উন্মাদনা পর্ব ১৪
কায়নাত খান কবিতা
__ড্রেস খু:লে আমার সামনে দাড়া বান্দী।”
অভীর কুরুচি পূর্ন কথা গুলো কর্নপাত হতেই আগনের মতো তেতে উঠে আনন্দী। সে কী এতোটাই সস্তা হয়ে গেছে? যখন অভী চাইবে তখনই তাকে শরীর প্রদর্শন করতে হবে। আচ্ছা সে কী বাজারি মেয়ে? তাকে কী টাকা দিয়ে কেনা?
আনন্দীর চোখ বেয়ে আপনাআপনি অশ্রুর ধারা গুলো ধাপিত হতে থাকে। গড়গড়িয়ে বইতে থাকা সে ধারা গুলো বোধহয় অভীর মন গলাতে ব্যর্থ হলো।সে আবার ও কাপুরুষের ন্যায় আনন্দীকে ঝাড়ি দিয়ে বললো,___খুলবি না-কি আমি নিজে এসে খুলমু?”
__তুই কী মানুষ? না-কি জানোয়ার?”
__আমার লগে শু’য়ার সময় মনে ছিলো না? জলদি খুল বা”ল। মুডে আছি।”
দাঁতে দাঁত পিষে আনন্দী বলে,__তুই তো একটা ধর্ষ”ন কারী। তোর সাথে ইচ্ছে করে কোনো মেয়ে শু’তে যাবে না।” আনন্দীর দাঁতে দাঁত পিষে কথাগুলো শুনতেই ফিক করে অট্টহাসিতে ফেটে পরে অভী। চোখ ডলতে ডলতে বলে,__ভিডিও তে তো স্পষ্ট দেখা যাইতাছে তুই ইচ্ছা কইরাই আছোস! দেখবি না-কি? পাঠামু তোর বাপরে?”
কথায় রয়েছে নারী জাতি ভয়ংকরী। কিন্তু কথাটি হওয়া উচিত ছিলো নারী জাতি অসহায় কারী। যে যখন নারীকে পায়। ভোগের সামগ্রী বানায়।সব থেকে সস্তা হলো মেয়ে লোকের সত্তা। কখনো পরিবার, কখনো ভিডিও বা কখনো এমন জিনিস দিয়ে তাদের ব্ল্যাক মেইল করা হয়, যখন তারা নিজের ইজ্জত ও দিয়ে দেয়। আসলে দিয়ে দেয় না। বরং অভীর মতো কিছু পশুরা লুটে নেয়। যখন মন চায় তাদের মনের খায়েস মেটায়।
অভীর হুমকি শুনে কিছু ক্ষণ চুপটি করে বসে থেকে বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাড়ায় আনন্দী।তারপর দরজা বন্ধ করে, শরীরের পোশাকটি খুলে ভিডিও কলে অভীর সামনে দাড়ায়। ফোন সামনে ধরতেই অভী বলে,__একটু নিচে ধর বা’ন্দী।কিছু দেখি না।”
অভীর কথা মতো আনন্দী ফোনটি দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ প্রদর্শন করতে থাকে। প্রতিটা বডি পার্ট দেখতে দেখতে অভী আরেক অকাজ করতে থাকে। ঘৃণায় চোখ বন্ধ করে ফেলে আনন্দী। চোখ বন্ধ করলে ও তার অশ্রু গুলো বন্ধ হলো না। সেগুলো পড়ে গলা টইটম্বুর হতে লাগলো। কিছু ক্ষণ পর অভী বলে,__যখনই ডাকমু। হাজির হবি। সময় মতো তোরে না পাইলে খবর আছে।” আনন্দী হ্যাঁ কিংবা না কোনো কিছুই করলো না।কোনোরকম ফোনটি কেটে দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়লো সে। একবার মন বললো মা-কে কী সব জানিয়ে দেবে? তখনই আবার এক বিশাল বড়ো বাঁধা মন বেঁধে দিলো। আনন্দী তার মা-কে কী বললে? মা আমি ধ:র্ষিতা? আজ আমি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলাম অভীর সাথে অকাজ করতে!
