চন্দ্রিমাকে দেখতে পাব! ওর ওই দুগ্ধশুভ্র ত্বকের মায়া, ওই বাদামী সিল্কি চুলের সুবাস… প্রতিদিন সকালে ওর মিষ্টি মুখটা দেখে আমার দিন শুরু হবে। বেশিদিন লাগবে না, খুব কাছাকাছি থেকে ওকে নিজের প্রেমের সাগরে এমনভাবে ডুবিয়ে দেব যে, ও নিজেই আমার বুকে এসে ধরা দেবে! ও শুধু আমার, আমার অন্ধকার আকাশের শত তারার মাঝে সে এক মাএ আলোর উৎস, আমার একান্ত ব্যাক্তিগত চন্দ্রিমা।”
কিন্তু বাইরে সারিম ওর মুখের অভিব্যক্তিকে একদম পাথরের মতো শক্ত করে ফেলল। ও একরাশ অবজ্ঞা আর জেদ নিয়ে বলল,
“আমি ঢাকা যাব না। মৃধা নিবাসে পা রাখার চেয়ে আমার এই হাসপাতালে মরে যাওয়া অনেক ভালো। পাঁচ বছর আগে যে বাড়িকে আমি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক স্পট মনে করে বের হয়ে এসেছিলাম, সেখানে আমি আর কোনোদিন ফিরে যাব না। তুমি তোমার ক্ষমতা আর ঘরের সেই ‘উটকো ঝামেলা’কে নিয়েই থাকো।”
আরিশান মৃধা ঝটকা মেরে ঘুরে দাঁড়ালেন। ওনার চোখের মনিতে এবার তীব্র রাগ আর কঠোর রূপ ধারণ করল। ওনি সারিমের বেডের একদম কাছে এসে নিচু ও বজ্রকঠিন কণ্ঠে বললেন,
“তুমি যাবে কি যাবে না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমি তোমাকে দিইনি, সারিম। তুমি এখন দেশের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী। তোমার ওপর হামলা মানে পুরো সরকারের ভাবমূর্তির ওপর আঘাত। আগামীকাল সকালে তোমাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবো। এটা আমার শেষ কথা। আর তুমি যাকে ‘উটকো ঝামেলা’ বলছ, সে এখন আঠারো বছরের এক প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী। ও আমার ঘরের সম্মান, আমার মেয়ে। ওর প্রতি তোমার এই অবজ্ঞা আমি আর বরদাশত করব না, আর এমনিতেও তোমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। তুমি নিজেই ওকে তোমার পিএ সাহায্যে ডিভোর্স পেপার এ সাইন করিয়ে আনছ।সো, এখানে আমি আর তোমার যাওয়া নিয়ে কোনো প্রবলেম দেখতে পারছিনা ”
সারিম দাঁতে দাঁত চেপে বালিশে মাথা এলিয়ে দিল।এমন ভান করতে লাগল যেন সে ওনার এই জোরাজুরিতে চরম বিরক্ত এবং নিরুপায় হয়ে ওনার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ও মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে অত্যন্ত কর্কশ গলায় আরিশান মৃধাকে বলল,
“ঠিক আছে, যাব। তোমার ক্ষমতার জোরের সামনে তো আমার কোনোদিন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ছিল না, আজও নেই। তবে মনে রাখবে, আমি সেখানে স্রেফ তোমার জিম্মি হয়ে যাচ্ছি, তোমার ছেলে হিসেবে নয়।”
সারিম এর কথা শুনে আরিশান মৃধা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। ওনার সাদা শার্টের হাতাটা আর একবার ঠিক করতে করতে অত্যন্ত দ্রুত ও গম্ভীর পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওনি চলে যেতেই আলভি আবার চোরের মতো ফুড়ুৎ করে ঘরের ভেতর ঢুকল এবং দরজার লকটা আটকে দিল। দরজার ওপাশে আরিশান মৃধার ভারী বুটের শব্দ মিলিয়ে যেতেই, বেডে শুয়ে থাকা সারিম এক ঝটকায় উঠে বসল। ওর মুখের সেই ব্যথার অভিনয় এক সেকেন্ডে উধাও!সারিম বাম হাত দিয়ে বালিশের নিচ থেকে মোবাইলটা বের করে আবার অত্যন্ত আনন্দের সাথে ‘ক্যান্ডি ক্রাশ’ গেম খেলতে শুরু করল।
আলভি নিজের কপালে হাত দিয়ে সোফায় বসল।আর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“স্যার! আপনি আস্ত একটা এক্টর! আপনার এই বাপ-বেটার ডায়লগ শুনে আমার মনে হইছিল আমি কোনো সিনেমার থিয়েটারে বসে আছি! কিন্তু স্যার, আপনি যে এত নাটক করে শেষমেশ ঢাকা যেতে রাজি হলেন,আপনার বলা সেই ‘উটকো ঝামেলা’র কাছেই তো আবার ফিরে যাচ্ছেন! লাভটা কী হইলো?”
সারিম আপেলের শেষ টুকরোটা মুখে পুরে দিয়ে, আলভির দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী, গভীর ও রহস্যময় হাসি হাসল। সে অত্যন্ত নিচু ও তৃপ্তির গলায় বলল,
“আলভি, তুমি স্রেফ কাগজের ডিভোর্স পেপারটা কুকুর দিয়ে চিবিয়ে খেতে দেখেছ। কিন্তু আমি সেই কাগজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আস্ত একটা চাঁদের টুকরো দেখে এসেছি। যে উটকো ঝামেলাকে আমি পাঁচ বছর ধরে এড়িয়ে চলেছি,সে আমার জীবনের destiny… ও আমার চন্দ্রিমা। এই চন্দ্রিমাকে নিজের আকাশে চিরতরে ধরে রাখার জন্যই আজ আরিশান মৃধার খাঁচায় আমার এই স্বেচ্ছায় বন্দী হওয়া। খেলা তো মাত্র শুরু হলো,এবার ইশকের ফানিয়ার জ্বলবে।”
সারিমের এই গভীর ও উন্মাদনাভরা কথা শুনে আলভি কেবিনের নিয়ন লাইটের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও বুঝতে পারল, বসের এই প্রেমের জ্বর এবার পুরো কাঁপিয়ে ছাড়বে,তবে বেচারা আলভির মনটা এটা ভেবে খারাপ হয়ে আছে যে,বস এখন আর নিজের বউকে ডিভোর্স দিচ্ছেন না, উল্টো বউয়ের কাছাকাছি থাকার জন্য এতো বড় মেলোড্রামা ক্রিয়েট করল।তার মানে এই জন্মে ঐ সুন্দরী কে বিয়ে করার ইচ্ছে আলভির সপ্নই থেকে যাবে। কত আশা ছিল বেচারা বস তালাক দিতেই মেয়েটাকে সে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে। সেসব এখন সেগুরে বালি হয়ে বসে আছে।
গোধূলির সেই মায়াবী কমলা আলো কখন যে রাতের নিবিড় অন্ধকারে রূপ নিয়েছে, তা পড়ার ঘরের চার দেওয়ালে বন্দী অরি আর জেবা টেরই পায়নি। ঘরের সিলিং ফ্যানটা তখনো একঘেয়ে সুরে ঘুরে চলেছে। পড়ার টেবিল থেকে শুরু করে খাটের ওপর পর্যন্ত বই-খাতার যে সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, তা এখন আরও কিছুটা বিস্তার লাভ করেছে। ঠিক তখনই অরির কোলের পাশে রাখা ওর ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ‘বাবা’ নামটা ভেসে উঠতেই অরি ওর হাতের হাইলাইটার পেনটা রেখে দ্রুত ফোনটা কানে নিল।
”হ্যা, বাবা বলো?তুমি কখন ফিরবে? আমরা তোমার জন্য ডিনারের অপেক্ষা করছি?” অরি খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল।
ওপার থেকে আরিশান মৃধার এক দীর্ঘ ও ভারী দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। ওনার ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন অনেক মানুষের ফিসফিসানি আর পুলিশের ওয়্যারলেসের কর্কশ আওয়াজ আসছিল। তিনি অত্যন্ত ধীর কিন্তু গম্ভীর গলায় বললেন,
“অদ্রিজা, আজ রাতে আমার বাড়ি ফেরা হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অত্যন্ত জরুরি একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, আমাকে আজ রাতেই একটা বিশেষ কাজে ঢাকার বাইরে যেতে হচ্ছে। প্রশাসন আর গোয়েন্দা বিভাগের সবাইকে নিয়ে একটা হাই-অ্যালার্ট মিটিং চলছে।”
আরিশান মৃধা ওনার একমাত্র ছেলে সারিমের ওপর হামলার খবরটা এই মুহূর্তে অরিকে জানিয়ে ওর কোমল মনে কোনো বাড়তি চাপ দিতে চাইলেন না। বিশেষ করে আগামীকাল মেয়েটার এত পরীক্ষা, এই সময়ে কোনো পারিবারিক অশান্তি বা দুর্ঘটনার খবর অরির মগজের কোষে ধাক্কা দিক, তা একজন বাবা হিসেবে ওনি কোনোভাবেই চান না।
”ওহ, আচ্ছা বাবা। দেশের পরিস্থিতি কি খুব খারাপ?” অরি একটু চিন্তিত সুরে জিজ্ঞেস করল।
”তুমি ওসব নিয়ে একদম ভাববে না, মা। দেশের পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আরিশান মৃধা এখনো বেঁচে আছে। তুমি শুধু নিজের পড়ালেখায় মন দাও। তুমি আর জেবা সময়মতো রাতের ডিনার করে নেবে।আর তোমার শাহীন আঙ্কেলকে বলে দিয়েছি সব গুছিয়ে রাখতে। ওহ্ হ্যাঁ, সারা রাত জেগে একদম পড়াশুনা করার মতো পাগলামী করবে না। শরীর খারাপ করলে কিন্তু পরীক্ষার হলে কলম চলবে না। নিজের খেয়াল রাখবে,জেবা বড্ড চঞ্চল,ওকেও একটু দেখে রেখো। কোনো সমস্যা হলে আমাকে বা গার্ডদের তৎক্ষণাৎ ফোন করবে, কেমন?”
”জি বাবা, আমি সব মনে রাখব। তুমি ও নিজের খেয়াল রাখবে, সময় মতো ডিনার করে নিবে,” অরি অত্যন্ত দায়িত্বশীলের মতো বলল।
”আচ্ছা মা, খোদা হাফেজ। ভালো করে পরীক্ষা প্রিপারেশন নাও,” আরিশান মৃধা ফোনটা কেটে দিলেন।
অরি ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে একটা লম্বা শ্বাস ফেলল। জেবা তখন খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে ইতিহাসের একটা জটিল পাতা মুখস্থ করার চেষ্টা করছিল। ও অরির দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল,
“কী রে? আঙ্কেল আজ ফিরবেন না?”
”না, খুব জরুরি কাজ পড়েছে। আজ রাতেই ওনাকে ঢাকার বাইরে যেতে হচ্ছে। আমাদের ডিনার করে নিতে বললেন,” অরি নিজের রিডিং গ্লাসটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে বলল।
জেবা এক ঝটকায় খাট থেকে নেমে সোফায় এসে বসল। ও একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল,
“বাব্বাহ! আঙ্কেল বাড়িতে না থাকলে কেন জানি ঘরের বাতাসটা একটু হালকা লাগে রে! ওনার সেই গম্ভীর চেহারা আর বাঘের মতো চাউনি দেখলে আমার বুকের ভেতর কেমন গুরগুর করতে থাকে। বিশেষ করে গত রাতের ঐ উকুন কাণ্ডের পর থেকে তো ওনার সামনে গেলেই আমার মনে হয় এই বুঝি ওনি আমারে ওনার স্পেশাল ফোর্স দিয়া অ্যারেস্ট করাইয়া দিলেন!”