একটা মেয়ে যার বয়স সবে ১৮ হলো। সে দিন দুনিয়া সম্পর্কে তেমন একটা কিছু জানে না। সে আজ ধ’র্ষিতা। সে কী করে মা-কে বলবে তার সাথে কী হয়ে গেছে। এটা কী আদোও সম্ভব? ঠিক এই ভুলটাই আনন্দী করে বসে। সে কিছু বললো না তার মা-কে। যদি বলতো তাহলে হয়তো কালকের সূর্যটি এক নতুন বার্তা বয়ে আনতো।
অভী নামক নরপিশাচটির হাত থেকে মুক্তি পেতো। কিন্তু আনন্দী বললো না তার মা’কে। সচারাচর কম বয়সী মেয়ে গুলো এই একটাই ভুল করে বসে। নিজের সাথে কিছু ঘটে গেলে মা-কে বলে না। ভাবে কী করে বলবে। বাসা থেকে বের হওয়া নিষিদ্ধ করে দেবে। যাকে পাবে তার সাথে ধরে বিয়ে দিয়ে দেবে। এই ভয় গুলোই কম বয়সী মেয়েরা নিজেদের পরিবার থেকে একটু দূর করে রাখে।এখানে যে সম্পূর্ণ তাদের দোষ বিষয়টি এমন ও নয়। পরিবারের কেউ আপন না হলে ও মায়ের হওয়া উচিত বন্ধুর মতো। যেন মেয়েটি কিছু হলে তার মা-কে বলতে পারে। কিন্তু মা সমাজে এমন কিছু মা রয়েছে যারা তিল থেকে তাল হলেই সন্তানকে এমন ভাবে দোষারোপ করে।সন্তানতি ভুলে যায়, তার বটবৃক্ষকের কথা। মা বাবাকে তখন চরম শত্রু মনে হয়।
আচ্ছা একবার কী ভেবে দেখেছেন? যেই কথা গুলো আমরা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে পারি।সেগুলো মা কিংবা বাবার সাথে কেন শেয়ার করতে পারি না? আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সেই বন্ডিং টায় ক্রিয়েট হয় না। এর মানে কী শুধু মায়ের দোষ? না! এখানে পঞ্চাশ শতাংশ ছেলে মেয়ের ও দোষ থাকে। তারা অনেক কিছুর ভয় ভীতির ফলে পরিবারকে মাঝে মাঝে ভিলেনে পরিণত করে। যেমন কেন রাতে বের হতে দিলো। এতোটা কুল প্যারেন্স নয়। ব্লা ব্লা।অথচ সন্তান গুলো বুঝে না। যেখানে দিনের বেলায় সেইফটি নেই, সেখানে রাতের বেলা কী করে সেইফটি থাকবে। সন্তানটি যতক্ষণ বাইরে বুক দুরু দুরু করতে থাকে মা-টির। যখন সে ঘরে থাকে। নিশ্চিত ভাবে ঘুমায়।
এই যে বোঝাপড়ার ভুল হয়ে একটা গ্যাপ চলে আসে। তখন অভীর মতো ছেলেরা মাঝে ঢুকে পরে। তারপর ঘটে যায় অঘটন। একটি দূর্ঘটনা। সারাজীবনের কান্না।
ফ্লোরে এলোমেলো ভাবে শুয়ে থাকা আনন্দী নিজের ন’গ্ন শরীরটার দিকে তাকায়। কতোটা অপবিত্র সে আজ।
চোখ তুলে উপরে ঘূর্ণি মান ফ্যানটির দিকে তাকায় সে। এভাবে আর যায় হোক। বেঁচে তো থাকা যায় না। বেঁচে থাকলে ও কী নামে থাকবে? ধর্ষ’ীতা?
ফ্যানটির দিকে তাকিয়ে নিজের ওড়না খুজতে থাকে আনন্দী। আলমারি থেকে একটি বড় সাইজের ওড়না, যেটা লম্বায় এবং চওড়ায় প্রসস্থ, সেটা নিয়ে আবার ও ফ্যানের দিকে তাকায় সে।তারপর পড়ার টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারটি নিয়ে বিছানার উপরে রাখে। খুব সাহস করে চেয়ারের উপরে দাঁড়িয়ে পরে আনন্দী। ফ্যানের সাথে ওড়নাটি বেঁধে গলায় দিবে।তার আগেই দরজার ওপার থেকে ভেসে আসে বাবার গলা।
খুব ভালোবেসে সে আনন্দীকে বলে,__মা আন্দু! তোর মা খাবার গরম করেছে রে। জলদি বের হ। আমার খুব খিদে পেয়েছে।” আনন্দীর বাবা সচারাচর তাকে ছাড়া খায় না। আজ ও বুড়ো লোকটা না খেয়ে তার পথ চেয়ে রয়েছে। আনন্দী গলায় থাকা ওড়াটি একবার দেখে।তারপর কপাল কুঁচকে আসতাগফিরুল্লাহ বলতে বলতে ওড়নাটি খুলে নিচে মেনে যায়। চেয়ার জায়গা মতো রেখে শরীরে পোশাক জড়ায়। যেই ওড়না দিয়ে আনন্দী ফাঁ’সি দিতে গিয়েছিলো, সেই ওড়নাটিই গায়ে জড়িয়ে চোখ মুখ মুছে দরজা খুলে বেরিয়ে পরে সে।