অরি জেবার কথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর রূপের সেই স্নিগ্ধ হাসি যেন পুরো ঘরের ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়ে দিল। ও জেবাকে ধমক দিয়ে বলল,
“ধুর বোকা! বাবা বাইরে থেকে যতই কঠিন প্রশাসক হোন না কেন, ভেতরে ওনার মনটা বড্ড নরম। আমাদের কত ভালোবাসেন দেখিস না? চল, শাহীন আঙ্কেলকে বলি খাবার দিতে। খেয়ে এসে আবার পড়তে বসতে হবে।”
দুজন নিচে নেমে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে রাতের খাবার শেষ করে নিল। শাহীন মিয়া ওদের জন্য গরম গরম খাবার রান্না করেছিলেন। খাবার শেষ করে ওরা দুজন আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আবার দোতলার পড়ার ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিল।
আজকের প্রশ্নপত্রের সেই ভয়াবহ রূপ দেখার পর ওদের ভেতরের সমস্ত আলসেমি উধাও হয়ে গেছে। জেবা আর অরি দুজনেই মনে মনে এক অলিখিত পণ করে ফেলেছে—আজ রাতে ওরা এক পলকও ঘুমাবে না। পুরো সিলেবাসের প্রতিটি লাইন, প্রতিটি অনুচ্ছেদ এমনভাবে খুঁটিয়ে পড়বে যেন,যেখান থেকেই প্রশ্ন করুক না কেন, খাতা যেন ফাঁকা না থাকে।
রাত যত গভীর হতে লাগল, ঘরের নীরবতা তত তীব্র হতে লাগল। ঘড়ির কাঁটা বারোটা, একটা, দুটো পার হয়ে যখন ভোরের চারটের ঘরে গিয়ে পৌঁছাল, তখনও দুই বান্ধবীর চোখের পাতায় ঘুমের কোনো চিহ্ন ছিল না। অরি টেবিল লাইটের আলোয় মগ্ন হয়ে খাতায় বারবার লিখছিল,
আর জেবা মেঝের কার্পেটের ওপর বসে পিঠটা সোফার সাথে ঠেকিয়ে অনবরত পড়া আউড়ে যাচ্ছিল। ভোরের দিকে যখন হালকা শীতল হাওয়া জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকল, তখন ওদের সিলেবাস সম্পূর্ণ শেষ হলো। দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে এক ক্লান্ত কিন্তু তৃপ্তির হাসি হাসল। অবশেষে এক রাতের কঠিন যুদ্ধ জয় করে ওরা ভোরের আলো ফোটার প্রতীক্ষা করতে লাগল।ভাবল পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে কিছু অধ্যায় রিভেশন দিয়ে যাবে পুনরায়।
সকালের সোনালী রোদ খন্দকার ভিলার ডাইনিং রুমে এসে পড়েছে। কাঁচের বড় টেবিলটার ওপর সাজানো ধোঁয়া ওঠা পরাটা, ডিম ভাজি আর সুজি-হালুয়া। টেবিলের এক মাথায় অত্যন্ত বিষণ্ণ মুখে বসে আছেন রাজন খন্দকার। ওনার পরনে যথারীতি সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি হলেও, ওনার মুখচ্ছবিতে গত রাতের সেই তীব্র গ্লানি কালো ছায়া স্পষ্ট। ওনার চোখের নিচে কালি জমেছে, চামচ দিয়ে প্লেটের খাবারটা নাড়াচাড়া করলেও এক লোকমা খাবার মুখে তোলার মতো রুচি ওনার নেই। ওনার সমস্ত পুরুষত্ব, ওনার এত বছরের সামাজিক সম্মান প্রতি রাতেই ধুলোয় মিশেয়ে দেয় ওনার ছেলে
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে নেমে এলো আফিম। ওর ভেতরের সেই পৈশাচিক তৃপ্তি আর বন্য উল্লাসের রেশ ওর চোখেমুখে তখনো চকচক করছে। আফিম এসে কোনো দ্বিধা বা সংকোচ ছাড়াই সরাসরি অনুপমার পাশে বসল। অনুপমা ততক্ষণে আফিমের জন্য প্লেট সাজাতে ব্যস্ত। আফিম বাবার সামনেই অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে নিজের একটা হাত অনুপমার ফিনফিনে শাড়ির ওপর দিয়ে ওর উন্মুক্ত পিঠ ও কাঁধে রাখল, তারপর ওকে নিজের দিকে টেনে জড়িয়ে ধরে বসল।
রাজন খন্দকার ছেলের এই অবাধ্যতা আর স্ত্রীর এই চরম বেহায়াপনা দেখেও নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নিলেন। ওনার গলার কাছে এক মস্ত বড় কান্নার দলা আটকে গেল। তিনি ওনার একমাত্র ছেলেকে কিছু বলতে গিয়েও পারলেন না; ওনার ঠোঁট দুটো কেঁপে ওখানেই থেমে গেল। ওনার নিজের ঘরে, নিজের চোখের সামনে এই অবৈধতার রাজত্ব চলছে, অথচ ওনার কিছুই করার নেই। ওনার শাসন, ওনার পিতৃত্ব আজ এই কামনার অন্ধ দেয়ালের কাছে সম্পূর্ণ পঙ্গু।
অনুপমা নিজের ঠোঁটে সেই চিরচেনা মায়াবী ও চতুর হাসিটা ধরে রেখে বাটি থেকে সুজি-হালুয়া চামচে তুলে অত্যন্ত যত্ন করে আফিমের মুখে পুরে দিল।
”নাও আফিম, তোমার প্রিয় হালুয়া। পুরোটা শেষ করো,” অনুপমার গলার স্বর যেন মধু ঝরানো, যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব।
আফিম হালুয়াটা চিবোতে চিবোতে রাজন খন্দকারের দিকে তাকিয়ে এক কুৎসিত ও তাচ্ছিল্যভরা হাসি দিল। ও ভালো করেই জানে, এই বাড়ির আসল মালিক এখন সে নিজে। ও যা পছন্দ করে, যার ওপর ওর নজর পড়ে, তা সে যেকোনো মূল্যে আদায় করেই ছাড়ে—তা সে বাবার আসন হোক, ক্ষমতা হোক, কিংবা বাবার ঘরের তরুণী স্ত্রীই হোক না কেন! রাজন খন্দকার নিঃশব্দে নিজের পানির গ্লাসটা তুলে নিলেন। ছেলের আর স্ত্রীর এহেন মেলামেশা উনি চেয়েও আটকাতে পারছেন না, কারণ ওনার ভেতরের প্রতিবাদের সেই মেরুদণ্ডটা অনেক আগেই ভেঙে গেছে। ওনি আর কিছুই বললেন না এসব নিয়ে।
আফিম নিজের ব্রেকফাস্ট শেষ করে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বাবার সামনেই অনুপমার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তারপর রাজন খন্দকারের অবশ দৃষ্টির সামনেই অত্যন্ত গভীর ও তীব্রভাবে অনুপমার অধরে নিজের কামনার এক শেষ চুম্বন এঁকে দিল। অনুপমাও চোখ বুজে সেই চুম্বন গ্রহণ করল এবং এক লোলুপ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল।
”আসছি, আম্মু! দুপুরের মধ্যে কাজ শেষ করে ফিরব,”
আফিম একটা পৈশাচিক হাসি দিয়ে বিদায় জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ওর যাওয়ার উদ্দেশ্য, আবার সেই পুরোনো—এলাকায় মাস্তানি, গুণ্ডামি আর সুন্দরী মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে নিজের দাপট বজায় রাখা। বিশেষ করে, রাফানের কাছ থেকে সেই তেজী মেয়েটার (অরির) নাম-ঠিকানা আজ ওকেই বের করতেই হবে।
আফিম বেরিয়ে যেতেই ডাইনিং রুমের থমথমে ভাবটা আরও বেড়ে গেল। রাজন খন্দকারও নিজের আধখাওয়া প্লেটটা ঠেলে দিয়ে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াতে চাইলেন। ওনার সারা শরীর অপমানে আর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল।
ঠিক তখনই অনুপমা অত্যন্ত চতুরতার সাথে রাজন খন্দকারের পিছু পিছু এসে ওনাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। ও ভালো করেই জানে, ওর বুড়ো স্বামীকে কীভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।অনুপমা ওর কাঁধে নিজের নরম চিবুকটা ঘষে অত্যন্ত মিষ্টি আর আদুরে গলায় রাজন খন্দকারের মুড ভালো করার অভিনয় শুরু করে দিল।
”ওভাবে মুখ কালো করে উঠে যাচ্ছ কেন বেবি? তুমি শুধু শুধু ভুল বুঝছ আমাকে,” অনুপমা ওনাকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল এবং ওনার বুকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
”আমি তো ইচ্ছে করে ওর কাছে যাই না বেবি। আমি তোমাকেই ভালোবাসি, এই মনে শুধু তুমিই আছ। কিন্তু আফিমের রাগ তো তুমি জানো-ও যা চায়, তা তো দিতেই হয়। নয়তো ও যদি রেগে গিয়ে এই খন্দকার ভিলার সব সম্পত্তি নিজের নামে লিখিয়ে নেয়, কিংবা তোমার কোনো ক্ষতি করে বসে? সৎ মা হিসেবে ওকে একটু খুশি রাখার, ওর ভেতরের রাগটা শান্ত রাখার একটা দায়িত্ব আমারও আছে তো, নাকি? আমি তো এসব করছি শুধু আমাদের এই সংসারের শান্তির জন্য, তোমার সুরক্ষার জন্য।”
অনুপমার এই জাদুকরী মিষ্টি কথাগুলো রাজন খন্দকারের কানে এসে পৌঁছাতেই ওনার ভেতরের সেই জমে থাকা ক্ষোভ আর শক্ত ভাবটা পলকে গলে গেল। প্রৌঢ়ত্বের এই শেষ বয়সে এসে অনুপমার এই কৃত্রিম ভালোবাসার মায়াটাকে উনি কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারলেন না। উনি মনে মনে জানতেন এটা মিথ্যা, তাও এই মিথ্যাটুকুকেই আঁকড়ে ধরে উনি নিজের সান্ত্বনা খুঁজে নিলেন। ওনার মুড নিমেষেই ভালো হয়ে গেল।অনুপমা ওনার চোখে সেই অন্ধতার সুযোগ নিয়ে ওনার পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল।অফিস যাওয়ার আগেই ওনার ওয়ালেট থেকে ‘ক্রেডিট কার্ডটা’ নিজের আঙুলের ফাঁকে লুফিয়ে নিল।
অনুপমা এরপর রাজন খন্দকার এর গালে একটা আলতো চুমু খেয়ে চপল গলায় বলল,
“আজকে একটু শপিংয়ে যাব বেবি। তোমার ক্রেডিট কার্ডটা রাখলাম। সুন্দর সুন্দর শাড়ি আর গয়না কিনে আনব, যাতে ওগুলো পরে তোমার সামনে সেজে তোমাকে আরও বেশি খুশি করতে পারি।”
রাজন খন্দকার অনুপমার এই চতুরতায় বাধা দেওয়া তো দূরের কথা, ওনার চোখে তখন এক অদ্ভুত প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। তিনি অনুপমার কপালে হাত রেখে বললেন,
“আচ্ছা অনু, সাবধানে যেও।”
রাজন খন্দকার ওনার অফিসের উদ্দেশ্যে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। রাজন খন্দকার চলে যেতেই,অনুপমা ক্রেডিট কার্ডটা হাতে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ও নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে মনে মনে হাসল। ও খন্দকার বাড়ির দুই পুরুষকেই নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে রেখেছে।
সকাল ঠিক সাড়ে আটটা। মৃধা নিবাসের বিশাল সদর গেটের বাইরে হঠাৎ করেই একসাথে কয়েকটা সাইরেন বাজানো পুলিশের গাড়ি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিশিয়াল ফ্ল্যাগশিপ কালো মার্সিডিজ গাড়িটি এসে থামল। তবে আজ গাড়ির পেছনের সিটে আরিশান মৃধা একা ছিলেন না; ওনার পাশে বসে ছিল ওনার একমাত্র ছেলে, দেশের শিক্ষামন্ত্রী মৃধা আবরার সারিম।
সারিমের ডান হাতটা একটা ধবধবে সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো, যা ওর হালকা নীল রঙের শার্টের ওপর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কপালে সামান্য চিন্তার ভাঁজ থাকলে ও চোখের কোণে ছিল এক লুকানো, চতুর বিজয়ের আলো। আরিশান মৃধা কাল রাতে রাজশাহী থেকে সরাসরি ওনার পার্সোনাল হেলিকপ্টারে করে সারিমকে নিয়ে ভোরে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন এবং ওনার কড়া নির্দেশে সারিমকে সরাসরি মৃধা নিবাসেই নিয়ে আসা হয়েছে, যাতে ওনার চোখের সামনে ছেলের সম্পূর্ণ চিকিৎসা আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
গাড়ি থেকে নামার পরপরই আরিশান মৃধার কোটের পকেটে থাকা ওনার পার্সোনাল ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। ওনি ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ওনার গম্ভীর মুখটা আরও কিছুটা শক্ত হয়ে উঠল। ওপার থেকে স্বরাষ্ট্র সচিব অত্যন্ত জরুরি কোনো রাষ্ট্রীয় সংকটের কথা বলছিলেন।আরিশান মৃধা সারিমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কড়া ও গম্ভীর গলায় বললেন,