দরজা খুলতেই বাবার মুখের হাস্যউজ্জল হাসি দেখে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতে থাকে আনন্দীর। আজ যদি সে সু’ইসাইড করতো।তাহলে বোধ হয় লোকটি আর কিছুই খেতো না। খালি পেটেই কয়দিন পার করতো।এতো তো বাবার শরীরটা আরো খারাপ হতো। কোনো কিছু না করে ও বাবা এবং সারাজীবন সাফার করতো।
আনন্দী চুপচাপ তার বাবার সাথে খেতে চলে যায়। মা কত সুন্দর করে রান্না করেছে তার জন্য। আলু দিয়ে গরুর মাং’সের ঝোল সাথে সাদা ভাত আনন্দীর সব থেকে প্রিয় খাবার। দু থালা ভাত তার এমনিতেই শেষ হয়ে যায় এ খাবার পেলে। আনন্দীকে চেয়ারে বসিয়ে বাবা প্লেট সামনে রাখে। মা দু হাতা ভাত দিতেই আনন্দী আর দিতে পারব করে। মা তবু ও আরো এক হাতা ভাত ঠেলে দেয়। মায়েদের সব থেকে বিশেষ কাজের মাঝে এই একটা কাজই রয়েছে। যদি সন্তান বলে ব্যাস আর ভাত দিও না। মায়েরা আরো এক হাতা বেশি দেয়। কারণ তারা জানেন। সন্তানের খিদে কতটুকু। ঠিক কতটুকু হলে তাদের পেট ভরবে।
সবাইকে খাবার দিয়ে নিজে ও খেতে বসেন আনন্দীর মা। এক এক করে তিন জনই খেতে শুরু করে।
খাওয়ার মাঝ পথে আনন্দী হু হু করে কেঁদে ওঠে। তার এই হঠাৎ কান্নার কোনো কুলকিনারা করতে পারে না তার মা বাবা। বাবা খাবারের প্লেট থেকে উঠে আনন্দীর কাঁধে হাত রাখে। কিন্তু কেন যেন আনন্দী তার হাতটি সরিয়ে ফেলে। নিজের বাবা ছোঁয়া ও কেমন যেন লাগতে শুরু করে আনন্দীর। বাবা নামক মানুষটি বুঝলো না মেয়ের মতিগতি। সে পানির গ্লাস সামনে ধরলো। মা ও কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। আনন্দীকে এতো বার জিজ্ঞেস করার পর ও সে কিছু বললো না।
এক পর্যায়ে হিঁচকি টান উঠে পরে আনন্দীর।মা পিঠে কয়বার হালকা বা’রি দিয়ে বলে,__এতো কাঁদিস না মা। কী হয়েছে। খুব বেশি শরীর খারাপ লাগছে?” মায়ের কথার কোনো উত্তর নেই আনন্দীর কাছে। সে অনবরত কেঁদেই চলেছে। বাবা আবার ও পিঠে হাত দিতেই আনন্দী আবার ও হাত সরিয়ে ফেলে। অভী আনন্দীকে এতোটাই ট্রমাট্রাইজ করে ফেলেছে। বাবার মতো পবিত্র ছোঁয়াতে ও তার গা ঘিনঘিন করে উঠছে। কিন্তু বোকা বাবাটি এবার ও বুঝলো না। সে এটা ওটা দিতে ব্যস্ত হয়ে পরে।
কিছু ক্ষণ পর আনন্দীর কান্না থামে। সে তার বাবাকে বলে,__আমার শরীর ভালো লাগছে না বাবাই। রুমে গিয়ে শুয়ে পরি?”
মেয়ের কপালে হাত দিয়ে আকরাম শেখ বলে,__কপালটি তো বেশ গরম রে মা। ডাক্তারের কাছে যায় চল।”
__না বাবাই! আমি রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবো।”
বাবা কিছু বলতে গিয়ে ও যেন পারলো না।মেয়েরা বড়ো হলে সবার আগে বাবার সাথে দূরত্ব বাড়ে। আনন্দী ও বড় হচ্ছে। তাই হয়তো এমন করছে। আকরাম শেখ তাকে চোখের ইশারা করে বোঝায় যেতে।
আনন্দী যেতে যেতে আবার ও পিছনে ফিরে বলে,__বাবাই।”
উন্মাদনা পর্ব ১৩
__হুম মা?”
__কিছু না।”
আনন্দী চুপচাপ চলে যায়। তার বাবাকে বলতে গিয়ে ও বলতে পারলো তার সাথে হয়ে যাওয়া এই অঘটনটির কথা। আকরাম শেখ সন্দেহ করে বটে। হয়তো অভীই আবার কিছু করেছে এই ধারণা তার হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েকে এখন কিছু জিজ্ঞেস করলে তার শরীর আরো খারাপ হবে। তাই কিছু না বলেই চুপচাপ করে রইলো আকরাম শেখ। এক বুক নিঃশ্বাস ফেলে আকরাম শেখ বললো,__মেয়েরা বড়ো হলে, সবার আগে পর হয় বাবা।”