“সারিম, তুমি আলভির সাথে ভেতরে যাও। আমার একটা জরুরি কল এসেছে, আমি একটু পরে আসছি। আলভি, তোমার স্যারকে সাবধানে ভেতরে নিয়ে যাও। ওর হাত যেন কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা না খায়।”
”জি… জি আঙ্কেল! আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আমি স্যারকে একদম কাঁচের পুতুলের মতো ভেতরে নিয়ে যাচ্ছি!” আলভি দুই হাত জোড় করে তোতলামি করতে করতে বলল।
আরিশান মৃধা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালেন না। ওনি ওনার গার্ডদের ইশারা দিয়ে গেটের এক কোণে বাগানের দিকে চলে গেলেন গভীর মনোযোগ দিয়ে ফোনটা পিক করতে। ওনি দূরে যেতেই সারিম ওর বাম হাত দিয়ে ওর শার্টের কলারটা একটু ঠিক করল। ও আলভির দিকে তাকিয়ে ওর সেই চিরচেনা, বাঁকা চতুর হাসিটা দিল। ও নিজের ডান হাতের ব্যান্ডেজটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“দেখলে তো আলভি? আরিশান মৃধার খাঁচায় পাখি কত সহজে, নিজেই চলে এলো! এবার শুরু হবে আসল শিকার।”
আলভি নিজের মধ্যেই বিড়বিড় করল,
“আপনার এই শিকারের চক্করে আমার জানটা যে কখন যায়, আমি শুধু সেই চিন্তায় আছি।
সারিম ধীর পায়ে মৃধা নিবাসের বিশাল ড্রয়িংরুমের ভেতর প্রবেশ করল। ও চারপাশের দেওয়াল,বিশাল ঝাড়বাতি আর আসবাবপত্র গুলোর ওপর নিজের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো বোলাল। পাঁচ বছর! দীর্ঘ পাঁচটি বছর পর ও এই বাড়িতে পা রাখল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বাড়ির একটা সুতোর টানও বদলায়নি। আসবাবপত্রের অবস্থান থেকে শুরু করে দেওয়ালে টাঙানো পুরনো ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিংটা পর্যন্ত ঠিক আগের মতোই আছে। যেন এই পাঁচটা বছর এখানে এসে থমকে গিয়েছিল। সারিমের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে বলল,
“সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে… শুধু আজ থেকে এই বাড়ির বাতাসে আমার চন্দ্রিমা-র সুবাস মিশে থাকবে।”
সারারাত এক ফোঁটা না ঘুমিয়ে একটানা পড়াশোনা করার ফলে জেবার অবস্থা তখন শোচনীয়। ও সোফায় ধপ করে মাথা এলিয়ে দিয়ে নিজের গলাটা শুকিয়ে কাঠ অনুভব করছিল। ও পাশে বসে থাকা অরিকে অত্যন্ত ক্লান্ত ও মরণাপন্ন গলায় বলল,
“ওরে অরি! আমারে এক ফোঁটা পানি দে রে বোন! সারারাত ঐ বইয়ের পাতা গিলতে গিলতে আমার ভেতরের সমস্ত পানি শুকাইয়া মরুভূমি হয়ে গেছে! আমি আর এক সেকেন্ডও বাঁচব না পানি ছাড়া!”
অরি টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের জগটার দিকে তাকাল। ও দেখল জগটা একদম খালি, এক ফোঁটাও পানি অবশিষ্ট নেই। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“একটু দাঁড়া বাদামনী, জগে তো পানি নেই। আমি নিচে রান্নাঘর থেকে জগে পানি নিয়ে আসছি। তুই ততক্ষণ একটু চোখ বন্ধ করে রেস্ট নে।”
অরি টেবিল থেকে কাঁচের জগটা হাতে নিল। সারারাত জেগে পড়াশোনা করার কারণে ওর নিজের চেহারায়ও এক ধরণের স্নিগ্ধ ক্লান্তি ভর করেছিল। ও নিজের কোনো তোয়াক্কা না করেই,এক হাতে কাঁচের জগ আর অন্য হাতে বইটা ধরে পড়তে পড়তে ধীর পায়ে ঘরের দরজা খুলে করিডোরে বের হলো।অরির পরনে ঘরের আরামদায়ক পোশাক ছিল। পরনে ছিল একটা ওভারসাইজড সাদা রঙের কটন শার্ট, যা ওর ফর্সা অবয়বকে আরও কিছুটা ছোট আর নিষ্পাপ করে তুলছিল, আর নিচে একটা ঢিলেঢালা কালো রঙের জিন্স প্লাজো।মাথায় চিরুনির কোনো ছোঁয়া লাগেনি। অরির সেই মেঘের মতো ঘন, বাদামী সিল্কি পিঠ সমান চুলগুলো সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায় পিঠের ওপর ডানা মেলে ছিল। জানলার বাতাসে সেই চুলগুলো ওর ফর্সা গালে এসে আলতো করে দোলা দিচ্ছিল। চোখের ওপর সেই চিরচেনা গোল রিডিং গ্লাসটা বসানো, আর বাম হাতে তখনো ও আজকের পরীক্ষার একটা ছোট হ্যান্ডনোটের বই শক্ত করে ধরে রেখেছিল।
অরি সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগলো, কিন্তু ওর চোখ তখনো বইয়ের জটিল লাইনের ওপরেই নিবদ্ধ ছিল। ও মুখে ফিসফিসিয়ে পড়াটা আউড়াচ্ছিল আর এক এক পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল।সিঁড়ির শেষ ধাপে আসতেই সারিমের তীক্ষ্ণ দূরদর্শী দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়ল ওপর থেকে নেমে আসা সেই মায়াবী অবয়বটির ওপর। অরিকে দেখামাত্রই সারিমের চোখের মনিতে যেন এক মস্ত বড় আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটল! ওর হাতের আঙুলগুলো ব্যান্ডেজের ভেতর থেকেও এক মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেল।
সকালের নরম রোদের আলো তখন ড্রয়িংরুমের বিশাল কাঁচের জানলা গলে অরির সেই দুগ্ধশুভ্র ত্বকের ওপর এসে পড়েছিল। চুলগুলোর সেই এলোমেলো বাদামী আভা, ওভারসাইজড শার্টের আড়ালে থাকা ওর সেই ছোট পাখির মতো স্লিপ শরীর, আর চোখে রিডিং গ্লাসের আড়ালের সেই টানা টানা হরিণীর মতো চোখ—সবকিছু মিলিয়ে অরিকে দেখতে এই মর্ত্যের কোনো মেয়ে মনে হচ্ছিল না। ও যেন স্বর্গের কোনো এক ক্লান্ত পরী, যে ভুল করে মানুষের এই কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে নেমে এসেছে!
সারিম ওর জীবনে কত শত সুন্দরী নারী দেখেছে, কিন্তু অরির এই সাধারণ, ক্লান্ত আর স্নিগ্ধ রূপের সামনে ওর ভেতরের সেই অহংকারী রুপটা এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে যায়।সে নিজের অজান্তেই অরির রূপের সাগরে দ্বিতীয়বারের মতো সম্পূর্ণ ডুবে গেল। ওর ফর্সা গাল দুটোতে আবার সেই হালকা লালচে ব্লাশিং ভাবটা ফুটে ওঠার উপক্রম হলো। ও নিজের অবাধ্য মনকে সামলাতে পারছিল না।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলভিও যখন অরিকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখল, ওর নিজের মনে মনে এক মস্ত বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করতে লাগল,
“হায় ফাঁটা কপাল আমার !মেয়েটা দেখতে যা মারাত্মক সুন্দর ! যেন আস্ত একটা পরি জান্নাত থেকে ডাইরেক্ট সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে! কত আশা ছিল বস ওনাকে তালাক দিলে,পরে আমি বিয়ের প্রস্তাব পাঠামু!কিন্তু বসের ঐ জাওড়া মনটা তখনি প্রেমে উষ্ঠা খেয়ে পড়তে হলো! আমার কপালে আর এই সুন্দরী বউ জুটল না! সব কপাল ঐ খবিশ বসের!”
এদিকে অরি নিচের এই নীরব দৃশ্য কিছুই খেয়াল করেনি। ও নিজের পড়া মুখস্থ করতে করতে সোজা গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। রান্নাঘরের ফিল্টার থেকে জগে ঠাণ্ডা পানি ভর্তি করে, বইটা আবার হাতে নিয়ে ও পড়তে পড়তে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলো। ও সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে এক পা এক পা করে ওপরে উঠতে নিতেই,
”চন্দ্রিমা!”
হঠাৎ করেই পুরো নিস্তব্ধ ড্রয়িংরুমের বাতাস চূর্ণ করে এক অত্যন্ত গভীর, পুরুষালি এবং মাদকতাভরা কণ্ঠস্বর অরিকে পিছন থেকে ডেকে উঠল। কণ্ঠস্বরের সেই অদ্ভুত টান আর গম্ভীরতা অরির কানের পর্দায় লাগতেই ওর পায়ের গতি থমকে গেল। এই বাড়িতে চন্দ্রিমা বলে তো কেউ নেই! এটা বড্ড বেশি অপরিচিত অথচ চেনা এক কর্কশ আওয়াজ।অরি অত্যন্ত অবাক হয়ে, ভ্রু কুঁচকে খুব ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা পিছনের দিকে ঘুরাল। নিজের রিডিং গ্লাসের আড়াল থেকে বড় বড় চোখ করে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে তাকাতেই ওর হাতের কাঁচের জগটা প্রায় হাত থেকে খসে পড়ার দশা হলো!
সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে স্বয়ং মৃধা আবরার সারিম! ওর ডান হাতটা ব্যান্ডেজে মোড়ানো, চোখে সেই চিরচেনা সেই তীক্ষ্ণ চাউনি।সে অরির দিকে এমনভাবে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন ওর ঐ চোখ দিয়ে সমস্ত ভালোবাসা একসাথে উগরে দিচ্ছে।
অরি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর ফর্সা কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। এই লোকটা এখানে কীভাবে এলো? আর ওনার হাতে ব্যান্ডেজ কেন?কাল সকালে তো ওনার পিএ এসে ডিভোর্স পেপার নিয়ে গেল, তার মানে তো সম্পর্ক শেষ! তবে কি লোকটা বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য এসেছে। কিন্তু বাবা তো এখন বাড়িতে নেই,
অরিকে ওভাবে বোকার মতো কাঠের পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সারিমের ঠোঁটের কোণে সেই চতুর, বাঁকা হাসিটা আবার ফুটে উঠল।
সে অরিকে আরও কিছুটা অবাক করার জন্য নিজের গলার স্বরকে একটু উঁচিয়ে অত্যন্ত রসালো ও তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল
”কী অবস্থা,বউ? ঠিকঠাক মতো লেখাপড়া করছ তো?পড়তে হবে,এবার আর নকল হবে না।
সারিমের এই তীরের মতো তীক্ষ্ণ কথাটি শুনতেই অরির ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় আর চরম অপমানে এক মুহূর্তে টকটকে লাল হয়ে গেল! ওর রিডিং গ্লাসের আড়ালের চোখ দুটো রাগে জ্বলজ্বল করে উঠল। ও বুঝতে পারল, এই লোকটা কালকের পরীক্ষার হলের সেই ঐতিহাসিক নকলের ঘটনাটা নিয়ে ওকে চরম খোটা দিচ্ছে এবং অপমান করার চেষ্টা করছে!
”এবার আর পরীক্ষায় কোনো নকল চলবে না, চন্দ্রিমা!শিক্ষামন্ত্রী আবরার সারিম কিন্তু সব সময় তোমার পাশে থাকবে না বাঁচানোর জন্য। নিজের মেধায় লিখতে হবে, বুঝলে?” সারিম আবার একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল।
অরি নিজের হাতের জগটা শক্ত করে চেপে ধরে, রাগে কাঁপতে কাঁপতে সিঁড়ি থেকে দুই ধাপ নিচে নেমে এলো। ও সারিমের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব শক্ত করে বলল,
“মুখ সামলে কথা বলুন, মিস্টার সারিম মৃধা! আপনি আমাকে এভাবে খোটা দেওয়ার কোনো অধিকার রাখেন না। কালকে যা হয়েছে তা একটা দুর্ঘটনা ছিল, আমি কখনো জীবনে ওমন কাজ করি না! আর আপনি এই বাড়িতে কেন এসেছেন? আপনার সাথে তো আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই!”
”সম্পর্ক নেই? কে বলল সম্পর্ক নেই?”
সারিম এক ঝটকায় সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ওর সেই দীর্ঘ সুঠাম অবয়ব অরির সামনে আসতেই অরি নিজেকে বড্ড ছোট অনুভব করল।সারিম অরির একদম কাছাকাছি এসে নিচু ও বজ্রকঠিন কণ্ঠে বলল,
“তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ এটা আমার বাবার বাড়ি,আর দ্বিতীয়ত তুমি এখনো আইনত আমার বিবাহিত স্ত্রী। আরিশান মৃধার পুত্রবধূ!”
”কীসের স্ত্রী?!” অরি চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু বাবার ভয়ে নিজের গলার স্বর নিচু করে বলল,আরিশান মৃধা সবসময় জটিল পরিস্তিতি তে অরিকে বলতেন।রাগ বা চিৎকার চেচাঁমেচি না করে শান্ত ভাবে পরিস্তিতি মোকাবেলা করতে শেখো। আর অরিও এখন সেটাই করছে।
“আপনার পিএ কালকে সকালেই এসে আমার থেকে ডিভোর্স পেপারে সাইন নিয়ে গেছে! আমি নিজের হাতে সাইন করেছি! আপনি এখন সম্পূর্ণ মুক্ত, আর আমিও স্বাধীন! আপনি আমাকে নিজের স্ত্রী দাবি করতে পারেন না!”
অরির কথা শুনে সারিম এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠল, যা শুনে পাশের সোফার আড়ালে থাকা আলভি নিজের কান বন্ধ করে ফেলল। সারিম অরির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু মারাত্মক গলায় বলল,
“ডিভোর্স পেপার? ওহ! ওই কাগজের টুকরোটার কথা বলছ? আহারে বেচারি! অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি চন্দ্রিমা… তোমার দেওয়া সেই অপবিত্র সাইন করা ডিভোর্স পেপারটা কাল সকালেই ক্ষুধার্ত কুত্তার দল চিউইং গাম ভেবে চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে! ওটা এখন একদম ধ্বংস! সো, টেকনিক্যালি আর লিগ্যালি… আমাদের ডিভোর্সটা আর হলো না!যেহেতু সাইন টা তুমি করেছো আমি না”
অরির চোখ দুটো এবার আক্ষরিক অর্থেই চড়কগাছ হয়ে গেল। ও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। একটা আস্ত ডিভোর্স পেপার কুত্তা চিবিয়ে খেয়েছে? এটা কোনো সিনেমার স্ক্রিপ্ট নাকি? ও রাগে ফেটে পড়ে বলল,
“আপনি মিথ্যা বলছেন! আপনি আস্ত একটা মিথ্যাবাদী, কুত্তা কেন ডিভোর্স পেপার খেতে যাবে? ওর কি খাওয়ার অভাব পড়ছে নাকি, আজব!আপনার এই ফাজলামি বন্ধ করুন দয়া করে! আপনি ইচ্ছে করে ওটা লুকিয়ে রেখেছেন!”
”আমি মিথ্যা বলছি না চন্দ্রিমা, বিশ্বাস না হলে আমার পিএ আলভিকে জিজ্ঞেস করো। ও নিজেই নিজের চোখে কুত্তার সেই ঐতিহাসিক ব্রেকফাস্ট দেখেছে,”
সারিম আলভির দিকে চোখ মারল।আলভি সোফা থেকে মাথা চুলকাতে চুলকাতে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“জি… জি ম্যাম! স্যার একদম ঠিক বলেছেন। ঐ কুত্তাটার কপাল বড্ড ভালো ছিল, ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের ডিভোর্স পেপার দিয়ে নিজের সকালের নাস্তা কমপ্লিট করছে! আমার নিজের চোখের সামনে সব শেষ হতে দেখেছি!”
অরি আলভির কথা শুনে রাগে নিজের দাঁতে দাঁত চাপল। ও বুঝতে পারল এই মাস্টারমাইন্ড লোকটা ওর সাথে এক মস্ত বড় নোংরা খেলা খেলছে। ও সারিমের দিকে তাকিয়ে তীব্র ঘৃণার গলায় বলল,
“আপনারা দুজনেই পাগল! আমি এই নাটক মানি না। বাবা আসুক, আমি বাবাকে এখনই সব বলে দেব।
অরি যেই পিছন ফিরে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই সারিম অত্যন্ত শীতল ও গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
“যাও চন্দ্রিমা, আরিশান মৃধাকে সব বলে দাও। কিন্তু মনে রাখবে, তুমি ওনাকে আমার কিছু বলার আগেই, আমি ওনাকে তোমার কালকের পরীক্ষার হলের সেই ‘নকল করার সুমধুর কাহিনী’টা একদম সপ্রমাণ জানিয়ে দেব! দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মেয়ে পরীক্ষার হলে খাতায় চিরকুট দেখে লিখতে গিয়ে,চুরি করে শিক্ষামন্ত্রীর হাতে ধরা পড়েছে… এই খবরটা যদি আরিশান মৃধা জানতে পারেন, ওনার অহংকার আর সম্মান এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে যাবে না? ওনার হার্ট অ্যাটাক হওয়াও কিন্তু অস্বাভাবিক নয়!”
সারিমের এই মারাত্মক ব্ল্যাকমেলের কথাটি শুনতেই অরির পুরো শরীরটা, এক মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেল! ওর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। ও খুব ভালো করেই জানে ওর বাবা আরিশান মৃধার কাছে ওর সম্মান আর সততা কতটা বড়। ওনি যদি জানতে পারেন ওনার অরি এই ধরণের নোংরা কাজ করেছে, তবে ওনি হয়তো অরির ওপর থেকে ওনার সমস্ত বিশ্বাস চিরতরে হারিয়ে ফেলবেন, ওনার বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
অরি অত্যন্ত অসহায় ও ভীতু চোখে সারিমের দিকে তাকাল। ওর চোখের কোণটা ভয়ের নোনা জলে সামান্য ভিজে উঠল। ও কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“আপনি… আপনি একটা নিচ মানুষ? আপনি নিজের ক্ষমতা দিয়ে আঠারো বছরের একটা মেয়েকে এভাবে ব্ল্যাকমেল করছেন? আপনার লজ্জা করে না?”
সারিম অরির চোখের সেই জল দেখে ওর ভেতরের সেই কঠোর রূপটা এক সেকেন্ডে গলে জল হয়ে গেল। ওর মনে হলো ও অরিকে বড্ড বেশি ভয় দেখিয়ে ফেলেছে। ও নিজের গলার স্বরকে অত্যন্ত নরম, মায়াবী ও গভীর করে অরির আরও এক ধাপ কাছে এলো। ও অরির ফর্সা মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত তৃপ্তির সুরে বলল,
“আমি নিচ নই চন্দ্রিমা, আমি স্রেফ একজন লোভী শিকারি, যে নিজের অস্তিত্বকে ফিরে পেতে চায়। আচ্ছা বাদ দাও ওসব ভয় দেখানোর কথা। আমার একটা অত্যন্ত ছোট আবদার পূরণ করবে, চন্দ্রিমা?”
অরি নিজের চোখের জলটা এক হাত দিয়ে মুছে, রেগে মুখ ফুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কীসের আবদার? আপনার মতো মানুষের কোনো আবদার আমি পূরণ করব না!”
সারিম ওর বাম হাতটা অরির চিবুকের কাছে এনে, ওর চোখের মনিতে নিজের গভীর চোখ দুটো ডুবিয়ে দিয়ে অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ ও মাদকতাভরা গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমি তোমার মনের ভেতর, একবার ঘুরে আসতে চাই, চন্দ্রিমা। জানতে চাই, সেখানে এই সারিম মৃধার জন্য কতটা রাগ আর কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।”
সারিমের এই আচমকা রোমান্টিক ডায়লগটা শুনতেই অরির ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় আর চরম মেজাজে ফেটে পড়ার দশা হলো! ওর মাথার ওপর এখন পরীক্ষার কঠিন পড়াগুলোর চাপ ঘুরপাক খাচ্ছিল, আর এই লোকটা সকাল সকাল এখানে এসে ওর সাথে প্রেমের নাটক শুরু করেছে!
অরি নিজের হাতের কাঁচের জগটা সারিমের বুকের সামনে একটু উঁচিয়ে ধরে চরম মেজাজে ও ত্যাঁদড় গলায় বলে উঠল,
“আমার এখন পরীক্ষার অনেক পড়া বাকি আছে! আপনার যদি এতই ঘোরার শখ জেকে থাকে, তবে গিয়ে বাবাকে বলুন! ওনার মনের ভেতর অনেক রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত আর গোয়েন্দা রিপোর্ট আছে, আপনি ওনার মনের ভেতর গিয়ে, আরামসে কয়েক বছর ঘুরে আসুন! আমার পথ ছাড়ুন বলছি!”
কথাটা শেষ করেই অরি আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। ও সারিমকে এক মস্ত বড় ধাক্কা দেওয়ার মতো পাশ কাটিয়ে,ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে দৌড়ে চলে গেল।
সারিম সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি হাসল।নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
“তীব্র তেজ! এই তেজটাই তো আমার ইশকের ফানিয়ারকে আরও বেশি জ্বালিয়ে দেবে, চন্দ্রিমা।”
এদিকে অরি ঝড়ের বেগে পড়ার রুমে ঢুকে ধপ করে দরজাটা বন্ধ করে দিল এবং ভেতরের লকটা সশব্দে আটকে দিল। ওর বুকের ভেতরটা তখন কামারের দোকানের নেহাইয়ের মতো ধড়ফড় করে কাঁপছিল, মুখটা রাগে আর লজ্জায় টকটকে লাল। ও হাতের কাঁচের জগটা টেবিলের ওপর আছাড় মারার মতো করে রাখল।
সোফায় বসে থাকা জেবা অরির এই রুদ্ররূপ দেখে এক লাফে উঠে দাঁড়াল। ও চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল,
“কী রে অরি?! নিচে কি কোনো ভুত দেখলি নাকি? তোর মুখ-চোখ এমন লাল হয়ে আছে কেন? আর পানি আনতে গিয়ে এত দেরি হলো কেন?”
অরি নিজের হাতের বইটা সোফার ওপর ছুড়ে মেরে, দুই হাত কোমরে রেখে রেগে চিৎকার করে বলে উঠল-
”হাই হেট কুত্তা, জেবা! আই জাস্ট হেইট ডগস! এই পৃথিবীর সমস্ত কুত্তাদের আমি নিজের হাতে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব! খবিশ সব!”
জেবা অরির মুখে এই ঐতিহাসিক গালিটা শুনে পুরোপুরি তাজ্জব বনে গেল! ও হাঁ করে অরির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ও কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী দেখছে। জেবা অত্যন্ত অবাক হয়ে বলল,
“অ্যাঁ?! কী বললি?! তুই কুত্তাদের ঘৃণা করিস?! তুই না এই এলাকার সমস্ত রাস্তার কুত্তাদের নিজের হাতের বিস্কুট খাওয়াস? কুত্তা তো তোর সবচেয়ে প্রিয় প্রাণী ছিল রে অরি! হঠাৎ আজকে সকাল সকাল কুত্তাদের ওপর তোর এত বড় অভিশাপের বন্যা বয়ে যাচ্ছে কেন? তোরে কি নিচের কোনো কুত্তা কামড়াইছে নাকি?!”
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৫
”কুত্তা কামড়ায়নি জেবা… কুত্তা আমার পুরো জীবনটা চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে!”
অরি সোফায় ধপ করে বসে নিজের মাথায় হাত দিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল।
জেবা কিছুতেই এই রহস্যময় কাহিনীর কোনো মাথা-মুণ্ডু বুঝতে পারল না। ও শুধু হাঁ করে বান্ধবীর এই পাগলু রূপ দেখতে লাগল,
